অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৪
সাজিয়া জাহান সুবহা
সূর্যের তেজস্বী রশ্মিতে গায়ে পীড়া দিয়ে উঠছে মানুষের। এই কড়া রোদের পীড়া থেকে বাঁচতে দ্রুত যে যার বাসস্থান/কর্মসংস্থানে পৌঁছাতে উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু ব্যাতিক্রম দেখা মিললো সায়েরীর বেলায়। গরমে শরীর ঝলসে যাওয়ার পরও তার মন সায় দিলো না এতো তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছানোর। তার কথামতো দূরের পথ দিয়েই রিক্সা এগোতে লাগলো। বেশ অনেকটা পথ পার হওয়ার পর হঠাৎ পরিচিত যায়গাটা চোখে পড়তেই দ্রুত রিক্সা থামাতে বললো সায়েরী। রিক্সা থামতেই ব্যাস্ত পায়ে নেমে দাঁড়ালো সে৷ রিক্সাওয়ালাকে অপেক্ষা করতে বলে সে এগিয়ে গেলো বিশাল জায়গা দখল করে গড়ে উঠা কবরস্থান-টার দিকে৷ বেশিদূর যাওয়া সম্ভব হলোনা কারণ সম্পূর্ণ জায়গাটা দেয়ালে ঘেরা।
দূর থেকেই সায়েরীর চোখ আটকে রইলো করবস্থানের একপাশে খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটা জায়গায়। মানুষটা পৃথিবী ছেড়েছে আজ প্রায় চারবছর হতে চললো। অথচ এই জায়গাটা এখনো কতো পরিচ্ছন্ন। যেনো তার আপনজনেরা চাই না মানুষটা ওই অন্ধকার জগতে অপরিচ্ছন্নতায় পড়ে থাকুক। বুক ছিড়ে দীর্ঘশ্বাস বের হলো সায়েরীর। চোখে ভাসলো মানুষটার সাথে কাটানো প্রতিটা রঙ বেরঙিন স্মৃতি। উপর ওয়ালার এ কেমন রহমত!! কেনো এক মায়ের কোল খালি করে তার ২৪ বছর বয়সের টগবগে যুবক ছেলেকে কেড়ে নিলো!! অজান্তেই চোখে জল জমলো সায়েরীর।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
একটা সময় সামান্য বিষয়ে কেঁদে কেটে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলা মেয়েটা এখন খুব সহজেই নিজেকে সামলে নিতে শিখে গিয়েছে। আগে সকলের সম্মুখে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলতো। সেই কান্না বদলি হলো নির্ঘুম রাতের বালিশের কানায় কানায়। তারপর একটা সময় সেটাও ফুরিয়ে গেলো। কথায় আছে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। সায়েরীর অবস্থাও এখন ঠিক তেমন। কষ্ট পেতে পেতে এখন যেনো অনুভূতিহীন এক পাথরে পরিণত হয়েছে সে৷
সত্যিই কি তাই! পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে সেই দুষ্টু-মিষ্টি, চঞ্চল সায়েরী? নাকি নির্দিষ্ট কেউ একজনের উপর হাজারো অভিমান, অভিযোগের নিচে চাপা পড়ে আছে সকলের মন ভুলিয়ে রাখা সেই হাসি-খুশি মেয়েটা!!
রাতের খাবারের পর মিনহা এবং আবরারের জোড়াজুড়ি তে বসার ঘরে আড্ডায় সামিল হয়েছে সায়েরী। যদিও আড্ডা বলে কিছুই চলছে না। মিনহা নিজ মনে টিভি দেখছে। পাশে বসে ফেসবুক স্ক্রল করছে আবরার৷ আর তার পাশে গম্ভীরমুখে বসা সায়েরী। দুই বাবা মিলে কিসব ব্যাবসা, রাজনীতি নিয়ে আলাপ করছে৷ আর দুই মা রান্নাঘরে থালাবাসন পরিষ্কারে ব্যাস্ত। অল্প কিছুক্ষণ আগেও টুকিটাকি আড্ডা চললেও এখন যে যার কাজে মগ্ন৷ বিরক্ত হলো সায়েরী। মনে মনে ভেবে নিলো নিজের ঘরে গিয়ে লম্বা ঘুম দিবে এখন৷ কিন্তু হঠাৎ আবরারের কথায় ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো তার। মোবাইলের দিকে দৃষ্টি রেখেই সে বললো,
‘ বাপরে…আজকাল তাশরীফ চৌধুরীও জনগণের সেবা করছে! তার বাপের কুকীর্তি কি কম পড়েছিলো নাকি! এখন ছেলেও এসে জুটেছে! ‘
পরিচিত নামটা কানে বাজতেই থমকালো সায়েরী। অবচেতন মনে প্রশ্ন করলো,
‘ কার নাম বললে?? ‘
সায়েরীর কন্ঠ শুনেই চোখ তুলে তাকালো আবরার৷ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বললো,
‘ আরে তোর সো কল্ড রিয়েল হিরো। জনগণের সেবক। অবশ্য তখন শুধু তোর চোখেই হিরো ছিলো। কিন্তু এখন তো দেখছি সত্যি সত্যিই জনগণের হিরো হওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। সামনে আবারও ইলেকশন কিনা। ‘
বিরক্তিতে মুখ দিয়ে “চ” ধরনের শব্দ বের করে সায়েরী। আবরারের মতো করেই ফিসফিস অথচ গম্ভীর কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ আমি কথাগুলো এমনি বলেছিলাম অন্য কাউকে নিচু দেখাতে। ব্যাপারটা তুমিও ভালো জানো। ‘
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ, জানি জানি। সাফওয়ান কে নিচু দেখাতে গিয়েই বলেছি এসব কথা আমাকে। আর আমার বন্ধু আমার উপরই ক্ষেপে গিয়েছিলো তোর এসব অসহ্যকর বাণী শুনে। কোথায় সাফওয়ান। আর কোথায় এই ছ্যাচড়া প্লে বয়! তুই কখনো বুঝতেই পারলি না সাফওয়ানকে। ‘
শেষ কথাটা বলে আবারো মোবাইলে মনযোগী হলো আবরার। সায়েরী একপলকের জন্য হকচকিয়ে উঠলো। তাকালো ভাইয়ের দিকে। আবরারের শেষ কথাটার গভীরতায় ডুবে গেলো সে। আপনমনে আওড়াল,
‘ আমি সত্যিই উনাকে বুঝতে পারিনি, ভাইয়া। এতো কাছে থেকেও তার মন পড়তে পারিনি৷ ওই চোখের মুগ্ধতা উপলব্ধি করেছি। তবে অন্যকিছু আমার চোখে ধরা দেয়নি। তার প্রতিটা হৃদস্পন্দন কানে শুনেও, তার মন বদলটা আমি ধরতে পারিনি। আমি সত্যিই তাকে বুঝতে পারিনি। কখনো পারিনি। ‘
কথাগুলোতে কি নিজের প্রতি রাগ ছিলো? না ছিলো সাফওয়ান ভাই নামক রহস্যময় মানবটার প্রতি একতরফা অভিমান? জানা নেই সায়েরীর। না সে জানার আগ্রহ রাখে। নিজের রুমে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সে। জোরপূর্বক মাথা থেকে ঝেরে ফেললো সাফওয়ানের ভাবনা। সাথে মনে পড়ে গেলো সেইদিনের স্মৃতি। যেদিন কলেজ প্রোগ্রাম শেষে মাঝপথে সাফওয়ান তাকে নামিয়ে দিয়েছিলো সেই কাঠগোলাপ গাছ তলায়…..
অতীত~~~
শরীরে পেছানো শাড়ি নামক বস্তুটা নিয়ে এমনিতেই সকাল থেকে চলতে ফিরতে হিমশিম খাচ্ছিলো সায়েরী। তারউপর মাঝপথে তাকে অপমান করে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে সাফওয়ান। রাগে দুঃখে নিজেরই চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে তার। খুব সাবধানে শাড়ির কুচি সামলে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাতে লাগলো সে। মনে মনে দোয়া করতে লাগলো যাতে শীঘ্রই কোনো রিক্সা পেয়ে যায়!
অন্যদিকে সায়েরী সেই স্থান থেকে নড়ার মিনিট খানিক পর পূণরায় সেই স্থানে ফিরে আসলো সাফওয়ানের স্করপিউ গাড়িটা। গাড়ির ভেতরে বসেই আশেপাশে চোখ বুলালো সাফওয়ান। কিন্তু সায়েরীর দেখা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে গরমের মধ্যে বেরিয়ে আসলো গাড়ি থেকে। আশপাশটা ভালো করে চেক করেও খোঁজ মিললো না সায়েরীর। বিরক্ত হওয়ার সাথে সাথে রাগ এবং দুশ্চিন্তা এসে ভর করলো সাফওয়ানের মস্তিষ্কে। মাত্র মিনিট তিনেকের ব্যাবধানে এভাবে উধাও হয়ে গেলো মেয়েটা!! শুধু মাত্র মেয়ে মানুষ বলেই সব রাগ ঝেড়ে ফেলে পূণরায় সায়েরীকে নিতে এসেছিলো সে। আর যায় হোক, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে এভাবে মাঝপথে একা ফেলে যাওয়ার মতো মানসিকতা সাফওয়ান খানের নয়। কিন্তু এই কথা ওই মেয়ে বুঝলে তো। একা একা ড্যাংড্যাং করে না জানি কোথায় চলে গেলো! কান্ডজ্ঞান বা বিবেকবুদ্ধি বলতে কিছু নেই এই মেয়ের মাথায়।সব জায়গায় অস্থিরতা তার!!
আপনমনে এসব ভেবেই ধপ করে গাড়িতে গিয়ে বসলো সাফওয়ান। বিড়বিড় করে বললো,
‘ ব্লাডি মাথা মোটা! সব জায়গায় মাথার আগে মুখ চালানোটা বাধ্যতামূলক তার! ‘
ক্লান্ত দেহে রিক্সার খুঁজে কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় হেঁটে চলেছে সায়েরী। গরমে মাথা ভার হয়ে আসছে তার। আশেপাশে রিক্সারও কমতি। শেষে আর না পেরে ফুটপাতেই ধপ করে বসে পড়লো সে।
‘ আরে বেয়াইন সাহেবা! আপনি এখানে কেনো? ‘
আচমকা ডাক পড়ায় চমকে উঠলো সায়েরী। বড় বড় চোখজোড়া মেলে তাকালো তার সামনে দন্ডায়মান মানবটার দিকে। চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কিন্তু ঠিক চিনতে পারলো না মানুষটা কে। সায়েরীর অবুঝ প্রতিক্রিয়া দেখেই যেনো মানবটা বুঝে ফেললো সায়েরীর মনের দ্বিধা। চমৎকার হেসে জানতে চাইলো,
‘ আমাকে চিনতে পারেননি? ‘
অবুঝ ভঙ্গিমায় মাথা নাড়ায় সায়েরী। যা দেখে আবারো হাসি ফুটলো মানবটার ঠোঁটে। খানিকটা রসিকতা গলায় বললো,
‘ আপনার স্মরণ শক্তি দেখছি খুবই দুর্বল। মাত্র সপ্তাহ খানিক আগে শপিংমলে দিব্যি ঝগড়া করলেন৷ দুদিন আগে কতো সুন্দর করে মেহমান আপ্যায়ন করলেন৷ আর আজকে চেহারা দেখেই চিনতেই পারছেন না? ‘
হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিমায় উচ্চস্বরে সায়েরী বলে উঠলো,
‘ আপনি সে না, যে আমাকে বাচ্চা চোর বলে শপিংমলে অপমান করেছিলেন? ‘
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো সাহিল। মাথা চুলকে আমতা আমতা করে বললো,
‘ সরি!! আসলে, ওটা একটা মিস-আন্ডাসটেন্ডিং ছিলো। ‘
সায়েরী জবাব দিলো না। অলস ভঙ্গিতে শাড়ির আঁচল সামলে উঠে দাঁড়িয়ে আশেপাশে দেখে বললো,
‘ গাড়ি এনেছেন?? ‘
‘ জ্বি?? অবাক কন্ঠ সাহিলের৷ ‘
‘ বলছি আপনি কি সাথে গাড়ি এনেছেন? ‘
‘ হ..হ্যাঁ। ‘
‘ বাইক?? ‘
‘ না না। ইফাজ ভাইয়ের গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছি। ‘
‘ গ্রেট। চলুন তাহলে। ‘
আরেকদফা অবাক হলো সাহিল। বললো,
‘ কোথায় যাবো? ‘
‘ আমার বাসায়। ‘
‘ কেনো? ‘
‘ উফফ!! আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমি এই রাস্তায় পিকনিকের আয়োজন করছি? বাড়ি যাবো। চলুন তাড়াতাড়ি। ‘
সায়েরীর চটপটে কথায় তাজ্জব বনে গেলো সাহিল। দ্রুত মাথা নেড়ে বললো, ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ। চালুন চলুন! ‘
যাওয়ার জন্য অগ্রসর হয়েও আবার থমকে দাঁড়ালো সায়েরী। চোখ পাকিয়ে তাকালো সাহিলের দিকে। যা দেখে ভড়কে গেলো সাহিল। ফাঁকা ঢোক গিলে জিজ্ঞেস করলো, ‘ কোনো সমস্যা?? ‘
‘ আমি কি আপনার বড় ফুফুর ক্লাস ফেল্যু হই?? ‘
সাহিল অবাক কন্ঠে বললো,
‘ তা হতে যাবেন কেনো? ‘
বড্ড বিরক্ত গলায় সায়েরী জবাব দিলো,
‘ না হলে আমাকে এভাবে আপ-জনাব করে ডাকছেন কেনো?আপনাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে আপনি আমার চেয়ে ৪-৫ বছরের বড়। এমন দামড়া ছেলের মুখে আপনি আপনি শুনে নিজেকে আমার ত্রিশ বছরের বুড়ি আন্টি মনে হচ্ছে। ‘
অনাকাঙ্ক্ষিত অপমানে মুখখানা থমথমে হয়ে গেলো সাহিলের। মাত্র তো বাইশ বছর বয়স তার। অথচ সায়েরী কি অনাসয়ে দামড়া ছেলে বলে দিলো তাকে। অবশ্য সায়েরীর জন্য সে দামড়া ছেলেই বটে। আড়চোখে একবার পাশে অবস্থানরত কিশোরীর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো সাহিল। ভাবলো কতই বা বয়স হবে এই মেয়ের? আজ যদিও শাড়িতে তাকে পরিপূর্ণ যুবতি মনে হচ্ছে। সাহিল একটুখানি ভাবলো সেদিনের শপিংমলে দেখা পিংক এবং হোয়াইট কম্বিনেশনের ক্রপ টপ পরে গাল ফুলিয়ে বসে থাকা মেয়েটার মুখশ্রী। বড়জোর সতেরো কি আঠারো হবে হয়তো। তাই এতো অনাসয়ে সাহিল তার জন্য দামড়া ছেলে হয়ে গেলো!! সায়েরীর আড়ালে ঠোঁট চেপে হাসলো সাহিল। এমন চটপটে, অকপটে সব কথা বলে ফেলা মেয়ে এই জীবনে খুব কমই দেখেছে সে।
সায়েরীকে গাড়িতে বসিয়ে “একটু আসছি” বলেই গাড়ি লক করে বেরিয়ে গেলো সাহিল। ক্লান্ত শরীরটা সিটের সাথে এলিয়ে দিলো সায়েরী। মিনিট খানিকের ব্যাবধানে ঠান্ডা পানির বোতল নিয়ে হাজির হলো সাহিল। সায়েরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
‘ আপ..না মানে তোমাকে দেখে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। খেয়ে নাও। ভালো লাগবে। ‘
ছোট্ট করে ধন্যবাদ জানিয়ে ঠান্ডা পানি দিয়ে গলা ভেজালো সায়েরী। সারাদিনের দৌড় ঝাপের পর এইবার একটু শান্তি লাগছে। গাড়ি এগুতে লাগলো স্বাভাবিক গতিতে। ক্লান্তির কারণে কিছু বলার ইচ্ছে হলো না সায়েরীর। আর কিভাবে কথা শুরু করবে তা ভেবে না পেয়ে চুপ রইলো সাহিল। হঠাৎ মোবাইল রিংটোনের আওয়াজে নিরবতার ব্যাঘাত ঘটলো। সাফ্রিনের কল। রিসিভ করার সাথে সাথে উপাশ সাফ্রিনের উত্তেজিত কন্ঠ ভেসে আসলো,
‘ সায়ু!! কোথায় তুই? ভাইয়া বললো তোকে রাস্তায় খোঁজে পায়নি! ঠিক আছিস তো?? ‘
সাফওয়ানের কথা মনে পড়তেই রাগী গলায় চেঁচিয়ে উঠলো সায়েরী,
‘ খোঁজে পায়নি মানে কি? আমাকে মাঝ রাস্তায় ফেলে আসার আগে তোর গুণধর ভাইয়ের মনে ছিলোনা আমি হারিয়ে যেতে পারি? ‘
‘ আ..ব!! না মানে ভাইয়া বললো তোকে নামিয়ে দেওয়ার পরপরই ভাইয়া আবার গেছিলো নিতে। কিন্তু তুই….. ‘
‘ আমি কি! তোর ভাইয়ের দয়ার পাত্রি না আমি যে কখন আবার নেওয়ার জন্য ফিরে আসবে সে আসায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যপ করবো। ‘
‘ আচ্ছা চুপ করনা। এটা বল যে, এখন কোথায় তুই? বাসায় পৌঁছে গিয়েছিস? ‘
‘ না। যাচ্ছি তোর…. একমিনিট (সাহিলের দিকে তাকিয়ে) এইযে হ্যালো! আপনার নাম যেনো কি? ‘
সায়েরীর এমন প্রশ্নে সাফ্রিন এবং সাহিল দুজনেই বিষ্ময়ের চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেলো। বিষ্ময় ভাব নিয়েই নিজের নাম বললো সাহিল। অন্যদিকে সাফ্রিন উদ্বিগ্ন কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ পাগল নাকি তুই সায়ু! না জেনেশুনে যারতার গাড়িতে করে…. ‘
‘ আরে চুপ কর মেরি মা। এই টা তোর কি যেনো.. হ্যাঁ সাহিল ভাইয়া। সাদিফ ভাইয়ার ছোট ভাইয়ের সাথেই যাচ্ছি। প্রোগ্রামে তোদের সাথেই তো দেখেছিলাম। তাই পরিচিত মানুষ বলে উনার সাথে আসছি। অন্যকেউ হলে কি যেতাম নাকি আজব!!
“ব্লাডি ইডিয়ট” হঠাৎ সাফ্রিনের পরিবর্তে ফোনের উপাশ হতে পুরুষালি কন্ঠের উক্ত বাণীটুকু শুনে চমকে উঠলো সায়েরী। কন্ঠটা চিনতে ভুল হলো না তার। নিজের অবাক ভাব কাটিয়ে উঠতে না পেরে সে উচ্চস্বরে বলে বসলো,
‘ হায় আল্লাহ্!! এই অ্যানাকন্ডা সব শুনে… ‘
কথা শেষ হওয়ার আগে নিজেই নিজের মুখ চেপে ধরলো সে। সেই সাথে খেয়াল করলো উপাশ থেকে সাফ্রিনও দ্রুত কল কেটে দিয়েছে। এই সেরেছে!! এটারই বোধহয় কমতি ছিলো আজকে। এবার এই সুদর্শন মানবের কুৎসিত ধমক থেকে রক্ষা পেলেই হলো।
এতোক্ষণের সব কথোপকথন কানে আসছিলো সাহিলের। কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে চুপ রইল সে। সায়েরীর কাছ থেকে রাস্তা জেনে নিয়ে অবশেষে পৌঁছে গেলো গন্তব্যে। আলসেমি ঝেরে গাড়ি থেকে নামলো সায়েরী৷ গাড়ির জানলায় ঝুঁকে সাহিলের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললো,
‘ ধন্যবাদের বদলে বাসায় এসে আম্মুর হাতের এক কাপ কফি খেয়ে যান! ‘
মুচকি হাসলো সাহিল। পালটা জবাবে বললো,
‘ তাহলে ধন্যবাদটা তোলে রাখুন মিস সায়েরী। যেদিন আপ..না মানে তোমার হাতের কফি খাওয়ার অফার পাবো সেদিন ধন্যবাদ এক্সেপ্ট করবো। ‘
আবারো দৃশ্যমান হলো সায়েরীর টোল পড়া হাসি। মাথা নেড়ে সে বললো,
‘ আসি তাহলে! সাবধানে যাবেন। ‘
‘ এইযে বেয়াইন সাহেবা বলে দিয়েছে। এবার সাবধানে না গিয়ে উপায় আছে বলো!! ‘
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১৩
শব্দ করে হাসলো সায়েরী। আবারো আসছি বলে পা বাড়ালো বাসার গেইটের দিকে। যতক্ষন দেখা পেলো ততক্ষণ তাকিয়ে রইলো সাহিল। ঠোঁটে তার তখনো হাসি ঝুলছে। কেমন এক অদ্ভুত ভালোলাগা যেনো ছুঁয়ে যাচ্ছে তার সর্বত্র। আশ্চর্য। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয় এবং এক প্রহর সাথে কাটিয়ে কারো প্রেমে পড়ে গেলো সে!! কি অদ্ভুত! পরমুহূর্তেই চোখে ভাসলো সায়েরীর হাস্যজ্জল মুখ,চঞ্চল ভাবভঙ্গি, অকপট সব স্বীকারোক্তি। এমন সরল মনের মেয়েও বুঝি এই যুগে আছে! কোনো পেঁচ গোছ মনে না এনে সাহিলের সাথে এতদূর চলে আসলো সে। একটা বার ভাবলো না ছেলেটা খারাপও হতে পারে! এমন অবুঝ কেউ হয় বুঝি?
