অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৭+৩৮
সাজিয়া জাহান সুবহা
বেলা এগারোটা। হাসপাতালের নরমাল কেবিন বেডে বালিশের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে সায়েরী। অল্প কিছুক্ষণ আগে হাতের ক্যানোলা খোলা হয়েছে। বিন্দু পরিমাণ রক্তজমা, হালকা ফুলে উঠা হাতের উল্টো পিঠের জায়গাটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে সে। কপালের চারপাশে গোল করে সাদা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে রেখেছে। গুরুতর কোনো আঘাত না লাগলেও মুখ থুবড়ে পড়ার কারণে কপালে একপাশে কেটে গিয়েছে। মাথার পেছনেও ব্যথা হয়ে আছে।
ঝিমঝিম করা দুর্বল দৃষ্টি মেলে সে সামনে তাকালো। তাকে ঘিরে বেডের তিন কোণায় বসে আছে তার তিন বান্ধবী৷ একটু পরেই রিলিজ দেওয়া হবে সায়েরীকে। অন্যপাশে মেহরিন বেগম ব্যাগে প্রয়োজনীয় সব জিনিস ঢুকিয়ে নিচ্ছেন, যাতে কিছু থেকে না যায়। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন কেবিন থেকে। বাইরে আবরার এবং সায়েরীর বাবা হসপিটালের সব ফর্মালিটি পূরণ করে নিচ্ছে। মেহরিন বেগম বেরিয়ে যেতেই সায়েরীকে ঘিরে বসে থাকা তিন রমনী আটকে রাখা নিঃশ্বাস ফেললো বড় করে৷ পেটের মধ্যে কতো কথা নাচানাচি করছে৷ কিন্তু মেহরিন বেগমের উপস্থিতির জন্য বলা হয়নি৷ এবার স্বস্তি নিয়ে আয়েসি ভঙ্গিতে বসলো তারা৷ শুরুতেই তোহা হড়বড়িয়ে বলে উঠলো,
‘ তোর শরীরের হালচাল জানা হয়ে গিয়েছে। এবার বল, তুই ওই ছাদে গিয়েছিলি কেনো? তোর তো থার্ড ফ্লোরে যাওয়ার কথা ছিলো৷ ওখানে কি করতে গিয়েছিলি? ‘
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সায়েরী জবাব দেওয়ার সুযোগ পেলো না। তার আগে নাজরাত বলে উঠলো,
‘ শেষবার ওই ছাদে যখন সবাই মিলে গিয়েছিলাম, তখন তো ভুতুড়ে জায়গা বলে এক মিনিটও থাকিসনি। আর কালকে একা একা চলে গেলি? কেনো? ‘
সায়েরী নিশ্চুপ হয়ে কিছু সময়ের জন্য ভাবনায় বিভোর হয়ে পড়লো। মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করলো গতকালের ঘটনা। যতোটুকু মনে আছে তা হলো, তার মাথায় শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করেছিলো কেউ। পরপর মুখ চেপে ধরেছিলো যাতে চিৎকার করতে না পারে। হাতে রুমাল ধরা ছিলো সম্ভবত। যেখানে ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু মিশিয়ে রেখেছিল। যার প্রভাবে সেকেন্ডের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো সে৷
‘ যদিও এসব ভুত, প্রেতাত্মা-তে আমার বিশ্বাস নেই। কিন্তু তোর এই ঘটনায় মনে হচ্ছে ভুত এসে নিয়ে গিয়েছে তোকে ছাদে৷ নয়তো তুই ওই ছাদে নিজ ইচ্ছায় যাওয়ার মেয়েই না। ‘
তোহার অযৌক্তিক কথায় ঘোর কাটলো সায়েরীর। নাজরাত এবং সাফ্রিন বিরক্ত মুখে তাকালো তোহার দিকে। তোহার মাথায় চাপড় মেরে সাফ্রিন বললো,
‘ এসব ইল-লজিকাল কথা মাথায় আসে কীভাবে? হয়তো কেউ ডেকেছিলো ওকে। তাই গিয়েছিলো। ভুত আসতে যাবে কেনো? আজাইরা লজিক। ‘
সাফ্রিনের ধমক শুনেই চুপসে গেলো তোহা। মেয়েটা একটু বেশি-ই ম্যাচিউর। সব কিছুতে পারফেকশন চাই তার। উল্টো পালটা কথা তার সামনে বলা দায়। সায়েরীকে নিশ্চুপ দেখে নাজরাত পুণরায় একই প্রশ্ন আওড়াল। কিন্তু এবারেও জবাব পেলো না কোনো। সায়েরী বলবে কি? সে নিজেও ভেবে পাচ্ছে না কি জবাব দিবে। অপরিচিত এক মেয়ের কাছ থেকে সাফওয়ানের নামের চিরকুট পেয়ে সে কেনো-ই বা ছুটে গিয়েছিলো ভুতুড়ে যায়গা-টাতে? কেনো আগ পিছ ভাবলো না কিছু? তাছাড়া, নিরিবিলি ছাদ টাতে ডেকে নিয়ে কোনো কারণ ব্যতিত আঘাত করবে, এমন মানুষ সাফওয়ান ভাই নয়। এটুকু বিশ্বাস আছে সায়েরীর। মানুষটা রগচটা, গুরুগম্ভীর হতে পারে। কিন্তু কোনো রাগঢাক নেই তার মাঝে। যা বলার সোজাসাপ্টা বলবে। আর যাই হোক, এমন পিঠপিছে ছুরাঘাত করার মতো ব্যাক্তিত্ব সাফওয়ান খান’র নয়। এটুকু বেশ ভালো করে জানে সে৷
‘ আশ্চর্য! মাথায় আঘাত পেয়ে কথা বলা ভুলে গেলি নাকি? আমার ভিতরটা অস্থিরতায় ফেটে যাবে যাবে বলে সিগনাল দিচ্ছে। আর তুই মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছিস। কীভাবে বেহুশ হলি বল না। ‘
উত্তেজিত কন্ঠে বলা তোহার কথাটা শেষ হতে না হতেই কেবিনের দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো তিন, চারজন মানব-মানবী। সায়েরী সহ বাকি তিন রমনী ফিরে তাকালো। নীতি,মিহাদ,জিমন এবং রায়ান এসেছে। বিষ্ময়ের সাথে তারা লক্ষ্য করলো মিহাদের হাতে মোটামুটি বড় আকৃতির একটা গোলাকার বেলুন। যার মাঝ বরাবর টানা হাতে লিখা আছে “Get Well Soon”. নীতির হাতে একটা মাঝারি আকৃতির পেকেট। যার ভেতরে খুব সম্ভবত চকলেট, চিপস জাতীয় কিছু রয়েছে। রোগী দেখতে এসে চার বন্ধু এসব নিয়ে এসেছে দেখে গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইলো বাকি চারজন। সকলের দিকে তাকিয়ে মিহাদ গালভরে হাসলো। সায়েরীর কাছাকাছি এগিয়ে যেতেই তোহা উঠে গিয়ে জায়গা করে দিলো তাকে৷ টুল টেনে বেডের পাশে বসে পড়লো মিহাদ। হাতের বেলুনটা সায়েরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
‘ কি খবর সুন্দরী? শরীর কেমন? ‘
বেলুন হাতে নিয়ে সায়েরী মৃদু হেসে জবাব দিলো,
‘ ভালো, ভাইয়া।’
জিমন এবং রায়ানও কথা বললো টুকটাক। মিহাদের পাশে বেডে এসে বসলো নীতি। মুচকি হেসে সায়েরীর গাল টেনে দিয়ে বললো,
‘ সবাইকে কতো ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে জানো? কাল যদি ঠিক সময় তোমাকে খুঁজে না পেতো, তাহলে কেমন খারাপ অবস্থা হতো সেটা ভেবেই আমার বুক কাঁপছে। ‘
সায়েরী কি জবাব দিবে ভেবে পেলো না৷ তার দ্বিধান্বিত মুখশ্রী দেখে মিহাদ নীতির হাতে থাকা প্যাকেট-টা বাড়িয়ে দিলো সায়েরী’র দিকে। হাসি হাসি মুখে বললো,
‘ এখানে তোমার জন্য চকলেট আর চিপস এনেছি। এগুলো রাখো। ভুলেও আবরার কে দেখাতে যেওনা যেনো। এগুলো দেখলে আমাদের আর রক্ষা থাকবে না। ‘
একথা শুনে নাজরাত বলে উঠলো,
‘ তাহলে এসব নিয়ে এসেছে কেনো ভাইয়া? রোগী দেখতে এসে মানুষ ফ্রুটস বা হেলদি কিছু নিয়ে আসে। আপনি যা এনেছেন, এসব খেলে তো সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। ‘
মিহাদ চোখ পাকিয়ে তাকালো। ছোট ছোট চোখে নাজরাতকে পরখ করে বললো,
‘ তুমি সাদিফ ভাইয়ের বউ না? নতুন বউদের এতো কথা বলতে নেই। এটা গ্রামের অকর্মা মহিলাদের রুলস। চুপচাপ শুধু তালে তাল মিলাবে। তাহলে দেখবে শাশুড়ী তোমাকে মাথায় না, বরং আসমানে তুলে রেখেছে। ফ্রি অ্যাডভাইস দিয়ে দিলাম৷ কাজে না লাগালেই বরং ভালো। ‘
ফিক করে হেসে উঠলো তোহা৷ নাজরাত কটমট চোখে তাকাতেই মুখ চেপে হাসি আটকালো সে। মিহাদ পুণরায় বললো,
‘ আর হ্যাঁ, আমি এই ছোট্ট, পিচ্ছি বোনটার জন্য ওর পছন্দের জিনিসগুলো এনেছি। এসব দেখেই সে তরতরিয়ে সুস্থ হয়ে যাবে দেখো৷ ‘
সায়েরী হেসে জবাব দিলো, ‘ একদম ঠিক।’
এই পর্যায়ে এসে মুখ খুললো সাফ্রিন। খানিকটা পিঞ্চ মেরে বললো,
‘ আজকাল সায়েরীকে বেশি বেশি আদর যত্ন করছেন দেখি আপনারা। কই, আগে তো এমন উতলা হতে দেখিনি। ‘
সাফ্রিনের কথা শুনে বিষম খেয়ে খুকখুক করে কেশে উঠলো রায়ান। চার বন্ধু চোখাচোখি হলো একে অপরের। নীতির দিকে ঝুঁকে মিহাদ ফিসফিস করে বিরক্ত গলায় বললো,
‘ এই মেয়ে নিঃসন্দেহে সাফওয়ান হারামজাদা-টার মায়ের পেটের আপন বোন। এতে কোনো সন্দেহ নেই। দুজন একই রকমের হাড়ে হাড়ে চতুর। হা করতেই হাতি বুঝে ফেলে। এতো চতুর হতে কে বলেছে এদের? লুকোচুরি করে শান্তি নেই কোনো। ডিসগাস্টিং! ‘
‘ চুপ কর। শুনে ফেলবে কেউ৷ ‘
‘ তুই শুন আগে, সায়েরীকে যদি আমরা আদর, যত্ন না করি তাহলে বোঝে নে যে খান সাহেবের কপালে বহুত দুঃখ আছে। ওই ব্যাটার যা ব্যবহার, এই ছোট্ট মেয়েটা ভয়ে, আতংকে গলা ফাটিয়ে কান্নাকাটি করবে। তবুও প্রেমে পড়বে না দেখিস। এক্ষেত্রে আমাদের সাথে ভালো সখ্যতা থাকলে আমরা নাহয় কনভিন্স করে নেব। ‘
নীতি চুপচাপ শুনলো। মিহাদ চোখের ইশারায় জানতে চাইলো, ‘আইডিয়া টা কেমন? ‘ তার দেখাদেখি নীতিও চোখের ইশারায় বোঝালো, ‘পারফেক্ট।’ সেটা দেখে নড়েচড়ে বসলো মিহাদ৷ সাফ্রিনের কথার জবাব দিলো না। এদের বিশ্বাস নেই কোনো। দেখা গেলো কথার জালে ফাঁসিয়ে আসল উদ্দেশ্য বের করে ফেলেছে৷ গলা খাঁকারি দিয়ে সে সকলের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ সায়েরীর সাথে আমার একটু পারসোনাল কথা আছে। তোমরা বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। ‘
দ্বিধান্বিত চোখে তিন বান্ধবী একে অপরের দিকে তাকিয়ে। সায়েরী নিজেও বুঝে উঠতে পারলো না তার সাথে কিসের আলাপ করবে। অবস্থা বুখে নীতি বললো,
‘ দুই মিনিট সময় নিবো শুধু। তোমরা একটু বাহিরে যাও। ‘
জিমন এবং রায়ান সহ বেরিয়ে গেলো তিন বান্ধবী। দরজা বন্ধ হতেই পকেট হাতড়ে একটা কাগজ বের করলো মিহাদ। কাগজ মেলে তা এগিয়ে দিলো সায়েরী’র দিকে। যা দেখে চমকে উঠলো সায়েরী। এই কাগজ মিহাদ ভাই পেলো কি করে? তার প্রতিক্রিয়া দেখে মিহাদ জানতে চাইলো,
‘ এটা পেয়েই কি ওই ছাদে গিয়েছিলে তুমি? ‘
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সায়েরী। তা দেখে চোখাচোখি হলো দুই বন্ধু৷ নীতি বলল,
‘ এটা কে দিয়েছিলো তোমাকে? ‘
‘ একটা মেয়ে। হয়তো আমাদের ক্যাম্পাসের। কিন্তু আমি চিনি না তাকে। ‘
‘ তুমি জানতে চাওনি এই কাগজ মেয়েটাকে কে দিয়েছে? ‘
‘ সুযোগ পায়নি। আমার হাতে কাগজ গুঁজে দিয়েই সে চলে গিয়েছিলো। ‘
‘ তোমার মনে হয় এটা সাফওয়ান দিয়েছে? তোমার সাথে এসব হওয়ার পেছনে সাফওয়ানের হাত আছে বলে মনে হচ্ছে তোমার? ‘
দ্রুত মাথা নেড়ে না বোঝালো সায়েরী। বললো,
‘ লিখাটা পড়ে আমার একটু অদ্ভুত লেগেছিলো বটে। তবুও কৌতুহল বশত গিয়েছিলাম ছাদটা-তে। তখন না বুঝলেও এখন বুঝেছি, এই কাজ সাফওয়ান ভাইয়ের হতেই পারে না। কোনো কারণ ছাড়া আমাকে কেনো এতো বিপাকে ফেলবেন উনি? যদি কারণ থেকেও থাকে, তবুও এমন কিছু করবেন না কখনো। আমি জানি, উনি এতোটাও খারাপ না। ‘
সায়েরী দৃঢ় কন্ঠের বুলি শুনে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল নীতি এবং মিহাদের। চেহারায় সন্তুষ্টি ভাব ধরা দিলো দুজনের। যাক, সাফওয়ানের উপর সে সায়েরীর এটুকু ভরসা আছে সেটাই অনেক। গলা ঝেরে মিহাদ পুণরায় বলে উঠলো,
‘ তোমার সাথে ঠিক কি ঘটেছিলো বলতো। কাউকে দেখেছো ওই জায়গায়? মাথায় চোট পেয়েছো কি করে? ‘
‘ কাউকে দেখিনি। তবে.. আমার মনে হচ্ছে কোনো মেয়ে ছিলো৷ একজন নয়৷ বরং দুজন। ‘
‘ মেয়ে!! ‘
‘ হুম। লেডিস পারফিউমের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম আমি। আর, ছাদে পৌঁছানোর পরপরই আমার মাথায় আঘাত করেছিলো কেউ। এরপর রুমাল চেপে ধরেছিলো মুখে। জ্ঞান হারাবার আগে দুজনের মানুষের অবয়ব দেখেছিলাম অল্পখানি। দুজন মেয়ে ছিলো এটুকু সিউর। কিন্তু.. আমাকে কেনো হঠাৎ আঘাত করলো তারা! এটা বুঝতে পারছি না। ‘
গভীর চিন্তায় মত্ত হলো নীতি এবং মিহাদ। সায়েরীর শেষে কথার শেষ ধরে নীতি হঠাৎ করে বলে উঠলো,
‘ হয়তো অন্য কারো ক্ষোভ তোমার উপর তুলেছে। ‘
‘ মানে? ‘
কি বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে নীতি তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,
‘ কিছুনা। কিছুনা। তুমি রেস্ট নাও। আর রিলেক্স থাকো, এমন কিছু আর কক্ষনো হবে না। ‘
ভ্রুঁ কুঁচকালো সায়েরী। সন্দিহান কন্ঠে বললো,
‘ তুমি এতোটা সিউর হয়ে কি করে বলছো? ‘
নীতি হাসলো। সায়েরীর ফুলোফুলো গাল টেনে দিয়ে বললো,
‘ সেটা বুঝতে হলে তোমাকে অনেক মানুষের অনেক কিছু বুঝতে শিখতে হবে বেবি গার্ল। আপাতত রেস্ট নাও।’
মিহাদ সায় জানিয়ে বললো,
‘ আর হ্যাঁ, কাল যা যা হলো এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলো না কেমন? এটা আমাদের তিনজনের টপ সিক্রেট ভেবে নাও। ‘
কথাটা বলেই সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বাড়িয়ে দিলো সায়েরী’র দিকে। মুচকি হেসে নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতের সাথে মিহাদের হাত মিলালো সায়েরী।
ভোর সকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ। শুভ্র মেঘে ঢাকা নীলাচলের পাহাড়ের চূড়া। মৃদু মৃদু বাতাস বইছে চারিদিকে। চূড়ায় দাঁড়ানো শুভ্র শাড়ি পরিহিতা এক রমনী। কোমড় বেয়ে নেমেছে তার ঘন কালো চুল। নিচের দিকের ঢেউ খেলানো চুলগুলো বাতাসের তালে তালে উড়ছে। মেয়েটা এক হাত দিয়ে পিঠ থেকে সব চুল সরিয়ে ডান কাঁধে রাখলো। ফলস্বরূপ কিঞ্চিৎ উন্মুক্ত হলো উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ ঘাড়, পিঠ। রক্ত রাঙা কাঁচের চুড়ি পরিহিতা ডান হাত বাড়িয়ে সে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে শুভ্র মেঘের ভেলা। তার অবস্থান হতে ঠিক পাঁচ হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে বলিষ্ঠ দেহের, লম্বাটে গড়নের এক যুবক। পরণে ট্যান ব্রাউন কালারের গেবাডিং প্যান্ট এবং হোয়াইট শার্ট। কনুই অবধি গুটানো হাতা। যার নিচ দিয়ে ধবধবে ফর্সা লোমশ হাত দৃশ্যমান হয়ে আছে। শার্টের টপ তিনটে বোতাম খোলা রেখেছে। যা পাল্লা দিয়ে উড়ছে বাতাসের তালে তালে।
লোমহীন ফর্সা বুকের মাঝ বরাবর আড়াআড়ি ভাবে কাটা ক্ষত চিহ্নটুকু উঁকি দিচ্ছে। দুইহাত পকেটে ঢুকিয়ে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার গভীর বাদামি মণির চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে সম্মুখে উপস্থিত রমনীটির সর্বত্রে৷ একপর্যায়ে ধীর কদম ফেলে সামনের দিকে অগ্রসর হলো সে। হালকা বাদামি এলোমেলো চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটার ঠিক পেছনে। দুরত্ব গুছিয়ে একদম পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ালো। তার উন্মুক্ত বুকের ছোঁয়া পিঠে লাগতেই চট করে ঘাড় ফিরিয়ে মাথা উঁচু করে তাকালো মেয়েটি। যুবকের বুক অবধি ঠাঁই হয়েছে তার উচ্চতার। ছোট্ট, নরম একহাত বাড়িয়ে সে ছুঁয়ে দিলো ক্লিন সেভ করা ফর্সা গাল। উত্তাপে হাত জ্বলে উঠলো যেনো। বড় বড় আঁখি পল্লব মুহুর্তেই দুশ্চিন্তায় ভরে উঠলো তার। মায়াময়ী ছোট্ট মুখশ্রী’তে আঁধার নামল। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ আপনার.. আপনার গায়ে জ্বর! ‘
বিনিময়ে মৃদু হাসি ফুটল যুবকের অধর কোণে। গালে লেপ্টে থাকা নরম হাতখানা নিজের শক্তপোক্ত হাতের মাঝে চেপে ধরে চুমু খেলো নিঃশব্দে। অনুভব করলো রমণীর শরীরের মৃদু কম্পন। তবুও ছাড়লো না সে। বরং পুণরায় মেয়েটাকে সামনে ফিরিয়ে পেছন থেকে নিজের বলিষ্ঠ হাতের মাঝে বন্ধি করলো সরু কোমর। মাথা ঝুঁকিয়ে গালে গাল ঘেঁষল। লম্বা শ্বাস টেনে এলোকেশের মিষ্টি ঘ্রাণটুকু নিজের মাঝে ঢুকিয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করলো৷ নেশায় বুঁদ হওয়ার মতো মাতাল মাতাল এই সুভাস। যুবকের নিরবতা সহ্য হলো না বোধহয় রমণীটির। ছটফটিয়ে উঠে ছাড়াতে চাইলো নিজেকে। অধৈর্য কন্ঠে বললো,
‘ জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে আপনার। ফিরে যায়, চলুন। এখানে থাকলে আরো বেশি শরীর খারাপ হবে। ‘
বারকয়েক বলেও বলিষ্ঠ হাতের বাহুবন্ধন হতে নিজেকে ছাড়াতে পারলো না রমনী। বরং অনুভব করলো, বন্ধন আরেকটু দৃঢ় হয়েছে। শাড়ির ফাঁক গলিয়ে পুরুষালী উষ্ণ এক হাত পেটে মৃদু চাপ দিয়ে ধরেছে তাকে। বেসামাল সেই ছোঁয়ায় নিঃশ্বাস আটকে আসলো বোধহয় রমনীর। তবুও ছাড়লো না মানুষটা। শুধু মুখ তুললো এলোকেশ হতে। গভীর চোখে অবলোকন করতে লাগলো রমণীর ঘাড়ের লাল, কালো তিল দুটো। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েই রইলো শুধু৷ পরপরই শব্দ করে চুমু খেলো তিল দুটোর উপর। দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠলো রমনীর সর্বাঙ্গ। উষ্ণ, ভেজা ঠোঁট দুটো ঘাড়ে ছুঁইয়ে রেখেই যুবকটি শীতল কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ জ্বর সেরে যাবে। সব সইয়ে যাবো৷ শুধু তুমি কাছে থাকো। ‘
পুণরায় ঠোঁট ছুঁইয়ে গেলো নরম গ্রীবাদেশ। টুকরো টুকরো উষ্ণ ছোঁয়াগুলো থেমে থেমে বেসামাল হয়ে উঠতে লাগলো। ঘন ঘন নিঃশ্বাসের তালে শরীরের সবটুকু শক্তি ফুরিয়ে গেলো রমণীর। দেহের সবটুকু ভার ছেড়ে দিলো বলিষ্ঠ বুকটায়। পেটের উপর থাকা শক্তপোক্ত হাতের উপর কম্পিত হাতে খামচি দিয়ে ধরলো সে। আটকে যাওয়া কন্ঠে থেমে থেমে ডেকে উঠলো,
‘ সাফওয়ান ভাই!!!’
বারকয়েক কানের কাছে নিজের নামডাক শুনতে পেয়ে চট করে চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। টকটকে লাল চোখ দুটো একটুখানি সময় নিলো আলো সইতে। এরপরই দৃষ্টি পড়লো তার শিয়রে বসা তাহুরা খান’র কান্নারত, উদ্বিগ্ন মুখশ্রী’তে। ভেজা কন্ঠে সাফওয়ান’কে ডাকছেন তিনি। চোখ ঘুরিয়ে আশপাশ অবলোকন করে নিজেকে বেডরুমে আবিষ্কার করতেই ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। স্বপ্ন ছিলো তবে! সবটা স্বপ্ন!
‘ সাফওয়ান! আব্বা? উঠো। বেলা বারোটা বাজতে চলেছে৷ কাল সন্ধ্যা থেকে না খেয়ে আছো। উঠো আব্বা। ঔষধ খেতে হবে যে। ‘
মায়ের কন্ঠ কর্ণগোচর হলেও প্রতিউত্তর আসলো না সাফওয়ানের পক্ষ হতে। স্বপ্নের কথাটা মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে তার৷ বাস্তবে ফিরে মনে মনে নিজেই নিজেকে জঘন্য গালি দিলো দুই একটা। এতোটা অধঃপতন হয়েছে তার? এতো গভীর স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন ছিলো কি? জীবনের প্রথম প্রেমানুভূতি। প্রথম ভালোলাগা, হয়তো ভালোবাসাও। যেই মেয়েটাকে দেখলে আগে কপালে বিরক্তির ভাব ফুটলো, আজকাল তার উপস্থিতিতে হৃদস্পন্দন হেসে উঠে যেনো। সর্বদা ওই বোকা বোকা চাহনিতে নিবদ্ধ থাকতে ইচ্ছে করে। তার গাল ফুলিয়ে থাকা, ঠোঁট উলটে কান্না করা, খিলখিল শব্দ তুলে হাসা সবকিছু আজকাল তাকে প্রভাবিত করে খুব৷ এই অনুভূতি এতো জলদি মেনে নিতো না সে। যদিনা সেদিন রবিন অশালীন উদ্দ্যশ্যে নিয়ে ছুঁয়ে দিতো তার প্রণয় কুমারী’কে৷ সেদিন সাফওয়ানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন জ্বলছিলো এই বলে যে, ” তার ব্যাক্তিগত রমনীর দিকে অন্য কেউ হাত বাড়িয়েছে।”
রবিনের মুখ থেকে বের হওয়া জঘন্য কথাগুলো তার শিরা উপশিরা অবধি জ্বালিয়ে তুলেছিলো৷ অবচেতনে রবিনকে আঘাত করতে করতে মুখ দিয়ে কখন যে মনের কথা বেরিয়ে এসেছে তা ঠেরই পেলো না সে। ঠের পেয়েছিল ভোর সকালে। নিজের কথায় নিজে বোকা বনে গিয়েছিলো তখন। সেদিনই আবার জিমনকে যখন দেখলো গোলাপ দিয়ে হেসে হেসে মেয়েটাকে কিছু বলছে, মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিলো তার। নিজের ভিতরের অন্য এক সত্তা জানা দিচ্ছিলো, ‘এই রমণী তার৷ একমাত্র সে ব্যাতিত অন্য কোনো পুরুষের অধিকার নেই এই রমণীর উপর। ‘ এজন্যই তো ভয়াবহ রেগে গিয়েছিলো। পরে ভুল টুকু বুঝতে পেরে ছুটে গিয়েছিলো অবশ্য। কিন্তু তেজস্বী সেই মুখশ্রী দেখে কিছু বলতে পারলো না ঠিকঠাক। সারাজীবন সকলকে নিজের রাগ,জেদের সামনে নত করিয়ে রাখা মানুষটা সেদিন নাবালিকা মেয়েটার ক্ষুব্ধ দৃষ্টির কাছে চুপসে গিয়েছিলো। একথা শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে? সাফওয়ান তেহজিব খান কারো জেদের কাছে নিজের জেদ দমিয়েছে, এটা কি বিশ্বাস যোগ্য কথা?
সবটা নাহয় মেনে নিয়েছে। কিন্তু দিনদিন নিজের এই বেপরোয়া হয়ে উঠা-টা মেনে নিতে পারছে না সে৷ এমন স্বপ্ন কেনো হানা দিলো মস্তিষ্কে? কোনো রূপ সম্পর্ক ছাড়া একটা মেয়েকে নিয়ে এতো গভীর চিন্তা ভাবনা আসতে গেলো কেনো স্বপ্নে? শত ভালোলাগা, ভালোবাসা থাকুক না কেনো। এই ব্যাপারটুকু ঠিক পছন্দ হলো না তার। তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না এসব৷ আজ স্বপ্ন দেখছে। কাল যদি সামনাসামনি কিছু করে বসে, সেটা খারাপ দেখাবে খুব। মেয়েটা জানে না তার অনুভূতি সম্পর্কে। সে জানাতেও চাইনা। এর মাঝে এধরণের চিন্তাভাবনা.. আর ভাবতে পারলো না সাফওয়ান। নিজেকে কঠিন বাক্যে শাসাল সে। সেই সাথে মন পিঞ্জিরায় জায়গা করে নেওয়া মেয়েটার এলোকেশ, সম্মোহনী দুই চোখ এবং আকর্ষণীয় তিল দুটো’কেও শাসাল খুব৷ ভাবখানা এমন যেনো সব দোষ এদের। সে সম্পূর্ণ নির্দোষ!
সাফওয়ানের ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটলো পুণরায় তাহুরা খান’র কন্ঠে। চিন্তায় চিন্তায় অস্থির অবস্থা হয়েছে উনার। সাফওয়ানের শুকনো মুখখানার দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বিলাপ শুরু করলেন তিনি,
‘ রাতভর ভেজা জামা কাপড় নিয়ে হাসপাতালে থাকতে কে বলেছিলো? মিহাদ আর আবরার তো ছিলোই। বৃষ্টির পানি যে সইতে পারো না এটা কি ভুলে গিয়েছো? সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টিতে ভিজে, রাতভর সেই ভেজা কাপড় পড়ে ছিলে। মিহাদ আর আবরার যদি সকাল বেলা জোর করে না পাঠাতো, তাহলে কি অবস্থা হতো তা ভাবতেই পারছি না। এখনো একশো দুই ডিগ্রি জ্বর। আমাকে অশান্তি’তে না রাখলে তো শান্তি পাও না তোমরা ভাই, বোন। ‘
সাফওয়ান কিছু বলতে চেয়েও শক্তির অভাবে মুখ খুলতে পারলো না। রাত থেকেই ভয়ানক জ্বর উঠেছে। সে ঠের পেয়েও কিছু করেনি। শরীরের সব শক্তি এবার বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। মাথা ব্যথা করছে প্রচন্ড। শক্তি সঞ্চয় করে সে মাথা তুলে দিলো মায়ের কোলে। মায়ের হাত নিয়ে রাখলো চুলের ভাঁজে। ইঙ্গিত বুঝে চুল টেনে দিতে লাগলেন তাহুরা খান। সেই সাথে ফ্যাচফ্যাচ কান্না তো আছেই। এরপর আবার কাউকে হুকুম করলেন বালতি করে পানি নিয়ে আসার জন্য। মাথায় পানি ঢালবে বলে। সাফওয়ান সবটা শুনতে পেলো। চোখ বুজে পড়ে রইলো মায়ের কোলে। শরীরের তাপমাত্রা আরো বেড়ে চলছে বোধহয়। চেতনা হারাচ্ছে কি? উঁহু। এইতো, সর্বনাশী সেই রমনীর চেহারা আবারো ভেসে উঠছে চোখের দৃশ্য পটে। বুকের বাম পাশে উপলব্ধি করতে পারছে চিনচিনে ব্যথাটা। দুর্বল হাত দিয়ে সেই স্থান চেপে ধরলো সে। অবচেতন মনে বিড়বিড় করে আওড়াল,
‘ শরীর ভর্তি একশো দুই ডিগ্রি জ্বর, আর মাথা ভর্তি তোমার চিন্তা। এ কোন মায়াজালে বাঁধছ তুমি শ্যামবতী? ‘
দুদিন পর…..
ইপ্সিতা দাঁড়িয়ে আছে একটা পার্কের সামনে। তার বাসা হতে অনেকটা কাছে পার্ক। মানুষ জন খুব একটা দেখা যায়না এখানে। প্রায়শ দুই বান্ধবী নিয়ে ইপ্সিতা আড্ডা জমায় এই স্থানে। আজ হুট করে হিনা জরুরি তলবে তাকে ডেকেছে উক্ত স্থানে। গত দুই দিন ইপ্সিতা ক্যাম্পাসে আসেনি। কেউ যাতে যোগাযোগ করতে না পারে তাই মোবাইল ও বন্ধ করে রেখেছিলো। তার এমন আচরণের কারণ একমাত্র সে ব্যাতিত অন্য কেউ জানে না। আজ সকালে তার বাসায় ল্যান্ড লাইনে ফোন করে হিনা এই পার্কে আসতে বলেছে তাকে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা জানানোর আছে নাকি। এছাড়া অন্য কিছু না বলেই কল কেটে দিয়েছিলো হিনা। ইপ্সিতার খটকা লাগছিলো ভীষণ। হুট করে কি হলো এই মেয়ের? সময় অনুযায়ী সে পৌঁছে গেলো পার্কে।
মোবাইল বের করে হিনার নাম্বার ডায়াল করতে করতে সামনের দিকে অগ্রসর হলো সে। সর্বদা যে স্থানে তারা আড্ডা জমায় সেখানে পৌঁছে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই থমকে গেলো সে। মোবাইল রিং হচ্ছে হিনার। ইপ্সিতার চেয়ে পনেরো হাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে আছে সে। সে একা নয়। পাশে জুঁই আছে। হাতের মোবাইলের দিকে একপলক তাকিয়ে হিনা চোখ তুলে তাকালো ইপ্সিতার দিকে। তার দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব, ভীতি। জুঁই’য়ের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। দুজনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে ইপ্সিতা তাকালো কাটের বেঞ্চিতে আয়েসি ভঙ্গিতে বসে থাকা নীতি, জিমন এবং মিহাদের দিকে। প্যান্ট, শার্ট পড়ে একেবারে টিপটপ হয়ে আছে তিনজন। নীতির কাঁধ ছুঁই ছুঁই চুলগুলো উঁচু করে ঝুটি করা। ইপ্সিতার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই সে শার্টের হাত গুটিয়ে হাত নেড়ে ‘হ্যালো’ বুঝাল। সন্তর্পণে ঢোক গিললো ইপ্সিতা। মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে.. শেষ, সব শেষ।
নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে সে গটগট পায়ে এগিয়ে গেলো তাদের সম্মুখে। হিনা এবং জুঁই ব্যাতিত অন্য ব্যাক্তি যেনো চোখেই পড়লো না, এমন একটা ভাব নিয়ে হিনাকে বললো,
‘ এখানে ডেকেছিস কেনো? কি বলার আছে তাড়াতাড়ি বল। ‘
জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুই মেয়ে জবাব দিলো না কোনো। দৃষ্টি তুলে চাইলো নীতির দিকে৷ যেনো অনুমতি চাইছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে রাগ হলো ইপ্সিতার। তার সামনে দাঁড়িয়ে, তারই বান্ধবী অন্য এক মেয়েকে প্রাধান্য দিচ্ছে। বিষয়টা তার অহংকারে আঘাত করলো যেনো। রাগে কিড়মিড়িয়ে উঠে সে বলল,
‘ আমি কিছু জানতে চাইছি, হিনা। যদি বলার মতো কিছু না থাকে তবে আমি যাচ্ছি। ‘
বলতে বলতে পিছন ফিরে চলে যেতে উদ্যত হলো সে। কদম বাড়াতে গিয়েও সম্মুখে গম্ভীরমুখে, বুক টানটান করে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে জমে গেলো সে। কালো প্যান্টের সাথে হোয়াইট টি-শার্টের উপর গ্রে কালারের শার্ট পরিহিত সাফওয়ান’কে দেখে বেহায়া নজর স্থির হলো তার। আজও কি সুন্দর লাগছে এই ছেলেকে! এক নজর তাকালে অন্তরের গহীনে গিয়ে ধাক্কা লাগবে একেবারে৷ সাফওয়ানের গভীর চোখের ধারালো দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই কেঁপে উঠলো ইপ্সিতা। নজর লুকাতে ব্যস্ত হলো দ্রুত। এতোক্ষণে দৃঢ় ব্যাক্তিত্ব এই পুরুষের এক নজরেই মিলিয়ে গেলো যেনো। সাহস হলো না কদম এগুনোর। সাফওয়ান এক হাত পকেটে ঢুকিয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশে রয়েছে রায়ান। যার হাতে তিন তিনটা পপ কর্নের প্যাকেট। সকলের দিকে এক পলক তাকিয়ে সে এগিয়ে গেলো বাকি তিন বন্ধুর দিকে। সে যেতেই বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো নীতি। শূন্য স্থানে গেড়ে বসলো রায়ান। নিজের জন্য এক প্যাকেট রেখে বাকি দুটো বাড়িয়ে দিলো মিহাদ এবং জিমনের দিকে। নীতি হেলে দুলে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো ইপ্সিতার। ব্যাঙ্গ করে বলে উঠলো,
‘ হাওয়া ফোঁস হয়ে গেলো কেনো? চোরের মন পুলিশ পুলিশ, এটা শুনেছিলাম। আজ স্ব-চক্ষে দেখেও নিলাম৷ পালানোর এতো তাড়া? ‘
বরাবরই নীতির এই অ্যাটিটিউড খুব অপছন্দ করে ইপ্সিতা। সাফওয়ান’দের গ্যাং এর মূল সাফওয়ান হলেও সর্বদা সবকিছুতে নীতির দাপট চলে৷ বন্ধুদের মাথার তাজ যেনো সে। খানিকটা টম-বয় ধরনের হলেও, কখনো বাজে মন্তব্য করার সুযোগ পায়নি কেউ৷ শালীনতার মাঝে অনন্য এক অগ্নি কুন্ড যেনো সে। যা সর্বদা হিংসা করে এসেছে ইপ্সিতা। নীতির এই দাপট, এই তেজ সে নিজের সামনে সহ্য করতে পারে না। তার কি কম আছে নাকি? বরং এই মেয়ের চেয়ে ঢের ভালো স্ট্যাটাস তার। তাহলে তার সামনে গলা উঁচু করার স্পর্দা পায় কি করে এই মেয়ে? রাগ দমিয়ে রাখতে না পেরে সে ক্ষুব্ধ গলায় বললো,
‘ নিজের মতো ছোট লোক ভেবেছো তুমি আমাকে? চুরি করার প্রয়োজন তোমার হতে পারে, ইপ্সিতা আজওয়ার এর হয় না। ‘
ইপ্সিতার মুখে থেকে উক্ত বাণী বের হতে দেরি, কিন্তু চার বন্ধুর রাগে তেড়ে আসতে দেরি হলো না। সাফওয়ান চোয়াল শক্ত করে নিজের জায়গায় ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকলেও বাকি তিনজন দাঁড়িয়ে পড়লো চট করে। এই দৃশ্যে ভয় পেয়ে গেলো ইপ্সিতা। নীতি হাতের ইশারায় বন্ধুদের বোঝাল বসে থাকতে। থমথমে মুখ নিয়ে পুণরায় বসে পড়লো তিনজন। ইপ্সিতার হতবিহ্বল মুখটার দিকে তাকিয়ে নীতি হেসে ফেললো৷ গর্বের সঙ্গে বলে উঠলো,
‘ কিছু বলার আগে ভেবে চিন্তে বলবে পা..পা..র প…রী৷ তোমার শুধু বাপের টাকা-টাই আছে। কিন্তু আমার যা আছে সেটা কোটি টাকা দিয়েও কিনতে পারবে না। দ্বিতীয় বার আমার জন্য মুখ দিয়ে খারাপ কিছু বের করার দুঃসাহস করো না। নয়তো এই মুখটার আস্ত থাকবে না। ‘
ইপ্সিতার শক্ত মনোবল মিনিটে মিনিটে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবুও নীতির সামনে নিজেকে দমাতে চাইলো না সে৷ তার মনোবল দেখে নীতি আবারো হাসলো। মিহাদ পপ কর্ন খেতে খেতে মৃদু কন্ঠে বললো,
‘ সো ইম্প্রেসিভ! আই লাইক ইট। ‘
জিমন এবং রায়ান বাঁকা চোখে তাকাতেই পুণরায় গলা ঝেরে সামনের দিকে মনযোগ দিলো সে। নীতি কথা বাড়ালো না বেশি। সরাসরি তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলো,
‘ সেদিন বারবার করে নিষেধ করার পরেও সায়েরীর দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কীভাবে হলো তোমার? কোন সাহসে আঘাত করেছো ওকে? ‘
ইপ্সিতা যেনো এই প্রশ্নের অপেক্ষায় ছিলো। নীতির প্রশ্নে সে অবাক হয়ে বললো,
‘ ওই মেয়েটার পিছনে লাগতে যাওয়ার মতো ফালতু সময় আমার নেই। সবকিছুতে আমাকে ব্লেম করা বন্ধ করো। ‘
‘ মিথ্যে বলতে আসবে না একদম৷ তোমার দুই চামচিকা অনেক আগেই স্বীকার করে নিয়েছে সব৷ নিজেকে বাঁচাতে এখন কোনো মিথ্যে বলে লাভ নেই। ‘
বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় ইপ্সিতা অবিশ্বাস্য নয়নে তাকালো হিনা এবং জুঁয়ের দিকে৷ অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে ফেললো দুজন৷ ফেঁসে গিয়েছে বুঝতে পেরে দাঁতে দাঁত পিষল ইপ্সিতা। নিজের ব্যার্থতা মেনে নিতে পারছে না সে। নীতি পুণরায় একই প্রশ্ন করাতে সে চটে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ হ্যাঁ আমি-ই আঘাত করেছি ওই মেয়েকে। যেটা আমার সেটা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে একদম ভালো করেনি। ওই মেয়ের কোনো রাইট নেই সাফওয়ানের উপর। ওমন লো ক্লাস, ওল্ড স্কুল টাইপের একটা মেয়েকে সাফওয়ান কখনো পছন্দ করতেই পারে না। তোমরা আমাকে ভুলভাল বোঝাতে আসবে না একদম৷ আমার জিনিসে হাত বাড়িয়েছে বলে আজ এটুকু করেছি। এর চেয়ে বেশি এগোনোর চেষ্টা করলে আরো বেশি কিছু করবো৷ আমার এতো বছরের ভালবাসা ছিনিয়ে নেওয়ার কোনো রাইট নেই ওই মেয়ের। ‘
এটুকু বলে সে ঘুরে দাঁড়ালো সাফওয়ানের দিকে। দ্রুত পায়ে কাছাকাছি এসে বলতে শুরু করলো,
‘ সাফওয়ান! ডোন্ট গেট মি রং। প্লিজ! দেখো আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না। কিন্তু একসাথে থাকলে ভালবাসা জন্মাতে কতোক্ষন? আমি এটাও জানি ওমন আন স্মার্ট একটা মেয়েকে তুমি কখনোই পছন্দ করবে না। ওই মেয়ে তো দেখতেও আহামরি সুন্দর নয়। তুমি..তুমি এসব মেয়েদের চিনো না। মিডলক্লাস বলে রিচ ছেলেদের কাছে পাওয়ার জন্য এরা যা কিছু করতে পারে। ওই মেয়েটাও এমন…… ‘
‘ শাট আপ!!!!! ‘
ইপ্সিতার বাকি কথাগুলো আটকে গেলো সাফওয়ানের এক হুংকারে। উপস্থিত প্রত্যেকে কেঁপে উঠলো। আশেপাশ হতে কয়েক জুড়া উৎসুক নজর স্থির হলো তাদের দিকে। ইপ্সিতা কেঁপে উঠে কদম পিছিয়ে নিলো আপনা আপনি। সাফওয়ান পুণরায় গর্জে উঠলো,
‘ জাস্ট শাট ইউর মাউথ। এই মুখ দিয়ে আর একটা বাজে ওয়ার্ড বের হলে আজ… ‘
টগবগিয়ে উঠা ক্রোধে বাকি কথাটুকু সম্পূর্ণ করতে পারলো না সে। চোয়াল শক্ত করে নিষ্ঠুরভাবে দাঁতে দাঁত পিষে ধরলো। আতংকের সাথে ইপ্সিতা লক্ষ্য করলো সাফওয়ানের ডান হাতের তালু ক্রোধের দাবানলে কাঁপছে। কম্পিত তালু সে মুষ্টিবদ্ধ করে পিঠের পেছনে নিয়ে গেলো। বাম হাত দিয়ে দমিয়ে রাখলো ডান হাত। এই দৃশ্যে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠলো ইপ্সিতার। সাফওয়ান তাকে থাপ্পড় মারতে চেয়েছে! এই হাত থাপ্পড় মারার জন্য এমন কাঁপছিলো!
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা একজন মেয়ে বলে, সাফওয়ান বহু কষ্টে দমিয়ে নিয়েছে নিজেকে। নয়তো তার শক্ত হাতের থাবায় ইপ্সিতার মুখের নকশা বদলে যেতো। ইপ্সিতা মেনে নিতে পারলো না এই দৃশ্য। অন্য এক মেয়ের জন্য সাফওয়ান তাকে থাপ্পড় মারতে চেয়েছে! কিভাবে এটা মেনে নিবে সে? এতোগুলা বছর ধরে এতো কাট খড় পুড়িয়ে শেষ অবধি মানুষটা অন্য কারো হয়ে যাবে! ব্যাপারটা কোনো ভাবে বুঝতে চাইছে না তার মস্তিষ্ক। অস্বাভাবিক ক্রোধে জর্জরিত হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ তুমি ওই মেয়ের জন্য আমার গায়ে হাত তুলতে চেয়েছো সাফওয়ান! আরে পেয়েছো টা কি ওমন চিপ ক্লাস মেয়েটার মাঝে? তোমাকে সবার চেয়ে বিচক্ষণ, সবার থেকে আলাদা ভেবেছিলাম। বাট ইউ ফ্রুভ মি রং। এখন আমার মনে হচ্ছে তুমিও বাকি ছেলেদের মতো শরীর দেখে গলে পড়েছো৷ বান্দরবানের ওই রাতে তোমরা যে সারারাত বাইরে ছিলে, নিশ্চয় ওই মেয়েটা তোমাকে নিজের শ…… ‘
স্ব শব্দে চড় পড়লো ইপ্সিতার ফর্সা গালে। বাকি কথাটুকু আর বের হলো না মুখ দিয়ে। আকস্মিক থাপ্পড়ে পিছিয়ে গেলো সে। মাথা হেলে গেলো একপাশে। জ্বলে উঠলো গাল। অবিশ্বাস্য চোখ তুলে তাকাতেই নীতির কঠিন দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল তার। নীতি তাকে থাপ্পড় মেরেছে! নিজের বিষ্ময় ভাব কাটিয়ে উঠার সুযোগ পেলো না সে। তার আগেই নীতি তেড়ে এসে গাল চেপে ধরলো তার। রাগী কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ অনেক বলেছিস। অনেক শুনেছি তোর ফাও কথা। বারবার ওয়ার্ন করেছিলাম, সায়েরীকে নিয়ে বাজে কথা বলবি তো কেলাবো। কুকুরের পেটে তো ঘি হজম হয়না। তোরও সহ্য হয়নি আমার ভালো মানুষি তাইনা? কথায় কথায় চিপ ক্লাস, ওল্ড স্কুল, আন স্মার্ট বললেই মেয়েটা এমন হয়ে যাবে না। সে নিজের দিক থেকে যথেষ্ট স্মার্ট আছে। আর যাই হোক, তোর মতো ওভার স্মার্ট হয়ে ছেলেদের কাছে নিজের শরীর দেখিয়ে চলে না সে। আর কি বললি? আহামরি সুন্দর না! নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছিস কখনো?
বস্তা বস্তা মেকাপের পেছনের এই বাঁদর মুখ নিয়ে কখনো সামনে আসার সাহস হলে তখন অন্যকে অসুন্দর বলবি। সায়েরীর সৌন্দর্য তোর মতো কুৎসিত মনের মানুষদের চোখে কখনোই পড়বে না। ওর সুন্দর চেহারার সাথে অত্যাধিক সুন্দর একটা মন আছে। এসব তোর মতো কিট পতঙ্গের মাথায় ঢুকবে না। আর হ্যাঁ, মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট টপিক…. সবাইকে নিজের মতো প্রস্টিটিউট ভাববি না। রবিনের সাথে তোর সম্পর্কের গভীরতা খুব ভালো করে জানা আছে আমাদের। ভালোবাসি ভালোবাসি বলে চিল্লালেই সেটা সত্য ভেবে নেওয়ার বোকামি সাফওয়ান খান করেনা। এতোগুলা বছরে যেমন পাত্তা পাসনি, সামনে আরো পাবি না। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং তোর জন্য। নয়তো তোর টাকা লোভী বাবা তোর কুকীর্তির জন্য কাউকে মুখ দেখানোর লায়েক থাকবে না। মাইন্ড ইট।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো ইপ্সিতাকে। হিনাদের উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ নিয়ে যা একে আমার সামনে থেকে। সামনে থাকলে ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে নয়তো। ‘
গালে হাত রেখে হতবাক চোখে ইপ্সিতা তাকিয়ে রইলো নীতির রাগ্বত মুখখানার দিকে। ডান গাল এখনো জ্বলছে তার। এতো জোরে চেপে ধরার কারণে ব্যাথা হয়ে গিয়েছে গালের দুপাশ। তার সাথে এতো রুড আচরণ কখনো কেউ করেনি। উঁচু গলায় কথা বলেনি। গায়ে হাত উঠানো দূরের কথা। আজ নীতির এই আকস্মিক আক্রমণের দখল সামলে উঠতে পারলো না তার মস্তিষ্ক। একপ্রকার ঘোরে ডুবে আছে সে এখনো। সেই অবস্থা তেই তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো হিনা এবং জুঁই।
বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো নীতি। ইপ্সিতা দৃষ্টি সীমানা অতিক্রম করার পর একত্র তিন জোড়া হাতের করতালি ভেসে আসলো কানে। চমকে উঠে পাশ ফিরে তাকালো নীতি৷ বেঞ্চে বসা রায়ান,মিহাদ এবং জিমন আনন্দের সাথে করতালি দিচ্ছে। জিমন দুই আঙ্গুলের সাহায্যে শিস বাজিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
‘ বাহ! বাহ! বাহ! আমাদের শেরনি৷ কি সিন ছিলো বাপরে! আমারই কান জ্বলে উঠেছে। লা জাওয়াব! ‘
নীতি হেসে উঠলো। লেডিস শার্টের কলার উঁচিয়ে ভাব নিয়ে দাঁড়ালো সাফওয়ানের পাশে৷ যদিও সাফওয়ানের চেয়ে তার উচ্চতা অনেক কম৷ তবুও কোনো ভাবে কাঁধে হাত রেখে বললো,
‘ দেখতে হবে না, আমি কার বন্ধু! ‘
সাফওয়ান মৃদু হাসলো। নীতির হাত ছাড়িয়ে নিজেই কাঁধ চাপড়ে বাহবা দিয়ে বললো,
‘ সো প্রাউড অফ ইউ। অ্যান্ড..অলসো থ্যাংক ইউ। ‘
‘ সেটা কেনো? ‘
‘ প্রতিটা কথার উচিৎ জবাব দেওয়ার জন্য। আমারও ইচ্ছে করছিলো কষিয়ে একটা থাপ্পড় লাগাতে। মেয়ে বলে ছাড় পেয়েছে৷ নয়তো… ‘
‘ নয়তো কি? এসব মেয়েকে একদম ছাড় দেওয়া উচিৎ না। তোর উচিৎ ছিলো আরো আগে একে সাইজ করা৷ নয়তো আজ মামলা এই অবধি পৌঁছাতো না। সেদিন আমি যে ওকে সায়েরীর পক্ষ হয়ে এতোগুলো কথা শুনিয়ে ছিলাম। সেটার ক্ষোভ সে বাচ্চা মেয়েটার উপর তুলেছে। আবার কি জঘন্য কথা বলছিলো দেখেছিস? ভুল করেছি, আরো দুই চারটা লাগানো উচিৎ ছিলো। ‘
নীতি পুণরায় রেগে বোম হয়ে উঠলো। তা দেখে কেশে উঠলো মিহাদ। রায়ানের কানে কানে বললো,।
‘ ভবিষ্যৎ অন্ধকার তোমার মামা। ত্যাড়া বেকা চলেছো তো এক থাপ্পড়। কথার খেলাফ করেছ তো, দুইয়ে দুইয়ে চার থাপ্পড়। ইশ!! কল্পনা করেই হতাশ লাগছে আমার। দুনিয়াতে আর মেয়ে পেলি না? এই বারুদ টাকেই নজরে আসলো? ‘
সহজ সরল রায়ানের মুখখানা আমাবস্যার মতো আঁধার হয়ে গেলো। মিহাদের কথা শুনে নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে সে নিজেই চিন্তা পড়ে গেলো। মিনমিন কন্ঠে বললো,
‘ আমি তো প্রপোজ করিনি রে। সে নিজেই করেছিলো। সেদিন রিজেক্ট করলে তো প্রথম থাপ্পড়-টা তখনই জুটত কপালে। ‘
মিহাদের আফসোসের সুরে ‘চু চু’ ধরনের শব্দ করলো। বুঝাল, আসলেই রায়ানের ভবিষ্যৎ কাটবে বউয়ের হাতে চড় থাপ্পড় খেয়ে খেয়ে।
পাঁচজন গোল হয়ে বসলো ঘাসের উপর। এতোক্ষণের হাসিমুখ মিলিয়ে গিয়ে নীতির। আঁধার মুখ করে রায়ানের কাঁধে মাথা রাখল সে। তানদেখে রায়ান জানতে চাইলো,
‘ কি হয়েছে? ‘
গভীর শ্বাস ফেললো নীতি। নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ ইরা’কে ভীষণ মিস করছি রে। কতোগুলো মাস যাবত ওকে নিয়ে আড্ডা দিতে পারছি না। তোদের মাঝে নিজেকে ভিনগ্রহের প্রাণী বলে মনে হয়। ইরা থাকতে কতো আনন্দ হতো। সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো তাইনা? ‘
মুহুর্তেই থমথমে হয়ে উঠলো পরিবেশ। তিন জোড়া চোখ গিয়ে ঠেকল মিহাদের গম্ভীর মুখশ্রীতে। শূন্য দৃষ্টিতে সে ঘাসের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখখানা গম্ভীর হয়ে আছে। কেউ বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। ইরাকে তারাও মিস করে। কিন্তু পরিস্থিতি আরো বেশি বিগড়ে যাবে বলে মুখ ফুটে বলে না। সকলের থমথমে মুখ দেখে নীতি সোজা হয়ে বসলো। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সাফওয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,
‘ সেসব কথা নাহয় পরে হবে। আগে বল, সায়েরীকে প্রপোজ করছিস কবে? ‘
কপাল কুঁচকালো সাফওয়ান। বিরক্ত মুখে জবাব দিলো,
‘ ফালতু কথা বলবি না। আমি এসব কিছুই করবো না। ‘
‘ আরে! ফালতু কথা বলছি মানে? এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা এই মুহূর্তে হতেই পারে না। সায়েরীর মনে তোর জন্য যে পজেটিভ চিন্তাভাবনা আছে। সেটাকে কাজে লাগিয়ে চট করে প্রপোজ করে ফেল৷ তোকে রিজেক্ট করবে এমন স্পর্দা কারোরই নেই৷তাই ঝটপট শুভ কাজটুকু সেরে ফেল। ‘
সাফওয়ান বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেললো। বলল,
‘ অন্য কারো না থাকুক। আমাকে রিজেক্ট করার দুঃসাহস তার বেশ আছে। ‘
হেসে উঠলো সকলে। নীতি পিঞ্চ মেরে বললো,
‘ বাহ! বাহ! পছন্দের নারীর কাছে সব পুরুষ ভেজা বিড়াল। আজ আবারো প্রমাণ পেলাম৷ ‘
সাফওয়ান জবাব দিলো না কোনো। ঠোঁট কামড়ে মৃদু হাসল কেবল৷ এরপর কৌতুহল বশত জানতে চাইলো,
‘ পজেটিভ চিন্তাভাবনা বলতে কি বুঝিয়েছিস? ক্লিয়ার করে বল৷ ‘
নীতি বেশ আয়েশ করে বসলো। সাফওয়ানের প্রশ্নটা যেনো বেশ পছন্দ হয়েছে তার। গদগদ হয়ে জবাব দিলো,
‘ ভেরি গুড কুয়েশ্চন। তোকে বলতেই ভুলে গিয়েছিলাম৷ দুদিন আগে হসপিটালে আমি আর মিহাদ ইপ্সিতার পাঠানো কাগজটার ব্যাপারে জানতে চেয়েছিলাম৷ ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ওর কি মনে হয়, কাগজটা তুই পাঠিয়েছিস কিনা৷ তখন ও কি জবাব দিয়েছিলো জানিস? ‘
প্রশ্ন করেই সে উত্তরের আশায় উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের দিকে। সাফওয়ান ভ্রুঁ কুঁচকে বললো,
‘ কি? থেমে গেলি কেনো? আমি কি করে জানবো কি বলেছে? তুই বল। ‘
‘ আচ্ছা, বলছি বলছি শুন। সায়েরী বলেছে তোর উপর ওর বিশ্বাস আছে। মানে তুই এমন ছেলে-ই না যে পিঠ পিছে আঘাত করবি। বলেছে, ” উনি মোটেও এতোটা খারাপ না। আমি এটা ভালো করেই জানি। ”
কথা শেষ করে নীতি হাসি হাসি মুখে উৎসুক নজরে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের প্রতিক্রিয়া দেখার আশায়। সাফওয়ান পূর্বের ন্যায় কপালে ভাঁজ ফেলে বললো,
‘ হুম। তো? ‘
‘ তো মানে? এই কথাগুলো তোর কাছে সামান্য লাগছে? ‘
‘ তা নয়তো কি? ফ্রেম করে বাঁধিয়ে রাখবো? ‘
‘ আজব ছেলে দেখি তুই। এই রসকষহীন মন নিয়ে প্রেম করতে এসেছিস তুই? শুন, নিজের মনের ইঞ্জিনে তেল ঢাল। ইমোশন জাগা। রোবট মানব থেমে একটু প্রেমিক পুরুষ হ৷ নয়তো এ জীবনে এই মেয়ের মন পাবি না তুই। ‘
সাফওয়ান হাত দিয়ে ঘাড় মেসাজ করে নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলো,
‘ আমারটা আমি বুঝে নিবো। তুই নিজের প্রেমিক পুরুষের দিকে ধ্যান দে। বেচারা তোর বোল্ড সিন দেখে এখনো তব্দা খেয়ে বসে আছে। আমি গেলাম। ‘
বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। ডান হাতের তর্জনী’র মাঝে বাইকের চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে প্রস্থান করলো। নীতি সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে কটমট দৃষ্টিতে তাকালো রায়ানের দিকে। তা দেখে থতমত খেয়ে গেলো বেচারা রায়ান। মিনমিন কন্ঠে বললো, ‘ আমি কি করলাম? ‘
নীতি জবাব দিলো না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে সে বলে উঠলো,
‘ তোদের কি মনে হয়, সাফওয়ান রোমান্টিক? ‘
এই পর্যায়ে জিমন হেসে জবাব দিলো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৫+৩৬
‘ আমার তো মনে হয় এই ব্যাটা রোমান্সের গুরু। রাগী পুরুষ নাকি ভালোবাসার মানুষের কাছে নরম হয়ে বেশি। একদম উজার করে ভালোবাসে। আমাদের রাগী মশাইয়ের ক্ষেত্রেও এমনই হবে দেখিস। ‘
নীতি তপ্ত শ্বাস ফেলে জবাব দিলো,
‘ সেটা হলেই ভালো। নয়তো এই ছেলের যা রাগ! বাচ্চা মেয়েটা এর হুংকার শুনে দিনে চারবার অজ্ঞান না হয়ে থাকে।
