Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৯+৪০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৯+৪০

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৯+৪০
সাজিয়া জাহান সুবহা

এক্সামের রুটিন দিয়েছে। সপ্তাহ খানিক পর হতে এক্সাম শুরু। বছরের শুরু’র দুইমাস গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর পর এখন এক্সাম রুটিন পেয়ে হা হুতাশের শেষ নেই কারো। প্রয়োজনীয় নোটস কালেক্ট করে নিচ্ছে সকলে। কলেজের বিশাল মাঠের এক কোণায় কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়াতলে বই,খাতা নিয়ে বসে আছে সাত বন্ধু বান্ধব। সকলের মুখে সিরিয়াস সিরিয়াস একটা ভাব। সাফ্রিনের খাতা নিয়ে টানাটানি চলছে। আয়ান সিরিয়াস হয়ে খানিকটা দূরে নিজেই প্রয়োজনীয় টপিক দাগিয়ে নিচ্ছে৷ তোহা,ফায়াজ এবং নাজরাত সাফ্রিনের কালেক্ট করা সব টপিক কপি করে চলছে একের পর এক। সকলের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখাচোখি হলো সায়েরী এবং নুহাশের। দুজনের মুখ করুণ হয়ে আছে অসহায়ত্বে। সায়েরী ঠোঁট উলটে নুহাশকে ইশারায় বুঝালো,

‘ খিদে পেয়েছে। ‘
নুহাশ জানতো এমন কিছুই বলবে এই মেয়ে। ঘন্টা খানিক পরপর খিদে পায় তার। সায়েরীর কথার বিপরীতে নুহাশ ইশারায় বোঝালো, ক্যানটিনে চল। ইঙ্গিত বুঝে চটজলদি বই খাতা বন্ধ করে ফেললো সায়েরী। এতোক্ষণ যাবত শুধু একটা সঙ্গীর অপেক্ষায় ছিলো সে। দুজন নিঃশব্দে ব্যাগ রেখে দাঁড়িয়ে পড়তেই আয়ান গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ কোথায় যাওয়া হচ্ছে? ‘
থেমে গেলো দুজন। সায়েরী কনুই দিয়ে খোচাখোচি শুরু করলো নুহাশের বাহুতে৷ নুহাশ আমতা আমতা করে জবাব দিলো,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

‘ সায়ুর খিদে পেয়েছে। ক্যানটিনে যাচ্ছি। এখনই ফিরে আসছি। তোরা থাক। আসছি আমরা। ‘
আয়ানকে প্রতিউত্তর করার সুযোগ না দিয়ে সায়েরীর হাত টেনে একপ্রকার পালিয়ে গেলো নুহাশ। তাদের দিকে তাকিয়ে সাফ্রিন হতাশ ভঙ্গিতে বললো,
‘ এদের নিয়ে যে কি হবে? সব সময় ফাঁকিবাজি। এক্সামের মাত্র ৬দিন বাকি। এখনো ফাঁক খুঁজছে কীভাবে ফাঁকি দেওয়া যায় সেটার। ‘
ফায়াজ বললো,
‘ ছাড় তো এদের কথা। আজ নতুন না। ফাইনালের আগে একটু সিরিয়াস হলেই হল। ‘
মাঠ পেরিয়ে ক্যানটিনে পা রাখতেই খিলখিল করে হেসে উঠলো সায়েরী। এতোক্ষণ বহু কষ্টে এই হাসিটুকু আটকে রেখেছিলো সে। তার হাসি শুনে নুহাশ বিরক্ত গলায় বললো,

‘ হাসি পাইতেছে তোর? শালা এতো পড়ালেখা করার মানেই খুঁজে পাইতেছি না আমি। আশপাশ থেকে চুরি চাপারি পাশ মার্ক তুলে ফেলতে পারতেই তো হইলো। এতো সিরিয়াস হওয়ার মানে হয় কোনো! আজাইরা আকাম! ‘
‘ একদম ঠিক কথা। এতো পড়ালেখা করার কোনো মানেই হয়না। আমি তোর মতো চুরি চাপারি করতে না পারি। তবে টেনে টুনে পাশ আনতে পারবো এটুকু জানি। তার বাইরে একটা শব্দও পড়ার ইচ্ছে নেই। ‘
‘ এই আয়ান্নার বাচ্চা আর সাফার বাচ্চারে ধরে কেলানো উচিৎ। দুটোই বদের হাড্ডি। পড়তে পড়তে কবে না পটল তুলে আল্লাহ মালুম। এতো পড়ে কোন হীরা গাড়বে সেটাই দেখব। খাড়া শুধু। ‘
সায়েরী হাসলো শুধু। জবাব দিলো না কোনো। আরাম করে চেয়ারে বসে এক টুকরো কেক মুখে পুড়ে নিয়ে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলো নুহাশের দিকে। এমনিতেই চটে ছিলো নুহাশ। সায়েরীর এই কাজে আরো বেশি গরম হলো মেজাজ। ধমকে উঠে বললো,

‘ আমাকে দিতেছস ক্যান? আমি বলছি আমি খাবো? মাছের মতো না খেয়ে মানুষের মতো খাওয়া শিখবি কবে? তোর যা খাওনের ধরন! ঘন ঘন খিদে পাবে না তো কি পাবে? ‘
কেক মুখে নিয়েই গাল ফুলিয়ে তাকালো সায়েরী। অস্পষ্ট কন্ঠে বললো,
‘ খিদে মিঠে গেলে খেতে ইচ্ছে করে না। এতে কি আমার দোষ? ‘
‘ আলবাত তোর দোষ। তোর রগে রগে দোষ। কোনো স্বভাব ভালো না। এই হাটুর তলার বুদ্ধি নিয়ে চলছ ক্যামনে আল্লাহ মালুম। তোর জামাইয়ের জন্য দুঃখ লাগে। বেচারা তোকে বিয়ে করে জিন্দেগী ভর পস্তাবে। ‘
‘ এ্যাঁই এ্যাঁই! আমি নির্বোধ হলে তুই কি হ্যাঁ? তোর কোন স্বভাবটা ভালো? তুই নিজেই একটা অকর্মের ঢেঁকি। আমার জামাইয়ে কপালে দুঃখ থাকলেও তোর বউয়ের কপালটাই পোড়া থাকবে দেখিস। ‘

‘ আগে খাইয়া ল মা আমার। খাবার মুখে নিয়ে চ্যা ম্যা করে কি বলতেছস তা কথা বিশেষজ্ঞ বাবাজীও বুঝব না। ‘
গাল ভর্তি কেক নিয়ে ছোট ছোট চোখ করে নুহাশের দিকে তাকিয়ে রইলো সায়েরী। তার এমন চাহনি দেখে নুহাশ ফট করে ছবি তুলে নিলো। পুণরায় ছবিটা দেখে ফিক করে হেসে দিলো সে। হাসতে হাসতে বললো,
‘ তোর জামাইরে সবার আগে এই ছবি দেখাব। এটা দেখেও যদি সে বিয়ের জন্য ছাগলের মতন লাফাই, তবে ধরে নেব দুই পাগলের জুটি মিলিয়েছে আল্লাহ৷ এক্কেবারে মেড ফর ইচ আদার। ‘

প্যাকেটের অবশিষ্ট কেকের টুকরো সব গালে ভরে নুহাশের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেওয়ার জন্য উদ্যত হলো সায়েরী। লম্বাটে নুহাশের উচ্চতার কাছে ব্যর্থ হতে হবে জানে সে। তাই চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো চেয়ারের উপর। মোবাইল হাতের নাগালে এসেছে এমন মুহূর্তে হাত ঝাড়া দিলো নুহাশ। ধাক্কা টুকু সামলাতে না পেরে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললো সায়েরী। চেয়ার উলটে যেতেই ফ্লোরে পড়ে যাওয়ার ভয়ে চোখমুখ খিচে ফেললো সে। কিন্তু ধব করে গিয়ে আটকা পড়লো কিছু একটা’তে। নিচে পড়েনি সেটা বুঝতে পেরে পিটপিট চোখ মেলে চাইলো সে। চিরপরিচিত গম্ভীর মুখখানা দেখে একটুখানি স্বস্তি পেলো অবচেতন মন। বুঝলো, মানুষটার দুইহাতের মাঝে আটকা পড়েছে তার ছোট্ট দেহশ্রী।

সাফওয়ান থমথমে মুখে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে কেক দ্বারা টইটম্বুর হয়ে থাকা সায়েরীর মুখের দিকে। ব্যাপারটা নজরে আসতেই বিষম খেয়ে সায়েরী। গলায় কেক আটকে কেশে উঠলো সে। সাফওয়ান দ্রুত নামিয়ে দিলো তাকে। কাশতে কাশতে মুখের ভিতর থাকা অধিকাংশ খাবার বেরিয়ে আসলো সায়েরীর। বিচলিত ভঙ্গিতে টেবিল থেকে পানির বোতল খুলে নিয়ে সায়েরীর গাল চেপে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো সাফওয়ান। অন্য হাতে বোতল ধরলো সায়েরীর ঠোঁটের মাঝে। সাফওয়ানের দিকে দৃষ্টি রেখেই চুকচুক করে অর্ধেকের বেশি পানি পান করলো সায়েরী। তৃষ্ণা মিটিয়ে হাত দিয়ে বোতল সরিয়ে দিতেই সাফওয়ান তার গাল ছেড়ে বোতল নামিয়ে নিলো। সায়েরী যেই একটু ধাতস্থ হয়ে লম্বা শ্বাস ফেলবে এমন সময় সাফওয়ানের ধমক শুনে কেঁপে উঠলো বেচারি। সাফওয়ান ধমকের সুরে বলে উঠলো,

‘ বাচ্চা তুমি? নাকি খাবারগুলো কোথাও হারিয়ে যাচ্ছিলো? একত্রে এতোগুলো খাবার মুখে নিয়েছো কেনো? তার উপর চেয়ারে উঠে লাফালাফি করছো। আমি যদি আর এক সেকেন্ড দেরি করে পৌঁছাতাম,তাহলে কি হতো ভাবতে পারছো? ‘
এটুকু বলে বিড়বিড় করে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ ইডিয়ট! ‘
বিড়বিড় করে বললেও তা স্পষ্ট ভাবে কানে গেলো সায়েরীর। সে ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালো নুহাশের দিকে। অবস্থা বেগতিক দেখে দ্রুত কেটে পড়লো নুহাশ৷ সায়েরী নিজেও যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো৷ পরক্ষনে মনে পড়লো, সে চিপস কিনেছিলো কেকের সাথে। পেছন ফিরে টেবিল থেকে চিপসের প্যাকেট তুলতে গিয়ে আচমকা সাফওয়ানের দিকে তাকাতেই বিষ্ময়ে জমে গেলো সে। রাগ দমন করে তার আধ খাওয়া পানির বোতল হতে নিয়ে পানি খাচ্ছে সাফওয়ান। বোতলের গোলাকার মুখে লেপ্টে আছে তার পাতলা অধর জোড়া। এই দৃশ্য দেখে শ্বাস আটকে আসলো সায়েরীর। সাফওয়ানের নজর তার উপর পড়তেই ভ্রুঁ কুঁচকালো সে। গম্ভীর কন্ঠে বললো,

‘ দাঁড়িয়ে আছো কেনো? কি চাই? ‘
সায়েরী ঘোরের মাঝেই কম্পিত কন্ঠে বলে উঠলো,
‘ এ..এটা আমার। ম..মানে আমার এঁটো করা পানি….
জড়তার জন্য কথা শেষ করতে পারলো না সে৷ সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়লো আরো কয়েক খানি। দায়সারা ভাব নিয়ে সে জবাব দিলো,
‘ হুম। তো? ‘
থতমত খেয়ে গেলো সায়েরী। নিঃশ্বাস যেনো গলায় আটকে আছে। দ্রুত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সে বুঝালো ‘কিছু না। কিছু না।’ এরপর চিপসের প্যাকেট তুলে একপ্রকার ছুটে পালিয়ে গেলো। সে দৃষ্টিসীমা হতে মিলিয়ে যেতেই ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসলো সাফওয়ান। আয়েশ করে চেয়ারে বসে মোবাইলে দৃষ্টি রেখে পুণরায় ঠোঁট ছোঁয়াল বোতলে। এক নিশ্বাসে অবশিষ্ট পানিটুকু শেষ করেই দম নিলো সে।

কলেজ ছুটির পর সকলে একে একে বেরিয়ে আসলো গেট পেরিয়ে। সবার আগে এসেছে নুহাশ এবং সায়েরী। নুহাশের এক বাহুতে লাগাতার চিমটি কেটে নিজের রাগ ঝেড়েছে সায়েরী৷ এখন পুণরায় ভাব জন্মেছে। দুজন আগে বেরিয়ে রাস্তার কিনারে এসে দাঁড়ালো বাকিদের অপেক্ষায়। চিপস খেতে খেতে সায়েরীর নজর গেলো সারি সারি গাড়ি পার্ক করে রাখা এক জায়গায়। এক ছেলে এবং এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা কাঁদছে, এবং ছেলেটা ধমকাচ্ছে তাকে। সায়েরী কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নুহাশের বাহুতে চিমটি কাটলো। লাফিয়ে উঠলো নুহাশ। বিরক্ত কন্ঠে ঝাড়ি দিয়ে বলল,

‘ এতোক্ষণ চিমটি কেটে শান্তি মিলে নাই তোর? চিপস কিনে দিলাম তারপরও চিমটা চিমটি করতেছস ক্যান? আমাকে কি পাবলিক প্রপার্টি পাইছস? যখন ইচ্ছা বাজিয়ে যাবি? ‘
‘ উফফ! সবকিছুতে দুই লাইন বেশি না বুঝলে হয়না তোর? ওদিকে দেখ, মেয়েটাকে ছেলেটা কীভাবে ধমকাচ্ছে। নির্ঘাত প্রেম ঘটিত কেস। ‘
নুহাশও উৎসুক নজরে তাকালো। সায়েরীর হাতের প্যাকেট হতে চিপস খেতে খেতে বললো,
‘ কি ঘটতে পারে বলতো? ‘

‘ হুম…মনে হচ্ছে ছেলেটা ব্রেকাপ করেছে। আর মেয়েটা কেঁদে কেঁদে বলছে যাতে ব্রেকাপ না করে। আর ছেলেটা ধমকা ধমকি করে বলছে, ‘ তোমার সাথে আমাকে যায়? তাকিয়ে দেখেছো নিজের দিকে? কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে আমার পেছনে লাইন লাগিয়ে আছে কোনো ধারণায় নেই তোমার। ‘ এসব শুনে মেয়েটা আরো কাঁদছে। ‘
‘ আহারে! এই মাইয়ার কান্না দেখে আমারই কান্না পাইতাছে দোস্ত। ‘
‘ আমারও। ছেলে মানুষ এতো নিষ্ঠুর হয় কেনো? মেয়েদের ফিলিংসের কোনো দাম নেই এদের কাছে। ‘
সায়েরীর মাথায় চাপড় মেরে নুহাশ বলে উঠলো,
‘ দুয়েক জন ছেলের জন্য এখন ছেলে জাতি খারাপ হয়ে গেলো? আমারে চোখে পড়ে না? একজন সুস্থ সম্মত ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলে জাতির নিন্দা করতেছস। তোকে তো লাত্থি মেরে উগান্ডা পাঠানো উচিত। ‘
‘ অবশ্যই খারাপ বলবো। একশো বার বলবো। দেখছিস না ছেলেটা কি নিষ্ঠুর? এতো কান্না দেখেও মায়া হচ্ছে না তার। ‘

নুহাশকে এবার বেশ সিরিয়াস দেখাল। সায়েরীর করা সুপ্ত অপমান যেনো মেনে নিতে পারলো না সে। শার্টের হাতা গুটিয়ে সে বড় বড় কদম ফেলে অগ্রসর হল সামনে। এই ছেলের গুষ্টি উদ্দ্বার করে সে আজ প্রমাণ করে দিবে। সব ছেলে এক হয়না। কিছু কিছু মানুষ নুহাশ সিকদারের মতো সুপুরুষ হয়, সুপুরুষ।
কোনো রূপ বাক্য বিনিময় ছাড়া সে সরাসরি গিয়ে অপরিচিত ছেলেটার কলার চেপে ধরলো। দাপটের সাথে বলে উঠলো,
‘ এ্যাঁই! পাবলিক প্লেসে প্রেমিকাকে ধমকা ধমকি করছ! এতো সাহস বেড়েছে আজকাল কার পোলাপাইনদের? মাইয়া যে কাঁদছে সেটা চোখে পড়ে না? প্রেম করছস ক্যান যদি ব্রেকাপ করতে হয়? এক্ষুনি মাফ চা। মাফ চেয়ে প্যাচ আপ কর। ‘

কথা শেষ করে কলার ছেড়ে দিলো সে। তার আকস্মিক আক্রমণে ধাতস্থ হতে সময় লাগল ছেলেটার। যখন বুঝে উঠলো ঠিক কি কি বলেছে নুহাশ। তখনই পুণরায় সে চেপে ধরলো নুহাশের কলার। বিরক্তিকর কন্ঠে বললো,
‘ আবে ওই? আমরা তোকে বলেছি যে আমরা প্রেমিক প্রেমিকা? তুই শুনেছিস আমরা ব্রেকাপ করছিলাম না কি করছিলাম? কথার মাঝে বাম হাত ঢুকাতে আসবি তো এক ঘাঁ দিবো। এমনিতেই মেজাজ গরম আছে। ‘
নুহাশের কপালে ভাঁজ পড়লো। কিন্তু দমে না গিয়ে পুণরায় বলে উঠলো,

‘ মেয়েটা এভাবে কাঁদতেছে ক্যান তাইলে? প্রেম করে এখন প্রেমিকা বলে স্বীকার করতেই মুখ জ্বলতেছে তোর? আমার কলেজ ক্যাম্পাসে এসব তো চলবে না মামা। ভদ্রভাষায় বলছি, চুপচাপ প্যাচ আপ কইরা কেটে পড়, যা। ‘
ছেলেটার মেজাজ বিগড়ে গেলো আরো বেশি। নুহাশের কলার চেপে চেঁচিয়ে উঠতেই দুই দিক থেকে পাঁচ, ছয় ছেলে দ্রুত এগিয়ে আসলো। এক দিকে আছে আয়ান এবং ফায়াজ। অন্যদিকে রায়ান,জিমন,মিহাদ এবং সাফওয়ান। তারা পার্কিং-এরিয়াতেই ছিলো। শোরগোল শুনে এগিয়ে এসেছে। আয়ান এসে জোর করে ছাড়িয়ে নিলো নুহাশকে। ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে অপরিচিত ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো,

‘ কি সমস্যা হয়েছে ভাইয়া? এতো হাইপার না হয়ে আমাকে বলুন। ‘
আয়ানের ভদ্রতা দেখে মুহুর্তেই শান্ত হয়ে গেলো ছেলেটা। নুহাশের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত মুখে জবাব দিলো,
‘ ভাই, ব্যাক্তিগত কিছু সমস্যার কারণে ছোট বোনকে বকছিলাম৷ এই ছেলে বলা নেই কওয়া নেই, হুট করে এসে আমার কলার চেপে ধরে বলে কিনা আমি ব্রেকাপ করছি বলে মেয়েটা কাঁদছে। এক্ষুনি যেনো প্যাচ আপ করে কেটে পরি। এসব কোনো কথা ভাই? এভাবে অন্যকারো ব্যাক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো কোন ধরনের সভ্যতা? ‘
আয়ান গম্ভীর মুখে নুহাশের দিকে তাকালো। থতমত খেয়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে নুহাশ। আয়ান তার পক্ষ হতে সরি বললো। ছেলে মেয়ে দুজন চলে গেলো। যেতে যেতে ছেলেটা বেশ কিছু কথাও শুনিয়ে দিয়ে গেলো। আয়ান নুহাশের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই নুহাশ তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো,

‘ কসম আল্লাহ! আমি জানতাম না ওরা ভাই,বোন। এই সায়ুর বাচ্চা, বেদ্দপ, মিচকা শয়তানটা বলেছে এরা ব্রেকাপ করছে। আমি তো ওই.. একটু প্রবলেম সলভ করতে চাইছিলাম আরকি। ‘
আয়ান জবাব দিলো না কোনো। নুহাশের বক্তব্য শুনে উপস্থিত সকলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হলো সায়েরী। যার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার তিন বান্ধবী। সায়েরী দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে আছে। গভীর ভাবে লক্ষ্য করে সকলে বুঝলো সে নিজের হাসি থামানোর বৃথা চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষ অবধি সফল হলো না সে। নুহাশের মুখ দেখে দম ফাটা হাসিতে ফেলে পড়লো। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো তার। তার হাসি দেখে তেড়ে মেড়ে এগুলো নুহাশ। যা দেখে সায়েরী হাসি আটকে কোনো রকমে বলে উঠলো,

‘ আমার কোনো দোষ নেই। আমি কি বলেছিলাম নাকি বীরপুরুষ সেজে যুদ্ধ করতে যেতে? গিয়েছিলি কেনো? ‘
নুহাশ শক্ত হাতে চাপড় মারলো তার মাথায়। বিড়বিড় করে অপরিচিত ছেলেটাকেও বকে দিলো। শেষে বলে উঠলো,
‘ শালার তেজ দেখলে বাঁচি না। এতো ব্যাক্তিগত সমস্যা হলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে বকতেছিলো কেনো বোনকে? ঘরে কি জায়গা নেই? পাবলিকে দাঁড়িয়ে এমন কান্ড ঘটালে মানুষ তো বাম হাত ঢুকাবেই। বলে কিনা পারসোনাল ব্যাপার। বা*লের পারসোনাল। ইচ্ছে তো করছিলো মেরে শালার নাট-বল্টু ঢিলে করে দি। ‘
নুহাশের নিম্ন কন্ঠের বকাঝকা সায়েরী ব্যাতিত কারো কানে ঢুকলো না। অবুঝ সে নুহাশের শেষের কথাগুলো বুঝতে না পেরে ফট করে বলে উঠলো,

‘ নাট-বল্টু মানে কি দোস্ত? তুই ছেলেটার নাট-বল্টু ঢিলে করবি কি ক…. ‘
দ্রুত হাতে সায়েরীর লাগামহীন মুখ চেপে ধরে কথা আটকে ফেললো নুহাশ। এই মেয়ের মুখ দিয়ে এমন কিছু বের হবে তা যেনো ধারণার বাইরে ছিলো সকলের। মিহাদ এবং জিমন চমকে উঠে ফিক করে হেসে দিলো। পরপর আবার নিজেদের সামলে ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো। সাফ্রিন, তোহা, নাজরাত এতোগুলা ছেলের সামনে বান্ধবীর বেফাঁস কথায় লজ্জায় হতভম্ব হয়ে দ্রুত প্রস্থান করো। ফায়াজ এবং রায়ান এমন ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো যেনো তারা কিচ্ছুটি শুনেনি। অন্যদিকে সাফওয়ান এবং আয়ান হতাশ ভঙ্গিতে তপ্ত শ্বাস ফেললো। দুজন মনে মনে একই কথা আওড়াল,

‘ এই মেয়ের বুদ্ধি সুদ্ধি হবেটা কবে? ‘
নুহাশের হাতের মাঝে আটকে পড়ে ‘উম উম’ জাতীয় শব্দ তুলে গুঙিয়ে উঠলো সায়েরী। নুহাশ হাত নামাতেই সে পিটির পিটির চোখে তাকিয়ে ঠোঁট উলটে বললো,
‘ আবার কি করলাম? ‘
দাঁত কিড়মিড় করে নুহাশ জবাব দিলো,
‘ দেশ দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলেছেন নিজের বুদ্ধিসম্পন্ন মাথা দিয়ে। গর্দভ কোথাকার। তোর সামনে আমি যদি আর মুখ খুলছি, তাহলে আমার নামও নুহাশ সিকদার না। গবেটের বাচ্চা, মহা গবেট। থাক তুই। ‘
সায়েরী এক সেকেন্ডের জন্য উপস্থিত সকলের দিকে তাকালো। অবস্থা বেগতিক দেখে নিজেও কেটে পড়লো দ্রুত। মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো,
‘ আশ্চর্য ব্যাপার! করলাম টা কি আমি? ‘

সারাদিন বাহিরে কাটিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি পৌঁছাল সাফওয়ান। সিড়ি বেয়ে উপরে উঠবে এমন সময় বাড়ির একজন কেয়ার টেকার ডাক দিলো তাকে। ঘুরে দাঁড়ালো সাফওয়ান। তার দিকে মাঝারি আকৃতির একটি গিফট বক্স এগিয়ে দিলো স্টাফ-টি। জানালো, কেউ একজন সাফওয়ানের নামে দারোয়ানকে দিয়ে গেছে এই বক্স। সাফওয়ান বুঝে উঠতে পারলো না কে পাঠাল এই বক্স! তাছাড়া কোনো স্পেশাল ডেটও পরেনি যে আগ বাড়িয়ে গিফট পাঠাবে। বক্সটা নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে গেলো সে। এতো হালকা বক্সটাতে কি থাকতে পারে? ওজন দেখে মনে হচ্ছে বক্সটা খালি। কৌতুহল বশত রুমে ঢুকা মাত্র বক্সটা খুললো সে। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো ভেতরে একটা খাম। যার মাঝে দুই ভাঁজ করা এক টুকরো কাগজ। সাফওয়ান দ্রুত হাতে মেলে ধরলো সেটা। কাগজের মাঝ বরাবর কালো কালি দ্বারা লিখা রয়েছে কয়েকটি লাইন,

‘ কথায় আছে, কারো কাছে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করাটা সবচেয়ে বড় বোকামি। দুর্বলতা সবসময় অগোচরে রাখতে হয় সকলের। ভুলক্রমে একবার যদি তা শত্রুর নজরে পড়ে যায়, তবে নিজের পরাজয় নিশ্চিত। একমাত্র বোকা ব্যাক্তিরাই নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে ফেলে খুব অনাসয়ে। বুদ্ধিমান-রা কখনো এই বোকামি করে না। কিন্তু সাফওয়ান তেহজিব খান যে এই বোকামি করে বসলো, এর জন্য তাকে কি বলা যায়? সকলে যে মানুষটাকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যাক্তি হিসেবে জানে। সেই ব্যাক্তির দ্বারা এতো বড় বোকামি কি করে হলো? ‘
কপালে ভাঁজ পড়লো সাফওয়ানের। কে পাঠিয়েছে এই চিঠি? কেমন দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেছে সে? প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানের অবচেতন মন উত্তর টাও খুঁজে নিলো চট করলো৷ মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে আসলো একটাই নাম, “সুবহা”।

হ্যাঁ বর্তমানে এই মেয়েটায় তো নাম লিখিয়েছে তার দুর্বলতার খাতায়। নয়তো মা,বোনের কথা এতো বছর পর কে-ই বা উল্লেখ করবে? তারা তো শুরু থেকেই আছে দুর্বলতা হিসেবে৷ সাফওয়ান চিঠিটা উলটে পালটে দেখলো কোনো নাম পরিচয় আছে কি না। কিন্তু পেলো না কিছু। কে পাঠাতে পারে এই চিঠি? কে জানে সায়েরীর ব্যাপারে? ইপ্সিতা! নাহ। সেদিনের ঘটনার পর মেয়েটা এমন দুঃসাহস করবে না কখনো। সাফওয়ান ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ভাবলো কয়েক মুহুর্ত। এই চিঠিটা সুক্ষ্ম সতর্কবার্তা ছিলো বলা যায়। সাফওয়ানের কোনো শত্রু হয়তোবা সায়েরীর ব্যাপারে জানতে পেরে গিয়েছে। সাফওয়ানকে আঘাত করতে চাইছে তার দুর্বলতায় আঘাত করে। রাগে চোয়াল শক্ত হলো সাফওয়ানের। ইচ্ছে করছে সেই মানুষটাকেই পিসে ফেলতে, যে এই দুঃসাহস মনে পুষেছে। রাগে বক্সটা উঁচু করে ছুড়ে মারতে উদ্যত হলো৷ পরপরই হাত থেমে গেলো কিছু একটা তে নজর গাঁথতেই। ব্যস্ত হাতে সে বক্সের ভিতর হালকা কালিতে লেখা শব্দগুলোর উপর নজর বুলালো। এবং সেকেন্ডের মধ্যেই তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুঝে নিলো লিখাটা। গোটা গোটা অক্ষরে লিখা রয়েছে পরিচিত একটা নাম। তা হলো,
‘ তাশরীফ চৌধুরী। ‘

অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমের বারান্দায় রকিং চেয়ারে চিন্তিত মুখে বসে রয়েছে সাফওয়ান। মুষ্টিবদ্ধ হাতে তাশরীফের পাঠানো সেই চিঠি। যা দুমড়েমুচড়ে আছে তার পোক্ত হাতের মাঝে। দুই আঙ্গুল দ্বারা কপাল ঘষে গভীর ভাবনায় বিভোর হলো সে। মাস দুয়েক পর ইলেকশন। তার বাবা নওশাদ খান এবার এমপি পদের জন্য দাঁড়িয়েছে। বর্তমান এমপি হচ্ছেন, তাশরীফ চৌধুরীর বাবা তৌসিফ চৌধুরী। সেদিক থেকে এই মুহূর্তে সাফওয়ান যদি হুট করে তাশরীফ’কে কিছু করে বসে, তবে ব্যাপারটা জানাজানি হলে পার্টি নওশাদ খান’কে নমিনেশন দিয়ে দিতে পারে। যার কারণে গিয়ে সাফওয়ান চেয়েও সোজা কোনো অ্যাকশন নিতে পারবে না। এবং পারবে না বলেই তার ক্ষোভ বেড়েছে আরো কয়েক ধাপ। দুমড়েমুচড়ে যাওয়া চিঠি টা মেলে সে পুণরায় পড়লো।

রুমের আলো নিভানো। গার্ডেন এরিয়ার টিমটিমে আলোয় চিকন কালির লেখাগুলো বুঝতে বেশ বেগ পেতে হলো তার। তবে স্পষ্ট চোখে দেখলো একটা শব্দ। দুর্বলতা। যা দেখে এবার অধর কোণে তীর্যক হাসি ফুটলো তার। চেয়ার দুলিয়ে বিড়বিড় করে শব্দটা আওড়াল বার কয়েক। পরপর কিছু একটা পরিকল্পনা করে মেসেজ করলো একজনকে। তাশরীফের পাঠানো গিফট বক্সটা যত্ন করে তুলে রাখলো। মনে মনে তাশরীফের মনোভাব বুঝতে পেরে হাসলো সে। তাশরীফ হয়তো ভেবে নিয়েছিলো সাফওয়ানকে দুর্বল করে নওশাদ খান এর মনযোগ- এ ব্যাঘাত ঘটাবে।

ছেলের চিন্তায় একটু হলেও নড়েবড়ে হবে কঠোর মানুষটার শক্ত মনোবল। সেই সুযোগে তৌসিফ চৌধুরী পুণরায় নিজ পদ হাতিয়ে নিবে। অন্যদিকে তাশরীফের প্রতিশোধ নেওয়াটাও পূর্ণ হবে। এক ঢিলে দুই পাখি মারার পরিকল্পনা করেছিলো হয়তো সে। কিন্তু ভুলে বসেছিলো, যার সাথে চল চাতুরী করতে এসেছে। মানুষটা অন্য কেউ নয়। সাফওয়ান তেহজিব খান! কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো যোগ্যতা তার ঢের আছে। এবার তাশরীফের পরিকল্পনা সে তাশরীফের উপরেই প্রয়োগ করবে৷ এমন কিছু করবে, যাতে সাঁপ ও মরবে আর লাঠিও ভাঙ্গবে না।

কোলাহল বিহীন রেস্টুরেন্টের এক কোণার এক টেবিলে বসে আছে নাজরাত। মুখোমুখি সামনের চেয়ারে আদনান। মাত্রই এসেছে সে। মুখজুড়ে বিস্তৃত হাসি। যা দেখে শক্ত হলো নাজরাতের মুখশ্রী। আদনান দেখেও না দেখার ভান করলো। খুটিয়ে খুটিয়ে পরখ করলো নাজরাতের নাকের নাকফুল, গলার চেইন, হাতের রিং সব। বিবাহিতা ভাবটা স্পষ্ট লক্ষ্যণীয় এসবের কারণে। মুখশ্রীতে ও অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা। বিয়ের পর সব মেয়েদের মুখের উজ্জ্বলতা বাড়ে শুনেছিলো সে। আজ স্ব চক্ষে দেখল। সেই সাথে খারাপ লাগা এবং হিংসায় বিষিয়ে উঠল মন। এই নাকফুল কি তার নামে হতে পারতো না? সে কি পারতো না নাজরাতের মুখশ্রীর এই উজ্জ্বলতার কারণ হতে? ভাবনার রেশ কাটলো নাজরাতের কন্ঠে। আদনানের দৃষ্টি অস্বস্তিতে ফেলছে তাকে। সেটা কাটাতে সে শক্ত কন্ঠে বললো,

‘ কেনো ডেকেছো আমাকে? ‘
নড়েচড়ে বসলো আদনান। নাজরাতের কথার উত্তর না দিয়ে ম্যানিউ কার্ড উলটে পালটে দেখে বললো,
‘ কি খাবি বল। খাবার আসতে আসতে কথা বলি। ‘
‘ তোমার সাথে খোশগল্প করতে আসিনি আমি এখানে। সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি বলে বাসায় এসে পড়বে? কি সম্পর্ক তোমার সাথে আমার? কোন অধিকারে বারবার বিরক্ত করে চলেছ আমাকে? শেষ বারের মতো বুঝাতে এসেছি এখানে। নয়তো তোমার সাথে দেখা করারর নূন্যতম ইচ্ছে আমার ছিল না। ‘
‘ ভালোবেসেছি বলে এতোটাই অপরাধ করে ফেলেছি? ‘
‘ অন্য একজনের স্ত্রীকে দিনের পর দিন উত্ত্যক্ত করে অপরাধ করেছো। ‘
‘ কি বললি? আমি তোর কাজিন হয় নাজ? ভালোবাসি আমি তোকে। সেটাই বোঝাতে চাইছি তোকে। এটাকে উত্যক্ত করছি বলে মনে হচ্ছে তোর? ‘

‘ তুমি কেনো বুঝতে পারছো না, আমি এখন অন্য কারো ওয়াইফ। তোমাকে নিয়ে কখনো আমার মনে কোনো ফিলিংস ছিলোই না। বিয়ের পর ফিলিংস আসবে কেনো তাহলে? আজ এক মাসের চেয়েও বেশি হচ্ছে আমার বিয়ের। তুমি কি দেখছো না কিছু? অন্য কারো ওয়াইফের দিকে বাজে নজর দিচ্ছো। এটাকে উত্যক্ত করা বলবো না তো আর কি বলবো? ‘
আঁধার হয়ে গেলো আদনানের মুখ। নিজেকে বুঝাতে সে টেবিলে থাকা নাজরাতের দুইহাত নিজের দুইহাতের মাঝে চেপে ধরে বলে উঠলো,

‘ বিশ্বাস কর, আমি অনেক আগেই মা’কে জানিয়েছি সব। আমি বহু আগে থেকে পছন্দ করি তোকে। আমি.. আমি মেনে নিতে পারছি না তোকে অন্য কারো সাথে। তুই অন্য কারো বউ হোস এটা আমি মানতে চাইছিও না। আমি খুব ভালোবাসি তোকে। আমার দিকটা একটু বোঝ, প্লিজ। তোর তো অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। ওই ছেলেটাকে কতটুকুই বা চিনিস তুই? আন্ডাসটেন্ডিং হতেও তো মাস লেগে যায়। সেই দিক থেকে বলতে গেলে আমাকে বহু বছর ধরে চিনিস তুই। আমি.. আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। আমার সাথে তুই অনেক হ্যাপি থাকবি। তুই প্লিজ বিয়েটা ভেঙ্গে দে। তোর গায়ে ডিভোর্সি তাকমা লাগলেও আমার কোনো যায় আসেনা। আমি সব পরিস্থিতিতে তোকে গ্রহণ করতে রাজি। প্লিজ আমাকে বোঝার চেষ্টা কর। আমি….
আর কিছু শোনার ধৈর্য হলো না নাজরাতের। গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে সে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত। দাঁড়িয়ে পড়লো চট করে। শক্ত কন্ঠে জানিয়ে দিলো,

‘ চুপ করো আদনান। কি বলছো তা নিজে শুনতে পাচ্ছো কি? তুমি আমাকে নিজের জেদ বানিয়ে নিয়েছো মনে হচ্ছে। আমি তোমার হলাম না বলে এখন অন্য কারো সাথেও আমাকে শান্তিতে থাকতে দিবে না? নিজের মানসিকতা বদলাও, প্লিজ। এসব যদি আমি পরিবারের কাউকে জানিয়ে দি তাহলে কারো চোখে চোখ রাখার যোগ্যতা থাকবে না তোমার। আমার চোখে তো নিচে নেমেই গেছো। অন্যদের চোখে অন্তত বিশ্বাসটার মর্যাদা রাখো। আর হ্যাঁ, এই যে বললে না? অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে একমাস শুধু দুজন দুজনকে জানতে আর বুঝতেই শেষ হয়ে যায়? ভুল বলেছো তুমি। মানুষটা সঠিক হলে একমাস কেনো, এক সপ্তাহ যথেষ্ট হয় বুঝতে আর ভালোবাসতে। আর আমার হাসবেন্ড আমার জীবনের সবথেকে সঠিক মানুষটি। আমাদের মাঝে আন্ডাসটেন্ডিং বলো বা ভালোবাসা, সবটা কানাই কানাই পূর্ণ আছে। সেখানে তোমার মতো মানুষদের কোন প্রয়োজন নেই। শেষ বারের মতো বলছি, দ্বিতীয় বার আমার সাথে যোগাযোগের কথা চিন্তাও করো না। নয়তো এবার আর ছাড় দিবো না।

নাজরাতের দৃঢ় কন্ঠের একটা একটা বাক্যে নিজের সব যুক্তি হারিয়ে বসেছিলো আদনান। কিন্তু যখনই দেখল নাজরাত চলে যাচ্ছে। চট করে দাঁড়িয়ে পড়লো সে। পুণরায় হাত চেপে ধরলো নাজরাতের। বলল,
‘ আরেকবার ভেবে দেখ প্লিজ। আমি তোকে সত্যিই অনেক ভালো….. ‘
রেস্টুরেন্ট বলে উচ্চকণ্ঠে কিছু বলতে না পারলেও আদনানের কথা শেষ হওয়ার আগে নাজরাত নিম্ন কন্ঠে চোয়াল শক্ত করে বললো,

‘ আদনান প্লিজ! হাত ছাড়ো। ‘
আদনান পুণরায় কিছু বলতে নিচ্ছিলো। কিন্তু আচমকা থেমে গেলো নাজরাতের দিকে তাকিয়ে। চোখে মুখে খানিকটা বিষ্ময় ভাব ধরা দিলো। নাজরাত ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো। লক্ষ্য করলো, ঠিক তার দিকে নয়, হয়তো তার পেছনে তাকিয়ে কথা থামিয়ে দিয়েছে আদনান। নাজরাত নিজে কিছু বলবে এমন সময় হঠাৎ করে আদনান আগ বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। নাজরাত চমকে উঠলো। বিমূঢ় হয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতেই ভুলে গেলো যেন। তাকে অবাক করে দিয়ে আদনান জড়িয়ে ধরা অবস্থা-তে বলে উঠলো,

‘ আমি তোকে অনেক বেশি ভালোবাসি নাজ! পরিবারের জন্য বিয়ে করেছিস সেটা আমি জানি। তোকে আমার চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝবে না। আমার সাথে অনেক বেশি সুখে থাকবি তুই। তুই নিজেও আমাকে কতো ভালো বুঝিস। আমার প্রস্তাব টা ভেবে দেখ। আমি জানি তুই ফিরিয়ে দিবি না। আফটার অল, তুমি নিজেও আমাকে…..
বাকি কথাগুলো বলার আগে আদনানের বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো নাজরাত। ঝাঁঝালো কণ্ঠে কিছু বলতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে ভেসে আসলো এক পুরুষালি কন্ঠস্বর,
‘ দাঁড়িয়ে আছেন কেনো মি. সাদিফ! তাড়াতাড়ি চলুন। আমাদের লেট হচ্ছে। ‘

বিস্ফোরণ ঘটলো যেনো নাজরাতের কানে। তড়িৎ গতিতে পেছন ফিরে গেলো সে। সম্মুখে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে চমকে গেলো। জমে গেলো সে স্থানে। বুকে ধাক্কা লাগলো প্রবলভাবে। অফিসের ফর্মাল পোশাকে হাতে দুটি ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ। তার চেহারা অতি মাত্রায় স্বাভাবিক। রাগ,ক্ষোভ, অবিশ্বাস, বিষ্ময় কিছুই বোঝার উপায় নেই। শান্ত, শীতল চোখ দুটো আদনানের দিকে স্থির। পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোকের কথার জবাবে সে চোখ সরিয়ে মৃদু কন্ঠে বললো, ‘চলুন’।

এরপর গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট থেকে। একটাবার চোখ তুলে তাকালো না নাজরাতের দিকে। নাজরাত অসাড় কন্ঠে একবার ডাকল তাকে। সেই ডাক কর্ণগোচর হলো না সাদিফের। হবে কি করে? আতংকে সর্বাঙ্গ অস্বাভাবিক রকমের কাঁপছে নাজরাতের। কন্ঠও কাঁপছিল ডাকতে গিয়ে। পাশে অবস্থানরত আদনান যেন বেশ উপভোগ করলো এই দৃশ্য। সাদিফকে এভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে সে তাচ্ছিল্য হেসে বললো,
‘ এই তোর বোঝদার স্বামী? বউকে অন্য কারো সাথে দেখে বিশ্বাস করে নিলো সব। তোর দিকে ফিরেও তাকালো না। এর সাথে সংসা….

ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে সপাটে চড় পড়লো আদনানের গালে। হতবাক সে হেলে পড়লো একদিকে। বিষ্ময়কর চোখ তুলে তাকাতেই চমকে উঠলো নাজরাতের জ্বলন্ত দুই চোখ দেখে। টলমল চোখের ধারালো দৃষ্টিতে কেঁপে উঠলো সে। রাগে ফোঁস ফোঁস করছে নাজরাত। আদনান যে সাদিফকে দেখে ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরেছিলো তা বেশ বুঝতে পেরেছে সে। আদনানের হীন মানসিকতা দেখে ধৈর্য সব গুড়িয়ে গেছে তার। এমন নিকৃষ্ট মানুষের সাথে আর কোনো বাক্য বিনিময় করার রুচি হলো না। জ্বলন্ত দৃষ্টি দ্বারা শাসিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট হতে। হতবিহ্বল মুখে আদনান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো শুধু।

রেস্টুরেন্ট হতে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে সাদিফকে খুঁজল নাজরাত। এবং পেয়েও গেলো। রাস্তার কিনারে পার্ক করা গাড়ির দিকে এগুচ্ছে সাদিফ। সাথে সেই ভদ্রলোক। নাজরাত দূর থেকে সাদিফকে দেখেই কাল বিলম্ব না করে ছুট লাগালো। সাদিফ তখন গাড়ির দরজা খুলেছে মাত্র। তা দেখে নাজরাত উচ্চ কন্ঠে ডেকে উঠলো তাকে। সাদিফ যে শুনতে পেয়েছে সেটা বুঝলো সাদিফের হঠাৎ থেমে যাওয়া দেখে। গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতে গিয়েও ডাক শুনে একটুর জন্য থমকালো সে। যা দেখে মৃদু হাসি ফুটল নাজরাতের ঠোঁটে। কিন্তু পর মুহুর্তেই মিলিয়ে গেলো সেটা৷ যখন দেখল সাদিফ তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গাড়িতে চড়ে বসেছে। এবং সেকেন্ডের মধ্যে গাড়ি চালু করে ত্যাগ করেছে স্থান।

নাজরাত আর এগোতে পারলো না। বুকের ভিতরটা জর্জরিত হয়ে উঠলো। চোখ বেয়ে নামল নোনাপানির ধারা। সাদিফের এই উপেক্ষা মেনে নিতে পারলো না তার মন। দহনে পুড়ছে ভেতরটা৷ ঝাপসা চোখে দেখে গেলো সাদিফের গাড়িটি দৃষ্টি সীমা হতে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। তা দেখে টনক নড়লো তার৷ কম্পিত হাতে মোবাইল বের করে কল লাগালো সাদিফের নাম্বারে। একবার, দুইবার , পাঁচবার। এক স্থানে দাঁড়িয়ে গুনে গুনে সাতবার কল দিয়েও কোনো রেসপন্স আসলো না অপর পক্ষ হতে৷ ভঙ্গুর হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নাজরাতের খেয়াল হলো না সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। সাদিফের এমন ব্যাবহার নিতে না পেরে এবার সে মাঝ রাস্তায় দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।

রাত ন’টা। দুপুরের দিকে কোনো রকমে বাসায় এসে সেই যে রুমে ঢুকেছে, এখনো বের হয়নি নাজরাত। কোন অবস্থায় বাড়ি ফিরেছে তা একমাত্র সে জানে। এখনো অবধি সেই কাপড় পড়ে আছে। সাদিফকে এই নয়, দশ ঘন্টার মাঝে কতো শত কল দিয়েছে তার হিসেব নেই। প্রতিবার রিং হচ্ছে৷ কিন্তু রেসপন্স পাচ্ছে না কোনো। কলের পাশাপশি মেসেজ দিয়েছে অনেক। ডেলিভার হলেও সিন হলো না কোনো মেসেজ। দুপর থেকে এই অবধি কান্নায় কান্নায় চোখে মুখের বেহাল দশা তার। মাথা ব্যাথা করছে প্রচন্ড। মনে মনে শুধু একটাই প্রার্থনা করছে,” সাদিফ একটাবার শুধু কল রিসিভ করুক৷ একটা সুযোগ দিক নিজেকে এক্সপ্লেইন করার৷ ” কিন্তু সেই আশায় আশায় বেলা বারোটা হতে এখন রাত ন’টা বেজেছে৷ সাদিফ কলের জবাব দিলো না কোনো।

এই পর্যায়ে এসে রাগে, দুঃখে ফোন ছুড়ে মারলো সে বিছানায়। দুইহাতে মাথা চেপে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলো। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় করাঘাত করলো তার মা। দুপর থেকে মাথা ব্যথার অযুহাত দিয়ে রুম বন্ধি হয়ে আছে সে। এবার না খুললেই নয়। কিন্তু চোখে মুখের এই হাল দেখলে মায়ের প্রশ্নের শেষ থাকবে না জানে সে। তাই চট জলদি মুখ ধুয়ে দরজা খুলে দিলো। লক খুলে আর তাকালো না সেদিকে। উলটো ঘুরে ধীর পায়ে আবারো বিছানার দিকে এগোল৷ দরজা খুললেও তার মায়ের সাড়াশব্দ পেলো না কোনো। বরং কানে আসলো পুণরায় দরজা বন্ধ করার শব্দ। পরপর আবার লক করার শব্দ। নাজরাত থেমে গেলো। কপালে ভাঁজ ফেলে যেই কিছু বলার জন্য পেছন ফিরেছে, অমনি সম্মুখের মানুষটাকে দেখে চমকে উঠলো সে। জমে গেলো সেই স্থানে। বিমূঢ় হয়ে ফ্যালফ্যাল নজরে তাকিয়েই রইলো শুধু। তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ।

দুপুরের দেখা সেই একই পোশাকে। বরং এখন খানিকটা অগোছালো লাগছে তাকে৷ গলার টাই ঢিলে হয়ে আছে৷ ইন করা শার্টের ভাঁজ খোলা৷ জেল দ্বারা সেট থাকা চুলগুলো এখন এলোমেলো। সাদিফের নজরেও অনেকটা চমকিত ভাব। যা হয়েছে নাজরাতের মুখশ্রী দেখে। নাজরাত বুঝে উঠতে পারলো না সে কি স্বপ্ন দেখছে কি-না। নড়াচড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে সে। সাদিফ নিজেই এগিয়ে আসলো। সবটুকু দূরত্ব গুছিয়ে একহাতে নাজরাতের পিঠ জড়িয়ে ধরে অন্যহাত রাখলো গালে। উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললো,

‘ নাজরাত! কি হয়েছে? চোখে মুখের এই অবস্থা কেনো? কেঁদেছ তুমি? ‘
হতবিহ্বল নাজরাতের ঘোর কাটলো এবারে৷ যখনই বুঝতে পারলো, সামনের মানুষটা তার ভ্রম নয়। স্বয়ং সাদিফ। তখনই দু’হাতে ঝাপটে ধরলো সে সাদিফকে। প্রসস্থ বুকটাতে আছড়ে পড়ে কেঁদে উঠলো হু হু করে। সাদিফ থম মেরে গেলো এই দৃশ্য দেখে। নাজরাতের কান্নার গতি বাড়লো ধাপে ধাপে। সাদিফ আগলে নিলো তাকে। নাজরাত ক্রন্দনরত, আটকে আসা কন্ঠে একটা কথায় আওড়াতে লাগল,
‘ আপনি আমার কথা না শুনে কেনো চলে গিয়েছিলেন? প্লিজ আমাকে ভুল বুঝবেন না সাদিফ। আমি..আমি আপনাকে ঠকায়নি। আদনানের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক ছিলো না। ভুল বুঝবেন না আমাকে..প্লিজ!!’
স্বান্তনা স্বরূপ নাজরাতের মাথায় হাত বইয়ে দিতে থাকা সাদিফ তাকে শান্ত করতে বলতে লাগলো,

‘ নাজরাত! কুল ডাউন। শান্ত হও। দেখো আমি তোমাকে…
তাকে বলতে না দিয়ে একাধারে বলতেই থাকলো,
‘ আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না সাদিফ প্লিজ। বিশ্বাস করুন, আপনি যা দেখেছেন, যা শুনেছেন। সবটা মিথ্যে ছিলো। আমি… আমি…. ‘
ক্রমান্নয়ে কান্নার ফলে শ্বাস আটকে আসলো তার। সাদিফ জোর করে বুক থেকে মাথাটা তুললো। দুই হাতের মাঝে নাজরাতের মুখশ্রী আগলে জোর কন্ঠে বললো,
‘ আমি বলেছি না চুপ করতে! চুপ করো। আমি শুনব সব৷ শান্ত হও আগে। টেক আ ডিপ ব্রিথ। ‘
নাজরাত শান্ত হলো না। গালের উপর থাকা সাদিফের দুইহাত দুইহাতে চেপে ধরে সে আবারো কান্নারত কন্ঠে বলে উঠলো,

‘ বিশ্বাস করুন, আমার লাইফে আপনি ছাড়া আর কোনো পুরুষের অস্তিত্ব নেই। কেউ ছিলো না। আপনাকে আমি ভালোবাসি সাদিফ। ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি। প্লিজ আমাকে ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিবেন না। এমন হলে আমি.. আমি শেষ হয়ে যাবো। ‘
সাদিফের মুখজুড়ে চমকিত ভাব ধরা দিলো পুণরায়। বিমূঢ় দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইলো সম্মুখের সেই ক্রন্দনরত চোখ দুটোই। বুক কাঁপছে কেনো! দেহের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিহরণ বয়ে চলছে বুঝি? এই অনুভূতি কিসের? প্রাপ্তির? বিস্তৃত হেসে সে নাজরাতের মুখশ্রী আরো কাছে ঠেনে নিলো। বৃদ্ধ আঙ্গুল দ্বারা গাল মুছে কন্ঠে খাদ নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,
‘ কি বললে? আরেকবার বলো। ‘
‘ আমাকে ভুল বুঝ…. ‘

কপালে কপাল ঠেকিয়ে নাজরাত কথা কেটে সাদিফ একই সুরে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ উঁহু! এটার পর কি বলেছিলে? ‘
সাদিফের কন্ঠটা শুনেই ফাঁকা ঢোক গিললো নাজরাত। কন্ঠ কেঁপে উঠলো। তখন ঘোরের মাঝে কি বলেছে ধ্যান ছিলো না। এখন মনে পড়তেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো তার। ঢোক গিলে কম্পিত কন্ঠে বললো,
‘ আ..আমি….. ‘
‘ হুম? ‘
‘ আমি আ..আপনাকে ভ..ভালোব…. ‘

কথাটুকু শেষ করারা আগে তার মুখের সন্নিকটে থাকা অধর যুগল প্রবল বেগে হামলে পড়লো তার অধরে। যেনো আর এক সেকেন্ডের দূরত্বও মেনে নিতে পারলো না সে। আকস্মিক আক্রমণে চোখ খিচে ফেললো নাজরাত। খামচে ধরলো সাদিফের শার্ট। তার কোমড় জড়িয়ে, ঘাড়ের পিছে হাত রেখে আরো বেশি ঘনিষ্ঠ হলো সাদিফ। পুরোপুরি উন্মাদ হলো প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনীর ওষ্ঠসুধা পান করতে। এক দীর্ঘ চুম্বনের সমাপ্তি করে বড় বড় দম নিলো দুজন। নাজরাতের কপালে ভেঁজা ঠোঁট চুমু খেয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো সাদিফ। উৎফুল্ল গলায় বললো,
‘ থ্যাঙ্কিউ। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ নাজরাত। আমি বলে বুঝাতে পারবো না, আমি ঠিক কতোটা খুশি হয়েছি। তোমার মুখে থেকে এই কথাটুকু শুনার জন্য কতোটা ব্যাকুল হয়ে ছিলাম তা প্রকাশ করা মুশকিল। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ। ‘
নাজরাত চোখ বুজে প্রশান্তির শ্বাস ফেললো। কিন্তু তবুও মন ছটফট করছে সাদিফকে সব কথা জানানোর জন্য। সে বুক থেকে মাথা তুললো। দরজায় করাঘাত হলো সে মুহুর্তে। তার মা ডাকছে। সাদিফকে ফ্রেশ হয়ে খেতে আসতে বলছে। নাজরাত দ্রুত বলে উঠলো,

‘ আপনাকে কিছু কথা জানানোর আছে। ‘
সাদিফ হাস্যজ্জল মুখে জবাব দিলো,
‘ আজকে শুনতে ইচ্ছে করছে না। আমার এতো সুন্দর মুডটা নষ্ট করো না প্লিজ। যা শুনার পরে কোনো সময় শুনবো। আপাতত ফ্রেশ হবো। সেই সকালের পর এই অবধি কিছুই খায়নি। বড্ড খিদে পেয়েছে। ”

মুহুর্তেই সব ভুলে সাদিফকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলো নাজরাত। সাদিফের শুকনো মুখ দেখে মায়া লাগল ভীষণ। তার বাবা’র কাপড় এনে দিলো পড়ার জন্য। সাদিফ চট জলদি ফ্রেশ হয়ে আসলো। খেতে বসলো সকলে মিলে। নাজরাতের মা-বাবা, চাচা-চাচি সকলে বারবার অনুরোধ করতে লাগলো যেন রাতটা এখানে কাটিয়ে যায়। নাজরাত লক্ষ্য করলো সাদিফ সকলের আবদার মুখের ঠেলায় না না করলেও জোর গলায় বলছে না যে চলে যাবে। সাদিফের ‘না’ স্থায়ী হলো না শ্বশুর বাড়ির মানুষের আবদারে। কিংবা বলা যায়, সে নিজেই চাইলো না ফিরে যেতে। নাজরাত বেশ বুঝতে পারলো তার চালাকি। ছোট ছোট চোখ করে সে আড়চোখে বার বার তাকিয়ে দেখছিলো সাদিফকে। হাসি যেনো সরছেই না ছেলেটার মুখ থেকে। যেনো রাজ্যের সব সুখ সাদিফের খাতায় লিখে দিয়েছে কেউ।
রুমে প্রবেশ করে বেডে টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো সাদিফ। নাজরাত আসলো খানিক্ষন পর। দরজা লাগিয়ে সে সাদিফের পাশে গিয়ে বসলো। পেটের মধ্যে অনেক কথা ঘুরপ্যাঁচ খাচ্ছে। না বলা অবধি শান্তি পাবে না সেটা জানে সে। তাই ভণিতা ছাড়া বলে উঠলো,

‘ আদনানের ব্যাপারে আপনাকে কিছু বলতে চাই৷ ‘
সাদিফ উপুড় হয়ে শুয়ে ছিলো। নাজরাতের কন্ঠ শুনে এবার চিৎ হয়ে শুল। হ্যাচকা টানে পলকের মধ্যে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো নাজরাতকে। হাত বাড়িয়ে বেড সাইড ল্যাম্প বন্ধ করে দিলো। নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো, ‘ঘুমাও’।
‘ কিন্তু আপনাকে কিছু ব….. ‘
‘ সব শুনবো। কিন্তু এখন না। আমি ক্লান্ত খুব। ঘুমাতে চাই। ‘
বলতে বলতে নাজরাতকে জড়িয়ে নিলো বুকের মাঝে। এবং হুট করেই হাত গলিয়ে দিলো নাজরাতের কামিজের ভাঁজে। পেট ছুঁইয়ে কোমর জড়িয়ে ধরলো। কেঁপে উঠলো নাজরাত। সাদিফের শার্ট খামচে ধরে কম্পিত কন্ঠে ডেকে উঠলো, ‘ স..সাদিফ! ‘
সাদিফ হাসলো। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,

‘ বউ ঘরে না তোলা অবধি বাসর করবো না বলে প্রতিজ্ঞা করেছি৷ কিন্তু তোমার এই কন্ঠ আমার প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গতে চাইছে। চুপচাপ ঘুমাও। নয়তো…. ‘
অর্ধেক কথা বলেই থেমে গেলো সাদিফ। না বলা কথাটুকু বুঝতে পেরে শক্ত করে চোখ বুজল নাজরাত। চোখে ঘুম ধরাও দিলো। দিবে না-ই বা কেনো। ভালোবাসার মানুষটা পরম যত্নে বুকে আগলে রেখেছে তাকে। এর চেয়ে প্রশান্তি অন্য কিছুতে আছে কি?

‘ কাল কি যেন বলতে চেয়েছিলে? এখন বলো। ‘
সবে মাত্র ফ্রেশ হয়ে বের হয়েছে সাদিফ। নাজরাত সাদিফের প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছিল৷ এমন সময় সাদিফের কথাটা শুনে একটুখানি চমকালো সে। সাদিফ তখন বিছানায় এসে বসেছে। নাজরাত তাকাতেই ইশারা করলো পাশে এসে বসার। ধীর পায়ে এগিয়ে পাশে বসলো নাজরাত৷ সাদিফ তার জবাবের আশায় উৎসুক নজরে তাকিয়ে। নাজরাত লম্বা শ্বাস ফেললো। সবটা জানানোর স্বীদ্ধান্ত যখন নিয়েছে। এখন আর বিচলিত হয়ে লাভ নেই। ভেবেই একে একে শুরু থেকে সবটা বলে দিলো সে। সাদিফ শুধু শুনেই গেল নিশ্চুপ হয়ে। কথা শেষ করে নাজরাত তাকালো সাদিফের শান্ত মুখখানা’র দিকে৷ গত কালকের মতো আজও এই মুখে কোনো কিছুর আভাস নেই । অত্যাধিক শীতল কন্ঠে সে জানতে চাইলো,

‘ কাল আদনানের সাথে দেখা করতে কেনো গিয়েছিলে? ‘
নাজরাত ফাঁকা ঢোক গিলে জবাব দিলো,
‘ অনেক দিন যাবত বিরক্ত করছিলো বলে, ভেবেছিলাম সামনাসামনি বসে বোঝালে হয়তো বুঝবে। কিন্তু এমন কিছু করবে সেটা ভাবিনি৷ ‘
সাদিফ নিশ্চুপ। নাজরাত বিষন্ন গলায় পুণরায় বলে উঠলো,
‘ ওর সাথে আমার কখনো বন্ধুত্বের বাইরে কোন সম্পর্ক ছিলো না। আমি কখনো কল্পনাও করিনি আদনান আমাকে পছন্দ পারে কিংবা এমন কিছু। কাল..কাল আপনাকে দেখে ও ইচ্ছে করেই জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলেছিলো। আপনি যা দেখেছেন তা বিশ্বাস করে আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চলে গিয়েছিলেন৷ অথচ সবটা মিথ্যে ছিল। ‘

‘ তোমাকে কে বললো আমি ওসব বিশ্বাস করেছি? ‘
চমকিত নজরে তাকালো নাজরাত। বললো,
‘ তাহলে আমার দিকে একটাবার তাকালেন না কেনো? আমি ডেকেছি শুনেও দাড়ান নি৷ কতশত ফোন করেছি হিসেব নেই। রেসপন্স করেননি কোনো? ‘
বলতে বলতে কন্ঠ কেঁপে উঠলো তার। সাদিফ পূর্ণ দৃষ্টি ফেলল তার দিকে। কন্ঠে খাদ নামিয়ে বললো,

‘ অভিমান হয়েছিলো তোমার উপর। আদনান যে ইচ্ছে করেই আমাকে দেখার পর তোমাকে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলেছিলো, সেটা আমি তখনই বুঝেছিলাম। আমি তোমাকে অবিশ্বাস করিনি এক সেকেন্ডের জন্যও। আমি জানি তুমি কেমন। আমার শুধু অভিমান জমেছিল এটা ভেবে যে, এতোদিন ধরে তুমি এসব ফেস করছো। অথচ আমাকে একটাবারের জন্যও জানালে না কিছু। এর আগেও একবার ফোনকলে আদনানকে নিয়ে কিছু বলেছিলে তুমি। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। তুমি সেদিনও জানাওনি কিছু। তোমার ব্যাপারে এটুকু জানার অধিকার তুমি দাওনি এখনো আমাকে? ‘

‘ আপনি ভুল বুঝছেন সাদিফ। আমি বলিনি কারণ আমি ভেবেছিলাম আদনান হয়তো আমার সাড়া না পেয়ে দমে যাবে। সেটা যখন হলো না, তখন ভাবলাম সামনে থেকে বুঝিয়ে বললে হয়তো বুঝবে। ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছি আমরা। আমি চাইনি ও কারো চোখে খারাপ হোক। কিন্তু কালকেও যা করলো, সেটা দেখে আমার ঘৃণা করছে ওকে নিজের বন্ধু ভাবতেও। ‘
হাত বাড়িয়ে নাজরাতকে কাছে টেনে নিলো সাদিফ। বললো,
‘ কাল জরুরি মিটিংয়ের জন্যই সেই রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। ফোন সাইলেন্ট ছিলো। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পুণরায় অফিসে গিয়ে পরপর আরো দুটো মিটিং হ্যান্ডেল করেছি। এই ফাঁকে মোবাইলের দিকে নজরই ছিলো না। আমি ভেবে রেখেছিলাম কাজ শেষে এখানে এসে তোমার সাথে দেখা করবো। কিন্তু তুমি এতোটা অস্থির হয়ে পড়বে সেটা ভাবিনি। সরি। ‘

‘ আর কখনো এমন করবেন না প্লিজ। আপনার অবহেলা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই । কাছে থেকে যা ইচ্ছে শাস্তি দিন। তবুও কখনো অবহেলা করবেন না। ‘
দৃষ্টি নত করে নাজরাতের মুখখানা সন্তুষ্টি নজরে দেখল সাদিফ। বক্ষস্থলে সুখ সুখ এক অনুভূতির জোয়ার বয়ে গেল যেন। জীবনের সবচেয়ে বড় পূর্ণতা তার বাহু বন্ধনে। এর চেয়ে অধিক প্রত্যাশা কিছুতেই নেই। প্রশান্তির সহিত হাসল সে। বলল,

‘ এই প্রথম, এই শেষ। জেনে হোক বা অজান্তে, আর কখনো অবহেলা করবো না। বিন্দু পরিমাণও না। কালকের জন্য এক্সট্রিমলি সরি। ‘
সাদিফের বুকে মাথা রেখে নাজরাত জবাব দিলো,
‘ আমিও সরি। আর কখনো আপনার কাছ থেকে কিছু লুকাবো না। ‘
‘ এখন কি সরি সরি জপ করতে থাকবে? না খাবারও দিবে? আমার লেট হচ্ছে। ‘
নাজরাতকে ছাড়তে ছাড়তে একথা বললো সাদিফ। সেটা শুনেই জিহ্ব কামড়াল নাজরাত। তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো। সাদিফকে আসতে বলে নিজেই ছুটে বেরিয়ে গেলো আগে আগে। পেছন থেকে সাদিফ তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে হাসলো শুধু।

ফাঁকা রাস্তা। সায়েরী বের হয়েছিল কলেজের উদ্দেশ্যে। ঘর থেকে কিছু পথ হেঁটে মেইন রোডে গেলেই গাড়ি পাওয়া যায়। সচরাচর তার ঘরের সামনে থেকে গাড়ি পাওয়া মুশকিল। নিরিবিলি পথ ধরে হাঁটছে সে। এক কাঁধে ঝুলছে ব্যাগ। হাতে দু’টো পাউরুটি একত্রে লাগানো। যার মাঝে নাটেলা লাগানো। বরাবরের মতোই ঘুম থেকে দেরিতে উঠে তাড়াহুড়ো করে বের হচ্ছিল সে। তখনই মেহরিন বেগম নাটেলা লাগানো পাউরুটি ধরিয়ে দিয়েছে তার হাতে। বোতলে পানি ভরে ঢুকিয়ে দিয়েছে ব্যাগে। জোর না করলে মেয়েটা খাবে না জানেন তিনি। তাই রোজ সকাল বিকাল দুই মেয়ের পিছে ছুটতে হয় তাকে। বড় বড় দুই তিন কামড় দিয়ে পাউরুটি সম্পূর্ণ মুখের ভিতর ঠেসে নিলো সায়েরী। পায়ের গতি বাড়ালো।

আজ লেট হওয়া যাবে না। পরীক্ষার আগে আজ কিছু গুরুত্বপূর্ণ টপিক কালেক্ট করে নিতে হবে। যদিও আয়ান সব কালেক্ট করে রেখেছে তার জন্য। তবুও দেরি হলে নির্ঘাত শূলে চড়াবে তাকে বন্ধুরা। ভাবনার মাঝে আচমকা কাঁধের একপাশে ঝুলতে থাকা ব্যাগটা টান মারলো কেউ। ছিনিয়ে নিলো তার কাছ থেকে। আচমকা আক্রমণে সায়েরী হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলো রাস্তায়। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখলো ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া ছেলেটা দৌড়ে পালাচ্ছে। বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে থাকা সায়েরী গাল ভর্তি খাবার নিয়ে চিৎকার করেও ব্যর্থ হলো। নিজেকে ধাতস্থ করে সেও ছুটল পিছু পিছু৷ বেশিদূর এগোতে হলো না তাকে। তার আগেই ব্যাগ নিয়ে ছুটতে থাকা ছেলেটার সামনে একজন যুবতী মেয়ে এসে টান মেরে ছিনিয়ে নিলো ব্যাগটা। ছেলেটাকে ধরার আগেই মেয়েটাকে ধাক্কা মেরে জান বাঁচিয়ে পালালো ছেলেটা। মেয়েটা পড়তে গিয়েও সামলে নিলো নিজেকে। সায়েরী ছুটে আসলো সেকেন্ড পাঁচেক পর। হাঁপিয়ে উঠেছে সে। বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে ধাতস্থ করে কৃতজ্ঞতা জানালো সে মেয়েটাকে। মেয়েটা হেসে জবাব দিলো,

‘ ইট’স ওকে। আমি দূর থেকে দেখেছিলাম তোমাদের। তাই তো ধরতে পারলাম। নয়তো ব্যাগ নিয়ে কোথায় পালাতো ঠেরও পেতে না। ‘
‘ থ্যাঙ্কিউ। আসলে আমি বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে। এর আগে কখনো হয়নি এমন। এই এলাকায় এমন খোলাখুলিভাবে এই ধরণের ঘটনা ঘটেনা বললেই চলে৷ আজ হঠাৎ…. ‘
চিন্তায় পড়ে গেলো সায়েরী। তার সামনের বাইশ তেইশ বছর বয়সী মেয়েটা তাকে পরখ করে বললো,
‘ কলেজে যাচ্ছো নাকি? ‘
‘ হ্যাঁ। ‘
‘ আমার সাথে চলো। আমি নামিয়ে দেই। ‘
‘ না, না। আমি চলে যেতে পারব। এই তো সামনের রোডে গেলেই গাড়ি পেয়ে যাবো। ‘

‘ তা ঠিক আছে। কিন্তু দশটা থেকে যদি ক্লাস টাইম হয়ে থাকে তাহলে তুমি অলরেডি অনেক লেট। গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে গেলে আরো বেশি লেট হয়ে যাবে৷ এরচেয়ে বরং আমি নামিয়ে দেই, চলো। ‘
সায়েরী ভেবে দেখল আসলেই অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। অগত্যা মেয়েটার কথামতো সে গিয়ে বসলো কাছে অবস্থানরত গাড়িতে। সামনের সিটে ড্রাইভার বসা। সায়েরীর পাশে মেয়েটা এসে বসলো। গাড়ি স্টার্ট হতেই মেয়েটা পানির বোতল এগিয়ে দিলো সায়েরী’র দিকে। বলল,

‘ হাঁপিয়ে গেছো তুমি। পানি খাও। ভাল লাগবে। ‘
বিনা জবাবে বোতলটা নিয়ে ঢকঢক করে অর্ধেকের বেশি পানি সাবাড় করে ফেললো সায়েরী। সত্যিই অনেক হাঁপিয়ে উঠেছে সে। পানি খেয়ে সে লম্বা দম নিলো। গা এলিয়ে বসলো সিটে। মিনিট পেরুতেই ঘুমে ঢুলু ঢুলু হয়ে উঠলো চোখজোড়া। সায়েরী চেয়েও ঘুমের রেশ কাটাতে পারলো না। নিজের উপর নিজেরই বিরক্ত লাগতে লাগলো। কেনো এতোটা ঘুমকাতুরে সে! শত বাঁধা উপেক্ষা করে শেষ অবধি জানলায় মাথা ঠেকিয়ে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো গভীর ঘুমে।
পাশে অবস্থানরত মেয়েটা সুক্ষ্ম চোখে পরখ করলো সবই। সায়েরীকে ঘুমিয়ে যেতে দেখে সে এবার সে ডেকে উঠলো সরাসরি নাম ধরে। সায়েরীর সাড়া না বাঁকা হাসলো। ব্যাগ হাতড়ে সায়েরীর মোবাইল বের করে সুইচড অফ করে দিলো সেটা। এরপর নিজের মোবাইল বের করে ছবি তুলে নিলো সায়েরীর ঘুমন্ত মুখের। তারপর পাঠালো একজনকে। সেই সাথে একটা খুদে বার্তা লিখল, ‘কাজ হয়ে গেছে।’

ছবি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপাশ থেকে জবাব আসলো। ‘গুড জব।’
মেয়েটা হাসলো। মোবাইল পুণরায় ব্যাগে ঢুকিয়ে সায়েরীর দিকে তাকালো। ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘ কেমন বোকা মেয়ে দেখেছ? একটুখানি সহানুভূতি দেখালাম আর আমাকে বিশ্বাস করে ফেললো। আমি ভেবেছিলাম একে বাগে আনতে কষ্ট হবে। কিন্তু স্যারের কথাটায় মিলে গেলো দেখি। এই মেয়ে অতিমাত্রায় বোকা। যাক, আমার কাজ সহজ হয়ে গেলো । হা হা হা। ‘

মনযোগ সহকারে ড্রাইভ করতে থাকা মাঝবয়সী লোকটা লুকিং গ্লাসের মাধ্যমে সায়েরীর দিকে একনজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। মনে মনে বললো,
‘ বোকা নয়। বরং মেয়েটা প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সহজ সরল। খুব সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করে ফেলে এরা। কিন্তু দিনশেষে এধরণের মানুষদেরই ঠকতে হয় বেশি। তাও আবার আপন মানুষদের কাছে। যে মানুষদের উপর তাদের বিশ্বাস, আস্তা সবচেয়ে বেশি থাকে। তারাই ঠকায় বাজেভাবে। ‘

তৌসিফ চৌধুরী’র অফিসে, নিজের কেবিন রুমের চেয়ারে আয়েশ করে বসে আছে তাশরীফ। হাতের মোবাইলে ঝলঝল করা সায়েরীর ঘুমন্ত ছবিটা দেখে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো সে। আঙ্গুল চালিয়ে ছবিটা পাঠালো নির্দিষ্ট একজনের নাম্বারে। যেটা ‘জুনিয়র খান সাহেব’ নামে সেভ করা। অনেকটা বিদ্রুপ নিয়েই নামটা সেভ করেছে সে। ছবি ডেলিভার হলো৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সিনও করে ফেললো অপর প্রান্তের মানুষটা। মনে হলো যেন মোবাইল নিয়ে সে তাশরীফের মেসেজ কিংবা কল এর আশায় বসে ছিল। মিনিট দুয়েক পার হওয়ার পরেও উপাশের মানুষটার কোনো হেলদোল না পেয়ে এবার নিজ থেকেই কল লাগালো তাশরীফ। রিং হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কল রিসিভ হলো। এমন আচরণে তাশরীফ একটু অবাক হলো বটে। ফোন লাউডে রেখে সে অপেক্ষা করলো অপর প্রান্তের মানুষটার রাগী,অস্থির কন্ঠের কয়েকটা বাণী শুনার। কিন্তু এমন কিছুই হলো না। পিনপতন নীরবতা বাদে কিছুই কানে আসলো না। এই পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে সে নিজেই বলে উঠলো,

‘ প্রেমিকার শোকে বোবা বনে গিয়েছো নাকি জুনিয়র খান! মাথা কাজ করছে না? হয়তো ভাবতেই পারো নি আমি হুট করে এমন কিছু করবো, তাইনা? ‘
এবারেও জবাব আসলো না কোনো। তাশরীফ জানে অপর পাশের মানুষটা শুনছে সব। কারণ তার নিশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট কানে বাজছে তার। জবাবের আশায় না থেকে সে পুণরায় বলে উঠলো,
‘ তবে যা-ই বল। তোর প্রেমিকা হিসেবে মেয়েটা বড্ড মাথামোটা হয়ে গেলো। এতো সরলতা নিয়ে জীবন চলে? হুহ? আজ আমি তুলে আনলাম। কাল যদি অন্য কেউ…। বুঝা যাচ্ছে তো কি বলতে চাইছি? ‘

‘ আচ্ছা। জবাব দিতে হবে না। পারলে নিজের দমে প্রেমিকাকে খুঁজে দেখা। তাড়াহুড়ো করার কোনো প্রয়োজন নেই। আজ সারাদিন সময় আছে। আস্তে ধীরে খোঁজ। ততক্ষণে তোর প্রেমিকাকে আমিও একটু মন ভরে দে…… ‘
‘ তাশরীফ!!!!! ‘
অপ্রত্যাশিত হুংকারে কেঁপে উঠলো তাশরীফ। হাত ফসকে মোবাইল পড়ে গেলো ফ্লোরে। গ্লাস ফেটে চুরচুর হলো। তাশরীফ বিমূঢ় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকাতে পুণরায় ভেসে আসলো রাগ্বত স্বর,
‘ ঘড়ি ধরে তিরিশ মিনিট অপেক্ষা কর। তিরিশ মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগেই তোর সামনে থেকে সুবহা’কে নিয়ে ফিরবো। আই ডেয়ার ইউ, যোগ্যতা থাকলে আটকিয়ে দেখা। ‘

কথা শেষ হওয়া মাত্র কল ডিসকানেকটেড হয়ে গেলো। হতবাক তাশরীফ কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুঝে উঠতে পারলো না কিছু। যখন তার মস্তিষ্ক ধারণ করতে পারলো কথাগুলো, অমনি যে ব্যস্ত হাতে মোবাইল তুলে নিলো। ত্রিশ মিনিট! ত্রিশ মিনিটের মধ্যে কীভাবে উদ্ধার করবে? তাশরীফের লোক সায়েরীকে তুলে এনেছে প্রায় দুই ঘন্টা আগে। সে ইচ্ছে করেই এতো দেরি করে সাফওয়ানকে খবর দিয়েছে। সাফওয়ান খবর পাওয়ার আগেই যাতে কাঙ্ক্ষিত ঠিকানায় সায়েরীকে নিয়ে পৌঁছে যায় তার লোক। যায়গাটা খুব দূরে নয়। তবে জন মানবহীন। খুঁজে পেতে সারাদিন লেগে যাওয়ার কথা। সেখানে সাফওয়ান এতোটা দৃঢ় গলায় তাকে বলছে ত্রিশ মিনিটের কথা?

আজ চারদিন হতে চললো সাফওয়ানকে চিঠি পাঠানোর। তার ধারণা ছিল সাফওয়ান হয়তো রাগে উন্মাদ হয়ে তাশরীফকে হুমকি ধামকি দিবে, কিংবা আক্রমণ করবে। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সাফওয়ান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না আজ অবধি। তাশরীফ আশা করেছিল, সাফওয়ানের নেওয়া একটা ভুল পদক্ষেপ কে কেন্দ্র করে নওশাদ খান’কে নমিনেশন দিয়ে দেওয়ার রাস্তা পেয়ে যাবে। কিন্তু সেটা যখন হলো না, তখন সে বাধ্য হয়ে তুলে আনলো সায়েরীকে। যার জন্য কোনো কাঠখড় পোড়াতে হলো না। আশ্চর্য হলো এই ভেবে যে, সাফওয়ানকে সতর্ক করা সত্ত্বেও সে সায়েরীকে কোনো নিরাপত্তায় রাখেনি। এবং সায়েরী কিডন্যাপ হয়েছে জেনেও সাফওয়ান শান্ত হয়ে আছে। এসব কি কাকতালীয় ব্যাপার? না সাফওয়ান নামক মানুষটা শান্ত মস্তিষ্কে কোনো চক কষেছে তাকে হারানোর জন্য? ভাবনাটা মাথায় আসতেই চঞ্চল হয়ে উঠলো সে। দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো নির্দিষ্ট স্থান টার উদ্দেশ্য। সাফওয়ানের আগেই পৌঁছাতে হবে তাকে। কিন্তু সাফওয়ান ত্রিশ মিনিটের মাথায় পৌঁছাবে কি করে? সে কীভাবে জানলো সায়েরী কোথায় আছে? জেনে থাকলে, এতো ঘন্টা চুপ ছিলো কেনো? কেনো????

সর্বোচ্চ গতিতে গাড়ি চালানোর পর প্রায় ত্রিশ মিনিট সময় লাগিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছাল তাশরীফ। কাছাকাছি আসতেই সামনের দৃশ্যটুকু দেখে প্রথমে কপালে ভাঁজ পড়লো তার। পরবর্তীতে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করার পর সে চমকে উঠলো। তার সম্মুখে মাটির কাঁচা রাস্তা ব্লক করে দাঁড়িয়ে আছে ব্লাক স্করপিউ কার। দুই পাশে অবস্থানরত মোট তিনটে বাইক। প্রতিটা বাইকে একজন করে বসে আছে যেন-তেন ভাবে। সকলের হাতে মোবাইল। দৃষ্টি সেদিকেই স্থির। বাইক তিনটার মাঝখানে মধ্যমণি হয়ে দাঁড়ানো গাড়িটির সামনের বনাটের উপর আধশোয়া অবস্থায় রয়েছে সাফওয়ান।

এক পা লম্বা করে দিয়ে এবং অন্যটা গুটিয়ে বেশ আয়েসি ভঙ্গিতে বসে আছে সে। তার হাতেও মোবাইল। চোখে কালো রোদচশমা। বারে বারে চোয়াল নাড়িয়ে কিছু একটা চিবিয়ে চলেছে সে। সম্ভবত চুইংগাম। সাফওয়ান সহ উপস্থিত তার তিন বন্ধুকে দেখে রীতিমতো ভড়কে গেলো তাশরীফ। এরা এখানে কি করে এলো? তাও আবার তার আগে? প্রশ্নগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো তার। গাড়ি থামিয়ে নেমে দাঁড়াতেই মাথা তুলে তাকালো সাফওয়ান। তাশরীফকে দেখে চমৎকার করে হাসলো। যা দেখে হকচকিয়ে গেলো তাশরীফ। সাফওয়ানের এমন উদ্ভট ব্যাবহারের কারণ খুঁজে পেলো না সে। তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে এক লাফে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো সাফওয়ান। চশমাটা গাড়ির উপরে রেখে দুইহাত প্রসারিত করে আলসেমি ঝাড়ল। এরপর কদম এগিয়ে নিতে নিতে নিজের বাম হাতে থাকা অ্যাপল ওয়াচে সময় দেখে শব্দ করে কাউন্ট ডাউন শুরু করলো,

‘ ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু… টাইম আপ! ‘
বলতে বলতে ঠিক তাশরীফের মুখোমুখি হাজির হলো সে। তাশরীফের বিমূঢ় মুখশ্রী দেখে তীর্যক হাসলো। ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বললো,
‘ আমাকে জায়গা খুঁজে নিতে বলে নিজেই ঠিকানা ভুলে গেছিলি নাকি? গুনে গুনে ৭ মিনিট লেট। সে যা-ই হোক। আমার বাচ্চা প্রেমিকা-টা কোথায়? ‘
বলেই আশেপাশে তাকালো সে। একনজর বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে উঁচু কন্ঠে জানতে চাইলো, কোথায়?
তারা কাঁধ নেড়ে বুঝালো জানে না। এতোক্ষণ বিচলিত হয়ে থাকা তাশরীফ এবার বোধহয় স্বস্তি পেলো কিছুটা। যাক, সায়েরীকে তবে খুঁজে পায়নি এখনো। এতেই শান্তি। ফিচেল হেসে সে বলে উঠলো,
‘ সময়ের আগে পৌঁছে আর লাভটা কি হলো। তোর প্রেমিকা এখনো আমার দখলে। পারলে খুঁজে বের কর। ঠিকানা পেয়ে গেলে কি হবে? এই বাড়িগুলোর মধ্যে কোন জায়গায় ওকে রেখেছে আমার লোক, সেটা খুঁজে পেতেই তো অর্ধেক দিন পেরিয়ে যাবে। ‘

সাফওয়ান চুপ হয়ে কি যেন ভাবলো। তাশরীফ বুঝল, সাফওয়ান দমে গিয়েছে। এবার নিশ্চয় নত হবে তার কাছে। কিন্তু তাকে এবারেও ভুল প্রমাণ করে সাফওয়ান দায়সারা ভাব নিয়ে বললো,
‘ কথাটা ভুল বলিসনি। দিনের অর্ধেক ওয়েস্ট করার মতো সময় আমার নেই। তার চেয়ে বরং একটা ডিল করি চল। আমি তোকে কিছু মূল্যবান গিফট দিচ্ছি। বিনিময়ে আমাকে সুবহা’র খোঁজ দে। ‘
তাশরীফের উত্তরের অপেক্ষা না করে সে জিমনকে ইশারা করলো কিছু। ইঙ্গিত বুঝে জিমন সাফওয়ানের গাড়ির ভিতর থেকে একটা গিফট বক্স বের করলো। তাশরীফের চিনতে ভুল হলো না। এটা তারই পাঠানো গিফট বক্স। ভ্রুঁ কুঁচকে সে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। জিমনের কাছ থেকে বক্সটা নিয়ে তাশরীফের দিকে বাড়িয়ে দিলো সাফওয়ান। তাড়া দিলো খোলার জন্য। অনিচ্ছা স্বত্তেও তাশরীফ বক্সটা হাতে নিয়ে খুলল সেটা। ভেতরে চোখ যেতেই বিষ্ময়ে বৃহৎ আকার ধারণ করলো তার চোখজোড়া। রক্তশূণ্য হলো মুখশ্রী। অন্যদিকে সাফওয়ান ফিসফিস কন্ঠে সুধাল,

” সারপ্রাইজ! ”
হতবাক তাশরীফ একনজর তাকিয়ে পুণরায় বন্ধ করে দিলো বক্সটা৷ আশ্চর্য কন্ঠে বললো,
‘ এ..এসব! এসব কোথায় পেলি? ক..কে দিয়েছে? ‘
অস্থিরতায় কন্ঠস্বর কেঁপে উঠলো তার। যা শুনে তৃপ্তি পেলো সাফওয়ান। এতোক্ষণের রসিকতা ছেড়ে এবার গম্ভীর হলো তার মুখশ্রী। আরেকটু কাছাকাছি এসে সে চোখে চোখ রেখে বললো,
‘ অন্যের দুর্বলতায় আঘাত করার খুব শখ না তোর? এই ইচ্ছেটা পূরণ করতেই এসব নিয়ে আসলাম। সারপ্রাইজ গিফট। কেনো? পছন্দ হয়নি? ‘

‘ বাজে কথা রেখে সত্যি করে বল এসব কোথায় পেলি তুই? কার সাথে হাত মিলিয়েছিস? কার এতো বড় স্পর্ধা হয়েছে যে তাশরীফ চৌধুরী’র সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে? ‘
সাফওয়ান বাঁকা হেসে তাশরীফের মুখোমুখি হয়ে জবাব দিলো,
‘ টাকার কাছে সবাই নত হতে বাধ্য। সে চাকর বাকর হোক কিংবা পুরনো প্রেমিকা। টাকার কাছে সবই হার মানে৷ বিশ্বাস না হলে তোর হাতের গিফট গুলোই দেখে নে। ‘
আরো একদফা আশ্চর্য হলো তাশরীফ। রাগে জ্বলে উঠলো চোখ মুখ। সাফওয়ান দেখেও পাত্তা দিলো না সেদিকে। বরং দায়সারা ভাব নিয়ে বললো,

‘ সামনে ইলেকশন। আমার বাবাকে আগে থেকেই সরানোর জন্য আমাকে টার্গেট করেছিলি তাইনা? কিন্তু দেখ, তোকে আর তোর বাবাকে রাস্তা থেকে সরানোর অনেক বড় একটা চান্স পেয়ে হাতিয়ে নিলাম আমি। কিন্তু আমি তোর মতো ছলচাতুরী করবো না। সামনে থেকে লড়াই করার মতো যোগ্যতা নওশাদ খান’র আছে। এবার আমিও দেখতে চাই। শেষ অবধি কার অহংকারের জয় হয়৷ তাশরীফ চৌধুরী? না তেহজিব খান?? ‘

কথাটা বলেই উলটো পথে হাঁটা ধরলো সে৷ পেছনে রাগে ফুঁসতে থাকা তাশরীফ তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে আরো একবার খুলে দেখলো বক্সটা। ভেতরে রয়েছে কয়েকটা ছবি৷ ছবিগুলো অবশ্যই তাশরীফের। তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে গত পরশু রাতে হোটেল রুমে কাটানো অন্তরঙ্গ মুহুর্তের ছবি। যা দেখে রাগে শরীর কেঁপে উঠছে তার। মেয়েটার সাথে তার যোগাযোগ নেই বহুদিন ধরে৷ হুট করেই দুদিন আগে উদয় হলো সে৷ নিজ থেকেই তাশরীফের সান্নিধ্য নিলো। যেহেতু সম্পর্কটা আগে থেকেই এমন খোলামেলা, তাই তাশরীফ বেশি কিছু ভাবে নি। সাড়া দিয়েছিল প্রেমিকার ডাকে। কিন্তু কে জানতো, টাকায় গা ভাসিয়ে মেয়েটা তার সুযোগ নিয়েছে৷ এজন্যই তবে সাফওয়ান চুপচাপ ছিলো এই চারদিন? ভিতরে ভিতরে সে নিজেই তাশরীফের দুর্বলতা খুঁজে এভাবে লাগাম টানলো! এই ছবিগুলোর মধ্যে হতে একটাও জনসম্মুখে আসলে বিরাট ঝামেলা হয়ে যাবে। তার সাথে সাথে তৌসিফ চৌধুরীর মান সম্মান জড়িত এখানে। তাই বহু কষ্টে ভিতরের রাগগুলো দমিয়ে রাখলো তাশরীফ। তবুও মানতে পারলো না নিজের এই ব্যার্থতা। এই আটাশ বছরের জীবনে এতোটা অপদস্ত আর কখনো হয়নি সে। আজ কিনা নিজের থেকে বছর চারেকের ছোট এক ছেলে তাকে এভাবে হারিয়ে দিলো!

বিশাল এক রেইনট্রি গাছের নিচে সাদা রঙের একটি গাড়ি দাড়ানো। গাড়ির সামনে পাহারারত অবস্থায় আছে মাঝ বয়সী একজন ড্রাইভার। সাফওয়ান সহ তার বন্ধুদের আসতে দেখে সে এগিয়ে গেলো। মাথা ঝুঁকিয়ে সালাম জানাল। সাফওয়ান আশেপাশে তাকিয়ে জানতে চাইলো,
‘ তোমার ম্যাডাম কোথায়? ‘
‘ ম্যাডাম গাড়িতেই আছে স্যার। যখন থেকে কিডন্যাপ করেছে তখন থেকেই উনি গাড়িতে। ‘
কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো সাফওয়ানের। সায়েরী যদি এখানে থেকে থাকে, তবে এতোটা নিরবতা ছেয়ে আছে কেনো এই জায়গায়? চিন্তিত কন্ঠে সে সামনের দিকে এগুতে এগুতে বললো,

‘ ঠিক আছে তো? ‘
‘ একদম ঠিক আছে স্যার। শুধু…. ‘
‘ কি? কোনো সমস্যা হয়েছে? কেউ এসেছিল? অন্য কোনো ছেলে? আর মেয়েটা কে ছিলো? ‘
‘ না না স্যার। কেউ আসেনি। আসার কথা থাকলেও আমি সামলে নিয়েছি। আর মেয়েটাকে ভাড়া করা হয়েছিলো। সে অনেক আগেই টাকা নিয়ে চলে গিয়েছে। ‘
‘ তো? সমস্যা হয়েছে কোথায়? ‘ সাফওয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল।
‘ আসলে হয়েছে কি…আমি যতটুকু জানি ওরা ম্যাডামকে ঘুমের ঔষধ মেশানো পানি খাইয়েছিল। হাই ডোজ ছিল না৷ বেশি হলে এক ঘন্টা মতো ঘুমিয়ে থাকতো। কিন্তু এখন তো তিন ঘন্টা হয়ে গেল৷ ম্যাডাম এখনো ঘুমাচ্ছে। আমি ডেকেছিলাম দুইবার। নড়েচড়ে আবারো ঘুম দিয়েছে। উঠছেনা। ‘
সিরিয়াস মুহুর্তে এমন কথাগুলো শুনে হেসে ফেললো জিমন, মিহাদ এবং রায়ান। সাফওয়ান নিজেও ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি আটকালো। মিহাদ কৌতুক গলায় বললো,

‘ নে ভাই। যার জন্য চারদিন ধরে অস্থির হয়ে এতো কিছু করেছিস। সে ম্যাডাম নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। কি জুটি এদের! একজন দিন দুনিয়ে উলটে ফেললেও অন্যজন খবর পায়না। বলি ভালোবাসাটা আর বুঝবে কবে তোর বাচ্চা প্রেমিকা? সে বুঝদার হতে হতে আবার তুই না বুড়ো হয়ে যাস। ‘
মিহাদের কথা শুনে সাফওয়ান ব্যাতিত বাকি তিনজন হেসে উঠলো। সাফওয়ান কড়া চোখে তাকালো মিহাদের দিকে। চুপ হয়ে গেল মিহাদ। সাফওয়ান কথা না বাড়িয়ে গাড়ির দিকে এগুল। বাকিরা ফিরে গেল যার যার স্থানে৷ সাফওয়ান গাড়ির ব্যাক ডোর খুলতেই চোখের সামনে ধরা দিলো সায়েরী’র ঘুমন্ত মুখশ্রী। বুকজুড়ে শীতল অনুভূতি বয়ে গেল যেন৷ প্রশান্তিতে ভরে উঠলো অস্থির হৃদয়। যত শক্ত থাকুক না কেনো উপর উপর দিয়ে। এই দুই, তিন ঘন্টা গুলো ভিতরে ভিতরে কতোটা অস্থির হয়ে ছিল, তা একমাত্র সে জানে। অবশেষে সুস্থ শরীরে সায়েরীর দেখা পেয়ে চক্ষু শীতল হলো তার। লম্বা শ্বাস ফেলে ঝুঁকল সায়েরীর মুখোমুখি। মৃদু কন্ঠে ডাকল, ‘ সুবহা! ‘
পরপর দুইবার ডাকার পর নড়েচড়ে উঠলো সায়েরী। মুখ দিয়ে বিরক্ত সূচক শব্দ তুলে, কপাল কুঁচকে ঘুমু ঘুমু কন্ঠে বললো,

‘ আম্মু! আর প..পাঁচ মমিনি..ট ঘুমাতে দা… ‘
সম্পূর্ণ কথাটুকু শেষ করতে না পেরে পুণরায় ঘুমে তলিয়ে গেল সে। তার ঘুমু ঘুমু কন্ঠটা শুনে সাফওয়ান থমকাল। হৃদস্পন্দন কাঁপল বোধহয় এই কম্পিত কন্ঠে। ঘুমন্ত কন্ঠ এতোটা আদুরে হয় বুজি! আশ্চর্য চোখে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ান। সায়েরী নড়তে গিয়ে হেলে পড়লো সাফওয়ানের বাহুতে। সরাসরি তার মাথা গিয়ে ঠেকল সাফওয়ানের উন্মুক্ত পেশিবহুল বাহুর মাঝে। হাফ হাতা টি-শার্ট পড়ায় দৃশ্যমান হয়ে আছে তার শক্তপোক্ত বাইসেপ্স দুটো।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৩৭+৩৮

সায়েরী উষ্ণতা পেয়ে নরম হাতে জড়িয়ে ধরলো এক বাহু। আলো থেকে বাঁচতে চোখ কুঁচকে নাক,মুখ,ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো সাফওয়ান উন্মুক্ত পেশিবহুল বাহুতে। তার উষ্ণ, নরম ঠোঁটজোড়ার ছোঁয়ায় সাফওয়ানের শিরা উপশিরা অবধি কেঁপে উঠলো যেন। শরীরের পশম দাঁড়িয়ে গেল। মুষ্টিবদ্ধ হলো হাত। চোখ বুজে অজান্তেই সে মুখ নামিয়ে আনলো বাহুতে থাকা মানুষটার চুলের ভাঁজে। লম্বা শ্বাস টেনে স্বগতোক্তি করলো,
‘ এই মেয়ে আমার প্রাণ নিয়েই হার মানবে। ‘

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৪১+৪২