অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮১
সাজিয়া জাহান সুবহা
শুভ্র রঙের নতুন শার্ট-টা গায়ে জড়ানোর পূর্বে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিলো সাফওয়ান। লার্জ সাইজ। ঠিক ঠিক তার মাপের। বোতাম সব খুলে যেই না শার্ট-টা গায়ে জড়াবে, এমন সময় হঠাৎ তার দৃষ্টি পড়লো শার্টের কলারের নিচে। ভালো ভাবে কলার মেলে ধরলে খেয়াল করলো, ওখানটাতে স্পষ্ট একজোড়া ঠোঁটের ছাপ বসানো। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, লিপস্টিক স্টেইন। সাফওয়ান এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। পরমুহূর্তে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হেসে ফেললো। শুকনো ঠোঁট জোড়া নিঃশব্দে ছুঁয়ে দিলো মেয়েলি ঠোঁটের চিহ্নের উপর। অতঃপর, শার্ট পরে পরিপাটি হয়ে নিলো। কড়া পারফিউম মেখে নিজের এ্যাপল ওয়াচটা হাতে নিয়ে বের হলো রুম থেকে। সায়েরীকে খোঁজার উদ্দেশ্যে নিচে নামবে ভেবেছিলো। কিন্তু দেখলো মেয়েটা ছাদে উঠার সিড়ির কাছটায় দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে কিছু শপিং ব্যাগ, অন্য হাতে শাড়ির কুচি সামলিয়ে সিড়ি বেয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে সে। শার্টের হাতা কনুই অবধি গুটিয়ে এগিয়ে এলো সাফওয়ান। বিনা বাক্যে চট করে পাজা কোলে তুলে নিলো মেয়েলি দেহটি। আকস্মিক এমন হওয়ায় সায়েরী চমকে উঠে খামচে ধরলো সাফওয়ানের দুই কাঁধ। সাফওয়ান লম্বা কদমে এগিয়ে বলে উঠলো,
‘ সামলাতে পারো না তবুও শাড়ি পরেছ কেনো? ‘
‘ আপনাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। ‘ -সায়েরীর অকপট স্বীকারোক্তি।
সাফওয়ানের কদম থমকায়। দৃষ্টি নত করে তাকায় প্রেয়সীর সুশ্রী মুখশ্রীর দিকে। অনিমেষ তাকিয়ে হঠাৎ দুষ্টুমি ভরা, ভারিক্কি গলায় প্রতিউত্তর করে,
‘ সো দিস ইজ মাই বার্থডে প্রেজেন্ট? শোড আই আনবক্স ইট? ‘
সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না কথাটার গভীরতা। সে তাকাল নিজের হাতের শপিং ব্যাগ গুলোর দিকে। সরল গলায় জবাব দিলো,
‘ আপনার জন্যেই তো এনেছি। সময় মতো আনবক্সিং করতে পারবেন। আগে ছাদে যাই। ‘
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এহেন বোকাসোকা জবাব শুনে সাফওয়ানের পেট মুচড়ে হাসি পেলো। মৃদু শব্দে হেসে উঠলো সে। হাসির তালে তার প্রসস্থ বক্ষপট কাঁপলো, কাঁপলো সায়েরী নিজে। মেয়েটা ভেবে কুল পেলো না এটুকু কথায় এমন হাসার মতো কি হয়েছে? সায়েরী ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে রয়েছে দেখে তৎক্ষনাৎ গ্রীবা নামিয়ে আনলো সাফওয়ান। মেয়েটার ফুলো গালে শক্ত করে ঠোঁট চেপে স-শব্দে চুমু খেলো। ঠোঁট জোড়া গালে ছুঁয়ে রেখেই অস্পষ্ট, ভরাট স্বরে আওড়াল, ‘ আজীবন মাথামোটা-ই থেকে যাবে,হু? ‘
সায়েরীর দুগাল আরক্তিম হয়ে উঠলো। বুঝল, আবারও বেক্কলের মতো কোন কথা বলে ফেলেছে। লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে সে পা জোড়া নেড়ে তাড়া দিলো ছাদে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ছাদের দরজাটা আধখোলা হয়ে ছিলো। পায়ে ঠেলে সম্পূর্ণ ভাবে দরজা খুলে দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হলো সাফওয়ান। সম্মুখের দৃশ্য দেখে আরেকদফা আশ্চর্য হলো সে। ধ্যানমগ্ন হয়ে বিবশ চিত্তে দাঁড়িয়ে কেবল দেখে গেলো সুখ নীড়ের ছোট্ট ছাদটার অপরূপ সাজসজ্জা। সায়েরী চট করে কোল থেকে নেমে পড়লো। দাঁড়ালো ঠিক ঠিক সাফওয়ানের বুক ঘেঁষে। নিজ থেকেই সাফওয়ানের দুই হাত টেনে নিয়ে জড়িয়ে নিলো কোমরে। কিচ্ছুটি বললো না, কেবল মিটিমিটি হেসে দেখতে থাকলো সাফওয়ানের হতবাক প্রতিক্রিয়া।
মাঝারি আকৃতির ছাদটার মধ্যবর্তী স্থানে চারটি কাঠের স্তম্ভের সঙ্গে ফিনফিনে সাদা পর্দা দিয়ে সাজানো হয়েছে। পর্দার মাঝে আর্টিফিশিয়াল ফুলের লতা পেছানো। ছাউনি দেওয়া কাঠামোর নিচে গোলাকার একটি টেবিল। এবং টেবিলের দুই প্রান্তে দুটো চেয়ার পাতানো। টেবিলটি সুন্দর একখানা সফেদ টেবিলক্লথ দ্বারা ঢাকা। লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে আছে সর্বত্রে। টেবিলের উপর ফুলদানিতে কিছু সংখ্যক সাদা গোলাপ এবং রজনীগন্ধা সাজানো রয়েছে। আশেপাশ জুড়ে ঢেকে রাখা ডিশ। সম্ভবত খাবার ঢেকে রয়েছে তাতে। রেড ভেলভেট কেকটি সহ সবটা বেশ চমৎকার ভাবে সাজানো। হিমেল হাওয়ায় উড়ছে ফিনফিনে সাদা পর্দাগুলো। তাজা রজনীগন্ধার ঘ্রাণে ম-ম করছে চতুর্দিক। বর্তমানে আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। সূর্যের দেখা নেই। ধূসর আকাশের নিচে অল্পতে এমন সুন্দর সাজানো ছাদটি কি চমৎকার লাগছে! সাফওয়ান নিগূঢ় চোখে সবদিক অবলোকন করে সহসা দৃষ্টি নামালো, তাকালো নিজের বুকের কাছটাতে। সায়েরী তাকিয়েই ছিলো। বড্ড উৎসুক, উচ্ছ্বসিত সেই দৃষ্টি। সাফওয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই চঞ্চল কন্ঠে শুধাল,
‘ কেমন লাগলো সারপ্রাইজ? পছন্দ হয়েছে? ‘
সাফওয়ানের বিমূঢ় চিত্তে দাঁড়িয়ে। কি জবাব দিবে? কীভাবে বহি:প্রকাশ করবে নিজের অনুভূতি গুলোর? সায়েরীকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বাহুবন্ধনী দৃঢ় করলো সে। শীতল সুরে আওড়াল,
‘ এগুলো কখন করেছো? ‘
দু’হাতে সাফওয়ানের কোমর জড়িয়ে বুকে থুতনি ঠেকাল সায়েরী। স্বভাবসুলভ চঞ্চল গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ আমি করিনি তো। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকেরা এসে করে দিয়ে গেছে। পিউ-দি হায়ার করেছিলো। ‘
এটুকু বলে আমতাআমতা করে পুণরায় বলে—
‘ শুধু একটু সমস্যা হয়ে গিয়েছে। ‘
‘ কি হয়েছে? ‘
সায়েরী ঠোঁট উল্টায়। গাল ফুলিয়ে সাফওয়ানের মুখের দিকে চেয়ে বিব্রত গলায় বলে,
‘ ম.. মানে হয়েছে কি ওরা এটুকু ডেকোরেশনের জন্য পুরো সাড়ে ছয় হাজার টাকা চাচ্ছে। এত রিকোয়েস্ট করলাম ডিসকাউন্ট দেওয়ার জন্য। ব্যাটারা শুনলোই না। আমার বাজেটের সঙ্গে কোনভাবে যাচ্ছে না। এডভান্স টা ছাড়া বাকি টাকা টা.. ম..মানে বাকি টাকা আপনকে পে করতে হ-হবে। ‘
বিব্রত গলায় কথাগুলো বলেই চোখ খিচল সায়েরী। লজ্জায় মুখটা এইটুকুন হয়ে এসেছে। তার প্রতিক্রিয়া দেখে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো সাফওয়ান। দুই আঙুলে সায়েরীর থুতনি ধরে মুখ উঁচু করলো। সায়েরী চোখ মেলে তাকাতেই বললো,
‘ কারো কাছ থেকে টাকা নিয়েছো? ‘
তৎক্ষনাৎ ডানে-বামে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানালো সায়েরী। দ্রুত গলায় প্রতিউত্তর করলো,
‘ একদম নেইনি। প্রমিস। পিউ দি খুব জোর করেছিলো তাও নেইনি। আপনাকে ছুঁয়ে বলছি। ‘
সাফওয়ানের দৃষ্টি জুড়ে সন্তুষ্টি ছেয়ে গেলো। সায়েরীর কানে পিঠে চুল গুঁজে খানিকটা গম্ভীর সুরে আওড়াল,
‘ গুড। আমাকে খুশি করার জন্য কারো কাছ থেকে ধার নেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যা যা প্রয়োজন আমাকে জানাবে, সব আবদার আমার কাছে করবে। আর কারো কাছে না। ‘
সায়েরী গাঢ় করে হাসে। আবার আপনমনে ভেংচি কাটে। একবার উপহার দিয়েই যেই এক রাম ধমক শুনতে হয়েছিলো তাকে। এরপর সায়েরীর বয়েই গেছে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করার। নেহাৎ জন্মদিন বলে কিছু-মিছু কিনেছে, তা-ও আবার সম্পূর্ণ নিজ জমাকৃত অর্থ থেকে। সাফওয়ান ভাই আজ কোন লেকচার ঝারতে এলে সায়েরী ও পাল্টা লেকচার শুনিয়ে দিবে। মনে মনে বেশ কিছু যুক্তি সে সাজিয়েও রেখেছে। একবার খালি মুখ খুলুক এই রাগী মহাশয়।
খাবারের কথা স্মরণে এলে সায়েরী আৎকে উঠে। সাফওয়ানের হাত টেনে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে হন্তদন্ত গলায় বলে,
‘ আপনি যেখানে সেখানে তব্দা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ছেন কেনো? একটু আগেই খাবার সব গরম করে এনেছি। ঠান্ডা হলে কোন স্বাদ পাওয়া যাবে? ‘
বকবক করতে করতে ছাউনির নিচে এসে থামলো সায়েরী। সাফওয়ানের হাত ছেড়ে তার জন্য চেয়ারও টেনে দিলো। বললো, ‘ বসুন তাড়াতাড়ি। ‘
সাফওয়ানের মনে হলো সে বোধহয় তার ফিমেইল ভার্সনকে দেখছে। এইযে চেয়ার টেনে দেওয়ার মতো ছোট্ট দায়িত্বটা, এটা সর্বদা সাফওয়ান পালন করে থাকে। আজ জন্মদিন বলেই কি এতোটা স্পেশাল ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে সে? তা-ও আবার এই লিলিপুট, বোকাপাখি টার পক্ষ থেকে! কথাটা ভেবে ভ্রুঁ চুলকে নিঃশব্দে হেসে ফেললো সাফওয়ান। সঙ্গে সঙ্গে বসলো না। টেবিলের অন্য প্রান্তের চেয়ারটা এক হাতে তুলে নিয়ে নিজ চেয়ারের পাশে এনে রাখলো। অতঃপর বসলো আরাম করে। সজ্জিত টেবিলটার দিকে একপলক তাকিয়ে পুণরায় দৃষ্টি তাক করলো সায়েরীর দিকে। উচ্ছ্বসিত মুখশ্রীটি অনিমেষ দেখেই গেলো। মুগ্ধতার রেশ যেন কাটার নয়। এই সজ্জিত, জ্যান্ত পুতুলটা চোখের সামনে এমন ঘুরঘুর করলে সাফওয়ান বোধহয় তাকে দেখতে দেখতে জনম পার করে দিতে পারবে।
সায়েরী চঞ্চল চিত্তে ঢেকে রাখা ডিশ গুলোর উপর হতে একে একে ঢাকনা সরাল। ধোঁয়ার সঙ্গে মশলার ঘ্রাণে মাতোয়ারা হলো চতুর্দিক। গদগদ ভাব নিয়ে সে নামল পরিবেশন কার্যে। সিল্কের শাড়িটা সামলাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিলো দেখে চট করে শাড়ির আঁচল কাঁধে তুলে নিলো। অমনি শাড়ির ফাঁক গলিয়ে কোমরের দিকটা উন্মুক্ত হয়ে গেলো। হলদেটে উদর উঁকি দিচ্ছে। সোনালি রঙের শাড়ি, ব্লাউজের মাঝে হলদেটে ত্বক আরও উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। আকস্মিক এমন এক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়ে সাফওয়ান কেশে উঠলো। পূর্বে কখনো সায়েরীর দেহের গোপন কোন অংশে দৃষ্টি পড়েনি বলে আজ এই দৃশ্য দেখে সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে তৎক্ষনাৎ। এক নজর দেখেই গলা শুকিয়ে চৌচির হলো তার। ধরফর করে উঠলো বুকের ভেতরটা। সাড়ে সর্বনাশ! এ কি দেখে ফেলল! বেহায়া নজর কি আর নিজ সীমায় থাকবে? অবশ্যই না। এইযে আড়চোখে আবার তাকিয়েছে।
মাথামোটা সায়েরীর সেদিকে খেয়াল কই? সাফওয়ানের প্লেটে গরম গরম কষা মাংস পরিবেশন করে সে আমোদিত গলায় শুধালো,
‘ কেমন লাগছে দেখতে? সুস্বাদু? হুহ? ‘
সাফওয়ানের চোরা দৃষ্টি তখনো ঘুরেফিরে এই জলজ্যান্ত সুস্বাদু খাবারের দিকেই আটকে রয়েছে। ঢোকের পর ঢোক গিলে সে আপনমনে প্রত্যুত্তর করে বসলো, ‘ উমম্.. ডিলেসিয়াস! ‘
‘ হুহ! না খেয়েই কীভাবে বুঝলেন? টেস্ট করে বলুন কেমন হয়েছে? ‘
সাফওয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো একথা শুনে। কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। আশ্চর্য হয়ে ইয়া বড় বড় চোখে তাকালো সায়েরীর মুখের দিকে। টেস্ট করবে মানে? কি টেস্ট করবে? কাকে টেস্ট করবে? বিস্মিত গলায় সে বলেই ফেললো,
‘ কি টেস্ট করবো? ‘
‘ কি আবার? মাংস। ‘
‘ হুহ? ‘
‘ হ হু কি? আচ্ছা মুসিবত তো! আপনি কি দেখতে পারছেন না আমি প্লেটে খাবার সার্ভ করেছি? ঠান্ডা হলে তখন খেয়ে স্বাদ পাওয়া যাবে? খাচ্ছেন না কেনো? ‘
ঝাঁজালো কন্ঠের বাণী শুনে সঙ্গে সঙ্গে সাফওয়ানের ঘোর কাটলো। গলা খাঁকারি দিয়ে নড়েচড়ে বসলো। নজর দিলো প্লেটের দিকে। ওহ! এই খাবারের কথা বলছিলো তবে সায়েরী। আপনমনে নিজেকে আচ্ছারকম বকে শার্টের টপ বোতাম দুটো খোলে দিলো সে। হুট করেই দেহ উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এমন ঠান্ডা আবহাওয়ার মাঝেও গরম লাগতে শুরু করেছে। বোতাম খুলে আর দেরি করলো না। চট করে সায়েরীর বাহু টেনে বসিয়ে দিলো পার্শ্ববর্তী চেয়ারে। নিজেকে যথাসম্ভব গম্ভীর রেখে নির্দেশ দিলো,
‘ কিছু সার্ভ করতে হবে না। চুপচাপ বসে থাকো। ‘
কথার তালে সন্তর্পণে সায়েরীর কাঁধ হতে আঁচল নামিয়ে দিয়ে তবেই স্বস্তির শ্বাস ফেললো সে। পূর্ণ মনযোগ দিলো খাবারের দিকে। টেবিলে ভিন্ন ভিন্ন চারটি পাত্রে গরুর মাংস, চিংড়ি মালাইকারি, আস্ত তেলাপিয়া মাছ ফ্রাই এবং টমেটো ভর্তা সাজানো রয়েছে। আইটেম সব দেখে সাফওয়ান আশ্চর্য হলো বটে। গরুর কষা মাংস এবং ঝাল ঝাল মুচমুচে তেলাপিয়া মাছ ভাজা তার ভীষণ পছন্দের। যেকোন ধরনের ভর্তা তো সব সময়ের ফেভারিট। চিংড়ি কখনো পছন্দের তালিকায় ছিলো না। আবার অপছন্দ ও বলা যায় না। তবে চিংড়ি যে সায়েরীর খুব পছন্দ করে এটা তার জানা আছে। ধোঁয়া উড়ানো গরম গরম খাবার গুলো দেখে সাফওয়ানের সারাদিনের খিদেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। হাত পরিষ্কার করে টমেটো ভর্তা দিয়ে চোখের পলকে পরপর কয়েক লোকমা ভাত মুখে পুরে নিলো সে। এরপর গরম গরম এক টুকরো মাংস মুখে দিয়ে তৃপ্তিতে চোখ বুজল। খেতে খেতে বলে উঠলো,
‘ খাবার গুলো বাসা থেকে নিয়ে এসেছো? কে রেঁধেছ এতসব? ‘
সায়েরীর সাড়া নেই। সাফওয়ান উত্তরের আশায় চোখ তুলে তাকাতেই দেখল গালে হাত দিয়ে সায়েরী এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। মন দিয়ে সাফওয়ানের খাওয়া দেখছে। তাকে এমন ধ্যানমগ্ন দেখে সাফওয়ান পুণরায় একই প্রশ্ন ছুড়ল। এবারেও জবাব দিলো না সায়েরী। উৎসুক দৃষ্টিতে চেয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ আপনার ভালো লেগেছে? ‘
তার কন্ঠে, প্রতিক্রিয়ায় অদ্ভুত উত্তেজনা। বদন জুড়ে অস্বাভাবিক চাঞ্চল্যভাব। উৎসুক গলায় পরপর কয়েক বার একই প্রশ্ন আওড়াল সে। উতলা হয়ে আছে খাবার কেমন হয়েছে তা জানার জন্য। সাফওয়ান সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে অবলোকন করে সায়েরীর এই অস্থিরতা, উত্তেজনা। কথার তালে বারে বারে নাড়াচাড়া করা সায়েরীর ডানহাতের দিকে নজর যেতেই সাফওয়ান থমকায়। ফুল স্লিভ ব্লাউজ পরিহিতা হাতের কব্জিতে স্পষ্ট দুটো ফোসকা। লালচে দেখাচ্ছে স্থানটা। সাফওয়ান উদ্বিগ্ন হলো মুহুর্তেই। বাম হাত বাড়িয়ে খপ করে ধরলো সায়েরীর নাজুক হাত। কীভাবে হাতে ফোসকা পড়লো তা জানতে চেয়েও সায়েরীর তরফ থেকে কোন জবাব পেলো না সে। ধরা পড়া চোরের মতো কাচুমাচু মুখ করে বসে রয়েছে সায়েরী। ক্ষণিক পূর্ব অবধি মেয়েটার এই উচ্ছ্বসিত মুখশ্রী, খাবার নিয়ে বারে বারে এতো প্রশ্ন এবং এই ফোসকা পড়া হাতের কব্জি দেখে সাফওয়ান থম মেরে গেলো। কিছু কি আন্দাজ করতে পারলো সে? পেরেছে বোধহয়। কিন্তু নিজের ভাবনা চিন্তার উপর বিশ্বাস করতে পারলো না। হতবাক নয়নে প্রায় মিনিট খানিক দেখলো সায়েরীকে। বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে বলে উঠলো,
‘ খাবার গুলো সব তুমি রান্না করেছো সুবহা? ‘
সায়েরী অপ্রস্তুত হলো। সাফওয়ানের এমন গুরুগম্ভীর মুখশ্রী দেখে বুঝে উঠতে পারলো না জবাবটা ঠিক কীভাবে দিবে। ফোসকা পড়া হাতটা শাড়ির আঁচলের নিচে লুকিয়ে রাখার সম্পূর্ণ প্রয়াস চালিয়েছিলো সে। কিন্তু শেষমেশ ঠিকই ধরা পড়ে গেল। ঢিপঢিপ করে কাঁপছে তার বুকের ভেতরটা। সাফওয়ান ভাই নিশ্চয়ই বকবে খুব? বকাগুলো কল্পনা করেই সায়েরীর মুখটা এইটুকুন হয়ে গেলো। আমতাআমতা করে মিহি সুরে বলে উঠলো,
‘ বকবেন না, প্লিজ। আমি পুরো চার ঘন্টা কিচেনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার জন্য এগুলো রান্না করেছি। একটু গরম তেল ছিটকে পড়েছিলো হাতে। এছাড়া আর কোন চোট লাগেনি, সতিই। ‘
সাফওয়ান তখনো নিশ্চুপ। এক ধ্যানে কেবল তাকিয়ে রয়েছে। তার অনুভূতিহীন চাহনি দেখে সায়েরীর চেহারা জুড়ে হতাশা ছেয়ে যেতে লাগলো। পরপর চোখের পলক ঝাপটে লম্বা দম নিয়ে সে ফের বলে উঠলো,
‘ আ–আপনি রেগে আছেন? আমি বললাম তো আর কোথাও ব্যথা পাইনি। শুধুশুধু রাগারাগি করে আমার কষ্ট সব জলে মিশিয়ে দিবেন না। খুব মন থেকে রান্না করেছি সব। আমার কতদিনের পরিকল্পনা ছিলো আজ আপনা… ‘
সায়েরীর কথাটা পূর্ণতা পেলো না। কম্পিত কন্ঠটা থমকে গেলো হঠাৎ করে। সাফওয়ানের বলিষ্ঠ দেহের মাঝে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়তেই হকচকিয়ে গেলো সে। দুজনার মধ্যবর্তী স্থানে যে কয়েক ইঞ্চি দুরত্ব ছিলো, সেটা ঘুচে গিয়েছে আচমকা। সাফওয়ানের পেশিবহুল বাহুদ্বয় সায়েরীর ছোট্ট দেহটি শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিয়েছে। সম্পূর্ণভাবে লেপ্টে নিয়েছে বুকের মাঝে।
সায়েরীর ঘাড়ের কাছটায় সাফওয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস ভীষণ গভীর। সাফওয়ানের কাঁধে থুতনি চেপে রাখা সায়েরী বুঝে উঠতে পারলো না হঠাৎ এমন প্রতিক্রিয়ার মানে টা কি। পুরুষালি প্রসস্থ পৃষ্ঠদেশে সায়েরীর হাতজোড়া উঠে এলো অবচেতনে। মেয়েটা কিচ্ছুটি বলতে পারলো না। না তো সাফওয়ানের কোন সাড়া পেলো। কোন কথা নেই, কোন শব্দ নেই। সাফওয়ান কেবল শক্ত আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে রেখেছে সায়েরীকে। তার বক্ষ জুড়ে ধ্বনিত হওয়া ধুকপুক ধুকপুক শব্দ গুলো সায়েরী শুনলো না। বুঝলো না, কেনো সাফওয়ান ভাই হুট করে এমন স্তব্ধ হয়ে গেলো। প্রায় মিনিট খানিক অতিক্রম হলো এভাবেই। পরক্ষণে গ্রীবাদেশে কোমল ওষ্ঠের শীতল স্পর্শ অনুভব করে সায়েরী হকচকিয়ে গেলো। শিরশির করে উঠলো সর্বাঙ্গ। নড়তে গেলে পূর্বের চেয়েও কঠিন বাধনে আটকে পড়লো। শুনতে পেলো সাফওয়ানের ভারিক্কি কন্ঠের অস্পষ্ট বাণী–
‘ এতো বড় কবে হলে, বোকাপাখি? ‘
কন্ঠে কিছু মেশানো ছিলো বোধহয়। কেমন গভীর আবেগপ্রবণ শোনাল বাক্যটা। সাফওয়ানের কন্ঠ কেঁপেছে কিঞ্চিৎ। সেই কম্পন, কথার পেছনে লুকানো অনুভূতি বুঝলে পেরে অদ্ভুত রকমের শিরহনে সায়েরীর হৃদয় টালমাটাল হলো। এবং কথাটা শুনে আচমকা হেসে ফেললো সে। শব্দহীন হাসি। এতক্ষণে গিয়ে বুঝল সাফওয়ানের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ার মর্মার্থ। সাফওয়ান মুখ তুলে মুখোমুখি তাকাতেই লজ্জা পেয়ে গেলো মেয়েটা। সাফওয়ানের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলানোর সাহস হলো না। এদিক সেদিক দৃষ্টি ঘুরিয়ে হন্তদন্ত গলায় বলে উঠলো,
‘ খাবার সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কখন খাবেন? ‘
সাফওয়ান আর কথা বাড়ালো না। তাকে বড় আগ্রহী দেখালো। প্লেটে আরও এক চামচ গরম ভাত তুলে নিয়ে সায়েরীকে বললো মাংস বেরে দিতে। বাধ্য মেয়ের মতো ঝটপট কাজ সারলো সায়েরী। সাফওয়ান পেট ভরে গেলো। বরাবরের চেয়ে একটু বেশিই খেলো। খিদের কারণে নাকি অন্য কোন কারণে তা সায়েরী বুঝলো না। কিন্তু এই প্রথম সাফওয়ানকে এতো এতো খাবার খেতে দেখছে সে। পূর্বে কতশত বার প্রোগ্রামে কিংবা অন্যান্য সময়ে দুজন একত্রে খাওয়া দাওয়া করেছে। সাফওয়ান সর্বদা সীমিত খেতো। ডায়েট মেইনটেইন করে চলতো। এটা খেলে ওটা খাওয়া যাবে না, একসঙ্গে এত বেশি খাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত অয়েলি খাবার খাওয়া যাবে না। এমন কতশত ঢংয়ের কথা শুনেছিলো সায়েরী। আজ সব কোথায় গেলো? তেল-মশলায় মাখোমাখো সব খাবার আজ গোগ্রাসে গিলছে দেখে মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে কুল পাচ্ছে না। কিন্তু ভালোও লাগছে। তার দুটো মাসের, চারটে ঘন্টার পরিশ্রম বৃথা যায়নি তবে। সাফওয়ান ভাইকে এমন তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখতেই তো চেয়েছিলো সে। আনন্দে সায়েরীর ইচ্ছে করছে এই মেঘলা আকাশে ভেসে বেড়াতে।
প্রায় দুই প্লেট পরিমাণ ভাত সাবাড় করার পর সাফওয়ান যখন তৃতীয় বারের মতো প্লেটে এক চামচ ভাত তুলে নিলো। সেই দৃশ্য দেখে আৎকে উঠলো সায়েরী। হলোটা কি! সাফওয়ানের ভাইয়ের পেটে রাক্ষস ভর করেছে নাকি? একথা ভেবে মেয়েটার ভালোলাগা সব ফুরুৎ করে উড়ে যেতে নিচ্চিলো, এমন মুহূর্তে চেয়ার সমেত তার গোটা দেহ দোলে উঠলো। সাফওয়ান চেয়ার টেনে সায়েরীকে আরও কাছাকাছি টেনে নিয়েছে। গরুর মাংস গুলো একটু বেশিই ঝাল হয়েছে বিধায় সাফওয়ান দুটো চিংড়ি এবং তেলাপিয়া মাছের মাথাটা তুলে নিয়েছে প্লেটে। এক লোকমা ভাত সায়েরীর মুখের সামনে তুলে ধরে সে বললো,
‘ এতো তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছি। কিন্তু তোমার নজর লেগে পেট খারাপ না হয়ে যায়! নাও হা করো। নিজেও খেয়ে আমার উপর থেকে নজর তুলে নাও। ‘
সায়েরী নাক, মুখ কুঁচকে তাকায়। ঘোর বিরোধীতা জানিয়ে তৎক্ষনাৎ প্রতিউত্তর করে,
‘ আমি মোটেও নজর লাগার মতো নজরে তাকাইনি। ভালো নজরে তাকিয়েছি। ‘
‘ তোমার ভালো নজর আমার পেটে হজম হওয়ার জন্যেই খাওয়াচ্ছি। মুখ খুলো.. ‘
সায়েরী অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু দ্বিমত করে না। সাফওয়ানের হাতে খাওয়ার এই সুযোগটুকু লুফে নিতে দ্রুত হা করে। খিদে পেটে নিজ হাতের রান্না করা খাবার গুলো তার নিজের কাছেই অমৃত বলে মনে হলো। ক্ষণিক পূর্ব অবধি চুপচাপ সাফওয়ানের খাওয়া দেখছিলো যে, এখন গালভর্তি ভাত নিয়ে সে মোটেও চুপচাপ বসে নেই। যতক্ষণ না তার পরিমাণ অনুযায়ী ভাত সে সাবাড় করেছে, ততক্ষণ পটরপটর করেই চলেছে। ‘ আর খাবো না, পেট ভরে গেছে ‘ এই চিরপরিচিত বাক্যটি শুনে আজ সাফওয়ান মোটেও জোর করেনি। অবশিষ্ট মাছের মাথা সহ অল্প খাবার টুকু সে-ই খেয়ে নিলো। পরপরই সায়েরী জিনিসপত্র সব গুছিয়ে রাখলো একপাশে। ব্যস্তরত অবস্থায় তাকে দেখে মনে হলো নতুন কোন বধূ। যে পরম সুখের সঙ্গে স্বামী সেবায় নিয়োজিত। আপনমনে একথা ভেবে মুচকি হাসলো সাফওয়ান। আজও আড়ালে, আবডালে এই সুন্দর মুহূর্তে সায়েরীকে ক্যামেরাবন্দি করতে ভুললো না সে।
নীলচে আকাশ ধূসর মেঘে ঢেকে গিয়েছে। প্রকৃতি জুড়ে বইছে শীতল হাওয়া। বৃষ্টি হবে বোধহয়। বাতাসের তালে সাজানো ছাউনির চারপাশের সফেদ পর্দা সব উড়ুউড়ি করছে। উড়ছে সায়েরীর খোলা চুল, জমিনে লেপ্টে পড়া শাড়ির লম্বা আঁচল। সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে আঁচলের অংশটা হাতে পেঁচিয়ে নেয়। সন্তর্পণে সায়েরীর ডান কাঁধ হতে পিঠ জড়িয়ে বাম কাঁধে ছড়িয়ে দেয়। অন্যহাতে ঘাড় হতে দীঘল চুলগুলো ছড়িয়ে দেয় পিঠে। সায়েরী বসে রয়েছে সাফওয়ানের উরুর উপর। দুই হাতে সাফওয়ানের গলা জড়িয়ে কখনো বাদামি চুলগুলোতে হাত ডুবিয়ে রাখছে। তো কখনো সাফওয়ানের শার্টের বোতাম নিয়ে ইতিউতি করছে। একই সঙ্গে তোতাপাখির ন্যায় বেজে চলেছে তার রিনরিনে কন্ঠস্বর। সাফওয়ান কেবল কোলে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো,
‘ রান্না করা শিখেছ কবে? ‘
এটুকু প্রশ্নের অপেক্ষাতেই বোধহয় ছিলো সায়েরী। গদগদ ভাব নিয়ে বলতে লাগলো গত দুই মাসে করা সব এক্সপেরিমেন্টের কথা। সাফওয়ান বরাবরের মতোই মনযোগী শ্রোতা। একনিষ্ঠ শ্রোতার ন্যায় শুনে যাচ্ছে সায়েরী জমিয়ে রাখা সব কথার ঝুলি। মেয়েটা বোধহয় আজকের সারপ্রাইজের জন্যেই এতগুলো দিন যাবত সব কথা পেটে হজম করে রেখেছিলো। আজ সঠিক সময় পেয়ে হড়বড়িয়ে সব বলে চলেছে। কিচ্ছুটি বাদ নেই, কোন রাখঢাক নেই। কথার তালে ডেজার্টের কথা বলতে বলতে সায়েরীর আকস্মিক মনে পড়লো, ডেজার্ট তো সাফওয়ানকে খাওয়ানো হয়নি। একথা মাথায় আসতেই লাফিয়ে উঠে সে। ছাদের রেলিঙের পাশে যে দোলনাটা রয়েছে, সেটির সম্মুখে অন্য একটি ছোট্ট টেবিলের উপর ডেজার্ট আইটেম দুটি এবং কেকটি আলাদা করে ঢেকে রেখেছিলো সায়েরী। শপিং ব্যাগ গুলো রেখেছে দোলনার উপরে। সায়েরীকে দ্রুত কদমে সেদিকে যেতে দেখে পেছন পেছন সাফওয়ান-ও এগোল। টেবিলের উপর ঢেকে রাখা ডেজার্ট গুলোর উপর হতে ঢাকনি সরাল সায়েরী। একটি বাটিতে রসমালাই, এবং অন্যটিতে বেশ পারফেক্ট একটি পুডিং। পাশেই তাজা স্ট্রবেরি দিয়ে সাজানো রেড ভেলভেট ফ্লেভারের ছোট্ট কেকটি। দেখে বোঝা যাচ্ছে, কেকটি কাস্টমাইজড করা। সায়েরী ছোট্ট বাটিতে কয়েকটি রসমালাই আলাদা করে নিলো। চামচের সাহায্যে একটি রসমালাই তুলে সাফওয়ানের মুখের সামনে ধরে বললো,
‘ খেয়ে বলুন তো কেমন হয়েছে? ‘
সাফওয়ান খেলো। একটি নয়, বাটি হাতে নিয়ে পরপর আরও তিনটা সাবাড় করে ফেললো নিমেষে। পুডিংয়ের একটি টুকরো ও খেলো। ক্ষণে ক্ষণে তার আশ্চর্যের মাত্রা আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে বোধহয়। এতোটা পারফেক্ট ভাবে রান্নাবান্না করা কবে শিখলো মেয়েটা? সাফওয়ান কখনো কল্পনা করেনি তার সুবহার রান্নার হাত এতোটা চমৎকার হতে পারে। পুডিংটা সাফওয়ানের টেস্ট অনুযায়ী একটু বেশি মিষ্টি। তবে বাকি সব ভীষণ সুস্বাদু হয়েছে। সাফওয়ান মুখ ফুটে কিছু বললো না ঠিক। কিন্তু তাকে তৃপ্তি নিয়ে খেতে দেখে সায়েরী আপ্লূত হয়ে উঠলো। সে জানে সাফওয়ান সহজে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না, তাকে দিয়ে হয়না। বিগত প্রায় দেড়টা বছর যাবত একসঙ্গে সময় কাটিয়ে সাফওয়ানকে অনেকটা বুঝতে শিখেছে সায়েরী। তাই আজকের এই চমৎকার আয়োজনে সাফওয়ান ভাই ঠিক কতোটা আশ্চর্য, কতোটা আবেগপ্রবণ হয়েছে তার কিঞ্চিৎ ধারণা করতে পারছে মেয়েটা। সাফওয়ানের এই গম্ভীর মুখ কিন্তু দৃষ্টি কোণে উপচে পড়া হাসিটা আরও একটু প্রসারিত করার তাগিদে সায়েরী এবারে দোলনার উপর হতে একটি শপিং ব্যাগ তুলে নিলো। সাফওয়ান পেছনে এসে সায়েরীর পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে তখন। প্রশ্ন চোখে তাকাতেই সায়েরী ঘাড় উঁচিয়ে চাইলো তার দিকে। আলতো হেসে জবাব দিলো,
‘ আরেকটা লিটল সারপ্রাইজ। চোখ বন্ধ করুন তো। হাত বাড়ান, দেখি.. ‘
সায়েরীর সর্বকালীন বাধ্য প্রেমিক পুরুষ সাফওয়ান তেহজিব খান এই মুহুর্তে-ও প্রেয়সীর আদেশের সঙ্গে সঙ্গে চোখ বুজল। বাম হাতে সায়েরীকে জড়িয়ে রেখে কৌতুহলী চিত্তে বাড়িয়ে দিলো ডান। কিন্তু সেটি অগ্রাহ্য করে সায়েরী তার বাম হাত টেনে নিলো। আঙুলের দিকে শীতল কোন বস্তুর স্পর্শ পেয়ে চট করে চোখ মেলে তাকালো সাফওয়ান। সিলভার রিং! সায়েরী প্লেইন ডিজাইনের চকচকে একটি সিলভার রিং পরিয়ে দিয়েছে সাফওয়ানের বাম হাতের অনামিকা আঙ্গুলে। সাফওয়ানের মনে পড়ে সেই রাতের কথা, যখন ঠিক এভাবেই একই পদ্ধতিতে সে সায়েরীকে ডায়মন্ড রিংটি পরিয়ে দিয়েছিলো। সেদিন সায়েরী আশ্চর্য হয়ে ছিলো, একই রকম ভাবে আজ সাফওয়ান আশ্চর্য হয়ে কুল পাচ্ছে না। এই মাথামোটা তার রিংয়ের সাইজ মিলালো কীভাবে! আশ্চর্য!
সাফওয়ানের হতবিহ্বল চেহারা দেখে সায়েরী মুখে হাত চেপে হেসে ফেলে। নিজ বাম হাতের সঙ্গে সাফওয়ানের বাম হাত মেলে ধরে বলে,
‘ দেখুন তো, এবার পারফেক্ট লাগছে না? এতোদিন শুধু আমাকেই নিজের নামে করে রেখেছিলেন। আজ আমিও আপনার উপর সিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছি। খবরদার যদি রিংটা কখনো খুলেছেন তো। ‘
বেশ দাম্ভিক সুরে কথাটা বলেছে সায়েরী। কন্ঠে স্পষ্ট অধিকারবোধ। সাফওয়ান প্রত্যুত্তর করার সুযোগ পেলো না। পূর্বে সায়েরী নড়েচড়ে উঠলো। দ্বিতীয় শপিং ব্যাগটি হাতে নিয়ে সাফওয়ানের মুখোমুখি দাঁড়ালো এবার। বক্স হতে বের করলো সিলভার এবং গোল্ডেন কম্বিনেশনের একটি চেইনের হাতঘড়ি। লেটেস্ট মডেল, সুন্দর দেখতে। সাফওয়ানের হাতের কব্জি হতে অ্যাপল ওয়াচটি খুলে নিয়ে নিজের কেনা ঘড়িটা যত্ন করে পরিয়ে দিলো সে। সাধারণ দেখতে ঘড়িটা হাতে পরিয়ে দিয়ে পরক্ষণে সায়েরী ঘড়ির ডায়ালের অংশ, অর্থাৎ সংখ্যা ও কাটা বসানো উপরের অংশটি ঘুরালো। তৎক্ষনাৎ দুটো অংশে বিভক্ত হলো ঘড়িটি। উপরের দিকের অংশটা ডান দিকে একটু সরাতেই নিচের অংশে দেখা মিললো সায়েরীর একটি হাস্যজ্বল ছবির। গোলাকৃতির, ঘড়ির মাপের ছোট্ট একটি ছবি সেট করা হয়েছে অভ্যন্তরে। কেবলমাত্র সায়েরীর হাসি হাসি মুখটা দেখা যাচ্ছে তাতে। সায়েরী দারুণ প্রফুল্ল গলায় বলে উঠলো,
‘ স্পেশাল দিনের ইম্পর্ট্যান্ট গিফট। আপনার খানদানি গরম মেজাজটা কোন কারণে ডাবল গরম হতে চাইলে তখন ফটাফট হাতঘড়িটা খুলে আমার এই সুইট, কিউট ফেইসটা দেখে নিবেন। দেখবেন মেজাজ একদম বরফের মতো শীতল হয়ে গিয়েছে। দারুণ আইডিয়া না? পছন্দ হয়েছে?হুহ? ‘
সাফওয়ানের কপালে সুক্ষ্ম দুটো ভাঁজ পড়েছিলো এমন অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার পেয়ে। পরমুহূর্তে উপহার নিয়ে সায়েরীর যুক্তি শুনে হেসে ফেললো সে। হাত উঁচিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো ছবিটার উপর। পুণরায় ঘড়িটি ঠিকঠাক করে বললো,
‘ হুম। তোমার আইডিয়া যেহেতু, পছন্দ না করে উপায় আছে? ‘
সায়েরী অতশত ভাবলো না। গদগদ ভাব নিয়ে বার দুয়েক বললো, ‘ থ্যাঙ্কিউ, থ্যাঙ্কিউ। ‘
সাফওয়ান অগোচরে হাসে। এখনো অবধি অক্ষত থাকা রেড ভেলভেট কেকটার উপর হতে একটি স্ট্রবেরি তুলে একপাশ হতে অর্ধেক খেয়ে বলে,
‘ কিন্তু আমার যে আরও স্পেশাল কিছু চাই। ‘
সায়েরী হঠাৎ থমকায়। আরও স্পেশাল কিছু মানে? এসবের চেয়েও বেশি স্পেশাল আর কি দিবে সে? মুহুর্তে মেয়েটা ভাবুক হলো। হিসেব করে দেখলো, বছর জুড়ে বাসা হতে দেওয়া কোচিং ফি এর সম্পূর্ণ টাকা যে সে জমিয়ে রেখেছিলো। সবই আজকের দিনটার পেছনে খরচ হয়ে গিয়েছে।
রান্নার জন্য বাজার সাদাই থেকে শুরু করে সাফওয়ানের জন্য বাড়তি উপহার সব কিনার পর হাত একদম ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। জমানো টাকা সব এক নিমেষে উধাও। মনটা ভার হয়ে গেলো তার। আরও স্পেশাল আর কি দেওয়া যায়? কীভাবে দিবে! মিনমিন সুরে সে বলেই ফেললো,
‘ এসবের চেয়ে বেশি স্পেশাল আর কি দিবো? ‘
সাফওয়ানের ঠোঁটের কোণে তখনো মিটিমিটি হাসি ফুটে রয়েছে। বাম হাত বাড়িয়ে হঠাৎ সায়েরীর কোমর পেঁচিয়ে ধরলো সে। হেঁচকা টানে দুজনার মধ্যবর্তী এক কদম সমান দুরত্বটুকু মিটিয়ে নিলো নিমেষে। প্রথম বারের মতো শাড়ির ফাঁক গলিয়ে সরাসরি উন্মুক্ত কোমরে সাফওয়ানের পুরুষালি হাতের শীতল স্পর্শ পেয়ে সায়েরীর দেহের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। শরীর জুড়ে বৈদ্যুতিক শক লাগার মতো অনুভূতি হলো তার। বিষ্ময়ে বড় বড় নেত্রপল্লব মেলে তাকালো সে। সাফওয়ান কিঞ্চিৎ গ্রীবা নোয়াল। ডান হাতের আধখাওয়া স্ট্রবেরিটা সায়েরীর ঠোঁটের সঙ্গে ঠেসে ধরে ফিসফিস কন্ঠে আওড়াল,
‘ আর কোন স্পেশাল গিফট দিতে পারবে না? ও-কে দ্যান। এই স্পেশাল সারপ্রাইজের জন্য আমি রিটার্ন গিফট তো দিতেই পারি। সেটা নিয়ে নাও.. ‘
সাফওয়ানের কন্ঠে, চাহনিতে অদ্ভুত এক মাতলামো লক্ষ্য করলো সায়েরী। তার দেহ হিম হয়ে এলো। মেয়েটা প্রতুত্তর করতে চেয়ে অনুভব করলো, তার কন্ঠ দিয়ে কথা আসতে চাইছে না। তবুও জোর দিলো সে। ঠোঁটের সঙ্গে ঠেসে থাকা স্ট্রবেরির দিক হতে একটুখানি মাথা পিছিয়ে বলতে চাইলো,
‘ ক-কোন রিটার্ন গিফট ল-লাগবে ন.. ‘
তার কথাটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। দুই ঠোঁটের মাঝখানে স্থান পেলো তাজা স্ট্রবেরি ফলটি। অসমাপ্ত কথাটার রেশ ধরে সাফওয়ান বলে উঠলো,
‘ কিন্তু আমার তো লাগবে। ‘
ভারিক্কি সুরের ছোট্ট বাণী। যা কর্ণধার হওয়ার পর ধাতস্থ হওয়ার সুযোগ টুকুও পেলো না সায়েরী। কেকের হোয়াইট ক্রিম লেপ্টানো কোমল ঠোঁট জোড়ার উপর অকস্মাৎ আরও একজোড়া ঠোঁট আধিপত্য জমাতেই মেয়েটার সর্বাঙ্গ ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠলো। শক্ত করে খিচে ফেললো চোখজোড়া। দুই হাতের ধারালো নক সব কোথায় খামচে ধরেছে সেই বোধটুকুও হলোনা। কোথায় গেলো ঠোঁটের মাঝে স্থান পাওয়া আধ খাওয়া স্ট্রবেরির টুকরো টা? এক মুহুর্তের জন্য সর্বাঙ্গ ঝংকার দিয়ে উঠলে পরমুহূর্তেই দ্রুত কদমে পিছিয়ে যেতে চাইলো সে। পায়ে পা মিলিয়ে এগোল সাফওয়ান-ও। কিন্তু একবিন্দু ছাড় দিলো না। সায়েরী পিছিয়েছে মাত্র দুই কদম। অমনি রেলিঙের সঙ্গে কোমর ঠেকে গেলো। থমকে গেলো রমনী। ফেঁসে গেছে বুঝতে পেরেই দুই হাতে সাফওয়ানের বুক ছুঁয়ে ঠেলে সরাতে চাইলো তাকে। আশ্চর্যজনক ভাবে, তক্ষুনি দু’জনের অধর যুগল আলাদা করে ফেললো সাফওয়ান। সায়েরীর বন্ধ চোখের উপর আঁচড়ে পড়ছে সাফওয়ানের এক একটি উষ্ণ, ঘন নিঃশ্বাস। তার চেয়েও অধিক ঘনত্বের সঙ্গে বড় বড় দম নিচ্ছে সায়েরী। এই বুজি ছাড় পেয়ে গেলো, এমন ভঙ্গিমায় চোখ মেলে দ্রুত সরে যেতে চাইলো সে। কিন্তু বিধি বাম! মাথা উঁচিয়ে চাওয়া মাত্র সাফওয়ানের ডান হাতটিও সুরসুর করে চেপে বসলো তার উন্মুক্ত উদরে। সরাসরি উদরের মধ্যবর্তী স্থান ছুঁয়ে শক্ত করে চেপে ধরলো কোমরের দুই দিক। ভয়ানকভাবে কেঁপে উঠে ডিম্বাকৃতির ন্যায় ডাগরডোগর চোখ মেলে তাকানো সায়েরীর নাকে নাক স্পর্শ করে সে ঘন নিঃশ্বাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফিসফিস ছন্দে বলে উঠলো, ‘ আ’ম নট ডান ইয়েট, সুইটহার্ট। ‘
এটুকু বাক্য মাত্র। বাক্যটি সম্পূর্ণ হলো কি হয়নি, অমনি সায়েরী শূন্যে ভেসে উঠলো। তার কোমরের দুই দিক চেপে ধরে চট করে তাকে শূন্যে তুলে নিয়েছে সাফওয়ান। একই সঙ্গে পুণরায় অধরের ভাঁজে অধর মিলিয়ে নিয়েছে। সায়েরীকে বসিয়ে দিয়েছে রেলিঙের উপর। পূর্বের চেয়েও মাত্রাতিরিক্ত গভীর, দমবন্ধকর এই স্পর্শের কবলে পড়ে সায়েরীর তখন টালমাটাল অবস্থা। দুই হাতে সাফওয়ানের কাঁধ ঠেলে সরে যেতে চাইলে তৎক্ষনাৎ তার নরম ঘাড়টা চেপে ধরলো একটি বলিষ্ঠ হাত। দেহ দুটির মাঝে যেটুকু দুরত্ব অবশিষ্ট ছিলো সবটা মিলিয়ে নিয়ে সায়েরীকে বাধ্য করলো এই স্পর্শে মিশে থাকতে। সায়েরীর সম্পূর্ণ দেহ বরফের মতো শীতল হয়ে জমে রয়েছে। নড়চড় করবার সম্পূর্ণ শক্তি খুইয়ে বসেছে সে।
সাফওয়ানের ঘাড়, কাঁধ খামচে ধরে শক্ত করে চোখ বুজে রয়েছে। কোমরে লেপ্টে থাকা সাফওয়ানের সরু আঙ্গুল গুলো যতবার নড়েচড়ে উঠছে, ততবারই কেঁপে কেঁপে উঠছে সায়েরীর নাজুক তনু। শীতল হাওয়াটা ঝড়ো হাওয়ায় রূপ নিয়েছে। এতো জোরে বাতাস বয়ে যাচ্ছে যে সায়েরীর দীঘল চুলগুলো এলোমেলো উড়ছে মুখজুড়ে। পরপরই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি স্পর্শে, ঠান্ডায়, এবং প্রেমময়ী অনুভূতিতে সায়েরীর মনে হতে লাগলো সে বোধহয় মোমের মতো গলে পড়বে। তার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসতে চাইছে। বৃষ্টির আগমন টের পেয়ে আরও উতলা হয়ে উঠেছে এই টালমাটাল অনুভূতি হতে পালাতে। অথচ বিপরীত পক্ষের মানবটা কেমন নির্বিকার। এতো আরামে, সাচ্ছন্দ্যে চুমু খাচ্ছে যেনো জনম জনম সময় রয়েছে চুমু খাওয়ার জন্য। কোন তাড়াহুড়ো নেই, কোন উগ্রতা, কঠোরতা নেই। সায়েরী মরে গেলেও স্বীকার করবে না ঠিক। কিন্তু এমন কোমল,আদুরে স্পর্শে সে সত্যিই আসক্ত হয়ে পড়েছে। আরামে ঘুম না পেয়ে যায়!
দীর্ঘ একটি চুম্বন। ঠিক কত সেকেন্ড, কত মিনিট কাটলো সাফওয়ান জানে না। জানার প্রবনতা ও নেই তার মাঝে। বহু মাসের উন্মাদনা সব উজাড় করে দিয়ে অনিচ্ছা স্বত্তেও সায়েরীর ঘাড় হতে হাত সরালো সে। দম নিলো বড় করে। তার চেয়েও বৃহৎ দম নিতে দেখা গেলো সায়েরীকে। ছাড় পাওয়া মাত্র হা মুখ করে একাধিক শ্বাস টানলো সে। কপাল ঠেকাল সাফওয়ানের বুকে। নিজেকে বেশ দুর্বল অনুভব হলো। একফোঁটা শক্তি যেনো অবশিষ্ট নেই শরীরে। তার বন্ধ চোখের পাতা তখনো মৃদুমন্দ কাঁপছে। সাফওয়ান তার থুতনি ছুঁয়ে মুখ উঁচু করলো। বন্ধ চোখের পাতায় কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি জল পড়তেই পিটপিট নজর মেলে তাকালো সায়েরী। সাফওয়ান তাকিয়েই ছিলো। দৃষ্টি তখনো সায়েরীর সিক্ত,আরক্তিম ঠোঁট জোড়াতে নিবদ্ধ। কেমন টকটকে লাল হয়ে আছে ঠোঁট দুটো! ফুলেও গিয়েছে কিঞ্চিৎ। সাফওয়ান ভাবলো, বেশি জোড়ে কামড় তো দেয়নি। তবে এমন ফুলে আবারও তাকে আকর্ষণ করার মানে কি? সায়েরী চোখ মেলে তাকালে বাদামি মনির ঘোরলাগা দৃষ্টি জোড়াতে দৃষ্টি মিলতেই আরক্তিম হলো তার ফুলো গালজোড়া। যেই না মাথা নত করবে, তৎক্ষনাৎ তার গাল চেপে টকটকে রক্তিম অধর যুগলে শব্দ করে চুমু খেলো সাফওয়ান। বৃদ্ধ আঙুলে ঠোঁট ছুঁয়ে থেমে থেমে হাস্কি সুরে আওড়াল,
‘ দ্য স্ট্রবেরি ওয়াজ সো জুসি। অ্যান্ড.. ক্রিমি টু। ‘
‘ আ-ই লা-ই-ক ই-ট। ‘
শেষের বাক্যটি ভেঙ্গে ভেঙ্গে অদ্ভুত দুষ্টুমির ছলে বললো সে। বলতে নিয়ে সায়েরীর নাকে নাক স্পর্শ করলো। সায়েরী লজ্জায়, আড়ষ্টতায় জমে গেলো। গাল গরম হয়ে গিয়েছে। সে কক্ষনো ভাবেনি এই ধরনের কথাবার্তা সাফওয়ানের পক্ষেও বলা সম্ভব। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে শুনে। তার ঠোঁট জোড়া ঝালাপালা করে এখন স্ট্রবেরির গুনগান গাইছে! ব্যাডা মানুষ জাতেই অকৃতজ্ঞ।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। সাফওয়ান এবং সায়েরী দুজনের শরীর ছুঁয়েছে অল্প সল্প বৃষ্টি ফোঁটা। এতক্ষণ নির্বিকার থাকলেও এবারে সাফওয়ান মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ালো। এলোমেলো চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করে চট করে পাজা কোলে তুলে নিলো সায়েরীকে। লম্বা কদমে পুণরায় ছাউনির নিচে এসে চেয়ারে বসলো। পূর্বের মতোই উরুর উপর বসিয়ে দিয়েছে সায়েরীকে। সায়েরী উঠে যেতে চাইলো। কিন্তু কোমরে শক্ত করে চেপে বসা সাফওয়ানের বলিষ্ঠ হাতের বাধনে আটকা পড়ে হার মেনে নিতে হলো তাকে। বেশ কিছুক্ষণ পূর্ব অবধি যেই মেয়ে তোতাপাখির মতোন কথার ঝুলি খুলে বসেছিলো। এক চুমুতেই তার কন্ঠ উবে গিয়েছে যেনো। কোন সাড়া নেই, শব্দ নেই। আরক্তিম মুখে নতজানু হয়ে রয়েছে। ঘূর্ণাক্ষরেও ফিরে চাইছে না তার দিকে পলকহীন দৃষ্টি স্থির করে রাখা প্রেমিক পুরুষটার দিকে। তাকে এমন লজ্জাবতী পাতার মতো নুইয়ে পড়তে দেখে সাফওয়ান মিটিমিটি হাসছে। সারপ্রাইজ গিফট গিয়ে তাকে আশ্চর্য করতে এসে রিটার্ন গিফট পেয়ে মেয়েটা এখন নিজেই বোবা বনে গিয়েছে। সাফওয়ানের কাছে ট্রিকসটা দারুণ বলে মনে হলো। ভবিষ্যতে কাজে দিবে বেশ। আপনমনে একথা ভেবে ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেললো সে।
বেলা তখন পাঁচটা প্রায়। সুখ নীড়ে সায়েরীর জন্য বরাদ্দকৃত কক্ষটি হতে শাড়ি চেঞ্জ করে বের হয়েছে সায়েরী। সকালে যেই জিন্স, টপ পরে এসেছিলো পুণরায় সেগুলি গায়ে জড়িয়েছে। তার মুখটা ভার হয়ে আছে। কক্ষ থেকে বের হওয়া মাত্র মুখোমুখি হলো সাফওয়ানের। সে-ও নিজ রুম থেকে বেরিয়েছে মাত্র। চোখাচোখি হতেই সাফওয়ান আগ বাড়িয়ে কিছু একটা বলতে চাইলো বোধহয়। কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দিলো না সায়েরী। সাফওয়ানকে যেনো দেখেয়নি এমন ভাব নিয়ে ধপাধপ সিড়ি বেয়ে নেমে গেলো নিচে। কিচেনে গিয়ে সাফওয়ানের কথামতো অবশিষ্ট খাবার সব বক্সে ভরে নিলো। সুন্দর মতো রেখে দিলো ফ্রিজে। এঁটো থালাবাসন সব সিঙ্কে রয়ে গিয়েছে। সেদিকে আর ধ্যান দিলো না সে। নিজের কাজটুকু করেই বেরিয়ে এলো কিচেন থেকে। সাফওয়ান সদর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। লিভিং রুমের সোফা হতে নিজের ব্যাগটা তুলে নিয়ে সায়েরী নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বের হলো। ঠিক তার এক কদম পেছনে তালে তাল মিলিয়ে হাঁটছে সাফওয়ান। গ্যারেজ হতে গাড়ি বের করে সায়েরীর জন্য যে গাড়ির দরজা খুলে দিবে, আজ সেই ধৈর্য টাও দেখাল না মেয়েটা। ভার মুখে নিজেই দরজা খুলে উঠে বসলো গাড়িতে। সাফওয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কথা বাড়ালো না কোন। নিস্তব্ধতার মাঝে গাড়ি চললো অনেক্ষণ। চুপচাপ বসেও সায়েরী স্থির নেই। বদনজুড়ে অস্থির অস্থির ভাব। এক পর্যায়ে চুপ থাকতে না পেরে সে মুখ খুললো। থমথমে গলায় প্রশ্ন করলো,
‘ সিলেট যাচ্ছেন কবে? ‘
সাফওয়ান একনজর ফিরে তাকালো। শান্ত কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,
‘ আমি কখন বললাম সিলেট যাবো? ‘
‘ তাহলে?আর কোথায় যাওয়ার কথা বলছিলেন?’
সায়েরীর কন্ঠে কৌতূহল। সাফওয়ান সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুত্তর করতে পারে না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখে। সুক্ষ্ম চোখে লক্ষ্য করলে হয়তো দেখা যেতো। স্টেয়ারিং ধরে রাখা তার হাতের আঙুল গুলো অস্বাভাবিক ভাবে নড়ছে। ডান উরু বারে বারে নাড়াচ্ছে অস্থিরতায়। একাধিকবার ঢোক গিলে গলা ভেজাল সে। তপ্ত শ্বাস ফেলে ছোট্ট গলায় জবাব দিলো,
‘ অন্য কোথাও না, সিলেটেই। ‘
সায়েরী এবারে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এতো সুন্দর দিনটাতে ভারী-ভারী কথাগুলো না বললেই কি হচ্ছিলো না? জটিল কথাগুলো শুধু শুধু কেনো শোনালো সাফওয়ান ভাই? গোটা দিনের সকল সুন্দর অনুভূতি মাটিতে গেড়ে গিয়েছে এমন অনুভব হচ্ছে সায়েরীর। রাগে, দুঃখে তার কান্না পাচ্ছে। বিগত কয়েক মাস সাফওয়ান সিলেট যায়নি দেখে সে ধরেই নিয়েছিলো আর হয়তো যাবে না। কিন্তু কোথায় কি! তাকে আরও একবার দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে তুলতে উঠেপড়ে লেগেছে বোধহয় সাফওয়ান ভাই। নয়তো এতো জটিল জটিল বাক্য সব কেনো শোনালো তাকে? আজকের দিনেই বা এসব বলার মানে কি? কি দরকার আজই সায়েরীর ছোট্ট হৃদয়ে এমন বিষাদ ঢেলে দেওয়ার?
মাঝপথে গাড়ি থেমে যেতেই সায়েরীর ঘোর কাটে। লালছে দৃষ্টি মেলে প্রশ্ন চোখে চায় সাফওয়ানের দিকে। তৎক্ষনাৎ সিট বেল্ট খুলে তার দিকে ঝুঁকে আসে সাফওয়ান। আদুরে ভঙ্গিতে প্রেয়সীর গাল ছুঁয়ে দেয়। অবিলম্বে সায়েরীর চোখে জমে থাকা টলমলে জল গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে। তার ভাঙা কন্ঠে একবুক অভিমান উপচে পড়ে–
‘ ওখানে গেলে আপনি আবার আমাকে ভুলে যাবেন, সাফওয়ান ভাই। আবারও বদলে যাবেন আপনি। ‘
সাফওয়ানের বুক কাঁপে অজানা আশংকায়। দ্রুত সায়েরীর গাল মুছে দিলো সে। কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে নরম গলায় বললো,
‘ এমন কিছুই হবে না, বোকাপাখি। কেনো বেশি বেশি ভাবছো? মাত্র কিছু মাসের ব্যাপার। আমি যোগাযোগ রাখবো তো। আগেও দূরে থেকেছি না,হুহ? কিচ্ছু বদলাবে না। আমি মোটেও বদলাবো না। অন্তত তোমার সামনে তো কখনোই না। কান্না থামাও। আজকের দিনে আমি তোমার কান্নাকাটি দেখতে চাইছি না সুবহা। ‘
সায়েরীর কান্না থামে। কিন্তু উদাসীনতা কমে না। এই উদাসীন মুখশ্রী দেখে সাফওয়ান কতশত কথা যে দাফন করে নিলো নিজের মাঝে তার ইয়ত্তা নেই। সে যে এতোটা দুর্বল হৃদয়ের তা পূর্বে কেনো টের পায়নি সে! এই নরম হৃদয়ের মেয়েটা বুকের সবটা জুড়ে রাজত্ব চালাচ্ছে বলেই হয়তো সাফওয়ান নিজর কঠোরতা সব খুইয়ে বসেছে। দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ফেলে ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক হাসি ফোটাল সে। বললো,
‘ কাল-পরশু দুই দিন খুব ব্যস্ত থাকবো। পরশু রাতে না হলেও এরপর দিন অবশ্যই যোগাযোগ করবো। কিছু কথা বলবো তখন, মন দিয়ে শুনবে। আমার সুবহা ভীষণ স্ট্রং আমি জানি। প্যানিক হবে না, কান্নাকাটি করতেও যেনো না শুনি। মনে থাকবে? ‘
সায়েরীর কপালে ভাঁজ পড়ে। কান্না ভুলে কৌতুহল জাগে মনে। অজানা কোন কারণে দুরুদুরু কাঁপে বুকের ভেতরটা। পাল্টা প্রশ্ন করতে চাইলে তক্ষুনি তার ঠোঁটে আঙুল চাপে সাফওয়ান। বলে,
‘ আর কোন কথা না। দুই দিন পর বলবো সব। চোখ মুছে নাও। ‘
বাধ্য মেয়ের মতো সায়েরী আর প্রশ্ন করলো না। কিন্তু চুপচাপ ও বসে থাকতে পারলো না। সাফওয়ান যখন বললো, ‘ কথা বলো ‘। তখন অটোমেটিক মুখের বুলি ছুটলো তার। সাফওয়ানের কাঁধে মাথা রেখে অবশিষ্ট পথ অতিক্রম করলো। সায়েরীর বাড়ির চেয়ে কিছুটা দূরে ব্রেক কষলো গাড়ি। ব্যাগপত্র হাতে নিয়ে সায়েরী ঝটপট নেমে যেতে উদ্যত হলো। এমন মুহূর্তে টান পড়লো বাহুতে। চোখের পলকে সায়েরী মিশে গেলো সাফওয়ানের সুডৌল বক্ষপটে। সাফওয়ান মুখ ডুবিয়েছে সায়েরীর গলার ভাঁজে। পেশিবহুল বাহুবন্ধনীতে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে রেখেছে সায়েরীকে। তার এক একটি তপ্ত নিঃশ্বাস ভীষণ গভীরভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে সায়েরীর গলা, ঘাড। গ্রীবাদেশে ছোট্ট করে ঠোঁট ছুঁয়ে সাফওয়ান অস্পষ্ট, আবদারের সুরে আওড়াল,
‘ আর কিছুক্ষণ বুকে থাকো, সুবহা। ‘
কন্ঠটায় আকুতি মিশে ছিলো বোধহয়। সায়েরীর ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠেছে শুনে। মেয়েটা সেকেন্ড কয়েক কোন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারলো না। পরিস্থিতি বুঝে উঠতে না পেরে বোকার মতো পড়ে রইলো সাফওয়ানের বুকে। ক্ষণিক পর নিজেও আলতো হাতে সাফওয়ানের প্রসস্থ পৃষ্ঠদেশ জড়িয়ে ধরলো। কোন প্রতিউত্তর করলো না। কেবল বুকে মিশে রইলো সাফওয়ানের কথামতো। সাফওয়ান আলিঙ্গন ছাড়লো প্রায় অনেক্ষণ পর। মুখোমুখি হয়ে সায়েরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কোন সুযোগ দিলো না সে। সায়েরীর কপালে দীর্ঘ চুমু এঁকে তাড়া দিয়ে বললো,
অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮০
‘ যাও তাড়াতাড়ি। আমার কাজ আছে, দেরি হচ্ছে। ‘
সায়েরী ভাবুক চিত্তে গাড়ি থেমে নামতে উদ্যত হয়েও কি যেন ভেবে পুণরায় ফিরে তাকালো। নিজ থেকেই গলা জড়িয়ে ধরলো সাফওয়ানের। কম্পিত গলায় বলে উঠলো,
‘ যেই কাজের জন্য যাচ্ছেন দ্রুত সেটা শেষ করে আমার কাছে ফিরে আসুন। আমি অপেক্ষায় থাকবো। ‘
কথা শেষে শব্দহীন চুমু খেলো সাফওয়ানের কপালের মধ্যিখানে। পরমুহূর্তে নিজ ঠোঁটে-ও চুমুর স্পর্শ পেলো সে। কানে ভেসে এলো সাফওয়ানের প্রত্যুত্তর–
‘ আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরবো, বোকাপাখি। ‘
