Home অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৭
সাজিয়া জাহান সুবহা

নাজরাতের সাথে কথা বলে আসার পর থেকেই তার বন্ধুদের চাপে রিতিমতো তিক্ত বিষাক্ত হয়ে উঠেছে আদনান। সেই থেকে যে নুহাশ,আয়ান ও ফায়াজ তার পিছু নিয়েছে, আর ছাড়ার নামই নেই। একজন না একজন সারাদিন লেগেই রয়েছে তার পিছে। সাদিফরা যখন আকদ্ পড়তে মসজিদে এসে হাজির হয়েছিলো ঠিক তখন থেকেই আদনান সুযোগ খোঁজছিলো সাদিফের সাথে একাকী একটু কথা বলার। কিন্তু এই তিন বন্ধুর দুর্দান্ত চালাকির জন্য তা সম্ভব হয়ে উঠেনি। আদনানের চোখের সামনে দিয়ে সাদিফ নাজরাতকে নিজের বউ করে নিলো। কিন্তু দেখে যাওয়া কিচ্ছুটি করার ক্ষমতা ছিলো না তার। তিন কবুল বলার পর যখন সবাই মোনাজাত করার জন্য হাত তুললো কেবল আদনান ছাড়া,তখন নুহাশ নিজে আদনানের হাত মুনাজাতের জন্য তুলে দিয়ে কানে কানে বললো,

‘ বোনের বিয়েতে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে আপনি মনে হয় হইরান হয়ে পড়েছেন, বড়ভাই। যাক গে, আমি তুলে দিলাম হাত। মন থেকে দোয়া করুন। দুজনের যেনো সুখে..র সংসার হয়। তারা যেনো এমন ভাবে চিপকে থাকতে পারে যাতে কোনো তৃতীয় পুরুষ ঢুকতে না পারে ওদের মাঝে। করুন না, দোয়া করুন। ‘
রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো আদনানের। নেহাত পারিবারিক বিষয় বলে চুপ করে আছে। না হয় এই তিন ছেলের সাথে একটা লন্ডাকান্ড বাঁধিয়ে ছাড়তো সে আজ। অন্যদিকে নুহাশের কথা ও কান্ডে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো আয়ান এবং ফায়াজ। চুপচাপ সব সহ্য করা ছাড়া কিছুই করার সাধ্য রইলো না আদনানের। সাদিফের দিকে হিংসাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সবার মাঝে থেকে উঠে গেলো সে। এবার আর তার পিছু নিলো না কেউ। যেহেতু বিয়ে হয়েই গিয়েছে তাই আর কিছুর ভয় নেই।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সাড়ে চৌদ্দ হাত লম্বা মেরুন রঙের শাড়ি টা নিয়ে হিমশিম খেতে লাগলো নাজরাত ও সায়েরী। নাজরাত যদিও শাড়ি পড়তে জানে কিন্তু আজকেরটা ভারী শাড়ি হওয়ায় একা সামলাতে পারছে না সে।তাই হেল্প নিয়েছিলো সায়েরীর। যে আস্ত এক আনাড়ি। সায়েরীর হাতে শাড়ি ধরিয়ে দিয়ে নাজরাত শাড়ির একাংশ কোমড়ে গুজে নিলো। তাকে ঘুরে ঘুরে শাড়ি পেছাতে দেখে সায়েরী নিজেও ঘুরতে লাগলো। ফলস্বরূপ শাড়ি পেছিয়ে দুজনেই ধরাম করে পড়ে গেলো ফ্লোরে।

‘ আহহ!! সায়ু কি করছিস টা কি তুই! শাড়ি কি তোকে পড়তে দিয়েছিলাম আমি?? ‘
‘ আমার কি দোষ! তুই নিজেই তো ঘুরছিলি। শাড়ি হাতে ছিলো তাই ভেবেছি কি না ঘুরলে হয়তো শাড়ি পেছাতে পারবি না। ‘
‘ বাহ! চমৎকার ভাবনা আপনার। এই তুই কি জীবনেও দেখিসনি শাড়ি কিভাবে পরে? বাঙালি মেয়ে হয়ে শাড়ি পরতে জানিস না। গর্দভ একটা। ‘
‘ এখানে গর্দভের কি দেখলি! আমি কি বিবাহিত নাকি যে শাড়ি পরানো শিখবো? শিখার দরকার আমার বরের। এসব কিছু তাকেই সামলাতে হবে। আমি বাবা এই বিশ হাত লম্বা কাপড় পেছানোতে মোটেও ইচ্ছুক নই। ‘
‘ হুহ!! তুমি জেগে জেগে স্বপ্নই দেখতে থাকো। ‘
ফ্লোর থেকে উঠে পূণরায় শাড়ি হাতে নিতেই সায়েরীর মা রুমে ঢুকে। দুজনকে দেখে অবাক হয়ে বলে,
‘ ইয়া আল্লাহ!! এই মেয়েগুলো এখনো তৈরি হয়নি! নাজ! কয়টা বাজে খেয়াল আছে তোর? মেহমান তো এই এলো বলে। ‘

‘ মামীমা দেখো তোমার মেয়ের কান্ড। সব সাজুগুজু আমি নিজেই করে ফেলেছি। এই মেয়েকে শুধু শাড়িটা ধরতে বলেছিলাম।এই সামান্য কাজটাও করতে পারছে না সে।,
‘ এই আহাম্মক টাকেই পেয়েছিলি শাড়ি পরানোর জন্য? ‘
‘ আম্মু আমাকে তোমার আহাম্মক মনে হয়? ‘
‘ মামী ঠিকই বলেছে। তোকে দেখলেই বুঝা যায় কতো বড় মাথা মোটা তুই। ‘
‘ তুই চুপ থাক হারামি। বিনা স্বার্থে সাহায্য করলাম তার কোনো মুল্য নেই। শয়তান মহিলা। ‘
‘ সায়েরী! ভদ্রভাবে কথা বল। তোর দুবছরের বড় হয় নাজরাত। ‘
‘ আজব তো! তোমরা মামী ভাগনী আমার পিছে লেগেছো কেনো? নিজেরাই সাহায্য চেয়েছো,আবার উল্টো সাহায্য পেয়ে আমাকেই বকছো। ভালোমানুষের দামই নেই এই দুনিয়ায়। থাকো তোমরা, গেলাম আমি। ‘
‘ যেতে যেতে দরজা লক করে যা। আমি শাড়ি পরাচ্ছি নাজরাতকে। ‘

গাল ফুলিয়ে সজোরে দরজা বন্ধ করে দিলো সায়েরী। সেদিকে তাকিয়ে হেসে দিলো বাকি দুজন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার আগেই মেহমানদের আগমন ঘটবে। তাই যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব তৈরি হয়ে নিলো সায়েরী। ব্লাক আর গোল্ডেন কম্বিনেশনের একটা গাউন পরলো সে। নরমাল মেকাপ, হালকা ঢেউ খেলানো কোমড় সমান লম্বা চুলগুলো একপাশে ক্লিপ দ্বারা সেট করে বাকিসব ছেড়ে দিলো পিঠময়। ইয়ারিং জুড়া সবে হাতে নিয়েছিলো এমন সময় তার ডাক আসলো বর এসেছে বলে। হিল পায়ে দিয়ে দৌড়ে বেড়িয়ে গেলো সে। গেইট আটকে টাকা নিতে হবে বলে সব ব্যাবস্থা করে রেখেছে। দেরী করা মানেই সব ভেস্তে যাওয়া। কাবিন হলেও বিয়ের মতোই আয়োজন সব। শুধু মেয়ে উঠিয়ে দিবে না এই তফাৎ।

ফায়াজ,আয়ান ও নুহাশ দাড়িয়ে ছিলো দরজার মুখে। সিড়ি বেয়ে সায়েরীদের নামতে দেখে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো তারা।কিন্তু সায়েরীর দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরাতেই ভুলে গেলো ফায়াজ। কালো রঙে কি আমায়িক লাগছে আজ সায়েরীকে! কাধের একপাশে মেলে রেখেছে গোল্ডেন পাড়ের কালো উড়না।রিনিরিনি শব্দ তুলছে হাত ভর্তি কাঁচের চুড়ি।সাইড সিঁথি করা খোলা চুলগুলো হাঁটার তালে তালে লাফাচ্ছে। বরাবরের মতোই হাস্যজ্বল মুখশ্রী। যা আজ আরো আকর্ষনীয় লাগছে।সায়েরী সাথে তোহা ও নাজরাতের দুয়েক জন কাজিন মিলে এগিয়ে আসলো। হিল পায়ে হেটে আসতে বেশ কষ্ট পোহাতে হচ্ছিলো তোহার। হাতে ফুলের ডালা থাকায় ড্রেস্টাও সামলাতে পারছে না সে। সিড়ির শেষ ভাগে এসে হঠাৎ পা ফসকে উঠলো তার। পড়েই যাচ্ছিলো এমন সময় আয়ান এসে বাঁচিয়ে নিলো।

‘ চোখ আসমানে রেখে হাটছিস নাকি? এক্ষুনি পড়লে কি হতো?
‘হাতে এসব নিয়ে এই ভারী কাপড়ে হাটা যাচছে নাকি! ‘
‘ চার চোখ লাগিয়েও হোচট খাচ্ছিস। দুচোখ হলে তো এতোদিনে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকতি। ‘
‘ ঝগড়াটা তোলা রইলো। এখন বরকে স্বাগতম জানাতে চললাম। ‘
আয়ান এবং তোহার কথায় পাত্তা না দিয়ে বাকিদের উদ্দেশ্যে সায়েরী বলে উঠলো,
‘ সব ঠিকঠাক আছে তো? ‘
ফায়াজ বিড়বিড় করে বললো,
‘ ঠিক আর থাকতে দিলি কই! কাজল লাগিয়ে তো সর্বনাশ করলি। ‘
‘ কি বললি? ‘
‘ বলছিলাম সব রেডি আছে। ফিতা লাগিয়ে রেখেছি। ‘
তোহা বললো,

‘ তো তোরা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখ দেখছিস কোন দুঃখে!যা না গিয়ে তাদের এগিয়ে আন। ‘
নুহাশ মুখ ঝামটি মেরে বললো,
‘ দুঃখেই তো দেখছি। তোদের মুখ দেখে ভালো মানুষের জীবন নরক হয়ে যাবে। আমরা টিকে আছি ভাগ্যের জোরে। এই মুখ নিয়ে ভাব দেখাস কতো! যেই না চেহারা, নাম আবার পেয়ারা! ‘
তোহা রেগে গেলো৷ চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বললো,
‘ তোরা এই বেদ্দপটাকে সরা আমার সামনে থেকে। এখানে থাকলে নির্ঘাত আজ খুনাখুনি হয়ে যাবে বলে দিলাম। ‘
ঘরের বাইরে থেকে নাজরাতের চাচ্চুর কন্ঠ ভেসে আসতেই দৌড় লাগালো সায়েরী ও নাজরাতের কাজিনরা। যেতে যেতে তোহাদের কে শাসিয়ে গেলো,
সায়েরী বললো,

‘ যদি ভদ্রভাবে থাকতে পারিস তবে থাক তোরা। আর না থাকতে পারলে তোদের প্রাণপ্রিয় বান্ধবীর বাপ চাচা লাত্থি মেরে বের করে দিবে। তখন রাস্তার মাঝে বসে বসে মশা মারিস সবাই। ‘
গেইটে আটকে রাখা ফিতাটার অপরদিকে এসে দাড়ালো সাদিফ। তাকে গিয়ে সব ভাই, বন্ধু। সায়েরী, তোহা তারাও হাসিমুখে এগিয়ে এসে সালাম জানালো। সাহিল একমুহূর্তের জন্য অবাক হলো সায়েরীকে দেখে। ইভান তোহার হাতে থাকা প্লেট থেকে কাচি নিতে চাইলে দ্রুত প্লেট সরিয়ে নিলো তোহা৷ বললো,
‘ আরে! এভাবে বিনা লেনদেন করেই ঢুকে যেতে নিবো নাকি বেয়াই সাহেব? আগে আমাদের একটু খুশি করুন। ‘
প্রতিউত্তরে ইভান বললো,

‘ বলুন। কতো লাগবে? আমরা আবার মানুষের চাওয়া অপূর্ণ রাখি না।’
সায়েরী জবাব দিলো,
‘বেশি না। এইতো..হাতে গুনে বিশ হাজার দিলেই হবে। ‘
সায়েরীর কথাটা শুনা মাত্রই চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠলো সাহিল ও ইভান। একদফা তর্কাতর্কি করে হার মেনে নিলো দুজন। একে অপরের দিকে তাকিয়ে একই সুরে ডাক দিলো “সাফওয়ান ভাইইইইইই”। বুকের ভিতরটা ধক করে কেঁপে উঠলো সায়েরীর। এতোক্ষণ যাবত মনেই ছিলো না যে সাফওয়ানও আসতে পারে। এবার কি হবে! এই ছেলের সাথে তো সে তর্ক করার কথা কল্পনাও করতে পারে না। না জানি কখন রেগে গিয়ে গাল লাল করে দেয়। সাহিল ও ইভান দুজন দুদিকে সরে গিয়ে মাঝখানে জায়গা করে দিতেই দেখা মিললো সাফওয়ানের। কালো পাঞ্জাবি গায়ে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। সিল্কি চুলগুলো আজ সুন্দরভাবে সেট করা। কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা পাঞ্জাবির হাতা। হাতে ব্ল্যাক লেদারের অ্যাপল ওয়াচ। কালো একজোড়া সু পায়ে। সায়েরী এক নজর দেখে দ্রুত নামায়। সাফওয়ানের পাশে সাফ্রিন সাথে আরো কয়েকজন মেয়ে ছিলো। হয়তো ছেলেদের ভিড় ছিলো বলে সামনে আসেনি তারা। সাহিল ও ইভানের ডাক পেয়ে এগিয়ে আসে সাফওয়ান। সাহিল নিম্ন কন্ঠে বলে,

‘ হেল্প আস ব্রো। এই মেয়ে আজ পকেট ফাঁকা করেই ছাড়বে নাহয়। ‘
‘ যতো চাচ্ছে দিয়ে দে। ‘ সাফওয়ানের নির্লিপ্ত কন্ঠ।
ইভান বলে উঠলো,
‘ পাগল হয়ে গিয়েছো! এই কাবিনে বিশ হাজার দিয়ে দিবো?’
সাহিল বললো,
‘ আর কথা হলো ওদের সামনে হার মানা যাবে না। আমরা ছেলেপক্ষ। ‘
ইভান ও সাহিলের কথা শুনে সাফওয়ান সরাসরি তাকালো সায়েরীর দিকে। স্বাভাবিক ভাবেই জানতে চাইলো,
‘ কতো লাগবে? ‘
সায়েরী আমতাআমতা করে জবাব দিলো,
‘ ব..বিশ হাজার। ‘
সাফওয়ান তর্ক করলো না। সাদিফের কাছে থাকা টাকার প্যাকেট টা নিয়ে রাখলো তোহার প্লেটে। বললো,
‘ এখানে দশ হাজার আছে। ‘

কোনো রূপ কথা ছাড়াই তোহার প্লেট থেকে কাচি নিয়ে সাদিফের দিকে এগিয়ে দিলো সায়েরী। ফিতা কেটে একে একে ভিতরে ঢুকলো সবাই। সাহিল ও ইভান মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলো। এতোক্ষণ পটরপটর করতে থাকা মেয়েটা সাফওয়ানের সামনে কেমন চুপসে গিয়েছে! গাল ফুলিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে ভেতরে ঢুকে গেলো সায়েরী। তার পিছু নিলো তোহা। নুহাশরা নাজরাতের কাজিনদের সাথে বর পক্ষকে আপ্যায়ন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
তোহাকে সায়েরীর পিছে ছুটতে দেখে সাফ্রিনও সবার অগোচরে বান্ধবীদের পিছু নিলো। নাজরাতের রুমে ঢুকে হাতের টাকার প্যাকেটটা বিছানায় ছুড়ে মারলো সায়েরী। বউ সাজে অস্থিরতায় ছটফট করতে থাকা নাজরাত চমকে উঠলো হঠাৎ কান্ডে। পরপরই ঢুকলো তোহা ও সাফ্রিন। নাজরাতকে দেখে ইয়া বড় বড় চোখ করে ঝাপটে ধরলো সাফ্রিন।
‘ বান্ধবী!!! আল্লাহ! কি সুন্দর লাগছে তোকে! ও মাই গড!আমি ভাবতেও পারিনি বউ সাজে তোকে এত্তো সুন্দর লাগবে! ‘
‘ সত্যি এতোটা সুন্দর লাগছে? ‘
‘ এতোটা মানে….উফফ একদম কাতিলানা লুক! ইশশ!! আমার ভোলা ভালা ভাইটার হার্ট আজ ব্লাস্ট করেই ছাড়বি।

‘ চুপ কর। বড় ভাইকে নিয়ে এসব বলতে লজ্জা করছে না! ‘
‘ দেখি দেখি….ওমা! গাল লাল হয়ে যাচ্ছে কেনো? ‘
সাফ্রিনের বাহুতে আলতো চাপড় মারতেই নাজরাতকে একহাতে জড়িয়ে ধরে হেসে ফেলে সে। সায়েরীর দিকে চোখ পড়তেই একেঅপরের দিকে তাকিয়ে আবার তোহাকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে? তোহা কিছু বললো না। বেডের উপর পরে থাকা প্যাকেট টা নিয়ে সায়েরীর পাশে বসে বললো,
‘ তুই নিজেই সাফওয়ান ভাইয়ের মুখের উপর কিছু না বলে টাকা নিয়ে চলে এসেছিস। এখন আবার মুখ ফুলিয়ে রেখেছিস কেনো? ‘
‘ আমি টাকার জন্য মুখ ফুলিয়ে রাখিনি। আমার রাগ লাগছে কারণ তিন দিন ধরে আমার কত্তো প্লানিং ছিলো। গেইট আটকে যতো চাই ততো টাকা নিবো, এন্ট্রিতে স্প্রে করবো,নাজরাতের দেবর, ভাবিদের সাথে মজা করবো। সব পরিকল্পনায় চা ঢেলে দিলো ওই দৈত্য দানবটা। আরে ভাই আমার বোনের বিয়ে, আমি একটু মজাও করতে পারবো না উনার জন্য! ‘

‘ আজব তো! তোকে কি সাফওয়ান ভাই আটকে রেখেছে নাকি? তুই তোর মতো এঞ্জয় কর। তোকে বাঁধা দিতে যাবে নাকি সে? ‘
‘ তোরা জানিস না কতোবড় শোয়ানা এই লোক। সবার সামনে ভদ্র হয়ে থাকবে, কিন্তু কিছু করলেই উনার ডাইনোসরের মতো চোখগুলো দিয়ে এমনভাবে তাকায় যেনো পারলে চোখ দিয়েই গিলে খেয়ে ফেলবে। অসহ্য লোক! ‘
কারো কিছু বলার ভাষা রইলো না সায়েরীর কথার আগে। তোহা ও নাজরাত অসহায় ভঙ্গিতে তাকালো সাফ্রিনের দিকে। যে মনযোগ দিয়ে নিজের মেকাপ ঠিক করতে ব্যস্ত। তাকে দেখে তোহা বলে উঠলো,
‘ তুই এতো রিলেক্স কিভাবে থাকিস বলতো! তোর একমাত্র ভাইয়ের নামে এতো দুর্নাম চলছে আর তুই মেকাপ করছিস?’

‘ এমনভাবে বলছিস যেনো এসব আজ নতুন শুনছি আমি। সেই পাঁচ বছর যাবত শুনে আসছি। অভ্যাস হয়ে গেছে বইন।’
নাজরাত বললো,
‘ আচ্ছা বাদ দে না এসব। সাফা তুই কিছু না খেয়ে বসে আছিস কেনো? সায়ু যা না, বাইরে গিয়ে দেখ গেস্টদের কি লাগবে না লাগবে। ‘
‘ আহা! দেবর ননদ-দের জন্য দরদ একেবারে উথলে উথলে পড়ছে। ‘
‘ তোরা যাবি? ‘
সায়েরী বললো,
‘ যাচ্ছি যাচ্ছি। দেখেছিস,কবুল বলতে না বলতেই পল্টি খেয়ে গেলো। শাশুড় বাড়ির লোকজনদের জন্য এখন বোনকে কথা শুনাচ্ছে। এই দুঃখ আমি কোন ব্যাংকে জমা রাখবো খোদা!’

সাফওয়ান ও ইফাজের মাঝখান বসে অস্থিরতায় পা নাড়তে লাগলো সাদিফ। এই কাজটা ছাড়া অন্যকিছু করার নেই তার। এমন চুপচাপ হয়ে বসে থাকতে থাকতে পা ঝিমঝিম করছে তার। আজ বুঝতে পারছে বিয়েতে বরের অবস্থা কতোটা শোষনিয় হয়। না অন্যদের মতো কম্ফোর্ট হয়ে বসতে পারে,না খেতে পারে,না কথা বলতে পারে। এমন রোবট হয়ে কতোক্ষন বসে থাকা যায়! তারউপর বউটাকে ও সামনে আনছে না। সে কিভাবে বোঝাবে বউকে একনজর দেখার জন্য তার মন ছটফট করছে!
পাশে বসে নিউজফিড স্ক্রল করতে থাকা সাফওয়ানকে দেখে সে মনে মনে ভাবলো এমন চুপচাপ ভঙ্গিতে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া একমাত্র এই ছেলের পক্ষেই সম্ভব। এসব নিয়ম সাফওয়ানের মতো মানুষদের উপরেই প্রযোজ্য। সাদিফতো পারছে না ছুটে বেরিয়ে পড়তে। শুধু বউয়ের সাথে দেখা করার আশায় এসব সহ্য করতে হচ্ছে তার।

‘ এমন করছো কেনো তুমি! সেই কখন থেকে একনাগাড়ে পা দুলিয়ে যাচ্ছো। রিলেক্স হয়ে বসো। এবাড়ির জামাই তুমি। ‘
সাফওয়ানের কথায় দাঁতে দাঁত চেপে নিম্ন কন্ঠে সাদিফ বললো,
‘ এই অস্বস্তিকর জায়গায় রিলেক্স হয়ে বসে থাকা যায়? পর্দার উপাশ থেকে লুকিয়ে একে একে মহিলারা আসছে আর কুচুরফুসুর লাগিয়েই রেখেছে আমাকে নিয়ে। বিয়েই তো করেছি। ডাকাতি করিনি যে এমনভাবে দেখা লাগবে। তারউপর আধ ঘন্টা যাবত বসিয়ে রেখেছে কিন্তু আমার বউটাকে সামনেও আনছে না। এই অবস্থায় কি করে রিলেক্স হবো? আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি অস্থিরতা কাকে বলে।’

পায়ের উপর পা তুলে আয়েশি ভঙ্গিতে বসে সাফওয়ান জবাব দিলো ,
‘ তোমার মনে হয় আমি এসবের ধার ধারবো! আমার বউ, দেখার ইচ্ছে হলেই সবার অগোচরে গিয়ে দেখা করে চলে আসবো কেউ জানতেও পারবে না। আর জানলেও কি! হ্যাভ আই এভার কেয়ার’ড এবাউড সামওয়ান? ‘
গাল ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সাদিফ। সাফওয়ানের কথা মিথ্যে নয়। এই ছেলে বরাবরই নিজের মর্জির মালিক। তার মতের বিরুদ্ধে কেউ তাকে এক চুল পরিমাণ নাড়তে পারবে না।
হাতে জুসের ট্রে নিয়ে সায়েরীকে ঢুকতে দেখে ইভানের নজর গেলো তার উপর। পিছে আরো দুজন ছিলো ট্রে হাতে। সাহিলের বাহুতে ধাক্কা দিয়ে ইভান জানতে চাইলো,

‘ এই মেয়ের কথা বলেছিলি? ‘
সাহিল চোখ তুলে তাকালো। হাস্যজ্জল মুখে সবাইকে জুসের গ্লাস এগিয়ে দেওয়া মেয়েটাকে দেখে আরো একদফা মুগ্ধ হলো সে। ইভান আবারো বললো,
‘ এই মেয়েটাই ছিলো? ‘
‘ হুহ! ‘
‘ তুই তো বলেছিলি বাচ্চা মেয়ে। এখন তো এডাল্ট লাগছে। তবে যাই বলিস চুলগুলো কিন্তু সেই। আমার আবার লম্বা চুল খুব পছন্দ। ‘
‘তোকে এতোকিছু দেখতে বলিনি আমি। ‘

‘ চেতে যাচ্ছিস কেনো আজব! আমার লাইন ক্লিয়ার আছে। এসব বাচ্চা কাচ্চা তুই-ই সামলা। ‘
সায়েরী আজ বেশ দায়িত্বের সঙ্গে ইফাজ ও সাদিফকে জুস দিয়ে সাফওয়ানকে দিতেই যাচ্ছিলো এমন সময় টেবিলের সাথে ধাক্কা লেগে গ্লাসের অর্ধেক জুস গিয়ে পড়লো সাফওয়ানের পাঞ্জাবি তে। হঠাৎ কান্ডে হতভম্ব হয়ে গেলো সাফওয়ান। নুহাশ কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করলো,
‘ এই মেয়েকে নিয়ে কি যে হবে! ‘
সায়েরী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো সাফওয়ানের পাঞ্জাবির দিকে। সাফওয়ানের রাগী চোখে চোখ পড়তেই সে মিনমিন করে বললো,

‘ স…সরি! ‘
সাফওয়ান কিছুই বললো না।নাজরাতের ছোট ভাইয়ের সাথে সে ভিতরে গেলো ড্রেস ক্লিন করতে। সেদিকে তাকিয়ে হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো সায়েরীর মাথায়। সবার অগোচরে টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে অনেকটা দুর্ঘটনার মতোই অল্প পানি ছুড়ে মারলো সাদিফের গায়ে। উপস্থিত সকলে পরপর সায়েরীর এমন কান্ডে হতবাক। নুহাশ,আয়ান,তোহা,ফায়াজ,সাফ্রিন পাঁচ জনেরই মাথায় হাত। এই মেয়ে করছে টা কি!!
আয়ান দ্রুত বলে উঠলো,
‘ সায়ু! তুই যা তো এখান থেকে। আমরা সামলে নিবো। ‘
সায়েরী দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে বললো,

‘ সো সরি ভাইয়া। আমি খেয়াল করিনি। ড্রেসের সাথে পা আটকে গিয়েছিলো। ‘
‘ ইট’স ওকেহ! পানিই তো পরে… ‘
‘ না জুস পরেছে। চলুন আপনাকে ওয়াসরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি।’
‘ জুস কই পানিই তো পড়লো আম.. ‘
সায়েরী ফিসফিস করে বললো,
‘ বলছি তো জুস পরেছে। আমার কথা মেনে নিন। প্রফিট কিন্তু আপনারই। ‘
সায়েরীর কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না সাদিফ। তবুও তার কথায় তাল মিলিয়ে বললো,
‘ হ্যাঁ হ্যাঁ জুস পরেছে। ক্লিন করতে হবে। ‘
সায়েরী দাঁত কেলিয়ে বললো,
‘ হুহ!! চলুন চলুন। ‘

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুচি ঠিক করছিলো নাজরাত। এমন সময় দরজা খোলার আওয়াজ শুনে আয়নাতে তাকাতেই চমকে উঠলো সে। দরজা খুলে দাঁড়ানো মানুষটাও চমকালো নাজরাতকে দেখে। গোল্ডেন কালারের পাঞ্জাবি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদিফ। বরাবরের মতোই চুলগুলো জেল দ্বারা সেট করা। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে রাখা হাতে শুভা পাচ্ছে ধূসর বর্নের ঘড়ি। পায়ে বাদামি রঙের চকচকে একজোড়া সু। সবমিলিয়ে আজ তাকে বর বর লাগছে। কিসব ভাবছে নাজরাত! সে বর না তো কি? এই সুদর্শন পুরুষটা তো এখন তারই বর। তার বর!! ইশশ!! লজ্জায় মাথা নুইয়ে পড়লো নাজরাতের। সাদিফ তখনো আয়নায় একনজরে তাকিয়ে রইলো তার সদ্য বিয়ে করা বউয়ের দিকে। ডার্ক মেরুন শাড়ি, গরজিয়াস মেকাপ, হাত ভর্তি চুড়ি, মাথায় লম্বা করে ঘোমটা সেট করা, কোমড়ে চকচক করছে হোয়াইট স্টোনের কোমড় বিচা। বউ রূপে নাজরাতকে কোনো অপ্সরী থেকে কম বলে মনে হলো না সাদিফের কাছে। তার চোখ যেনো পলক ফেলতেই ভুলে গেছে।

‘ উহুম উহুম!দাঁড়িয়েই থাকবেন নাকি ভিতরে ও ঢুকবেন? ‘
সায়েরীর কথায় হুশ ফিরলো সাদিফের। নড়েচড়ে ভিতরে ঢোকা মাত্রই সায়েরী দরজার ফাঁকে মাথা ঢুকিয়ে বলে,
‘ জামা ক্লিন করার সময় কিন্তু দশ মিনিট ভাইয়া। আমি গেলাম। ব্রেগ অ্যা লেগ, নাজ!! ‘
স্ব শব্দে দরজা লাগিয়ে দিলো সায়েরী। সাদিফের সাথে একা রুমে আছে ভেবেই বুকের ভিররটা ঢিপঢিপ করছে নাজরাতের। হঠাৎ সে অনুভব করলো তার খুব কাছাকাছি সাদিফের অবস্থান। পিছন ঘুরে দাঁড়াতেই গেলেই সাদিফের প্রসস্থ বুকের সাথে পিঠ ঠেকে গেলো তার। শরীর জমে গেলো নাজরাতের। সাদিফ নিজেই তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনলো। দু’হাতে নাজরাতের কানের নিচে হাত রেখে মুখটা উপরে তুলতেই সাদিফের স্পর্শে সর্বাঙ্গে কম্পন ধরলো তার। নাজরাতের লাল হয়ে উঠা গালজোড়ায় বৃদ্ধ আঙুল দ্বারা স্লাইড করে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো তার ললাটে। নাজরাতের সবর্ত্র নিশপিশ করে উঠলো অদ্ভুত অনুভূতিতে। চোখ খিচে সাদিফের জামা খামছে ধরলো সে। নিঃস্বাস ভারী হয়ে উঠেছে তার। নাজরাতের কপালে লম্বা চুমু এঁকে কপালে কপাল ঠেকাল সাদিফ। নেশাভরা কন্ঠে বললো,

‘ বারবার একই ব্যাক্তির প্রেমে পড়া নাকি সার্থক প্রেমের নিদর্শন। আজ আমিও সার্থক নাজরাত। তোমাকে আমার অর্ধাঙ্গিনী রূপে পেয়ে আজ আমি পরিপূর্ণ। ‘
নাজরাতের পিঠে হাত দিয়ে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো সাদিফ। স্বামীর ভালোবাসাময় স্পর্শে তার বুকে গুটিয়ে গেলো নাজরাত। সাদিফের শক্ত আলিঙ্গনে সেও সাড়া দিলো। আলতো করে দুহাত রাখলো সাদিফের পিঠে।

‘ সায়ু! যা তো মা। গেস্ট রুমের কাভার্ডের উপর যে ডালা টা আছে ওটা একটু নিয়ে আয়। বাকি জিনিসে হাত দিস না। ‘
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পাহাড়া দিচ্ছিলো সায়েরী। এমন সময় তার মায়ের এমন বাণী শুনে বিরক্ত হলো সে। বললো,
‘ অন্য কাউকে যেতে বলো না আম্মু। আমি ডিউটি তে আছি।’
‘ রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে কি বিশ্ব রেকর্ড গড়ে তুলছিস তুই! যেটা বলেছি সেটা কর যা। ‘

বন্ধ রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সায়েরী। সে জানে তার মায়ের কথামতো কাজ না করলে এখন তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ এখানেই আরম্ভ হবে। অগত্য গেস্ট রুমের দিকে হাটা দিলো সে। কাবার্ডের উপর রাখা ডালাটার দিকে তাকিয়ে রাগ হলো তার। কে বলেছে এতো লম্বা কাবার্ড তৈরি করতে! যত্তসব খাটো মানুষদের জন্য এক্সট্রা ঝামেলা। লম্বা টোল এনে হিলসহ টোলের উপর দাঁড়িয়ে পড়লো সায়েরী। ডালা টা হাতের নাগালেই এসেছিলো এমন সময় দরজা খোলার আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে তাকালো সে। ওয়াশরুমের দরজা ঠেলে সাফওয়ান কে আসতে দেখে হঠাৎ ঘাবড়ে গিয়ে পায়ের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেললো। চেয়ার উলটে ধপ করে পড়ে গেলো সে। অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের আভাস পেয়ে চোখমুখ খিচে চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। এই বুঝি কোমরটা দুই টুকরো হয়ে গেলো তার। কিন্তু কি আশ্চর্য! ব্যথা ব্যথা ফিল আসছে না কেনো! মনে হচ্ছে যেনো হাওয়ায় ভাসছে সে।

‘ আর ইউ ওকে? ‘
পিটপিট করে চোখ মেলতেই চোখের দৃশ্যপটে সাফওয়ানের মুখটা ভেসে আসতেই চমকে উঠলো সায়েরী। অনুভব করলো সাফওয়ানের প্রসস্ত বুকে তার অবস্থান। দু হাতে সায়েরীকে পাজা কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।
‘ ঠিক আছো তুমি? ‘
‘ এ্যা!!! ‘
সাফওয়ানের নম্র কন্ঠ হজম করতে পারলো না সায়েরী। এই দৈত্য দানব বাজে লোকটার মুখে মিষ্টি কথা শোনা পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বিষয় হবে। সে স্বপ্ন দেখছে না তো! একটু বাজিয়ে দেখা যাক। ধমক শুনলেই কনফার্ম হবে এটাই মি.অ্যানাকন্ডা। কিন্তু কি বলবে সে? আচমকা তার মনে পড়লো মায়ের বিখ্যাত বাণী “বড় ভাই হয় তোর, সম্মান দিয়ে কথা বল”।
কোল থেকে সায়েরীকে নামিয়েই দিচ্ছিলো এমন সময় সায়েরী বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে বললো,

‘ আরে বড় ভাইয়া! কিয়া হাল চাল? ‘
সেকেন্ড পেরুতেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো সায়েরী। সত্যি সত্যিই যেনো কোমড়টা দুই ভাগ হয়ে গেছে তার। আকষ্মিক ব্যাথা পেয়ে শরীর কেমন ঝিমঝিম করছে তার। অশ্রুপূর্ণ চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো সাফওয়ান পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঠোঁট শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য হালচাল জানতে চেয়েছিল বলে এই হাল করবে সায়েরীর? এ কেমন জবাব? সায়েরীকে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে সাফওয়ান সেই আগের মতো করে জানতে চাইলো,

‘ ব্যথা লাগেনি তো? ‘
রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো সায়েরীর। কোল থেকে ফ্লোরে ফেলে দিয়ে আবার আহ্লাদ দেখাচ্ছে! ব্যথা না তো কি আদর পেয়েছে! বহু কষ্টে উঠে দাড়ালো সে। কিন্তু ঠিক করে দাড়াতে পারলো না কোমড়ের ব্যথার জন্য। পা মোচড়ে পরে যেতে নিলেই সাফওয়ান কোমড় আঁকড়ে ধরলো তার। সায়েরী হুমড়ি খেয়ে পড়লো সাফওয়ান বুকে। বিরক্ত হয়ে ধমকে উঠলো সাফওয়ান।
‘ এই মেয়ে, তুমি কি একটা কাজও ঝামেলা ছাড়া করতে পারো না? পারো না যখন তাহলে এতো হুশিয়ারি কে দেখাতে বলেছে,ইডিয়ট? ‘
একেতো শরীরের ব্যথা। তারউপর সাফওয়ানের বকাঝকা শুনে চোখ ভিজে উঠলো সায়েরীর। ভার মুখে সরে আসতে গেলেই চুলে টান লেগে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো সে। আহহহ!!!

সাফওয়ান লক্ষ্য করলো সায়েরীর লম্বা চুল তার পাঞ্জাবির বোতামে আটকে গেছে। তাড়াহুড়ায় চুল টেনে আনতে চেয়ে আরো বেশি পেছিয়ে ফেললো সায়েরী। সাফওয়ান স্পষ্ট লক্ষ্য করলো টকটকে লাল হয়ে উঠা সায়েরীর রক্তিম নাক। কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা চলছে তাতে। সায়েরী যখন চুলের প্যাচ ছাড়ানোতে ব্যস্ত তখনই সাফওয়ান হঠাৎ তার দুহাত রাখলো সায়েরীর কোমরে। সায়েরী চমকে উঠারও সময় পেলো না। তার আগেই সায়েরীর কোমরের দু পাশ থেকে দু’হাতে ধরে মাঝ বরাবর এমনভাবে চাপ প্রয়োগ করলো, যে সায়েরীর মনে হলো হাড্ডি সব মড়মড় করে গুড়িয়ে গেছে। আকষ্মিক ব্যথায় আওয়াজ করতেও ভুলে গেলো সে। শুধু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা অশ্রুকণা। সাফওয়ান যেনো সেটা দেখেও দেখলো না। অতি সাবধানে পাঞ্জাবির বোতাম হতে চুল সরিয়ে নিলো সে। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললো,

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৬

‘ ঘুমানোর আগে ব্যথার স্প্রে করে দিলেই ব্যথা সেরে যাবে। দ্যান ইউ ক্যান স্টার্ট জাম্পিং এগেইন। ‘
সায়েরী বুঝে উঠতে পারে না এই ছেলের মতিগতি। নিজেই বাঁচালো।আবার নিজেই ব্যথা দিলো, নিজেই ব্যথা সরালো আবার যেতে যেতে বাঁশ মেরে গেলো। উফফ্ এই ছেলেকে বুঝে উঠা তার সাধ্যের বাইরে। আপাতত একটু রেস্ট করা দরকার। যদিও সাফওয়ানের এক চাপে অর্ধেক ব্যথা সেরে গেছে। এখন সোজা হয়ে দাড়াতে পারছে। কিন্তু ফ্লোরে পরার কারণে শরীর ব্যথা হয়ে গিয়েছে তার।

অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ৮