অনুভূতি সব তোমায় ঘিরে পর্ব ১
সাজিয়া জাহান সুবহা
বেলা এগারোটা।কোলাহলে ভরপুর ক্যান্টিনের এককোনায় আড্ডায় মশগুল পাঁচ মানব-মানবী। ইন্টার প্রথম বর্ষ অতিক্রম করে দ্বিতীয় বর্ষে উঠতে পেরে তারা বেজায় উচ্ছ্বাসিত। এখন থেকে তাদেরও জুনিয়র আছে। আহা! সিনিয়র হওয়ার মজায় আলাদা।
‘ মামা, চারটা চমুচা দাও তো। ‘
মেয়েলি কন্ঠের আওয়াজ শুনে ফিরে তাকালো নুহাশ। হ্যাংলা পাতলা গড়নের প্রথম বর্ষের একজন মেয়ে। তার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলো সে। মেয়েটি চলে যেতেই সে টেবিলের উপর হাত দ্বারা তবলা বাজিয়ে খুশি খুশি আওয়াজে গাইলো—
হায়ে.. কচি মাইয়া দেখিয়া
পরাণ গেলো জুরাইয়া!!
গান গাইতে দেরি। কিন্তু নুহাশের পিঠে কিল পরতে দেরি নেই। ধুম করে কিল মেরে নিজেই নিজের হাত চেপে আর্তনাদ করে উঠলো তোহা,
‘ আহহ্!! নুহাশ! এটা শরীর না অন্য কিছু! উফফ্, আমার হাত! ‘
কলার উঁচিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বসলো নুহাশ। তোহা’র নাকের ডগার চশমাটা ভালোভাবে ঠেলে দিয়ে বললো,
‘ জানিস যে তোর এই পুটিমাছের মতো শরীরের হাতের মাইরগুলো আমার বা*ল ও বাঁকা করতে পারবে না। তবুও কেনো শুধু শুধু নিজের এনার্জি লস করিস বলতো, চার আনা চোখ কানা? ‘
‘ খবরদার উল্টা পাল্টা নামে ডাকবিনা বলে দিলাম। আর মারবো না তো কি এপ্রিসিয়েট করবো? এভাবে মেয়েদের ইভটিজিং করার জন্য? ‘
‘ লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা… আমি ইভটিজিং করেছি! এতো বড় অপবাদ তুই আমাকে দিতে পারলি কানা বুড়ি? একটা বারও আমার নিষ্পাপ, মায়াবতী থুক্কু মাসুম চেহারাটা চোখে পড়লো না তোর? এতোটা হৃদয়ছাড়া তুই? ‘
‘ হৃদয়ছাড়া? ‘
‘ হুহ,হার্টলেস। ‘
‘ ধ্যাৎ। ‘
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মুখ বাকিয়ে অন্যপাশ ফিরে বসলো তোহা। নুহাশের অবশ্য তোহার রাগ,ঝগড়া নিয়ে কোনোকালেই কোনো মাথা ব্যাথা ছিলো না। আজও নেই। টেবিলে অবস্থানরত বাকিদের দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুঁচকালো নুহাশ। সাফ্রিনের কাধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে সায়েরী। এই মেয়ের আর কাজ কাম নাই। জেগে থাকলে বকবক করবে আর একটু টায়ার্ড হলেই ঝিমুবে। সাফ্রিন নোট বানাতে ব্যাস্ত। অন্যদিকে গালে হাত দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বসে রয়েছে নাজরাত। তার কি হয়েছে জানা নেই নুহাশের। তার একটাই ভয়। এই বুঝি নাজরাত ব্যাগ গুছিয়ে সবাইকে তাড়া লাগালো ক্লাসে যাওয়ার উদ্দ্যেশ্য। তার একটাই যেনো ক্লাস এই কলেজে “পরিসংখ্যান”। কি ছাতার মাথা বুঝে আল্লাহ মালুম। এসব ক্লাস ফ্লাস করার কোনো কালেই কোনো ইচ্ছে নেই তার। পরীক্ষার হলে বসে আশেপাশে তাকিয়ে পাশ করতে পারাটাই তো গর্ভবতী থুক্কু গর্বের ব্যাপার। নুহাশ আর তোহার সাময়িক ঝগড়ায় যে এরা এভাবে আড্ডা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে ফেলবে তা আজ নতুন নয়। প্রথম প্রথম এদের ঝগড়া থামাতে থামাতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো বাকিরা। কিন্তু এখন নুহাশ আর তোহার ঝগড়াটা অতি স্বাভাবিক বিষয় সবার জন্য। বরং ঝগড়া না করাটাই অস্বাভাবিক। প্লেটে করে সিংগারা আর চা নিয়ে হাজির হলো আয়ান এবং ফায়াজ। খেতে খেতে আবারো জমে উঠলো আড্ডা। ঘুমু ঘুমু চোখে হাই তুলে গালে হাত ঠেকিয়ে একটু একটু করে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে সায়েরী। তখনই শুনা গেলো তাদের ক্লাসমেট অর্থির কন্ঠ,
‘ সায়েরী! ফার্স্ট ইয়ারদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানের জন্য পারফর্মেন্স লিস্ট তৈরি করছে অনার্সের সিনিয়র আর টিচার-রা। তুই না গান গায়বি বলেছিলি? ‘
‘ উহু!! ইচ্ছে করছে না। ‘
সায়েরী’র ক্লান্ত গলার জবাব শুনেই তাকে ধমকে উঠলো নুহাশ,
‘ ইচ্ছে করছে না মানে কি হ্যাঁ? এমনিতে হুদাই গান গেয়ে আমাদের কানের পর্দা পাতলা করে ফেলস। এখন গায়বি না কেনো? অর্থি! তুই যা তো। আমরা আসছি। এই তিন ফুট দুই ইঞ্চি আজ কি করে গান না গায় আমিও দেখবো। ‘
নুহাশের কথায় মত পোষন করলো সকলে।গাল ফুলিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো সায়েরী। ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে হেলেদুলে পা বাড়ালো অনার্স ভবনের দিকে। যেতে যেতে এক পেকেট চিপসও কিনে নিলো। এই চিপস নামক বস্তুটা মুখে না পড়া অবধি তার যেনো দিনই শেষ হয়না। অনার্স ভবনের বিশাল হলরুমে সিনিয়র কিছু ছেলে মেয়ে লিস্ট করছে সব পার্ফমেন্সের। সায়েরী অনেক উঁকি ঝুঁকি মেরে চিপায় চাপায় পড়ে শেষ-মেষ পৌঁছাতে সক্ষম হলো সিনিয়রদের সামনে। তাকে দেখেই হাসলো নীতি। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের এই মেয়েটা একটু বেশিই পছন্দ করে সায়েরী-কে। সে হাসিমুখে বলে উঠলো,
‘ আরে,চিপস কন্যা যে!! আজ কি করে এমুখো হলে? ‘
নীতির কাধ অবধি সিল্কি চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে সায়েরী দুষ্টু কন্ঠে প্রতিউত্তর করলো,
‘ যেখানে তোমার মতো সুন্দরীর দর্শন পাওয়া যায়।সেখান থেকে আমি কি করে মুখ ফিরিয়ে রাখি বলোতো? ‘
সায়েরীর বলার ভঙ্গি দেখেই হেসে ফেললো নীতি। সায়েরীর গালে আলতো চাপড় মেরে বললো ‘দুষ্টু’! নীতির পাশ থেকে তার বন্ধু রায়ান উঠে এসে একহাতে কাঁধ জড়িয়ে ধরলো নীতির। সায়েরীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
‘ তুমি ভুল নম্বরে ডায়াল করছো পিচ্ছি আপু। এই নাম্বারের মালিক অনেক আগে থেকেই অন্য দিকে সংযুক্ত আছেন। অনুগ্রহ করে অন্যদিকে গিয়ে নতুন নাম্বার খুঁজুন। ‘
নীতি সায়েরী দুজনেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো রায়ানের কথা শুনে। হাই বেঞ্চে বসে সায়েরী ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললো,
‘ আমার এতো বেকার সময় নেই ভাইয়া। আপনার সম্পদ আপনিই রাখুন। আপাতত গানের লিস্টে আমার সুন্দর নামখানা এড করলে আমি ধন্য হবো। ‘
‘ ঠিক আছে আমি করছি এড। অনুষ্ঠানের তো মাত্র দুই সপ্তাহটাই বাকি।তাই আজ থার্ড পিরিয়ড থেকেই রিহার্সাল শুরু করবো। চলে এসো কেমন? ‘
‘ ঠিক আছে আপু, আমি আসি তাহলে। ‘
‘ আরে দোস্ত বলবি তো কি হয়েছে। মুখটা এমন দশ মন ভারি করে রেখেছিস কেনো সকাল থেকে? ‘
তোহার কথায় চুপসে থাকা মুখখানা আরো চুপসে গেলো নাজরাতের। অসহায় কন্ঠে সে জানালো,
‘ বাসায় প্রপোজাল এসেছে। ‘
নাজরাতের কথা শুনে সবাই একই সুরে বললো, ওহ!
‘ ওহ মানে! আমার বিয়ের কথা চলছে আর তোরা বলছিস, ওহ! ‘
নুহাশ মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিলো,
‘ এতে আর এমন কি! প্রতি মাসেই তো কোনো না কোনো প্রপোজাল আসতেই থাকে। আজ অবধি দেখলাম না একটাও সিরিয়াসলি নিতে। বিয়ে শাদি করতেছস না, হুদাই নিজের সাথে সাথে আমাদেরও প্যারা দিতেছস। ‘
ফুঁসে উঠে নাজরাত। টেবিলে রাখা বই দিয়ে ধুম করে মারে নুহাশের বাহুতে। নাজরাতের রাগ দেখে বাকিরা মিটিমিটি হাসছে। সবার দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে নাজরাত ফের বলে বললো,
‘ আব্বুর সাথে বাব্বাকে কথা বলতে শুনেছিলাম। আব্বু টিকেট করেছে শুনেছি বাড়ি আসবে বলে। কেউ সরাসরি না বললেও আমি জানি কেনো আসছে। (দুহাতে মুখ ঢেকে) আ..আমি বুঝতে পারছি না কিচ্ছু। কয়েক মাস পর এইসএসসি। এরমাঝে এসব….. ‘
হতবাক নয়নে সবাই তাকিয়ে রইলো নাজরাতের দিকে। ব্যাপারটা যে এমন সিরিয়াস তারা বুঝতেই পারলো না। সায়েরী নাজরাতের পাশে বসে একহাতে জড়িয়ে ধরলো ওকে।
‘ কখন থেকে চলছে এসব! আম্মুর কাছে তো ফুপিকে এই ব্যাপারে কিছু বলতে শুনলাম না। আমাকেও কিছু বলিসনি তুই! ‘
‘ এই সপ্তাহ থেকেই চলছে। ভেবেছি প্রতিবারের মতো এটাও চাপা পড়ে যাবে কিন্তু…. শুনেছি পরশু দেখতে আসছে!
তপ্ত শ্বাস ফেললো সকলে। কারো মুখে কিছু বলার ভাষা নেই। সায়েরীর হাতের উপর মাথা রেখে চোখ বুজলো নাজরাত। কয়েক সেকেন্ড অতিবাহিত হওয়ার পর শুনা গেলো তার কাতর কন্ঠস্বর।
‘ আমি এই বিয়েটা করতে চাই না দোস্ত! প্লিজ কিছু কর। ‘
কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো পাঁচ মানব মানবীর চলমান হৃদস্পদন। তোহা আর সায়েরী দুদিক থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো নাজরাত কে। নুহাশের মতো হাস্যজ্জল ছেলেটাও চুপসে গেলো বান্ধবীর কাতর কন্ঠে। তোহা নাজরাতের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বারবার একটা কথা আওড়াতে লাগলো,
‘ দেখতে আসবে বলেছে বলে কি বিয়ে হয়ে যাবে নাকি পাগলী! কেনো এতো চিন্তা করছিস! ‘
তোহার কথাটা নাজরাতের কর্ণগোচর হয়েও যেনো হলো না। আগের মতোই নির্বিকার চিত্তে চোখ বুজে রইলো সে। সায়েরী অসহায় মুখ করে তাকালো বন্ধুদের দিকে। ওর তাকানো দেখে নুহাশ চট করে বলল,
‘ ওই ব্যাটার ইনফরমেশন আছে তোর কাছে? ‘
সোজা হয়ে বসে মাথা নাড়লো নাজরাত। অর্থাৎ নেই। উত্তর শুনেই মুখ বিকৃত করে ফেললো নুহাশ।
‘ শালার! আজকাল প্রপোজাল আসার আগে মেয়েরা নিজেই বায়ো কালেক্ট করে রাখে আর তুই! কিচ্ছু হবে না তোদের দ্বারা। ‘
মুখ কুঁচকে ফেললো নাজরাত। নুহাশকে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান জানতে চাইলো,
‘ তুই কি ছেলের নামটাও শুনিস নি কারো মুখে? কি করে,কোথায় থাকে নাথিং? ‘
নাজরাত একটু ভেবে জবাব দিলো,
‘ এক মিনিট, ছোট আম্মি মজার ছলে ছেলের বায়ো আমাকে দিয়েছিলো। রাগ করে আমি দেখিনি। থাকবে হয়তো মোবাইলে। ‘
বলতে বলতে ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে খোঁজ লাগালো সে। এবং পেয়েও গেলো সঙ্গে সঙ্গে। হাতের মোবাইলটা আয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে তার চোখ গেলো মোবাইল স্ক্রিনে ক্যান্ডিডেট প্লেসে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা Sadman Shahriyar Sadif নামটার দিকে। নাজরাতের বাড়িয়ে দেওয়া মোবাইলটা আয়ান নেওয়ার আগেই একপ্রকার কেঁড়ে নিলো নুহাশ। গভীর মনযোগ দিয়ে তাকালো স্ক্রিনে।
‘ সাদমান শাহরিয়ার সাদিফ!! গোটা বংশের নাম নিজেই নিয়ে বসে আছে। এই ব্যাটার সাথে তোর বিয়া হলে তো তুই তোর বাচ্ছার নামটাও খুঁজে পাবি না রে দিনরাত। পেলেও তিন দুকুনে ছয় খানা লাগিয়ে রাখবি। তখন আমাদের ভবিষ্যতের কি হবে! আমরা কি বাচ্ছা কাচ্ছা পয়দা করবো না? নাহ, এই বিয়ে ক্যান্সেল। ‘
কপাল চাপড়ালো নাজরাত। বাকিরাও হতাশাজনক শ্বাস ফেললো। ছেলের নামটা পড়তেই এই কাহিনি। পুরো বায়ো দেখে আজ ছেলের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করেই ছাড়বে নুহাশ।এতে কোনো সন্দেহ নেই। ভাবুক চিত্তে সকলে তাকিয়ে রইলো নুহাশের দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া দেখার আশায়। সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠলো নুহাশ,
‘ কস কি মামা! মাত্র ২৬ বছর এই ছেলের! কচি বাচ্চা বিয়ে করিয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যত প্রজন্ম দুনিয়ায় ল্যান্ড করার প্রসেসিং ক্যামনে করবে জানে নাকি এই নাদান বাচ্চা? এখনো নাক টিপলে ম্যা ম্যা করবে। নাহ, এই বিয়ে ক্যান্সেল।
খানিক থেমে আবারো বললো,
‘ ওহহো….বড় পোলা! আবার আরেক নাদান ভাইও আছে দেখি। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। যাক তোর কপালে কোনো শাকচুন্নি….মানে ননদিনী নাই। এই দিক দিয়ে বিয়ে করে তুই শান্তি পাবি। ওকে, বিয়ে ফিক্সড। ‘
একটু থেমে আবারো বলে উঠলো,
‘ ছেলে বি এস সি করেছে! এ তো দেখি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রে দিনরাত। নাদান বাচ্চাটা জব ও করে দেখছি। শপিংয়ের টাকা থেকে আমারেও কিছু ধার দিস গো বন্ধু। আমি তোর জিগরী দোস্ত মনে রাখিস। তুই কলিজা দিতে বললে আমি কলিজার লাইন লাগাই দিব তোর সামনে। যত মুরগীর জান যায় আমি নিবো। এতো বিশাল হৃদয়ের একটা বন্ধুর সাথে পাঠানগিরি থুক্কু! পাষাণগিরি তুই করতে পারবি না দোস্ত আমি জানি। আই লাভ ইউ টু…. ‘
খপ করে হায় থেকে মোবাইল কেড়ে নিলো নাজরাত। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড়িয়ে তাকালো নুহাশের দিকে। যেটা দেখে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে বুকে থু থু দিলো নুহাশ।
‘ এমন করে থাকাস কেন? আমার সফট হার্টের দিলে ডর লাগে না বুঝি? ‘
নাজরাত দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘ ইচ্ছে তো করছে কাঁচা চিবিয়ে ফেলি তোকে। আমি বলেছি বিয়ে কীভাবে ভাঙবো আইডিয়া দে। তা না তুই একবার বিয়ে ক্যান্সেল, আবার বিয়ে ফিক্সড। কি সব লাগিয়ে রেখেছিস? ‘
‘ আবে ওই পয়েন্টেই তো আসছিলাম বা*ল। বায়ো না দেখে আইডিয়া দিব ক্যামনে? ব্যাটা যদি পুলিশ টুলিশ হয় তখন দেখা যাবে বিয়ে ভাঙ্গার দ্বায়ে দ্যা হ্যান্ডসাম নুহাশ সিকদার লকাপে বন্দী। তখন সিঙ্গেল রমনীদের কি হবে বল তো দেখি। এই হ্যান্ডসাম আমাকে না দেখতে পেয়ে তারা তো ক্রাশহীনতায় ভুগতে ভুগতে ইন্না-লিল্লাহ হইয়া যাবে রে। ‘
নুহাশের মাত্রাতিরিক্ত কথায় বিরক্ত সকলেই। নাজরাত যেনো ভুলেই গেলো একটু আগের মন খারাপ। হাত জোর করে সে নুহাশের উদ্দেশ্যে রাগী কন্ঠে বললো,
‘ মাফ চাই। ভুল হয়েছে তোর কাছে সলিউশন খুঁজে। আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধ কর তুই এই নন-স্টপ রেডিয়ো। ‘
‘ যাহ! করে দিলাম মাফ। এবার ফোন টা এদিকে দে। নুহাশ এখন সিরিয়াস। পোলার নাম্বার দেওয়া আছে এখানে। ফোন করে বল যে দেখা করবি। কাল লাঞ্চে। ‘
নুহাশের কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলো সকলে। আয়ান ধমকে উঠলো,
‘ পাগল হয়ে গিয়েছিস। এই ছেলের সাথে দেখা করবে নাজরাত! ‘
‘ আরে একা দেখা করতে বলছি নাকি? আমরা আছি ক্যান তাইলে! শুন, তুই ফোন দে। পরশু না দেখতে আসার কথা? তো কাল আমরা সবাই গিয়ে ব্যাটার সাথে রেস্টুরেন্টে মিট করবো। তুই ইনিয়েবিনিয়ে বলবিনি যে বিয়ে করবার মুড এখনো তোর জন্মাই নাই। ব্যাটা যদি তোরে দেখে পটে যায়, তাইলে আমরা মিলে ট্রিট নিবো ১০-১২ হাজারের। তখন দেখবি টাকা বাঁচাতে হলেও এই ব্যাটা বিয়ে করবে না।
ফ্যালফ্যাল করে সবাই তাকিয়ে রইলো নুহাশের দিকে।নাজরাত ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইলো মোবাইল স্ক্রিনে। আইডিয়া টা খারাপ না। কিন্তু কেনো জানি ভয় ভয় লাগছে তার। প্রশ্নবিদ্ধ চোখে সে তাকালো সায়েরীর দিকে। চোখের ইশারায় সায়েরী নিজেও সম্মতি জানালো। সবাই যখন একত্রে থাকবে তাহলে ভয়ের কোনো কারণই নেই। লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করলো নাজরাত। সবার দিকে তাকিয়ে আবারো জানতে চাইলো,
‘ ফোন করি তাহলে? ‘
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো সকলে।নাম্বার ডায়াল করে কল দিলো নাজরাত। ফোনটা লাউডে দিয়ে টেবিলের উপর রাখলো। রিং হচ্ছে। অস্থির অস্থির লাগতে লাগলো নাজরাতের। চারবারের মতো রিং বাজছে। কলটা কেটেই দিবে এমন সময় হুট করে রিসিভ হলো। সাথে শুনা গেলো উপাশ থেকে খুবই নমনীয় এক পুরুষালি কন্ঠস্বর, ‘ হ্যালো? ‘
নিশ্বাস আটকে আসলো নাজরাতের। গলা দিয়ে যেনো কথায় বের হচ্ছে না। নুহাশ চোখ গরম করে তাকালো নাজরাতের দিকে। সায়েরী ধাক্কাধাক্কি শুরু করলো। উপাশ থেকে আবারো হ্যালো বলতেই নম্র কন্ঠে সালাম দিলো নাজরাত। সালামের জবাব নিয়ে পুরুষ-টি জানতে চাইলো,
‘ কে বলছেন? ‘
‘ আ..আপনি সাদমান শাহরিয়ার বলছেন তো? ‘
‘ জ্বি আমিই সাদমান শাহরিয়ার। আপনি কে বলছেন? ‘
‘ আমি নাজরাত। ‘
উপাশে কয়েক সেকেন্ড নিরবতা। তারপর জানতে চাইলো,
‘ কোন নাজরাত!! ‘
বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ইশারায় জবাব চাইলো নাজরাত। ফায়াজ ইশারা দিলো। সে অনুযায়ী বললো,
‘ যাকে আগামী পরশু দেখতে আসবে বলে কথা দিয়েছে আপনার ফ্যামিলি। ‘
আবারো কয়েক সেকেন্ডের নিরবতা। নাজরাত বিরক্ত হয়। কি এতো ভাবছে এই ছেলে!
‘ ওহ আপনি বলছেন! দুঃখিত। নামটা আমার মনে ছিলো না। কিছু কি বলবেন আপনি? ‘
রাগে দাঁতে দাঁত পিষে নাজরাত। কেমন অভদ্র লোক। সোজা মুখের উপর বলছে কিনা নাম মনে নেই। আর কথা বলার ছিলো বলেই তো ফোন দিয়েছে। খুশগল্প করতে তো দেয়নি। নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে জবাব দিলো সে,
‘ আসলে আমি কাল আপনার সাথে দেখা করতে চাইছি। যদি আপনি ফ্রি থাকেন তো.. ‘
‘ ওকেহ। আমি কাল লাঞ্চ টাইমে ফ্রি আছি। আপনি বলুন আপনি কোথায় দেখা করতে চান? ‘
নুহাশ দ্রুত খাতায় রেস্টুরেন্টের নাম লিখে এগিয়ে দিলো নাজরাতের দিকে। সেই অনুযায়ী রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দিলো নাজরাত।
‘ ওকে দ্যান,সি ইউ টোমরো মিস নাজরাত। আল্লাহ হাফেজ। ‘
খট করে কল কেটে গেলো। হতবাক নয়নে নাজরাত তাকিয়ে রইলো ফোনের দিকে। অসন্তুষ্ট গলায় আওড়াল,
‘ এই অভদ্র লোকটাকে তো বিয়ে করার থাকলেও করবো না। মুখের উপর কল কেটে দিলো! আমার কিছু বলার অপেক্ষাও করলো না। হাউ ম্যানার্সলেস! ‘
তিনটা ক্লাস শেষ করে রিহার্সাল করার জন্য অনার্স ভবনের দিকে চললো সায়েরী। সাথে নাজরাত,তোহা এবং সাফ্রিন। আশেপাশে আরো কয়েকজন মেয়ে আছে। কথা বলতে বলতে মাঠ পেরুচ্ছিলো চার বান্ধবী। হঠাৎ কানে আসলো ফার্স্ট ইয়ারের দুজন মেয়ের কথোপকথন ।
‘ দেখ দেখ। উনার কথায় বলেছিলাম সেদিন। কি সুদর্শন এই ছেলে! যেমন আকর্ষণীয় বডি,তেমন অ্যাটিটিউড, তেমনি চেহারা,হাইট। উফফ! আমি তো ফিদা! ‘
কৌতুহল বশত ফিরে তাকালো চার জনেই। ধোঁয়া উড়িয়ে গেইট দিয়ে ঢুকলো একটি কালো রঙের বাইক।সায়েরীর মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে আসলো একটাই নাম, “সাফওয়ান ভাই”! ডার্ক ব্রাউন শার্ট আর হোয়াইট গেবার্ডিন প্যান্ট পরিহিত বাইক চালকের দিকেই আটকে রইলো মেয়েদের মুগ্ধ নজর। দুধ ফর্সা শরীরে যেনো ব্রাউন শার্টখানা ফুটে উঠেছে। বাতাসের তালে তালে উড়তে থাকা তার কালো সিল্কি চুলগুলো ভীষণ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে রোদের ঝলকানিতে। প্রথম বর্ষের মেয়েদের লোভাতুর দৃষ্টি যেনো গিলে খাচ্ছে তাকে। পার্কিং লটে বাইক থামিয়ে বাইক থেকে নেমে দাড়াতেই মেয়েগুলোর দৃষ্টিগোচর হলো সুদর্শন পুরুষটার বলিষ্ঠ দেহখানা। কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা শার্টের হাতা ফেটে যেনো বেরিয়ে আসতে চাইছে তার পেশিবহুল বাহু। প্রায় ছয় ফুট মতো লম্বা মানবটার এই ঘায়েল রূপে মেয়েগুলো পারছেনা এখনই তার গলায় ঝুলে পড়তে।
তোহা,সাফ্রিন, নাজরাত এবং সায়েরী চোখ ফিরিয়ে নিলো। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো বেশ কয়েকটা। এসব যেনো বহুদিনের জানা তাদের। চারজনই নিঃশব্দে পা ফেললো অনার্স ভবনের দিকে। রিহার্সাল রুমে গিয়ে দরজার পাশাপাশি বেঞ্চে হেলান দিয়ে দাড়ালো তারা। তোহা বললো,
‘ দেখলি? সাফওয়ান ভাইয়ার উপর আবারো কিছু সস্তা জেলি চিপকানোর ফন্দি আঁটছে। ‘
তার কথায় নাজরাত হেসে নাজরাত জবাব দিলো,
‘ এখনো তো মাত্র কয়েক মাস পার হলো তারা কলেজ এসেছে। এতেই এই অবস্থা। না জানি সাফওয়ান ভাইয়ার কপালে আরো কতো কি আছে! ‘
দুজনের কথা শুনে বিরক্ত হলো সায়েরী। মুখ কুঁচকে বললো,
‘ এখনো তো বাইরে থেকেই দেখেছে। তাই এই অবস্থা। একবার যখন উনার আসল দজ্জাল রূপ সামনে না তখন বুঝবে, কে খাটিঁ মধু আর কে চিনির ক্যারামেল। ‘
তার কথায় সাফ্রিন অবাক কন্ঠে বললো,
‘ তুই ভাইয়াকে দজ্জাল বলতে পারলি? ‘
সায়েরী দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিলো,
‘ কেনো বলতে পারবো না? আমার এখনো মনে আছে, গত বছর শিক্ষা সফরে উনি আমাকে থাপ্পর মেরেছিলো। ইনফেক্ট তোদের সামনেই মেরেছিলো। আমিতো জীবনেও ভুলবো না কতো বড় দৈত্য দানব এই লোক। ‘
সায়েরীর কথা শুনতে থাকা তিন বান্ধবী হঠাৎ চুপসে গেলো। তোহা আমতাআমতা করে বললো,
‘ হ..হ্যা হ্যা ম..মনে আছে। এবার অফ যা বইন। ”
‘ কেনো অফ যাবো? ‘
নাজরাত খোচা মেরে বললো,
‘ স..সায়ু চুপ কর না প্লিইইজ। ‘
সায়েরী সেদিকে পাত্তা না দিয়ে আবারো একই সুরে বললো,
‘ কেনো চুপ করবো কেনো? খারাপ লাগছে তোদের দ্যা গ্রেটেস্ট সবার প্রিয় সাফওয়ান ভাইয়ের বিরুদ্ধে কথা শুনে? আমার কি মনে হয় জানিস? উনি না কোনো সাধারণ মানুষই নন। মঙ্গল গ্রহের এলিয়েন উনি। বাংলাদেশে পিকনিক করতে এসে এখানেই সেটআপ হয়ে গিয়েছে। নাহলে এতো বড় দামড়া ছেলে হয়ে সবার সামনে একটা মেয়ের গায়ে হাত তুলতে উনার বিবেকে বাঁধলো না? এই সাফা! তুই না আমার কথা মিলিয়ে নিস। উনি আঙ্কেল আন্টির ছেলে হতেই পারে না। উনারা কত্তো সুইট। মাশাল্লাহ একটা মেয়ে জন্ম দিয়েছে সেও চিনির ডিব্বা। কিন্তু ওই সাফওয়ান ভাই! নির্ঘাত হসপিটালে কোনো এলিয়েনের বাচ্চার সাথে এক্সচেঞ্জ হয়ে গি….. ‘
সায়েরীর কথা শেষ করার আগেই তার মুখ চেপে ধরলো সাফ্রিন। ভরকে গেলো সায়েরী। খেয়াল করে দেখলো নাজরাত, তোহা, সাফ্রিন তিনজনের চেহারা ভয়ে থমথমে হয়ে আছে। অজানা আতংকে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো সায়েরীর। তোহার ইশারা অনুযায়ী পেছন ফিরে তাকাতেই যেনো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেলো তার। পাঁচ ছয় হাত দূরত্বে সায়েরীদের অপজিট বেঞ্চেগুলোর পাশেই চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে সাফওয়ান। ভয়ে কলিজা লাফিয়ে উঠলো সায়েরীর। এইবুঝি সাফওয়ান এসে তার ঘাড় মটকে দিলো।
কিন্তু তার কল্পনানুযায়ী কিছুই হলো না। অতি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে রইলো সাফওয়ান। হাতে পারফর্মেন্স লিস্ট যেটাতে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে সে। একটাবারের জন্যও চোখ তুলে সায়েরীদের দিকে তাকালো না সে। যেনো কোনো কথা তার কানেই যায়নি। সাফওয়ানের পাশেই দাড়িয়ে আছে তার তিন বন্ধু বান্ধব। নীতি,রায়ান এবং মিহাদ। তাদের মুখেও থমথমে ভাব। বুঝায় যাচ্ছে, বন্ধুর বিরুদ্ধে এমন কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা তাদের পছন্দ হয়নি। নীতির সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিলো সায়েরী। ব্যাগ কাঁধে চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো রুম থেকে। পেছন পেছন ছুটলো বাকিরা। যেতে যেতে সাফ্রিন এগিয়ে গেলো সাফওয়ানের কাছাকাছি। নিম্নস্বরে বললো,
‘ স্যরি ভাই! সায়েরী এতোকিছু ভেবে বলেনি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড। ‘
সাফওয়ান নিশ্চুপ। নীতি চোখের ইশারায় যেতে বললো সাফ্রিন কে। আরেক নজর সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে গেলো সাফ্রিন।
