Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১২

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১২

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১২
শ্রাবণী ইয়াসমিন

ঘড়ির কাঁটা ভোর ৪টা ছুঁইছুঁই করছে। নিস্তব্ধতায় ভরা সেই নীরব রাত যেন নিজের নিঃশ্বাস চেপে বসে আছে চারপাশে। বাড়ির গেইট টা ধীরে খুলে আবার বন্ধ হয়ে গেলো। জেভিয়ার ঢুকলো ঘরে চুপচাপ, নিঃশব্দ পদক্ষেপে।
গত দুইদিন ধরেই এই সময়টায় সে ফিরছে। গুরুত্বপূর্ণ এক কাজে তাকে এখন বেশিরভাগ সময়ই তাদের গুপ্ত গুদামঘরে কাটাতে হচ্ছে।

ধীরে ধীরে সে আনায়ার রুমের সামনে এসে দাঁড়ায়।
দরজায় হাত রাখে। তালা খুলে খুবই ধীরে রুমে প্রবেশ করে।
দরজা ঠেলতেই এক ধরনের ঘোলা হালকা আলোতে চোখে পড়ে ঘরের নিস্তরঙ্গ নৈঃশব্দ্য। জানালার পাশে রাখা নৈশ বাতির ক্ষীণ আলোয় ঘরটা আবছা দেখা যাচ্ছে।
আনায়া ঘুমিয়ে আছে। এক কোণে, ছোট করে গুটিসুটি মেরে। বুকের কাছে হাত গুঁজে রাখা।
সামনের টেবিলে একটা প্লেটে খাবার ঢেকে রাখা, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে খায়নি সে। জেভিয়ারের চোখ আটকে যায় সেদিকে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে বুক ভেদ করে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে আনায়ার দিকে। চেয়ারে বসে পড়ে বিছানার এক প্রান্তে। আনায়ার শরীরটা ঘুমের তাপে অল্প নড়ছে। তার পরনের টিশার্টটা খানিকটা গুটিয়ে উঠে গেছে পেটের কাছে। সেই মেদহীন, দুধে-আলতা ফর্সা পেটের মসৃণতা অন্ধকারেও চোখে লাগে জেভিয়ারের। নাভির কোণে নিঃশব্দে জমে থাকা নিস্পাপ উষ্ণতা যেন স্নায়ুর মধ্যে ছুরি চালায়।

পাজামার ঢিলেঢালা কাপড় হাঁটু অবধি উঠেছে আর টিশার্টের সামনের গলা থেকে হালকা বুকের ভাঁজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যা একটা শ্বাসরুদ্ধ করা দৃশ্য।
জেভিয়ার চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। তার ভিতরের পুরুষটি যেন জেগে উঠে ফিসফিস করে বলে,
এই মেয়েটাকে পিষে দাও, ভেঙে দাও ওর সব চিৎকার, ছিন্নভিন্ন করে দাও ওর নরম মসৃণ দেহটাকে।
তার গলা শুকিয়ে আসে। হাত মুষ্ঠি করে নিজেকে থামিয়ে দেয় কোনোভাবে। সে জানে এই মুহূর্তে সে চাইলে ওর ভিতর ঢুকে যেতে পারে, ওকে নিজের অধীনে নিতে পারে,
কিন্তু…
সে চায় না এখন।

দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয় সে। চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। আনায়ার দিকে আর তাকায় না।
কিন্তু বুকের ভিতরে তার আগুনটা নিভেও নিভে না।
চোখ নামিয়ে নেয় জেভিয়ার। তার মনের মধ্যে ঠিক তখনই বাজতে থাকে আনায়ার কণ্ঠস্বর। সেই তীক্ষ্ণ বাক্যগুলো, সেই শব্দের ছুরিগুলো যেগুলো সরাসরি এসে বিঁধে গিয়েছিল তার বুকের গভীরে।
—তোমার ছোঁয়া আমার কাছে ঘৃণ্য লাগে। এই হাত দিয়ে তুমি মানুষ খুন করো, আর কত মেয়ের শরীর তোমার এই হাতের স্পর্শে গলে গেছে আমি ভাবতেও পারি না। আমি আর তোমাকে ভালোবাসি না। আমি তোমার কিছুই চাই না।
জেভিয়ারের চোখ ধীরে ধীরে লাল হয়ে ওঠে। চোয়াল কাঁপছে। ভেতরের আগুনটা একেবারে জ্বলে উঠেছে যেন।
সে জানে এই কথাগুলো আনায়া নিজের ইচ্ছেতে বলেনি।
পেছনে আছে সেই ইলোরা। যে মেয়েটা এক সময় তার পা চে/টে/ছে, আজ তার লাভ বার্ডের মনে বিষ ঢেলেছে।
তার সম্পর্কে ঘৃণা ছড়িয়েছে। ইলোরাকে সে দেখে নেবে। নিজ হাতে। ঠিক সময়ে। ধৈর্য ধরে।
কিন্তু, আজকাল আনায়ার সাথে তার এই দূরত্ব যেন তাদের মাঝে দেয়াল তৈরি করে দিচ্ছে। সে জানে আনায়া তাকে দোষ দেয়, ভয় পায়, ঘৃণা করে তবুও সে আনায়াকে ছাড়া ওর এক মহূর্তও থাকতে পারছে না। সে আর ওকে দূরে রাখবে না।

সে এখন ওকে নিজের কাছেই রাখবে।
জেভিয়ার চোখ ঘুরিয়ে আনায়ার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টি
আবারও আটকে যায় আনায়ার শরীরে। টিশার্টের গলার কাছ থেকে উঁকি দেওয়া বুকের মাঝে, যেখানে এক ফোঁটা লাল তিল জমে আছে অবিকল রক্তবিন্দুর মতন।
জেভিয়ার একটা ঢোক গিলে নেয়। তার চোখ আটকে যায় ওই তিলের উপর। সে নিজেকেই নিজে বলতে থাকে,
— আমি সেইখানে হালকা করে কামড় দিলে কি লাভ বার্ড খুব বেশি ব্যাথা পাবে? জেগে উঠবে সে?
তার ভিতরে এখন যুদ্ধ। নিয়ন্ত্রণ আর কামনার। প্রেম আর অধিকারবোধের। আনায়ার নিঃশ্বাস একটু গাঢ় হয়ে আসে ঘুমের ঘোরে।

জেভিয়ারের চোখ এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় ওর ঠোঁটের কোণে।
সে কি এগিয়ে যাবে? নাকি আবার নিজেকে থামাবে?
জেভিয়ার আর নিজেকে থামায় না। ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে আনায়ার দিকে।
তার নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যায় মেয়েটার নরম পেট, গলা, ঘাড়ের পাশ। একেকটা শ্বাস টেনে নেয় গভীরভাবে,
যেন ওর শরীরের ঘ্রাণেই লুকিয়ে আছে কোনো নিষিদ্ধ নেশা। আনায়ার ত্বক থেকে ভেসে আসা সেই নিরীহ মিষ্টি ঘ্রাণ জেভিয়ারের রক্তে বিদ্যুৎ ঢুকিয়ে দিচ্ছে। তার চোখে একরকম নেশা নেমে আসে।
সে আরেকটু কাছে গিয়ে আনায়ার কানের পাশে ঠোঁট রেখে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলে ওঠে,

— তোমার শরীরের ঘ্রাণ আমার এমন এক ব্রেথিং অ্যাডিকশন যেটা ছাড়া আমার সত্তা অবশ হয়ে পড়ে।
আমি অচল হয়ে পড়ি। তাই ভালোবেসে হোক, জোর করে হোক,বা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়ে হলেও আমার কাছেই আটকে রাখবো তোমাকে। তোমার গন্তব্য যা-ই হোক, তার শেষ ঠিকানা হবে জেভিয়ার ড্রেভেন।
তার ঠোঁট আনায়ার ঘাড়ে থেমে থাকে কয়েক সেকেন্ড।
জেভিয়ারের শরীর কাঁপছে না কিন্তু ভেতরে জ্বলছে, পুড়ছে, আরেকটু কাছে যাওয়ার তীব্র তৃষ্ণায়।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে নিচু হয়ে আসে। সেই ছোট্ট লাল তিলটা যেন ওর সমস্ত হুঁশ গিলে নিয়েছে। জিভে তৃষ্ণা, চোখে ক্ষুধা নিয়ে ধীরে ধীরে ওর ঠোঁট এগিয়ে যায় সেই লাল তিলের দিকে। হঠাৎ করেই ঘরের পাশে থাকা জেভিয়ারের পোষা কুকুরটা অসহ্য জোরে ডাকতে শুরু করে।
আনায়ার ঘুম ভেঙে যায় ঝাঁকুনির মতো আতঙ্কে। চোখ বড় বড় করে উঠে বসে সে। আর সামনে জেভিয়ারকে দেখে সেইভাবে ঝুঁকে থাকা অবস্থায়, আনায়া মুহূর্তেই পিছিয়ে যায়! চোখে ভয় আর অবিশ্বাস। শরীরটা কেঁপে উঠছে ওর।
আর জেভিয়ার? তার চোখ লাল হয়ে আসছে। রাগে, বিরক্তিতে কারণ সে জানে, সেই নেশাক্ত তিলের স্বাদ নেওয়ার আগেই মুহূর্তটা ভেঙে গেছে।

তার চোয়াল শক্ত। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চোখ সরিয়ে নেয় জেভিয়ার।
আনায়ার মুখভর্তি ভয়। পেছনে সরে এসে দেয়ালের সাথে সেঁটে আছে সে। আর জেভিয়ার দাঁড়িয়ে আছে সামনে।
ঠোঁট কামড়ে ধরা, আর চোখে একরাশ দুঃসহ তৃষ্ণা।
আনায়ার ভয়ে থরথর কাঁপছে। সে পেছনে সরে গেছে যতটা পারে,আর দেয়ালের সাথে গা সেঁটে বসে আছে যেন ছায়া হয়ে গেছে। জেভিয়ার তার অন্ধকার চোখে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকে তারপর ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে আসে।
এরপর উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকে,
— তুমি ভয় পেয়েছো লাভ বার্ড?খুব ভয় পেয়েছো না?খুব ভয়?ভয় পেয়ো না আমি আছি তো।
চোখে বিকারগ্রস্ত নরম ছায়া,কিন্তু কথায় শিরশিরে হিম!
আনায়া কিছু বলে না,তবে চোখে যে ভয়ের ছাপ তা স্পষ্ট, পোড়া দাগের মতো। আরো একটু পিছিয়ে যায় সে।
সেই মুহূর্তেই জেভিয়ারের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।
ওর ভেতরের আগুন যেন ছিটকে পড়ে বাইরে।

এক ঝটকায় সামনে থাকা কাচের টেবিলে একটা তীব্র লাথি মারে সে। ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল ভাঙা কাচ আর প্লেটের খাবার। ঘরটা অন্ধকারেই ছিল, তবু চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ধ্বংস যেন ভয় গিলে নিচ্ছে।
জেভিয়ার চোয়াল শক্ত করে, দরজার দিকে এগিয়ে যায়। এরপর শব্দ করে করে বন্ধ করে দিয়ে বেরিয়ে যায়।
ঘরটা কেঁপে ওঠে সেই শব্দে।
আনায়া স্তব্ধ। কান্না আসছে,
কিন্তু কাঁদতেও ভয় লাগছে। পেছনে শুধুই নীরবতা।
আর ভাঙা কাচের ওপর ছড়িয়ে থাকা ঠান্ডা খাবার
যেন বলছে, এখানে যুদ্ধ চলছে, ভেতরের আর বাইরে।

আনায়া আর ঘুমাতে পারেনি জেভিয়ার চলে যাওয়ার পর। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে উঠছিল টেবিল ভাঙার সেই আওয়াজ। তার চেহারার অদ্ভুত রাগ ভয়ংকর ঠান্ডা।
আর সেই কণ্ঠস্বরে বলা কথা,
ভয় পেয়ো না, লাভ বার্ড। আমি তো আছি।
তাকে এখন নিজের রুমও অসহ্য লাগছে। দেয়ালগুলো যেন চোখ রাঙাচ্ছে। মনটা ভারী হয়ে আছে, ক্লান্ত লাগছে ভেতরটা। অনেকক্ষণ পরে দরজা খুলে বাইরে বের হয় সে। একটু হাওয়ায় দাঁড়াতে চায়, নিঃশ্বাস নিতে। তবে রুম থেকে বেরুতেই থেমে যায় ওর পা। একটা গড়গড় আওয়াজ কানে আসছে নিচের দিক থেকে।
আনায়া সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে চারপাশে তাকায়। নীচে এসে দরজার দিকে চোখ যেতেই ওর পায়ের নিচের মাটি সরে যায়।

সামনে তাকাতেই আনায়ার দৃষ্টি থমকে যায়। তার পেট উগলে সব বেরিয়ে আসতে চায়।
সামনেই জেভিয়ার হাতে বিশাল এক রক্তমাখা ছুরি। মুখেও রক্ত ছিটকে লেগে আছে। আর তার পায়ের কাছে পড়ে আছে তার প্রিয় এক পোষা কুকুর গলা কা*টা। শুধু চামড়ায় ঝুলে আছে। আরেকটা কুকুর সেই রক্ত চেটে খাচ্ছে একেবারে শান্তভাবে।আর জেভিয়ার সেই কুকুরটার গায়ে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
কোনো ভয়, কোনো দয়া নেই চোখে।
আনায়ার চোখ বড় হয়ে গেছে।শ্বাস আটকে এসেছে।
পেটটা মোচড় দিয়ে উঠছে। সে দাঁড়িয়ে থাকে নিঃশব্দে।
জিভ শুকিয়ে গেছে, পা নড়ছে না। আনায়ার শরীর কাপতে থাকে, সে ধপ করে নিচে বসে পড়ে। মাথা নিচু করে, একটানা বমি করতে থাকে। সব কিছু ভয়, আতঙ্ক, গ্লানি, রাগ বমির সঙ্গে বেরিয়ে আসছে যেন।
আর তখনই জেভিয়ার মাথা ঘুরিয়ে তাকায় ওর দিকে।
চোখে একটুও বিস্ময় নেই, বরং সে যেন জানতো এমন কিছু ঘটতে পারে। সে ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। ভেজা, ছোপ ছোপ রক্তমাখা জুতোর শব্দ।
আনায়া কাঁপতে থাকে। হালকা করে পিছাতে থাকে তার চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে। চোখের সামনে ভাসে শুধু জেভিয়ারের রক্তমাখা মুখ আর ছুরির ঝকঝকে ধার। আনায়ার শরীর একপাশে ঢলে পড়ে। জ্ঞান হারায়,নিঃশব্দে, নিথরভাবে।

আনায়া জ্ঞান হারাতেই জেভিয়ার চুপচাপ এগিয়ে আসে।
দুটো হাতেই রক্ত। তাজা, গা গুলানো, কাঁচা রক্ত। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে আনায়ার পাশে।
আনায়ার নিস্পন্দ শরীরটা নিজের বাম হাতে টেনে তুলে নেয় একটু। তার ডান হাতের রক্তমাখা আঙুলগুলো ধীরে ধীরে আনায়ার গালের ওপর রাখে। একটা হালকা লালচে দাগ ছড়িয়ে পড়ে ওর গালের পাশে। সেই আঙুল দিয়ে সে আস্তে আস্তে গালের ওপর স্লাইড করে। তার ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসির টান।
— আমার কাজে আমি কোনো কিছুর ব্যাঘাত সহ্য করি না।
নিচু গলায় বলে সে, যেন আদর আর হুমকি একসাথে মিশে আছে।
আঙুলটা এবার আনায়ার থুতনির কাছে থামে। সেখান থেকেও এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ে।
— আর আমাকে ছাড়া তুমি যাকে দেখে ভয় পাবে বা যার কারণে আতঙ্কে থরথর করবে তাকে সরিয়ে ফেলতে আমার দুই সেকেন্ডও লাগে না।তুমি শুধু আমাকে ভয় পাবে। শুধুই আমাকে।
চোখদুটো একদম আনায়ার মুখে গেঁথে রাখে সে। তারপর ধীরে সে আনায়াকে কোলে তুলেনেয়।

আনায়া ধীরে ধীরে চোখ মেলে। চোখে ঝাপসা, মাথা ভারী হয়ে আছে। হালকা আলোয় সে বুঝতে পারে, সে ওপরে জেভিয়ারের রুমে। হঠাৎ করেই মনে পড়ে সকালের সেই দৃশ্যটা,
রক্তে ভেজা ছুরি, কুকুরের ক্ষতবিক্ষত দেহ, জেভিয়ারের চোখের নিষ্ঠুরতা।
আনায়া ঝটকা দিয়ে উঠে বসে।
— ও..ওইসব কি সত্যি ছিলো? নাকি আমার ভ্রম? ওইটা সত্যি জেভিয়ার ছিলো?
নিজের মনে বিড়বিড় করতে থাকে। বুকে চেপে বসা আতঙ্কটা এবার গলার কাছ পর্যন্ত উঠে আসে। সে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।
একদম গলার ভেতর থেকে কান্নার রোল বেরিয়ে আসে।
না পারে চিৎকার করে কাঁদতে, না পারে আর সহ্য করতে।
— আমি এইখানে আর থাকতে পারবো না… না… না।
ঘরের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে চিৎকার না করে, চোখ দুটো চাপা দিয়ে গলা চেপে কান্না আটকায়।
ঠিক তখনই দরজার ফাঁক গলে জেভিয়ার ঢুকে পড়ে।
হাতে একটা স্যুপের বাটি সাদা ভাঁজ করা তোয়ালের ওপর রাখা, ধোঁয়া ওঠা গরম। তার মুখে এক বিন্দুও ভাব নেই। সে চুপচাপ এসে বাটিটা পাশে টেবিলে রাখে।

আনায়া তার দিকে তাকাতেই ভয় আর আতঙ্কে সিটিয়ে যায়।
দেয়ালের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে পরে, হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিজের কান্না লুকাতে চেষ্টা করে। জেভিয়ার ধীরে ধীরে তার দিকে এগোয়। আনায়া ভয়ে আরও পেছনে সরে যায় যতটা পারে। হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরে। যেন শব্দটা যেন বের না হয়। শুধু ফুপিয়ে উঠছে একটানা।
জেভিয়ারের চোখে একফোঁটা করুণা নেই। একটা ক্লান্ত, নির্লিপ্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। জেভিয়ার চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। আনায়া জেভিয়ারের হালকা এগিয়ে আসা দেখে সরে যেতে চায়, কিন্তু বিছানার কোনে আটকে যায়।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে এক চামচ স্যুপ তুলে ধরে তার মুখের সামনে এনে ধরে,
একটা নিঃশব্দ, ঠান্ডা আদেশ যেন সেই চোখে।

— খাও।
আনায়ার গা শিরশির করে উঠে। সে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে ছিটকে ফেলে দেয় সেই বাটি। ধোঁয়া ওঠা স্যুপ ছিটকে পড়ে বিছানায়, কার্পেটে, বাটিটা গড়িয়ে যায় একপাশে।
আনায়া ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কেদে ফেলে।
—প্লিজ জেভিয়ার… আমাকে যেতে দাও। আমি এই নরকের জীবন চাইনি।
তার গলার স্বর ভেঙে যায়।
— তোমাকে… তোমাকে আমি ভয় পাই জেভিয়ার…
ভয় পাই! প্লিজ… প্লিজ দূরে থাকো আমার থেকে।
চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। চোখ লাল হয়ে গেছে কান্নায়, কণ্ঠ কাঁপছে। কিছুক্ষণ জেভিয়ার তাকিয়ে থাকে। জেভিয়ার অভিব্যক্তি বোঝার উপায় নেই। সে শুধু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। আলতো করে জামার হাতাটা গুটিয়ে নেয়, যেন কিছুই হয়নি।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলে—

—বসো। আমি এক্সট্রা বানিয়েছি স্যুপ। অন্য বাটিতে নিয়ে আসছি।
জেভিয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই আনায়া যেন হুঁশ ফিরে পায়। চোখের পানি থেমে যায় না, কিন্তু ভিতরের কোথাও একটা প্রচণ্ড চেতনা মাথা চেপে ধরে,
— এইখান থেকে পালাতে হবে,যে করেই হোক আমাকে পালাতেই হবে।
সে উঠে দাঁড়ায় পা কাঁপছে, মাথা ঝিমঝিম করছে,
তবুও মনে হয় জীবন তার এখনই থেমে যাবে যদি সে এইখান থেকে বেরোতে না পারে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে দরজা খোলা। সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না।
সাধারণত এই দরজা তালাবদ্ধই থাক এখন হয়ত জেভিয়ার ভুলে লাগায়নি।
আনায়া ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে এগিয়ে যায়। দরজার বাইরের করিডোরে পা বাড়িয়ে, চারপাশে তাকায়
শুনশান, নিঃশব্দ, জেভিয়ারের কোনো অস্তিত্ব নেই আশেপাশে। তার বুকের ভেতর কাঁপতে থাকা পাখিটা হঠাৎ একটু ডানা মেলে,এই-ই সুযোগ।
কোনো শব্দ নেই তার পেছনে, শুধু আনায়ার হেঁপচে ওঠা নিঃশ্বাসের আওয়াজ আর ছিন্নভিন্ন এক আত্মার কান্না।
এটাই সুযোগ!

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১১

সে নিঃশ্বাস আটকে দম বন্ধ করে বাড়ির মূল দরজার দিকে এগিয়ে যায় এক পা দু পা করে। তখনই পেছন থেকে ভেসে আসে এক কৌতুক মিশ্রিত কণ্ঠ,
— লাভ বার্ড, মেইন গেইটের চাবিটা তো নিয়ে যাও……..

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৩