Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৬
তোনিমা খান

বড্ড সহজ এক সম্পর্ক! অথচ তাতে জড়তার কমতি নেই এক ফোঁটা। এটা স্পষ্ট হয় রাতের অন্ধকারে যখন বিছানার দুই প্রান্তে দু’জন মানুষ নিজেদের যথাসম্ভব গুটিয়ে ঘুমায়। প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলা যেন তাদের জন্য অপরাধ, একে অপরের দিকে তাকানো তো নিষিদ্ধ! এমনি দু’টো সত্তা বহন করে দু’জন দু’জনের অগোচরে।
গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন তপোবনের বুক ধড়ফড় করে উঠলো, সদ্য নিদ্রায় বিঘ্ন ঘটানো আওয়াজটিতে। সে চকিতে উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে বেডসাইড ল্যাম্পটি জ্বালাতেই দৃশ্যমান হয় রূপকথার কুঁচকানো ব্যথাতুর মুখশ্রী। আলো জ্বলে উঠতেই সহসা রূপকথার কুঁচকানো মুখটি মসৃণ হয়ে গেল। বিছানার অপরপাশে মেঝেতে পড়ে আছে সে। তপোবন অবাক কণ্ঠে শুধায়,

–”পড়লে কিভাবে?”
রূপকথা তেরচা চোখে তাকায়। আবার পড়ে দেখাবে নাকি? সে শাড়ি ঠিক করে উঠে দাঁড়ায়। পুনরায় বিছানায় বসে মিহি স্বরে বলল,
–”ঘুমের ঘোরে পড়ে গিয়েছি। আপনার ঘুম ভাঙানোর জন্য দুঃখিত!”
তপোবন প্রতিক্রিয়া হীন শুধায়,
–”ব্যথা পেয়েছ?”
রূপকথা তার দিকে একপলক তাকিয়ে না বোধক মাথা নাড়লো। অতঃপর নীরবে শুয়ে পড়ে আর তপোবনকেও বলে,
–”চিন্তা করবেন না, ঘুমিয়ে পড়ুন।”
উল্টো দিকে কাত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই রূপকথা কোমর ব্যথায় চোখ মুখ কুঁচকে নিলো। ঘুমের ঘোরে অপ্রস্তুত ভাবে পড়ে যাওয়ায় বেশ ব্যথা পেলেও সেটিকে অগ্রাহ্য করার প্রয়াস করল। তখনি চোখের সামনে একটা কিছু ভেসে উঠলো। ব্যথানাশক স্প্রেটির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তপোবনের দিকে। তপোবন ইশারায় সেটি নিতে বলল। গম্ভীর গলায় বলে,

–”ব্যথা সহ্য করতে নেই। ছোট একটি আঘাত বড় কোনো রোগের কারণ হতে পারে। এটা স্প্রে করে নাও। ব্যথা কমে যাবে।”
রূপকথা সেটি নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল। তপোবন তা দেখে বলল,
–”এটা মুভ স্প্রে! খুব ভালো ব্যথা নিরাময় করে।”
রূপকথা তখনো সেটি আঁকড়ে ধরে শুয়ে থাকে। তপোবন আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। বুকটা তখনো ধড়ফড় করছে। বাবা হওয়ার পর থেকে ঘুম হালকা হয়ে গিয়েছে। আর একটু বয়স হয়েছে পর থেকে ঘুম একদম কমেই গিয়েছে। বেড়েছে সন্তানের জন্য ভয়, চিন্তা। ভেবেছিল তানশানের কিছু হয়েছে! আগে তো দরজা খুলে রেখে ঘুমাতো। তানশানের কোনো সমস্যা হলে সে যেন সহজেই বাবার নাগাল পায়। এখন তো আর তার সুযোগ নেই, তাই এই চিন্তাটা আরো প্রবল থাকে অবচেতনেও। আলো নিভে যেতেই রূপকথা ধীরস্থির শাড়ি সরিয়ে সেটি কোমড়ে স্প্রে করল। পুনরায় একদম বিছানার পাশ ঘেঁষে ঘুমাতে নিলে ভেসে আসে তপোবনের ভারী কণ্ঠ।

–”এদিকে এগিয়ে ঘুমাও। আমার নড়াচড়া করার অভ্যাস নেই। আমি যেই কাত করে ঘুমাই সেই কাতেই আবার উঠতে পারি। তাই স্পর্শ লাগার কোনো ভয় নেই। জায়গা নিয়ে আরামে ঘুমাও।”
রূপকথা ঘাড় কাত করে আড়চোখে তাকায় উল্টোদিকে মুখ করে কথা বলা তপোবনের দিকে। আশ্চর্য, লোকটা সব বুঝে যায় কী করে? বয়স্ক বলে তাদের সবদিকে বুঝদার হতে হবে? সে একটু এগিয়ে আসে বিছানার মাঝবরাবর।
তবে মাঝবরাবর শুতে বলাই যেন তপোবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল। তখন সদ্যই ঘুমে লেগে এসেছিল তপোবনের নেত্রদ্বয়। কিন্তু তার ঘুমে নিদারুণ ব্যাঘাত ঘটিয়ে নাক বারাবর ধপ করে কিছু পড়তেই আচমকা ব্যথাতুর শব্দ করে উঠল সে।
নাকের নরম হাড়ে আঘাত লাগায় টলটলে চোখে সে কপাল কুঁচকে হাত বাড়িয়ে ল্যাম্প জ্বালায়‌। মুখের ওপর মেয়েলি এক হাত দেখে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে ঘাড় কাত করে। নাকের ওপর এক হাত দিয়ে কাঁধের উপর নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে রমনীটি‌।
সে নাক ডলতে ডলতে হাতটা আলতো হাতে সরিয়ে রূপকথার দেহের উপর রেখে দিলো। নিজে আরো সরে যায় বিছানার কিনারায়। ল্যাম্প নিভিয়ে আবার ঘুমানোর প্রয়াস করলে অনুভব হয় গলার উপর ধপ করে আবার একটি হাত পড়েছে। তপোবন ধৈর্য্য সহকারে সেটাও সরিয়ে রূপকথার দেহের উপর রেখে দিলো। অতঃপর নিজের নাক চোখ রক্ষা করার প্রয়াসে কাত ফিরে ঘুমায়।
কুয়াশার আবছায়া কেটে কেবল ধরণিতে সূর্যের দেখা মিলছে। তন্মধ্যে ফাঁকা রাস্তার সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো বাবার পেছন পেছন নত শির হাঁটতে থাকা সন্তান। তকদির সিকদার কথা বলতে বলতে হাঁটছেন, তার পেছনে তপোবন পিছে হাত বেঁধে গম্ভীর মুখে ধীর কদমে হাঁটছে আর তপোবনের পেছনে তানশান গম্ভীর মুখে হাঁটছে।
তকদির সিকদার গুরুগম্ভীর গলায় শুধায়,

–“এরোজের অবস্থা দেখেছ, তপোবন?”
–“জি আব্বু।”, তপোবনের শান্ত কণ্ঠে তকদির সিকদার ফিরে তাকায়।
–“কি বুঝলে? এরোজের অবস্থা দেখে তোমার এত নিশ্চিন্তের শান্ত কণ্ঠ আমার হজম হচ্ছে না তপোবন।”
বাবার কঠোর কণ্ঠে তপোবন নত শির চলতে চলতে বলল,
–“অফিসে কথা বলি, আব্বু।”
বলেই তপোবন ছেলের দিকে ফিরে তাকায়। তানশান নীরবে হাঁটছে। তপোবন মৃদু হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–“ঠান্ডা লাগছে আব্বু? কাছে এসো।”

তানশান নীরবে বাবার কাছে চলে আসে। তার সত্যিই ঠান্ডা লাগছে। তপোবন নিজের চাদরের আড়ালে ছেলেকে জড়িয়ে নিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বাবার উষ্ণতা তানশানের জন্য সবচেয়ে প্রিয়কিছু। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
পিছু পড়ে যাওয়া তকদির সিকদার থমথমে নিঃশ্বাস ফেলে চলতে শুরু করলেন। ছেলের সামনে এইসব অসংলগ্ন আলোচনা করতে নারাজ, অথচ ঘরেই আস্ত এক অসংলগ্ন চরিত্রের মানুষ ঘোরাফেরা করে।
হাঁটাহাঁটি করে সকাল সাতটার দিকে তপোবন, তানশান আর তকদির সিকদার বাড়িতে ঢোকে। রূপকথা, মৌনতা সকালে উঠেই জবা আর মাজেদা চাচির সাথে মিলে নাস্তা তৈরি করছে। তারা আসতেই জবা তাদের জন্য চা নিয়ে ছুটলো। এক কাপ চা পান করে যে যার ঘরে যায়। তপোবন ছেলের পিছু পিছু তার ঘরে ঢোকে। ক্লাস রুটিন অনুযায়ী ব্যাগে বই খাতা ঢুকিয়ে রাখে। তানশান শীতে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতেই সে কম্বলের নিচে ঢুকে গিয়েছে। তা দেখে তপোবন ছেলের পড়ার টেবিলের পাশে থাকা শেল্ফের ভেতর থেকে ড্রাই ফ্রুটসের কৌটাটা নামায়। একটা বাটিতে সেগুলো ঢেলে নিয়ে, তানশানের বায়োলজি বইটা সহ তার কোলের উপর রেখে বলে,

–”খাও আর বসে বসে পড়ো।”
বায়োলজি দেখতেই তানশান চোখমুখ কুঁচকে নেয়। বিরক্তিকর বিষয় এটা তার কাছে। এটা পড়তে তার মোটেই ভালো লাগে না। আর প্রতিবার এটার কারণেই সে খারাপ রেজাল্ট করে। তবুও বাবার কথা উপেক্ষা করার সাহস নেই। সে চুপচাপ বইটা হাতে নিয়ে পড়তে লাগল আর একটা একটা বাদাম মুখে তুলতে লাগল।
ছেলের স্কুলে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু রেডি করে, তপোবন‌ তার স্কুল ড্রেস আয়রন করে নেয়। দিনের বেশিরভাগ সময়টা তানশানের কাটে বইয়ের সাথে। শুধু বিকেলে বায়োলজি কোচিং এর পর এক ঘন্টা সে হাদিস পার্ক সহ আশেপাশে ঘোরাফেরা করে, বা কখনো বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে। ছেলের স্বভাব, পছন্দ সবকিছু নিজের মতো হওয়ায় তপোবনের জীবনযাত্রা অনেকটা সহজ। যেহেতু তানশানের বেশিরভাগ সময় কাটে ঘরে তাই তার ঘরে তার প্রয়োজনীয় সবকিছু সে সরবরাহ করে রাখে সে। খাবার থেকে শুরু করে কফি পর্যন্ত।
তপোবন কাজ করতে করতে বলল,

–”আজ তোমার সাথে আমিও স্কুলে যাবো।”
–”কেন?”, তানশান বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই শুধায়।
তপোবনকে একটু ভাবনায় পড়তে হলো জবাবটি দেয়ার জন্য। কেননা ছেলেকে তো নিজেই বারন করেছে রূপকথাকে মা ডাকতে। তবে ছেলে এখন কি বলে তাকে সম্মোধন করবে! সে কিয়ৎকাল সময় নিয়ে বিষয়টা ছেলের উপরেই ছেড়ে দিয়ে বলে,
–”রূপকথা’কে তোমার প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে যাব। একই প্রতিষ্ঠানে পড়বে একে অপরের খেয়াল রাখবে।”
তানশান সাথে সাথেই ধরতে পারল না কথাটির মানে। তাকে সময় নিতে হলো। অতঃপর যখন বুঝতে পারলো সে নিভন্ত স্বরে বললো,
–”ওহ্।”
তপোবন এক পলক তাকায় ছেলের নিভে যাওয়া মুখটির দিকে। বুকভরা উষ্ণ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। অন্তরালে একটাই কথা চলে, এর‌ থেকে কঠিন মুহূর্ত একজন বাবার জন্য আর কিছু হতে পারে না।
একটা বাচ্চার ক্ষেত্রে প্রথমদিন স্কুলে যাওয়ার আনন্দটা যেমন হয়, রূপকথার ক্ষেত্রেও আজ আনন্দটা তেমনি। সে দ্রুত তৈরি হচ্ছে। পড়নে আড়ং এর একটা মাল্টিকালারের প্রিন্টের কটন শাড়ি। তবে সুতির শাড়ি হওয়ায় সেটা কেমন ফুলে ফুলে বসছে মাথায় কাপড় দেয়া যাচ্ছে না। চেঞ্জিং রুম থেকে পাঞ্জাবি পাল্টে এসে তপোবন ও রূপকথার পাশে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। হাতঘড়ি পড়তে পড়তে অবলোকন করে শাড়ির সাথে রূপকথার দ্বন্দ্ব। বেশ কিছুক্ষণ দেখে সে কাবার্ডের উপর থেকে একটা চাবি বের করলো। অতঃপর কাবার্ডের বদ্ধ দরজাটি খুলে কিছু খুঁজতে লাগলো। কাঙ্খিত জিনিসটি পেতেই সে সেটি হাতে নিয়ে রূপকথাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে,

–”তুমি কি এটা পড়বে? শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথায় কাপড় দিতে হয়ত তোমার সমস্যা হচ্ছে। তুমি হিজাব পড়তে পারো এটা কম্ফোর্টেবল হবে তোমার জন্য। এটা একটু পুরোনো তবে নষ্ট হয়ে যায়নি। আমি যত্ন করে রেখেছি, যেমনটা ছিল তেমনি আছে‌। আর কিছুক্ষণ একটু কষ্ট করো, আসার সময় তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু কিনে আনব।”
তপোবনের কণ্ঠে ভরপুর জড়তা ছিল। কেননা এটা পূর্বার। রূপকথা এই বিষয়টা কিভাবে নেবে সেটা সে জানে না। খুব ভালোভাবে যে নেবে না সেই আন্দাজা থেকেই মূলত জড়তার সৃষ্টি। তবে পরিস্থিতির মতো তপোবনের এই জড়তাকেও রূপকথা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। মুহূর্তেই তপোবনের জড়তা গায়েব হয়ে গেল। সে তপোবন মৃদু হেসে হিজাবটা রূপকথার হাতে দেয়।
বিয়ের পর দ্বিতীয়বার নির্জনা বেগম এক চোখ জুড়ানোর মতো প্রশান্তিদায়ক দৃশ্য দেখলো। তবে প্রথমদিনের মতো আজ আর আনন্দ পেলো না বরং তার মুখটা পাংশুটে বরন ধারন করেছে। তপোবন, রূপকথা আর তানশান একসাথে তৈরি হয়ে নিচে নামছে। রূপকথা শাশুড়ির কাছে বলতে গেলে নির্জনা বেগম রাগে গজগজ করে উঠল। তবে কিছু বলার সুযোগ পেল না তপোবনের কারণে। তপোবন মায়ের কাছে বলে দ্রুত বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। আটটা চল্লিশ বাজে, নয়টায় তানশানের ক্লাস।

তানশান শুধু বারবার আড়চোখে রূপকথার দিকে তাকাচ্ছে। মানুষটার উপস্থিতি তার মধ্যে বিন্দুমাত্র বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করতে না পারলেও, তার পড়নের হিজাবটি তার ভেতরে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে। ওটা যে তার মায়ের। এতোদিন যেগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে মাকে অনুভব করতো আজ সেগুলো অন্য কারোর পড়নে দেখে, তার মনে হলো তার মা হারিয়ে যাচ্ছে কারোর মাঝে। তানশান খুব চেষ্টা করছে নিজের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করতে। তবুও মন মস্তিষ্ক যেন অবুঝ হয়ে যায় মায়ের ব্যাপারে।
গাড়ির কাছে আসতেই তপোবন দেখল সে ফোন আনেনি। সে রূপকথা আর তানশানকে বলল,
–”তোমরা গাড়িতে গিয়ে বসো,আমি দুই মিনিটের মধ্যে আসছি।”
তানশান মাথা নেড়ে ফ্রন্ট সিটে গিয়ে বসে পড়লো। রূপকথা গাড়ির কাঁচ ভেদ করে দেখলো সে কোথায় বসবে। বাবা ছেলে সামনে বসবে তারমানে সে পেছনে বসবে। তাই সে পেছনের দরজা টান দিলো কিন্তু খুললো না দরজাটি। ফলশ্রুতিতে সে আরো জোরে জোরে টানতে লাগলো। তার মনে হচ্ছে তার দেহে জোর নেই তাই দরজাটা হয়তো খুলছে না। সে নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে টানাটানি করতে লাগল। তানশান পিছু ফিরে তাকায় এতো টানাটানি দেখে। এক পলক দেখে সে নীরবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রূপকথার পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,
–”পাশে সরুন, আমি খুলে দিচ্ছি।”
রূপকথা বিনা বাক্যব্যয়ে সরে গেল। তানশান মুহূর্তের মাঝেই দরজা খুলে দিয়ে তাকে ইশারা করল ভেতরে বসতে। রূপকথা হা করে তাকিয়ে রইল তানশানের দিকে। সে এতক্ষণ কত কি করল খুললো না অথচ তানশান আসতেই খুলে গেল?

–”কি হলো বসুন!”, তানশানের কথায় রূপকথা হতচকিত মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়। তানশান দরজা আটকে নিজেও এসে নিজের সিটে বসে। তপোবন ও তাড়াহুড়ো করে ফোন নিয়ে এসে গাড়িতে বসল। তানশানকে ক্লাসে পাঠিয়ে তপোবন রূপকথার ভর্তির কাজ সম্পন্ন করল, তাকে নিয়ে কেনাকাটা করলো। আর এই পুরোটা প্রহরে তপোবন একবারও এটা বলতে ইতস্তত বোধ করেনি যে মেয়েটি তার স্ত্রী। বরং গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে অকপটে বলেছে মেয়েটি তার স্ত্রী। নিউমার্কেটের অলিগলিতে আইসক্রিম পার্লার থাকে। তপোবন রূপকথা সেখান থেকে বের হওয়ার পথে, তপোবন রূপকথাকে নিয়ে সেখানে দাঁড়ায়। হাস্যোজ্জ্বল কণ্ঠে বলে,
–”আমাদের ঘরের সকলে বাহিরে বের হলে এখানে আসবেই আইসক্রিম খেতে। সকলের খুব পছন্দ। তোমারো আইসক্রিম নিশ্চয়ই পছন্দ? তুমি কোন ফ্লেভার খাবে বলো।”

–“এই শীতে আইসক্রিম?”, রূপকথা কপাল কুঁচকে শুধায়। তপোবন প্রফুল্ল কণ্ঠে বলল,
–”আইসক্রিমের আবার কোনো কাল আছে না-কি? এর স্বাদের কাছে শীত গরম সব হার মানে। আমার, তানশান, রোজ আর নায়েলের শীতকালে আইসক্রিম খেতে আরো বেশি ভালো লাগে।”
রূপকথার আইসক্রিম খুব পছন্দ। তারা তো সবসময় পাঁচ টাকার আইসক্রিম গুলো খায় যেগুলো লোকেরা হেঁটে হেঁটে বিক্রি করে। সেখানে আইসক্রিম বলতে বরফ, কোনো ফ্লেভার আর থাকে না। সে মিহি স্বরে বললো,
–”আপনার যেটা ইচ্ছা সেটা দিন।”
–”তাহলে চকলেট দিতে বলি, হ্যাঁ? আমি আর তানশান ও চকলেট খাই।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। রূপকথা অবাক হলো লোকটি মেশিনের নিচে কোনটি ধরতেই তাতে আইসক্রিম পড়তে লাগলো। তার চোখেমুখে বিস্মিত ভাব। লোকটি টিস্যুতে মুড়ে আইসক্রিম তার হাতে দিতেই রূপকথা অবাকপানে‌ দেখতে লাগল আইসক্রিমটিকে। এভাবে আইসক্রিম পাওয়া যায়? সে আগে কখনো দেখেনি। তপোবন তাড়া দিয়ে বলল,
–”খাও, গলে যাবে।”
রূপকথা মুখে নেয়। অসম্ভব সুস্বাদু আইসক্রিমটি মুখে তুলতেই তার মুখশ্রী মলিন হয়ে গেল। এতো সুস্বাদু আইসক্রিম যদি শুকতারাকে খাওয়াতে পারত, ও তো নিশ্চিত আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত! সে আর খেতে পারল না আইসক্রিমটি। তপোবনকে বলল,

–”আমি আর খাবো না।”
–”খাবে না মানে? ভালো লাগেনি?”
তপোবন আশ্চর্য হলো। রূপকথা আইসক্রিমটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
–”আমার শীত করছে খেতে পারছি না।”
–”ওহ্, ঠিক আছে দাও।”, তপোবন নিয়ে নেয় আইসক্রিমটা। দু’জনে নিউমার্কেট থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসে। তপোবন নিজের শেষ করে রূপকথার টাও মুখে তুলতে নিলে রূপকথা মৃদু চেঁচিয়ে উঠে বলল,
–”ওটা এঁটো।”
বাধা দিলেও সেটি কার্যকর হলো না। তপোবন মুখে তুলে নিয়েছে আইসক্রিম। সে খেতে খেতে ভীষণ সাবলীল ভাবেই বলল,
–”শুনেছি স্বামী স্ত্রীর এঁটো খেলে না-কি ভালোবাসা বাড়ে। আমাদের মধ্যে এটার বড্ডো কমতি রয়েছে। তাই এটা একটা ভালো উপায় ভালোবাসা বাড়ানোর জন্য।”
তপোবনের ঠোঁটের কোনে উপহাসের হাসি। রূপকথা কপাল কুঁচকে এক পলক দেখলো লোকটাকে। হুটহাট অন্যরকম লাগে লোকটাকে। কিন্তু কখনোই খারাপ লাগেনি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রূপকথা সামনে তাকায়। তপোবন আইসক্রিম শেষ করে রূপকথার সিটবেল্ট বেঁধে দিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।

শীতল সমীরণে ললাট ঢেকে রাখা রুক্ষ শুষ্ক লালচে চুলগুলো উড়ছে। পেয়ারা গাছটির সাথে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শুকতারা মলিন মুখে কাঁধ গলিয়ে সামনে পড় চুলগুলোতে আঙুল প্যাঁচাচ্ছে। নাসারন্ধ্রে তখন ফুরফুর করে প্রবেশ করছে ইলিশ মাছ ভাজার সুঘ্রান। কথায় আছে ঘ্রানে অর্ধভোজন! শুকতারাও ঠিক সেটাই করছে। ইলিশ মাছ ঠিক কবে খেয়েছিল তার মনে নেই। মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছে হয় একটু চেখে দেখার, তবে সেটা যেনো তাদের জন্য বিলাসীতা! অভ্যন্তরীণ ইচ্ছারা আরো তীব্রতর হতে নিলেই শুকতারা দ্রুত কদমে ঘরে চলে যায়। এখানে হরহামেশাই এমন সুস্বাদু খাবারের ঘ্রান ভেসে বেড়ায়।
নিলীমা মাত্রই কচুর লতি কেটে উঠলো। শুকতারা মন্থর গতিতে গিয়ে মায়ের পাশে বসে। মসুর ডাল ধুতে ধুতে নিলীমা তাকায় মেয়ের শুকনো মুখের দিকে। নম্র স্বরে জিজ্ঞাসা করে,
–”কি হলো? মুখটি এমন শুকনো কেন?”
শুকতারা মায়ের প্রশ্নটি এড়িয়ে, জিজ্ঞেস করে,

–”কি রান্না করছ?”
–”ডাল আর কচুর লতি চরচরি করব। তোর তো খেতে ভালো লাগে এটা।”
–”না, ভালো লাগে না। আগে ভালো লাগত। কিন্তু এক সপ্তাহ যাবৎ এটা খেতে খেতে আর ভালো লাগছে না।”, শুকতারার বিলম্বহীন স্বগোক্তিতে নিলীমা ম্লান হাসল। আশ্বাস দিয়ে বলে,
–”আজ একটু কষ্ট করে এটা দিয়ে খা। কাল আমিনাকে দিয়ে বাজার করাব। মাছ ও আনাবো, ঠিক আছে?”
মাছের কথা শুনতেই শুকতারার মুখশ্রী চকচক করে উঠলো। সে আবদার করে বলে,
–”আম্মা, ইলিশ মাছ আনাবে?”
ইলিশ মাছের নাম শুনতেই নিলীমার মুখশ্রী ঠিক একই হারে বিবর্ন হয়ে গেলো, যতটা উজ্জ্বল মুখশ্রী এই মুহূর্তে শুকতারার। সে নিভু স্বরে বলে ওঠে,
–”ইলিশ মাছ? সে তো অনেক দাম রে মা! অতো টাকা তো মায়ের কাছে নেই।”
বরাবরের মতোই শুকতারার জীবনে আর মুখে উজ্জ্বলতা বেশিক্ষন স্থায়ী হলো না। সে লাঠি দিয়ে মেঝে খোঁচাতে খোঁচাতে বলল,

–”ওহ্!”
নিলীমা আঁচলে হাত মুছে মেয়েকে কাছে টানে। শুকতারা লেপ্টে যায় মায়ের বুকে। নিলীমা মেয়ের চুলগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
–”মন খারাপ করিস না মা, এখন তো ভালো কাজ পাচ্ছি। টাকা জমিয়ে সামনের মাসে তোকে ইলিশ মাছ এনে খাওয়াবো। ডিম ওয়ালা!”
শুকতারা ম্লান হেসে মাথা দোলায়। সে জানে এগুলো মায়ের মিথ্যা আশ্বাস। ছোটবেলা থেকে এমন কত শুনেছে! মা মেয়ের আলাপনের মাঝেই কেউ হাঁক ছেড়ে ডাকে নিলীমাকে। সিকদার বাড়ির ড্রাইভারের আওয়াজে নিলীমা মাথায় কাপড় টেনে বের হয়। বরকতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুধায়,
–”জি, ডেকেছেন?”
বরকত মাথা দুলিয়ে বলে,
–”হ, চাচি। এই ব্যাগ গুলা রাইখেন ভেতরে। অনেক গুলা ব্যাগ।”
বরকত সহ আরেকজন লোক চারটা বাজার ভরতি ব্যাগ নিলীমার চৌকাঠে রাখল। নিলীমা অবুঝপানে সবকিছু অবলকন করে জিজ্ঞাসা করে,

–”এগুলো কি? এখানে কেন রাখছেন?”
বরকত উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে কথা বলার মানুষ। সে নিজ স্বভাব অনুযায়ী হাত নেড়ে বলল,
–”আমি কিছু জানি না। এই নেন তপোবন ভাইজান কথা কইব। যা কওয়ার তারে কন।”
নিলীমা জড়তা নিয়ে ফোনটি হাতে নেয়। ফোনটি কানে ঠেকাতেই ভেসে আসে নম্র কণ্ঠে সালাম। নিলীমা সালামের উত্তর দেয়। তপোবন গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
–”কেমন আছেন? শুকতারা কেমন আছে?”
–”জি, শুকতারা ভালো আছে। কিন্তু এগুলো কি? না মানে বরকত এগুলো…”, নিলীমার পুরো বাক্য সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই তপোবন ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–”ওগুলো শুকতারার জন্য, আমি পাঠিয়েছি। আশাকরি এখানে আপনি কোনো বাঁধা দেবেন না। শুকতারা আমার ছোট বোনের মতো। আমি ওকে ভালোবেসে অবশ্যই কিছু দিতে পারি। আমি চাই না আপনি আমাদের ভাই বোনের মাঝে আসুন। এটা আমার অনুরোধ!”
নিলীমা বিলম্বহীন অকম্পিত স্বরে বলে,
–”এগুলো করে আপনি আমায় ঋণী করছেন। আমাদের আর কোনপ্রকার সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমার মেয়েটা আপনার কাছে সুরক্ষিত আছে, ভালো আছে এতোটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট।”
তপোবন নিঃশব্দে চাপা নিঃশ্বাস ফেললো। ভরাট কণ্ঠে বলল,
–”আমি কোন সাহায্য করছি না। যেভাবেই হোক না কেন, আপনারা আমার আরেকটি পরিবার। আগেও যা করতে চেয়েছি তা আমার পরিবার ভেবেই। কিন্তু আপনি সাহায্য ভেবে সেটা ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি সম্মান করি আপনার আত্মসম্মান বোধকে। কিন্তু তাই বলে আপনি আমাদের ভাই বোনের মাঝে আসতে পারেন না। শুকতারা আমার স্ত্রীর বোন, ও আমার পরিবারের আরেকটি অংশ। ওর পাশে আমি সবসময় সবভাবে থাকব, তাতে আপনি বাঁধা দিতে পারেন না।”

নিলীমা কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। ভাই বোন? ভাই বোনের মাঝে ঢোকার সাধ্য তার নেই। নিলীমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাঠানো জিনিসগুলো গ্রহণ করে। স্বল্প ফোনালাপের সমাপ্তি ঘটে শুকতারার সাথে তপোবনের মিষ্টি কথোপকথনের মাধ্যমে। যতক্ষণ কথা বলেছে ততক্ষন শুধু বলেছে বেশি বেশি খাওয়া-দাওয়া করতে হবে আর কিছু লাগলে ভাইজানকে যেন নির্ভয়ে বলে। সর্বশেষে এটাও বলেছে, তাকে শিঘ্রই তার বুবুর কাছে বেড়াতে নিয়ে আসবে। শুকতারার বেশ লাগে বুবুর জামাইকে।
বরকত চলে যেতেই নিলীমা ব্যাগ গুলো খুলে দেখে। এবং খুলতেই সে অবাক হয়ে গেল বিশালাকৃতির দুইটা ইলিশ মাছ দেখে। শুকতারা তো আশ্চর্যান্বিত হয়ে চিৎকার ই করে উঠেছে। খুশিতে আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠে বলে,
–”ও, আম্মা! কতো বড় বড় ইলিশ মাছ!”

আচমকা ম্যাজিকের ন্যায় পূরণ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের আনন্দে খেই হারা শুকতারার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে রইল নিলীমা। বক্ষস্থলে জমে থাকা ক্লেশ, যন্ত্রনা, অসহায়ত্বরা বাড়তে লাগলো। তার মেয়ে দুটোর জীবন তো এমন হওয়ার কথা ছিল না। কেন সে একজন অসহায় মা? একটু ইলিশ মাছ আজ তার মেয়েটার জন্য স্বপ্ন! একজন মানুষের অনুপস্থিতিতে জীবনটা কেনো এত কঠিন হয়ে দাঁড়ালো? নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে তাকে ভরসা করেছিল বলে কি সেই ভরসা ভাঙতে হবে? কি হতো তার করা অন্ধের মতো বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করলে? নাকি মানুষটার সাথে কোনো বিপদ ঘটে গিয়েছে? আদৌ কি বেঁচে আছে? থাকলে তো একবার তাদের খোঁজ নিতো! কতোশত জবাববিহীন প্রশ্ন চলে নিলীমার মনে।
শুকতারা প্রফুল্ল চিত্তে একে একে সব বাজার বের করতে লাগল। যত বের করে ততই অবাক হয়ে যায় শুকতারা। গরুর মাংস, মুরগির, কবুতর, ডিম, গলদা চিংড়ি, দু’টো বড়ো বড়ো ইলিশ মাছ, রুই মাছ সবজি, ফল , নুডুলস সহ আরো অনেক পুষ্টিকর খাবার। এই বয়সী বাচ্চা মেয়েদের হুটহাট কতোকিছু খেতে ইচ্ছে হয় তবে শুকতারার জন্য এগুলো বিলাসীতা ছিল। কিন্তু আজ চোখের সামনে দুধ, হরলিক্স, আইসক্রিম, চকলেট, বিস্কুট, চানাচুর, মিষ্টি সহ আরো অনেক ধরনের বাজে খাবার দেখে শুকতারা আনন্দে রীতিমতো হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে চোখ বড় বড় করে তাকায় মায়ের দিকে। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধায়,

–”আম্মা এইসব আমাদের? তুমি আবার ফেরত দিয়ে দেবে না তো?”
একটু ভালো খাবারের জন্য মেয়ের আহাজারি দেখে , নিলীমা আর পারে না নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে। বিনা অনুমতিতে সেগুলো গড়িয়ে পড়তে লাগল। সে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–”না ফেরত দেবো না। এগুলো সব তোর। যত ইচ্ছে তত খাবি।”
শুকতারার ঝিমিয়ে পড়া আনন্দরা আবারো উজ্জীবিত হয়ে যায়। সে চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–”আম্মা তাহলে একটু তাড়াতাড়ি রান্না করো না! একটা বেজে গিয়েছে। রান্না করতে সময় লাগবে না?”
নিলীমা চোখের পানি মুছে সেগুলো নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। হাসিমুখে বলে,
–”সময় লাগবে না। আমি তাড়াতাড়ি রান্না করে দেবো।”
–”আমি এগুলো গুছিয়ে রাখি, আম্মা?”, শুকতারার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ। নিলীমা সায় জানাতেই শুকতারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাবারগুলো গুছিয়ে রাখতে।

নিজের অফিস কক্ষে বসা তপোবন প্রশান্তির এক নিঃশ্বাস ফেললো। সে বোঝে কথার মনের অবস্থা! সে তো কখনো এরোজ, ইমরোজ আর রোজকে ছাড়া কোনো আনন্দ উপভোগ করতে পারে না।
সেখানে দুই বোন একজন ভালো খাচ্ছে আরেকজন খাবার ই পাচ্ছে না, তার অনুভূতি ঠিক কেমন হয়। তবে কথার মা কখনোই রাজি হয় না সে কোনো সাহায্য করতে চাইলে। এর আগেও সে বলেছিল কাছারি ঘরে না থেকে তাদের দালান সংলগ্ন ভাড়ার ঘরে থাকতে। কিন্তু নিলীমা সাফসাফ না করে দিয়ে বলেছে, সে ঐ ঘরের ভাড়া বহন করতে পারবে না তাই ঐঘরে থাকবে না। আর বিনা ভাড়ায় তো থাকবেই না। নয়তো তপোবন কখনো তাকে কাছারি ঘরে থাকতে দিতে রাজি ছিল না। কাছারি ঘর পরিষ্কার করার জন্য ও মানুষ পাঠিয়েছিল কিন্তু তাকেও ফিরিয়ে দেয় সে। সে ভেবেছিল আজও রাজি হবে না এগুলো নিতে।
আজকের গুরুত্বপূর্ণ দু’টো কাজ সম্পন্ন করতে পেরে তপোবন ফুরফুরে মেজাজে সামনে রাখা ফাইলটি নিয়ে কামড়া থেকে বের হয়।

–”তুমি নাকি কলেজে ভর্তি হয়েছ?”
বরাবরের ন্যায় শাশুড়ির গম্ভীর কণ্ঠে করা প্রশ্নে রূপকথা মিহি স্বরে জবাব দেয়,
–”জি।”
নির্জনা বেগম কুশিকাটা রেখে রূপকথার মুখপানে দৃষ্টি রাখে। চোখে চোখ রেখে শুধায়,
–”কলেজে ভর্তি হয়ে কি করবে?”
শাশুড়ির অদ্ভুত প্রশ্নে কিয়ৎকাল হতবুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে রইল রূপকথা। কলেজে ভর্তি হয়ে মানুষ পড়াশুনা ছাড়া আর কি করে? শাড়ির আঁচল আরেকটু দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে নিয়ে নম্র কণ্ঠে বলল,
–”পড়াশুনা করব।”
–”পড়াশুনা করে কি করবে?”, পুনরায় একই রকম অদ্ভুত প্রশ্নে রূপকথার ইতস্ততা, অস্বস্তি বাড়তে লাগলো। সে আড়চোখে তাকায় মৌনতার দিকে। যে কি-না তাকে দূর থেকে আশ্বাস দিচ্ছে। এখানে আসার আগেও তাকে বুঝিয়েছে, শাশুড়ি যা বলে চুপচাপ শুনতে। যা বলার তপোবন বলবে। তবুও প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সাহস না থাকায় সে বলল,

–”পড়াশুনা করে একজন বড় ডাক্তার হবো।”
–”স্বামীর টাকায় পড়াশুনা করে, ডাক্তার হয়ে তারপর স্বামীর মুখে চুনকালি মেখে অন্য ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যাবে, তাই তো?”
নির্জনা বেগম চোয়াল শক্ত করে বলল। সদ্য সংসারের মারপ্যাঁচে পড়া মেয়েটি আশ্চর্য হয়ে গেল শাশুড়ির ঘৃণ্য মন্তব্যে। সে কিয়ৎকাল নির্বাক, প্রতিক্রিয়াহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শাশুড়ির দিকে। অবুঝ কণ্ঠে শুধায় ,
–”এগুলো কি বলছেন?”
–”ঠিক-ই বলছি। স্বামী বয়স্ক বলেই তো তোমার এত অনীহা সংসারের প্রতি, তপোবনের প্রতি। তাই সংসারের গন্ডি থেকে বের হওয়ার জন্য এই ফন্দি করেছ। স্বামীর টাকায় পড়বে, ভালো খাবে তারপর কোনো যুবক ছেলের হাত ধরে পালিয়ে যাবে। এটাই তোমার পরিকল্পনা, তাই না?”, নির্জনা বেগম রাগান্বিত স্বরে বলল।
বৈবাহিক জীবনে পা দেয়ার পর থেকে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে রূপকথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন ঘৃন্য কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি। সে মেনে নিতে পারল না শাশুড়ির কথাটি। সে এমন ঘৃণ্য চিন্তাধারা লালন করে না। আর না এমন ঘৃন্য কাজ করার রুচি তার মধ্যে রয়েছে।
যেভাবেই হোক না কেনো সে এখন বিবাহিত, কারোর স্ত্রী। এটাই সত্য, আর সে এই সত্য মনেপ্রাণে মেনে চলে। এ জীবনে আর কোনো পুরুষ মানুষের সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষা সে রাখে না। তবে সে কেন নীরবে মেনে নেবে শাশুড়ির এই জঘন্য মতবাদ? সব সহ্য করা যায় কিন্তু বিনা দোষে চরিত্র নিয়ে কথা বলার সাহস কাউকে দেয়া উচিত নয়। টলমলে আঁখি তুলে তাকায় ক্রোধে লালচে বরন ধারণ করা শাশুড়ির মুখের দিকে। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–”কারোর হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে বিয়ের আগেই যেতাম, আম্মা। আপনার বুড়ো ছেলের স্ত্রী হয়ে, এখানে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম না। কিন্তু আমার সেই রুচি আর ইচ্ছে তখনো ছিল না, আজও নেই আর না কখনো হবে।”

–”বাহ্, ভালো কথা জানো! তোমার মা তো বলেছিলো মেয়ে কারোর সাথে উঁচু গলায় কথা পর্যন্ত বলে না। এখন তো দেখছি শাশুড়ির সাথে মুখে মুখেও তর্ক করো। এটাই তোমাদের আসল রূপ তাই না? তোমাদের তো বংশের-ই ঠিক নেই। বাবা ছিল চরিত্রহীন, ফেলে রেখে চলে গিয়েছে কার কাছে যেন! মা মিথ্যাবাদী, মেয়ের পেছনে পড়ে ছিল কতগুলো গুন্ডা, মাতাল। আর আমি এমন মেয়েকে দয়া দেখিয়ে ঘরে উঠিয়েছি। আমার-ই উচিত হয়নি কোনকিছু বিবেচনা না করেই হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া।”, নির্জনা বেগমের কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়েই মৌনতা ব্যগ্র কণ্ঠে বলল,
–”আম্মা? কি বলছেন এগুলো? ওর বাবার কৃতকর্মের খোঁটা ওকে কেন দিচ্ছেন? এতে ওর কি দোষ? ও এমন মেয়ে নয়, আম্মা। সবচেয়ে বড় কথা হলো আপনি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে বর্তমানটা নষ্ট করছেন।”
–”তুমি চুপ করো, মেজো বউ মা। আমাদের মাঝে কথা বলার দুঃসাহস দেখাবে না।”, নির্জনা বেগম ধমকে উঠলো মৌনতাকে। মৌনতা থেমে যায়। আজ পর্যন্ত কখনো শাশুড়ির সাথে তর্কে জড়ানো তো বহুদূর উঁচু গলায় কখনো কথাও বলেনি সে। নির্জনা বেগম পরপরই রূপকথার দিকে তাকিয়ে বলে,
–”আজকে তপোবন আসলে তাকে বলবে, তুমি পড়াশুনা করতে চাও না। যেই মেয়ের বংশের ই ঠিক নেই, সেই মেয়েকে কলেজে পড়ানো মানে নিজ হাতে আমাদের বংশের নাম লাঞ্ছিত করা।”
রূপকথার মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে গেলো আজ তাকে গণ্য করা হচ্ছে, তার পারিবারিক অবস্থান, বাবা-মায়ের কৃতকর্মের দ্বারা। যেই কৃতকর্ম তার বাব মা করেইনি তার ভার কেন কেউ দেবে তাদের মাথার উপর। তারা তো জানে না তাদের বাবা কোথায় আছে? আদৌ কি বেঁচে আছে কি-না! তাহলে কেন তাকে একজন চরিত্রহীন ব্যক্তির মেয়ে বলবে? সে দ্রুত গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মুছে নিয়ে থমথমে মুখে বলল,

–”আম্মা, আমার কোনো ভুল থাকলে কিংবা আমার কাজে আপনি অসন্তুষ্ট হলে, সোজাসুজি আমায় যা বলার বলবেন। দরকার পড়লে বকা দেবেন কিন্তু দয়াকরে আমার মা-বাবাকে নিয়ে কোনোরূপ মন্তব্য করবেন না। আর আমার পড়াশোনার বিষয়টা আপনার ছেলে নিশ্চিত করেছে, তাই তাকেই এই কথাগুলো বলবেন। তাকে বলবেন— যে আমার মতো মেয়েকে পড়াশুনা করালে আপনার এই উঁচু বংশকে লাঞ্ছিত হতে হবে। বাকিটা সে যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমি রাজি আছি তাতে, আসছি।”
অকম্পিত দৃঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলেই রূপকথা জোর কদমে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নির্জনা বেগম রাগে গজগজ করতে লাগলো। তপোবনকে এগুলো বলে বোঝাতে পারলে তো হতোই! সে তো আরো উল্টা ক্ষেপে যাবে তার উপর। অনিশ্চিত অন্ধকার ভবিষ্যতের চিন্তায় বিভোর নির্জনার মুখশ্রী বিবর্ণ হতে লাগলো। তার ছেলেদের জীবনগুলো সবসময় গোছানো থাকবে তো যেমনটা সে চায়? মৌনতা শাশুড়ির কাছে এগিয়ে আসে। আলতো স্পর্শে তার হাত আঁকড়ে ধরে বলে,

–”আম্মা এমন করছেন কেন? রূপথাকে এই কয়দিনে আমি বেশ চিনেছি। আপনার পছন্দে কখনো খুঁত থাকতে পারে না। রূপকথার জন্য তানশান আর ভাইজান ই সবকিছু এটা ও মনেপ্রাণে মানে। আপনি শুধু শুধু চিন্তা করছেন।”
নির্জনা বেগম হাত ঝাড়া দিয়ে মৌনতার হাত সরিয়ে দেয়। তেজি গলায় বলে,
–”না, আমি শুধু শুধু চিন্তা করছি না। এমনি হয় প্রতিবার। স্বামী সংসার তার কাছে সবকিছু বলে বলে, সেও একদিন সকলকে মিথ্যা প্রমাণ করে চলে গিয়েছিল। রেখে গিয়েছিল তিনটা ছোট্ট ছোট্ট অবুঝ শিশুকে। আমি দেখেছি তাদের, মায়ের জন্য তরপাতে। একটা হাসিখুশি পরিবারকে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেতে দেখতে বুকটা ছিঁড়ে যায়, বউমা। তপোবন এমনিতেই জীবনে দুই দুইবার ধাক্কা খেয়েছে। এখন আর তার মাঝে জীবন নিয়ে কোন আকাঙ্ক্ষা, আহ্লাদ নেই। ভেবেছিলাম কম বয়সী মেয়ে জীবনে আসলে জীবনটা একটু রঙিন হবে। কিন্তু দেখো সেই তো আবারও নিজে যেচে বিপদ ডাকছে সে। আমার কথা কেউ কখনো শোনেনা। আমি কারোর খারাপ চাই বলো? আমি শুধু চাই যেকোনো পরিস্থিতিতে আমার ছেলে মেয়েগুলো যেন ভালো থাকুক। তাদের জীবনে কোনো কষ্ট না থাকুক।”

মৌনতা ম্লান হেসে, পুনরায় শাশুড়ির হাত আঁকড়ে ধরলো। মিহি স্বরে বলল,
–”আমি জানি তো আপনি সব আপনার সন্তানদের ভালোর জন্য করেন। কিন্তু তাই বলে অনিশ্চিত কোনো ভাবনার জন্য আপনি এক নির্দোষ মানুষকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারেন না। রূপকথার উপর ভরসা রাখুন, আম্মা। পরিস্থিতি ওকে যথেষ্ট পরিপক্ব করে তুলেছে। দেখবেন ও পড়াশুনা সামলে ঠিক ভাইজান আর তানশানের ও খেয়াল রাখতে পারবে।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৫

–”এমনটা যেনো হয় মেজো বউমা‌। আমি ওদের আর কোনো কষ্টে দেখতে পারবো না। আমার ছেলেদের জীবন এতো এলোমেলো কেন, বলতে পারো?”
নির্জনা বেগম উদাসীন কণ্ঠে বলে। মৌনতার ও মুখশ্রী মলিন হয়ে গেল। লোকে তো শুধু চাকচিক্য আর সমাজের অবস্থান দেখে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ এই হৃদয়ভাঙা গল্পগুলো কি কেউ জানে? কেউ কি জানে এই দামি শাড়ি, গহনা, কৃত্রিম হাসির আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া অন্তরে কত ক্লেশ?

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ১৭