Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৬

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৬
তোনিমা খান

নির্জনা বেগম পুরো ঘরময় তোড়জোড় চালাচ্ছেন। এখানে ওটা রাখো, অমুকের জন্য এটা এনে রাখো, ওটা এনে রাখো।
তখন ড্রাইভার ডালায় ডালায় মিষ্টি এনে রাখছে বসার ঘরে। নির্জনা বেগম সেগুলো দেখতে দেখতে মৃদু বিরক্তি নিয়ে তাকায় তানশানের দিকে। তানশান অজশ্রবারের মতো অনুনয় করে বলল,
–”দাদুমনি প্লিজ!”
–”কোনো প্লিজে কাজ হবে না, দাদুভাই। জন্মদিনের উপহার রাত বারোটার সময় দিতে হয়। আর তুমি তোমার উপহার রাত বারোটায় পাবে। এখন আমার পিছু ছাড়ো, অনেক কাজ আছে। এখনো ফল পরিমাণ মতো আনেনি তোমার বাবা। তিন তিনটা ছেলে অথচ সব আমায় আনাতে হচ্ছে ড্রাইভার দিয়ে।”, নির্জনা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন।
দাদুর কথায় তানশান অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় ঘড়ির দিকে দুপুর আড়াইটা বাজে মাত্র। রাত বারোটা যেন কয়েক দশক দূরত্বের সমান মনে হলো তার কাছে।
সে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,

–”দাদুমনি বারোটা বাজতে আর অল্প কিছু ঘন্টা আছে। ইট’স নট আ বিগ ডিল! আমার-ই তো উপহার। কি যায় আসে সময়টা দুপুর দুইটা কিংবা রাত বারোটা!”
তপোবন ব্যস্ত গতিতে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছিলো, ছেলের করুণ আবদার মাখা কণ্ঠে তার গতিরোধ হয়ে আসে‌। সে সতর্ক চাহনিতে তাকায় মায়ের দিকে। বাবাকে দেখতেই তানশান বলে,
–”পাপা সে সামথিং! আমার-ই তো গিফট, এখন দিলে সমস্যা কোথায়?”
তপোবন মায়ের পানে চেয়ে নম্র কণ্ঠে বলল,
–”দিয়ে দিন।”
–”তারপর তুমিও বলবে, তোমারটাও এখনি দিয়ে দিতে।”
মায়ের কথায় তপোবন ম্লান হাসল। লহু স্বরে বলল,
–”এক বছর! অপেক্ষাটা অনেক দীর্ঘ। আপনি দিলে হয়তো অপেক্ষা নামক যন্ত্রনাদ্বায়ক অনুভূতিটা একটু কমবে।”
–”ইয়েস, পাপা ইজ রাইট। অপেক্ষা অনেক যন্ত্রনাদ্বায়ক।”, তানশান ও অনুনয় করে বলে।
নির্জনা বেগমের মুখশ্রী ফ্যাকাশে হয়ে গেল ছেলে-নাতির আকাঙ্ক্ষাভরা মুখটি দেখে। উদাসীন কণ্ঠে বলে,

–”এতোদিন তো তাও অপেক্ষা করতে—যে বছর শেষে কিছু পাবে। কিন্তু আজকের পর থেকে আর অপেক্ষা নামক যন্ত্রনাদ্বায়ক অনুভূতি অনুভব করতে হবে না। এটাই শেষ।”
হতবাক তানশান, তপোবনের মুখশ্রীতে অন্ধকার ছেয়ে গেলো। তপোবনের মুখশ্রী ঠিক একই হারে বিবর্ন হলো যেমনটা হয়েছিল বহুবছর পূর্বে। যখন তার বুকের মাঝে ছটফট করতে থাকা মেয়েটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল। গলদেশে কিছু দলাপাকতে লাগল আরেকবার চিরতরে হারিয়ে ফেলার সময় এসে যেতেই।
তানশানের নাক কান লাল হয়ে উঠলো অচিরেই। বিবর্ণ সর্বহারা তার চাহনি। অস্ফুট স্বরে শুধায়,
–”এটাই শেষ? আর কখনো পাবো না?”
নির্জনা বেগম মলিন হেসে বলে,
–”আজ তোমার পনেরো তম জন্মদিন। আর এটা তোমার পনেরো তম এবং শেষ উপহার তোমার মায়ের তরফ থেকে।”
উপচেপড়া বিষন্নতায় চোখ টলটল করে উঠলে তানশান মাথা নত করে নেয়‌। ক্ষীণ স্বরে বলে,

–”ওহ্, তবে থাক দরকার নেই। এটা আজ নয় বরং কাল রাত বারোটায় দিও। আজ দিলে তো অপেক্ষারা ফুরিয়ে যাবে। কখনো কখনো অপেক্ষা নামক যন্ত্রনাদ্বায়ক অনুভূতিটা ও আনন্দের হয়। যদি অপেক্ষা ফুরালে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কিছু পাওয়া যায়।”
তানশান ভাঙা কণ্ঠে বলেই মন্থর গতিতে সেখান থেকে চলে যায়। বক্ষস্থল জুড়ে এক অবর্ণনীয় হাহাকার তপোবন নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। নির্জনা বেগম উদাসীন ফ্যাকাসে নয়নে তাকিয়ে রয় দুই পথে চলে যাওয়া বাবা ছেলের দিকে। অন্তরালে বলে ওঠে, বাবা-ছেলের জীবনের এই গল্পটা অন্যরকম হলে ভালো হতো।
তপোবন রান্নাঘরে ঢুকতেই জবা ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,,
–”বড় ভাইজান, মাছ ভাইজা রাখছে বড় ভাবিজান। আফনে ভর্তা বানান, আমার কাজ আছে। আফনারে বড় ভাবিজান সাহায্য করবে।”
কর্মব্যস্ততায় আচ্ছন্ন রূপকথা কোনোরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না। সে নত মস্তকে শুধায়,

–”কি সাহায্য করব?”
তপোবন কিছুটা হতচকিত দৃষ্টি ফেলে রূপকথার দিকে। মন মস্তিষ্কে দাপিয়ে বেড়ানো হাহাকার গুলো লুকিয়ে নেয় লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে। নিজেকে ধাতস্থ করে মিহি স্বরে বলল,
–”কিছু করার প্রয়োজন নেই। আমি পারব।”
রূপকথা ও আর প্রত্যুত্তর কর না। নিজ কর্মে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তপোবন ধীর গতিতে ছেলের জন্য মাছ ভর্তা করতে লাগল। দক্ষ হাতে কাজী লেবুর জিস্ট, ধনিয়া পাতা, ঝাল ঝাল শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ বেরেস্তা দিয়ে মাছ ভর্তা বানায়।
ছোটবেলা থেকেই তানশান মাছে গন্ধ পায়। তাকে ধরে বেঁধে কোন মাছ খাওয়ানো যায় না। আর সেই ছোটবেলা থেকেই তপোবন তাকে এভাবে সব ধরণের মাছ ভর্তা বানিয়ে খাওয়ায়। এভাবে সে গন্ধ পায় না বরং মজা করে খায়। আর এই ভর্তা তার হাতের ছাড়া আর কারোর হাতে হলে চলবে না। সপ্তাহে দুদিন তপোবন মাছ ভর্তা তৈরি করে।
–”আপনি রান্না করতে পারেন?”
রূপকথার প্রশ্নে ঘোরগ্রস্থ তপোবন মৃদু হতচকিত হয়ে বলল,

–“হুম। রান্না পারি বলতে শুধু তানশানের প্রয়োজনীয় সবকিছু রান্না করতে পারি। ওকে ছোটবেলা থেকে রান্না করে খাইয়েছি কিন্তু এর বাইরে আর কিছু কখনো রান্না করা হয়নি।”
রূপকথা ম্লান হাসল। সৃষ্টিকর্তার মর্জি অন্যরকম থাকলে আজ লোকটা পৃথিবীর সর্বোপরি সুখী একজন মানুষ হতো! কিন্তু জগতের কেউ কি কখনো সর্বসুখী হয়?
হয় না, তাই তো আজ সে একটা ভঙ্গুর সুখী পরিবারে আঁছড়ে পড়া পরগাছা। যাকে জোরপূর্বক মানিয়ে নেয়াই সকলের আপ্রাণ প্রয়াস! ভালোবাসা সে তো দুঃস্বপ্ন!
পরবর্তী সময়টুকু পিনপতন নীরবতায় কেটে গেল। আজ আর দু’জনের মধ্যে একটা শান্তিপূর্ণ, সুন্দর আচরণ দেখাগেল না। দু’জন ই একে অপরের থেকে দৃষ্টি লুকানোর চেষ্টা করে। কেউ কারোর মনের খবর জানার প্রয়োজন বোধ করে না।
সন্ধ্যা হতেই ঘরময় কেক, উপহার, রকমারি খাবার, প্রিয়জনদের আগমনে সিকদার বাড়ি সেজে ওঠে এক অন্যরকম উৎসবে।
সিকদার বাড়ির সকল দুঃখগুলোকে ম্লান করে এক ফালি সুখ হয়ে ঠিক এমন দিনেই তানশানের আগমনী সুর বেজেছিল। সেই থেকে এই দিনটা একটু বেশিই প্রাধান্য পায় সকলের কাছে।
উপরন্তু মা হারা এই ছেলেটার মুখের হাসি ধরে রাখা হলো বাড়ির সকলের একমাত্র চাওয়া। তার জন্য তারা সব করতে পারে।

তপোবনের অফিস থেকে প্রত্যেক ইমপ্লয়ি উপহার পাঠিয়েছে তানশানের জন্য। দুপুরের পর থেকেই তপোবন ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তাদের পাশের প্লটে ভাড়া বাড়ির পাঁচ তলায় খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। অতিথিরা সহ এতিম শিশুরা সেখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে। সেদিকটা সামলাচ্ছে সে আর তকদির সিকদার। তকদির সিকদারের অন্য ভাইয়েরাও এসেছে কাজে হাত বাটাতে।
নায়েলের আজ আনন্দের শেষ নেই। সে বিস্ময় নিয়ে ছুটছে এদিক সেদিক আর উপহার দেখছে, আবার কেক গুলোর পাশে ঘুরঘুর করছে। কয়েকবার ভাইজানের কাছে যাওয়া হয়ে গিয়েছে তার। কেক কেন কাটছে না ভাইজান? এই প্রশ্ন নিয়ে। কিন্তু ভাইজান গোমড়ামুখো। সে কেক ও কাটছে না, কথাও বলছে না শুধু নিজের ঘরে বসে পড়ছে।
সদর দরজা দিয়ে তখন তপোবন হাস্যোজ্জ্বল মুখে ঢোকে সাথে কয়েকটি অপরিচিত মুখ। তবে রূপকথার কাছে অপরিচিত হলেও বাকি সবার কাছে বড্ড পরিচিত। মৌনতা, নায়েল মুখশ্রী চকচক করে উঠল নানাভাই, নানুমনি আর মামুকে দেখে।
মৌনতা খুলনার মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন সন্তান। তার বাসা কাছেই ত্রিশ মিনিটের দূরত্বে। তার বাবা একজন হাই স্কুলের টিচার ছিলেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর আর চাকরি করেননি। দুই বার স্ট্রোক করা এবং হার্টে রিং পড়ানো।

তাকে সর্বদা শান্ত, বেডরেস্টেই থাকতে হয়। তারা তিন ভাইবোন। বড়ো বোন বিবাহিত দুই সন্তানের জননী, মেজো সে আর তার ছোট ভাই ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। তার বাবা মায়ের আয়ের ইনকাম বলতে তাদের নিজস্ব বাড়ি। পাঁচ তলা বাড়িটাই তাদের একমাত্র সম্বল। সেটার এক তলায় তার বাবা মা থাকে এবং বাকি চার তলা ভাড়া দেয়া। সেটা দিয়ে যা টাকা পায় তাতে তাদের সংসার সুন্দর ভাবে চলে যায়।
মৌনতা ছলছল নয়নে তাকায় বাবা মায়ের দিকে। বাবার বাড়ি কাছে হলেও সে খুব একটা যেতে পারে না। ইমরোজ পছন্দ করে না ওই বাড়িতে গিয়ে রাতে থাকা। গেলেও এক, দুই ঘন্টা থেকে চলে আসে। মাঝে মধ্যে ছোটভাই মৃন্ময় এসে নায়েলকে নিয়ে যায়। সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি তৈরি হয়। এতদিন বাদে মায়ের বুকে লেপ্টে যাওয়া মৌনতার মনে হলো বুকে জমা অর্ধেক কষ্ট শুষে নিয়ে গিয়েছে ভদ্র মহিলা।
মৌনতা যখন মায়ের আলিঙ্গনে নিজের সব ক্লান্তিগুলোর নিঃশেষ করছিল তখনি ভেসে আসে অভিমানী কণ্ঠ।

–“হ্যাঁ হ্যাঁ মাকে পেয়ে, এই মাকে ভুলে গিয়েছে একজন মানুষ। আমাদের আর চোখে পড়ে না। আমরা তো আর মা না।”
পারমিতার অভিমানী কণ্ঠে, মৌনতা অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিক করে হেসে উঠল। মাকে ছেড়ে ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়ে পারমিতার বুকে। পারমিতার মুখে স্নেহের হাসি ফুটে উঠল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধায়,
–“কি রে তুই এমন কাঠ হয়ে গিয়েছিস কেন? আমার ইমরোজের কি কম পড়েছে? তোকে খাওয়ায় না?”
–“খাওয়াতে কোনো কমতি কেউ রাখে না, বেয়ান। কিন্তু আপনার এই বাঁদর মেয়েই কিছু মুখে তোলেনা। সবার বেলায় আছে কিন্তু নিজের বেলায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না।”, মৌনতার মায়ের কণ্ঠে অভিযোগ। পারমিতা ম্লান হাসল তার কথায়। সে জানে একলা এই বিশাল সংসারটার দায়িত্ব এই মেয়েটাকে একা হাতে সামলাতে হয়। আর তাতে নিজের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখার সুযোগ হয় না। কিন্তু এখন? সে উৎসুক নজরে তাকায় মৌনতার দিকে।
হাসিমুখে শুধায়,

– “সে কোথায়?”
মৌনতা অবুঝ কণ্ঠে বলে,
–“কে তানশান?”
–“না, আমার আরেক মেয়ে।”, পারমিতার কথায় মৌনতা এক গাল হাসল। মানুষটা কত অমায়িক! না জানি তার মেয়েটা কতো অমায়িক ছিল।
সে এদিক ওদিক তাকিয়ে অদূরে একা দাঁড়িয়ে থাকা রূপকথার দিকে তাকায়। ধমকে উঠে বলে,
–”ওখানে একা দাঁড়িয়ে আছো কেন? এখানে এসো, দেখো তোমার আরো দুইটা মা এসেছে।”
রূপকথা জড়তা নিয়ে এগিয়ে যায়। পারমিতা ঘাড় বাঁকিয়ে নির্মল নয়নে তাকায়। চোখেমুখে উপচেপড়া স্নেহ, আগ্রহ, ভালোবাসা নিতান্তই ছিমছাম ছোট একটা মেয়েকে দেখে।
রূপকথা এগিয়ে আসতেই পারমিতা অভিভূত হয়ে বলল,
–“এ যে একটা ছোট্ট পরী, মৌনতা?”
মৌনতা হেসে বলে,

–“হ্যাঁ মামনি, একটা পরী-ই। যেমন সুন্দর দেখতে, তেমন সুন্দর আচরণ।”
রূপকথা সালাম দিতেই পারমিতা বলে,
–“আমায় চিনতে পেরেছিস? আমি কিন্তু তুই বলব, ছেলে মেয়েদের আমার তুমি বলতে ইচ্ছে হয় না। তাতে যে যা ভাবুক। আমার সবগুলো ছেলেমেয়েকে আমি তুই করে বলি।”
রূপকথা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে স্পষ্ট কথায়। সে মাথা নেড়ে বলে,
–“মায়েরা সন্তানদের তুই বললেই শুনতে শ্রুতিমধুর লাগে। কোনো সমস্যা নেই, আপনি যা ইচ্ছা তাই বলেন।”
–“আমাকে তুই বলতে বলে, তুই আমাকে আপনি বলছিস কেন? তুমি বল। আমি মৌনতার মামনি, তোর ও মামনি”, পারমিতা গুরুগম্ভীর গলায় বলল।
রূপকথার মলিনতা, জড়তা দৌড়ে পালায় চমৎকার মানুষটার সান্নিধ্যে। সে হাসিমুখে বলল,
–“কেমন আছো, মামনি?”
পারমিতা হেসে তাকে বুকে জড়িয়ে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

–“অনেক ভালো আছি। তোকে দেখার পর আরো ভালো হয়ে গিয়েছি। আমার খুব ইচ্ছা ছিল তোকে দেখার। কিন্তু তোর দু’টো বাঁদর ভাই আছে বুঝেছিস? তাদের যন্ত্রনায় আমি বের হতে পারিনা। এবার তপুকে বলব, ঐ দুটোকে শায়েস্তা করতে। ঐ দুটো শুধু তপুর কথাই মেনে চলে।”
রূপকথা এতক্ষণে বুঝলো ইনি তানশানের নানুমনি। সাথে এটাও বুঝলো তানশান নামক চমৎকার ছেলেটি কেন এতো চমৎকার আচরণের। যার গোটা পরিবারটাই এত চমৎকার।
রূপকথা সবার সাথে পরিচিত হয়। নির্জনা বেগম দুই বেয়ান নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। বেয়ানের সাথে কথা বলে পারমিতা ছুটলো কাঙ্খিত মানুষটির কাছে। রূপকথা কাজ করছিল নিচে। পারমিতা তাকে বলে,
–“রূপকথা মা’রে একটু উপরে দিয়ে আয় আমায়। পায়ের গিঁটে ব্যথা। উঠতে কষ্ট‌ হবে।”
রূপকথা হেসে বলল,

–“ আসছি মামনি।”
রূপকথা পারমিতাকে দিয়ে আসলেও নিজে ঢোকেনা। তানশান ম্যাথ করছিল। কষ্টগুলোকে চাপা দেওয়ার এই এক চমৎকার মাধ্যম। যা কখনো তাকে আশাহত করেনি।
তন্মধ্যেই তাকে ধ্যানচ্যূত করে পারমিতা ধীরস্থির দরজা ঠেলে নাতির ঘরে ঢুকলো। ঠিক পড়ার টেবিলে দৃষ্টি ফেলতেই টলটলে নেত্রে দৃষ্টি আঁটকে গেল।
কলম আঁকড়ে ধরা ছেলেটির হাতটি খানিক কেঁপে উঠল উপচেপড়া বিষন্নতা বেরিয়ে আসতেই। চাপা দেওয়া সেই যন্ত্রণাদের অবমুক্ত করে দিয়ে তানশান হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠল।
–“না…নানুমনি…মাম্মা আবার হারিয়ে গিয়েছে।”
পারমিতা লালচে নেত্রে এগিয়ে গিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো তাকে। সহসা তানশান তাকে আঁকড়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বিলাপের সুরে বলে,
–“আর কখনো মাম্মার চিঠি আসবে না, নানুমনি। আমি আজ আরো একবার মাম্মাকে হারিয়ে ফেললাম।”
পারমিতার চোখ ঝাঁপসা হতে লাগল। তবুও শক্ত হাতে নাতিকে সামলায়। তাদের কোনো অধিকার নেই সৃষ্টিকর্তার সিদ্ধান্তের উপর প্রশ্ন তোলার। শুধু হাসিমুখে মেনে চলাই তাদের কর্তব্য!
নাতিকে সামলে পারমিতা তার মুখে হাসি ফুটিয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। নাতির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,

–“আমরা কখনো আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর আঙুল তুলতে পারি না, নানুভাই। তিনি যা করেন আমাদের ভালোর জন্য করেন। তার উপর অসন্তুষ্ট হলে তোমার মাম্মার কষ্ট পাবে, নানুভাই। তুমি বড় হচ্ছো, তোমার উচিৎ এপারে তোমার বাবা আর ওপারে মায়ের জীবন সহজ করা। কিন্তু তুমি কঠিন করছ এমন ভেঙে পড়ে।”
নানুর বুকে মাথা ঠেকিয়ে বসা তানশান নির্বাক। পারমিতা পুনরায় বলল,
–“তুমি যত হাসিখুশি থাকবে তোমার মাম্মা ওপারে তত ভালো থাকবে।”
তানশান নীরব অশ্রু গুলো মুছে নিলো। মাথা নেড়ে বলল,
–“আর কখনো হবে না।”
পারমিতা মৃদু হাসল। বলল,
–“আচ্ছা, নানুভাই তুমি কি জানো আল্লাহ যা কেড়ে নেয় তার থেকে দ্বিগুণ ফিরিয়ে দেয়।”
–“জানি।”
–“এখন বলোতো আল্লাহ তোমায় কি দিয়েছে?”
এবার তানশান জবাব পেল না। অবুঝ কণ্ঠে বলল,
–“কিছুই দেয়নি।”
–“তুমি কিন্তু আল্লাহকে নারাজ করছ নানুভাই। তুমি কি জানো তোমার নতুন মামনি তোমার জন্য একটা নেয়ামত?”, পারমিতার গম্ভীর কণ্ঠে তানশানের চোখে ভাসে রূপকথার বোকাসোকা মুখশ্রী।
–“সৃষ্টিকর্তা কিছু দিলে তা হাসিমুখে গ্রহণ করতে হয় নানুভাই। তোমার ও উচিৎ তাকে মন থেকে গ্রহণ করা। কিন্তু তুমি যদি সৃষ্টিকর্তার পাঠানো নেয়ামত গ্রহণ না করে পায়ে ঠেলে দাও তবে সে নারাজ হয়ে যাবে আর এর প্রভাব কিন্তু তোমার মায়ের উপর ও পড়বে!”
তানশান মুখ তুলে তাকায়। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,

–“আমি কাউকে পায়ে ঠেলে দেইনি নানুমনি। কেন মাম্মা কষ্ট পাবে?”
–“তুমি যে তাকে গ্রহণ ও করোনি সেটাও স্পষ্ট, নানুভাই। সে তোমার ঘরে আসতে ইতস্ততা করে, নিজেকে ছোটো মনে করে।”
তানশানের শির নত হয়ে গেল। পারমিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
–“আমি তোমায় বলছি না তাকে একবারে মায়ের আসনে বসিয়ে দাও। কিন্তু তাকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দাও, ভালোবাসা টুকু দাও। সে তো এমন কিছু করেনি যার পরিবর্তে তুমি তাকে ঘৃণা করবে। করেছে কি?”
তানশান নত শির না বোধক মাথা নাড়লো।
–“তবে তার সাথে স্বাভাবিক ব্যবহার করো নানুভাই। ঘৃণা, ইতস্ততা নিয়ে লম্বা একটা জীবন কাটানো অনেক কঠিন। তাকে কোন ভুলের শাস্তি দিচ্ছো? সে তোমার মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী নয় আর না তোমার মায়ের জায়গা নিচ্ছে। শুধু তোমাদের জীবনে নতুন একটা জায়গা করছে।
কারোর কি এই শক্তি আছে যে—সে তোমার মায়ের জায়গা নেবে?”
তানশান এবারেও না বোধক মাথা নাড়লো। পারমিতা তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
–“আমি আশা করব, নতুন বছরের শুরুটা তুমি ভালোবাসা আর সম্মানের সহিত করবে। তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেবে।”
তানশান নীরবে শুনলো শুধু। পারমিতা নিজের দায়িত্বটা যথাযথভাবে পালন করে।
নাতি এবং রূপকথা দুজনকেই উপহার দেয় সে রূপকথা আপত্তি করার সুযোগই পায়নি। অমায়িক মানুষটা কেমন ধমকে হুমকি দিয়ে তার গলায় চেইন‌ পড়িয়ে দিয়েছে। কে বলবে, সে তার মেয়ের সতীন?
অমায়িক মানুষগুলোর সাথে রাতটা হুড়মুড়িয়ে কেটে যেতে লাগল। ঘড়িতে তখন এগারোটা পঁয়তাল্লিশ।

ঘরের অর্ধেক মেঝে ভরে যাওয়া গিফট বক্সগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছেলেটি হঠাৎ করেই ছোট্ট বাচ্চাদের মতো ডুবে যায় অসম্ভব কিছু স্বপ্নের মাঝে। কেমন হতো, তার সারাজীবনের চাওয়ার বদলে সৃষ্টিকর্তা সকলকে চমকে দিয়ে তার মাকে পাঠিয়ে দিতো? দরজা খুলেই মা হাসিমুখে বলত,
–“তানশান, মাম্মা এসে গিয়েছি।”
তানশানের স্বপ্নটিকে খানিক বাস্তবতায় রূপ দিয়ে ঠিক স্বপ্নের মতো তার দরজায় হঠাৎ টোকা পড়লো। হতচকিত তানশান চমকে তাকায় দরজা পানে। অস্ফুট স্বরে ডেকে ওঠে,
–“মাম্মা?”
দরজাটা খুলে গেল। দরজা আঁকড়ে ধরে রূপকথা মাথা ঢুকিয়ে উঁকি দিলো। মৃদু ইতস্ততার সাথে বলল,
–“একটু আসি?”
তানশানের মনে হলো স্বপ্নগুলো টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গিয়েছে। কিন্তু তার অবুঝ মন বুঝলো না সৃষ্টিকর্তা তার ভঙ্গুর স্বপনগুলোকে নতুন করে জুড়ছে।
সে মিহি স্বরে বলল,
–“আসুন।”
বলেই সে ভঙ্গুর স্বপ্নগুলো নিয়ে বইয়ে মুখ গুঁজলো। রূপকথা মন্থর গতিতে এগিয়ে যায়। বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা ছেলেটির দিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে হাতে করে আনা ছোট্ট পায়েশের বাটিটা তার পাশে রাখলো। মিনমিনে স্বরে বলল
–“শুভ জন্মদিন!”
তানশান বই থেকে মুখ তুলে তাকায় পায়েশের দিকে। গম্ভীর গলায় বলল,

–“ধন্যবাদ!”
বলেই সে পায়েশের বাটিটা নিয়ে খেতে লাগল। রূপকথা প্রসন্ন হয় এতটুকুতে। মৃদু চঞ্চল কণ্ঠে শুধায়,
–“পায়েশ খেতে কেমন হয়েছে? প্রথমবার বানিয়েছি।”
তানশান খেতে খেতে শান্ত স্বরে বলল,
–“ভালো হয়েছে, শুধু লবনের জায়গায় চিনি দিলেই পার্ফেক্ট হতো!”
এহেন অদ্ভুত কথায় রূপকথা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কথার মানে বুঝতে পেরে হতচকিত সে তানশানের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় পায়েশের বাটিটা। শঙ্কিত মনে তৎক্ষণাৎ এক চামচ নিজের মুখে তুললে অত্যাধিক লবনের তিতকুটে স্বাদে চোখমুখ কুঁচকে নিলো।
তানশান নীরবে আবার বইয়ে মনোযোগ দিয়েছে। রূপকথা অবাক পানে তাকায়। শুধায়,
–“এত তিতা পায়েশ খেলে কেন?”
তানশান নত শির বইয়ের মুখ গুঁজে বলল,
–“পাপা বলে, কেউ খুশি হয়ে কোনো উপহার দিলে তা হাসিমুখে গ্রহণ করতে হয়।”
রূপকথা ম্লান দেহে মুগ্ধ হয়ে শোনে সেই প্রত্যুত্তর। এযাত্রায় আরো একবার মনে হলো, তপোবন সিকদার পৃথিবীর সবচেয়ে সফল বাবা বোধহয় ধরণীতে আর একটা নেই! যে কি-না মা ছাড়া এই ছেলেটাকে শিষ্টাচারে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
সে দ্রুত জগ থেকে পানি ঢেলে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,

–“এখন পড়ছো? একটু পরে পড়ো, নিচে আসো। সবাই অপেক্ষা করছে কেক কাটবে, বারোটা বেজে যাবে।”
তানশান লিখতে লিখতে ভারী ভাঙা কণ্ঠে বলল,
–“আপনি যান, আমি আসছি।”
রূপকথা দেখে ফোলাফোলা ঐ মুখটি। কান্না করেছে বুঝতে পারে তাই আগ বাড়িয়ে কিছু বলার সাহস করে উঠতে পারে না। বলল,
–“আচ্ছা, দেরি করো না কিন্তু।”
তবে যেতে নিলে তানশান পিছু ডাকলো।
রূপকথা তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে শুধায়,
–“কিছু বলবে?”
স্বল্প সময়ের এই সংসার জীবনে রূপকথা প্রায়শই বাবা-ছেলের অদ্ভুত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। আজও তানশানের থেকে তেমনি এক অদ্ভুত প্রশ্নের সম্মুখীন হলো। যেই প্রশ্ন অন্তঃস্থলে ডেকে ওঠে সে কারোর মা! হ্যাঁ মা! মাতৃত্ব সুন্দর! ছোটবেলা থেকে এটা দেখেই বড় হয়েছে সে। মাতৃত্বের কোনো বিভেদ হয় না। অন্তরে মাতৃত্ব থাকলে আপন মা, সৎ মা বলে কিছু হয় না।
তানশান কলম ছেড়ে মাথা তুলে তাকায়। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–”আপনাকে আমি কি বলে ডাকব?”
শড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরা রূপকথা কিয়ৎকাল স্তম্ভিত পানে তাকিয়ে রইল সোজাসাপ্টা প্রশ্নে। অবুঝ কণ্ঠে বলল,

–“হ্যাঁ?”
তানশান পুনরায় রোবোটের মতো বলল,
–“আপনাকে আমি কি বলে ডাকবো?”
বহুল আকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নটি হঠাৎ পেতেই রূপকথা নির্বাক হয়ে গেল। তবুও জোরগলায় বলতে পারল না, মা বলেই ডাকো। সে মিহি স্বরে বলে,
–“তোমার যা ইচ্ছা তাই বলে ডাকো। সমস্যা নেই।”
তানশান কিয়ৎকাল সময় নেয়। অতঃপর বিভ্রান্তিত কণ্ঠে বলে,
–“মিমি বলে ডাকি?”
রূপকথার মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে গেল অদ্ভুত সম্বোধনে। চোখমুখ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত আনন্দটা গায়েব হয়ে যায়। অসন্তোষের কণ্ঠে বলে,
–“মিমি?”
–“হ্যাঁ, এটা ভালো হবে। আপনার সাথে এই ডাকটা ভালো মানায়।”
রূপকথা জোরপূর্বক কৃত্রিম হেসে অস্ফুট স্বরে বলল,
–“আচ্ছা।”
তানশান পুনরায় লেখায় মনোযোগী হয়। রূপকথা দরজা চাপিয়ে বেরিয়ে আসে। নিচে নামতে গেলেই দেখলো তপোবন উপরে উঠছে। রূপকথাকে দেখে তপোবন জিজ্ঞাসা করে,

–“তানশানকে ডেকেছো?”
–“জি, ডেকেছি।”
–“কি বলেছে?”
–“আসছে, বলেছে।”
–“ওহ, আচ্ছা।”, বলেই তপোবন পা বাড়ায় ছেলের ঘরের দিকে। সন্ধ্যা থেকে দেখা হয়নি বার্থডে বয়ের সাথে।
রূপকথা ইতস্ততার সাথে তাকে পিছু ডাকে।
–“শুনছেন?”
তপোবন পিছু ফিরে শুধায়,
–“কিছু বলবে?”
রূপকথা চঞ্চল কদমে এগিয়ে আসে। ইতস্তত কণ্ঠে শুধায়,
–“মিমি মানে কি?”
তপোবন ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“মিমি সাধারণত নাম। আবার অনেক ক্ষেত্রে মা’কে মিমি বলে ডাকা হয়। কেন বলোতো?”
রূপকথা হতচকিত শুধায়,
–“মা? তারমানে মিমি মানে কি মা হয়?”
তপোবন মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলল,

–” হুঁ, মা’ও হয়। বিদেশে প্রায়শই বাচ্চারা মাকে মিমি বলে ডাকে। আমার কিছু কাজিন ও আছে। তারাও মাকে মিমি বলে ডাকে। তুমি বললে তো না কেন এটা জিজ্ঞেস করেছ?”
আনন্দে খেই হারা মেয়েটি উত্তেজনা চাপিয়ে রেখে হাসিমুখে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলে,
–“নাহ, কিছুনা। আপনি যান।”
বলেই সে চঞ্চল কদমে নিচে নেমে যায়। তপোবন ও কাঁধ ঝাঁকিয়ে ছেলের ঘরে ঢোকে। ঢুকেই বলে,
–“আব্বু, এগারোটা পঞ্চাশ বাজে। এখনো আসছো না কেন?”
তানশান বই গোছাতে গোছাতে বলল,
–“আসছি।”
তপোবন মাথা নেড়ে ঘর থেকে বের হতে নেয়। কিন্তু তানশান হঠাৎ করেই বলে উঠল,
–“দাদুমনি, মিমির সাথে খারাপ ব্যবহার করে।”
নিজের গতিশ্লথ করা তপোবন কপাল কুঁচকে তাকায় ছেলের দিকে। অবুঝ কণ্ঠে শুধায়,
–“মিমি?”
“হুঁ, তাকে খারাপ কথা বলে।”, তানশান পুনরায় বলল। তপোবন তখনো অবুঝপানে তাকিয়ে আছে। অবুঝ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে,
–“কিন্তু এই মিমি’টা কে?”
তানশান কপাল কুঁচকে থমথমে মুখে তাকায় বাবার দিকে। চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট।
ছেলের এমন দৃষ্টিতে তপোবন ভড়কে গেল। হঠাৎ করেই মাথায় আসে সদ্য-ই কারোর ‘মিমি’ শব্দটি নিয়ে রাজ্যের কৌতুহল।
আশ্চর্যের প্রলেপনে আচ্ছাদিত ভারী মুখশ্রীতে স্নিগ্ধ এক হাসির উজ্জ্বলতা দেখাগেল। অন্তরালে বলে ওঠে, আজ পরোক্ষভাবে মা ডেকেছে একদিন হয়তো সরাসরি জোরগলায় মা ডাকবে। কিন্তু যেভাবেই ডাকুক না কেন—মন থেকে, নিজের ইচ্ছায় ডাকুক।

বাবা-ছেলে ভেবেছিল এড়িয়ে যাবে বহুল আকাঙ্খিত উপহারটি। কিন্তু বারোটা বাজতেই অন্দর আন্দোলনে মত্ত হয়। একটু সান্নিধ্য লাভের তৃষ্ণায় চৌচির, উদগ্রীব অন্তঃস্থল হাঁসফাঁস করতে লাগল। তাই তো কোনমতে কেকটা কাটা হতেই, অনাহুত বাবা ছেলে পাংশুটে মুখদুটি নিয়ে হাজির হয় নির্জনা বেগমের সামনে।
বসার ঘরের এক কিনারায় পারমিতা আর মাসুমা বেগমের সথে বসে ছিলেন নির্জনা বেগম। ছেলে নাতির নত শির আর উদগ্রীব মাখা মুখটি দেখে ব্যাথিত হতে গিয়েও হেসে ফেললেন।
কোনো প্রকার বাকবিতন্ডা ছাড়া আঁচলের নিচ থেকে দু’টো খাম বের করে বললেন,
–”তোমরা না-কি আজ উপহার নেবে না?”
তপোবন কেমন ইতস্ততা নিয়ে ছেলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। কোনো শব্দ নিঃসৃত হয় না কণ্ঠনালী থেকে। বারবার শুধু আড়চোখে তাকাচ্ছে নির্জনা বেগমের কোলের মাঝে থাকা দু’টো খামের দিকে। তানশানের ও ঠিক একই অবস্থা। উদগ্রীব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ছুটে যাচ্ছে খামটির দিকে। নির্জনা বেগম ম্লান হেসে খাম দুটো বাড়িয়ে দেয়।
বাবা ছেলের অপেক্ষা ফুরাতেই দু’জনে আর এদিক ওদিক তাকায় না। সকলের আবেগমাখা দৃষ্টি উপেক্ষা করে দ্রুতপায়ে উপরে চলে গেল।
তবে বাবা ছেলের এই উদগ্রীব চিত্ত ভুলেই বসে, এখানে একজোড়া কৌতুহলী দৃষ্টি তাদের এই বদলে যাওয়া আচরণ পর্যবেক্ষণ করছে।
রূপকথা ঘাড় কাত করে মৌনতার দিকে তাকায়। কৌতুহলী গলায় শুধায়,

–”ওই খাম দুটোতে কি ছিল, ভাবি?”
মৌনতা ম্লান হেসে বলল,
–”তানশানের মায়ের চিঠি। প্রতিবছর তানশানের মায়ের তরফ থেকে রেখে যাওয়া এই চিঠি তাকে এবং বড় ভাইজানকে দেয়া হয়। তবে এবার মনে হয় এটাই শেষ চিঠি।”
–”শেষ চিঠি কেন? আর কেন দেবে না?”, রূপকথার উৎকণ্ঠা মাখা কণ্ঠে মৌনতা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
–”সৃষ্টিকর্তা আর সময় দেয়নি। দিলে হয়তো তানশানের গোটা জীবনের জন্য উপহার রেখে যেত।”
রূপকথার দেহাবয়ব ম্লান হয়ে আসে। অন্তঃপুরে বলে ওঠে আর একটু সময় দিলে খুব কি ক্ষতি হতো? শেষ! এই কথাটিতেই তো কত ক্লেশ!
বদ্ধ ঘরের সোফার এক কিনারায় বলহীন দেহে বসে আছে ভারী এক অবয়ব।
দুই হাঁটুতে ঠেকিয়ে রাখা দুই কনুই এবং দুই হাতের আজলায় একটা পত্র। মেয়েটির চিঠি লেখার অভ্যাস মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল ছিল। প্রযুক্তির এই যুগে তপোবন এই মেয়েটির কারণে চিঠি প্রেমিক। সেই ক্লাস সেভেন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাকে এভাবেই চিঠি দিয়ে গিয়েছে। ওষ্ঠকোনে মৃদু হাসি প্রগাঢ় হয় প্রথম লাইন পড়েই।
❝“হাতের লেখার জন্য বকা দিবি না, তপু।”~তপোবন মলিন হেসে মাথা নেড়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“দেবো না, কখনো দেবো না।”
এরপর……অজশ্র ডট ডট। এর পরের ছোট্ট একটি লাইনটি পড়তেই ধ্বক করে উঠল তপোবনের বক্ষস্থল। হাঁসফাঁস করা অন্তঃস্থল কেমন উষ্ণ হয়ে উঠল মেয়েটির সেই চিরচেনা রাগান্বিত মুখটি অনুভব করতেই। কথাটি লেখার সময় ও কি তার মুখটি এমনি ছিল?

“জীবনে নতুন কেউ এসেছে, তপু? আমি কিন্তু একটুও রাগছি না। আমি তো ভালোবাসি তোকে। আর ভালোবাসা মানে ভালোবাসার মানুষটির ভালো থাকা নিশ্চিত করা, তাই না? তবে কেন রাগবো বল? আমি তো স্বার্থপর হতে পারবো না। আমি সবসময় চাই তুই ভালো থাক! আমি তো ব্যর্থ হলাম, তোর জীবনটা ভালোবাসাময় করে তুলতে। আমি চাই তোর জীবনে কেউ আসুক। যে তোর অসম্পূর্ণ জীবনটাকে পরিপূর্ণ করবে। যে তোর স্ত্রী হবে, তুই যখন কাজের চাপে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বি তখন কেউ আদুরে হাতে তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। তোর আধোয়া জামা গুলো ধুয়ে রাখবে। তোর জন্য তোর পছন্দের খাবার রান্না করে রাখবে। তুই অসুস্থ হলে তোকে সেবা করবে। পরিবর্তে তুই তাকে তোর বক্ষে আগলে নিবি, ভরসা আর ভালোবাসা দিবি। আমি জানি আমার তপুকে এগুলো বলে দিতে হবে না, তবে অন্তঃস্থলে যে জড়তা লালন করছিস তার জন্য হলেও আমায় এগুলো বলতে হচ্ছে।

তুই তো সবসময় বলিস, জীবন তার নিজের গতিতে প্রবাহিত হয় আর আমরা তার উপর ভাসতে থাকা কিছু কচুরিপানা। আমাদের তার গতির সাথে তাল মেলাতে হবে। ঠিক সেভাবেই আমি তো থেকে যাব তোর ঐ মনিকোঠায় এবং তানশানের মা হয়ে। কিন্তু তাকে কখনো তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করবি না। শুধু তাকে একটু বলবি আমার ছেলেটাকে যেন কখনো বোঝা মনে না করে। ভালো না বাসুক কিন্তু কষ্ট না দিক। আমার ছেলেটা কখনো জেনেশুনে কাউকে কষ্ট দেবে না কিংবা কারোর কষ্টের কারণ হবে না। এটা তুই নিশ্চিত করবি। তুই ওকে এমনভাবে বড় করবি।
আমার এতটুকুই অনুরোধ তোর কাছে, আমার ছেলেটার মুখের হাসি কখনো যেন বিলীন না হয়, তপু। জানি প্রতিবার আমার জেদের কারণে তুই ভোগান্তিতে পরিস। কিন্তু এবারের জেদটা হয়তো একটু বেশি বাড়াবাড়ি ছিল, তাই না? আমার শ্বাস নিতে প্রচুর কষ্ট হচ্ছে তপু। কি হতো বলতো সৃষ্টিকর্তা বরাবরের মতো আমার এবারের জেদটাকেও সফল করে দিলে? আমার প্রচুর কষ্ট হচ্ছে তপু। আমি তোকে ছেড়ে যেতে চাইনা। আমি বাঁচতে চাই তোর আর তানশানের সাথে। আল্লাহকে একটু বল না! আমায় এত বড় শাস্তি না দিতে!….❞
চিঠির শেষটা আর্তনাদ, আকুতিতে এবরোথেবড়ো হয়ে আছে। শারীরিক যন্ত্রণায় মেয়েটির পিছলে যাওয়া হাতের লেখায় তপোবন শব্দ করে কেঁদে উঠল। চিঠিটা মুখে চেপে ধরে অজশ্র চুম্বনে একটু চেষ্টা করে মেয়েটির আর্তনাদ শুষে নেয়ার। কিন্তু এটা বোধহয় এই জনমে আর সম্ভব নয়।

বিছানার হেডবোর্ডের সাথে পিঠ এলিয়ে, বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে তার পাশে গুটিয়ে বসে আছে তানশান। অশ্রুসিক্ত আঁখিদ্বয় তখন বাঁধ ভাঙা। কতশত আদরের সাথে নম্র স্পর্শে ছুঁয়ে যাচ্ছে মায়ের রেখে যাওয়া শেষ উপহার।
খুলতে ইচ্ছে করে না মনে হয় এমনি রেখে দেই সারাজীবন।
বহুক্ষণ দেখলো এবরোখেবরো ভাবে একটা ডোরেমন আঁকা খামটিকে। ছোটবেলায় তার ডোরেমন কার্টুন খুব পছন্দের ছিল। তাই মা প্রতিটা চিঠিতেই ডোরেমন এঁকে রেখেছে। তবে এবারের ডোরেমনের কেন এত বিধ্বস্ত অবস্থা? প্রতীক্ষা করার সাধ্য না থাকায় খামটি খুলে চিঠিটা বের করে।
শুরুতেই মায়ের আদুরে সম্বোধনে তানশানের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তবে আশ্চর্য হয় এটা দেখে চিঠিতে নিজের প্রশ্নের জবাবটাও লেখা। মনে প্রশ্ন জাগে, মায়েরা কেন সন্তানের সব মনের কথা বুঝে ফেলে?
❝আমার আব্বু! আমার তানশান আজ কত বড় হয়ে গিয়েছে তাই না? চৌদ্দ শেষ! মায়ের আদুরে বাচ্চা! শুভ জন্মদিন। মা এই মুহূর্তে যেখানেই থাকি না কেন তোমায় হাসিমুখে দেখব হয়তো। মাকে ছাড়া দিনগুলো কেমন কাটছে, আব্বু? মাকে মনে পড়ে? তুমি নিশ্চয়ই এখন অনেক লম্বা হয়ে গিয়েছ? তোমার চোখ আগের থেকেও কি ধূসর হয়ে গিয়েছে? দেখতে কেমন হয়েছো তুমি? পাপার মতো? আমি জানি তুমি ঠিক তোমার পাপার অবিকল হবে। তাই তো যতক্ষন সময় পেয়েছি তোমার পাপাকে চোখ ভরে দেখে রেখেছি। কিন্তু অতৃপ্ত এই তৃষ্ণা মেটানো যে অসম্ভব।

আমি আশ্চর্য হই, দীর্ঘ নয় মাস আমি তোমায় রক্তে মাংসে ধারণ করেছি অথচ তুমি হয়েছো একদম বাবার মতো। আমার খুব হিংসে হয় তানশান। তোমার পাপা সবকিছুতে কেনো্ এগিয়ে থাকে আমার থেকে। তোমার পাপা আমার থেকেও দেখতে সুন্দর, সে একজন সুপুরুষ, ভালো মনের একজন মানুষ, একজন ভালো স্বামী। সে সকলকে অনেক বেশি ভালোবাসতে জানে। দেখো সে দিনশেষে তোমার সাথে বেশি সময় কাটাতে পারছে কিন্তু আমি? আমি তার থেকে সবকিছুতে পিছিয়ে। এমনকি আমার সন্তানটিকে ভালোবাসার দিক থেকেও। বাবাকে কখনো কষ্ট দেবে না, আব্বু! তার সবকথা শুনবে, তাকে খুব ভালোবাসবে। তার ভালোবাসার খুব প্রয়োজন। কিন্তু তার ভালোবাসার মানুষ গুলো তার জীবনে খুব স্বল্প সময় থাকে। কিন্তু আমি চাই তুমি সবসময় তার সাথে থাকো।
সন্তান বড় হয়ে গেলে বাবার সাথে‌ দূরত্ব বাড়ে কিন্তু তুমি কখনো এমনটা করবে না। যত দিনযাবে বাবার সাথে তোমার সম্পর্ক আরো দৃঢ় বন্ধুসুলভ হবে। বাবার জীবনে যেই নতুন মানুষটা আসবে তাকেও ভালোবাসবে। কখনো অসম্মান করবে না। মায়ের শেষ ইচ্ছেটা রাখবে, আব্বু? এটা হয়তো আমার শেষ চিঠি হবে তোমার জন্য। আজ নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে, তানশান। আমি…..আমি বাঁচতে চাই আব্বু! তোমার সাথে , তোমার পাপার সাথে। কিন্তু দেখো,

আমার জীবনটার মতো তোমার পছন্দের ডোরেমনটাও আজ হেরে গিয়েছে সৃষ্টিকর্তার পরিকল্পনার কাছে। আজ ডোরেমনটা সুন্দর হয়নি, তাই না আব্বু? মায়ের হ্যান্ড রাইটিং ও খারাপ হচ্ছে। আমার হাত কাঁপছে, লিখতে পারছি না। শব্দ ফুরিয়ে আসছে, দেহের শক্তি ফুরিয়ে আসছে। এখন শুধু দেহ অসাড় হওয়া বাকি।
মায়ের কাছে আর সময় নেই, আব্বু। আমার টিউমারটাও ফেটে গিয়েছে। তোমার ভাই-বোন হয়তো আর নেই। সে মাকে ছাড়া খুব ভয় পায়, তাই তো মাকে ছাড়া যাবে না। ডাক্তার আল্টিমেটাম দিয়েছে চব্বিশ ঘন্টার। আমি হাসপাতালের বেডে বসে এটা লিখছি। এই তো তুমি আর তোমার পাপা আমার কোলে শুয়ে আছো। তোমার পাপা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ভেবেছিলাম মানুষটার জীবনে আমার আগমন হয়তো আস্ত এক সুখের কারণ হবে। কিন্তু কে জানতো আমি তার দুঃখের ছোট্ট নদীটাকে সমুদ্র করতে এসেছিলাম!

মাম্মা তোমায় খুব ভালোবাসি, আব্বু। তুমি যখন আদুরে কণ্ঠে মাম্মা বলে ডাকো, সেই একটা ডাক আমার কাছে মৃত্যু যন্ত্রনার চেয়েও যন্ত্রনাদ্বায়ক। আর কখনো এই ডাক আমি শুনতে পারবো না এটা ভাবলেই আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। কলম ধরে রাখা কষ্টকর আমার জন্য আব্বু। মাম্মার যদি ক্ষমতা থাকতো তবে তোমার প্রতিটা জন্মদিনের জন্য উপহার রেখে যেতাম। কিন্তু মাম্মা যে আজ অসহায়! তোমার জীবনের প্রতিটা ক্ষন সুখের, সুন্দর হোক। মাম্মা হয়তো আজ আরো একবার তোমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। চিরতরে! যেই দূরত্ব মেটানোর ক্ষমতা মাম্মার নেই। আমার আব্বু! তোমার থেকে বিদায় নেয়ার শক্তি আর ইচ্ছে আমার নেই , তবুও নিতে বাধ্য আমি। মাম্মা সবসময় তোমার মুখের ঐ হাসির সাথে থাকবো। তোমার হাসিমুখ যেদিন বিলীন হয়ে যাবে সেদিন আমিও বিলীন হয়ে যাবো। তাই কখনো তোমার মুখের হাসি যেনো বিলীন না হয়। মাম্মা হারাতে চাই না তোমার মধ্য থেকে। আর আমি জানি তোমার পাপা কখনো আমায় হারাতে দেবে না।❞
তানশানের নিরবে অশ্রু বিসর্জন তখন উচ্চশব্দে পরিণত হয়। চিঠিটা বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল তানশান। পূর্বা ঠিক বলে, তপোবন কখনো তাকে হারাতে দেবে না। ঝড়ের গতিতে কেউ তানশানকে বুকে জড়িয়ে নিতেই তানশানের কান্নার গতিবেগ দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পায়। বাবাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকা তানশান আবদার করে বলে,

–”মাম্মাকে এনে দাও, পাপা।”
নিরুপায় তপোবন অজশ্র চুম্বনে ভরিয়ে তুললো ছেলের মুখটি। এ যেন চৌদ্দ বছরের তানশান নয় বরং রেখে যাওয়া সেই তিন বছরের ছোট্ট বাচ্চাটি। সে তাকে সব দিতে পেরেছে কিন্তু মায়ের সুখ দিতে পারেনি। তাই নিরুপায়, অসহায়ত্বের আদর এগুলো।
দরজার কপাট আঁকড়ে উঁকি দিয়ে তাকিয়ে থাকা রুগ্ন মলিন মুখটিতে ম্লান হাসি ফুটে ওঠে, বাবা ছেলের হৃদয়গ্রাহী দৃশ্যে। মনে মনে সাধ জাগে, প্রশ্ন জাগে, তার কি একটুও ক্ষমতা নেই এই কান্নারত দুটি মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার? তার যে কাউকে কাঁদতে দেখতে ভালো লাগে না।
বাবাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়ে পড়ে তানশান। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে অনবরত মাথায় হাত বুলাতে থাকে তপোবন। একটা সময় ভার হয়ে আসা মাথা নিয়ে সেও ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।

বাবা ছেলে ঘুমাতেই রূপকথা মন্থর গতিতে ঘরে ঢুকলো। নিঃশব্দে বিছানায় পড়ে থাকা দু’টো চিঠি হাতে তুলে নেয়। বাবা-ছেলের লালচে ঘুমন্ত মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে ল্যাম্পের পাশে গালিচার উপর গুটিয়ে বসল। প্রবল আগ্রহ কৌতুহল নিয়ে চিঠি দু’টো পড়তে লাগল। কিন্তু যতোই আগায় মাতৃবর্জনের অস্পৃশ্য এক অনুভূতি তাকে গ্রাস করতে লাগল। অন্তরে মাতৃ হারা এক মায়ের আর্তনাদ যাতনার সৃষ্টি করছে। গলার কাছে দলা পাকাতে থাকে অদ্ভুত সুন্দর এক মাতৃরূপের সাথে পরিচিত হয়ে। বাবা ছেলের কান্নার কারণ তখন বুঝতে পারে, যখন তার চোখ থেকেও বিনা অনুমতিতে গড়িয়ে পড়তে থাকে অজশ্র অশ্রুকনা।

তবে অভ্যন্তরে একটা কথা সূচের মতো এঁটে যায়~“তার ছেলেটাকে ভালো না বাসুক কিন্তু কষ্ট যেনো না দেয়।”
কথাটা বুকে বিঁধলেও তার মুখে থাকে হাসি। মায়েরা এত সুন্দর কেন হয়? মাতৃত্ব সুন্দর! এটা আজ আরো একবার বুঝতে পারে সে নিজের মা এবং তানশানের মাকে দেখে। এখন তার কাজ শুধু এই মাতৃত্বকে সম্মান করা। এক আর্তনাদ ভরা মায়ের আর্তনাদ একটু কমানো। আর সে নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবে মানুষটা যেখানেই থাকুক না কেন তার মুখে হাসি ফোটানোর। তার ছেলে হাসলে, ভালো থাকলেই তো সেও হাসবে। যন্ত্রনা একটু কমবে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৫

রূপকথা নীরবে চিঠি দু’টো আবার তাদের জায়গায় রেখে দেয়। তপোবনের মাথার কাছ থেকে একটা কাঁথা নিয়ে ঐ রুমের পূর্ব পাশে থাকা সোফাটায় গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। রাত হলেই যখন পশুদের ভীড় বাড়তো তখন রূপকথা ভয়ে, আড়ষ্ট বদনে গুটিয়ে শুয়ে থাকতো মায়ের কোলের মাঝে। সে একা ঘুমাতে পারে না এই কারণেই।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ২৭