অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩২
তোনিমা খান
বরাবরই এরোজের সকাল হয় দুপুরে। আজও ব্যতিক্রম হলো না। এবং ঘুম ভাঙতেই অনুভব করলো সে বিগত রাতে জীবনের অন্যতম সুন্দর এক স্বপ্ন দেখেছে। হ্যাঁ, ক্ষণকালের ঐ মুহুর্তটুকু এরোজ স্বপ্ন ভেবেই উড়িয়ে দিলো। মায়া রাখতে নেই যে! কখন ঐ উপর ওয়ালার চোখ পড়ে বসে তার সুখের উপর!
থমথমে ফোলা ফোলা মুখে নিচে নামতে নামতে দেখলো ঘরের সকলের খাবার শেষ প্রায়।
বাচ্চারা স্বভাবতই যেখানে ভালোবাসা পায় সেখানে বেশি আকৃষ্ট হয়। এরোজ সিঁড়ির গোড়ায় নামতেই দূরন্ত নায়েল উজ্জ্বল দৃষ্টি ফেলল তার পানে। চোখমুখে চমৎকার হাসির উজ্জ্বলতা। সে তানশানের থেকে ছুটে গিয়ে দুই হাতে এরোজের বাম পা জড়িয়ে ধরলো। আদুরে গলায় আবদার করে বলল,
–“কোলে নাও।”
এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেললো হাঁটু সমান বাচ্চাটির দিকে। থমথমে মুখে দুই হাত বাড়িয়ে দিলে নায়েল ঝাঁপ দিয়ে কোলে উঠে গেল।
আর কোলে উঠেই সদ্য তৈরি হওয়া এক বদ অভ্যাসের জোরে এরোজের গাল আঁকড়ে ধরে তার গালে নিজের ছোট্ট মোলায়েম গাল ঘষতে লাগলো। নিজের কাজে নায়েল নিজেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
গুরুগম্ভীর এরোজ কপাল কুঁচকে দেখলো দুষ্টু মেয়েটির কর্মকাণ্ড। গতকাল রাত থেকে এই কান্ড তিনবার করেছে।
সে থমথমে মুখে শুধায়,
–“এটা কি ছিল?”
নায়েল দুষ্টু হাসি দিয়ে তার গজা গজা দাঁড়িগুলো দু’হাতে ছুঁতে ছুঁতে বলল,
–“তোমার দালিতে অনেক সুলসুলি লাগে। আমাল অনেক মজা লাগে।”
বলেই সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে আবার নিজের গাল ঘষে এরোজের দাঁড়িতে। এরোজ নিজেও স্মিত হেসে পা বাড়ায় খাবার টেবিলের দিকে।
নায়েল নিজ কর্ম করতে করতেই গতকালকের অনুভূতি প্রকাশ করে বলল,
–“আমাল তোমাল কাছে ঘুমাতে ভালো লেগেছে। খুব আলাম লেগেছে। তোমাল ঘলে গন্ধ ও ছিল না।”
ছোট্ট একটা বাচ্চার ভীষণ ঠুনকো অনুভূতি তার অথচ অন্তঃস্থল পুলকিত, অস্থির। গতকাল-ই অনুভব করলো এই বুকটা যার জন্য বরাদ্দ করেছিল, সে ব্যতীতও এই বুকটিতে কেউ প্রশান্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখে। এরোজের মনে ছোট্ট এক আশা দানা বাঁধতে লাগলো। যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ এই ছোট্ট প্রানটিকে যদি তার বুকে আগলে রাখতে পারে তবে যন্ত্রনা একটু কমবে।
সে হাঁটতে হাঁটতেই ক্ষীণ প্রলুব্ধ স্বরে বলল,
–“তুমি যখন চাও ছোট পাপার কাছে ঘুমাতে পারো। আর কখনো ঘরে কোনো গন্ধ পাবে না, ঠিক আছে?
নায়েল পিট পিট করে তাকালো। হাসিমুখে বলল,
–“সবসময়? না, আমি তো আমাল পাপাল কাছে ঘুমাবো। মাম্মা বলেছে আজ আমি পাপা আল মাম্মাল সাথে ঘুমাবো।”
এরোজ ক্ষীণ বলল,
–“ওহ্।”
নায়েল তার গম্ভীর মুখশ্রী দেখে আদুরে গলায় বলল,
–“তুমি মন খালাপ কলো না। আমি তোমাল কাছেও ঘুমাবো। তুমি ঘরে অনেক এয়াল ফেশ দিও তাহলে আর গন্ধ আসবে না, বুঝেছো?”
এরোজ স্মিত হেসে বলল,
–“ওকে, আম্মাজান।”
নায়েল পুনরায় চঞ্চল কণ্ঠে বলল,
–“তোমাল মুখেও এয়াল ফেশ দিও কিন্তু। তোমাল মুখ থেকেও গন্ধ পাই।”
এই পর্যায়ে এরোজকে মিইয়ে যেতে দেখা গেল। ওগুলোর সাহায্যেই তো অন্তঃস্থলের উচাটন দমিয়ে রাখে সে। তবুও এই চমৎকার সত্ত্বার সান্নিধ্য পাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে বলল,
–“ঠিক আছে।”
–“এইতো গুড বয়!”, নায়েল হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। এরোজ নায়েলকে নিয়েই ডাইনিং টেবিলের এক প্রান্তে বসে সে। সোফায় বসা তকদির সিকদার কোনা চোখে ছোট ছেলেকে পর্যবেক্ষণ করছে। এসেছে পর থেকে এই বোধহয় একটু হাসিমুখে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে পেল।
টেবিলের অপরপ্রান্তে বসা তপোবনের মুখের হাসি প্রগাঢ় হয় এরোজের কোলে নায়েলকে নির্ভয়ে দেখে। অবশেষে তার মা, চাচার ভালোবাসা অর্জন করে নিলো।
আজ রূপকথা আর তপোবন সবার শেষে খেতে বসেছে।
এরোজ বসতেই রূপকথা তড়িঘড়ি করে তাকে খাবার দিতে আসলে এরোজ চোখ তুলে তাকায়। মৃদু হেসে বলল,
–“ভাইজানের ফেইরিটেইল যে! তোমার সাথে তো খুব একটা কথাই হলো না। কলেজে গিয়েছিলে?”
ভাইজানের ফেইরিটেইল শুনতেই তপোবন সরু দৃষ্টিতে তাকালো ভাইয়ের পানে। মেয়েটির নামটি অন্যরকম সুন্দর দেখেই বলেছিল এরোজকে। অথচ এই ছেলে কেমন সকলের সামনে বলে দিল।
রূপকথা কোনা চোখে ফেইরিটেইলের আবিস্কারককে একবার দেখে নিলো। মৃদু হেসে বলল,
–“জি ভাইজান।”
নায়েলকে এক পায়ের উপর বসিয়ে নেয় এরোজ। রূপকথার থেকে ভাতের বোলটা নিয়ে বলল,
–“তুমি বসো, আমি নিচ্ছি।”
–“না না সমস্যা নেই ভাইজান, আমি দিচ্ছি।”, রূপকথার ব্যস্ত কণ্ঠ শুনলো না এরোজ।
–“তুমি খেতে বসো।”
এরোজ নিজ থেকেই খাবার নিতে লাগল। তপোবন ইশারায় মেয়েটিকে বসতে বলল। অসহনীয় পেট ব্যথা সহ্য করে রূপকথা তাদের সাথে খেতে বসে। শরীর ভালো না থাকলেও সংসারের টানাপোড়েনে ঘরের পুত্রবধূদের অসুস্থতা ভুলে যেতে হয়।
সন্ধ্যা সাতটা। মৌনতা দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে ঢুকলো। রূপকথা তানশান আর নায়েলের স্যান্ডউইচ বানাচ্ছে, আর জবা সকলের জন্য সিঙারা ভাজছে। মৌনতাকে হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে রূপকথা মৃদু হাসল। প্রতি সন্ধ্যায় দুই জা মিলে নাস্তা বানায়। তবে আজ আর তা হলো না। ইমরোজ যতক্ষণ বাড়িতে থাকে তার পাশে ততক্ষণ থাকতে হয়। মৌনতা অনুতপ্ততা নিয়ে বলল,
–“দুঃখিত কথা। তোমার ভাইজানের পাশে বসতে বসতে আমিও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। তোমার অনেক কষ্ট হয়ে গিয়েছে তাই না?”
রূপকথা মৃদু হেসে বলল,
–“সব তো ওনারাই করছেন ভাবি আমি তো শুধু তানশান আর নায়েলের স্যান্ডউইচ বানাচ্ছি। আপনি এত দুশ্চিন্তা করছেন কেন?”
–“তারপরেও, আমি বড় হয়েও যদি পড়ে পড়ে ঘুমাই তা কেমন দেখায়! দাও এখন আমি বানাই তুমি বসো।”, মৌনতা রূপকথার হাত থেকে স্প্যাচুলাটি নিতে নিতে বলল।
রূপকথা মৃদু হকচকালো অত্যাধিক পরিমাণে উষ্ণ হাতের স্পর্শে। সে সরব মৌনতার কপালে হাত দিলো। অত্যাধিক তাপমাত্রা অনুভব হতেই সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“ভাবি আপনার তো প্রচুর জ্বর উঠেছে।”
মৌনতা ম্লান হাসল। বলল,
–“এর জন্যই তো বেহুঁশের মতো ঘুমাচ্ছিলাম। তুমি চিন্তা করো না। আমার এমন সংক্রমণ লেগেই থাকে।”
রূপকথা শুনলো না মৌনতার কথা। সে স্প্যাচুলাটি নিজের হাতে নিয়ে বলল,
–“ভাবি, আপনি যান ঘুমিয়ে থাকুন। এই দু’টো স্যান্ডউইচ বানাতে আমার কোনো কষ্ট হয় না। এছাড়াও এগুলো আমার দায়িত্ব।”
মৌনতা কথা বাড়ালো না ইতিমধ্যেই শরীর ভেঙে আসছে। আচমকা চোখের সামনে কেমন ধোঁয়াশা হয়ে আসতেই সে কিচেন কেবিনেট আঁকড়ে নুইয়ে পড়ল। সকলে হকচকায়। রূপকথা সাথে সাথে আঁকড়ে ধরল মৌনতাকে।
–“ভাবি? ভাবি? খারাপ লাগছে?”, রূপকথা তাকে জড়িয়ে ধরে তড়িঘড়ি করে শুধায়। মাজেদা আর জবাও ছুটে এসে আঁকড়ে ধরে মৌনতাকে। চেয়ার টেনে তাতে বসায়। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায় মৌনতা। কোনরকম একটু ভালো লাগতেই জবাকে বলল,
–“আমায় একটু রুমে দিয়ে আয়, জবা।”
জবা আর রূপকথা মৌনতাকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়। জবা মৌনতাকে তাদের ঘরে নিতে গেলে মৌনতা বাঁধা দেয়। দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“ইমরোজ ঘুমাচ্ছে, সে বিরক্ত হবে ঘুমে বিঘ্ন ঘটলে। তোমরা রোজের ঘরে চলো।”
জবা কপাল কুঁচকে তাকায় মৌনতার দিকে। রাগ ঝেড়ে বলল,
–“এ কেমন কথা, ভাবিজান? বউ অসুস্থ হে বিরক্ত হইবো ক্যান? সারাদিন মৌনতা ঘরে আইসো, ঘরে আইসো করার সময় তো বিরক্ত লাগে না?”
মৌনতা বিরক্তি নিয়ে তাকায় জবার দিকে। রূপকথা জবাকে থামিয়ে বলল,
–“থাক আপা, আপনি কথা বাড়িয়েন না। ভাবিকে আপুর রুমে নিয়ে যাই চলেন।”
–“আরে বড় ভাবিজান, আফনে বোঝবেন না , এই মাইজ্জা ভাবিজান একদম অতিরিক্ত করে। সবাইর জন্য চিন্তা করতে করতে নিজের দিকে এক রত্তি খেয়াল নেয় না। নয়তো দেহেন বয়স কত হইছে— এর মধ্যে পা যায়, মাজা যায়, মাথা যায়?”, জবা বিলাপ করতে করতে এগিয়ে চলে।
অসুস্থতার মাঝেও মৌনতা হেসে ফেলল জবার কথায়। মেয়েটা তার জন্য খুব চিন্তা করে সবসময়। তার ভালো-খারাপ সবদিকের খেয়াল রাখে। বিয়ের সময় থেকেই জবা তার সাথে রয়েছে। মৌনতাকে রোজের ঘরে শুইয়ে দেয় তারা।
রোজ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে সে মৌনতাকে শুয়ে থাকতে দেখে চিন্তিত কন্ঠে শুধায়,
–“কি হলো মৌন বউ, সকাল থেকে তুমি কেমন যেন করছো? ঐ সময় ছোটাছুটি করছিলে এখন আবার শুয়ে আছো, কাহিনী কী?”
বলতে বলতেই রোজ মৌনতার পাশে বসে তার হাত ধরে। অত্যাধিক পরিমাণে তাপমাত্রা অনুভব হতেই তার বুঝতে বাকি রইল না মৌনতার জ্বর এসেছে। এমন বারবার অসুখে পড়তে দেখছে সে বিগত দিনগুলোতে। সে বিরক্ত হয়ে বলল,
–“তোমার নিজের প্রতি অনেক অনিহা, মৌন বউ। নিজের দিকে একবার তাকিয়েছো? গালের চাপা লেগে গিয়েছে। এখন তো ভাইজান এসেছে ডাক্তারের কাছে যাও। নয়তো আমি নিয়ে যাই। তোমার আর কোনো কথা আমি শুনবো না। তোমায় এমন অসুস্থ দেখতে আমার ভালো লাগে না। আমার ঝগড়া করতে অসুবিধা হয় তুমি অসুস্থ থাকলে।”
বদ্ধ নেত্রে মৌনতা ফিক করে হেসে উঠল। রোজ ও হাসল। মৌনতা বদ্ধ নেত্রেই বলল,
–“তোমার ভাইজান নিয়ে যাবে, চিন্তা করো না।”
–“গেলেই হলো। খেয়েছো কিছু? ওষুধ খেতে হবে।”
তন্মধ্যেই নায়েলকে কোলে নিয়ে রূপকথা ঢুকলো। এক হাতে তার খাবারের প্লেট।
–“আমি খাবার এনেছি আপু। খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দাও।”
রোজ তাকে গিয়ে সাহায্য করলো। পুরো বাড়ি চড়িয়ে বেড়ানো নায়েল সন্ধ্যা হলেই রূপকথার কাছে জব্দ হয় পড়াশুনার জন্য। স্যান্ড উইচ সহ নায়েলকে নিয়েই রূপকথা ঢোকে। এটা খাইয়ে পড়তে বসাবে।
শুয়ে থাকা মাকে দেখে নায়েল ডেকে উঠল।
–“মাম্মা?”
নায়েলের ডাকে মৌনতা চকিতে চোখ খুললো। শারীরিক অসুস্থতা, ইমরোজের ঘরে থাকায় সকাল থেকে খুব একটা সময় দিতে পারেনি মেয়েটিকে। সে জ্বরে কাবু দেহ টেনে তুলে দ্রুত উঠে বসে। নায়েলকে কাছে ডেকে বললো,
–“মাম্মার কাছে এসো।”
নায়েল গুটি গুটি কদমে বিছানায় উঠে গিয়ে মায়ের কোলে বসে পড়লো। মৌনতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদুরে গলায় শুধায়,
–“এতক্ষণ দুষ্টু করেছো ভাইজানের সাথে?”
নায়েল না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“দাদাভাইয়েল সাথে ঘুলতে গিয়েছিলাম।”
–“দাদাভাই নামাজ পড়তে যায়নি?”
–“গিয়েছে, আমায় নিয়ে।”
মৌনতা বড় বড় নেত্রে চেয়ে বলল,
–“তুমি মসজিদে গিয়েছো?”
–“হুঁ।”
–“কেন? নামাজের সময় ওখানে মেয়েরা যায়?”
নায়েল পিটপিট করে চেয়ে বলল,
–“আমি তো বাবু। আমি কি মেয়ে?”
নায়েলের কথায় রোজ জবা আর রূপকথা ফিক করে হেসে উঠল। রোজ হাসতে হাসতে বলল,
–“বুড়িরে তুমি এতদিন পর এ কি বললে? তুমি হলে মেয়ে বাবু।”
–“মেয়ে বাবু?”
–“হুম, তুমি মেয়ে বাবু।”, মৌনতা মেয়ের এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে দিয়ে বলল। পুনরায় শুধায়,
–“আজ তুমি ছোট পাপার সাথে ঘুমিয়েছো?”
–“হুঁ।”, নায়েল মায়ের বুকের সাথে লেগে বসে বললো।
–“ভালো লেগেছে তার কাছে ঘুমাতে? বকা দেয়নি?”
–“উহুঁ,খুব ভালো লেগেছে।”, নায়েল হাসিমুখে বলল। পরপরই উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
–“জানো আমায় অনেকগুলো গিফট দিয়েছে, তিনটা চকলেট দিয়েছে, আল লাতে আমায় খাইয়েও দিয়েছে চকোস আল ডাই ফুট। আর ছোট পাপাল ঘলে কোনো পঁচা গন্ধ ও ছিল না। ছোট পাপা ডাট্টি বয় নয়।”
নায়েলের কথায় রোজ সহ সকলে হেসে ওঠে। মৌনতা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে চোখেমুখে অজশ্র আদর করে দেয়। ক্ষমা চেয়ে বলে,
–“গতকালকের জন্য স্যরি, মা! তুমি কষ্ট পেয়েছিলে তাই না? পাপা গতকাল রেগে ছিল তাই একটু বকা দিয়েছে। তুমি রাগ করে থেকো না। আজ আমরা একসাথে ঘুমাবো, ঠিক আছে?”
–“ঠিক আছে”, নায়েলের আনন্দিত কণ্ঠ।
নায়েল খুশি হয়ে গেল এবং ভুলে গেল গতকালের বাবার করা আচরন।
রূপকথা আর রোজ মৌনতাকে যতোটুকু পারলো যত্ন করলো। তবুও যেই মানুষটার সবচেয়ে বেশি যত্নের প্রয়োজন ছিল সেটি যেন মেয়েটির জন্য স্বপ্নতুল্য। মৌনতা উদাসীন হয়! অন্তঃস্থলে বলে বেড়ায় লোকটির একটু যত্ন, ভালোবাসা পেলে শত অসুস্থতাও তাকে কাবু করতে পারবে না।
তানশানের শরীর দুদিন যাবৎ একটু বেশি উত্তপ্ত থাকে। তপোবন আজ ও ছেলেকে তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়াতে নিলো।
কম্ফোর্টারের আড়ালে ড্রিম লাইটের আলোয় বক্ষমাঝে লেপ্টে থাকা ছেলেটিকে এক পলক দেখে তপোবন ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা স্মরণ করে বলল,
–“পাপা, প্রায় এক সপ্তাহের মতো থাকব না তানশান। নিজের খেয়াল রাখবে, তোমার শরীরের অবস্থা তো ভালো লাগছে না আমার। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে। কিন্তু পাপার জরুরী যশোরে যেতে হবে।”
তানশান বদ্ধ নেত্রে বলল,
–“নো প্রবলেম পাপা। তুমি যাও, আমার জ্বর আসবে না।”
তপোবনের মুখ পান্তুর। বাধ্যতামূলক যেতেই হবে। তাই তার কাছে উপায় ও নেই।
কিন্তু মা বিহীন নিজের ছোট্ট এই অংশটিকে দেখতে সবচেয়ে অসহায় লাগে যখন সে অসুস্থ থাকে। আর যদি সেই সময়টাতে বাবাও না থাকে! তপোবন অস্থির নিঃশ্বাস ফেলল। জটিল সম্পর্ক, পরিবার পরিজন, ব্যবসা সবটা গুছিয়ে উঠতে উঠতে হঠাৎ মনে হচ্ছে কোথায় তার অগোচরে কোনো চির ধরছে।
কেন অন্তঃস্থল এমন অস্থির হয়ে পড়ছে। পূর্বার মতো রূপকথার অসুস্থতা যদি কখনো প্রকট রূপে ধারণ করে? অন্যদিকে আজ এতগুলো বছরে ইমরোজের বদলে যাওয়া আচরণ হঠাৎ করেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। মৌনতাকেও আগের মতো প্রাণবন্ত দেখা যায় না। তবে কি সে ভাইদের স্পেস দিতে গিয়ে ভুল করছে? ভাবলো যশোর থেকে এসে মৌনতার সাথে খোলামেলা কথা বলবে।
সে ছেলের মানিব্যাগে তিন হাজার টাকা রেখে বলল,
-“পাপা যথেষ্ট টাকা দিয়ে রেখেছি, আব্বু। যেখানে প্রয়োজন হয় খরচ করবে। স্কুল থেকে মিমিকে নিয়ে ড্রাইভার কাকার সাথে সোজা বাড়িতে আসবে। এদিক ওদিক কোনো রেস্টুরেন্ট কিংবা শপিং সেন্টারে ঢকুবে না। যা লাগবে দাদুভাই নয়তো ছোট পাপা কিংবা মেজো পাপাকে বলবে।”
তানশান নীরবে মাথা নাড়লো। সে তে পরিকল্পনা করেছিল বাবা গেলে প্রতিদিন রুবার্স ক্যাফেতে যাবে। নিজের পরিকল্পনা ব্যর্থ মনে হতেই সে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। বাবা কেন তার আগাগোড়া বুঝে যায়?
তপোবন তার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আবার বলল,
–“যেহেতু পাপা থাকবো না তাই কোচিং শেষে পার্কে যাওয়ার প্রয়োজন নেই এই কদিন বাসায় চলে আসবে। আসবে তো?”
–“জি পাপা।”
তপোবন মৃদু হাসল। বলল,
–“পাপাকে দুশ্চিন্তা করতে না হয়, তানশান।”
–“হবে না।”
–“ওকে, তবে ঘুমাও। আমি তোমার মিমিকে পড়াতে বসব। আর তাকে যে পড়াগুলো দিয়ে যাবো তা তুমি নিজ দায়িত্বে কমপ্লিট করাবে। সে কিন্তু কাজের কথা বলে পড়াশুনায় ফাঁকি দেবে বুজেছো?”
–“ওকে আমি দেখে নেবো তাকে।”, তানশানের চঞ্চল কণ্ঠে তপোবন হেসে ফেলল ইদানিং এই দু’জনের সম্পর্ক খোটাখুটির হয়ে উঠেছে। একে অপরের শায়েস্তা করতে পারলে খুব খুশি হয়। সে ছেলেকে সব বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘর থেকে বের হয়।
রাত তখন বারোটা বেজে দশ মিনিট। কলম হাতে রূপকথা নিগুঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত তপোবনের দিকে। যে কি-না চেয়ারে বসে বসে ঘুমাচ্ছে। তাকে পড়াতে পড়াতে ঘুম পড়েছে। টিচার ফাঁকিবাজ! ভাবতেই রূপকথা গা দুলিয়ে হেসে উঠল। যেহেতু সংসারে টানাপোড়েনে সে পড়ার খুব কম সময় পায়। তাই তপোবন প্রতিদিন তানশানকে পড়িয়ে রাত করে তাকে পড়ায়।
লোকটার দিকে কখনো তেমন পূর্ন দৃষ্টিতে তাকানো হয় না। চোখে চোখ রাখার সাহস হয় না। সুযোগ পেতেই রূপকথা খুঁটে খুঁটে দেখতে লাগল। ফর্সা মুখ, কালো কুচকুচে দাঁড়ির মাঝে দু একটা সাদা দাঁড়ি। অত্যাধিক ফর্সা মানুষটা। এতো ফর্সা মানুষ তার ভালো লাগে না, কিন্তু লোকটা দেখতে খারাপ না বরং অস্বাভাবিক সুন্দর।
তেমনি মনোযোগ সহকারে দেখতে দেখতেই হঠাৎ করেই ধূসর বর্ণের দৃষ্টিদ্বয়ের সাথে দৃষ্টি মিলে গেল। রূপকথা হকচকিয়ে মৃদু চিৎকার করে উঠল হঠাৎ তপোবন চোখ মেলে তাকাতেই। নিজের বোকামোতে সে নিজেই হতবুদ্ধি হয়ে বুকে থু থু ছুঁড়লো।
তপোবন কপাল কুঁচকে দেখে সেই বিরক্তিকর কাজ। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“কি করছিলে?”
–“কই, কিছু না তো!” মুখের ওপর ডাহা মিথ্যা কথা বলে দেয় রূপকথা। তপোবন গাম্ভীর্যতা আঁকড়ে বলে,
–‘ওহ্ আচ্ছা।”
রূপকথা আবারো লিখতে শুরু করে। তপোবন দৃষ্টি চুরি করা মেয়েটিকে দেখতে দেখতেই হঠাৎ করেই জিজ্ঞাসা করল,
–“বলোতো আমার মুখে কয়টা তিল রয়েছে।”
রূপকথা চোখ তুলে তাকায়। চটপটে কণ্ঠে জবাব বলল,
–“তিনটা, তিনটা। দুইটা কালো তিল আর একটা লাল তিল।”
সহসা রূপকথা থমকালো পুনরায় নিজের বোকামিতে। তপোবন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দুই আঙুল ভাঁজ করে তার নাকল’সের মাঝে মেয়েটির নাক চেপে ধরল। রূপকথা মৃদু আর্তনাদ করে উঠল ব্যথাদ্বায়ক সেই স্পর্শে। তপোবন মৃদু রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“পড়া কি আমার মুখের ওপর লেখা?”
নাকটা ছেড়ে দিতেই মেয়েটির নাক লাল হয়ে উঠল। রূপকথা অভিমানী চোখে তাকায় লোকটির দিকে। তপোবন গম্ভীর গলায় বলল,
–“রাত বারোটার সময় ফাঁকিবাজি করলে এমন শাস্তি পাবে। তাড়াতাড়ি এটা শেষ করো আরো পড়া আছে। আর যেই পড়াগুলো দিয়েছি তা সব এই সপ্তাহের মধ্যে কমপ্লিট করে রাখবে। তানশানকেও বলে রেখেছি খেয়াল রাখতে, আমি এসে পরীক্ষা নেবো কিন্তু!”
রূপকথা থমথমে মুখে মাথা নেড়ে পুনরায় লিখতে শুরু করে। তপোবন তাকে পড়তে দিয়ে নিজে কিছু ডকুমেন্ট চেক করতে লাগল, আগামীকাল সাথে করে নিয়ে যাবে এগুলো।
কাজ করতে করতেই শুধায়,
–“ওষুধ খেয়েছিলে?”
–“হুঁ।”, রূপকথা লিখতে লিখতে জবাব দেয়।
–“পেট ব্যথা কমেছে?”
–“হুঁ।”
–“হট ব্যাগ দিয়ে রাখবে সবসময়। আর কখনো বন্ধ দেবে না ওষুধ।”
তপোবনের কথায় রূপকথা নীরবে মাথা নাড়লো। তপোবন মেয়েটিকে এক পলক দেখে পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে এগিয়ে দেয়। রূপকথা চোখ তুলে তাকালে তপোবন বলল,
–“এটা রাখো, এক সপ্তাহ থাকবো না নিজের খেয়াল রাখবে। কলেজে যাবে আর তানশানকে সাথে নিয়ে ফিরে আসবে আবার। চেষ্টা করবে কোথাও না যাওয়ার আর ঝামেলা এড়িয়ে চলার।”
রূপকথা মাথা নেড়ে সায় জানায়। টাকাগুলো দেখে বলল,
–“এত টাকা আমার প্রয়োজন নেই। আগের ও অনেক টাকা রয়েছে।”
–“রেখে দাও, রাস্তাঘাটে চললে নিজের কাছে সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা রাখতে হয়।”
রূপকথা নীরবে রেখে দিলো। তপোবন কিয়ৎকাল বাদ পুনরায় বলল,
–“তানশানের দিকে একটু খেয়াল রেখো, ওর শরীর খারাপ করার আশঙ্কা রয়েছে।”
–“কি করে বুঝলেন?”, রূপকথার উৎসুক কণ্ঠ। তপোবন মিহি স্বরে বলল,
–“ওর জ্বর আসার আগে এমন গা ব্যথা, মাথা ব্যথা গা গরম গরম থাকে।”
–“ওও তবে এমন হলেই আমি বুঝে যাবো ওর জ্বর আসবে?”
রূপকথার আগ্রহী কণ্ঠে তপোবন চোখ তুলে তাকায়। মৃদু হেসে মাথা নাড়ে। বলল,
–“একদম নিশ্চিত না থালকেও সতর্ক থাকতে হবে।”
–“আচ্ছা আচ্ছা আমি সতর্ক থাকব। জ্বর আসলেই ওষুধের খাইয়ে তাড়িয়ে দেবো।”
রূপকথার বাচ্চামো ভরা কণ্ঠে তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“তানশানের জ্বর আসলে ওর যেভাবেই হোক পাপাকে কাছে চাই নয়তো অসুস্থতা ভালো হয় না। ছোটবেলায় এমন একবার জ্বর হয়েছিল আমি কানাডাতে ছিলাম এক সপ্তাহের জন্য তখন এক সপ্তাহেও জ্বর ভালো হয়নি। আমি এসেছি তারপর গিয়ে সুস্থ হয়েছে।”
–“স্বাভাবিক তখন ওকে আগলে রাখার জন্য আপনি ব্যতীত কেউ ছিল না। কিন্তু এখন আছে, আমি দেখে নেবো।”
রূপকথার চঞ্চল আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে তপোবন মুগ্ধ হয়। বলল,
–“এর জন্যই তো তোমায় বললাম।”
কথোপকথন শেষে দু’জনে ফের মগ্ন হয় নিজেদের কাজে। রূপকথা লেখা শেষ করে তপোবনের কাছে খাতা এগিয়ে দিলো। তপোবন সেগুলো দেখতে দেখতে বলল,
–“ফিজিক্স সাপ্লিমেন্ট বের করো।”
রূপকথা সাপ্লিমেন্টের বের করলো না বরং জহুরি চোখে চেয়ে রইল তপোবনের মুখপানে। মেয়েটির কোনো নড়চড় না দেখে তপোবন মুখ তোলে। কলম মুখে নিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মেয়েটিকে দেখে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“কী? ওভাবে চেয়ে আছো কেন?”
রূপকথা ভীষণ গুরুগম্ভীর মুখে তাকিয়ে বলল,
–“আপনি যশোর যাচ্ছেন কাল?”
–“হুঁ।”
রূপকথার চোখ সরু হয়ে আসে। ঠিক পুলিশ যেমন চোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তেমন করে সন্দিগ্ধ কণ্ঠে শুধায়,
–“এক সপ্তাহের জন্য?”
তপোবন মুখ বিকৃত করে নেয় মেয়েটির এহেন পুলিশের মতো গুরুতরভাবে জিজ্ঞাসা করায়। গা ছাড়া ভাবে বলে,
–“হুঁ। কেন?”
রূপকথা জবাব দেয় না, দাঁত দিয়ে কলম কামড়াতে কামড়াতে সরু চোখে দেখতে থাকে লোকটিকে। তপোবন অতিষ্ট হয়ে বলল,
–“কি সমস্যা?”
রূপকথা ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
–“আপনি কি আমার কাছে মিথ্যা কথা বলছেন?”
–“হ্যাঁ?”, তপোবন সরব চোখমুখ কুঁচকে নিলো।
–“আমি তোমার কাছে কি মিথ্যা কথা বলবো?”
রূপকথা থমথমে মুখে বলল,
–“আমি ছোট হলেও অনেক কিছু বুঝি কিন্তু।”
এহেন কথায় তপোবন ভ্রু টান টান করে শুধায়,
–“ওহ্ তাই নাকি? তা কি বুঝেছেন, মুরুব্বি?”
রূপকথা বাঁকা চোখে চেয়ে বলল,
–“আপনি কি বাইরে কোথাও ইটিশ পিটিশ করেন?”
সহসা রূপকথার মাথা বরাবর একটা ব্যথাহীন চাপড় পড়লো। রূপকথা কঁকিয়ে উঠে মাথায় হাত দিলো। রেগে বলল,
–“আহ্! মারলেন কেন?”
তপোবন ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকায়। ধমকে উঠে বলে,
–“এসব উল্টাপাল্টা কথা শিখেছো কোত্থেকে, ইঁচড়েপাকা মেয়ে?”
শেষ পর্যন্ত কি না এই বয়সে এসে স্ত্রীর সন্দেহের তোপে পড়তে হলো? রূপকথা মাথা ঘষতে ঘষতে মিইয়ে গেল। তপোবনের এমন ক্রুব্ধ দৃষ্টি দেখে ভয়ে চেয়ার ঘঁষে তপোবনের হাতের নাগাল থেকে দূরে সরে গেল। মিনমিনে স্বরে বলল,
–“এমন করে তো অনেক মানুষ। যারা ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন থাকে তারা বাইরে ইটিশ পিটিশ করে।”
তপোবন দাঁতে দাঁত চেপে তাকায় দূরে সরে যাওয়া মেয়েটির দিকে। হাত বাড়িয়ে পুনরায় চেয়ার টেনে মেয়েটিকে কাছে এনে কঠোর গলায় শুধায়,
–“এসব বাজে কথা কে বলেছে? নিশ্চিত তোমার ঐ বিবাহিত বিগড়ে যাওয়া বান্ধবীরা, তাই না?”
রূপকথা চেয়ারে সেঁটে গিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,
–“আরে এমন করে তো! আমার ঐ ফ্রেন্ডের স্বামীর এক বন্ধু এমন করেছে।”
–“তো আমকে নিয়ে তোমার এমন কেন মনে হলো?”
তপোবনের শানিত কণ্ঠে রূপকথা কোনা চোখে চেয়ে বলল,
–“এমনিই।”
–“এমনিই বললে তো শুনবো না আমি। এমন উল্টাপাল্টা এলিগেশন লাগানোর যৌক্তিক কারণ বলতে হবে।”
রূপকথা এবার মৃদু রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“আপনিও তো ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন।”
–“কোনদিক থেকে উদাসীন?”
–“সবদিক?”, রূপকথার চটপটে কণ্ঠ।
–“হ্যাঁ, সেই দিকগুলো বলো। আমি কি বাজার করি না? স্ত্রী সন্তানের খেয়াল রাখি না? রোজ সকাল- দুপুর স্কুল কলেজে দিয়ে আসি, নিয়ে আসি না? পরিবারের সকলের খোঁজ খবর নেই না? তোমাদের পড়াই না?”
রূপকথা এবার দ্বন্দ্বে হেরে যেতে লাগল। লোকটা সব করে কিন্তু স্ত্রীকে ভালোবাসে না। এটা মুখ ফুটে আর বলতে পারল না।
তপোবন চোয়াল শক্ত করে তাকায় মিইয়ে যাওয়া মেয়েটির দিকে। এরপরেও সে ঘর সংসারের প্রতি উদাসীন? এসব গুজব ছড়িয়ে তার সুখের সংসারে আগুন লাগানোর কোনো মানে হয়? তার ছোট্ট অবুঝ বউটার মাথা যে বিগড়ে দিচ্ছে যে!
সে এবার পাশ থেকে স্টিলের স্কেলটা তুলে নিলো। শাসিয়ে বলল,
–“এরপর থেকে যদি আমি শুনেছি, তুমি ঐ বান্ধবীদের সাথে মিশেছো তবে এটা দিয়ে দু’টো খাবে।”
রূপকথা অভিমানী দৃষ্টিতে তাকায় কঠোর স্বামীর পানে। অতঃপর চুপটি করে বসে রইল চেয়ারে।
এসব কথা তাকে নৈমি আর নূর-ই বলেছে। শুনেছে যেই পুরুষের ঘরের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা থাকে না সে নাকি বাইরে আকৃষ্ট! বুক জুড়ে কেমন বিষন্নতা অনুভব হলো সদ্য আবেগের হাওয়া লাগা অবুঝ মেয়েটির।
তপোবন মুখ ফোলানো স্ত্রীকে দেখেও উপেক্ষা করল। জীবনের এই স্বর্নালী মুহুর্তটিতে সে কোনোভাবেই চায় না রূপকথা স্বামী সংসারের মারপ্যাঁচে নিজের গন্তব্য হারিয়ে ফেলুক। মুখ থুবড়ে পড়ুক ঠুনকো কিছু আবেগের কাছে।
যেখানে রূপকথা একটু একটু করে নিজের জটিল জীবন সহজ করে তুলছে, সেখানে মৌনতা ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে একটা জটিল সম্পর্কের মারপ্যাঁচে।
সে যেন জীবনের সেই বিদঘুটে অধ্যায়টিতেই থমকে আছে। যেখানে মানসিক যন্ত্রণা, শরীরিক যন্ত্রনার ছড়াছড়ি কিন্তু উপশম করার মতো কেউ নেই।
মৌনতা আজও পারেনি নিজের মাতৃত্বকে আঘাত পাওয়া থেকে রক্ষা করতে। আজও স্বামীর কামনার স্বীকার হতে হয়েছে তাকে আর ছোট্ট মেয়েটিকে মা বাব হীনা অন্যত্র ঘুমাতে হয়েছে।
অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরটির থাই ভেদ করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মৌনতা। মুখশ্রী তার নিষ্প্রাণ, নিঃসাড় যন্ত্রণায় কাতর! অনেকবার বলেছিল আজ তার জ্বর কিন্তু কাজ হয়নি। চোখের কার্নিশ বেয়ে অনর্গল গড়িয়ে পড়তে থাকা অশ্রু সেই অন্ধকারেই মিলিয়ে গেল। আজ মৌনতাকে ভাবাচ্ছে নিজের পরিনতির বিষয়ে। তার জন্য কঠিন হলেও তাকে ভাবতে হচ্ছে —যার ভবিষ্যতের জন্য, ভালোথাকার জন্য এত আত্মত্যাগ, তাকেই যদি কষ্ট পেতে হয় তবে কি লাভ এত আত্মত্যাগের।
আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে বুকের উপর ঘুমিয়ে থাকা ইমরোজের মাথায় কম্পিত রুগ্ন হাত রাখে মৌনতা। কণ্ঠনালী আঁটকে আসে কষ্টে, তবুও অভিযোগ করতে ইচ্ছে হয়,
–“আমার সুখ দুঃখের চিরসাথী হতে হবে না, অন্তত একটু নায়েলের পাপা হয়ে থাকুন না, ইমরোজ।”
প্রায় বছরদুয়েক নিয়মিত মা/দ/কের সান্নিধ্যে থাকা মানুষটা যখন পুরো দিনে এক ফোঁটা নেশা দ্রব্য ছুঁয়ে না দেখে, তখন তার অবস্থা কতটা বেগতিক হয়?
এলোমেলো রুক্ষ চুল, অস্থির- চঞ্চল দৃষ্টি, লালচে চোখের আভা, ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে কামড়াটির পরিবেশ কেমন থমথমে।
ঘেমেনেয়ে একাকার দেহটা ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে। দেহটা যেন হঠাৎ নিজের সঙ্গেই শত্রুতা শুরু করে দিয়েছে।
বিছানার পাশ ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকা এরোজ একহাতে অনবরত একটি স্ট্রেস বল সংকুচিত প্রসারিত করে যাচ্ছে। অন্যহাতে একটা চকলেট যেটা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা কমানোর জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে সে। পুরোটা দিনে ম/দ কেন একটা সিগারেট ও ছুঁয়ে দেখেনি এটা তারই প্রতিক্রিয়া।
রাত তখন সাড়ে বারোটা প্রায়। তবুও সে অপেক্ষা করছে, নায়েল আসবে হয়ত। এসে ঘরে সিগারেটের গন্ধ পেলে সে চলে যাবে এই ভয়ে সে এখন পর্যন্ত একটা সিগারেট ছোঁয়নি। বারবার আড়চোখে তাকাচ্ছে টেবিলের উপর রাখা সিগারেটের প্যাকেটটির দিকে। নিজের ওপর যথাসাধ্য জোরজবরদস্তি করে ক্ষণকাল সেভাবেই কাটায় এরোজ।
ঘেমে ওঠা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বারংবার ছুটে যাচ্ছে ক্ষতিকর জিনিস গুলোর দিকে। একটা সময় আর পারে না এরোজ স্ট্রেস বলটি ছুঁড়ে মেরে উঠতে যায় ঠিক তখনি ছুটতে ছুটতে এসে ছোট্ট একটি দেহ আঁছড়ে পড়ে তার বুকে। এরোজ থমকায়! আঁছড়ে পড়া ছোট্ট দেহটিকে তৎক্ষণাৎ একহাতে জড়িয়ে নিয়ে তাকায় ঘাড়ে মুখ গুঁজে হেঁচকি তুলে কান্নারত বাচ্চা মেয়েটির দিকে।
এরোজের থমকানো মুখটিতে হাসি ফুটে উঠল। সে ছোট্ট দেহটিকে শক্ত করে দু’হাতে জড়িয়ে নেয়। উদগ্রীব কণ্ঠে শুধায়,
–”নায়েল এসেছো? ছোট পাপার কাছে ঘুমাবে?”
নায়েল হেঁচকি তুলতে তুলতে হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–”এখন থেকে আমি তোমাল কাছেই ঘুমাবো। আল কারোল কাছে ঘুমাবো না। সবাই পঁচা! মাম্মাও পঁচা, পাপাও পঁচা। আমাকে আজও ঘুমাতে নেয়নি তাদেল সাথে।”
বলেই নায়েল ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এরোজের চোখেমুখে উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় মাথা নেড়ে বলল,
–”হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি ঘুমাবে, আমার কাছেই ঘুমাবে। আর কারোর কাছে ঘুমানোর দরকার নেই। ছোট পাপার ঘর থেকে আর কখনো গন্ধ আসবে না, মা। আমি অনেকগুলো চকলেট ও দেবো তোমায়, ঠিক আছে?”
নায়েল ঘাড় থেকে মুখ তুলে তাকায় এরোজের দিকে। কান্নারত চোখ, ঠোঁটের কোনে প্রাণোচ্ছ্বল হাসি নিয়ে আনন্দিত কণ্ঠে শুধায়,
–”সত্যি বলছো?”
–”হুঁ,সত্যি। তিন সত্যি মা।”
–”আমায় অনেকগুলো চকলেট ও দেবে?”,
নায়েলের প্রশ্নে এরোজ তড়িৎ নিজের পাশের ছোট্ট ড্রয়ারটা খুলে চার পাঁচটা চকলেট বের করে নায়েলের কোলের উপর দিয়ে বলল,
–”এই নাও চকলেট, এগুলো সব তোমার।”
নায়েল কান্না ছেড়ে লুফে নিলো চকলেটগুলো। মুহুর্তেই কান্নার কারণ ভুলে সে চকলেটে মেতে উঠল। একগাল হেসে বাচ্চা বাচ্চা কণ্ঠে বলল,
–”ছোট পাপা তুমি তো গুড বয়! তবে মাম্মা তোমায় ব্যড বয় কেন বলে?”
এরোজ ম্লান হেসে পাল্টা প্রশ্ন করে,
–”তোমার মাম্মা আমায় ব্যড বয় বলে?”
–”হুম।”, নায়েল চকলেট ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল।
–”কারণ ছোট পাপা ব্যড কাজ করি, তাই ব্যড বয় বলে।”, এরোজ ম্লান হেসে বলল। সহসা নায়েল বিরোধীতা করে বলে,
–”না তুমি ব্যড কাজ কলো না, তুমি গুড কাজ কলো। তুমি গুড বয়। মাম্মা পঁচা! তাকে আমি বকে দেবো।”
এরোজ চোখ ভরে দেখে নায়েলকে। পিঠের মাঝ বরাবর পর্যন্ত চুল যেগুলো এলোমেলো হয়ে আছে। কান্নার কারনে চোখমুখ শুকনো, লালচে হয়ে আছে। পড়নে একটা ফুল কভারেজ রমপার সাথে মোজা। আজ মনে হলো, নায়েল আর তার সব থাকতেও তারা যেন একা। তাদের দুজনের যা চাই সেটা বাদে সব রয়েছে।
আচ্ছা, তারা যদি দুজন দুজনের সঙ্গী হয়, তবে কি সৃষ্টিকর্তা তাকেও কেড়ে নেবে তার থেকে?
ছোট চাচার কোলের মধ্যে বসে বসেই নায়েল চকলেটগুলো শেষ করতে লাগল। মেঝেতে কার্পেটের উপর বসা এরোজ তার এলোমেলো চুলগুলো আলতো হাতে গুছিয়ে দিতে দিতে শুধায়,
–”নায়েল, আমি তোমার চুল বেঁধে দেই?”
–”তুমি চুল বাঁধতে পালো? তুমি তো ছেলে!”, নায়েল খেতে খেতে বলল। এরোজ বলে,
–”ছেলেরা চুল বাঁধতে পারে না কে বলেছে? ছোট পাপা পারি তো।”
–”কেন পালো?”, নায়েল কপাল কুঁচকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করল। কুঁচকানো দৃষ্টি তাক করা এরোজের বিধ্বস্ত মুখটির দিকে। এরোজ তার গম্ভীর কণ্ঠে স্মিত হেসে বলল,
–”আমার একটা রূপাঞ্জেল ছিল। তার চুল ছিল অনেক বড়। যেগুলো আমার খুব প্রিয়। ভেবেছিলাম তার চুলগুলো নিজের হাতে যত্ন নেবো। তাই শিখেছিলাম।”
নায়েলের মাথায় এতো কিছু ঢুকলো না। তার মাথায় শুধু ঢুকেছে রূপাঞ্জেল কথাটি। সে ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে শুধায়,
–”লুপাঞ্জেল? কালকের সেই লুপাঞ্জেল?”
–“হুঁ।”
–“তোমাল ও লুপাঞ্জেল ছিল?”
–“হু ছিল।”
–“টিভিতে যেই পিনসেস দেখায় তেমন?”
–“হুম।”
–”তাহলে তো দেখতে অনেক সুন্দল সে, তাই না?”, নায়েলের কণ্ঠে বিস্ময়! এরোজ উজ্জ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঘন ঘন মাথা নেড়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে,
–”হুম, খুব সুন্দর! ঠিক যেন রূপকথার গল্পের সেই রূপাঞ্জেল! স্নিগ্ধ, চঞ্চল, প্রাণবন্ত আর…”
–”আল কি?”, নায়েল উৎসুক কণ্ঠে শুধায়।
এরোজের দৃষ্টি উদাসীন হয়ে পড়ল। সে তে পুনরায় নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে নিষিদ্ধ কিছুর মাঝে। না এটা ঠিক নয়। নিষিদ্ধ কিছুর চর্চা করাও পাপ।
–”আল কি? বলো, ছোট পাপা। আমি শুনবো। তুমি আমায় দেখাবে সেই পিনসেসকে? আমাল খুব ইচ্ছে করে টিভির ঐ পিনসেসদেল দেখতে।”, নায়েল তাড়া দিয়ে বলল।
এরোজ স্থবিরতা ভেঙে মৃদু হাসল নায়েলের কথায়। সে নায়েলকে কোলে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নায়েলকে নিয়ে দাঁড় করায় সেন্টার টেবিলের উপর। অতঃপর আয়নায় নায়েলের প্রতিবিম্বের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
–”এই তো সেই রূপাঞ্জেল! তার চোখ ঠিক তোমার মতো, তার ঠোঁট দুটো ও একদম তোমার মতো , গালদুটো তোমার মতো ফোলা ফোলা লালচে, তাকে দেখতে অবিকল তোমার মতো। কিন্তু তার চুল অনেক অনেক বড়। যখনি ইচ্ছে হবে প্রিন্সেসকে দেখতে, তখনি নিজেকে এভাবে আয়নায় দেখবে। তুমি নিজেই একটা প্রিন্সেস, ছোট্ট রূপাঞ্জেল!”
নায়েল চোখ বড়বড় করে আয়নার দিকে তাকায়। বিস্মিত চিত্তে নিজেকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলে,
–”তাইইই?”
এরোজ মাথা দুলিয়ে সায় জানায়। নায়েল আনন্দে চিৎকার করে বলে,
“ওহ্ ওহ্, আমি পিনসেস, আমি ছোট্ট রূপাঞ্জেল।”
–”ছোট্ট রূপাঞ্জেলকে চুল বেঁধে দেই?”, এরোজ আদুরে গলায় জিজ্ঞাসা করে। নায়েল মাথা নেড়ে বলে,
–”দাও দাও। সুন্দল কলে চুল বেঁধে দাও। আর আমাকে পিনসেসের মতো একটা জামাও কিনে দিও ঠিক আছে?”
–”আচ্ছা।”
এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতেই এরোজের দৃষ্টি ক্রমশই গভীর হয়ে আসে। এমনি কারোর চুল দেখে সে চোখের তৃষ্ণা নিবারণ করতো। আজ সেদিকে তাকানো তার জন্য নিষিদ্ধ হলেও, এটা তো আর নিষিদ্ধ নয়। রুক্ষ আঙুল গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় নায়েলের এক একটি মসৃন কেশ। সময়ের পালাবদলে এরোজ ভুলতে লাগলো তার মাঝে জেঁকে বসা নেশার উন্মাদনা। এই একটু প্রাপ্তির কাছে মাদকের তীব্র নেশাও ফিকে পড়ে। তাহলে পুরুষটির অন্তরালে থাকা সেই মানুষটির জন্য ভালোবাসার তীব্রতা ঠিক কতটুকু? মানুষটা কি আদৌও জানে তাকে কেউ উন্মাদের মতো ভালোবাসে? সে কি কখনো ভেবেছে সে কারোর জীবনের অতৃপ্ত বাসনা?
দীর্ঘ এক ঘন্টা অভিমান আঁকড়েই মুখে কুলুপ এঁটে থাকা রূপকথা আর না পারতেই এবার মুখ খুলল। নির্বিকার গম্ভীর মুখে বসে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
–“এবার ছেঁড়ে দিন। অনেক পড়েছি আর পড়তে ইচ্ছা করে না।”
তপোবন ঘড়ির দিকে তাকায়। একটা পাঁচ বাজে। সে আগের মতোই কঠোরতা আঁকড়ে বলল,
–“এখনো এক ঘন্টা পড়তে হবে। আমি গেলে তোমরা দু’জন কি পড়াশুনা করবে তা আমি বেশ জানি। তাই কোনো ফাঁকিবাজি না করে এই অধ্যায় শেষ করবে।”
রূপকথা অনুনয় করে বলল,
–“আর পড়তে ইচ্ছে করছে না, আজ থাকুক। আমি সব পড়া শেষ করে রাখব, সত্যি বলছি।”
তবুও তপোবনের মাঝে কোনো প্রকার নড়চড় দেখাগেল না। সে থমথমে মুখে বলল,
–“একটু হেঁটে আসো কিন্তু এই অধ্যায় না করে ঘুমাতে পারবে না। আগামীকাল কলেজেও তো যাচ্ছো না।”
রূপকথা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো লোকটির কঠোরতায়। সৃষ্টিকর্তা তাকে স্বামী নয় কঠোর টিচার দিয়েছে।
সে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বারান্দায় চলে গেল। তপোবন আড়চোখে সেই রাগ দেখে স্মিত হেসে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
চেয়ারে হেলান দিয়েই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে রইল আঁধারে বারান্দার রেলিং ধরে নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছিমছাম নারী অবয়বের পানে।
ভেবেছিল দীর্ঘ এই জীবন প্রারাম্ভেই নিজের উপসংহার টেনে নিয়েছে। কিন্তু কে জানতো অপরাহ্নে আরো একটা উপসংহার অপেক্ষা করছে?
বয়সের এই মূর্ছা যাওয়া সময়টাতে এসে মনে হলো প্রেমে পড়া আর কাউকে প্রেমে পড়তে দেখা উভয়ই অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি!
নাসারন্ধ্রে ফুরফুরিয়ে আতরের গন্ধ প্রবেশ করতেই রূপকথা স্মিত হাসল। লোকটির সান্নিধ্যে বক্ষস্থলের স্পন্দন বেড়ে গেলেও চেষ্টা করে মুখশ্রীতে কোনো ভাবভঙ্গি প্রকাশ না করতে। তবে তা কি সম্ভব হয়? চোখমুখ ঠিকরে প্রকাশিত হয় অন্তঃস্থলের উদগ্রীবতা।
তপোবন পেছনে হাত বেঁধে নীরবে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
রাতের নিস্তব্ধতা, নিস্তরঙ্গতায় একে অপরের শ্বাস প্রশ্বাসের সুশ্রাব্য শব্দ একে অপরের অন্তঃস্থলে শিহরণ সৃষ্টি করছে। অনুভূতিরা প্রকট হচ্ছে। কিয়ৎকাল নীরবেই কেটে গেল একে অপরের। অনুভূতিদের উস্কে দেওয়া সেই নীরবতায় আস্কারা পায় বহুদিনের দমিয়ে রাখা কৌতুহল।
“তানশানের মায়ের কি হয়েছিলো?”
ভীষণ অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে তপোবন কিয়ৎকাল সময় নিয়ে মিহি স্বরে জবাব দেয়,
–“ফিফথ মান্থ মিসক্যারিজ অফ সেকেন্ড প্রেগনেন্সি। হুইচ ওয়াজ ক্রিটিক্যাল। এতটাই ক্রিটিক্যাল—যে জীবন তাকে দ্বিতীয় বার সুযোগ দেয়নি।”
রূপকথার উদাসীন বক্ষস্থল খামচে ধরে, পরিপূর্ণ একটি সুখী পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা ভাবতেই। শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় শুধায়,
–“কেন মিসক্যারিজ হয়েছিল?”
তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মেয়েটির কৌতুহলী মুখপানে। গম্ভীর গলায় বলে,
–“তুমি সময় নষ্ট করছো? রাত কট বাজে খেয়াল আছে? ঘুমাতে হবে। পড়া শেষ করতে হবে।”
–“সে পরে পড়ে নেবো। আপনি বলুন।”
–“শুনতে কেন হবে?”, তপোবনের গম্ভীর কণ্ঠে রূপকথা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“কারণ আমার অধিকার রয়েছে।”
মেয়েটির সুদৃঢ় কণ্ঠে তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। মিহি স্বরে বলতে লাগল,
–” জরায়ুতে সিস্ট ছিল। যেটা কনসিভ করার পরে খুব দ্রুত বাড়ে। গর্ভাবস্থায় যখন পাঁচ মাসে পড়ে তখন সিস্ট ফেটে যায়। গর্ভাশয় ও নাজুক ছিল। সেই কারণেই মূলত মিসক্যারিজ হয়েছিল। এছাড়াও আরো কিছু সমস্যা ছিল। তার বডি কন্ডিশন বেবি কেরি করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণে হেলদি ছিল না। মোটকথা তার কনসিভ করাই ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।”
বলতে বলতেই সেই দূর্বিষহ দিনগুলোর চিত্র ভেসে উঠলো তপোবনের সামনে। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে নিজের মাইন্ড ডাইভার্ট করার চেষ্টা করে তপোবন। ভেসে আসে মিনমিনে কণ্ঠ,
–“তবে আপনি কনসিভ করার অনুমতি দিলেন কেন?”
তপোবনের ওষ্ঠকোনে ম্লান হাসি ফুটে ওঠে। বিষাদ, যন্ত্রণার হাসি। আক্ষেপ নিয়ে বলে,
–“আমি তো জানতাম’ই না। অনুমতি দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আর সে জেদি ছিল। যেটা করবে, মানে করবেই।”
–“তাহলে আপনি তাকে বিদেশে নিয়ে যেতেন? শুনেছি সেখানে ভালো চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।”, রূপকথার উৎকণ্ঠা মাখা কণ্ঠে তপোবন পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় তার দিকে। গম্ভীর গলায় শুধায়,
–“তুমি কি ফাঁকি বাজি করছো?”
রূপকথা কপাল কুঁচকে তাকায় তার দিকে। জেদি কণ্ঠে ফের শুধায়,
–“আপনি তাকে বিদেশে কেন নিয়ে যাননি?”
–“হাতে সময় ছিল না।”, তপোবন ছোট্ট করে জবাব দেয়।
–“সময় ছিল না?”
রূপকথা অনাহুত’র ন্যায় শুধায়। তপোবন ডানে বামে মাথা নাড়ে। ধিমি কণ্ঠে বলে,
–“ডাক্তার প্রথমে বলেছিল কোনো সমস্যা হবে না। সিস্ট নিয়েও বেবি কেরি করা যায় এবং সুস্থ সবল পৃথিবীতে আনাও যায়। কিন্তু যখন ওটা ক্রিটিক্যাল আকার ধারণ করে তার ঠিক এক সপ্তাহের মাঝে সব শেষ হয়ে যায়।”
একে অপরের দিকে দৃষ্টি এড়িয়ে গেল দু’জনে। কিছুটা সময় আবার নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়। ঘোর গ্রস্থ রূপকথা। অনুভূতির টানাপোড়েনের সাথে না পেরেই হঠাৎ করেই সে প্রশ্ন করে,
“আপনি আপনার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন, তাই না?”
অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে তপোবন স্থবিরতা ভেঙে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় চমৎকার ক্ষমতাধর মেয়েটির পানে। কত কঠিন প্রশ্ন কত অবলীলায় করার ক্ষমতা রাখে। অথচ তার অন্তঃস্থল জবাব দেয়ার জন্য সাহস জোগাতে মগ্ন।
উদাসীন মেয়েটিকে দেখতে দেখতেই তাকে টেনে নিজের দু’হাতে বলয়ের মাঝে নিয়ে আসে তপোবন। প্রশস্ত বক্ষে পিঠ লেগে যেতেই রূপকথার উদাসীন দৃষ্টি হকচকায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় তপোবনের মুখপানে। ধূসর দৃষ্টিদ্বয় শূন্য সড়কপানে স্থির। তপোবন দু’হাতে জড়িয়ে নেয় ছিমছাম মেয়েটিকে। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“ওটা ভালোবাসতাম হবে না, ভালোবাসি হবে। আমি আমার স্ত্রীকে এখনো ভালোবাসি। এই যে আমার ছোট্ট একটা স্ত্রী। যাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।”
রূপকথা থমকানো চিত্তে স্মিত হাসল। বলল,
–“কথা ঘুরানোর কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
–“আমি মোটেই কথা ঘুরাইনি।”
–“আমি আপনার স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম।”
–“আমি আমার স্ত্রীর কথাই বলেছি।”
–“আমি তানশানের মায়ের কথা জিজ্ঞেস করেছি।”
কথা ঘুরাতে ঘুরাতে হেরে যাওয়া তপোবন শান্ত চোখে তাকায় স্ত্রীর পানে। সে বরাবরই এই টপিক এড়িয়ে চলে মেয়েটির সাথে। সে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে শুধায়,
–“খারাপ লাগে না?”
–“নাহ, কেন?”
–“তোমার স্বামী কাউকে একটাসময় খুব ভলোবাসতো। বিষয়টা খারাপ লাগার।”
রূপকথা কাঁধ ঝাঁকিয়ে না বোধক মাথা নাড়লো। মিহি স্বরে বলল,
–“নাহ, খারাপ লাগে না। একজন মৃত মানুষের জন্য খারাপ লাগা কিংবা হিংসা পোষন করার মতো নিকৃষ্ট আমি নই। আর সত্যি তো এটাই যে—সে বেঁচে থাকলে আমি এখানে থাকতাম না। আমাদের জীবন অন্যরকম হতো!”
তপোবন মুগ্ধ হয় নিজের ছোট্ট স্ত্রীর বুঝদারের ন্যায় আচরণে। পরিপক্কতা যে বয়স দেখে নয়, পরিস্থিতি দেখে আসে। ছোট্ট দেহটি আরেকটু জোড়ালো বাঁধনে আবদ্ধ হতেই রূপকথা সচকিত হয়। কাঁধে একটি থুতনি ঠেকলো ধীরগতিতে। কর্নকুহরে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ আগের করা প্রশ্নের জবাবটি,
–“তাকে কতটা ভালোবাসি জানি না। কিন্তু সে কখনো অভিযোগ করতে পারবে না এতটুকু ভালোবাসি। আর এই অভিযোগের সুযোগ আমার এই ছোট্ট স্ত্রীকেও দেবো না, বুঝেছেন?”
রূপকথা ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। দুষ্টু হেসে বলল,
–“অভিযোগ করার সুযোগ দেবেন না?”
–“উঁহু।”
–“তবে ফুচকা খেতে নিয়ে চলুন।”, সরব অসময়ে এই অনৈতিক চাওয়ায় তপোবন কপাল কুঁচকে সরু চোখে তাকায়। গম্ভীর গলায় বলল,
–“ব্লাকমেইল করা হচ্ছে?”
রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। বলল,
–“আপনি কিন্তু বলেছেন অভিযোগ করার সুযোগ দেবেন না। এখন ফুচকা না খাওয়ালে কিন্তু খাতা কলম নিয়ে অভিযোগ লিখতে বসবো।”
তপোবন মুখ বিকৃত করে নির্বিকার চিত্তে বলো।
–“এই অভিযোগ শুধু ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো অনৈতিক চাওয়ার ক্ষেত্রে নয়, ফেইরি টেইল। চালাকি করা বন্ধ করুন। আপনার ব্রেক টাইম শেষ এখন আবার পড়তে বসুন, ফার্স্ট!”
রূপকথা আর্তনাদ করে উঠল। বায়না ধরে বলল,
–“এখন আর বই পড়ব না।”
–“কোনো কথা নয় রূপকথা। তাড়াতাড়ি চেয়ারে এসো।”, তপোবনের গম্ভীর গলায় রূপকথা এবার হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে বারান্দায় বসে পড়ল। সে আজ আর পড়বেই না। তপোবন হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটিকে দেখে। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোলে তুলে নিলো।
এহেন কান্ডে রূপকথা চেঁচিয়ে বলল,
–“আমি কিন্তু এখন কোনোমতেই পড়তে বসবো না।”
–“আচ্ছা পড়তে হবে না, ঘুমাও তবে।”, তপোবন তাকে বিছানায় রেখে বলল।
রূপকথা সুযোগ পেতেই হুড়মুড়িয়ে কম্ফোর্টার মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। তপোবন আড়চোখে দেখে ফাঁকিবাজ মেয়েটিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় আসে।
বিছানায় এসেই নির্বিকার অদূরে শুয়ে থাকা স্ত্রীর পেট জড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে আসলো। রূপকথা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় গম্ভীর মুখপানে। তপোবন তার প্রশ্নবিদ্ধ চাহনি দেখে থমথমে মুখে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩১
–“বিছানার কিনারায় ঘুমালে পড়ে যাবে, পড়ে গেলে ব্যথা পাবে, পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাবে, আমার অনেক টাকা খরচ হবে। কিন্তু আমার কাছে অনেক টাকা নেই চিকিৎসা করানোর জন্য বুঝেছো? তার চেয়ে বুড়োর বুকে ঘুমাও, শীত ও কম লাগবে আর ব্যথাও পাবে না।”
স্ক্রিপ্টেড অযুহাতে রূপকথা খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তপোবন ও স্মিত হেসে তাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে পড়লো। ছোট্ট মেয়েটিকে আর কতভাবে বোঝাবে ভালোবাসা কেমন?
