অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৬ (২)
তোনিমা খান
অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বহুল আকাঙ্ক্ষিত মানুষটি যখন পুনরায় হারিয়ে যাচ্ছিল, তখন রূপকথা দিক দিশাহারা হয়ে পড়ল। শুকতারাকে আর মাকে কি জবাব দেবে? এই এক প্রশ্ন নিয়ে রূপকথা ভিড় ঠেলে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে লাগল। কিন্তু গেট পেরোতেই দেখল মানুষটা কালো রঙের একটা দামি গাড়িতে করে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে।
নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ছুটেও যখন রূপকথা গাড়িটি ধরতে পারলো না তখন সে উন্মাদ হয়ে পড়ল, কি করবে? দশ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা কি তবে এক নিমেষেই শেষ হয়ে যাবে? এই যান্ত্রিক শহরে বাবাকে পুনরায় হারানোর আতঙ্কে যখন রূপকথা প্রায় উন্মাদপ্রায় ঠিক তখনই তার পাশে দ্রুতগামী এক বাইক এসে থামল।
গাড়ি থামিয়েই তৃশান মৃদু বিক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“ফোন দিলে ফোন ধরো না, কলেজে আসো না ঠিকমতো—আমায় পাগল বানাতে চাইছো? সকাল থেকে খুঁজছি তোমায়।”
কিন্তু রূপকথার মস্তিষ্কে ঢুকলো না তৃশানের কথাগুলো। তার অশ্রুভরা মুখে হাসি ফুটে উঠল তৃশানের বাইকটি দেখে।
তৃশান কপাল কুঁচকে অস্বাভাবিক বিধ্বস্ত মেয়েটিকে দেখে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,
–“কি হয়েছে এমন করছো কেন? আজকেও কি তোমাকে কেউ নিতে আসেনি? ভয় নেই আমি আছি তো।”
তৃশানের কণ্ঠে রূপকথার ঘর্মাক্ত বিবর্ণ মুখটি ঠিকরে কান্না বেরিয়ে আসে। বাবা নামক মানুষটি দূরে চলে যাওয়ার ভয়ে সে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে অনুনয় করে বলল,
–“আমায় একটু সাহায্য করবেন? ঐ যে কালো গাড়িটাতে আমার বাবা আছে। একটু ঐ গাড়িটার পিছু নিবেন? নয়তো আমি আবার চিরতরে হারিয়ে ফেলব আমার বাবাকে, প্লিজ।”
তৃশান কিছুই বুঝতে পারল না, সে মৌন সম্মতি দিলে রূপকথা দ্রুত গাড়িতে উঠে বসে। গাড়িটি সর্বোচ্চ গতিতে কালো প্রাইভেট কারটিকে অনুসরণ করে।
পেছন থেকে অনবরত চেঁচিয়ে যাওয়া তানশান হাঁটু আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে রূপকথাকে ধরতে না পেরে। সে কালবিলম্ব না করে ছুটে যায় কাঙ্খিত জায়গাটিতে।
তপোবন গাড়ির স্টিয়ারিং আঁকড়ে অপেক্ষা করছিল স্ত্রী সন্তানের জন্য। কিন্তু হঠাৎ করেই চোখ থেকে অপক্ষারত স্নিগ্ধতা সরে যায়।
চোখের সামনে নিজের স্ত্রীকে অন্যের বাইকে দেখে চমকালো তপোবন। তারথেকেও বেশি
চমকালো যখন দেখল ওটা আর কেউ নয় বরং তৃশান। প্রতিবার তৃশান-ই কেন? সবটা কি কাকতালীয়?
তানশান দূর্বার গতিতে ছুটে এসে গাড়িতে বসে। বাবাকে তাড়া দিয়ে বলে,
–“পাপা, মিমি তৃশান চাচুর সাথে ওদিকে কোথায় গেল? তাড়াতাড়ি গাড়ি স্টার্ট দাও। তাদের পিছু নাও।”
তপোবন নির্বাক চোয়াল শক্ত করে গাড়ি স্টার্ট দিলো। ধোঁয়াটে কাঁচের ওপারে স্মৃতির কিছু তিক্ত কণা বারবার ঝাপটাচ্ছে। তবে কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে? স্ত্রীকে দেওয়া স্বাধীনতার মাশুল তাকে বাজেভাবে দিতে হবে? পুরোনো বিদঘুটে অভিজ্ঞতায় তপোবন ঐ মুহুর্তে ভালোকিছু আর ভাবতেই পারল না। অবচেতনে তপোবন শুধু একটাই প্রার্থনা করে—রূপকথা যেন তাকে আফসোস করার কোনো সুযোগ না দেয়। এক জীবনে এতবার ভেঙেচুরে তছনছ হওয়ার পর, আবার সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তার নিঃশেষ হয়ে গেছে।
কালো রঙের প্রাইভেট কারটি যখন ‘সেভ এন্ড সেফ’ সুপার শপের সামনে ব্রেক কষল, ঠিক তখনই রূপকথা আর তৃশান সেখানে এসে পৌঁছাল। বাবাকে দেখতে পেয়েই রূপকথার দুচোখে খুশির ঝিলিক খেলে গেল। বাইক থামতেই সে কোনোদিকে দৃষ্টিপাত না করে এক প্রকার ছুট লাগালো প্রবেশদ্বারের দিকে।
তৃশান বাইকটা রাখতে গেল, দারোয়ানের কড়া বাধা—সেখানে আর তিল ধারণের ঠাঁই নেই। বাধ্য হয়েই রূপকথার দিকে একবার উদ্বিগ্ন নজর বুলিয়ে তৃশান নিউমার্কেটের দিকে এগোলো বাইক রাখার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
কিন্তু বিধি বাম! কাঙ্ক্ষিত কিছুর খুব কাছে গিয়েও মানুষ অনেক সময় থমকে যায়। রূপকথা যখনই সুপার শপের ভেতর পা রাখবে, ঠিক তখনই কেউ ক্ষিপ্ত হস্তে তার বাহু টেনে ধরলো।
রূপকথা চমকে পেছনে ফিরতেই তপোবনের থমথমে মুখাবয়ব ভেসে উঠল। চোখেমুখে মেঘলা দিনের মতো এক জমাটবাঁধা আক্রোশ আর গভীর গাম্ভীর্য। ধূসর চোখের মণি দুটো রাগের তোপে যেন আরও গাঢ় ধূসর হয়ে উঠেছে।
বিমূঢ় রূপকথা অনাহুত’র ন্যায় বলে উঠল,
–“তানশানের পাপা, আপনি?”
তপোবন কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করল না। ইস্পাতদৃঢ় মুঠিতে রূপকথাকে এক প্রকার টেনে হিঁচড়ে গাড়ির কাছে নিয়ে এল সে। রূপকথা হাত ছাড়াতে ছাড়াতে ছটফট করে উঠল,
–“তানশানের পাপা কি করছেন? আপনি আমায় নিয়ে যাচ্ছেন কেন? আমার কথা শুনুন। ওখানে..”
মেয়েটির ক্রমাগত জোরাজুরিতে তপোবনের পায়ের গতি থামল ঠিকই, কিন্তু মেজাজ নরম হলো না। সে আরও শক্ত করে রূপকথার কনুই চেপে ধরল। মেয়েটির অশ্রুভেজা চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে বলল,
–“হচ্ছে কি রূপকথা? রাস্তাঘাটে এমন করছো কেন? চুপচাপ গাড়িতে ওঠো। তোমার সবকথা শুনব কিন্তু বাড়িতে গিয়ে।”
দশ বছরের দূরত্ব, অপেক্ষা, দুঃখ দৈন্যের অবসান ঘটতে যাচ্ছে আজ। রূপকথা রীতিমতো কাঁপছে। কণ্ঠনালী আঁটকে আসছে। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
–“তানশানের পাপা…ও..ওখানে.. আব্বু..”
বলতে বলতেই রূপকথার চোখ যায় কালো গাড়িটার দিকে। সদ্যই সেটাতে তার যাত্রী উঠে বসেছে। চলে যাবে ভাবতেই রূপকথা গলা কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করে উঠল। জোরপূর্বক তপোবনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পুনরায় ছুটতে চায়, কিন্তু পারে না তপোবন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।
ক্রোধ নিয়ন্ত্রন না করতে পেরে তপোবন উচ্চস্বরে ধমকে উঠল,
–“স্টপ ইট রূপকথা! অনেক হয়েছে!”
রূপকথার চোখের কার্নিশ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে তপোবনের ক্রোধের আগুনে দ্বগ্ধ লাল মুখশ্রীর দিকে তাকায়। অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে বলে,
–“তানশানের পাপা! ঐ গাড়িতে আমার আব্বু আছে। আজ যদি হারিয়ে ফেলি তবে আমি শুকতারাকে কি জবাব দেবো? একটু গাড়িটাকে থামান না!”
তপোবন থমকালো! সে চকিতে তাকায় সদ্যই স্টার্ট দেওয়া গাড়িটির দিকে। দ্রুতগতিসম্পন্ন গাড়িটি অনেকটা দূরে চলে যেতেই রূপকথা পেছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল ,
–“আব্বুউউ! আব্বুউউ শুনতে পাচ্ছো? আমি রূপকথা, তোমার মেয়ে! তানশানের পাপা কিছু করুন না, ঐ গাড়িটিকে একটু থামান!”
তপোবনের বিমূঢ় দৃষ্টি একবার ধাবমান গাড়িটির দিকে যায়, পরক্ষণেই ফিরে আসে রূপকথার বিধ্বস্ত মুখপানে। একরাশ বিস্ময় আর অবিশ্বাসের দোলাচলে শুকনো ঢোক গিলে অস্ফুট স্বরে শুধাল,
–“ ওই গাড়িতে তোমার বাবা?”
–“হ্যাঁ, হ্যাঁ তানশানের পাপা। ঐ গাড়িতে আমার আব্বু আছে।”
পাথরের ন্যায় থমকে যাওয়া তপোবন স্থবিরতা ভেঙে দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করলো। রূপকথা তখনো ছটফট করছে, যেন এক লহমায় পৃথিবীটা তার হাতের মুঠো থেকে ফস্কে যাচ্ছে।
রূপকথার বিধ্বস্ত মুখপানে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে তপোবন ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“খালুজান, তুমি কি দেশে এসেছো? খালামনির গাড়ি নিয়ে কি মাত্রই সেভ এন্ড সেফের সামনে থেকে গিয়েছ?”
অপরপ্রান্তের পরবর্তী কথা আর শোনাগেল না। বরং তিন মিনিটের মাথায় বহুল আকাঙ্ক্ষিত কালো গাড়িটি এসে থামলো তপোবন, রূপকথা আর তানশানের সামনে।
রূপকথা তখন চমকে তাকায় তপোবনের মুখপানে। তপোবন ও তাকিয়ে মেয়েটির অবিশ্বাস্য মুখপানে। ততক্ষণে গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসে সেই স্নিগ্ধ পিতৃসুলভ হাসিমাখা মুখটি।
ওয়াহেদ অমায়িক এক চিলতে হাসি নিয়ে তপোবনের দিকে এগিয়ে এলেন। চারপাশের থমথমে পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে সহজ হাস্যোজ্জ্বল স্বরেই বললেন,
–“তপোবন, তুমি এখানে? আমি খেয়ালই করিনি তোমাদের। তানশান যে! কেমন আছো দাদুভাই?”
মিমির দিক থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছিল না তানশান। সে একপ্রকার ঘোরের মধ্যে থেকেই যান্ত্রিকভাবে জবাব দিলো,
–“ভালো আছি, দাদুভাই।”
তপোবন কোনো উত্তর দিল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সে রূপকথার সেই বিস্ফোরিত, অশ্রুসজল দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে সরাসরি ওয়াহেদ সাহেবের চোখের দিকে তাকালো। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
–“খালুজান ভালো আছো? ও আমার স্ত্রী—রূপকথা। দেখো তো, চিনতে পারো কি-না!”
‘রূপকথা’ নামটি কানে আসা মাত্রই ওয়াহেদের হাসিমাখা মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। এক অজানা আশঙ্কায় তার হৃৎপিণ্ড যেন একটা স্পন্দন মিস করল। তিনি বিমূঢ় হয়ে তাকালেন তপোবনের বাহুবন্ধনে আটকে থাকা সেই বলহীন, স্থবির মেয়েটির দিকে।
দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই ওয়াহেদ সাহেবের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। মেয়েটির মুখাবয়বে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। দশ বছরের লালন করা ভয় আর গোপনীয়তাগুলো যেন আজ অনাবৃত হওয়ার পথে।
ওয়াহেদের সেই অস্থির ও কুঞ্চিত দৃষ্টি দেখে রূপকথার শরীর যেন আরও নিস্তেজ হয়ে এল। সে তার অশ্রুভারাক্রান্ত চোখে ‘বাবা’ নামক এই মানুষটির আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। প্রতিচ্ছবিটি আজ কতটা অচেনা! দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এমন এক বীভৎস ও ঘৃণ্য বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে জানলে, রূপকথা কোনোদিন স্রষ্টার কাছে এই মানুষটার প্রত্যাবর্তনের প্রার্থনা করত না।
ঠিক সেই মুহূর্তে নিহাম এসে ওয়াহেদের হাত শক্ত করে ধরল। রূপকথা সেই আঁকড়ে ধরা হাতটির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে বিদীর্ণ কণ্ঠে শুধালো,
–“ও কে হয় আপনার?”
ওয়াহেদের মুখে কোনো শব্দ নেই; তার চোখেমুখে কেবল এক অপরাধবোধমিশ্রিত কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা। নিহাম অমলিন হাসি নিয়ে বলে উঠল,
–“ইনি আমার পাপা, ভাবি!”
নিহামের সেই সরল স্বীকারোক্তি রূপকথার মস্তিষ্কে যেন তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। এক অসহ্য ও ঘৃণ্য সত্য হজম করার যন্ত্রণায় তার স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যেতে লাগল। সে ক্ষীণ, অথচ তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল,
–“আপনার ছেলেও আছে? চমৎকার! কত সুখে আছেন আপনি, দেখে সত্যিই প্রাণ জুড়িয়ে গেল।”
সে পুনরায় তাকালো তার জন্মদাতার নতমুখী অবয়বের দিকে। ‘বাবা’ নামক পবিত্র সম্বোধনটি এই মুহূর্তে লোকটার নামের পাশ থেকে চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। অতি শোকে পাথর হয়ে যাওয়া রূপকথা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি ঝুলিয়ে বলল,
–“ভালো আছেন খালুজান? আমায় চিনতে পেরেছেন তো? আমি রূপকথা! এক কলুষিত, নিকৃষ্ট ঔরসজাত আমি। চিনতে পারার কথা। আবার ভুলেও যেতে পারেন, বলা যায় না। মানুষ তো আস্ত এক গিরগিটি। তারা ভয়ঙ্কর ভাবে তাদের রূপ বদলে নেয়।”
পরপরই উন্মাদের ন্যায় বলে,
—“চিনতে পারেননি বোধহয়? দাঁড়ান, আমি আপনার স্মৃতি ঝালিয়ে দিচ্ছি। দশ বছর আগে বাগেরহাটের সেই জীর্ণ ঘরে আপনি যে তিনটে ‘পশু’কে ফেলে এসেছিলেন, তাদের মনে পড়ছে? পশুই বললাম, কারণ আপনি যা করেছেন তা কোনো মানুষের সাথে করা সম্ভব নয়। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের সাথে এমন নৃশংসতা তো অকল্পনীয়! আমার ভাবতেই দম বন্ধ হয়ে আসছে যে, আপনি যা করেছেন তা বোধহয় কোনো বন্য পশুও স্বজাতির সাথে করে না।”
ওয়াহেদ সজোরে এক শুকনো ঢোক গিলল। দশ বছরের ধুলোবালি মাখা সেই স্নিগ্ধ স্মৃতিগুলো উজ্জিবীত হতে লাগল। কোলজুড়ে সারাক্ষণ আহ্লাদ করা সেই ছোট্ট মেয়েটির প্রতিচ্ছবি তার চোখের সামনে দাপিয়ে বেড়ালো। সে কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠল,
—“রূপকথা… মা আমার!”
এক বহুল প্রতীক্ষিত ডাক! অথচ সেই সম্বোধনে রূপকথার অস্থিমজ্জা পর্যন্ত তীব্র ঘৃণায় রি রি করে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ থামিয়ে দিয়ে বলল,,
—“থামুন খালুজান, আর একটি শব্দও নয়! চিনতে পেরেছেন, এটুকুই যথেষ্ট। নামের শেষে ‘মা’ সম্বোধন জুড়ে দিয়ে ওই পবিত্র সত্তাটিকে আর কলুষিত করবেন না। আপনার মতো ঘৃণ্য মানুষের মুখে এই স্বর্গীয় ডাকটি বড্ড বেমানান!”
পরপরই আকুতিভরা কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“আমায় একটা কথা বলুন তো, আমাদের অপরাধটা কি ছিল? আমার মা—ঐ মহিলাটার কি অপরাধ ছিল? সে আপনি বলতে পাগল ছিল। আজ দশ বছর সে আপনার অপেক্ষায় গুমড়ে গুমড়ে মরছে।
আমরা দুই বোন আধা ঘন্টা আগ পর্যন্ত স্বপ্ন দেখতাম, কোনো একদিন আমাদের বাবা ফিরে আসবে। আমাদের সব দুঃখ সেদিন ঘুচে যাবে।
আমার ছোট বোনটা ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতো, কেমন হতো যদি ম্যাজিকের মতো আমরা আব্বুকে খুঁজে পেতাম।
আমায় যখনি ফোন দেয় তখনি বলে,
বুবু, তুই তো শহরে থাকিস। একটু দুলাভাইকে বল না আব্বুকে খুঁজে বের করতে।
আজ ম্যাজিকের মতোই সব সত্যি হলো, কিন্তু এই বাস্তবতা এত জঘন্য কেন? আপনার নিখোঁজ হওয়ার যন্ত্রণার চেয়েও, এই সত্যটা বেশি বিষাক্ত। আমি কি করে শুকতারাকে বলব যে—আমাদের বাবা একজন চরিত্রহীন মানুষ, সে আমাদের ফেলে অন্য কোথাও সুখে সংসার করছে! আমার মা আর বোনটা তো মরে যাবে।”
রূপকথা ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বলছে। দশ বছর ধরে লালন করা ভয়গুলোর সম্মুখীন ওয়াহেদের কাছে কৈফিয়ত দেয়ার মতো একটা শব্দ নেই। পৃথিবীর সকল কৈফিয়ত বুঝি ফিকে পড়বে ফেলে আসা কুলকিনারাহীন ঐ তিন অবলা নারীর আর্তনাদের কাছে।
তপোবনের সব ভ্রান্ত ধারণা বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল। সে দ্রুত বিধ্বস্ত মেয়েটিকে আগলে নিলো। রূপকথা অশ্রুসিক্ত চোখ তুলে তাকায় আগলে ধরা মানুষটার দিকে। চোখের সামনে সব ধোঁয়াশা হয়ে আসতেই সে মিহি স্বরে বলল,
—“তানশানের পাপা, এগুলো সব স্বপ্ন ছিল তাই না? একটা ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন! চলুন আমরা বাড়ি ফিরে যাই। মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হতেই পারে না, কেউ আমাদের এমন কঠিন শাস্তি দিতেই পারে না। চলুন, আমি আর এসব দুঃস্বপ্ন দেখতে চাই না।”
তপোবন ব্যথিত নয়নে মেয়েটির উদ্ভ্রান্ত চাহনির দিকে তাকাল। আদুরে স্বরে বলল,
—“শান্ত হও, রূপকথা!”
সরব রূপকথা রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় তপোবনের দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
–“আপনাকে আমি কি বলেছি, আমি বাড়িতে যাবো। এখুনি চলুন। ওহ্, তাকে তো একটা ধন্যবাদ দেয়া বাকি।”
বলেই রূপকথা ফের তাকায় নত শির দাঁড়িয়ে থাকা বাবার বেশে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটির দিকে। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে গাল ভরে হেসে বলল,
–“আপনাকে ধন্যবাদ খালুজান, আপনার কাপুরুষতার কারণে আজ আমি এই মানুষটার স্ত্রী। আপনার বদৌলতে আমি এই নিকৃষ্ট পৃথিবীতে একজন ভালো মানুষকে স্বামী হিসেবে পেয়েছি। আর এটা আমার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। লোকটা আর পাঁচটা কাপুরুষের থেকে আলাদা। যে একজন ভালো বাবা, একজন ভালো স্বামী। আসি হ্যাঁ? দোয়া করবেন যেন—আপনার ছায়াও আমার আর আমার পরিবারের উপর না পড়ে।”
বলেই রূপকথা একপ্রকার ছুটে পালিয়ে যায় ঘৃণ্য বাস্তবতা থেকে। তানশান ও দ্রুত মিমির পেছন পেছন গাড়িতে উঠে বসলো।
স্ত্রী সন্তানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তপোবন তাকায় ওয়াহেদের নত মুখপানে। ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারছি না খালুজান, তবে এই মুহূর্তে তোমার মুখটা দেখতেও আমার ঘৃণা হচ্ছে। ওই পরীর মতো মেয়ে দুটোর সাথে যা হয়েছে, সেটা ওদের প্রাপ্য ছিল না।
আমি কোনো কৈফিয়ত শুনতে চাই না। শুধু এতটুকু বলব, আজকের পর আমার স্ত্রী আর আমার এই ছোট পরিবারটা থেকে তুমি দূরে থাকবে। দশ বছর আগে তুমি স্বেচ্ছায় হারিয়ে গিয়েছিলে আর আজ থেকে আরেকবার চিরতরের জন্য হারাবে।
প্রয়োজনে আমি তোমায় সাহায্য করব, কিন্তু ওই তিনটা মানুষের জীবনে তোমার ছায়াও যেন আর না পড়ে। ওরা তোমাকে হারানোর কষ্ট সয়ে বেঁচে থাকতে শিখে গিয়েছে; তোমাকে ফিরে পেয়ে পুরোপুরি শেষ হতে আমি দেব না। আশাকরি বুঝতে পেরেছ।”
বলেই তপোবন লম্বা লম্বা কদম ফেলে গাড়িতে উঠে বসে। ওয়াহেদ নত শির চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সেথায়।
কাঁচ তুলে দিলে শব্দ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো গাড়ির ভেতরটা। পিনপতন নীরবতায় গাড়ির মধ্যকার গুমোট পরিবেশ ধীরে ধীরে আরো তীব্রতর হলো।
তিনজনের শ্বিস প্রশ্বাস ব্যতীত অন্য কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
তানশান বারবার চঞ্চল দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে বাবা আর মায়ের দিকে। কিন্তু কেউ একটা কথা তো দূর, মাথাও তুলছে না। অন্তঃস্থলে অজস্র প্রশ্ন, বেদনা নিয়ে সে আবার চুপটি করে বসে রইল।
তবে গাড়ির মধ্যকার সেই ভীতিকর গুমোট পরিবেশ কিয়ৎকাল বাদেই ভেঙে গেল হঠাৎ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে উঠতেই। তানশান চমকে পিছু ফিরে তাকায় ব্যাকসিটে বসে হাঁউমাঁউ করে কাঁদতে থাকা রূপকথার দিকে। এলোমেলো হিজাব খামচে ধরে রূপকথা কাঁদছে আর ছটফট করছে। সে অস্ফুট স্বরে ডাকে,
–“মিমি?”
তপোবন জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে আলগোছে ছেলের হাতের উপর হাত রেখে থামিয়ে দিলো।
তানশান তাকায় বাবার দিকে। তপোবন চোখে আশ্বস্ত করে কিছু না বলার জন্য। পুরোটা রাস্তা রূপকথা সেভাবেই কাঁদতে থাকে। বাড়ির ভেতর গাড়ি ঢুকতেই তপোবন গ্যারেজে গাড়ি ঢুকিয়ে, ছেলেকে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“আব্বু, উপড়ে যাও। আমি তোমার মিমিকে নিয়ে আসছি।”
তানশান তখনো হতভম্ব কান্নারত মিমিকে দেখে। কাউকে কাঁদতে দেখলে তার কষ্ট হয়, ভীষণ কষ্ট হয়। সে মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে ঘরে চলে যায়।
তপোবন লম্বা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বের হয়ে পেছনের সিটে গিয়ে বসলো। ব্যাকসিটে গুটিয়ে শুয়ে থাকা কান্নারত দেহটিকে নির্বিকার দু’হাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নিলো। সহসা রূপকথা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তপোবনের শার্ট খামচে ধরে। অভিযোগে ভরপুর নয়নে তাকায় আর বলে,
–“আমার মায়ের কি দোষ ছিল? ঐ লোকটা কত ভালো আছে আর আমার মা? আমার বোনটা? তিনবেলা ঠিক করে খেতেও পারে না। আপনি দেখেছেন না? দেখেছেন না ঐ লোকটাকে? ঐ লোকটা আমার বাবা ছিল, প্রতিদিন অফিস থেকে আসার পথে আমাদের জন্য ব্যাগ ভর্তি খাবার নিয়ে আসতো। শহুরে খাবার! আর আজ কত পার্থক্য! বড় গাড়িতে চালফেরা করে সে, আর আমার মা ছেঁড়া জুতো সেলাই করে পড়ে।”
তপোবন নিরুত্তর অনবরত তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। রূপকথা ফের কান্নারত চোখ তুলে বলে,
–“বাবারা এমন হয়? কোনো বাবা কি এমন করতে পারে? সে জীবিত ছিল, ভালো ছিল অথচ একটাবার ফেলে আসা সন্তানদের খোঁজ কি করে না নিয়ে থাকতে পারল? পুরুষ মানুষ এতটা অনুভূতিহীন? আপনিও কি এমন অনুভূতি হীন? আপনিও কে ছেড়ে দিবেন আমায়?”
তপোবন ম্লান হালো মেয়েটির কথায়। অশ্রু আর ঘেমে নেয়ে একাকার মুখটি বা হাতে মুছিয়ে দিয়ে হিজাবটা খুলে ফেলল। এলোমেলো চুলগুলো হাতের ভাঁজে গুছিয়ে দিয়ে ছোট্ট মুখটি দু হাতের আজলায় নিয়ে নেয়। প্রবল অধিকার আর আদরের সাথে কষ্ট গুলো শুষে নেয়ার প্রয়াসে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় দুই ভ্রুর মাঝ বরাবর, পরপরই দুই চোখের পাতায়। একদম জড়তাহীন। বদ্ধ নেত্রে রূপকথা খামচে ধরলো শার্টের আস্তিন। ফের গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মুছতে মুছতে তপোবন শুধায়,
–“তুমি থাকবে আমার সাথে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত?”
তিরতির করে কাঁপতে থাকা ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে রূপকথা ঘন ঘন মাথা নাড়লো। তপোবন স্মিত হেসে আবার ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় কপালে অতঃপর দৃঢ় গলায় বলে,
–“তুমি থাকলে আমি আজীবন যত্ন আর সম্মানের সহিত তোমায় আগলে রাখব। কখনো শঙ্কা তৈরির সুযোগ-ই দেবো না। অবিশ্বাসের খেয়ালে মগ্ন এই পৃথিবীতে আমরা নাহয় বিশ্বস্ত এক অদ্ভুত অসম জুগল হিসেবে থেকে যাব।”
রূপকথা আবারও অশ্রুসিক্ত নয়নে পিটপিট করে চেয়ে রইল। সৌন্দর্য, অবস্থান, পদ, সামাজিক অবস্থান, বয়সের পার্থক্য সবকিছু ছাপিয়ে সে আজীবন থাকতে চায় এই মানুষটার সাথে।
তপোবন চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
–“তবে এসব চিন্তা এখন বাদ দাও। তোমার বাবা দশ বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল—এটাই ধ্রুব সত্য! শুকতারা আর আম্মার জন্য তুমি আমি আর তানশান-ই যথেষ্ট। আর কারোর প্রয়োজন নেই। যেটা এতদিন আড়ালে ছিল, তা আড়ালেই থাকতে দাও। এই দশ বছরে আম্মা আর শুকতারা দুঃখগুলোকে সামলে উঠতে শিখেছে, নতুন করে দুঃখ গাঢ় করার প্রয়োজন নেই। তাদের জন্য আমরা যথেষ্ট!”
রূপকথা নিস্তেজ দেহে তাকিয়ে রইল দৃঢ় মুখপানে। বাবা নামক মানুষটার চোখেমুখেও ছোটবেলায় এমনি দৃঢ়তা ছিল সন্তান আর তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু সময়ের ছলনায় তা এখন কেমন বিদঘুটে স্মৃতি! তাই সে পুনরায় শুধালো,
–“আপনি কি সারাজীবন আমার পাশে থাকবেন?”
তপোবন গাঢ় নেত্রে কাঁপতে থাকা পাতলা ঠোঁটজোড়া দেখতে দেখতে টলটলে নেত্রদ্বয়ে দৃষ্টি রাখে। স্মিত হেসে মেয়েটির বাহু জড়িয়ে আরেকটু বুকের কাছে টেনে নিয়ে আদুরে গলায় শুধায়,
–“আপনি কি চান, মুরুব্বি?”
কথার ছলে রূপকথা নিরুত্তর শুধু চেয়ে রইল। তপোবন উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–”মুরুব্বি যদি চায়, আমি আজীবন তার পাশে থেকে যাই, তবে আমি আজীবন তার পাশে থেকে যাব। আপনি কি তা চান?”
রূপকথা মাথা নেড়ে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“চাই!’
তপোবন স্মিত হেসে বলল,
–“মুরুব্বির কথা শিরধার্য! সিদ্ধান্ত কিন্তু হয়ে গিয়েছে, মুরুব্বি! এই বুড়ো কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর আপনার পিছু ছাড়ছে না। বিরক্ত হলেও না!”
রূপকথা বলহীন দূর্বল কণ্ঠে বলল,
–“ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমরা সারাজীবন ছটফট করেছি। বিরক্ত অন্তত হবো না, কিন্তু আমাদের যে ভালোবাসতে সকলে অনেক কার্পণ্য করে।”
তপোবনের দৃষ্টি হঠাৎ ম্লান হলো। নারীটি যে কারোর দ্বিতীয় জীবনের অংশ হয়ে তার ভার বইতে পারছে না। ছোট্ট মেয়েটি কখনোই এমন বিতর্কিত জীবন আর জীবনসঙ্গীর প্রাপ্য নয়। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ইচ্ছে তো করছে নিখুঁত এই ফুলটিকে পৃথিবীর সকল সুখ আর ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখতে। কিন্তু আমি নিজেই যে খুঁত যুক্ত এক মানুষ। কি করে এই ফুলের যোগ্য প্রাপ্য তাকে দেই বলোতো?”
রূপকথার দেহমনে আজ আর বিন্দুমাত্র শক্তি নেই। শরীরটা নেতিয়ে পড়লো বড্ডো আরামদায়ক বুকটিতে। বদ্ধ নেত্রে ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো,
–“সব অযুহাত! কেউ ভালোবাসতে চায় না।”
তপোবনের মুখশ্রী হতাশার আড়ালে মিলিয়ে গেল। ছোট্ট মেয়েটি যে সাধ্যের বাইরে গিয়ে বাস্তবতার সাথে লড়ছে। তার সঙ্গের বড্ডো প্রয়োজন!
নিজের রুমে পায়চারি করতে থাকা তানশান বারবার উঁকি দিলো কড়িডরে।
তপোবন অচেতন প্রায় দেহটিকে কোলে নিয়ে বাড়িতে ঢুকতেই মৌনতা আর জবা চমকালো।
তারা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে কিছু বলতে যাবে তার আগেই তপোবন চারিপাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে চাপা স্বরে বলল,
–“মৌন, পরে কথা বলব। আপাতত আম্মাকে কিছু বলোনা। আর আম্মা রূপকথার কথা জিজ্ঞেস করলে বলবে, ওর জ্বর এসেছে।”
মৌনতা অজস্র প্রশ্ন নিয়ে নিরুত্তর শুধু মাথা নেড়ে সায় জানালো।
বাবাকে উপরে আসতে দেখে তানশান ছুটে গেল। আতঙ্ক ভরা কণ্ঠে শুধায়,
–“পাপা, মিমির কি হয়েছে?”
তপোবন মিহি স্বরে বলল,
–“মিমি একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, আব্বু। একটু ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে।”
তপোবন ঘরে গিয়ে রূপকথাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে দ্রুত নিজে গোসল করে বের হয়। বিছানায় শায়িত মেয়েটিকে দেখে চাপা নিঃশ্বাস ফেলল। চোখেমুখে বিতৃষ্ণা! তাকে জরুরী ভিত্তিতে এখন অফিসে যেতে হবে।
সে পাঞ্জাবী পড়ে ছেলের ঘরে গিয়ে দেখলো সে তখনো স্কুলের ইউনিফর্ম পড়েই ঝিমুচ্ছে। তার ছেলেটা গম্ভীর হলেও অনুভূতির দিক থেকে ভীষণ নাজুক। ছোটবেলা থেকে মা হারানোর কষ্ট সহ্য করতে করতে পাথর হয়ে যাওয়া ছেলেটি, অদ্ভুত ভাবে অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারে না। সে আদুরে গলায় ডেকে ওঠে,
–“আব্বু।”
তানশান চোখ তুলে তাকায়। বিমর্ষ কণ্ঠে বলে,
–“পাপা, ওয়াহেদ দাদুভাই মিমির বাবা? সে সুস্থ সবল ছিল কিন্তু মিমিদের ফেলে লুকিয়ে ছিল? কেউ এমনটা কি করে করতে পারে পাপা? এমন বাবা মাও হয়? ”
তপোবন ছোটবেলা থেকে ছেলের কাছে বাবা মা শব্দদুটোকে পবিত্র শব্দ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আজ ও চাইলো না দুনিয়ার নিকৃষ্টতার সাথে ছেলেকে পরিচয় করাতে। সে ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসা ছেলের মাথাটা আগলে নেয় নিজের সাথে। এক হাত চুলে গলিয়ে দিয়ে বলে,
–“সব মানুষ সমান হয় না, আব্বু। জরুরী নয় একজন দু’জনের জন্য আমরা গোটা শব্দটাকে খারাপ বলব। যারা খারাপ —তারা জীবনের সব পর্যায়েই খারাপ আচরণ করে, হোক সেটা স্বামী কিংবা বাবার পর্যায়ে। এখন তুমি এটা থেকে কি বুঝলে বলোতো?”
তানশান মুখ তুলে তাকায়। তপোবন দুহাতের আজলায় ছেলের মুখটি নিয়ে বলল,
–“তুমি কি শিক্ষা নিলে এটা থেকে?”
তানশান ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“ভালো মানুষ হতে হবে, যেন আমার দ্বারা জীবনের কোনো পর্যায়ে কেউ আঘাত না পায়।”
–“একদম ঠিক, আর তোমার মিমিকে এই কষ্ট থেকে বের করতে হবে। সবসময় তার খুশির কারণ হতে হবে। তুমি কি জানো, তোমার মিমি আর তার পরিবরাকে ভালোবাসার মতো কেউ নেই তুমি আর আমি ব্যতীত। তাই আমাদেরই সবসময় তাদের আগলে রাখতে হবে, ভালোবাসতে হবে, পাশে থাকতে হবে। থাকবে তো?”
তানশান ঘন ঘন মাথা নেড়ে বলল,
–“থাকব পাপা, সবসময় থাকব।”
তানশানের বক্ষস্থলে কেমন ব্যথা অনুভব হলো। মিমির অবস্থা তো তার থেকেও করুণ! তার তো সব রয়েছে কিন্তু মিমির? মিমির বাবা থেকেও নেই, তাদের ছেড়ে অন্য কারোর কাছে চলে গিয়েছে! অন্তঃস্থলে আরো কয়েকধাপ নম্রতা বৃদ্ধি পেল মিমির জন্য।
তপোবন ছেলের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৬
–“মিমি ঘুমাচ্ছে। তার পাশে থাকবে। পাপাকে জরুরী কাজে একটু অফিসে যেতে হবে তানশান। আসতে লেইট হতে পারে। তুমি দেখে নেবে তো তাকে? তার কিন্তু এখন কাউকে খুব প্রয়োজন।”
–“আমি দেখে নেবো তাকে। একটুও মন খারাপ হতে দেবো না।”, তানশান সাগ্রহে বলল। তপোবন নিশ্চিন্তের নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে।
