Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৭

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৭
তোনিমা খান

বিভীষিকাময় জীবনের মোড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে রূপকথা ছোট্ট একটা হাত পেতেই তার অধরে ফুটে উঠল এক চিলতে বিষাদমাখা হাসি।
দ্বিতীয়বারের মতো পিতৃহারা হওয়ার সেই বিদঘুটে আর অসহনীয় প্রদাহে রূপকথা বেশিক্ষণ চোখ বুজে থাকতে পারল না। বুক জুড়ে হারিয়ে ফেলার তীব্র সেই হাহাকার নিয়ে সে ছটফট করে উঠে বসল। চৈতন্য ফিরে আসতেই আবার সেই বিভীষিকাময় বাস্তবতা তাকে গ্রাস করল। তবে এবার আর ‘স্বামী’ নামক ভরসাটুকুকেও পাশে খুঁজে না পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে রূপকথা।
কিন্তু যেদিন থেকে তপোবন দ্বিতীয়বার কবুল বলেছিল, সেদিন থেকেই মনেপ্রাণে মানে—সে কারোর ভরসাস্থল। কোনোভাবেই এই আশ্রয়ের ভিত নড়বড়ে হতে দেওয়া যাবে না। আজও তার সেই প্রতিজ্ঞার ব্যত্যয় ঘটল না।
বাবার অনুপস্থিতিতে তাঁরই আদর্শে দীক্ষিত তানশান এক শক্তিশালী ঢাল হয়ে দাঁড়াল উন্মাদপ্রায় নারীটির।
বাবার আদেশ মান্য করা তানশান শক্তিশালী ভরসাস্থল হলো তার মিমির।
রূপকথার দুইহাত নিজের শক্ত আজলায় নিয়ে তানশান শক্ত কণ্ঠে বলল,

–“পাপা সবসময় বলে , আল্লাহ যা করেন আমাদের ভালোর জন্য করেন। আল্লাহ যদি কাউকে আমাদের থেকে কেড়ে নেয়, তবে তার জন্য হয়তো তার কোন উত্তম পরিকল্পনা থাকে। আপনার জন্য ও হয়তো আল্লাহ কোন উত্তম পরিকল্পনা ভেবে রেখেছিলেন তাই এমনটা করেছেন। আপনি যদি কান্নাকাটি করেন তবে আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ পাবে। এতে আল্লাহ নারাজ হবে। আপনার কষ্টগুলো আল্লাহর কাছে সপে দিন আর হাসিমুখে থাকুন। যার যা প্রাপ্য তা সৃষ্টিকর্তা তাকে তা দেবেই।”
বিছানায় নেতিয়ে পড়া দূর্বল দেহে রূপকথা কান্না থামায়। ক্ষীণ স্বরে বলে,
–“বাবার আশায় দশ বছর চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করার পর এত যন্ত্রনা কি আমাদের প্রাপ্য?”
তানশান না বোধক মাথা নাড়লো।
–“আপনাদের এগুলো প্রাপ্য নয় বলেই সৃষ্টিকর্তা একজন অযোগ্য মানুষকে আপনাদের থেকে কেড়ে নিয়েছে।”
তিরতির করে কেঁপে ওঠা অধরযুগল আর চেপে রাখতে পারল না রূপকথা; ফের গুমরে উঠল তার অবরুদ্ধ কান্না। আর্তনাদের সুরে বলল,

—”কিন্তু ওই মানুষটা যে আমার বাবা ছিল, তানশান! যার কাঁধে চড়ে আমার শৈশব কেটেছে, যার বুকে মুখ লুকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি। সেই মানুষটা চলে যাওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের এতটাই ভালোবেসেছিলেন যে—দশটি বছর আমরা শুধু তাঁর ফেরার অপেক্ষায় কাটিয়ে দিয়েছি। এত স্মৃতি, এত মায়া কি এক নিমেষে বিস্মৃতির অতলে ভুলিয়ে দেওয়া সম্ভব? এত নিখাদ ভালোবাসার পরেও সৃষ্টিকর্তা কেন আমাদের বাবাকে এমন নৃশংসভাবে কেড়ে নিলেন?”
আঁকড়ে ধরা হাতটি আরও নিবিড়ভাবে নিজের মুঠোবন্দি করে নিল তানশান। চরম প্রতিকূল মুহূর্তেও বাবার মতো চিরচেনা স্মিত হাসি নিয়ে সে দৃঢ়কণ্ঠে বলল,
—”সৃষ্টিকর্তা যা অযোগ্য, তা-ই আমাদের থেকে কেড়ে নেন; আর যা উত্তম, তা-ই আমাদের দান করেন। তিনি আপনার বাবাকে সরিয়ে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে কতজন আপন মানুষকে পাঠিয়েছেন তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন?”
রূপকথা অশ্রুসিক্ত, বিভ্রান্ত চোখে চেয়ে রইল। তানশান মৃদু হেসে বলল,

—”সৃষ্টিকর্তা আপনার বাবাকে হয়তো ফিরিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু পরিবর্তে আমাদের তো দিয়েছেন। আজ থেকে আমরাই আপনার পরিবার, আপনার বাবা, আপনার একমাত্র ভরসা। এইযে আমি যখন বড় হবো তখন আপনার সব দায়িত্ব আমার। নতুন নানু আর আপনার ছোট বোনের দায়িত্ব ও আমার। আমাদের আর কাউকে প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই সবাইকে ভালোবেসে আগলে রাখব—এটুকু কি যথেষ্ট নয়?”
তানশানের কণ্ঠে ভরপুর দৃঢ়তা। নেই কোনো জড়তা, ঘৃণা। কঠিন বাস্তবতার দোরগোড়ায় রূপকথার মনে হলো সন্তান হিসেবে সে হেরে গেলেও, মা হিসেবে সে জিতে গিয়েছে। সে জিতে গিয়েছে ‘সৎ মা’ নামক সামাজিক কলঙ্ক আর অবজ্ঞার জড়িত শব্দটির সাথে লড়াইয়ে। এক সুপ্ত বিজয়ের উল্লাসে তার কান্নার বেগ স্তিমিত হয়ে আসে।
এতক্ষণ ঘরের কোণে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা আর রোজ তাদের স্থবিরতা ভেঙে একে অপরের দিকে তাকাল।
মায়েরা যেমন সন্তানদের সুখে দুঃখে তাদের আগলে রাখে, পরিবর্তে সন্তান ও মায়ের সুখ দুঃখে মাকে আগলে রাখবে। এমন একটা সুন্দর দৃশ্য সাধারণ রক্তের সম্পর্কে স্বাভাবিক হলেও, সৎ মা ও ছেলের সমীকরণে তা বরাবরই এক বিরল দৃশ্য। তবে আজ মৌনতা আর রোজ এক পরম সৌভাগ্যের ফলে সেই দুর্লভ মুহূর্তেরই সাক্ষী হলো।
হৃদয়ে একরাশ মৃত অনুভূতির ভার নিয়ে শয্যাশায়ী নির্জীব নারীটি অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা চঞ্চল ছেলেটির দিকে। নিস্তেজ নারীটির পানে চেয়ে তানশান ভীষণ আদুরে স্বরে বলল,

–“ভাত খাবেন? মেজো মা ভাত এনেছে। কোন সকালে খাবার খেয়েছেন!”
অশ্রুভেজা নয়নে রূপকথা নীরবে না বোধক মাথা নাড়লো।
তানশান যেন আজ মাকে আগলে রাখা এক যত্নবান সন্তান। সে এবার মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
–“তবে কি অন্যকিছু খাবেন? পাস্তা খাবেন?”
রূপকথা এবারেও নাকোচ করল। তানশান এবার ভাবুক হলো। ভেবেচিন্তে শুধাল,
–“তবে পিৎজা? বার্গার? চিকেন চাপ, নান এগুলো খাবেন?”
রূপকথা এবারও প্রত্যাখ্যান করল। চতুর্থ বারের মতো ভাবুক তানশান সরব চমৎকার হেসে উৎসুক কণ্ঠে বলল,
–“আচ্ছা; ভাত, পাস্তা, পিৎজা কিছুই খেতে চান না? কিন্তু এখন আমি এমন একটা জিনিসের নাম বলব, যেটা আপনি কিছুতেই ফেরাতে পারবেন না। নামটা শুনলেই আপনার জিভে জল এসে যাবে, আর আপনি নিজেই অনুরোধ করে বলবেন—তানশান, প্লিজ একটু খাই। বলব সেটা কি?”
তানশানের উৎসুক কণ্ঠে রোজ আর মৌনতার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটলেও, কাঙ্ক্ষিত মানুষটির মুখে বিষণ্ণতার ছায়া কাটল না; বিন্দুমাত্র নড়চড় হলো না তার পাথর হওয়া চাউনিতে। তানশান দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে জানে, এই একটি খাবারের নাম শুনলে রূপকথা বরাবরই আত্মহারা হয়ে যায়। সে হাসিমুখে আরো উৎসাহ নিয়ে বলল,

–“ফুচকা খাবেন? অনেকগুলো ফুচকা? আমায় দশ মিনিট দিন আমি এখুনি গিয়ে নিয়ে আসব।”
তবে এবার তানশানের উৎসুকতারা ফিকে পড়লো। এবার সত্যিই তানশানকে হতাশ হতে হলো। রূপকথা একই ভাবে নির্জীব নেত্রে তাকিয়ে আছে তার পানে। অতি পছন্দের খাবারটির নাম শুনেও তার মধ্যে কোনো উল্লাস দেখা যাচ্ছে না।
একরাশ হতাশা নিয়ে তানশান তার সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসল। বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
–“এমন করছেন কেন? এভাবে করে তো—যেই মানুষটা আপনাকে কষ্ট দিয়েছে, সেই মানুষটাকে আপনি আরো জিতিয়ে দিচ্ছেন।”
বুকের ভেতর অসহনীয় অবিশ্বাস্য যন্ত্রণায় কাতর রূপকথার চোখ ফের নোনাজলে ঝাঁপসা হয়ে আসলো। কী করে বোঝাবে—তার দীর্ঘ দশ বছরের সযত্নে লালিত অপেক্ষাগুলো কেউ কতটা নৃশংসভাবে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে! কোনো বাবা, কোনো স্বামী কিংবা কোনো রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে এতটা পাষাণ হওয়া কি আদেও সম্ভব? সম্ভব নয়, রূপকথা তখনো ঘৃণ্য বাস্তবতা গলধঃকরণ করতে মগ্ন।
অশ্রুভরা চোখে চেয়ে তানশান ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেললো। যেই মানুষটা পুরো বাড়ি মায়ের বেশে ঘুরঘুর করে বেড়াতো, তার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকতো আজ সেই মানুষটাকে এভাবে মূর্ছা যেতে দেখা তার জন্য কঠিন। সে নরম স্বরে পুনরায় বলল,

–“ফুচকা আনি? ঝাল ঝাল টক টক অনেক মজা, খাবেন?”
রূপকথা পলক ফেলল। সহসা টুপ করে ঝড়ে পড়ল এক ফোঁটা অশ্রু। উপচেপড়া কান্না আঁটকে মেয়েটি ক্ষীণ স্বরে আবদারের সুরে বলল,
–“একটু ঘুমাই?”
অথচ আবদারটুকু করুণ আর্তনাদ মনে হলো তানশানের কাছে। মুখাবয়ব ম্লান হয়ে এলো। খাবার হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মৌনতা আর রোজের বুকেও অজানা হাহাকার মোচড় দিয়ে উঠল। বাবার নিষেধাজ্ঞায় তানশান কিছুই বলেনি যে—ঠিক কোন ঝড়ে রূপকথা নামক ছোট্ট মেয়েটি আজ এভাবে তছনছ হয়ে গিয়েছে। তবে তারা ধারণা করতে পারছে কিছু!
বাবাকে কথা দেয়া তানশান ব্যর্থ হয় রূপকথার মন খারাপ দূর করতে। রূপকথাকে ঘুমাতে দিয়ে তানশান পাণ্ডুর মুখে বেরিয়ে আসে কক্ষ থেকে। মৌনতা আর রোজ ও তার পেছন পেছন বেরিয়ে আসে। মৌনতা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে শুধায়,

–“তানশান আব্বু, রূপকথার কি হয়েছে আমাদের খুলে বলো।”
তানশান আনত মুখে মেজো মাকে বলল,
–“পাপা বলতে নিষেধ করেছে, মেজো মা। আম স্যরি, তুমি পাপার থেকে শুনে নিও। আমায় কোচিং এ যেতে হবে মেজো মা। তুমি একটু মিমিকে এক ঘন্টা দেখে রেখো, আমি জলদি এসে পড়ব।”
মৌনতা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আচ্ছা ঠিক আছে, যাও। আমি দেখে রাখব।”
তানশান মাথা নেড়ে নত শির নিজের ঘরে চলে যায়। রোজ বিরক্ত হয়ে বলল,
–“ওটা একটা রোবট! ভাইজান যা মেমোরিতে সেট করে যাবে তাই বকে যাবে। ওর কাছে কি জিজ্ঞেস করো? চলো বড় ভাবির সাথেই কথা বলি।”
মৌনতা তাকে আঁটকে দিয়ে বলল,
–“তুমি দেখলে না ওর অবস্থা কত খারাপ? অপেক্ষা করো ভাইজান আসুক, আমরা সব শুনে নেবো। এখন একটু ঘুমাতে দাও। উঠলে আমি জোরপূর্বক কিছু খাইয়ে দেবো।”

তখন বেলা তিনটা। তানশান পাঁচ মিনিট আগেই বেরিয়ে গিয়েছে কোচিং এর উদ্দেশ্যে। বাবা যে কোচিং বন্ধ দেয়া পছন্দ করে না।
নায়েল গভীর ঘুমে তখন। বিকালে এক ঘন্টা মেয়েটা ঘুমায় তাতে মৌনতার শরীর ভীষণ স্বস্তি পায়।
ইদানিং শরীরের সাথে ক্রমেই হেরে যাচ্ছে সে। ব্লিডিং ও ক্রমাগত বাড়ছে, ইমরোজকে জানাবে আজ। ডাক্তার এত দেরি কেন করছে রিপোর্ট দিতে?
মৌনতা পা টেনে টেনে নিচে নামতেই সদর দরজা থেকে হন হন করে ঢুকলেন নির্জনা আর মুখাবয়বে কেমন চাপা আক্রোশ!
শাশুড়িকে দেখামাত্রই মৌনতা এগিয়ে এসে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়। বার্ধক্যের সায়াহ্নে এসে জরাগ্রস্ত দেহটা ইদানীং নির্জনা বেগমের কাছেই বড্ডো দুর্বহ বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৌনতার স্পর্শ পেতেই প্রৌঢ়ার ক্রুব্ধ মুখে জমে থাকা ক্লান্তির মেঘ খানিকটা অপসৃত হলো। তিনি থমথমে মুখে মৌনতার ওপর শরীরের সমস্ত ভর দিয়ে কুশল বিনিময়ের ন্যূনতম সৌজন্যটুকু না দেখিয়েই গনগনে কণ্ঠে শুধায়,

–“বড় বউমা কোথায়, মেজো বউমা?”
ঘরে পদার্পণ করামাত্রই শাশুড়ির এমন ক্ষিপ্ত প্রশ্নে মৌনতা খানিকটা অপ্রস্তুত বোধ করল। তার মনে সংশয় জাগল, বড় ভাইজান আর রূপকথার মাঝে আজ নিশ্চিত কোনো অনভিপ্রেত অঘটন ঘটেছে। ভাইজান বলেছে রাতে এসে সব জানাবে। সে রূপকথার বেগতিক অবস্থার কথা লুকিয়ে গিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
–“ঘরেই আছে, আম্মা।”
–“কলেজ থেকে ফিরেছে কখন?” নির্জনা বেগমের কণ্ঠস্বর কাঠিন্যে ভরা।
–“ঘণ্টা দুয়েক হবে।”
–“কার সাথে ফিরেছে?”
লাগাতার এই জেরা মৌনতার ললাটে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলল। তবুও মনের অস্বস্তি গোপন করে শান্ত গলায় বলল,
–“রোজকার মতোই বড় ভাইজান আর তানশানের সাথেই তো ফিরল, আম্মা। কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন?”
নির্জনা বেগম কোনো প্রত্যুত্তর করলেন না। অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে মুখে ধীর পায়ে নিজের শয়নকক্ষের দিকে অগ্রসর হতে হতে বললেন,

–“তাকে এখুনি আমার ঘরে পাঠাও।”
মৌনতা তাকে অনুসরণ করল। বলল,
–“ওর জ্বর এসেছে আম্মা। একটু ঘুমিয়েছে।”
–“ঘুম থেকে তুলে পাঠাও।”, নির্জনা বেগমের বজ্রকণ্ঠে আদেশে মৌনতা হকচকালো। বরাবরই শান্ত ধারার মানুষ হওয়ায় সকল পরিস্থিতি শান্তভাবেই সামলে নিলো। কোনো প্রকার দ্বিরুক্তি না করে বলল,
–“আচ্ছা। খাবার কি বাড়ব, আম্মা?”
–“তোমার শ্বশুর কি আজ বাড়ি ফিরবেন? বলে গিয়েছেন কিছু?”
–“আব্বুজান সকালে যাওয়ার সময় তো নিশ্চিত করে কিছু বলেননি।”
–“আমাকেও কিছু বলেননি। আমি খেয়ে এসেছি, নিঝাম আর ওয়াহেদ এক প্রকার জোর করেই খাওয়ালো।”
–“খালুজান ভালো আছেন? কবে আসবেন এদিকে?”
–“ভালোই আছে। আমি বলে এসেছি, আসবে বলেছে।”
বলতে বলতেই নিজ ঘরে গিয়ে নির্জনা বেগম থম মেরে গেলেন। চোখেমুখে অস্থিরতা, কাঠিন্যতা! শাশুড়ির আকস্মিক উদাসীনতায় শঙ্কিত মৌনতা সতর্ক গলায় শুধাল
–“কিছু হয়েছে কি, আম্মা?”
–“কিছু যেন না হয় মেজো বউমা, শুধু সেই দোয়া করো। কিছু হলে এবার আমি শেষ হয়ে যাব।”
–“হঠাৎ এমন কথা বলছেন কেন আম্মা?”
–“আমায় একা ছেড়ে দাও, মেজো বউ মা। আর দ্রুত বড় বউমাকে নিচে পাঠাও। তার সাথে আমার বোঝাপড়া আছে।”

–“কিসের বোঝাপড়া, আম্মা?”
–“সেটা পড়ে দেখবে। শুধু এতটুকু প্রার্থনা করো যেন আমার শঙ্কা সত্যি না হয়!”
নির্জনা বেগম বারান্দার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ক্ষীণ ধরা গলায় কথাগুলো উচ্চারণ করলেন। মৌনতা অবুঝ দৃষ্টি ফেলে বেরিয়ে গে‌ল কামড়া থেকে।
নির্জনা বেগম মন্থর গতিতে গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দা বরাবর। উদাসীন চোখে তখন স্পষ্টভাবে ভেসে উঠছে, এক বেগানা পুরুষের বাইকের পেছনে নিজের ঘরের সম্মান, সুখ। গত দু-মাসে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, তানশান আর তপোবনকে কী নিপুণভাবে আগত নতুন মানুষটা মোহাচ্ছন্ন করে ফেলেছে। দেখেছেন, কিভাবে রূপকথা একটু একটু করে তানশান আর তপোবনের বিশ্বাস ও ভালোবাসার স্থান দখল করে নিয়েছে। দেখেছেন, কি করে তানশান রূপকথার সান্নিধ্যে খিলখিলিয়ে হাসে, মজা করে, চঞ্চলতা প্রকাশ করে।
কিন্তু এই মায়াই যে তার সাজানো সংসারটা তছনছ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট! সে কোনোভাবেই আরেকবার তানশান-তপোবনকে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে দেখতে পারবেন না।
চাপা আক্রোশ আর অসহ্য অস্থিরতায় নির্জনা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, জীর্ণ কায়া ঘামে সিক্ত হলো।
দুশ্চিন্তায় অস্থির তৃশান এবার না পেরে ল্যান্ড লাইনেই ফোন দিলো। একবার দু’বার অনেকবার দিলেও কেউ রিসিভ করল না। তৃশান মেজাজ হারায়।‌ মেয়েটা হঠাৎ কোথায় উধাও হয়ে গেল? আদৌও কি ঠিক আছে?
ল্যান্ড লাইন লাগাতার বেজেই চলছে দেখে নির্জনা বেগম ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলেন বসার ঘরে। অজানা ভয়, দুশ্চিন্তায় দিশেহারা অন্তঃস্থল নিয়ে অনাগ্রহে টেলিফোনটা কানে ঠেকায়। কিন্তু তার অনাগ্রহরা নিদারুণ মাত্রা পেল ভেসে আসা চিন্তিত অপরিচিত পুরুষালী কণ্ঠে‌।
পৌঢ়ার অন্তঃস্থলের প্রশ্ন আর ভয়গুলোকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য ঐ উদ্বিগ্ন কণ্ঠই যথেষ্ট ছিল।

–“হ্যালো রূপকথা? তুমি কি বাড়ি পৌঁছেছো? আমি তোমায় অনেক খুঁজেছি কিন্তু কোথাও পাইনি।”
নির্জনা বেগমের বুকের ভেতরটা এক লহমায় সংকুচিত হয়ে এল। বহু বছর আগে সমাহিত হওয়া কিছু তিক্ত স্মৃতি দগদগে ক্ষতের মতো জেগে উঠল। অতি কষ্টে ক্ষীণ স্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন,
—”কে তুমি? রূপকথাকে কেন খুঁজছো?”
অপরিচিত কণ্ঠে তৃশান মুখ বিকৃত করে নেয়। এটা নিশ্চিত তপোবন ভাইজানের মা। মেয়েটা নিজেও ফোন রিসিভ করে না ,আর না করে ঘরের ফোন। সে বিরক্তি লুকিয়ে বলল,
–“আমি ওর কাছের মানুষ। আপনি একটু বলুন, রূপকথা বাড়িতে পৌঁছেছে কি-না!”
‘কাছের মানুষ’ শব্দ দুটো নির্জনা বেগমের কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধল। চোখের সামনে সমস্ত পৃথিবীটা ধোঁয়াশা হয়ে এল। তিনি অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করলেন,
–“কী বলছো এসব?”
–“কিছু না। আপনি কাইন্ডলি একটু বলুন ও পৌঁছেছে কি-না!”
–“হ্যাঁ, পৌঁছেছে। কিন্তু তুমি কে? ও তোমার কেমন কাছের মানুষ?”
নির্জনা বেগম উদ্ভ্রান্তের মতো প্রশ্নগুলো ছুড়ে দিলেন। কিন্তু তার ব্যাকুলতার কোনো উত্তর না দিয়েই ওপাশে তৃশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলল,

–“থ্যাংক গড!”
কথা শেষ হওয়া মাত্রই ওপাশ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। হাতে টেলিফোন ধরে নির্জনা বেগম পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তার চোখের মণি তখন আগুনের মতো রক্তাভ, দৃষ্টি নিবদ্ধ এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে—যেখানে কেবল ভাঙা সংসারের দীর্ঘশ্বাস আর আপনজন হারানোর হাহাকার প্রতিধ্বনিত হয়।
অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি কঠিন স্বরে বিড়বিড় করে ওঠে,
–“আমি তোমায় কোনোভাবেই আরেকবার আমার সংসার ভাঙতে দেবো না, রূপকথা! আমি থাকতে আমার সন্তান আর নাতিকে আর কেউ কোনোদিন দুঃখ দিতে পারবে না।”
বলেই সে একপ্রকার হুঙ্কার ছেড়ে রূপকথাকে ডাকলো। নির্জনা বেগমের চোখের তারায় তখন প্রলয়ের আভাস, যেন কোনো এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস বয়ে আনছে সেই দৃষ্টি। নিজের ভেতরেই নিজে দগ্ধ হচ্ছেন তিনি; আজ তার বারবার মনে হচ্ছে, আভিজাত্য আর বংশপরিচয়হীন এক মেয়েকে ঘরের বড় বউ করে আনাটাই ছিল জীবনের চরম ভুল।
মৌনতা রূপকথাকে ডাকতেই গিয়েছিল হঠাৎ হুঙ্কারে বাড়িতে থাকা সকলে বেরিয়ে আসল। রোজ, মাজেদা, জবা দ্রুত এগিয়ে আসে। তারা জানতোই না নির্জনা বেগম বাড়িতে এসেছেন।
রোজ এগিয়ে এসে শুধায়,

–“বড় ভাবি অসুস্থ আম্মা। তাকে এভাবে ডাকছো কেন?”
নির্জনা বেগম মেয়ের দিকে বরাবরের মতোই কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে নিজ কর্মে মনোযোগী হয়। ফের কর্কশ কণ্ঠে ডাকে,
–“রূপকথা…নিচে এসো।”
মৌনতা রূপকথার কাছেই গিয়েছিল। কিয়ৎকাল বাদ কোনোমতে শাড়ি একটা জড়িয়ে রূপকথা নত শির দূর্বল কদমে এগিয়ে আসে। তবে আজ চোখেমুখে একটুও জোর নেই শাশুড়ির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর। যেই মুখে কখনো দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল, তার বাবা চরিত্রহীন নয়। সেই মুখটা বাবা নামক মানুষটা নিজ দায়িত্বে পায়ে পিষে ফেলেছে। একজন কলঙ্কিত মানুষের সন্তান! এই ঘৃণ্য সত্যটা ভাবতেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক হিমস্রোত বয়ে গেল। চোখে জমা অশ্রু আড়াল করে সে নতমুখে শাশুড়িকে সালাম দিল। মৌনতার শিখিয়ে দেওয়া সেই অজুহাতটাই ক্ষীণ স্বরে আওড়ালো,

—”একটু অসুস্থ ছিলাম আম্মা, তাই নিচে নামতে পারিনি।”
নির্জনা বেগম ধীর অথচ ভারি কদমে রূপকথার একেবারে সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন রূপকথার আত্মা পর্যন্ত এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে। কঠোর গলায় বললেন,
—”আমার দিকে তাকাও।”
মৌনতা আর রোজ খানিক ভীত হলো। নির্জনা বেগমের অবয়বে কেবল ক্রোধ নয় কেমন বিষাক্ত ঘৃণা মিশে আছে। রূপকথা মাথা তোলার সাহস পেল না। এবার নির্জনা বেগম সিংহীর মতো গর্জে উঠলেন,
—”আমার চোখে চোখ রাখো!”
কেঁপে উঠল রূপকথার শীর্ণ কায়া। বাধ্য হয়ে যখন সে চোখ তুলল, দেখল একজোড়া রক্তাভ চাহনি তার দিকে স্থির হয়ে আছে। তবে কি শাশুড়ি জেনে গেছে বাবার কথা? এবার কি বাবার পাপের প্রায়শ্চিত্ত তাকে এই সংসার বিসর্জন দিয়ে করতে হবে?
ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার ওপর স্বামী আর ছেলের ছায়ার কথা মনে পড়তেই সে শেষবারের মতো একটু সাহস সঞ্চার করল। অতি ক্ষীণ স্বরে বলল,

—”আমার দ্বারা কি কোনো ভুল হয়েছে আম্মা?”
নির্জনা বেগমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। তাচ্ছিল্য ভরা কণ্ঠে বললেন,
—”তোমাদের মতো মেয়েরা কত নিপুণভাবে অভিনয় করতে পারো, তাই না?”
—”আমাদের মতো মেয়ে মানে? আপনিও তো একজন নারী, তাই না আম্মা?”
তর্কের এই দুঃসাহসটা রূপকথার অবচেতন মন থেকেই বেরিয়ে এল। সহসা নির্জনা বেগম এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়লেন,
—”হ্যাঁ, আমিও নারী! কিন্তু তোমাদের মতো দুশ্চরিত্র নই। যে সুপরিকল্পিতভাবে হাসিমুখে একটা সাজানো সংসার ছারখার করে দিতে পারে, যাদের বিবেক এক মুহূর্তের জন্যও দংশন করে না!”
রূপকথা বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইল। সে কবে কার সংসার ভেঙেছে? বাবার কলঙ্ক নিয়ে মানুষ তাকে কথা শোনাতে পারে, কিন্তু তাকে কেন ‘চরিত্রহীন’ বলা হচ্ছে?
সে অশ্রুরুদ্ব কণ্ঠে বলল,

–“আপনি আমায় এমন অপবাদ দিচ্ছেন কেন, আম্মা? আমি কখন কার সংসার ধ্বংস করলাম?”
নির্জনা বেগম অবাক হলেন রূপকথার আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে।
–“তোমার চোখেমুখে এখনো কি নাটকীয় দৃঢ়তা। তোমার বয়স অনুযায়ী তোমার অভিনয়ের পরিপক্কতা দেখে আমি সত্যিই অবাক। আমার সংসার ভাঙছো আবার আমার চোখে চোখ রেখেই আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলছো!”
রূপকথা অশ্রুরা ফের অবমুক্ত হয়। সে তৎক্ষণাৎ বিরোধ করে বলল,
–“আমি কোনো অভিনয় করছি না আম্মা, আর না আপনার সংসার ভাঙছি—তাই আমার আত্মবিশ্বাস ক্ষুন্ন হচ্ছে না। কিন্তু আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না আপনি কেন এত ঘৃণ্য অপবাদগুলো আমার উপর দিচ্ছেন? আমার বাবার করা ভুলের শাস্তি আমায় কেন দেয়া হবে?”
রূপকথার অবুঝ কণ্ঠে করা বিরোধে নির্জনা বেগম অতি দুঃখে হেসেই ফেললেন,
–“তোমার কি আমায় বোকা মনে হয়? আজ ত্রিশটা বছর আমি এই সংসারের হাল ধরে আছি শক্ত হাতে। আমার চোখের সামনে তুমি আমার সেই সংসারের শক্ত ভীত নাড়াতে চাইছো আর আমি টের পাব না?”
–“কিন্তু আমি কি করেছি?”
রোজ এতক্ষণ চুপ থালকেও আর চুপ থাকতে পারে না। সে ব্যগ্র কণ্ঠে বলে,

–“আম্মা, সবার উপরে ভিত্তিহীন সন্দেহ আর অভিযোগ করা বন্ধ করো। কেউ তোমার ঘর সংসার ভাঙতে চায় না। বড় ভাবিজান তো বয়স, সখ আহ্লাদ সব মাটিচাপা দিয়ে সেই প্রথম দিন থেকে একটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক আর এই সংসারের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে যাচ্ছে। তবে তুমি কোন জ্ঞানে তাকে এই অপবাদ দিচ্ছো?”
নির্জনা বেগম কঠোর দৃষ্টি ফেললেন রোজের দিকে। ধমকে উঠে বললেন,
–“একদম চুপ রোজ! মায়ের মুখে মুখে তর্ক করার জন্য কোনোদিন তুমি আমার থেকে বাজে এক শাস্তি পাবে, রোজ। জীবন কি তা আমি দেখেছি, তুমি এখন পর্যন্ত কিছুই দেখোনি। আমি কোনো কারণ ছাড়া একটা কথা বলি না তা তোমার মতো নির্বোধ আজও বুঝবে না।”
–“আচ্ছা, আমি নাহয় নির্বোধ কিন্তু কি তোমার সেই কারণ? দেখাও যার কারণে তুমি একটা মানুষকে চরিত্রহীন বলছো।”
নির্জনা বেগম রক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে নিজের ফোনটা বের করলেন। ফোনের স্ক্রিনটা রূপকথার চোখের সামনে ধরতেই চারপাশের সমীরণ ভারী হয়ে উঠল। রোজের কণ্ঠের জোর নিমেষেই মিলিয়ে গেল। স্ক্রিনে ভাসছে এক বেগানা পুরুষের বাইকের পেছনে রূপকথা বসে আছে। যদিও পুরুষটির চেহারা অস্পষ্ট, কিন্তু রূপকথাকে চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হয় না।
রূপকথা যেন আবার নিজের বাকশক্তি ফিরে পেল।
এটা যে একটা ভুল ধারণা। সে হড়বড়িয়ে কৈফিয়ত দিতে বলল,

–“আম্মা, উনি আমার কলেজের প্রিন্সিপালের ছেলে। ওনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। শুধু পরিচিত! আজ একটু বিপদে পড়েই তার বাইকে উঠতে হয়েছিল।”
জীবন আর তার দেয়া শিক্ষায় নির্জনা বেগম রীতিমতো এক বিকারগ্রস্ত মা। এমনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আশঙ্কা একদিন তপোবন, ইমরোজ আর এরোজের মা’কে কেড়ে নিয়েছিল। তাই রূপকথার এই কৈফিয়তগুলো একটুও প্রাধান্য পেল না বরং রূপকথা থমকে যায় তার গালে সপাটে এক চড় পড়তেই।
মৌনতা আর্তনাদ করে উঠল,
–“আম্মা!”
নির্জনা বেগম হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,
–” আমাদের মাঝে একদম কেউ আসবে না, মেজো বউমা। আজ আমার বোঝাপড়া হবে রূপকথার সাথে, তার দুঃসাহসের সাথে। তাকে প্রথম দিন থেকে আমি সাবধান করে আসছি আমার সংসারকে মাথায় করে রাখতে হবে। কিন্তু সে তো আমার সংসার ভাঙার দুঃসাহস দেখালো কি করে?”
নির্জনা বেগম থামেন। ফের দাঁতে দাঁত চেপে থমকানো রূপকথার দিকে চেয়ে বলেন,

–“তুমি আমার আমার সাথে চালাকি করার একটুও চেষ্টা করবে না। পরিচিত আর কাছের মানুষের পার্থক্য আমি বুঝি। তুমি যাকে পরিচিত বলছো, সে তোমায় নিজের কাছের মানুষ বলে দাবি করে। কলেজে পড়াশুনার নাম করে তুমি বেগানা পুরুষের সাথে ফষ্টিনষ্টি করে বেড়াবে আর এটা আমি মুখ বুজে সহ্য করব? তপোবন জীবনে অনেক চড়াই-উতরাই দেখেছে, অনেক কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু সব ভুলে সে বারবার ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছে। তোমার মতো নাম পরিচয়হীন মেয়ে—যার নেই বাপের পরিচিয় সেই মেয়ে তাকে আরেকবার ভাঙতে পারে না। আমি তোমায় ভাঙতে দেবো না আমার সংসার। আমারই ভুল হয়েছিল মানুষের প্ররোচনায় এসে তোমার মতো জাত, বংশ ছাড়া মেয়েকে আমার বাড়ির বড় বউ করা। এখন সেই ভুল শুধরানোর সঠিক সময়! সম্পর্কটা আরো গভীরে যাওয়ার আগেই সেই ভিত্তি উপড়ে ফেলব, তবে কষ্ট‌ কম হবে।”
অপরাধের সত্যতা যাচাই করার আগেই নির্বিচারে শাস্তির ঘোষণায় রূপকথা যেন বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল। তার চারপাশের পৃথিবীটা দুলছে। সে অস্ফুট স্বরে আর্তি জানাল,

—”আপনি ঠিক কী চাইছেন আম্মা? অন্তত সত্যটা বলার সুযোগ তো আমাকে দেবেন!”
–“তোমাদের মতো চরিত্রহীন মেয়েরা খুব সুন্দর নাটক করতে জানো। হয়তো তপোবন সেই নাটকে মুগ্ধ হতে পারে কিন্তু আমি না। তাই অনেক হয়েছে। তোমায় প্রশ্রয় দেয়া মানে আরেকবার বোকামি করা। আমি এই মুহুর্তে তোমায় আমার ছেলে আর সংসারের থেকে দূরে সরিয়ে দেবো।”
মৌনতা এবার ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে প্রতিবাদ করে উঠল,
–“আম্মা রূপকথার কথাটা একটু শুনুন। ও যখন বলছে ও এমনকিছু করেনি তখন করেনি। আপনি সামান্য একটা ছবির জন্য ওকে ঘর ছাড়া করতে পারেন না।।”
নির্জনা বেগম চোয়াল শক্ত করে মৌনতার দিকে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকালেন। সেই দৃষ্টির দহন সইতে না পেরে মৌনতা শিউরে উঠল।

—”ওই ছেলে নিজে মুখে স্বীকার করেছে রূপকথা তার কতখানি কাছের মানুষ! এরপরও আমায় বিশ্বাস করতে বলছো মেজো বউমা? সব জেনে-শুনেও? আর সবথেকে বড় কথা হলো, আমার সিদ্ধান্তে আঙুল তোলার স্পর্ধা তোমার হলো কী করে? এই চরিত্রহীনাকে আমি আর এক মুহূর্তও আমার ছাদের নিচে রাখব না।”
বলেই সে বজ্রকণ্ঠে হাঁক ছেড়ে ড্রাইভারকে ডাকলেন,
–“জাফর!”
দুই তিনবার ডাকতেই প্রৌঢ় ড্রাইভার জাফর ত্রস্ত পায়ে ঘরের ভেতরে ছুটে এলেন। নির্জনা বেগমের কণ্ঠ তখন ইস্পাতের মতো শক্ত।
—”জাফর, এই মেয়েটাকে এখনই গাড়িতে তোলো। সোজা বাগেরহাটে রেখে আসবে। একে যেন আমার চোখের সামনে আর না দেখি।”
রূপকথা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তবুও চোখমুখ থেকে দৃঢ়তা সরে না। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আমি চরিত্রহীন নই, আম্মা। আর না আমার ঐ লোকটার সাথে কোনো সম্পর্ক আছে। আপনার ভুল হচ্ছে। আমি যেদিন থেকে কবুল বলেছি সেদিন থেকে আমার ধ্যানজ্ঞান আপনার ছেলে আর নাতি জুড়েই। তারা জানে আমি কেমন।”
নির্জনা বেগম তাচ্ছিল্য হাসলেন। চোয়াল চেপে বললেন,

–“তোমাদের মতো চরিত্রহীন মেয়ে মানুষ হয় কাল সাপের মতো বিষাক্ত! আমার ছেলে আর নাতির চোখে তো নতুন ভালোবাসা আর আশার আলোর পর্দা টেনে দিয়েছো তুমি। তারা দেখবেও না তোমার এই রূপ। কিন্তু আমি এতকিছু জেনেও তোমায় আমার ঘরে রাখব এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসো। এখুনি বের হবে আমার বাড়ি থেকে, তোমার হাতে পাঁচ মিনিট সময়।”
ঘৃণ্য বাস্তবতার কাছে মুখ থুবড়ে পড়তে‌ পড়তে আজকের জন্য রূপকথা ভীষণ ক্লান্ত।‌ তাই আর কৈফিয়ত দিলো না শুধু অনুনয় করে বলল,
–“আমায় আপনার ছেলের সাথে একটু কথা বলতে দিন, আম্মা। সে যদি সব শুনে বলে আমায় চলে যেতে, আমি চলে যাব।”
–”তোমার স্পর্ধা তো আকাশচুম্বী! তোমার কি মনে হয় এসব শোনার পর তপোবন তোমায় ঘরে রাখবে আরেকবার ধ্বংস হওয়ার জন্য? আমার ছেলে আর যাই হোক, দুশ্চরিত্র মানুষকে ঘৃণা করে। তাই কোনো অজুহাত নয়, এই মুহূর্তেই আমার বাড়ি থেকে দূর হও!”
মাজেদা চাচি ছলছল নয়নে অসহায় রূপকথাকে দেখে। সে জানে নির্জনা কতটা কঠোর উপরন্তু সে চরিত্রহীন মানুষদের ঘৃণা করে। সে অনুনয় করে বলল,
–“বড় ভাবি, একটু বড় বউমার কথাডা শোনেন। ওর মধ্যে আমি এই কয়মাসে একটুও খুঁত দেখিনাই। ও এমন কাজ করতেই পারে না। কোথাও পাঠাইয়েন না। তপোবন আসুক, ও যা সিদ্ধান্ত নেয় নেবে।”

–“আমার ঘরের কথার মাঝে কথা বলার দুঃসাহস হয় কি করে তোমার, মাজেদা? আমার সন্তানদের ভালোমন্দ দেখার জন্য এখনো আমি জীবিত আছি।”, নির্জনা বেগম তার উপর ও গর্জে উঠলেন। মাজেদা নত শির চুপসে গেলেন। মৌনতা ছলছল নয়নে কঠোর শাশুড়ির পানে তাকায়। যেই মানুষটা চরিত্রহীনদের এত ঘৃণা করে, সে তো জানে তার নিজের ছেলেই এক চরিত্রহীন ব্যক্তি! তবে কি করে সারাদিন শুধু ছেলের বউয়ের উপর দোষারোপ করে যায় যে—ছেলের বউয়ের দোষের কারণে তার ছেলে ঘরমুখী হচ্ছে না? বিচারব্যবস্থায় এত অন্যায় কেন?
রূপকথা বলহীন দেহে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। ফের ক্ষীণ স্বরে অনুনয় করে বলে,
–“আমার বাবাকে নিয়ে আপনি আমায় যত দোষারোপ করেন আমি মুখ বুজে সহ্য করে নেব আম্মা। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি চরিত্রহীন নয়। আপনার ছেলেকে একটু ফোন দিন, সে জানে আমি এমন কিছু করতেই পারি না।”
নির্জনা বেগমের ধৈর্য্যর বাঁধ ভেঙে যায়। সে চেঁচিয়ে বলে,
–“এসব ন্যাকা কান্না করবে না আমার সামনে। এই মুহূর্তে বের হবে আমার বাড়ি থেকে। বাকি বোঝাপড়া আমি তপোবন আর তোমার মায়ের সাথে করব।‌ কিন্তু আগে তুমি আমার ঘর থেকে বের হও।”
ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! সকাল থেকে বাস্তবতার দুয়ারে মাথা ঠুকতে ঠুকতে এবার আর রূপকথার শশুরবাড়িতেও জায়গা হলো না। চরিত্রহীন নামক ঘৃণ্য অপবাদ লেপ্টে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়।

ছাব্বিশ পেরিয়ে সাতাশ বছর বয়সে ওয়াহেদ খুলনা শহরে আনোয়ার মাহমুদের প্রতিষ্ঠিত এক স্বনামধন্য কোম্পানিতে যোগ দেয়। সেই বছরই পারিবারিকভাবে তার জীবনে আসে নীলিমা। অর্থকষ্ট থাকলেও দাম্পত্য জীবনে ছিল অটুট ভালোবাসা ও সহযোগিতা। পরিশ্রম, সততা আর স্ত্রীর সমর্থনে ওয়াহেদ দ্রুত উন্নতির পথে এগোয়। ততদিনে সে দুই কন্যার জনক।
খুলনার ধনী শিল্পপতি আনোয়ার মাহমুদ চার কন্যাসন্তানের পিতা। পুত্র না থাকায় ব্যবসার ভার সামলানো ছিল কষ্টকর। সেই শূন্যতা পূরণ করেছিল তার বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ওয়াহেদ, যে ছিল তার চোখের মণি। কিন্তু হঠাৎ ওয়াহেদ কনজেনিটাল হার্ট ডিফেক্টে আক্রান্ত হয়। উন্নত সার্জারির জন্য প্রয়োজন ছয় লাখ টাকা। আনোয়ার মাহমুদ কোনো দ্বিধা না করে অর্থ দেন—কাজ করে শোধ করবে এই শর্তে। অস্ত্রোপচার সফল হলেও ওয়াহেদের সংসারে শুরু হয় আর্থিক টানাপোড়েন।

ওয়াহেদ আবার কাজে ফেরে। এরই মাঝে আনোয়ার মাহমুদ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন। প্রাণে বাঁচলেও কর্মক্ষমতা হারান। তার অনুপস্থিতিতে কোম্পানির মূল দায়িত্ব এসে পড়ে ওয়াহেদের ওপর। বাবার কাজ সামলাতে তখন কোম্পানিতে যোগ দেয় তার ছোট মেয়ে নিঝাম। সুন্দরী, অহংকারী ও জেদি মেয়েটি একসাথে কাজ করতে গিয়ে একসময় সে ওয়াহেদের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অমায়িক ব্যক্তিত্বে ওয়াহেদ কোম্পানির ভরসা হয়ে ওঠে। তারা দু’জন এক হলে কোম্পানির পতন ও রোধ হবে কিন্তু বারবার এপ্রোচ করেও নিঝাম তার কাছ থেকে কোনো সাড়া পায় না। প্রত্যাখ্যানের জেদে সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

একপর্যায়ে হুমকি দেয়—এক সপ্তাহের মধ্যে বাবার টাকা শোধ করতে হবে, নতুবা তাকে বিয়ে করতে হবে। ওয়াহেদ সিদ্ধান্ত নেয়, টাকা শোধ করে চাকরি ছেড়ে দেবে।
এই সিদ্ধান্ত নিঝামকে আতঙ্কিত করে তোলে। এরপরই ঘটে ভয়াবহ ঘটনা। সেদিন বদ্ধ কামরায় নিঝাম অশালীনভাবে ওয়াহেদকে এপ্রোচ করলে সে প্রতিবাদে চড় মেরে বসে এবং জানায় সে বিবাহিত। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। অফিসজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উল্টো গল্প। ঈর্ষান্বিত সহকর্মীরাও যোগ দেয় অপবাদে। মালিকের মেয়েকে এপ্রোচ করে কোম্পানি দখলের চেষ্টা করেছে ওয়াহেদ।
চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে সহকর্মীদের হাতে সেদিন তাকে মারা হলো। মাথা হেঁট করে বসে থাকা আনোয়ার মাহমুদ সেদিন মেয়ের মাথায় হাত রেখে শুধু জিজ্ঞেস করেছিলে, সে কী চায়? চাইলে ওয়াহেদকে আজীবনের জন্য জেলে পাঠানো হবে।

কিন্তু নিঝাম চায় ভিন্ন কিছু। যার দ্বারা তার সম্মান নষ্ট হয়েছে, তাকেই সে বিয়ে করতে চায়।
এই সিদ্ধান্তে সহকর্মীরা বিস্মিত হলেও আনোয়ার মাহমুদ খুশি হন। ওয়াহেদের প্রতিবাদের একটি বাক্যও কেউ শোনেনি। সেদিনই নিঝামের সাথে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়—আর এক লহমায় বদলে যায় ওয়াহেদের পুরো জীবন।
বিদঘুটে স্মৃতিচারণ থেকে বেরিয়ে আসে ওয়াহেদ। হাঁটুতে কনুই ঠেকানো হাত দুটো এসে থামে ঘর্মাক্ত মুখশ্রীতে। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো অনাদরে মুছে নেয়। সেদিনের পর থেকে সে এই মুখ নিয়ে কোনোদিন নীলিমার সামনে দাঁড়ানোর সাহস পায়নি। যেই নারীটা তার জন্য আজীবন কষ্ট করে গিয়েছে সেই নারীটিকে এমন একটা উপসংহারে এনে দাঁড় করাতে তার বুক কাঁপে। ঐ চোখে তাকানোর সাহস আজ ও তার হয়নি। আজ ও সে সাহস করে উঠতে পারেনি মেয়ে দুটোর সামনে গিয়ে ক্ষমা চাওয়ার।
উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দরজা ধাক্কানোর শব্দ কানে আসলেও ওয়াহেদ বিন্দুমাত্র নড়লো না। এই পর্যায়ে ভেসে আসল পাষণ্ড, বিকারগ্রস্ত এক নারীর কণ্ঠ।
নিঝাম চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,

–“ওয়াহেদ তুমি যদি এখুনি দরজা না খুলছো তবে নিহামকে আমি ঠাটিয়ে কটা চড় মারব।”
হুমকিটি বরাবরের মতোই কাজে আসল। দরজাটা খুলে যেতেই নিঝাম হনহনিয়ে ঘরে ঢুকলো। সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওয়াহেদের গায়ে অস্থির চিত্তে হাত বুলিয়ে শুধাল,
–”কি হলো এতক্ষণ দরজা বন্ধ করে ছিলে কেন? আপা যাওয়ার পর থেকে এমন করছো কেন ওয়াহেদ? শরীর খারাপ করছে না-কি?”
ওয়াহেদ চোয়াল শক্ত করে থমথমে মুখে বলল,
–“আমি কি দশ মিনিটের জন্য একটু একা থাকতে পারি না?”
–“না পারো না, একদম পারো না। কি সমস্যা হচ্ছে আমায় বলো।”, নিঝাম উন্মত্ত হয়ে শুধাল।
–”সাফোকেশন হচ্ছে, নিঝাম। একটু একা ছেড়ে দাও প্লিজ।”
–”কেন? সাফোকেশন হবে কেন?”
–”তুমি পাশে থাকলে এমনিতেই সাফোকেশন হয়।”
নিঝামের অস্থিরতা খানিক ভড়কালো। পরপরই হেসে উঠে বলল,
–”পরিবারের জন্য মন কেমন করছে না-কি?”
ওয়াহেদ চোয়াল শক্ত করে তাকায় সম্মুখের বিকারগ্রস্ত নারীটির দিকে। যে কি-না তার পরিপূর্ণ জীবনটা তছনছ করে দিতে একবার ভাবেনি। সে পাথর চাপা স্বরে শুধাল,

–“তুমি কখনো বলোনি তপোবনের স্ত্রীর বয়স এত কম।”
–“তপোবনের স্ত্রীর বয়স কম তাতে তোমার কি, হ্যাঁ? তোমার ঐ বিষয়ে মাথা ঘামাতে হবে কেন?”
ওয়াহেদ রক্তাভ নেত্রে চেয়ে বলল,
–“কি হতো বলোতো আমার যদি তোমার মতো পিশাচের সাথ কোনোদিন দেখাই না হতো। তুমি আর তোমার পরিবার আমায় ধ্বংস করে দিয়েছো, নিঝাম।”
–”কি হলো আজ হঠাৎ এমন করছো কেন, ওয়াহেদ? সব ভুলে যাও, আমি ব্যতীত কেউ নেই তোমার। আমি আর নিহাম ব্যতীত তোমার কোনো পরিবার নেই। এসো ভাত খাবে।”, নিঝাম টানতে লাগল ওয়াহেদকে। ওয়াহেদ টলটলে নেত্রে রেগে ধাক্কা মারলো তাকে। হিসহিসিয়ে বলল,
–”সরো আমার কাছ থেকে‌, আমি একা থাকব।”
নিঝাম ও তেড়ে এসে তার কলার চেপে ধরলো,
–“একদম আমার কথার নড়চড় করবে না, ওয়াহেদ। একা থাকতে পারবে না তুমি, একটুও না। এখন খাবে তারপর আমার সাথে বসে গল্প করবে।”
–“করব না, একদম করব না। অনেক হয়েছে নিঝাম। তোমায় আমি আর সহ্য করতে পারছি না। সরো আমার চোখের সামনে থেকে। আমি বাগেরহাটে যাবো। আমার মেয়ে দুটোর সাথে কি হয়েছে? কেন হয়েছে আমায় জানতে হবে, নিঝাম।”
নিঝাম আতঙ্ক ভরা নয়নে তাকায়। ভয়ে বিবর্ণ মুখে চেঁচিয়ে বলল,

–”কোন মেয়ে? কিসের মেয়ে? তোমার কোনো মেয়ে নেই ওয়াহেদ। ভুলেও এইসব কথা উচ্চারণ করবে না তবে কিন্তু আমার‌ থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
ওয়াহেদ রক্তাভ দৃষ্টি ফেলে তার চোয়াল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে বলল,
–“যা ইচ্ছা করো তুমি। আমি বাগেরহাটে যাব, নিলীমার সাথে দেখা করব আর সব বলব। এরপর ও যা শাস্তি দেবে সব মাথাপেতে নেব, তবুও এভাবে আমি মরতে পারব না।”
নিঝামের দেহ ঘামে ভিজে উঠল। সে ওয়াহেদের দিকে এক পলক অস্থির দৃষ্টি ফেলে ছুটে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। ওয়াহেদ ধপ করে বসে পড়ে বিছানায়। অক্ষিপটে ভাসছে তার ছোট্ট রূপকথার পরিপূর্ণ নারীরূপের বিধ্বস্ত মুখটি। যেই মেয়ে বাবার আওয়াজ শুনলেই ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ত বুকে সেই মেয়ের চোখে বাবার জন্য কত ঘৃণা, অভিযোগ ছিল। ভাবতেই তার চোখের কার্নিশ বেয়ে টপটপিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু কিয়ৎকাল বাদ সে চমকালো পুনশ্চঃ নিঝাম ছুড়ি হাতে তার ঘরে প্রবেশ করতেই। তার থেকেও চমকালো নিঝামের বাহুবন্ধনে নিহামকে দেখে।
সে চেঁচিয়ে উঠল,

–“করছো কি নিঝাম?”
নিঝাম উন্মাদের ন্যায় ছুড়িটা নিহামের গলায় ঠেকালো। ভয়ে শক্ত হয়ে থাকা নিহাম এবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
–“পাপা…পাপা প্লিজ সেইভ মি।”
ওয়াহেদ ছুটে যেতে নিলেই নিঝাম কঠিন দৃষ্টি ফেলে হুমকি দিয়ে বলল,
–”একদম আগাবে না, ওয়াহেদ। তুমি যদি বাগেরহাট যাও আর ঐ নিলীমার সাথে দেখা করো— তবে আমি এই ছুড়ি আগে ওর গলায় চালাবো তারপর আমার গলায়।”
ওয়াহেদ অশ্রুসিক্ত নয়নে ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“নিঝাম তুমি পাগল, মানসিক বিকারগ্রস্ত। যে কি-না নিজের সন্তানকেও ছাড় দাও না নিজের জেদের কাছে।”
–“হ্যাঁ, আমি জেদি তোমার জন্য। চুপচাপ বলো, তুমি আমার কথা শুনবে কি শুনবে না।”
ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া নিহাম কাঁদতে কাঁদতে ভয়ার্ত কণ্ঠে আবার বলল,
–“পাপা, প্লিজ সেইভ মি। আমি ভয় পাচ্ছি।”
ওয়াহেদ ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে বহু বছরের ন্যায় আজও পরাস্ত সৈনিকের ন্যায় বলল,
–“ছেড়ে দাও ওকে। আমি যাব না কোথাও।”
নিঝামের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে তড়িৎ গতিতে বলল,

–“আর কারোর খোঁজ ও নেবে না।”
–“নেব না।”
–“কোনো স্ত্রী পরিবার নেই তোমার, আমরাই তোমার সব।”
ওয়াহেদ যান্ত্রিক স্বরে বলল,
–“তোমরাই আমার সব।”
নিঝাম বিশ্বজয়ের হাসি নিয়ে নিহামকে ছেড়ে দিলো। নিহাম এক ছুটে গিয়ে আঁছড়ে পড়ল বাবার বুকে। ওয়াহেদ শক্ত করে জড়িয়ে নেয় ছেলেকে।
বিয়ের দশ বছর এবং নিহামের ও দশ বছর। এই ছেলেটাও নিঝামের জেদের ফল। যাকে এখন প্রতিনিয়ত তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করে সে। নিঝাম এতটাই হিংস্র উগ্র যে—জেদ হলে ছেলেকে আঘাত করতেও দু’বার ভাবে না। মাকে এর জন্য ভীষণ ভয় পায় নিহাম, বাবার কাছেই ছেলের সব সুখ শান্তি।
এক সন্তানকে আগলে রাখতে গিয়ে তার আর দুটো সন্তান কিভাবে দিন কাটিয়েছে সে জানেও না। প্রতি মাসে সে লুকিয়ে লুকিয়ে টাকা পাঠায় নিলীমার কাছে। কিন্তু জানে না আদৌও নিলীমার কাছে তা পৌঁছায় কি-না!
সে অনেকভাবে তাদের খোঁজ খবর রেখেছে। জানত রূপকথার বিয়ে হয়েছে, এটাও জানত তপোবন বাগেরহাট থেকে বিয়ে করেছে। কিন্তু ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে রূপকথাই তপোবনের স্ত্রী।
সে নিশ্চিত তার সন্তানের এই দূর্ভোগের কারণ সে নিজেই। বাবা হিসেবে দ্বিগুণ বয়সের একটা লোকের স্ত্রী হিসেবে নিজের ছোট্ট মেয়েটাকে দেখা তার জন্য কষ্টকর!

তপোবন আর তানশান অবাক পানে তাকায় নির্জনা বেগমের দিকে।
তপোবন হতভম্ব হয়ে বলল,
–“আম্মা, আপনি সন্দেহের বশে আমার স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দিতে পারেন না।”
নির্জনা বেগম চোয়াল চেপে বলল,
–“আমি সন্দেহের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি, তপোবন। মা হই তোমার। তোমার ভালোর জন্য যা সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার তা আমি নেবোই। ঐ ছেলে নিজের মুখে বলেছে রূপকথা ওর কাছের মানুষ।”
তপোবন কিছু বলার আগেই তানশান এবার উৎকণ্ঠা ভরা কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,
–“দাদুমনি, বাইকে যে ছিল সে তৃশান চাচু। তোমার কোনো মিস্টেক হচ্ছে। তার সাথে মিমির কোনো সম্পর্ক নেই। আমি দেখেছি তৃশান চাচু প্রতিদিন কিভাবে মিমিকে বিরক্ত করতো। তুমি না জেনে মিমিকে এভাবে ঘর থেকে বের করে দিতে পারো না।”

–“তানশান তুমি ছোট, ভালোমন্দ কিছু বোঝ না। উপরে যাও।”, নির্জনা বেগম ধমকে উঠলেন। তানশান রাগে ইতিমধ্যেই লাল হয়ে গিয়েছে। সে রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“না, আমি ছোট নই। কে ভালো কে খারাপ এতটুকু বোঝার মতো বয়স হয়েছে আমার। আর আমি জানি মিমি ভালো। তুমি আমার মিমিকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছো কেন? সে এমনিতেই অসুস্থ ছিল, কতটা কষ্টে ছিল। তার কি অবস্থা হয়েছে কে জানে!”
তানশানের চোখ টলটল করছে। নির্জনা বেগম অবাক চোখে তাকিয়ে বললেন,
–“দেখেছো সবাই, কি করে ওর ব্রেইন ওয়াশ করেছে ঐ মেয়ে? তোমার মিমি তাকে প্রশ্রয় দিতো বলেই ঐ ছেলে তাকে বিরক্ত করতো।”
ঘরময় চিৎকার চেঁচামেচিতে এরোজ অলস দেহে কড়িডর থেকে উঁকি দিলো। ইমরোজ খানিক সতর্ক দৃষ্টি ফেলছে বাবা-মা ভাইয়ের দিকে। সে দরদর ঘামছে, সামান্য সন্দেহের বশে রূপকথাকে ঘর থেকে বের করে দিলে, তাকে কি করবে আম্মা?

–“আমার স্ত্রীকে আমি যথেষ্ট ভালোকরে চিনি, আম্মা। রূপকথা কোনোদিন আমার কাছে কোনোকিছু লুকায়না। আমি শুরু থেকে জানতাম তৃশান ওকে বিরক্ত করে। আর আজকেও আমি নিজেই দেখেছি ওকে তৃশানের বাইকে। এর পেছনে কিছু কারণ ছিল, আম্মা। আপনি সন্দেহের বশে তার উপর এমন এলিগেশন দিতে পারেন না।” , তপোবন ত্যক্ত সুরে বলল। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। সকাল থেকে মেয়েটার উপর কি কম ধকল গেল।
তকদির সিকদার বিরক্তি মিশ্রিত চাহনি ফেলে স্ত্রীর দিকে। রাগান্বিত স্বরে বলল,
–“তুমি এমনটা কি করে করতে পারো নির্জনা? অন্তত যার স্ত্রী তাকে জানিয়ে তো সিদ্ধান্ত নেবে। সবাই চরিত্রহীন হয় না!”
বৃদ্ধার চোখে চোখ মেলে যায় নির্জনার। তকদির সিকদার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। জীবনের বাজে অধ্যাগুলো এখন তার সুখের কাছে নিছকই দুঃস্বপ্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ঐ দুঃস্বপ্নে পাওয়া তিন সন্তান আজকে তার সকল সুখের কারণ, এই কৃতজ্ঞতা সে কখনো অস্বীকার করতে পারবে না।
নির্জনা বেগম পাণ্ডুর থমথমে মুখে বসে রইলেন সোফায়।
ইমরোজ সকলের দিকে চেয়ে মেকি হেসে বলল,
–“আচ্ছা, ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে। কিন্তু একে অরপকে দোষ না চাপিয়ে ভাইজানের উচিৎ বড় ভাবিজানকে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আসা। এখন রাগারাগী থামাও বড় ভাইজান।”
তপোবন মায়ের দিকে কঠোর দৃষ্টি ফেলে বলল,

–”আমি রূপকথাকে আনতে যাচ্ছি।”
তপোবন ফোনের দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টি ফেলে ছুটে ঘর থেকে বের হতে নিলে তানশান ছুটে এসে বাবার হাত আঁকড়ে ধরে। তপোবন ফিরে তাকায় ছেলের বিবর্ণ চিন্তিত মুখপানে। গালে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,
–“কেঁদোনা আব্বু, পাপা তোমার মিমিকে নিয়ে আসব।”
তানশান সতর্ক কণ্ঠে আবদার করে বলল,
–“পাপা, আমি আসি তোমার সাথে?”
–“যাবে?”
–“হুম হুম।”
তপোবন তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
–“চলো।”
তানশানের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বাবা ছেলে ছুটে তাদের সদ্য গড়ে ওঠা বদঅভ্যাসের কাছে। যার দুঃখে এখন তাদের বুক পোড়ে, যার ভরসা হতে আনন্দ অনুভব হয়, যার হাসিমুখ দেখলে মনে হয় তাদের ছোট্ট পৃথিবীটা আনন্দে হাসছে।
বুকে সরব আঁছড়ে পড়া দেহটি আর চিরচেনা সন্তানের সেই সুগন্ধে নিলীমা হতভম্ব হয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,

–“কথা, তুই?”
থেমে সে তড়িঘড়ি করে শুধায়,
–“হঠাৎ কোত্থেকে এলি? জামাই আর নানুভাই ও এসেছে নাকি?”
ছোট্ট এক জীবন! সেই জীবনে কঠিন পরীক্ষা, যন্ত্রনাদ্বায়ক ফলাফল আর কঠিন বাস্তবতার সাথে লড়াই করা এক দূর্বল যোদ্ধা রূপকথা। এই মুহূর্তের জন্য ভঙ্গুর অন্তঃস্থল প্রশ্ন করেই বসল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৬ (২)

–“এত কঠিন পরীক্ষা আর যন্ত্রণাদ্বায়ক ফলাফল কি তার প্রাপ্য?”
সারাদিনের সব ঘৃণ্য যন্ত্রণাগুলো হঠাৎ করেই এক পশলা শান্তি খুঁজে পেল মায়ের বুকে। রূপকথা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো রুগ্ন দেহটিকে। ম্লান স্বরে বলে ওঠে,
–“ও মা, জীবন এত কঠিন কেন? জীবনে থাকা মানুষগুলো তার থেকেও পাষণ্ড মা। তুমি কি সারাজীবন আমায় তোমার বুকে আগলে রাখতে পারতে না? তোমার বুক ছাড়া পুরো পৃথিবীটা অনেক নিকৃষ্ট, আম্মা।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৩৮