Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (২)

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (২)
তোনিমা খান

ক্ষণকালের সুখ দীর্ঘস্থায়ী দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। হাসপাতালের করিডোরে আন্দোলিত হলো এরোজের অশ্রুরুদ্ধ আর্তনাদ।
–“সে আগে থেকেই অসুস্থ ছিল কিন্তু আমায় কিচ্ছু বলেনি। একটুও বলেনি যে তার শরীর খারাপ করছে। আমার উপর একটুও করুণা হয় না তার। তার চোখে বাঁধে না তার সুস্থতার জন্য কত কী করছি আমি।”
​নিশাত আলগোছে ঘেমে ওঠা ছেলেটির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আদুরে স্বরে বলল,
–“কিচ্ছু হবে না আব্বা। ডাক্তার বলছে তো তারা সর্বোচ্চটা দিয়ে ওর চিকিৎসা করবে।”
​বলহীন দেহে দাঁড়িয়ে থাকা এরোজ অশ্রুসিক্ত নয়নে চাইল। অতিরিক্ত ব্লিডিং-এর কারণে মৌনতাকে আবার ইমার্জেন্সি আইসিইউতে নেয়া হয়েছে। ডাক্তার জানিয়েছে মৌনতার শরীর আগে থেকেই খারাপ ছিল। এবং হঠাৎ করে পাওয়া মানসিক চাপ পড়ায় তা আরো বাজে রূপ ধারণ করে। অথচ মানুষটা একটাবারের জন্যও তাকে জানায়নি শরীর খারাপের কথা।
​পরবর্তী কেমোর জন্য প্রস্তুত হতে মৌনতার শারীরিক অবস্থার যতটা উন্নতির প্রয়োজন তার থেকেও বেশি অবনতি হচ্ছে। সে আফসোসের সুরে বলল,

–“যে বাঁচতেই চায় না তাকে কোনো চিকিৎসা বাঁচাতে পারে না, খালামনি। সে বাঁচতেই চায় না, অথচ কেউ তার জন্য বেঁচে আছে। সে কেন বোঝে না?”
নিশাত ওড়না দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,
–“তাকে কখনো বুঝিয়েছিস?”
​–“বোঝালে যদি ঘৃণা করে? দূরে চলে যায়?”
ছেলেটার অসহায়ত্ব ভরা কণ্ঠে নিশাত ম্লান হেসে বলল,
–“ঘৃণাকে ভালোবাসায় বদলাতে পারবি না? ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্বাস পারে না এমন কিছু আছে?”
​এরোজ ঘন ঘন মাথা নাড়লো। সে পারবে তবে সেই লহমাটুকু অন্তত সৃষ্টিকর্তার দিতে হবে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা দেবে তো সেই লহমাটুকু?
আবার কিন্তু? প্রতিবার সুখের আগে কেন এত কিন্তু থেকে যায়? এই কিন্তু যে বড্ড ভয়ঙ্কর! শুধুই কেড়ে নিতে জানে।

​নিজের দুর্বলতা লুকাতে রোজ সর্বোচ্চ জেদ আর রাগের ব্যবহার করছে তৃশানের বিরুদ্ধে। তবে জেদ এবং রাগ কখনোই যে ভালো ফলাফল বয়ে আনে না।
বিকাল তিনটা নাগাদ রোজ কর্তৃপক্ষকে জানায় সে একটু শপিং-এ যাবে। তানশান ম্যাথ চর্চা করছে, সে একা বসে কী করবে? এখানেই তার চাচাতো ভাই রয়েছে তার সাথে যাবে। দু’জন টিচার এতে সম্মতি দিলেও তৃশান সাফ সাফ নাকচ করেছে। শিক্ষা সফরে এসে কিসের শপিং তাও আবার একা! সে যাওয়ার অনুমতিই দেয়নি কিন্তু রোজ তবুও তার সাথে এক দফা তর্ক-বিতর্ক করে বেরিয়েছে। তানশানও তার জেদের কারণে রাগ দেখিয়েছে তবুও কাজ হয়নি।
​সে বাচ্চা নয়! এর আগেও বহুবার ঢাকায় চলাফেরা করেছে তবে তখন ভাইয়েরা ছিল। সে মোটামুটি পথঘাট চেনে। মেজো চাচির ছেলে রুশান বলেছে তাকে টিএসসিতে থাকতে। সে ওখান থেকে নিয়ে যাবে। তার এই সময়ে একটা টিউশনি থাকে নয়তো নিজেই নিয়ে যেতো। রোজও আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, সে টিএসসি পর্যন্ত যেতে পারবে।
উবার তখন নিজ গতিতে চলছিল। কানে ইয়ারফোন গুঁজে আরামে বসে রোজ গুনগুন করছিল। গুনগুন করতে করতেই সে আনমনে জানালার কাঁচ ভেদ করে তাকালো। খানিক কপাল কুঁচকে নিলো চাপা গলি দেখে।
সে ইয়ারফোন খুলে বলল,

–“এটা কোন গলি ভাইয়া?”
মধ্যবয়স্ক একটা তেলতেলে বরণের লোকটি ফিরে না তাকিয়েই বলল,
–“আছে আপা, আপনি চিনবেন না। আপনি তো এইখানে থাকেন না।”
​–“আপনাকে কে বলেছে আমি চিনব না? আমি এর আগেও অনেকবার ঢাকায় এসেছি। আপনি বলুন এটা কোথায়? এটা তো টিএসসি যাওয়ার রাস্তা নয়।”
​–“আরে আপা আপনি বেশি চিন্তা কইরেন না আমি আপনারে টিএসসি পৌঁছে দেব ঠিকমতো। আপনি শুধু চুপ কইরা বসেন।”
লোকটার কথার সুর মোটেই ভালো লাগল না রোজের। তার সন্দেহ ক্রমেই প্রগাঢ় হয় যখন গাড়ি জনমানব ছাড়িয়ে অতি নোংরা, চিপাচাপায় ঢুকতে লাগল। ভয়ে ঘেমে ওঠে রোজ। রুশানকে তো জানিয়েছে কিন্তু সে এখনো মেসেজ দেখেনি।
ভয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল,
–“গাড়ি থামান। আমি যাব না আপনার সাথে।”
​লোকটা এবার পিছু ফিরে থমথমে মুখে বলল,
–“গাড়ি থামবে না আপা। এহন তো জায়গামতো পৌছাইয়াই গাড়ি থামবে। আপনি নাইমা গেলে আমি কী এই মাঝপথে আর যাত্রী পাব? চুপ কইরা বসেন বেশি বাড়াবাড়ি কইরেন না।”
রোজের চোখ টলটল করে উঠল। জেদ দেখিয়ে একা বের হওয়াটা ঠিক হলো না। এক মিনিটও যেন নষ্ট করা এখন বিপজ্জনক! রুশান তখনো দেখছে না মেসেজ। তৃশানকে জানালে সে তার মাথা ফাটিয়ে দেবে নিশ্চিত! তবুও আগে প্রাণে বাঁচতে হবে। সে তৎক্ষণাৎ তৃশানকে মেসেজ দিল হোয়াটসঅ্যাপে। সৌভাগ্যবশত সাথে সাথে সিন হলো। রোজ খুশিতে আত্মহারা হয়ে হাঁফ ছাড়ল। হড়বড়িয়ে সব লিখে পাঠালো,

–“প্লিজ হেল্প মি!”
​অপরপ্রান্ত থেকে অ্যাংরি রিয়্যাক্টসহ একটা ধমক আসলো। তৃশান রেগেমেগে বলল,
–“মাথামোটা মেয়ে! উবার ঠিক করার সময় গাড়ির সব ডিটেইলস পেয়েছ না? ওগুলো পাঠাও দ্রুত। আর ফোনটা লুকিয়ে নাও যেন লোকেশন ট্র্যাক করতে পারি।”
​রোজ দ্রুত সেগুলো পাঠিয়ে দিল। ড্রাইভারটির দিকে তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল,
–“গাড়ি থামান, আমি কিন্তু অলরেডি পুলিশকে ফোন করে দিয়েছি।”
​সহসা লোকটার আসল রূপ বেরিয়ে আসল। লোকটি পিছু ফিরে বিশ্রী ভাষায় গালি দিয়ে বলল,
–“মা** পুলিশ তাদের ভুঁড়ি সামলাইয়া আসতে আসতে আমি কাম সাইরা ফুরুৎ হইয়া যামুগা। চুপ কইরা বইতে কইছি। বেশি উড়লে একদম জানে মাইরা থুইয়া যামু। ফোন দে!”
​বলেই লোকটা হাত বাড়িয়ে রোজের ব্যাগটা ছিনিয়ে নিলো। কিন্তু ফোন পেল না। গাড়ি থামে এক অজানা নোংরা বস্তির জনমানবশূন্য এক জায়গায়। ড্রাইভারটি বের হয়েই পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে বসা রোজের বাম গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে বলল,

–“মা** ফোন করছোস কী? জামার ভিতর রাখছো? খুলমুই তো সব। আয়… পাইয়া যামু।”
রোজ ফুঁপিয়ে কাঁদছে। লোকটা ওকে টেনেহিঁচড়ে বের করল। তন্মধ্যেই পরিত্যক্ত একটা গোডাউন ঘর থেকে দুইজন লোক বেরিয়ে আসল। রোজকে দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ে বলল,
–“আরে মামু আইজকার মাল তো পুরাই মাখন!”
​–“হ, দেইখাই পছন্দ হইয়া গেছিলো।”, ড্রাইভারটি দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল। তাদের ধান্দাই এগুলো। তবে সবদিন করে না, ঝোপ বুঝে কোপ মারে। রোজ বোকামিটা এখানেই করেছিল, ওঠার আগেই বলেছিল সে খুলনা থেকে এসেছে, দেখেশুনে গাড়ি চালাতে।
রোজের দেহ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে লাগল ভয়ে। মনে হলো বাঁচার কোনো পথ নেই। এক মুহূর্তে নিজের গোটা পৃথিবীটা বদলে যেতে দেখে রোজ গুমড়ে কেঁদে উঠল। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
–“ভাইজান…!”

​কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। রোজকে টেনেহিঁচড়ে গোডাউনের ভেতরে নিতেই বস্তিটি আলোড়িত হলো পুলিশের গাড়ির সাইরেনে। ড্রাইভারটি চমকালো। বাঁচার ছোট্ট একটু আশা দেখতেই রোজ গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলল, ‘বাঁচাও’।
সহসা ড্রাইভারটি আরো একটা চড় বসালো তার গালে আর সাথে সাথে মুখ বেঁধে ফেলল। রোজ ছটফট করতে লাগল বাঁচার জন্য।
​গাড়িটির সিটের নিচে রোজ নিজের ফোন লুকিয়ে রেখেছিল। পুলিশ গাড়িটা পর্যন্ত আসতেই আশেপাশে চোখ বুলালো। এবং বার আগে গোডাউনের দিকেই চোখ গেল। তারা দ্রুত গোডাউনে ঢুকতেই দেখল তিনজন লোক চুপচাপ শুয়ে আছে, সেখানে কেউ নেই।
পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা তাদের একজনের পায়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বলল,
–“এই ওঠ! তোদের মধ্যে ওই গাড়ির ড্রাইভার কে?”
​তিনজন এমনভাবে চোখ খুললো যেন তারা কিছুই জানে না। তারা একত্রে বলল,
–“জানি না স্যার। ক্যান কী হইছে?”
​পুলিশটি নিজেকে সংবরণ করল না বরং সপাটে একজনের গায়ে একটা ঘা বসিয়ে দিয়ে বলল,
–“অভিনয় করো আমাদের সাথে শালা। সোজাসুজি বল, ওই গাড়ির ড্রাইভার কে আর গাড়িতে থাকা মেয়েটি কোথায়?”
​–“কোন মাইয়্যা স্যার? আমরা কিছুই জানি না, আমরা এইখানে ঘুমাইছিলাম এক ঘণ্টা যাবৎ।”
​–“এই ওরা ভালো কথায় মুখ খুলবে না। দড়ি দিয়ে বেঁধে তারপর কয়টা ঘা দে। ঠিক বলে দেবে। আর তিনজন চারপাশে খোঁজ কর।”

​তিনজন ওই লোকদের বাঁধল আর তিনজন কনস্টেবল পুরো গোডাউন খুঁজতে লাগল। লোকদের আর বলা লাগেনি তার আগেই গোডাউনের একটা ট্রাঙ্কের ভেতর অচেতনপ্রায় রোজকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পেল।
​পুলিশটি রাগে গজগজ করতে করতে লোকগুলোকে সেখানেই বেধড়ক পেটাতে শুরু করল।
–“আমার সাথে নাটক করছিলি তাই না? পঁচিশ বছর যাবৎ ঘাসে মুখ দিয়ে চাকরি করিনি। এই কটাকে নিয়ে চল, আজ ওদের দেখাবো আমার সাথে নাটক করার ফল। মেয়ে মানুষ দেখলেই শকুন হয়ে যাওয়া বের করব আজ।”
​রোজের হাত-পা খুলে দিল পুলিশ। পুলিশকে দেখতেই রোজ দেহের ভর ছেড়ে দিয়ে কেঁদে উঠল। দশ মিনিটের মাথায় তৃশান আর দু’জন টিচার হন্তদন্ত হয়ে সেখানে আসল। পুলিশের গাড়িতে রোজকে দেখে তৃশান কোমরে হাত দিয়ে বড়সড় এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। থমথমে মুখে পুলিশের সব ফরমালিটিজ পূরণ করে রোজকে কোলে তুলে নিলো। টিচার দু’জন বেশ ধমকালো রোজকে। রোজ নির্বাক নতশির শুধু সব মাথা পেতে নেয়।
​পুরোটা রাস্তা তৃশান রোজকে একটা কথাও বলল না। হোটেলে ফিরতেই সোজা নিজের রুমে নিয়ে গেল। দু’জন টিচার আর সে ছাড়া কেউ জানে না দুই ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যাওয়া এই অপ্রীতিকর ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা। তানশানকে জানালে নিশ্চিত ছেলেটার প্রতিযোগিতাই নষ্ট হয়ে যাবে।
​তৃশান রোজকে বিছানায় বসাতেই রোজ আড়ষ্ট নয়নে চেয়ে বলল,

–“আমায় এখানে এনেছেন কেন? আমি আমার রুমে যাব।”
​এই পর্যায়ে তৃশানের আওয়াজ শোনা গেল। রোজকে অবাক করে দিয়ে তৃশান গর্জে উঠে বলল,
–“ওখান থেকে এক পাও নড়লে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না রোজ।”
​–“আমি রুমে যাব। আমার শরীর খারাপ করছে।”, রোজ ছলছল নেত্রে বলতেই তৃশান তেড়ে এসে বলল,
–“এখন একটা ঠাটিয়ে চড় দেই?”
​রোজ কাঁদতে কাঁদতে চেঁচিয়ে বলল,
–“সাহস থাকলে দিন।”
​রোজের বলতে দেরি আছে কিন্তু তৃশানের চড় দিতে দেরি হলো না। সপাটে আরো একটা চড় খেয়ে রোজ ত্বদা খেয়ে গেল। অবাক হয়ে বলল,

–“আপনি আমার গায়ে হাত তুলেছেন?”
​–“শুধু হাত না… ইচ্ছে করছে তোমার মতো বিগড়ে যাওয়া বেপরোয়া, জেদি মেয়েকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে বসিয়ে রাখি। বারণ করিনি তোমায় একা বাইরে যেতে? আজ কী হতো যদি সময়মতো পুলিশ না পৌঁছাতো?”, তৃশান রাগে ফেটে পড়ে বলল।
​রোজ কাঁদতে কাঁদতে জেদি কণ্ঠে বলল,
–“মরে যেতাম, ভালো হতো। কিন্তু আপনি আমার গায়ে হাত তুললেন কোন সাহসে?”
​–“এমন জেদ থাকলে মরেই যেতে হবে। অভদ্র মেয়ে কোথাকার! আবার এমন মেয়ে আর তার পরিবারের প্রশংসা নাকি মানুষের মুখে মুখে!”, তৃশান বিদ্রূপ করে বলেই অয়েন্টমেন্ট আর স্যাভলন নিয়ে আসে। কাঁদতে থাকা জেদি মেয়েটার হাতে-গলায় থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঘাতে অয়েন্টমেন্ট লাগাতে গেলে রোজ হাত সরিয়ে নেয়। তৃশান কঠোর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে হাতটা জোরপূর্বক চেপে ধরে অয়েন্টমেন্ট লাগিয়ে দিল।
বিড়বিড় করে বলল,
–“একটা নির্বোধ আপদ পাঠিয়েছে শিক্ষা সফরে।”
​পরপরই ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল,
–“ছেলের সাথে তোমার ভাই আসতে পারেনি? তার কী এমন কাজ ছিল যে তোমার মতো আপদকে পাঠিয়েছে? নাকি কচি বউ পেয়ে ছেলের গুরুত্ব কমে গিয়েছে।”
​–“মুখ সামলে কথা বলুন। আমার ভাই আর ভাবি নিয়ে একটাও বাজে কথা বলবেন না।”
​রোজের কঠিন মুখপানে চেয়ে তৃশান পাল্টা ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“নিজে এখনো অবিবাহিত একটা মেয়ে অথচ নিজের আধবুড়ো ভাইয়ের জন্য এনেছ নিজের থেকেও একটা ছোট মেয়েকে। তোমাদের লজ্জা করে না হ্যাঁ?”
​রোজ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–“ওহ্, তবে চড় মেরে এই ক্ষোভটা ঝাড়লেন বুঝি? আমার ভাই ছোট মেয়ে বিয়ে করুক বা বড় মেয়ে তাতে আপনার কী?”
​–“মাথামোটা তোমায় শুধু শুধু বলিনা। নিজের করা বোকামির শিক্ষা তোমার এখনো হয়নি তাই না? তোমার ভাইয়ের বিয়ে করা নিয়ে আসলেই আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মাথাব্যথা হয় ওই মেয়েটার জন্য, যার জীবন তোমরা নষ্ট করে দিয়েছ।”,
তৃশান ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে সরে যায়। রোজ তার পানে চেয়ে বলল,
–“আমরা কারোর জীবন নষ্ট করিনি। যেটা হয়েছে সেটা ভবিতব্য ছিল। আর ভাই-ভাবি এখন অনেক সুখে আছে। আপনি তাদের উপর নজর না দিলেই হলো।”
​–“আমি কারোর উপর নজর দেইনি।”
​–“তবে কেন ভাবিকে নিয়ে আপনার এত ক্ষোভ আমাদের উপর? আপনি ভাবির জীবন আরো জটিল করে তুলেছেন।”
​–“আমি জেনেবুঝে রূপকথাকে কখনো বিরক্ত করিনি। যেদিন থেকে জেনেছি সেদিন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি।”, তৃশান ক্ষীণ স্বরে বলল। কণ্ঠের তেজ হারিয়ে গেল বিব্রতকর কথোপকথনের বিষয়বস্তুতে।
রোজ মলিন মুখে চেয়ে বলল,
–“তাহলে আমার আর আমার পরিবারের উপর এই ক্ষোভ ঝাড়া বন্ধ করুন।”
​তৃশান সরব কঠিন চোখে তাকালো।
–“আমি মোটেই কারোর ক্ষোভ ঝাড়িনি তোমার উপর। আজ যা করেছ তার জন্য এটা তোমার প্রাপ্য ছিল। তানশানের ট্রিপটা আজ নষ্ট হয়ে যেতো তোমার কারণে। তোমার ভাই আর পরিবারকে আমি কী জবাব দিতাম?”
​রোজ থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে গেল। আনত মুখে বলল,

–“আমি আসছি।”
​–“ওড়না পরে যাও।”
​এতক্ষণে রোজের চোখ যায় নিজের উপর। লোকগুলো ওড়না ছিনিয়ে নিয়েছিল। সে এখন ওড়না পাবে কোথায়? প্রশ্নটি মনে জাগতেই চোখের সামনে একটা তোয়ালে ভেসে উঠল। সেটি হাতে নিতেই তৃশান গমগমে স্বরে বলল,
–“ধুয়ে দিয়ে যাবে।”
​–“কেন গায়ে কুষ্ঠ রোগের জীবাণু লেগে আছে?”, রোজ কপাল কুঁচকে বলল।
​–“তার থেকেও ভয়ঙ্কর জীবাণু রয়েছে তোমার গায়ে।”, তৃশান চোয়াল শক্ত করে বলল। রোজও চোয়াল শক্ত করে বলল,
–“আমি ইহকালে কাপড়চোপড় ধুইনি। নিজে ধুয়ে নেবেন।”
​বলেই সে তোয়ালেটা গায়ে পেঁচিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল। পেছনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তৃশান চেঁচিয়ে বলল,

–“ওই আধোয়া তোয়ালে যেন আমার ঘরে না আসে বেয়াদব মেয়ে। আর আমার পঁচিশ হাজার টাকাও দিতে বলবে তোমার ভাইকে। দুই ঘণ্টায় আমার পকেট খালি করে দিয়েছে।”
​–“বেয়াদব, জেদি একটা মেয়ে। এই মেয়ের প্রশংসা নাকি সবার মুখে। রোজ নাকি একটা ফুল! কচুফুল একটা! মুখ, হাত-পা সব চুলকায় অকাজ না করতে পারলে। অভদ্র!”
​তৃশান রাগে গজগজ করতে করতে বিছানায় বসে পড়ল। পুলিশকে তৎক্ষণাৎ একটা বড় অঙ্কের টাকা না দিলে তারা অ্যাকশন নিচ্ছিল না। সে রাগ দমিয়ে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিল। কিন্তু দশ মিনিট বাদে তার রাগ আবার তরতর করে বেড়ে গেল তপোবনের ফোনে।
তপোবন অবাকপানে শুধালো,
–“তৃশান, তুমি নাকি রোজের গায়ে হাত তুলেছো? চড় মেরেছো?”
​তৃশান দাঁত খিঁচিয়ে বলল,
–“শুধু চড় মেরেছি এটাই বলেছে? চড় মারার কারণ বলেনি?”
​–“কারণ যাই হোক না কেন তুমি আমার অত বড় বোনের উপর কোন সাহসে হাত তুলেছো?”
​–“বাহ্! আপনার বোন তবে আপনাদের আস্কারাতেই এত জেদি হয়েছে। জি হ্যাঁ, আমি আপনার বোনকে চড় মেরেছি। আরো একটা মারতে ইচ্ছা করেছিল কিন্তু নিজেকে দমিয়েছি। আর এটা নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। কারণ এটা আপনার বোনের প্রাপ্য ছিল।”
​–“হাউ ডেয়ার ইউ?”, তপোবন হতভম্ব হয়ে বলল।

তৃশান রাগে গজগজ করতে করতে সবটা খুলে বলল। ফোন রাখার আগে খেঁকিয়ে উঠে বলল,
–“আমার পঁচিশ হাজার টাকা দয়া করে পাঠিয়ে দেবেন। আমার পকেটে এখন পাঁচ টাকাও নেই।”
​ডিসকানেক্টেড ফোন হাতে তপোবন তখনো অবিশ্বাস্য চিত্তে বসে আছে। রোজের সাথে এত বড় ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল? সে তৎক্ষণাৎ ফোন দিল রোজকে। ধমকে উঠে বলল,
–“রোজ তুমি এমন দুঃসাহসিক কাজ কী করে করতে পারো? একা একা বাইরে গিয়েছ কোন সাহসে?”
​রোজ নাক টানতে টানতে বলল,
–“আমার একা একা হোটেলে থাকতে ভালো লাগছিল না। তানশান তো একটা রোবট!”
​–“আজ কত বড় দুর্ঘটনা হয়ে যেতে পারত রোজ? তোমার কাজকর্ম দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তুমি তো এমন কখনো করো না।”
​–“আমার এখানে ভালো লাগছে না, ভাইজান।”
​–“তাই বলে তুমি এমন করবে? তৃশান তো মোটেও ভুল কাজ করেনি। আমি থাকলে বোধহয় আমিও একটা দিয়েই দিতাম।”

​–“ভাইজানননন!”, রোজ চেঁচিয়ে উঠল।
তপোবন কঠিন গলায় বলল,
–“আদর দিয়ে কী বিগড়ে দিয়েছি তোমায়? এত জেদি কবে হলে রোজ? বাইরে যেতে ইচ্ছে করলে আমায় বলতে, আমি কোনো একটা ব্যবস্থা করতাম।”
​রোজ চুপটি করে রইল। তপোবন হতাশার সুরে বলল,
–“আমারই উচিত হয়নি তোমায় পাঠানো। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না তুমি এত বড় বিপদ থেকে ফিরে এসেছো। আজ কিছু হলে ভাইজানের কী হতো রোজ? ভাইজান কী করে বাঁচতাম? আব্বু-আম্মুকে কী জবাব দিতাম?”
​রোজ চোখের পানি মুছে বলল,

–“আমি ঠিক আছি।”
​তপোবন চাপা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আর দু’টো দিন একটু সামলে চলো। বাইরে যেতে চাইলে তৃশান নিয়ে যাবে। ওকে আমি বলে রাখব।”
​–“প্রয়োজন নেই।”
​–“আচ্ছা, নিজের খেয়াল রেখো।”
​–“তোমাদের ট্রিপ কেমন যাচ্ছে?”
​তপোবন শ্রান্ত কণ্ঠে বলল,
–“তোমরা ভালো কাটাতে দিচ্ছো না। এত টেনশন নিয়ে থাকা যায়? তুমি এত বড় কাণ্ড ঘটিয়েছো ওদিকে মৌন…”
​বলতে গিয়েও থামলো তপোবন। বুকভরা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে জীবনের জটিল টানাপোড়েনে।
রোজ হকচকায়। হন্তদন্ত হয়ে শুধায়,

–“মৌন বউ? আমার মৌন বউয়ের কী হয়েছে ভাইজান? আমি তো তার সাথে গতকাল কথা বললাম। সে বলল সে এখন অনেকটা ভালো আছে। তার কী কিছু হয়েছে?”
​ভালো থাকা যে দুঃস্বপ্ন মৌনতা নামক দুঃস্থ নারীর জন্য। তপোবন অস্ফুট স্বরে বলল,
–“দোয়া করো যেন কিছু না হয়। আল্লাহ একটু রহমত দান করুক মেয়েটার উপর। জানি না আর কবে মেয়েটাকে আগের মতো দেখতে পারব, নাকি আদৌ পারব না।”

​–“এমন কথা বলো না ভাইজান।”
​–“মৌনর শরীর ভালো না, রোজ। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। শরীরের সব কার্যপ্রক্রিয়া আবার ফল করেছে।”
​রোজ মিইয়ে গেল। এই জীবনে মৌন বউকে হারতে দেখলে সে আর কখনো স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারবে না। নিজের ভাইয়ের কারণে তার মৌন বউকে হারাতে দেখলে সে কী করে বাঁচবে?
​সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“তুমি চিন্তা করো না ভাইজান। আমার মৌন বউয়ের কিচ্ছু হবে না। সে একদম সুস্থ হয়ে যাবে। আমিও আর কোনো ঝামেলা করব না। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। ভাবিকে সব জায়গায় ঘুরিয়ে আনবে। সে কিন্তু কখনো এই জায়গাগুলোতে যায়নি।”
​–“হুঁ।”

ফোন রেখে তপোবন তৃশানকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা পাঠালো। মেসেজে ছোট্ট করে বলল,
–“রোজ বাইরে যেতে চাইলে ওকে একটু ঘুরিয়ে এনো। যা কিনতে চায় কিনে দিও।”
​মেসেজটা দেখে তৃশানের মাথায় আগুন ধরে গেল। তেতে উঠে বলল,
–“হ্যাঁ হ্যাঁ ওই আপদকে বাইরে নিয়ে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে আসব। ঝামেলা একবারে চুকে যাবে।”
​তানশানকে কিছুই জানালো না রোজ। সে নিমগ্ন তার প্রতিযোগিতায়। রাত তখন আটটা। তৃশান রোজের রুমের সামনে গেল। নক করার আগেই দেখল অদূরে আবছা আলোর মাঝে হোটেলের করিডোরে চেয়ার পেতে বসে আছে রোজ। সে সেদিকে এগিয়ে গেল। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
–“এখানে কী করছ?”
​রোজ ঘাড় ঘুরিয়ে লালচে নেত্রে তাকায়। চোখেমুখে অসুস্থতার দুর্বলতা। বলল,
–“কেন কী হয়েছে?”
​–“তোমার ভাই টাকা পাঠিয়েছে তোমার জন্য। বাইরে যেতে চাইলে চলো।”
​–“নাহ, যাব না।”, রোজ নাকচ করেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তৃশান দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“আমি বাইরে যাচ্ছি। ঘুরব আর শপিং করব। লাস্টবার বলছি, যেতে চাইলে চলো নয়তো ওই টাকা দিয়ে আমি শপিং করে আসব। আর তোমার ভাইকে বলব, ওই টাকা দিয়ে তুমি শপিং করেছ।”
​রোজ হতবাক হয়ে গেল।

–“আমি কখন শপিং করলাম?”
​–“করোনি সেটা তোমার ব্যাপার। আমি তো তোমায় বলেছি কিন্তু তুমি জেদ দেখিয়ে যাবে না। এর দায়ভার কী আমার?”
​–“আপনি একটা ছ্যাঁচড়া লোক!”
​–“তোমার মতো জেদি মেয়েদের সাথে ছ্যাঁচড়ামো না করে উপায় নেই। গেলে চলো নয়তো আমি গেলাম।”
​–“এই দাঁড়ান! খবরদার আমার ভাইয়ের টাকা ছোঁবেন না। আমি আসছি।”
​রোজ এক ছুটে গিয়ে রেডি হয়ে আসলো। একটা রিকশা, দু’টো মানুষ— একজনের অন্তঃস্থলে কিশোরী বয়সের সুপ্ত অনুভূতির তীব্রতা আর একজনের অন্তঃস্থলে অজানা নয়া অনুভূতির তীব্রতার সংঘর্ষ আরো প্রকট হতে লাগল গায়ে গায়ে লাগা মৃদু ঘর্ষণে। দুটি উত্তেজিত বদমেজাজি সত্তা ক্রমেই নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে শান্ত-স্থির হয়ে গেল অদ্ভুত সেই নীরব পরিবেশে। ঢাকার মতো জঞ্জাল শহরেও নীরব পরিবেশ? এই নীরবতা যে ভিন্ন। জনমানবে ভরপুর মর্ত্যধামে যারা শুধুই একে অপরকে অনুভব করতে পারে তাদের এই অনুভূতির নাম কী?
​রোজ আড়চোখে তাকালো অতি সন্নিকটে থাকা মানুষটার পানে। নৈকট্য যতটা বাড়ছে বক্ষস্থলের অস্থিরতাও ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সুবাস, এই মানুষটা জুড়ে কত কত বোকামি করেছে! ভেবেই নিজের উপর রাগ হচ্ছে রোজের। সে পুনরায় মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল।
তৃশান ব্যস্ত নগরী দেখতে দেখতে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

–“কোথায় যাবে?”
​–“আড়ং-এ।”
​–“তারপর?”
​–“কিছু ডেকোরেশনের জিনিস কিনব সেখানে নিয়ে যাবেন।”
​–“তারপর?”
​–“ফুচকা খাবো।”
​সহসা তৃশান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। কপাল কুঁচকে বলল,
–“বিষ কিনে দেব কিন্তু ফুচকা খাওয়াব না।”
​রোজ কঠিন মুখে বলল,

–“মানে?”
​–“ফুচকা খেয়ে তিলে তিলে মরার চেয়ে বিষ খেয়ে একবারে মরে যাওয়া ভালো।”
​–“ফুচকা খেলে কেউ মরে না।”
​–“আজ না মরলেও কাল ঠিকই মরবে। ওসব আমি খাওয়াতে পারব না, সোজা রাস্তায় ফেলে চলে যাব।”
​রোজ ফুঁসতে ফুঁসতে রিকশায় চেপে বসল। কিয়ৎকাল বাদে গাড়িটি থামলো একটা হাসপাতালের সামনে। রোজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“হাসপাতালে এসেছেন কেন?”
​তৃশান দাঁত কেলিয়ে বলল,

–“মানসিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত ছিল তোমায়। কিন্তু আমি তো ভালো তাই ভালো মানুষের ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছি। গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে সেদিকে তো বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই, কিন্তু জেদ-রাগ দেখানোর বেলায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা হয়। এসো, আবার তোমার ভাই বলবে আমি তার বোনের খেয়াল রাখিনি। এর থেকে তানশান আরো ম্যাচিউর!”
​তৃশান গজগজ করতে করতে হাসপাতালের ভেতরে চলে গেল। রোজ বোকাবনে তাকিয়ে রইল। তার জ্বর—এটা সে একবারও বলেনি তৃশানকে।
​সে ছুটতে ছুটতে বলল,

–“এই এই আপনি জানলেন কী করে আমার জ্বর উঠেছে?”
​–“যেই থাপ্পড় খেয়েছো তাতে জ্বর কেন টাইফয়েড হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ভালোই শক্ত মেয়ে তুমি।”, তৃশান চলতে চলতে বিদ্রূপ করে বলল। রোজ গাল ফুলালো।
​ফুলকো গাল আর রাজ্যের বিরক্তি নিয়েই তারা ডাক্তার দেখালো, শপিং করলো, রেস্তোরাঁয় খেলো আর তৃশান মনে করে তানশানের জন্যও কিছু খাবার নিয়ে নিলো। কিন্তু রোজকে কোনোভাবেই ফুচকা খেতে দিল না। বিকালটা বিদঘুটে ভয়ঙ্কর ভাবে কাটলেও রাতটুকু ছিল ভীষণ প্রশান্তিদ্বায়ক।
কেননা মন যে অবুঝ। রোজ যতই নিজেকে দমাক কিন্তু মন তখনো তৃশানের প্রতি দুর্বল।
​এরপর থেকে তৃশান আর রোজের মাঝে খুব একটা দ্বন্দ্ব হলো না। কেটে গেল আরো কিছু লহমা। তানশানের চার-চারটি অগ্নিপরীক্ষা শেষ। আগামীকাল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—ফলাফল ঘোষণা। আগামীকালকে সকলের ফলাফল একসাথে ঘোষণা করা হবে এবং বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।
​রূপকথা তার তপোবনের একান্ত ‘রূপকথা’ হয়ে থাকার দিনগুলো ব্যাগে পুরে নিয়ে আবার চেনা বাস্তবতায় ফিরে এলো। এখন সে কারোর মমতাময়ী মা, কারো বাধ্য পুত্রবধূ, আবার কারো আদরের ভাবি। গতরে শোভা পেয়েছে চিরচেনা সেই শাড়ি আর অলংকার।

​যাওয়ার আগে শেষবারের মতো বিলাসবহুল রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সমুদ্রের বিশালতা দুচোখ ভরে দেখে নিচ্ছিল সে। বিগত সাতটি দিন ছিল তার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। এই ক’দিন সে এক অন্য তপোবনের দেখা পেয়েছে; একটা অন্যরকম দাম্পত্য জীবন উপভোগ করেছে। যেখানে কোনো জড়তা ছিল না, ছিল না সংসারের গুরুভার কিংবা কোনো কুণ্ঠা। ছিল কেবল একে অপরের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর নিখাদ ভালো লাগা। শুধু প্রিয়জনরা সাথে থাকলে আনন্দটা যেন কানায় কানায় পূর্ণ হতো।
তপোবন দ্রুতপায়ে রুমে ঢুকতেই দেখল, জানলার মৃদু হাওয়ায় কারো আঁচল উড়ছে। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই রূপকথা চঞ্চল কণ্ঠে বলল,

–“এসেছেন? চলুন বের হই।”
​–“এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আস্তেধীরে বের হই ইনশাআল্লাহ সময়ের মধ্যে পৌঁছে যাব।”
বলেই তপোবন হাতে করে আনা অ্যালবামটি রূপকথার দিকে এগিয়ে দিল। রূপকথা সেটি নিয়ে বলল,
–“এটা কী?”
​তপোবন বুকে হাত গুঁজে বলল,
–“তোমার কাটানো বিগত সাতদিন।”
​রূপকথা কপাল কুঁচকে অ্যালবামের পাতা উল্টাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল তার বিচিত্র সব রূপ আর মুহূর্ত। কখনো সে গহীন অরণ্যে মগ্ন, কখনো পাহাড়ের চূড়ায় বিমুগ্ধ চিত্তে দাঁড়িয়ে আছে, কখনো মেঘের আড়ালে লুকানো কোনো এক চঞ্চল কিশোরী, আবার কখনো লুসাইদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিতা এক ছোট্ট ভানু। কখনো বা সমুদ্রের তটে আপন মনে কড়ি কুড়োচ্ছে সে, কখনো বা সমুদ্রে পা ভিজিয়ে আনমনে হেঁটে চলেছে।
তবে প্রতিটি পান্নার শেষে একটি ছবিতে তপোবন অবশ্যই আছে। হয়তো সে কড়ি কুড়োতে সাহায্য করছে, অথবা মুগ্ধ নয়নে রূপকথাকে দেখছে।
​রূপকথার ঠোঁটের কোণা ঠিকরে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে চমৎকার হেসে অ্যালবামটি বুকে জড়িয়ে নিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলল,

–“ভুল বলেছেন, আমার সাতদিন এখনো পরিপূর্ণ হয়নি। আমার একটা ছেলে আছে তা কী আপনি ভুলে গিয়েছেন? তাকে ছাড়া আমার জীবনের প্রতিটা অ্যালবাম অসম্পূর্ণ। এই অ্যালবামটা একটু পরে পরিপূর্ণ হবে।”
​তপোবন স্মিত হাসল ছোট্ট স্ত্রীর বড় কথায়। ছোট্ট মেয়েটি আসলেই একটা ছেলের মা। যে মেয়েটি নিজেই কচি লতার মতো কোমল, সে আজ কত বড় এক মায়ের দায়িত্ব পালন করছে! তার ‘বালিকা বধূ’ তার ছেলের একজন চমৎকার ‘বালিকা মা’। নিজের ভাবনায় তপোবন নিজেই আনমনে হেসে উঠল।
​রূপকথার সেই ‘একটু পর’ হলো কয়েক ঘণ্টা পর। রূপকথার জীবনের সাতদিনের অ্যালবামটি পূর্ণতা পেল যখন বাবা-মায়ের মাঝে বিজয়ী তানশানের হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি অ্যালবামের শেষ পান্নায় ঠাঁই পেল।
​নির্দিষ্ট টাইম পেরিয়েছে আরো দশ মিনিট আগে। তপোবন-রূপকথা সেই পর্যায়ে হাঁটা ছেড়ে একপ্রকার দৌড় লাগালো। মাইকে শোনা যাচ্ছে, বিচারক টপ থ্রি ঘোষণা করছে। যেখানে তৃতীয়তে তানশানের নাম বলা হয়েছে। তপোবন-রূপকথার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে স্কুলের চার তলার হল রুমে পৌঁছালো। দু’জনে বড়সড় এক হাঁফ ছেড়ে হাসিমুখে হলরুমে ঢুকতেই দেখলো অভিভাবক, অতিথি, স্টুডেন্টদের সমারোহে প্রথম সারির এক কোণায় চুপটি করে বসে আছে তানশান। শান্ত ফর্সা ছেলেটার মুখটা লাল হয়ে আছে চিন্তায়।
​আশ্চর্যের বিষয় হলো টপ টেন থেকে টপ থ্রি পর্যন্ত টিকে থাকা ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে তানশান আর সুনেহরা অন্যতম। তানশানের নাম তৃতীয়তে ঘোষণা করা হয়েছে আর দ্বিতীয়তে সুনেহরার নাম ঘোষণা করা হয়েছে আর প্রথম ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকার অন্য স্কুলের একটা স্টুডেন্টকে। নিজেকে তৃতীয়তে দেখতেই তানশান হাত-পা ছেড়ে দিল, দেহ ঠান্ডা হয়ে গেল ভয়ে। টলটলে নেত্রে রোজকে বলল,

–“আমি হেরে গিয়েছি ফুপি। আমি পাপাকে কী বলব এখন? আমি পাপাকে জোর গলায় বলেছি যে আমিই জিতব।”
​রোজ দাঁত দিয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে ধমকে উঠে বলল,
–“থামো বাঁদর ছেলে! এখনো সুযোগ আছে। আগে বিজয়ী ঘোষণা করুক তারপর ন্যাকা কান্না কাঁদবে। বিশ্বাস করো ছেলে, আজ যদি তুমি না জিতেছো তবে তোমার পড়াশোনা বন্ধ। সারাজীবন ম্যাথ করে তুমি যদি এই প্রতিযোগিতায় হেরে যাও তবে এর থেকে লজ্জার আর কিছু থাকবে না। সাথে আমাকেও লজ্জিত করবে।”
​রোজ আরো এক দফা ভয় পাইয়ে দিল তানশানকে। সে টলটলে নেত্রে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সুনেহরার দিকে। যে কিনা আরামসে পা দোলাচ্ছে আর ললিপপ খাচ্ছে। এ কেমন মেয়ে? একটুও কী চিন্তা হচ্ছে না?
তানশান ভয়ে-আতঙ্কে জড়সড় হয়ে বসল।
ঠিক তখনই প্রধান বিচারক উঠে দাঁড়ালেন। পিনপতন নীরবতার মাঝে তিনি মাইক্রোফোনে বললেন,

–“উপস্থিত সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ বিগত দুই ঘণ্টা যাবৎ ধৈর্য সহকারে আমাদের সাথে থাকার জন্য। আর আপনাদের অপেক্ষা আর কৌতূহল না বাড়িয়ে এবার আমরা ফাইনাল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করছি।”
​তানশান রোজের হাত চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে বসে রইল। ভাতিজার কাণ্ডকারখানা দেখে রোজ দাঁতে দাঁত চাপলো। দীর্ঘ এক টান টান উত্তেজনা ভেঙে প্রধান বিচারক হাসিমুখে বললেন,
–“আন্তর্জাতিক ম্যাথমেটিক্যাল অলিম্পিয়াডের বিজয়ী হলো *** স্কুলের দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র তানশান সিকদার। দ্বিতীয় হয়েছে একই স্কুলের দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী সুনেহরা আহসান আর তৃতীয় হয়েছে তালহা জুবায়ের।”
​প্রথম স্থানে নিজের নাম শুনে তানশান যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! রোজ সরব চিৎকার করে উঠল। সেই হৈ-চৈ এর মাঝেই তানশান নিজের অনুভূতি খুইয়ে বসল। কেননা অদূরে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে তার সবচেয়ে অতিপ্রিয় দুটি মানুষ। পাপা আর মিমিকে এগিয়ে আসতে দেখে বিস্ময়ে তার কথা আটকে গেল। কখনো কখনো মুহূর্তগুলো এতটাই সুখময় আর আনন্দঘন হয়ে ওঠে যে মানুষ তা প্রকাশ করতে ভুলে যায়।
​ছেলের স্তম্ভিত রূপ দেখে তপোবন স্মিত হাসল। ভিড় ঠেলে এগিয়ে এসে ছেলের দিকে ঝুঁকে গিয়ে দুগাল আঁকড়ে ধরলো, ললাট বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে ভীষণ গর্বের সাথে বলল,

–“কংগ্রাচুলেশন, আব্বু। পাপাকে পুরো দেশের সামনে এতটা গর্বিত করার জন্য ধন্যবাদ। পাপা আজীবন তোমার কৃতজ্ঞ থাকব।”
তানশান এখনো ঘোর কাটেনি। বিড়বিড় করে বলল,
–“পাপা, মিমি… তোমরা এখানে?”
​রূপকথা গাল ভরে হেসে বলল,
–“আমার ছোট টিচার এত বড় প্রতিযোগিতা জিতবে আর আমরা আসব না তা কী হয়?”
​সন্তানের নিজের উপর বিশ্বাস না থাকলেও বাবা-মায়ের যেন দৃঢ় বিশ্বাস থাকে সন্তানদের উপর। তপোবন ছেলেকে বুকে টেনে নিয়ে আড়চোখে ছোট বোন রোজের দিকে তাকাল। রোজ তখন ভয়ে কাঁচুমাচু। ভাইজান তাকে কতটা ভালোবাসেন সেটা সে জানে, আবার তার শাসনের তেজও অজানা নয়। তবে আজ তপোবন আর রাগ করল না। হাত বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

–“কাছে এসো।”
​রোজ যেন হাতে চাঁদ পেল। ভাইয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অনুতপ্ত স্বরে বলল,
— “সরি ভাইজান, আর কখনো এমন জেদ করব না, কখনো বেয়াদবি করব না।”
​বোনকে জড়িয়ে ধরে তপোবন এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। এই মেয়েটিকে সে নিজের হাতে বড় করেছে। আজ যদি এই ছোট্ট মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলত তবে কী হতো? ভাবলেই তার গা শিউরে উঠছে। বিজয়ের এই আনন্দঘন মুহূর্তে সব অভিমান ধুয়ে মুছে গিয়ে এক নিটোল পারিবারিক আবেশ তৈরি হলো।
​বিচারকমণ্ডলী থেকে তানশান আর তার স্কুলের টিচারদের ডাকা হলো উপহার নিতে। তপোবন ছেলের পিঠ চাপড়ে বলল,

–“যাও আব্বু।”
​তানশান এগিয়ে গিয়েও ফিরে তাকাল বাবার পানে। তপোবন শুধায়,
–“কী হয়েছে?”
​–“তোমরা কী একটু আসবে আমার সাথে?”
​–“আমরা?”, তপোবন রূপকথার পানে চাইল। তানশান মাথা নেড়ে বলল,
–“হুঁ, তুমি আর মিমি আসো আমার সাথে।”
​ছেলের অদ্ভুত আবদার। তপোবন তার গালে হাত রেখে বলল,
–“এখানে তুমি উপহার নেবে আমরা গিয়ে কী করব?”
​–“আমার সব অর্জনের কৃতিত্ব তো তোমাদের। এসো।”, তানশান বাবার হাত আঁকড়ে ধরে রূপকথার পানে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। রূপকথা ছলছল নেত্রে তাকাল। এতটা সম্মান, ভালোবাসা তার প্রাপ্য কী? ছেলেটির জন্য সে আদতে কিছুই করেনি।

​–“ভাবি, যাও যাও।”, রোজ ঠেলে রূপকথাকে পাঠাল। তানশান আঁকড়ে ধরলো বাবা-মায়ের হাত। একজন টিচার বললেন,
–“আসুন স্যার। ছেলের অর্জন মানেই তো আপনার অর্জন।”
​তপোবন সৌজন্য হেসে ছেলের সাথে গেল। তবে সকলে অবাক হলো যখন তানশান উপহার গ্রহণ করার পরে চিনে পড়তে যাওয়ার যে অনুমোদন দেয়া হয়েছে সেটা ফিরিয়ে দিল। বিচারকমণ্ডলীসহ উপহার প্রদানকারীরা অবাক হয়ে শুধাল,

–“এটা দিয়ে দিলে কেন? এই নথিতে তোমার ভবিষ্যতে চিনে যাওয়ার জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছে। এটা সামলে রাখতে হবে নিজের কাছে।”
​তানশান বিনম্র কণ্ঠে বলল,
–“আমি জিতেছি এতেই আমি খুশি। কিন্তু আমি চিনে পড়তে যেতে চাই না। এটা আমার চাই না। এটা আপনি অন্য কাউকে দিয়ে দিন।”
​তপোবন অবাক হয়ে বলল,
–“এটা কী করছ আব্বু?”
​তানশান বাবার পানে চাইল। সে জানে এই মানুষটার বাঁচার কারণ সে। তবে সে কী করে তার মনে কষ্ট দেবে? সে হাসিমুখে বলল,

–“আমি সারাজীবন আমার পাপার সাথে থাকতে চাই। তার থেকে দূরে কখনো যেতে চাই না।”
​তপোবন শ্রান্ত নয়নে তাকালো ছেলের পানে। এই যে এতটুকু কথা, তার বিগত এক সপ্তাহের অস্থিরতা নিমিষেই শুষে নিলো। যতই মুখে বলুক না কেন, সে ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরছিল তানশানের দূরে চলে যাওয়ার কথা মনে করেই। সে ঝট করে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিলো। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“পাপাকে বোঝার জন্য, থ্যাংক ইউ আব্বু।”
​তানশান শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বাবাকে। বাবা-ছেলের অদ্ভুত সেই স্নিগ্ধ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী হলো, সকলে মুগ্ধ হয়ে দেখলো তাদের ভালোবাসা। ছেলেসন্তান বড় হলে বাবা-মায়ের সাথে দূরত্ব করতে শুরু করে, কিন্তু এই দৃশ্য যেন সকলের অন্তরে প্রশান্তি এনে দিল।
​শত ভিড়ের মাঝেও কেন বারংবার আমাদের দৃষ্টি ওই নিষিদ্ধ কিছুতে গিয়েই আটকায়? দুঃখগুলো এতটা তীব্র কেন হয়? এ কেমন নিয়ম? দরজার ঠিক ওপাশে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি না চাইতেও তাকায় শাড়ি পরিহিত ছোট্ট মেয়েটির দিকে। সম্পর্ক, দায়িত্ব, পোশাক মেয়েটিকে অচিরেই বদলে দিয়েছে। কলেজ ড্রেসে থাকা সেই ছোট্ট মেয়েটি একটা ছলনা, ঠিক যেমন তার অনুভূতিগুলোও নিছক ছলনা।
​তৃশানের লালচে দৃষ্টি দেখে রোজ ম্লান হাসল। নীরবে ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে বলল,

–“ভুলগুলো ভুলে যেতে হয়। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। কিন্তু তার জন্য নিজেকে কষ্ট দেয়া আরো বড় ভুল।”
​তৃশানের মাঝে কোনো উদ্বেগ দেখা গেল না রোজের আগমনে। একইভাবে স্থির দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
–“ভুলবশত কাউকে ভালোবেসে ফেলার মতো ভুল কখনো শুধরানো যায় না, আর না যায় ভোলা।”
​রোজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“চেষ্টা করেই দেখতে পারেন। হয়তো ভাগ্য আর জীবন আপনাকে আরো একবার ভুল প্রমাণিত করবে।”
​তৃশান দৃষ্টি নামায় মেয়েটির পানে। বোধগম্য হলো না কথাটির মাঝে সুপ্ত অনুভূতির রেশ। রোজ মৃদু হাসল। বলল,
–“বোঝেননি তাই না?ভুলগুলো আমাদের সঠিকটা বোঝার ক্ষমতা কেড়ে নেয়। আসছি, আর কখনো দেখা হবে না। ভালো থাকবেন।”
বলেই রোজ চলে গেল। তৃশান তাকিয়ে রইল মেয়েটির গমনের পানে। মেয়েটির চোখ সবসময় কিছু একটা বলে। কিন্তু কী?

​সময় বহুরূপী! সময়ের অজস্র বিচিত্র ব্যাখ্যা রয়েছে। এটা একপ্রকার প্রলেপ বা হিলিং টাচ।
দুঃখের ধারালো অমসৃণ জটিলতাগুলোকে ঘষে ঘষে ধীরস্থির মসৃণ করে দেয়।
তবে সুখের ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাখ্যা একটু নিষ্ঠুর। একটু? না না অনেকটা নিষ্ঠুর।
সময় সুখকে ধরে রাখে না, বরং তাকে অতীতে ঠেলে দেয়। সময় হলো ঠিক শরতের মেঘ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়— “যেতে নাহি দিব, হায়, তবু যেতে দিতে হয়।”
​সময় সুখকে কেড়ে নিয়ে তাকে আরও মূল্যবান এবং হাহাকারময় করে তোলে। ঠিক যেমন, এরোজ বারংবার সেই মানুষটাকে পেয়েও হারিয়ে ফেলে। এরপর শূন্য হাতে অনুভব করে, সে ওই মানুষটাকে একটু বেশিই ভালোবাসত। যতটা ভালোবাসলে ওই মানুষটাকে ছেড়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে ওঠে।

​চারিদিকে ঘুটঘুটে তমসা ছেয়ে আছে। বিভুঁইয়ের আকাশে আজ মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়েছে। যে বাঁচতে চায় না তাকে বাঁচতে দেয়া হলো না, যে সুখ আঁকড়ে বাঁচার জন্য গলাকাটা মুরগির মতো ছটফট করছে তার সুখ কেড়ে নেয়া হলো; জগতের সব খারাপকে ঊর্ধ্বে রেখে, সব ভালো আজ হারিয়ে গেল অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণার কাছে।
​চারিদিকে শুধু হাহাকার, আর্তনাদ, প্রার্থনা আর প্রচেষ্টা। হাসপাতালের বেডে ছটফট করতে থাকা নারীটি বমি করতে করতে রক্তবমি করে দিল। দেহের সকল যন্ত্রণা সেই পর্যায়ে এসে স্তিমিত হয়ে এলো। সাত জন ডাক্তার নিজেদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে তাকালো কক্ষে পাথরের ন্যায় থমকে থাকা এরোজের পানে। হাত থেকে গ্লাভস খুলতে খুলতে নতশিরে বলল,
–“We are sorry. We failed to save her. She was totally devastated from the inside. No medicine or treatment was effective anymore.”
​ডাক্তাররা বেরিয়ে গেলেন। বদ্ধ কামরার যন্ত্রের শব্দ ভেদ করে এরোজের কানে বাড়ি খাচ্ছে বিছানায় শায়িত ছটফট করতে থাকা নারীটির ক্ষীণ শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ। এরোজ এগিয়ে যায় বিছানার কাছে। চোখে চোখ পড়ল। দু’জনের চোখ থেকেই অশ্রু গড়ালো। কিন্তু কেউ কিছুই বলতে পারল না, বলার সময় দেয়া হলো না।
এরোজ তবুও হার মানলো না। ক্রমেই অস্পর্শী হয়ে যাওয়া নারীটির কাছে ছোট্ট একটা আবদার রাখল,

–“মৌন? আপনাকে একটাবারের জন্য একটু জড়িয়ে ধরি?”
​এবং বরাবরের ন্যায় মৌনতার কাছে এরোজ নামক ব্যক্তির ভালোবাসা আর আবদারগুলো প্রশ্রয় পেল না। তাকে একটাবারের জন্য জড়িয়ে ধরার অধিকার দেয়া হলো না।
নারীটির দেহ ততক্ষণে সর্বশান্ত হয়ে গিয়েছে। যেই নারীটি কখনো এরোজের চোখের দিকে তাকাত না আজ সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে এরোজের চোখের দিকে। পার্থক্য শুধু ওই চোখে আর কখনো অনুভূতির দেখা মিলবে না।
হতভম্ব এরোজ কৌতূহলী হলো। থরথরিয়ে কাঁপতে থাকা হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিল ক্যানুলা লাগানো হাতটি। বরফের ন্যায় ঠান্ডা নিশ্চল দেহটি জানান দিচ্ছে জীবন যুদ্ধ শেষ…..!

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮

​মৌনতার ধৈর্য ও সহ্য সীমা ছাড়িয়ে গেল। শুধু ধৈর্য হারালো না এরোজ। সে আজও মৌনতার কাছে যাওয়ার সেই পথ ভুলল না। সে প্রতিদিন সেই পথে হাঁটে যেই পথে রূপাঞ্জেলের দেখা পাওয়া যায়।
​হাঁটতে হাঁটতে পুরুষালী দেহটি অজস্র কবরস্থান ছাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত কবরস্থানের সামনে এসে দাঁড়ালো— যেই কবরস্থানের চারিপাশে ফুটে আছে অজস্র ল্যাভেন্ডার ফুল গাছ।
​এরোজ জুতা খুলে কবরস্থানটির পাশে গিয়ে পা গুটিয়ে বসে হাতের ডায়েরিটা খুললো। যেই ডায়েরিটিতে ‘তাকে’ ফিরে পাওয়ার গল্প লিখতে শুরু করেছিল, সেই ডায়েরিতে আজ ‘তাকে’ হারানোর গল্প লিখছে।
​সে কলম চালিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে লিখল,
–“তাকে হারানোর আজ ‘তিনশ পঁয়ষট্টি দিন’।”

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (৩)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here