Home অপরাহ্নে উপসংহার অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮
তোনিমা খান

নায়েলের ​নিদ্রার ঘোর কাটার সাথে সাথেই মিলিয়ে যায় এরোজের মোহ। স্তিমিত হয়ে আসে ‘পাপা’ নামক সেই স্নিগ্ধ ডাকের প্রতিধ্বনি। যেদিন সে ছোট্ট মেয়েটিকে প্রথম বুকে জড়িয়ে ধরেছিল, সেদিন মনে হয়েছিল ইমরোজ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী আর সৌভাগ্যবান মানুষ। তার কাছে এমন এক অবোধ সত্তা আছে, যার পুরো পৃথিবী জুড়ে কেবল ইমরোজেরই আধিপত্য। যে পরম আদরে তাকে ‘পাপা’ বলে ডাকে, যার সব আবদার আর অভিমান কেবল তাকেই ঘিরে। সেদিন প্রথম অনুভব করেছিল ‘বাবা’ পরিচয়টি কতখানি ক্ষমতাধর আর সুখময়!
​অথচ পরক্ষণেই রূঢ় বাস্তবতা তাকে মনে করিয়ে দেয়, সে আদতে এক নিঃস্ব পথিক। নিজের ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেদিন অঝোরে কেঁদেছিল সে। কেন তার জীবনে এমন এক চিলতে সুখের স্থায়ী নিবাস নেই!
​তবে ভাগ্য যে এভাবে মোড় নেবে, তা সে কক্ষনো ভাবেনি। আজ নায়েল অবচেতনে তাকে ‘পাপা’ বলে ডাকছে, হয়তো কাল পূর্ণ চেতনা নিয়েই ডাকবে। এই সামান্য বিশ্বাসের ওপর ভর করেই এরোজ প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছে নিজের মানসিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে।

​–“ছোট পাপা? এই ছোট পাপা? কাম হিয়াল! আসো খেলা কলি।”
​বিস্তৃত বিশাল সবুজ ঘাসে আবৃত মাঠের উপর বাচ্চাদের সাথে ছোটাছুটি করতে থাকা নায়েল চেঁচিয়ে ডাকলো এরোজকে। চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত চোখে চেয়ে থাকা মানুষটি পুনরায় এক ম্লান হাসি ফুটিয়ে তুলল। গলা উঁচিয়ে বলল,
​–“আর খেলা করতে হবে না। এখন এসো, খাবার খাবে।”
​–“নো, খাবাল খাবো না।”, নায়েল জেদ ধরে চেঁচিয়ে বলল। সে তখন অচেনা শিশুদের সাথে খেলায় মগ্ন। টরন্টোর স্থানীয় শিশুদের সাথে সে এখন বেশ কিছুক্ষণ কথোপকথন চালিয়ে নিতে পারে; সামনের মানুষটি কী বলতে চাইছে, তা বোঝার তীব্র আগ্রহ কাজ করে তার ছোট্ট মনে।
​মাঠ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এরোজ রেস্টুরেন্টের ভেতর ঢুকে গেল এবং কিছুক্ষণ পর এক ট্রে খাবার হাতে বেরিয়ে এলো। সূর্যের কিরণ উদিত হওয়ার আগেই তুষারপাত থেমে গিয়েছিল। মর্ত্যধামে তখন আকস্মিক সূর্যের কিরণ খেলা করছে। ইদানিং এমন চমৎকার আবহাওয়া টরন্টোতে খুবই বিরল। তাই এরোজ সময় নষ্ট না করে মৌনতা আর নায়েলকে নিয়ে এই পার্কে এসেছে।

​রেস্তোরাঁর অবস্থান আর পরিবেশ দুটোই মৌনতার অনুকূলে। রেস্তোরাঁটি অবস্থিত টরন্টোর এক সুদীর্ঘ পার্কের ঠিক মাঝখানে, যা একটি উঁচু পাহাড়ি জায়গার ওপর নির্মিত। পার্কের মখমল সদৃশ সবুজ লন, নিরিবিলি দূষণমুক্ত পরিবেশ, কিছুক্ষণ পর পর বসার জন্য আরামদায়ক বেঞ্চ আর স্বাস্থ্যসম্মত খাবার—সবকিছু বড্ড মনকাড়া।
​প্রতিদিন ভোরে এখানে স্বাস্থ্যসচেতন ও শৌখিন মানুষের ভিড় জমে। কেউ আসে শরীরচর্চা করতে, কেউ আড্ডা দিতে, আবার কেউবা কেবলই বিশ্রামের খোঁজে। ব্যায়াম বা প্রাতঃভ্রমণ শেষে সবাই এই রেস্তোরাঁতেই ভিড় করে। এখানে ফাস্টফুড পাওয়া গেলেও মূলত ‘হেলদি ডায়েট’ বা স্বাস্থ্যকর খাবারকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়, যা করাল রোগে অসুস্থ বা স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের জন্য বিশেষ উপযোগী।
​পার্কটির পূর্ব সীমান্ত যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বিশাল এক খাদ। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত হওয়ায় সেখান থেকে টরন্টোর দিগন্তরেখা এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। খাদের ঠিক কয়েক ফুট নিচ দিয়ে বিশাল হাইওয়ে তার আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। আর হাইওয়ের ঠিক পরে আরও একটা খাদ, যার পরে বিস্তৃত এক ঘুমন্ত শহর দেখা যাচ্ছে।

​–“টেবিলে আসুন।”
​পার্কের একদম শেষ প্রান্তের রেলিং আঁকড়ে ধরে মাথা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকা রুগ্ন দেহটি মৃদু নড়েচড়ে উঠল কারোর ডাকে। ফিরে তাকাতেই মিঠা রোদ আঁচড়ে পড়ল চোখেমুখে। মৌনতা চোখমুখ কুঁচকে নিল। পুরুষটির দৃষ্টি শ্রান্ত হয় ওই সৌন্দর্যটুকু লুফে নিয়ে।
কিয়ৎকাল পূর্বের সেই চঞ্চল, প্রাণবন্ত নারীটিকে অচিরেই হারাতে দেখে এরোজ খাবার রেখে এগিয়ে গেল।
​–“খাবার খেতে আসুন।”
​নারীটি নিরুত্তর। তার উদাসীন দৃষ্টি তখনো এঁটে আছে অদূরে একটা ছোট্ট ঢালু পাহাড়ের উপর পার্কের আরেকটি অংশের দিকে। যেখানে বয়স্ক এক কানাডিয়ান যুগল একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাসছে, কথা বলছে, আবার পশ্চিমা সংস্কৃতির অভ্যাস অনুযায়ী জনসমক্ষে চুম্বনে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের চোখেমুখে লেপ্টে আছে তৃপ্তিময় এক ভালোবাসার রেশ। যেন জাগতিক সকল দুঃখ ছাপিয়ে তারা ভীষণ সুখী এক দম্পতি।
​এরোজ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল,

–“ওদিকে কী দেখছেন?”
​মৌনতা তাদের দেখতে দেখতেই বলে উঠল,
–“তারা খুব সুখী মানুষ, তাই না?”
​জগতে কেউ কি সর্বসুখী হয়? এই ধরণীতে তো মানুষ জীবনের অন্ধকার পান্না লুকিয়ে বাইরে সাফেদ পান্না দেখিয়ে পথ চলে। এটাই যে বাঁচার নিয়ম! এরোজ ক্ষীণ নিঃশ্বাস ফেলে রেলিংয়ে কনুই ঠেকালো। অলস বদনে দাঁড়িয়ে মিহি স্বরে বলল,
​–“রেনন! এই পার্ক আর রেস্তোরাঁর মালিক। আর তার সাথে যে আছে, সে অ্যামিলি। রেনন এর দ্বিতীয় স্ত্রী। অ্যামিলি মুসলিম আর রেনন খ্রিষ্টান।”
​এতটুকু বলে এরোজ থামে। কিয়ৎকাল বাদে ফের বলে উঠল,

–“রেনন অ্যামিলিকে খুব ভালোবাসে। যতটা ভালোবাসলে মৃত্যুকে প্রতিনিয়ত উন্মাদের মতো ভয় পেতে শুরু করে। তার ভাষ্যমতে, মৃত্যু তার থেকে অ্যামিলিকে কেড়ে নেবে। তাই সে নিজ ধর্ম ত্যাগ করে আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা করতে শুরু করে। তবে আল্লাহর কাছে তার একটাই চাওয়া—সে যতদিন বাঁচবে অ্যামিলিকে নিয়ে বাঁচবে। আর যখন মারা যাবে, যেন তারা দু’জন একসাথে মারা যায় আর তাদের জান্নাত দেয়া হয়।”
​তবে চমৎকার এই গল্পে মৌনতা একটুও সুখ খুঁজে পেল না। দৃষ্টি অচিরেই লাল হয়ে উঠল। কারোর জীবনের প্রথম নারী হওয়ায় দ্বিতীয়বার কোনো পুরুষকে সুখী হতে দেখলে তার বুকে ব্যথা করে। হয়তো ইমরোজ ও রেননের মতোই এখন খুব সুখে আছে। সৃজাকে আগলে রাখার জন্য পরিবার-পরিজন, পৃথিবী সব ছাড়তে রাজি। ইমরোজ তাকে নিশ্চয়ই খুব ভালোবাসছে। টুপটাপ করে কিছু নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
​–“পুরুষ মানুষ যদি নিজের জীবনের প্রথম অধ্যায়কে এতটা ভালোবাসে, তবে সৃষ্টিকর্তা কেন আমায় কারোর জীবনের প্রথম অধ্যায় করে পাঠালো?”
​এরোজ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অন্যের সুখ দেখে আফসোস করা ক্রন্দনরত নারীটির দিকে। অথচ কেউ তার জন্য একবুক সুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ম্লান হেসে বলল,

–“যেন কারোর জীবনের একমাত্র অধ্যায় হয়ে বাঁচতে পারেন।”
​মৌনতা ঘাড় ঘুরিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায়। আজ আর দৃষ্টি সরায় না এরোজ। খুব করে চায় নারীটি তার ভেতরটা বুঝুক। জোরপূর্বক নয়, মন থেকে তাকে বুঝুক আর তার অপেক্ষাদের একটু করুণা করুক। কিন্তু বরাবরের ন্যায় নারীটি তার দৃষ্টির গভীরতা বোঝেই না—মন বোঝা তো দূরের কথা! মৌনতা চোখে চোখ রেখে অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
–“আপনি সবসময় মিথ্যে সান্ত্বনা দেবেন না।”
​–“আমি মিথ্যা সান্ত্বনা দেই না। শুধু আপনি জীবন আর সুখকে দেখতে পারছেন না।”
​মৌনতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কম্পিত কণ্ঠে বলল,
–“ভালোবাসার বিনিময়ে যে মৃত্যু পেল, সে কী করে কারোর জীবনের একমাত্র অধ্যায় হবে? যেখানে মৃত্যুই তার নিকটস্থ শেষ অধ্যায়। আর ভালোবাসা চাই না। অনেক চেয়েছিলাম কিন্তু দেয়নি। এখন একটু শান্তিতে মরতে চাই।”
​সেই পর্যায়ে এরোজ আর জবাব খুঁজে পেল না। মৃত্যু আর সুখের দ্বন্দ্বে হেরে যাওয়ার ভয়ে কুঁকড়ে গেল অন্তঃস্থল। জবাবহীনতায় মৌনতার মুখে হাসি ফুটে উঠল। চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল,
​–“কী হলো, মিথ্যা সান্ত্বনারাও বুঝি আজ কথা হারালো? জীবনে যত যাই হোক অন্তত কাউকে মিথ্যা আশা দেখাবেন না। দশটা দুঃখ দিলেও যত না কষ্ট হয়, তার থেকেও বেশি কষ্ট হয় আশা ভঙ্গ হলে।”
​মৌনতা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেল টেবিলে। এরোজ বলহীন দেহে অদূরে গগনে চেয়ে রইল। ওই উপরওয়ালার প্রতি ইদানিং অগাধ বিশ্বাস আর ভরসা জন্মেছে তার মনে। কিছু হলেই তার দুয়ারে লুটিয়ে পড়ে দেহ-মন। জানা নেই কেন! কিন্তু সে বড্ড আশা করে ওই অস্পর্শী শক্তির উপর। একদৃষ্টিতে চেয়েই ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,

​–“আপনি কি আরও একবার আমায় ভেঙে চুরমার করে দেবেন? যদি তাই হয়ে থাকে, তবে আমায় আগে নিয়ে নিন। কিন্তু আমার চোখের সামনে তার কিছু হলে আমায় দুইবার মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে, যা সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই।”
​–“এখানকার খাবার খাওয়া কি উচিত হবে?”
​কারোর ভাঙা কণ্ঠে এরোজ এগিয়ে আসল অতি নিকটে থাকা রাউন্ড টেবিলটির দিকে। টেবিলে বসতে বসতে থমথমে মুখে বলল,
–“এখানে অসুস্থ, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষদের জন্য আলাদা মেনু থাকে। আপনার উপযোগী খাবারই আনা হয়েছে।”
​–“ওইসব স্বাদহীন ঘাসপাতা?”
​মৌনতার ত্যক্ত কণ্ঠে এরোজ মুখ তুলল। গম্ভীর মুখে বলল,
–“আপনি না মাত্রই খুব যত্ন দেখাচ্ছিলেন নিজের খাওয়া নিয়ে? তবে এখন আবার নাক সিঁটকাচ্ছেন কেন?”
​মৌনতা বাচ্চাদের মতো ছোট মুখ করে এগিয়ে আসে। পাণ্ডুর মুখে বলে,
–“খাবার দেখলেই আমার বমি আসে। খেতে খুব কষ্ট হয়। তাই ভেবেছিলাম হেলদি খাবারের বাহানা দিয়ে এখন খাবার খাবো না। কিন্তু আপনি তো উদ্ভট মানুষ! জগতে যা কিছু বিরল তা আপনি সহজলভ্য করে দেন, কী করে যেন!”

​এরোজ শান্ত দৃষ্টি ফেলল চোরের মতো মুখ লুকানো নারীটির দিকে। থমথমে মুখে খাবারের প্লেটটা এগিয়ে দিতেই মৌনতা চোখমুখ কুঁচকে নিল। মাইক্রোগ্রিন, বিনস, স্যূপ আর ফলের জুস রয়েছে। বাঁচতে হলে এগুলো তাকে খেতে হবে—নিদারুণ এই বাধ্যবাধকতা নিয়েই মৌনতা খাবার মুখে তোলে। এরোজ খেতে খেতে হঠাৎ করেই বলে উঠল,
​–“রেননের প্রথম স্ত্রী খুব সুন্দরী ছিল। রেনন তাকে পাগলের মতো ভালোবাসত, কিন্তু তার স্ত্রী একাধিকবার অন্য সম্পর্কে জড়ায়। তবুও রেনন তাকে ভালোবেসে সম্পর্ক ধরে রাখে। তবে একার কন্ট্রিবিউশনে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। রেননও পারেনি। একদিন ওর স্ত্রী তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে চলে যায় তাকে ছেড়ে।”
​মৌনতার খাওয়া থেমে যায়। চামচ হাতে সে অবাকপানে তাকায় এরোজের দিকে। তার বিবর্ণ মুখ দেখে এরোজ মৃদু হাসল। বেদনাভরা কণ্ঠে বলল,
–“সব পুরুষ খারাপ হয় না। শুধু সামনের মানুষটাকে চেনার মতো, আর বোঝার মতো সঠিক জ্ঞান আর ইচ্ছা থাকা প্রয়োজন। যা আপনার মাঝে নেই।”
​মৌনতা সরু নেত্রে তাকাল। তার দৃষ্টি প্রশ্নবিদ্ধ! কাকে বোঝার সঠিক জ্ঞান আর ইচ্ছা তার নেই? এরোজ কেন এই কথা বলল?

​–“খাচ্ছেন না কেন? খাবার ঠান্ডা হয়ে গেলে কোনো উপকারেই আসবে না।”
​এরোজের কথায় মৌনতা নড়েচড়ে উঠে খাবার মুখে দিল। আড়চোখে চেয়ে শুধাল,
–“নায়েল আসছে না কেন?”
​–“খেলছে। খেলা শেষে আমি খাইয়ে দেবো।”
​মৌনতা আর কথা বাড়াল না। দীর্ঘ দেড় মাস যে তার সন্তানের খেয়াল রেখেছে, তার উপর কোনো বাধানিষেধ আরোপ করার মতো নিচু কাজ করা ঠিক হবে না। তবে তার অন্তঃস্থল আবার প্রশ্নবিদ্ধ হলো। এরোজ কেন তার আর তার সন্তানের জন্য এত করছে? ক্রমেই শঙ্কিত হয়ে পড়ছে! দীর্ঘ দেড় মাসে যা তার অগোচরে ছিল, আজ একটু একটু করে সবটা কেমন অস্বস্তিকর হয়ে ধরা দিচ্ছে তার কাছে।
​হাসপাতালের বেডে বসে জানত, তার সব যত্ন-খেয়াল পরিবার নিচ্ছে। আর এরোজ শুধুই তপোবন ভাইজানের আদেশ পালন করছে এবং নিজের ভাইয়ের করা কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করছে। কিন্তু চোখ যে অন্য কিছু বলে, আচরণ যে অন্য কিছুর আবদার করে। আর আজ এই শঙ্কা আরও তীব্র হয় যখন এরোজ নিজেকে নায়েলের পাপা হিসেবে সম্বোধন করে। পরিস্থিতি ক্রমেই যেন জটিল হয়ে যাচ্ছে। আদতে এরোজ কাকে বোঝার জন্য বলছে?
​মৌনতা হাঁসফাঁস করে উঠল নিজেকে করা প্রশ্নেই। অস্থির চিত্তে খাবার খেতে গেলে তা নাকেমুখে উঠে গেল। সহসা সে ছটফট করে উঠল। এরোজ ভয়ার্ত দৃষ্টি ফেলে ছুটে এলো কাছে। মাথাটা আগলে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে শুধাল,
–“কী হলো, এত তাড়াহুড়া করে খেলেন কেন?”

​এরোজ দ্রুত পানি খাইয়ে দিয়ে পিঠে চাপড় দিল। কাশতে কাশতে মৌনতার চোখে পানি এসে গেল। দীর্ঘ দুই মিনিট পর তার ছটফটানি কমল। মৌনতা স্বাভাবিক হতেই এরোজ রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে ধমকে উঠল,
–“আপনি কবে নিজের ভালো বুঝবেন? এত তাড়াহুড়া করে খাওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? আপনাকে আমি তাড়া দিয়েছি? আপনার কি একটুও মায়া হয় না আমার উপর? দিনরাত আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি আপনাকে একটু সুস্থ করার জন্য আর আপনি ততই নিজের উপর অনীহা দেখাচ্ছেন।”
​মৌনতা টলটলে নেত্রে চেয়ে বলল,
–“আমি কি ইচ্ছে করে করেছি নাকি? হঠাৎ নাকে উঠে গিয়েছে। বকছেন কেন?”
​এরোজ ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ফেলে ফোঁস ফোঁস করতে করতে নিজের সিটে বসে পড়ল। চোখটা টলটল করছে তার। মৌনতা নাক টানতে টানতে আবার খাবার খেতে লাগল। ভোরের একদম প্রথম প্রহর হওয়ায় মানুষ খুব একটা নেই। মৌনতা খেতে খেতে আড়চোখে চাইল সম্মুখের রাগী মানুষটার দিকে। সহসা রক্তাভ ক্রুদ্ধ চোখে চোখ পড়ে গেল। মৌনতা তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

​–“তোমায় আমি এতবার করে বলছি এসব এরোজ করেছে, তবুও তুমি কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছো না কেন, ইমরোজ?”
​সৃজার রাগান্বিত স্বরে ইমরোজ বিতৃষ্ণাভরা কণ্ঠে বলল,
–“বোকার মতো কথা বলছ কেন সৃজা? এরোজ দেশে আছে? তোমার কাছে কোনো প্রমাণ আছে যে এগুলো এরোজ করেছে? তবে আমি কিসের ভিত্তিতে এরোজের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেব?”
​সৃজা নিরুত্তর। তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই। এমনকি ওই কল রেকর্ডও নেই। সে বলল,
–“তুমি তোমার ভাই তপোবনের সাথে কথা বলো। তার ছোট ভাই এগুলো করেছে, তাকে আমার গাড়ি কিনে দিতে বলো।”
​–“তারাও প্রমাণ চাইবে সৃজা।”
​–“তবে আমার গাড়ি ঠিক করে দাও।”, সৃজা অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে বলল।
​–“ওই গাড়ি ভাঙারিতে বিক্রি করার মতো অবস্থাও নেই সৃজা। কেন বাচ্চাদের মতো করছ? যা গিয়েছে যাক। আমরা একবার নিজেদের কোম্পানি দাঁড় করাতে পারলে এমন আরও পাঁচটা গাড়ি কিনতে পারব।”
​–“ততদিনে আমি বুড়ো হয়ে যাব। তোমার কাজের যা গতিবিধি! তুমি বলেছিলে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা হলেই তুমি আমার নামে বাড়ি কিনবে। তাও করোনি তুমি।”
​ইমরোজ কপাল কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

–“তোমার এত সন্দেহ আমার উপর? আই কান্ট বিলিভ সৃজা! আমি ভাবতাম আর যাই হয়ে যাক না কেন তুমি আমার উপর বিশ্বাস করবে।”
​–“কিসের বিশ্বাস করব তোমার উপর? সম্পত্তি পেয়েছ আজ কতদিন? কিছু করতে পেরেছ?”
​ইমরোজ ভীষণ দাম্ভিকতার সাথে বলল,
–“আগামীকাল আমাদের নতুন বাড়ি কেনার ফাইনাল বৈঠক। কাল দলিল হস্তান্তর করা হবে আমাদের কাছে। যেই বাড়ি থেকে আব্বু আমায় বের করে দিয়েছে, আজ তার থেকেও বড় বাড়ির মালিক আমি।”
​সৃজা আশ্চর্য হয়ে গেল ইমরোজের কথায়। সে আচমকা ছুটে এসে ইমরোজের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। উপচেপড়া উল্লাস আটকে বলল,

–“তুমি সত্যি বলছ? আগামীকাল আমাদের বাড়ির কাগজ হস্তান্তর করা হবে? কিন্তু কোন বাড়ি? তুমি তো আমায় কিছুই বললে না এই ব্যাপারে।”
​–“গাড়ি হারিয়ে মন খারাপ ছিল তোমার, তাই ভেবেছিলাম তোমায় সারপ্রাইজ দেব। কিন্তু এখন বুঝলাম আমার ভাবনা ভুল ছিল। তুমি তো আমায় অকর্মা ভেবে বসে আছো।”
​ইমরোজের গুরুগম্ভীর কণ্ঠ। সহসা সৃজা আঁকড়ে ধরল ইমরোজের হাত। আদুরে গলায় বলল,
–“আমি ডিপ্রেসড ইমরোজ। তাই মুখে যা আসে তাই বলে ফেলেছি। তোমার দেয়া এত দামী উপহার ছিল গাড়িটা। সেটা আমি হারিয়ে ফেলেছি—মন খারাপ হবে না? আমি তো তোমায় আর তুমি জুড়ে সবকিছুকে খুব ভালোবাসি।”
​এতটুকুই যথেষ্ট ছিল ইমরোজের রাগ গলানোর জন্য। ইমরোজ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
–“আমি জানি। তবে তোমার থেকে পাওয়া ছোট আঘাতও আমায় অনেক কষ্ট দেয়। তোমার জন্য আমি আমার পুরো পৃথিবী ছেড়ে দিয়েছি সৃজা। প্লিজ আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারাবে না।”
​সৃজা প্রগাঢ় হেসে তার হাতের উল্টো পিঠে চুমু দিয়ে বলল

–“কখনো না। তুমি আমায় এখন এটা বলো আমাদের বাড়ি কেমন? কত বড়? লাক্সারি তো?”
​–“ডুপ্লেক্সের একদম লাক্সারি টাইপের একটা বাড়ি। আগামীকাল যখন দেখবে তখন চোখ ফেরাতে পারবে না।”, ইমরোজ তার গালে হাত রেখে বলল। সৃজা সতর্ক দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
–“কার নামে কিনছো?”
​প্রসঙ্গটি আসতেই ইমরোজ স্বগৌরবের সাথে বলল,
–“নায়েলের নামে।”
​সৃজা স্তব্ধ হয়ে গেল ইমরোজের জবাবে। হতভম্ব হয়ে শুধায়,
–“নায়েলের নামে মানে?”
​–“হ্যাঁ, কী সমস্যা? আব্বু-ভাইজান ভাবে আমি নায়েলকে ভালোবাসি না। কিন্তু আমি জানি আমি নায়েলকে কতটা ভালোবাসি। ওর নামেই বাড়িটা কিনব। নায়েলকে যখন নিয়ে আসব তখন ও এখানে থাকবে।”
​সৃজা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। হন্তদন্ত হয়ে বলল,

–“ইমরোজ তুমি পাগল হয়ে গিয়েছ ইমরোজ? তকদির আঙ্কেল, তপোবন ভাইজান সবাই তোমার বিরুদ্ধে। তারা কোনোভাবেই নায়েলকে তোমার কাস্টডিতে আসতে দেবে না। বাই এনি চান্স মামলায় তুমি যদি কোনোভাবে হেরে যাও আর নায়েল মৌনতার হয়ে যায়—তবে পুরো বাড়িটা নায়েলের নাম করে মৌনতার হয়ে যাবে।”
​সহসা ইমরোজের টনক নড়ল। ভাবুক কণ্ঠে বলল,
–“তুমি তো ঠিক কথা বলেছ সৃজা। এই কথা তো আমি আগে ভাবিনি।”
​–“তাড়াতাড়ি ভাবো। বাড়ির কাগজপত্র যদি নায়েলের নামে হয়ে যায়? তাড়াতাড়ি তাদের ফোন করে জানাও। আর তুমি তো বলেছিলে, বাড়িটা আমার নামে করবে। আমার নামে করতে বলো।”
​কিন্তু এই কথায় সায় জানাল না ইমরোজ। সে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে নাকচ করে বলল,
–“নাহ, বাড়ির মতো বড় সম্পত্তি তোমার নামে করা যাবে না। এখানে অনেক ঝামেলা আছে। তোমার নামে করলে তোমার বিপদ বেড়ে যাবে। আমি ওনাদের সাথে একটু কথা বলে আসি, তুমি থাকো।”

​ইমরোজ ফোন নিয়ে হুইলচেয়ার টেনে বারান্দায় চলে গেল। অন্যদিকে সৃজা! সে চোয়াল শক্ত করে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল ইমরোজের দিকে। সম্পত্তি পাওয়ার আগে সবসময় বলত, সব তার নামে করে দেবে। অথচ যেই সম্পত্তি পেল, সব নিজের আর নিজের মেয়ের নামে করতে ব্যস্ত! তার নামে করতে গেলেই বিপদ হয়ে যাবে? ইমরোজ কি তার সাথে কোনো খেলা খেলছে? কিন্তু এই খেলা কতদিন টিকবে? সে যে এই খেলার পুরোনো খেলোয়াড়! বাঁকা হাসল সৃজা।
​একত্রে মেঘ ছোঁয়া, গাঁ ঘেঁষে পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটা, সমুদ্রের পাড়ে একে অপরের হাত ধরে পা ভিজিয়ে সম্পর্কের নতুন সুর তোলার সংকল্পের আজ তৃতীয় রাত।
​দীর্ঘ এক পথ পাড়ি দিয়ে তখন দুটি তনু-মন সিক্ত হচ্ছে সমুদ্রের গর্জন আর শীতল স্পর্শে। একে অপরের হাত ধরে পা ভিজিয়ে বালু মাড়িয়ে এগিয়ে চলা মানব-মানবী নির্বাক, শুধু অনুভূতির তীব্রতা অনুভব করছে। সমুদ্রের এক একটা গর্জন জানান দিচ্ছে নারীটির অন্তরেরও ঠিক একই অবস্থা!
​পরনে বেবি পিংক রঙা ফতুয়া, স্কার্ফ আর সাদা স্কার্ট। স্কার্টটি অর্ধেকটা ভিজে উঠেছে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের ঝাপটায়। তবুও সমীরণের তীব্রতায় তা উড়ছে। হাতের কব্জিতে ঝুলতে থাকা কড়ি আর পাথরের তৈরি ব্রেসলেটটি তখন অবাধে রুনুঝুনু শব্দ করে যাচ্ছে।
​রূপকথা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় একমনে হাঁটতে থাকা মানুষটির দিকে। ভীষণ আদর আর কৃতজ্ঞতার সাথে হাত ছেড়ে কনুই জড়িয়ে ধরল দু’হাতে। আদুরে স্বরে বলল,

–“তানশানের পাপা, থ্যাংক ইউ।”
​তপোবন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় এই পর্যন্ত সাতবার থ্যাংক ইউ বলা মেয়েটির পানে। কত অল্পতেই খুশি—অথচ মেয়েটির জগতের কলুষহীন সুখ প্রাপ্য। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায় সে জুড়ে গিয়েছে তার মতো খুঁতযুক্ত ব্যক্তির সাথে। সে মৃদু হেসে একহাতে জড়িয়ে নিল মেয়েটিকে। চলতে চলতে অদূরে সমুদ্রের পাড়ে থাকা ছোট ছোট স্টলগুলোর দিকে চেয়ে বলল,
–“আপনি কিন্তু আমায় তপোবন বলতে পারেন মুরুব্বি। আফটার অল আপনি আমার মুরুব্বি!”
​এই মুরুব্বি যে প্রিয়তম স্ত্রী নির্দেশ করে, তা এতদিনে বুঝে গিয়েছে রূপকথা। সে তৎক্ষণাৎ নাকচ করে বলল,
–“নাহ।”
​–“কেন?”, তপোবন ভ্রু কুঁচকে নিল। রূপকথা অলস দেহে চলতে চলতে বলল,
–“তানশানের পাপাতেই আপনাকে ভালো মানায়।”
​–“রূপকথার তপোবনে আমায় ভালো মানায় না?”, তপোবনের হতাশার সুরে বলা কথাটিতে রূপকথা মিটিমিটি হেসে বলল,

–“উহু, আপনাকে রূপকথার বুড়োতেই ভালো মানায়। আপনি রূপকথার ‘বুড়ো’ আর রূপকথা আপনার ‘মুরুব্বি’।”
​বলেই সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। তপোবনের মুখেও সেই হাসি সংক্রমিত হয়। আলগোছে আরেকটু নিবিড়ভাবে জড়িয়ে নিয়ে বলল,
–“কখনো বিশেষ কোনো মুহূর্তে তপোবন বলেই ডাকতে পারেন।”
​–“সেই কখনো বিশেষ মুহূর্ত আগে আসুক।”
​–“এখনো আসেনি?”, তপোবন বিমর্ষ মুখে শুধাল। রূপকথা ডানে বামে মাথা নাড়ল। তপোবন হতাশ হলো বেশ!
​দু’জনে এগিয়ে গেল স্থানীয় কিছু ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র নিয়ে বসা স্টলের দিকে। রূপকথা সেখান থেকে বাড়ির সবার জন্য উপহার কিনে হোটেলে ফিরল।
​সময় গড়ায়, মৌনতার মনের শঙ্কা ততই তীব্রতর হয়। হাজার ভিড়ের মাঝেও নিজের উপর নিবদ্ধ কারোর নির্নিমেষ দৃষ্টি জানান দেয় অন্তরের ব্যাকুলতা।
​দুপুর দেড়টা। বসার ঘরে নিশান্ত তখন আধশোয়া হয়ে নেটফ্লিক্স দেখছিল টিভিতে আর ফোনে গেম খেলছিল। মৌনতাকে মানুষের মাঝে যেতে না দিলেও এরোজ যখন না থাকে সে তখন বাইরে বের হয়। নায়েল তখন নিভার সাথে চাইল্ড কেয়ারে। মৌনতা নীরবে গিয়ে নিশান্তের পাশে বসতেই নিশান্ত চমৎকার হেসে বলল,

–“ভাবি, শরীর ভালো লাগছে?”
​মৌনতা নির্বাক মাথা নেড়ে সায় জানাল। নিশান্ত পা দোলাতে দোলাতে নিজ মনে ফের শুধাল,
–“এই বাড়িতে থাকতে মজা না বলো?”
–“হুম।”
–“খুব মজা ভাবি। আমি তো বছরের বেশিরভাগ সময় ব্রোর কাছেই থাকি। আনলিমিটেড ভিডিও গেমস, সুইমিং পুল, জিম, আর ওয়াইন…কী নেই এই বাড়িতে!”
​নিশান্তের প্রফুল্ল চিত্তে বলা কথায় মৌনতা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
–“তুমিও নেশা করো নিশান্ত?”
​নিশান্ত মাথা চুলকাল নিজের বোকামিতে। একবার কথা বললে আর থামানো যায় না নিজেকে। সে বোকাসোকা হেসে বলল,
–“ওই ভাবি…না মানে আরকি ভাই যখন আগে খেত, তখন তার সাথে মাঝেমধ্যে একটু খেতাম।”
​–“তুমি আমায় এখনো ভাবি বলে ডাকো কেন?”
–“কারণ তুমি আমার ভাবি তাই।”
–“আমি তোমার ভাবি নই, নিশান্ত।”, মৌনতার শক্ত কণ্ঠে নিশান্ত মেকি হেসে বলল,
–“তুমি আজীবন আমার কাছে আমার ভাবি হয়েই থাকবে।”
​মৌনতা সময় নিল কথা গোছাতে। এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাতেও তার সংকোচ বোধ হচ্ছে। তবুও অন্তঃস্থলের উচাটন দমাতে হবে। সে বুকভরা নিঃশ্বাস ফেলে শুধাল,

–“একটা সত্যি কথা বলবে নিশান্ত?”
–“অবশ্যই, বলো ভাবি।”
–“তোমার ভাই কাকে ভালোবাসত?”
​মৌনতার প্রশ্নে নিশান্ত সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল। চাপা কণ্ঠে শুধাল,
–“কোন ভাই, ভাবি?”
​–“আমার সাথে মজা করবে না নিশান্ত। তুমি ভালো করে জানো আমি কোন ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করছি।”, মৌনতা গম্ভীর মুখে বলল। নিশান্ত বোকাসোকা হেসে বলল,
–“ব্রো?”
​পরপরই অপ্রস্তুত হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
–“আমি…মানে…না ভাবি আরকি আমি তেমনভাবে জানি না ভাই কাকে ভালোবাসত! তবে কাহিনী জানি।”
​মৌনতা অসন্তুষ্ট হলো তার জবাবে। নম্র স্বরে বলল,
–“তুমি সত্যিই জানো না?”
–“না ভাবি।”
–“কাহিনী কী ছিল বলতে পারো?”
​নিশান্ত পড়ল মহা বিপদে। ভাই যদি জানে সে কিছু বলেছে তবে তার খবর আছে! সে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল,

–“ওই একজনকে ভালোবাসত আরকি। বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু প্রস্তাব পাঠানোর আগেই তার বিয়ে হয়ে যায়।”
​–“কার সাথে বিয়ে হয়? কিছু জানো?”, মৌনতা উদগ্রীব হয়ে শুধাল। নিশান্ত দাঁত কেলিয়ে না-বোধক মাথা নাড়ল। মৌনতা ফোঁস করে ব্যর্থ নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় পিঠ এলিয়ে দেয়।
​ব্যর্থতার রেশে পাণ্ডুর মুখশ্রীর পানে আড়চোখে তাকায় নিশান্ত। শুধায়,
–“কিন্তু তুমি এগুলো কেন জানতে চাইছ?”
​মৌনতা বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
–“এমনিই।”
​তন্মধ্যেই কলিং বেল বাজল। নিশান্ত উঠতে উঠতে বলল,
–“তুমি বসো ভাবি। আমি দেখছি কে এসেছে।”

​সে চলে যায়। তখনি মৌনতার পাশেই সোফায় রাখা নিশান্তের ফোনে শব্দ হলো। মৌনতা আনমনে সেদিকে তাকালে দৃষ্টি হকচকায় ইমরোজের নাম দেখে। না চাইতেও কৌতুহল আছড়ে পড়ে বদনে। ফোনটা অন করাই ছিল। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা হাতে নিয়ে নোটিফিকেশন বার চেক করে বুঝতে পারল, ফেসবুকে ইমরোজ কিছু পোস্ট করেছে—তার নোটিফিকেশন এসেছে। আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লিক করল সেখানে।
​দৈবাৎ ভেসে উঠল দুটি হাস্যোজ্জ্বল মুখশ্রী একে অপরকে ঘনিষ্ঠভাবে আঁকড়ে ধরে আছে একটা বিলাসবহুল বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। ক্যাপশনে লেখা, “আমার গোটা পৃথিবী যাকে আমি অনেক মূল্যবান কিছুর বিনিময়ে পেয়েছি…তবুও পেয়েছি। তার জন্য ছোট্ট একটা উপহার।”
​ছবিটা নিগুঢ় চোখে দেখতে দেখতেই মৌনতার অক্ষিপটে ভাসে নিজের বিদঘুটে চেহারা, নিজের ছোট্ট মেয়েটার বাবার জন্য করা আর্তনাদ। দেহ অস্থিরভাবে গরম হতে লাগল তার, চোখের সামনে সবটা ঝাপসা হয়ে আসে অচিরেই। দেহ ভারসাম্যহীন হতেই মৌনতা অসহায়ত্বভরা একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মানুষটা আজো তাকে অসহনীয় বেদনা দেয়ার ক্ষমতা রাখে!
​সদর দরজা খুলতেই এরোজকে দেখে নিশান্ত চমৎকার হাসল। উদগ্রীব কণ্ঠে বলল,

–“ব্রো, জানো কী হয়েছে? আজ ভাবি জিজ্ঞেস করেছে তুমি কাকে ভালোবাসতে।”
​এরোজ শ্রান্ত দেহে ম্লান হেসে বলল,
–“যেদিন অনুভব করতে পারবে সেদিন প্রশ্ন করা ছেড়ে দেবে। কিন্তু সেটাই যেন আমার জন্য স্বপ্ন! মানুষটা আমায় কখনো অনুভব ই করে না। কখনো আমার চোখের দিকে তাকায়না। দেখে না কেউ তার অপেক্ষায় গলা কাঁটা মুরগীর মতো ছটফট করছে।
​বলেই সে নিশান্তকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকল। কিন্তু বসার ঘর পর্যন্ত যেতেই সে স্তব্ধ হয়ে গেল মেঝেতে পড়ে থাকা অচেতন দেহটি দেখে। এরোজ আচমকা ছুটে গেল। উদ্বিগ্ন চিত্তে আওড়ালো,
–“মৌনতা? এই মৌনতা কী হলো আপনার?”
​এরোজ সবেগে অচেতন দেহটিকে বুকে জড়িয়ে নিতেই দেখল নাক গলিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। পুরুষালী দেহ থমকে যায়। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“তার কী হয়েছে নিশান্ত? কীভাবে হয়েছে? আমি তো দশ মিনিট আগেও তার সাথে কথা বললাম।”
​নিশান্ত হতবাক হয়ে বলল,

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৭ (২)

–“ব্রো, আমরা এক মিনিট আগেও কথা বলেছি।”
–“আচমকা তবে কী হলো?”
​এরোজ হন্তদন্ত হয়ে মৌনতাকে কোলে তুলতেই দেখল তার দেহের নিচে নিশান্তের ফোন পড়ে আছে। স্ক্রিনে ভাসছে ইমরোজ আর সৃজার আলিঙ্গনরত একটা ছবি। এরোজের বুঝতে বাকি রইল না হঠাৎ অসুস্থতার কারণ! নিশান্তের দিকে এক পলক রক্তচক্ষু নিক্ষেপ করে সে তৎক্ষণাৎ অচেতন দেহটিকে নিয়ে ছুটল গাড়ির দিকে।

অপরাহ্নে উপসংহার পর্ব ৫৮ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here