Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১০

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১০

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১০
রিদিতা চৌধুরী

দরজাটা সজোরে লেগে যেতেই ঘরজুড়ে নেমে এলো নিস্তব্ধতা, যা সৌহার্দ্যের বুকের ভেতর জমানো দীর্ঘশ্বাসটাকে আরও ভারী করে তুলল। মাথার দপদপানিটা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে, যেন প্রতিটি স্পন্দন তার অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। অথচ কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই নিজের এই আচরণের ওপর এক তীব্র বিতৃষ্ণায় সে চোখ শক্ত করে বন্ধ ফেলল!
​রিদির কপালে সেই স্পর্শটুকু—যেন এখনো তার ঠোঁটে লেপ্টে আছে। একটা শিহরণ খেলে গেল তার শরীরে। কেন করল সে এমনটা? মস্তিষ্ক আচ্ছন্ন ছিল—এই অজুহাতটা তো কেবল নিজেকেই ধোঁকা দেওয়া। সে তো জেগে ছিল, পূর্ণ সচেতনতা নিয়েই মেয়েটার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়েছে। এই উপলব্ধিটাই তাকে দংশন করতে লাগল। ছিঃ!

​নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগে সৌহার্দ্য বালিশে সজোরে একটা ঘুষি মারল। আর মুহূর্তেই তার আহত হাতটায় চিনচিনে ব্যথায় যন্ত্রণার ঢেউ খেলে গেল। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু মনের ভেতরের তোলপাড় থামল না। অস্ফুট স্বরে, নিজের কাছেই কৈফিয়ত দেওয়ার মতো করে বিড়বিড় করে উঠল, “সো হোয়াট? আমার বউ হয় ওটা। “আই হ্যাভ এভরি রাইট টু টাচ হার।”
এদিকে সৌহার্দ্যর রুম থেকে বের হয়ে ,দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে রিদি বুক ভরে শ্বাস নিল, যেন নিজের হৃদস্পন্দনকে বশে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। মানুষটার তেজ দেখলে গা জ্বলে যায়! মাথা ফেটে রক্ত, হাত ভেঙেছে—তবুও তার মেজাজের ধার এতটুকু কমেনি। সারাদিন শুধু “গেট আউট” শুনতে শুনতে তার কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। রাগে গজগজ করতে করতে পা দাপিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতেই ধাক্কা খেল আমেনা খালার সাথে।
​আমেনা খালা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “কি হইলো, ছোট আম্মা? এমুন হুড়াহুড়ি করতাছো ক্যান? ছোট স্যার ঠিকঠাক আছে তো?”

​রিদি নিজের মনের ভেতরের তোলপাড় আর অস্বস্তিটুকু আড়াল করার জন্য চটজলদি মুখে একটা স্বাভাবিক ভাব ফুটিয়ে তুলল। একটু আমতা আমতা করে বলল, “হুম খালা, উনি ঠিক আছেন। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে, রাতের খাবারের সময় পেরিয়ে গেছে খেয়ালই ছিল না! ইশ, কিভাবে যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! খালা, আমি রান্না ঘরে গেলাম আপনি আসেন—আম্মুর আবার ওষুধ খাওয়ার সময় হয়েছে, উনিও তো উঠে গেছেন। কিছু একটা তৈরি করে দিতে হবে তো!”
কথা গুলো বলে ,​রিদি রান্নাঘরের দিকে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিল, আমেনা খালা পেছন থেকে ডাক দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,

“এত হুড়াহুড়ি করতে হইবো না ছোট আম্মা। বড় বউ সব রান্নাবান্না তো শেষ কইরাই রাখছে, এখন শুধু বড় ভাবীর জন্য রুটি কয়টা সেঁকা বাকি। তোমার চিন্তা করণ লগবো না, ওইটা আমি কইরা দিমু নি!”
​রিদি কোন প্রতিউত্তর না করে, রান্নাঘরে ঢুকে নিজের মনের চঞ্চলতাকে ব্যস্ততায় ঢেকে ফেলল। শাহেদা চৌধুরীর জন্য দুটো রুটি সেঁকে নিয়ে সে ফ্রিজ থেকে চিকেন বের করল। সৌহার্দ্যর জন্য সুপ বসানোর পাশাপাশি তার প্রতিদিনের সেই গ্রিন সালাদটাও গুছিয়ে নিতে লাগল। রিদি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না, মানুষটা এই পানসে লতাপাতা খেয়ে কী তৃপ্তি পায়! অথচ তার এগুলোর দিকে তাকালেই বিরক্তির পারদ যেন আরও বেড়ে যায়। রিদি রাগে বিরবির করে বলল, “দিনরাত এসব ঘাসপাতা খেলে মেজাজ ভালো থাকবে কেমন করে!”
বাড়ির সবাইকে রাতের খাবার খাইয়ে রিদি সৌহার্দ্যের জন্য সুপ আর সালাদের ট্রে-টা হাতে নিল। দরজার কড়া নাড়ল না, বরং এক হাতে কোনোমতে ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের মৃদু আলোয় দেখা গেল, সৌহার্দ্য বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে বাঁ-হাতে ল্যাপটপে কিছু একটা টাইপ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। তার চেহারার অভিব্যক্তিই বলে দিচ্ছে, এই কাজটা তার জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক।

​দরজার শব্দে মাথা তুলে তাকাল সে। রিদিকে হাতে খাবার নিয়ে ঢুকতে দেখে সৌহার্দ্যের কপালে বিরক্তির ভাঁজ গভীর হলো। চোখ সরু করে শীতল স্বরে বলল, “আবার কেন? কী চাই এখানে?”
​রিদি তার এই রুক্ষ আচরণকে পাত্তাই দিল না। শান্ত পায়ে ট্রে-টা নিয়ে বিছানার পাশে বসল খুব শান্ত ও স্বাভাবিক স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি নিজে খেতে পারবেন, নাকি আমি খাইয়ে দেব?”
​সৌহার্দ্যের কণ্ঠে সেই চেনা বিষাক্ত সুর, “আই ক্যান ইট বাই মাইসেল্ফ। আমার কোনো সিম্প্যাথির দরকার নেই। গেট আউট!”
​কথাটা বলেই সে বাঁ-হাত দিয়ে চামচ তুলে খেতে খাবার গুলে মুখে তুলার চেষ্টা করল, কিন্তু হাতের ব্যথায় এবং অসাবধানতায় বারবার ব্যর্থ হতে লাগল। রিদি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল, তার ভেতরে রাগ আর অভিমান মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। অপমানিত বোধ করে সে যখন উঠে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে,
ঠিক তখনই সৌহার্দ্যের গমগমে কণ্ঠস্বরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।

​”ইউ দেড় ব্যাটারি, খাইয়ে দাও!”বাট বিওয়্যার, ডোন্ট লেট ইয়োর হ্যান্ড টাচ মি।”
​কথাটা এমনভাবে বলল যেন রিদির হাতে খাবার খাওয়াটা তার কাছে বড় কোনো বিড়ম্বনা, যেন সে বাধ্য হয়ে, নিরুপায় হয়েই তার সাহায্য নিচ্ছে। তার এই দম্ভ আর কৃত্রিম কাঠিন্যের আড়ালে যে অসহায়ত্বটুকু লুকিয়ে ছিল, তা রিদির নজর এড়াল না। সৌহার্দ্য এমন একটা ভাব করল যেন সে খুব অনিচ্ছুক!
সৌহার্দ্যের এমন উদ্ধত আচারনে রিদির ভেতরটা রাগে রি রি করে উঠল, বুকের ভিতরটা চিন চিন ব্যাথা অনুভব করলো, এই যন্ত্রণা হয়তো কাওকে বুঝানো সম্ভব না। দাঁতে দাঁত চেপে সে ফোঁস করে বলে উঠল, “অসভ্য! অহংকারী লোক! নিজের খাওয়া নিজে খাওয়ার ক্ষমতা যখন নেই, তখন এমন নাটক করার মানে হয় না। আমি এখন পারব না আপনাকে খাইয়ে দিতে!”

​রিদি রাগে গজগজ করতে করতে ট্রে নিয়ে চলে যেতে উদ্যত হলো। ঠিক তখনই সৌহার্দ্য কোনো বাড়তি কথা না বলে, নিস্পৃহ স্বরে শুধু বলল, “ওকে, দেন। ওসব নিয়ে যাও।” বলেই সে একপাশে ফিরে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করল।
​রিদি বুঝলো এই বেয়াদব লোকের সাথে জিদ দেখিয়ে ও সুবিধা করতে পারবেনা। মুহূর্তের মধ্যে রাগ আর অভিমান বিসর্জন দিয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ট্রে-টা নামিয়ে রাখল। সৌহার্দ্যের সামনে বসে কাঁপা কাঁপা হাতে চামচটা তুলে নিল সে। জীবনে এই প্রথম কাউকে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছে, তাও আবার নিজের স্বামী! এক অদ্ভুত অনুভূতি—উত্তেজনা আর সংকোচের এক মিশ্র দলা তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে গেল। এক গভীর অস্থিরতার মাঝেও এক অদ্ভুত মমতায় সে সৌহার্দ্যের ঠোঁটের কাছে সুপ নিয়ে গেল। পরম যত্নে খাইয়ে দিলো!
​খাওয়া শেষ হতেই না হতে সৌহার্দ্য আগের মতো সেই বিরক্তির সুর টেনে বলল, “হয়েছে, এবার গেট লস্ট!”
​রিদির মনের গহীনে জমে থাকা ক্ষোভ যেন বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। তিরতিরে কণ্ঠে, আগুনের মতো জ্বলে ওঠা চোখে সে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনার মতো অকৃতজ্ঞ, ইতর আর ছোটলোক আমি জীবনেও দেখিনি! অসভ্য লোক!”

​কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে সে দপদপ পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল!
সৌহার্দ্য কোনো প্রতিউত্তর করলো না, কেবল “স্থির, নির্লিপ্ত দৃষ্টি নিয়ে” নিয়ে সে রিদির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল! কিছ্ক্ষণ পর সে নিজে নিজে বিরবির করে বলন,
অ্যাটাচমেন্ট ইজ আ ডেঞ্জারাস থিং। ওয়ান্স ইউ গেট ট্র্যাপড ইন ইটস বন্ড, ইউ বিগিন টু লুজ ইয়োরসেলফ। দ্যাটস হোয়াই আই, ডক্টর সৌহার্দ্য চৌধুরী, উইল নেভার নোয়িংলি ফল ইনটু দ্যাট ট্র্যাপ।
(মায়া বড় ভয়ংকর জিনিস। একবার তার বাঁধনে জড়িয়ে পড়লে মানুষ নিজেকেই হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। তাই জেনেশুনে সেই মায়ার ফাঁদে আমি, ডাঃ সৌহার্দ্য চৌধুরী, কখনোই পা দেব না।)
সৌহার্দ্যের ঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর এক ঘণ্টা কেটে গেছে। রিদি এখনো বারান্দার গ্রিলটা শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ওটার শীতলতা তার ভেতরকার জ্বালা কিছুটা হলেও জুড়াবে। কিন্তু নাহ, সৌহার্দ্যের বিষাক্ত কথাগুলো যেন একেকটা ধারালো কাঁটা হয়ে তার ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে বিঁধে আছে। সেই কাঁটার ওপর যেন কেউ দলা পাকানো লবণ ছিটিয়ে দিচ্ছে—প্রতিটা মুহূর্তে রিদি সেই অসহ্য যন্ত্রণা টের পাচ্ছে।
রিদি আকাশের চাঁদটার নিঃশব্দে তাকিয়ে বিরবির করে বলল,”আপনার প্রতিটা কথাই কেন এত কষ্ট দেয়, সৌহার্দ্য? আপনি তো আমাকে নিজের কেউ বলেই মনে করেন না… তবুও আপনার অবহেলাতেই কেন আমার বুকটা এভাবে ভেঙে যায়?”

​চোখের জল আর বাঁধ মানছে না। গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া সেই উষ্ণ ধারা বুকের গভীরে জমে থাকা হিমশীতল শূন্যতাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সৌহার্দ্যের চোখের সামনে এক মুহূর্ত থাকা মানেই নিজের অস্তিত্বকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিলীন করে দেওয়া। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল— বাবা, মা, বেঁচে থাকলে হয়তো আজ এত অসহায় লাগত না। রিদির ইচ্ছে করছে সব ফেলে কোথাও হারিয়ে যেতে, কিন্তু যাবে কোথায়? কার কাছে?
​ফুফির কথা মনে হতেই একরাশ বিষণ্নতা তাকে ঘিরে ধরল। সেখানে গেলেও তো সেই একই পরিণতি। এক আশ্রয়ের ছায়া থেকে আরেক আশ্রয়ের শিকলে বন্দি হওয়া—সেখানে কি অপমান হবে না তারই বা কি নিশ্চিয়তা? দূর থেকে চেনা সম্পর্কগুলো বড্ড মায়াবী, কিন্তু কাছে এলেই বোঝা যায়, প্রিয়জনদের মুখোশের আড়ালে আসলে কতটা মরুভূমি।

​রিদির এলোমেলো চিন্তাগুলোর জাল ছিঁড়ে ঘরে ঢুকলেন আমেনা খালা। হাতে খাবারের প্লেট, চোখেমুখে একরাশ মমতা। রিদির পিঠের কাছে এসে ধীর স্বরে ডাকলেন, “ছোট আম্মা, সেই বিকাল থেকে কিছু খাও নাই। শরীরটা এমনে করলে চলবো? একটু খায়া লও, মা।”
​রিদি তড়িঘড়ি করে চোখের পানি মুছে ফেলল। ম্লান একটা হাসির আভা ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল, “খালা, প্লিজ… এই মুহূর্তে খাবার খেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি নিয়ে যাও, আমার একদমই খিদে নেই।”
​আমেনা খালা নাছোড়বান্দা। তিনি রিদির হাত ধরে আলতো করে টেনে বসিয়ে দিলেন। স্নেহমাখা কণ্ঠে ধমক দিয়ে বললেন, “না খায়া থাকা চলবে না। তোমার এই না খাওয়া আমার কলিজায় লাগে ছোট আম্মা। তুমি না খাওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে এক পা-ও নড়তেছি না।”
​আমেনা খালার ওই অকৃত্রিম ভালোবাসার কাছে রিদি আর নিজেকে শক্ত করে রাখতে পারল না। দীর্ঘক্ষণের অভুক্ত পেটে খিদেটা যে দলা পাকিয়ে ছিল, তা বুঝতে পেরে সে নিঃশব্দে প্লেটটা টেনে নিল।
​রিদি যখন খেতে শুরু করল!

অন্ধকারের আড়াল থেকে একজোড়া চোখ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সরে গেল। রিদি জানে না, তার প্রতিটি মুহূর্তের নীরব কান্না দূর থেকে কেউ একজন অতন্দ্র প্রহরীর মতো দেখছে।
​আমেনা খালা ঘর থেকে বের হতেই আরহানের মুখোমুখি হলেন। আরহান উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করে বলল, “খালা, বনু কি খেয়েছে?”
​আমেনা খালা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। কথাটা শোনার পর আরহানের দীর্ঘশ্বাসটা যেন এক পাহাড় সমান চাপ কমিয়ে দিল। আমেনা খালা চলে যেতেই আরহান সোফায় গা এলিয়ে বসল। নিজের ওপর নিজেই বিরক্তি নিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “অসভ্য” বউ মানে না, অথচ দরদ উতলে উঠে!
কথাটা বলেই আরহান একটু চিন্তিত মুখে বিরবির করে বলল,”সৌহার্দ্য, তুই বুঝছিস না তুই কি হারাচ্ছিস। রিদি কারো বোঝা নয়, ও তো একটা ছোট্ট পাখি, যে শুধু একটু ভালোবাসা চায়। অথচ তুই তাকে প্রতিদিন নিষ্ঠুরতার শৃঙ্খলে বাঁধছিস।”

​ফ্ল্যাশব্যাক
​সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর শরীরটা যেন ভেঙে আসছিল আরহানের। কাজের পাহাড়ের ওপর সৌহার্দ্যের এক্সিডেন্ট টেনশন কারণ আরহান খুব ভালো করে জানে এটা কোন সাধারণ এক্সিডেন্ট না তার ভাইয়ের কাজ কর্ম তার নখদর্পণে—সব মিলিয়ে দম ফেলার মতো এক মুহূর্তও জোটেনি আজ। তার ওপর তার বাচ্চাদের ফে, পু, তো আছেই। সব সামলে ক্লান্ত শরীরটা যখন বিছানায় এলিয়ে দিল, তখন চোখের পাতাগুলো ঘুমে ভারি হয়ে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ফোনটা বেজে উঠল।
​বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল সৌহার্দ্যর নাম। একটু টেনশন নিয়ে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগাতেই অপর প্রান্ত থেকে সৌহার্দ্যের সেই গমগমে আর কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “ওটাকে খাইয়ে আয়!”
​আরহান তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন, ঘোর ভাঙেনি ঠিকমতো। সৌহার্দ্যের এই হঠকারী নির্দেশে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে, ধীর স্থিরভাবে সে জানতে চাইল, “ওটা কে? তুই কার কথা বলছিস ভাই?”
​আরহানের এই প্রশ্নটা যেন আগুনের ওপর ঘি ঢালল। সৌহার্দ্যের গলায় উপচে পড়ল তীব্র বিরক্তি নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “যাকে সারাদিন ‘বোন-বোন’ করে হেদিয়ে মরিস, ওই স্টুপিড দেড় ব্যাটারিটার কথা বলছি!”
​কথাটা বলেই সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ফোনটা ঢাস করে দিল। ফোনের ওপাশে তখন ‘টুট-টুট’ শব্দের রেশ, আর এপাশে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে আরহান। আরহান বিরবির করে বলল, চৌধুরী বাড়ীর বেয়াদব!

রাত তখন ১টার কাছাকাছি। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল চত্বরে তখনো মানুষের গমগম শব্দ। সেই ভিড় ঠেলে বিমানবন্দরের গেট দিয়ে বেরিয়ে এল এক সুদর্শন যুবক—শাহাবীর শিকদার। যার হাঁটার ভঙ্গিতে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। ভিনদেশিদের মত নীল চোখের গভীরতায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যা দেখলেই যে কারো দৃষ্টি আটকে যাওয়ার মতো। দীর্ঘ সাত বছর পর আজ সে আপন দেশের মাটিতে পা রেখেছে।
​বিমানবন্দরের গেটে বেরোতেই পরিচিত এক মুখ তাকে দেখে আবেগ সামলাতে পারল না। শাহান মুহূর্তের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল বড় ভাইকে। তার চোখে-মুখে অসীম আনন্দ আর অভিমান মেশানো তৃপ্তি। শাহান হাসিমুখে বলল, “ভাইয়া! আমাদের এভাবে দুই দিন একা ফেলে রেখে থাকার কি খুব দরকার ছিল? আমাদের সাথে আসলেই তো পারতে?”

​শাহাবীর মুখে থাকা মাস্কটি খুলে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টিতে ছিল উদ্বেগের ছাপ। সে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “মম খুব অসুস্থ, তাই না? খবরটা পাওয়ার পর আর এক মুহূর্তও দেরি করতে ইচ্ছে করছিল না, তাই দ্রুত চলে এলাম।”
​শাহাবীর যখন মায়ের অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করল, সাহানের মুখটা মুহূর্তের জন্য একটু ম্লান হয়ে গেল। সে জানে, তাদের মা আসলে খুব একটা অসুস্থ নন; ভাইয়ের ফেরার সময় এগিয়ে আনতেই মা অসুস্থতার অভিনয় করেছেন। মায়ের সেই সরল মিথ্যাচারের কথা ভেবে সাহান একটু আমতা আমতা করে বলল, “ভাইয়া, ওসব কথা এখন থাক, বাসায় চলো। অনেক লম্বা জার্নি করে এসেছ, মা তো তোমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছে।”
​দুই ভাই তখন ব্যস্ত পায়ে বিমানবন্দরের পার্কিংয়ের দিকে এগিয়ে চলল। গন্তব্য—শিকদার মেনশন।

রাত তখন প্রায় দুটো। নিস্তব্ধ রাত, অথচ রিদির মনের ভেতর এক তুমুল ঝড় বইছে। চোখের পাতা এক করতে পারছে না সে। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎই তার মনে পড়ল রাতের সময়ের কথা—খাওয়ানোর পর ওষুধ দেওয়ার সময় সৌহার্দ্যের শরীরটা খানিকটা গরম ছিল। আরহান বলেছিল জ্বর আসতে পারে, কিন্তু তখন ব্যথার ইনজেকশনের কারণে জ্বরের ওষুধ দেওয়া হয়নি।
​রিদির বুকের ভেতরটা ছটফট করে উঠল। উৎকণ্ঠায় আর বসে থাকতে পারল না। পা টিপে টিপে নিঃশব্দে সৌহার্দ্যের ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। কাছে যেতেই রিদির বুকটা কেঁপে উঠল—সৌহার্দ্যর শরীরটা কাঁপছে, আর মুখ দিয়ে অস্ফুট কিছু বিড়বিড় করছে সে। ভয়ে হাত কাঁপছিল রিদির, শরীরে হাত দিতেই মনে হলো আগুনের হলকা। শরীরের তাপমাত্রা যেন পুড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা!
​রিদি দ্রুত আরবানকে ফোন দিল, কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। সম্ভবত ডিউটিতে ব্যস্ত। একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হয়েও এমন পরিস্থিতিতে রিদির মাথাটা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল। তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। শক্ত করে সৌহার্দ্যকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আধশোয়া করে বসাল। কোনোমতে নাপাটা খাইয়ে ধীর হাতে শার্টটা খুলে দিয়ে সারা শরীর ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে দিতে শুরু করল।

​ঠিক সেই মুহূর্তে ঘটে গেল অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সৌহার্দ্য তার বাম হাতটা বাড়িয়ে রিদির কোমর আলতো করে জড়িয়ে ধরল। ঘোর লাগা কণ্ঠে বিড়বিড় করে উঠল, “প্লিজ, প্যারোট, স্টে উইথ মি। ডোন্ট গো, প্লিজ।”
​রিদির সারা শরীর দিয়ে এক অদ্ভুত শিরশিরানি বয়ে গেল। হঠাৎ চমকে উঠল সে। ‘প্যারোট’? এই লোক তাকে এত সুন্দর নামে ডাকবে অসম্ভব? রিদি নিশ্চিত—সৌহার্দ্য তাকে এই নামে জিবনেও ডাকবেনা! রাগ, বিরক্তি আর ধাঁধায় রিদির চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল, আমি জানি আমাকে এত সুন্দর করে ডাকার লোক তুই না,”আমার আগে থেকে, তোর চরিত্র নিয়ে সন্দেহ ছিল! অসভ্য লুচ্চা ডাক্তার, তোর সেবার গুষ্টি কিলাই! এই জন্যই তোর বউ ভালো লাগে না!”

​কথাগুলো বলে ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতেই সৌহার্দ্য যেন আরও জেদ ধরে বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে রিদির হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ঘুমের ঘোরেই চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “ডোন্ট গো, ,দেড় ব্যাটারি।”
বলেই সে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, কিন্তু রিদির ছোট কোমল হাতের কবজিটা তার শক্ত হাত টা দিয়ে চেপে ধরে রাখল । রিদি অনেক চেষ্টা করেও হাতটা ছাড়াতে পারল না। শেষমেশ উপায়ান্তর না দেখে সে খাটের পাশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে পড়ল।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৯

সৌহার্দ্যর হাতের দিকে তাকিয়ে বিরক্তি ভরা কণ্ঠে আপনমনেই বলতে লাগল, “অসভ্য লোক! এখন চিপকে ধরে আছে, সকাল হলে আবার ঠাডা পড়া বকের মতো চিঁচিয়ে উঠবে!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here