Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৭

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৭

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৭
রিদিতা চৌধুরী

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুল ঝাড়ছিল রিদি। হঠাৎ ঘাড় ফেরাতেই তার বুকের ভেতরটা এক ঝটকায় থমকে গেল, হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে এসে আছড়ে পড়ছে। দরজার ফ্রেম ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্য! পরনের সাদা শার্টের বোতাম অগোছালো, আর দুচোখে এমন এক মাতাল আচ্ছন্নতা, যা রিদির চেনা সৌহার্দ্যর সাথে একেবারেই মেলে না। সে যে এই অসময়ে বিনা নোটিশে বাড়ি ফিরে আসবে, রিদি তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
​সৌহার্দ্যর স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রিদির অগোছালো শাড়ি আর চুইয়ে পড়া ভেজা চুলের ওপর এসে আটকে গেল। ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে এল, নিশ্বাস নেওয়াও দায়। রিদি লজ্জায় আর তীব্র এক অজানিত আতঙ্কে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; হাত থেকে তোয়ালেটা কখন খসে পড়ে গেল, টেরই পেল না।
​সৌহার্দ্য টলমলে পায়ে রিদির দিকে এগিয়ে এল। যেন কোনো এক অদৃশ্য মায়ায় সে আচ্ছন্ন। রিদির একেবারে গায়ে গা ঘেঁষে থামল সে—দুজনার মাঝে এখন বাতাসের সরু জায়গাটুকুও অবশিষ্ট নেই। তার সেই অস্বাভাবিক, ঘোরলাগা দৃষ্টির সামনে রিদির শরীর থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে রিদির, মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ডটা বুঝি এখনি বুকের খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে। রিদি এক পা পিছিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য বিদ্যুৎগতিতে তার কোমরে হাত জড়িয়ে কাছে টেনে নিল।

​সৌহার্দ্যর উত্তপ্ত নিশ্বাস যখন রিদির ভেজা চুলের ভাঁজে মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম, ঠিক সেই মুহূর্তে তার পকেটের ফোনটা আর্তনাদ করে বেজে উঠল। বিরক্তিতে সৌহার্দ্যর মুখমণ্ডল কুঁচকে গেল। সে রিদিকে ছেড়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ‘সুজন’-এর নামটা ভেসে উঠতেই তার বিরক্তি যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। স্ক্রিনে কিছু একটা টাইপ করে সে ফোনটা বিছানার ওপর অবজ্ঞায় ছুড়ে মারল, আর তার দৃষ্টি আবার গিয়ে পড়ল রিদির ওপর।
সৌহার্দ্যর বাঁধন থেকে মুক্তি পেয়ে রিদি যেন প্রাণ ফিরে পেল; এতক্ষণ তার নিশ্বাস প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। হৃৎপিণ্ডের সেই প্রচণ্ড ধুকপুকুনি এখনো কমেনি, সারা শরীর কাঁপছে থরথর করে। কোনোমতে কাঁপা হাতে মেঝে থেকে তোয়ালেটা কুড়িয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই ভেসে এলো সৌহার্দ্যর গমগমে কণ্ঠস্বর , “কী পরেছ ওটা? খুলে ফেলো! ভীষণ রকমের বাজে লাগছে।”
​সৌহার্দ্যর নির্লজ্জ ইঙ্গিত কানে আসতেই রিদির মনে পড়ল সকালের কথা। ক্ষোভ আর অভিমানে রিদির কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল তিরতিরে মেজাজে বলল, “আপনাকে দেখতে হবে না! আপনার জন্য আমি পরি নি, অসভ্য লোক!”
​সৌহার্দ্য শিকারি বাঘের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদিকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করল। ঠোঁটের কোণে এক কুটিল হাসি ফুটিয়ে সে এগিয়ে এসে বলল, “তাই বুঝি? তাহলে আমার রুমে এসে এমন অগোছালো শাড়িতে উন্মুক্ত পেট দেখিয়ে আমাকে সিডিউস করার মানে কী?”

​নিজের দিকে তাকাতেই রিদি শিউরে উঠল। শাড়িটা বেশ খানিকটা সরে গিয়ে পেটের খানিকটা অংশ বেরিয়ে আছে। লজ্জায় রিদির মুখটা মুহূর্তেই রক্তবর্ণ ধারণ করল। দ্রুত শাড়িটা টেনে নিজেকে ঢেকে নিয়ে রাগে চেঁচিয়ে বলল, “অসভ্য! লুচ্চা! ডাক্তার আপনার নজর এত নোংরা? ছিঃ!”
​সৌহার্দ্য এক পা এগিয়ে এসে বাঁকা চোখে তাকাল, “তাই নাকি? তুমি সিডিউস করলে দোষ নেই, আর আমি তাকালেই যত দোষ?”
​রিদি দাঁতে দাঁত চেপে জ্বলন্ত চোখে তাকাল, “আমার আর খেয়ে কাজ নেই যে তোমার মতো একটা খাটাশ মানুষকে সিডিউস করব! লোকের অভাব—”
​কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য ক্ষিপ্ত বাঘের মতো রিদির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শক্ত হাতে রিদির চোয়াল চেপে ধরে সে তার রক্তবর্ণ চোখ জোড়া রিদির চোখের ওপর স্থির করল। হিসহিসিয়ে বলল,
“চাপার জোর বেড়ে গেছে না? তুই কি ভেবেছিস সৌহার্দ্য চৌধুরী তোকে বলার অধিকার দিছে, তাই বলে যা খুশি বের করতে পারবি? শুয়োরের বাচ্চা, জ্যান্ত পুঁতে দিবো! যা খুশি বল, ওই মুখ থেকে অন্য কোনো পুরুষের নাম যেন উচ্চারণ না হয়! যা, আমার চোখের সামনে থেকে!”

​এক ঝটকায় রিদিকে ছেড়ে দিয়ে সে গর্জে উঠল, “চোখের সামনে থেকে দূর হ!”
​সৌহার্দ্যর লোহার মতো শক্ত থাবায় রিদির মুখটা ব্যথায় টনটন করছে, শ্যামলা ত্বকে যেন নীল ছাপ বসে গেছে। কিন্তু ব্যথার চেয়েও বেশি আঘাত লেগেছে তার আত্মসম্মানে। কান্নায় রুদ্ধ কণ্ঠে রিদি ফুঁসে উঠল, “আপনি তো আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানেন না, ভালোবাসেন না। তাহলে আমার ওপর অধিকার দেখাচ্ছেন কেন? আমার যা খুশি আমি করব, আপনি বলার কে অসভ্য, বেয়াদব লোক!”
​সৌহার্দ্য একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল হেসে বলল, “তোর দ্বারা এর চেয়ে ভালো কীইবা আশা করা যায়? চরিত্রহীন লম্পট বাবার মেয়ে তো, রক্তে তো ওসবই থাকবে!”
সৌহার্দ্যর কথাগুলো যেন রিদির বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তাকে যা খুশি বলছে বলুক, রিদি সহ্য করে নিত; কিন্তু তার বাবাকে নিয়ে এই নোংরা মন্তব্য? তার বাবা, যিনি ছিলেন একজন দেবতুল্য মানুষ—তাকে এমন অপমান! রিদি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বরেই আক্রোশে সৌহার্দ্যর দিকে তেড়ে গিয়ে সে আর্তনাদ করে বলল

“চুপ করুন!সবাইকে নিজের মতো ছোট লোক ভাবেন কেন? আপনি কোন সাহসে আমার পাপাকে নিয়ে ওইসব বললে? ওনার মতো ভালো মানুষ আর একটাও হয় না, আর আপনি কি না…”
রিদি আর কিছু বলতে পারল না। তার আগেই সৌহার্দ্য ঘরের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলে হিংস্র চিৎকারে গর্জে উঠে বলল, “আই সে, গেট আউট ফ্রম মাই রুম অ্যান্ড মাই লাইফ! আউট!”
রিদির বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল। এতদিন সৌহার্দ্যর প্রতি যে ভালোবাসা তিলে তিলে জমা ছিল, তা যেন এখন তপ্ত ঘৃণায় রূপান্তরিত হচ্ছে। নিজের অস্তিত্বের প্রতিই আজ তীব্র ঘৃণা হচ্ছে তার—এই মানুষটার এত অবহেলা, এত অপমান সহ্য করেও সে কেন তার পিছু পিছু ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায়? আজ সৌহার্দ্যর বিষাক্ত মন্তব্যে তার মৃত বাবার আত্মা পর্যন্ত রক্তাক্ত হলো। রিদি আর এক মুহূর্তের জন্যও সেখানে দাঁড়াল না। তীব্র কান্নায় বুক ভাসিয়ে সৌহার্দ্যর রুম থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে দৌড়ে পালানোর সময় হঠাৎ করেই মুখোমুখি হলো শাহেদা চৌধুরীর।

​শাহেদা চৌধুরী উদ্বিগ্ন হয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রিদি কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেকে সামলে নিজের রুমে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে দিল। শাহেদা চৌধুরী পিছু পিছু এসে দরজায় মৃদু করাঘাত করতে দরজ খোলা পেয়ে ভেতরে ঢুকতেই তিনি রিদিকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে দ্রুত কাছে এসে জড়িয়ে ধরলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বললেন, “কী হয়েছে মা? আম্মুকে বল তো? বাবু কি আবার তোর সাথে খারাপ আচরণ করেছে?”
​রিদি যেন এতক্ষণ একটি আশ্রয়ের অপেক্ষায়ই ছিল। শাহেদা চৌধুরীকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল সে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আম্মু, আপনার ছেলে ভীষণ খারাপ! ও ওনি সব সময় আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, আমি তাও মেনে নিই। কিন্তু আজ… আজ ও আমার পাপাকে নিয়ে কী সব জঘন্য কথা বলল! আপনি তো জানেন না আমার পাপা মানুষ হিসেবে কতটা মহান ছিলেন। কেন ওনি এমন বললেন?”
​রিদির কথা শুনে শাহেদা চৌধুরী মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। দীর্ঘদিনের পুরোনো কোনো এক স্মৃতির ধুলো যেন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনি দ্রুত নিজেকে সংযত করে নিলেন। রিদির ভেজা চুলে আদুরে হাত বুলিয়ে দিয়ে ধীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন, “শান্ত হ মা, বাবুটা এমনই। রাগের মাথায় ওর নিজের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ও কী বলে ফেলেছে তার কোনো মানে নেই, তুই প্লিজ ওসব মনে করিস না। আমি ওকে আজ অবশ্যই বকা দেব।”

​ শাহেদা চৌধুরীর সেই শীতল ও আশ্বাসের স্পর্শে রিদির কান্নার তোপ ধীরে ধীরে কমে এল। কখন যে কান্নার ক্লান্তি আর সবকিছুর অবসাদে রিদির চোখের পাতা ভারী হয়ে ঘুম নেমে এল, সে নিজেও টেরই পেল না। রিদিকে শান্তভাবে বালিশে শুইয়ে দিয়ে শাহেদা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রিদির কপালে শেষবারের মতো আলতো হাত বুলিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন;ছেলের রুম এর উদ্দেশ্য।
সৌহার্দ্যর ঘরের ভেতরটা তখন এক রণক্ষেত্র। রিদি বেরিয়ে যাওয়ার পর রাগের মাথায় সে যা পেয়েছে, তাতেই আছাড় মেরেছে। মেঝেজুড়ে কাঁচের টুকরো আর ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শাহেদা চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে গেলেন। রুমের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে তার বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। সোফার ওপর সৌহার্দ্য স্থির হয়ে বসে আছে, দুচোখ বন্ধ। মায়ের উপস্থিতি টের পেয়েও সে চোখের পাতা খুলল না, বরং যেন এক অদৃশ্য দেয়ালে নিজেকে আড়াল করে নিল।
​শাহেদা চৌধুরী ছেলের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে শান্ত, গম্ভীর গলায় বললেন, “এ বাড়ির অনেকের অনেক কিছুই আমি দেখেছি, অনেক কিছু সহ্য করে চুপ করে ও থেকেছি। তোর এই অবহেলার কথা জেনেও মেয়েটাকে কষ্ট পেতে দেখেছি, তবুও মুখ খুলিনি। কিন্তু আজ তুই সব সীমা ছাড়িয়ে গেলি, সৌহার্দ্য! কী করে পারলি তুই আকরাম ভাইকে—”

​মায়ের কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্যর ক্ষিপ্ত চিৎকার ঘরে প্রতিধ্বনি তুলল, “একদম নাটক করবে না আমার সাথে, আম্মু! তুমি জানো, আমি আকরাম আঙ্কেলকে নিয়ে কিছু বলিনি। আমি শুধু ওই রক্ত—যার রক্ত সে—তার কথা বলছি! তোমার বোন…”
সৌহার্দ্য কথা থামিয়ে দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, রাগের মাথায় নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সে। রিদির চোখের জল আর তার আর্তনাদ মুহূর্তের জন্য তার হৃদয়ে এক দলা অপরাধবোধ তৈরি করলেও, জেদ তাকে শান্ত হতে দিচ্ছে না।
​শাহেদা চৌধুরী একটা করুণ, তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন। “এটা কি কারণ? এই কি তোর সমস্ত তিক্ততা আর অবহেলার উৎস? একজনের দোষের বোঝা তুই কেন রিদির ওপর চাপাচ্ছিস, সৌহার্দ্য?”
​সৌহার্দ্য চোখ না খুলেই খুব ধীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় উত্তর দিল, “নো, আই ডোন্ট জাজ ওয়ান পারসন বিকজ অব অ্যানাদার পারসনস ফল্টস।”

​ শাহেদা চৌধুরী আড় চোখে তাকিয়ে বলল “তাহলে ওর সাথে এমন আচরণের কারণ কী?”
​ঘরজুড়ে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা নেমে এল। সৌহার্দ্যর ঠোঁট যেন সিলগালা করা। কোনো শব্দই বেরিয়ে আসছে না তার মুখ থেকে। শাহেদা চৌধুরী বুঝলেন, এই ছেলে যখন জেদের বশে মুখ বন্ধ করে, তখন পৃথিবীর কোনো শক্তিই তাকে দিয়ে কথা বলাতে পারবে না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মা চলে যাওয়ার পর সৌহার্দ্য দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে আবার দুচোখ বুজে বিরবির করে বলল,
আই ডোন্ট ট্রাস্ট হার। ব্লাড উইল অলওয়েজ শো ইটস ট্রু নেচার।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। রিদির ঘুম ভাঙল একরাশ শূন্যতা নিয়ে। দীর্ঘ সময় কান্নায় ফুলে ওঠা চোখ দুটো কোনোমতে মেলে ধরল সে। পেটে কিছুই পড়েনি, ক্ষিদেও মরে গেছে অনেক আগেই। ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে আলমারি থেকে একটা পোশাক বের করে শাড়িটা বদলে নিল সে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল শাহেদা চৌধুরীর ঘরের দিকে।
​দরজার কাছে গিয়ে দেখল, শাহেদা চৌধুরী ফোনে ব্যস্ত। মৃদু স্বরে, কিছুটা ইতস্তত পায়ে রিদি ডাকল, “আসতে পারি, আম্মু?”

​রিদির গলার স্বর শুনে শাহেদা চৌধুরী ফোনটা রেখে দ্রুত এগিয়ে এলেন। রিদির ফোলা চোখ আর মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে তার বুকটা হু হু করে উঠল। মেয়ের মুখটা নিজের দুহাতের আজলায় নিয়ে আদুরে কিন্তু ব্যথিত স্বরে বললেন, “কী অবস্থা করেছিস নিজের! আয়, কিছু খেয়ে নে।”
​রিদি ম্লান হাসল। শাহেদা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে শান্ত গলায় বলল, “না আম্মু, একদম খিদে নেই। আমি এখন চলে যাচ্ছি। প্লিজ, আমাকে যেতে দাও।”
​শাহেদা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। কিসের জন্য আটকে রাখবে মেয়েটাকে অনেক চেষ্টা করলো ,লাভ কি হলো? ওনি চোখের পানি মুছে বললেন, “ঠিক আছে, আর আটকাবো না তোকে। চলে যা। এমন মানুষের জীবনে থাকার কোনো মানে হয় না, যে তোর প্রাপ্য সম্মানটুকুই দিতে জানে না।”
​রিদি কোনো কথা বলল না। শাহেদা চৌধুরীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল বাড়ি থেকে। রিদি চলে যেতেই শাহেদা চৌধুরী দ্রুত হাতে ফোনটা তুলে নিলেন। রিং হওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওপাশ থেকে ভেসে এল এক গম্ভীর, পুরুষালি কণ্ঠস্বর, “বলো ফুফুমনি?”
​শাহেদা চৌধুরীর ঠোঁটে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। তিনি বললেন, “কোথায় আছো এখন আমার এমপি আব্বা?”

​ওপাশের মানুষটি চওড়া হাসি হেসে উত্তর দিল, “আই’ম অন মাই ওয়ে, ফুফু মনি!”
​শাহেদা চৌধুরীর মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে এল। বিষণ্ন গলায় বললেন, “আমার মেয়েটা চলে গেল, রাখতে পারলাম না ওকে। আমি ওর দায়িত্বটা তোকে দিতে চাই। তোর দাদার মতো মুখ ফিরিয়ে নিস না বাপ আমার।”
​ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সেই দীর্ঘ নীরবতা দেখে শাহেদা চৌধুরী অস্থির হয়ে উঠলেন, “কী হলো? কিছু বলছিস না যে?”

​ওপাশের লোকটি শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে শুধু বলল, “ডোন্ট প্যানিক, আমি দেখছি।” বলেই লাইনটা কেটে দিল।
​এদিকে, শহরের ভিড়ে নিজের অস্তিত্ব ভুলে দিকশূন্য হয়ে হাঁটছে রিদি। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে—কোনো কিছুরই হুঁশ নেই তার। হঠাৎ এক জোরালো ধাক্কা। একটা চকচকে মার্সিডিজ গাড়ি এসে থামল সামনে। গাড়ির গতি কম থাকায় রিদি খুব একটা আঘাত পায়নি, কিন্তু ধক করে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল তার।

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৬

​ঝেড়ে উঠে দাঁড়াতেই গাড়ি থেকে নেমে এল এক দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবক। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি—সব মিলিয়ে যেন কোনো এক রাজপুত্রের অবয়ব। রিদি চোখ তুলে তাকাতেই লোকটা গম্ভীর অথচ সম্মোহনী কণ্ঠে বলে উঠল,
” টপকানোর জন্য কোথাও পাওনি? না কি সরাসরি এমপি ফারিস খন্দকারের গাড়ির সামনেই আছাড় খেতে হলো মেয়ে?”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ১৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here