অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৭
রিদিতা চৌধুরী
ভোর ৬টা। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা হালকা আলোয় রিদির ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলেই সে ঘরটা একবার ভালো করে দেখে নিল, কিন্তু কোথাও সৌহার্দ্যের উপস্থিতি নেই। চট্টগ্রাম থেকে আসার পর প্রতিদিন ঘুম থেকে জেগে সে নিজেকে সৌহার্দ্যের বুকের উষ্ণতায় আবিষ্কার করে, কিন্তু আজ বিছানাটা একদম খালি। মনে হলো, এই মানুষটা আজ তার আগেই উঠে পড়েছে।
রিদি নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ল। ওযু সেরে নামাজটা পড়ে নিল পরম শান্তিতে। তারপর খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখল ঘরটা। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে যখন সে চুলে হাত দিল, ঠিক সেই মুহূর্তে রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সৌহার্দ্য। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, শরীরে জিমের পোশাক, দেখে মনে হচ্ছে শরীরচর্চা শেষ করে সবে ফিরল। রিদি আড়চোখে একবার তাকাল তার দিকে, বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অভিমানে মোচড় দিয়ে উঠল, তবুও সে নিজেকে সামলে নিল।
সৌহার্দ্য কোনো কথা বলল না। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে রিদির পাশ কাটিয়ে এসে পানির বোতলটা ড্রেসিং টেবিলে রাখল। একবার শুধু ঘড়ির দিকে তাকাল সে, তারপর তোয়ালেটা কাঁধে নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। রিদির মনে হলো, লোকটা যেন তাকে ঘুণাক্ষরেও দেখতে পাচ্ছে না।
সৌহার্দ্য বাথরুমে ঢুকে গেলে রিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলমারি থেকে সৌহার্দ্যর পোশাকগুলো বের করে বিছানায় সুন্দর করে সাজিয়ে রাখল। এরপর ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা দিল সে। কাল রাত থেকেই এই মানুষটা তার সাথে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। কাল সন্ধ্যায় রুমে ডেকেছিল, কিন্তু রিদি তখন সবার সামনে ওভাবে বলায় রাগ করে আসে নি। তারপর থেকেই এই নীরবতার দেয়াল।
সেই কখন থেকে পৃথা বিছানা ছাড়ার জন্য অরবানের সাথে এক প্রকার লড়াই করে যাচ্ছে, কিন্তু আরবান তাকে ছাড়ার পাত্র নয়। বরং সে যেন আরও জেদি হয়ে উঠেছে। এক হাতে পৃথার কোমরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন আলগা হলেই পৃথা হারিয়ে যাবে। অরবানের এই গাঢ় আলিঙ্গনে পৃথা কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়ে গেল, তবুও মিনমিনে কণ্ঠে আর্জি জানাল, “প্লিজ, ছাড়ুন না… অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। কলেজে যাওয়ার সময় হয়ে এল। ওদিকে রিদি আর ভাবী একা হাতে সব সামলাচ্ছে, ওরা কী ভাববে বলুন তো?”
আরবান চোখ না খুলেই পৃথার শরীরের উষ্ণতা আরও নিবিড়ভাবে অনুভব করল। কিছুটা আলসেমি মেশানো কণ্ঠে সে বলে উঠল, “কেউ কিছু ভাববে না। আর দশটা মিনিট… প্লিজ, একটু ঘুমাতে দাও। তারপর নাহয় উঠে যেও।”
কিন্তু পৃথা এবার আর অরবানের কথায় কান দিল না। সে জানত, অরবানের এই বায়নায় গা ভাসানো মানেই আজ আর বিছানা ছাড়া হবে না। একপ্রকার জোর করেই সে অরবানের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। তার এই সিদ্ধান্তে আরবান মনে মনে কিছুটা বিরক্ত হলেও মুখে কোনো কথা বলল না।
বিছানা ছেড়ে উঠে পৃথা পেছন ফিরে অরবানের দিকে তাকাল। অগোছালো চুলে শুয়ে থাকা অরবানের সেই অভিমানী মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভিষম হাসি পেল এই লোক সব সময় এমন করে। পৃথা সে দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসল— তারপর রুম থেকে বের হয়ে গেল!
আমেনা খালার সাথে হাসি-ঠাট্টায় মেতে রান্নাঘরে ব্যস্ত ছিল রিদি। ঠিক সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে এসে ঝাপিয়ে পড়লো পৃথা, দুহাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে। রিদি একটু নাক-মুখ কুঁচকে, বিরক্তির ভান করে বলল, “আমার এত সুন্দর একটা ভাই থাকতে তুই কেন আমার সাথে এসে এমন ঘেসাঘেসি করছিস? একদম বেয়াদব মেয়ে, সর তো!”
পৃথা মুখটা বাঁকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, “তুই ইদানীং স্যারের সাথে থেকে থেকে একদম ওনার মতোই হয়ে যাচ্ছিস। একদম ঠোঁট কাটা কথা বলিস!”
রিদি ঘুরে দাঁড়ালো। তার চোখেমুখে কিছুটা অস্থিরতা। বলল, “সত্যি কথা বললেই দোষ? এখন তাড়াতাড়ি কর ভাই ,কলেজ যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর ডাক্তার সাহেব আজ আবার একটা ক্লাস টেস্ট নেবেন বলে শুনলাম!”
রিদির কথা শুনে পৃথা বাঁকা হাসল, “বাহ্! বর টিচার হলে কি যে সুবিধা! পড়া, প্রশ্ন, পরীক্ষার ডেট—সব যেন হাতের মুঠোয়। কপাল লাগে ভাই, কপাল!”
পৃথার খোঁচায় রিদির মনটা দমে গেল। সে কিছুটা অভিযোগের সুরেই বলল, “কপাল না ছাই! আমি কত করে বললাম টেস্টের পড়াগুলো অন্তত একটু বলে দিতে, সে তো বললই না—উল্টো শুনিয়ে দিল আমি নাকি ক্লাসের সব থেকে খারাপ ছাত্রী! আমার হাতে নাকি রোগী সেফ না!”
কথাগুলো বলে রিদির মনটা খারাপ করে নিলো। পৃথা রিদির দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ‘স্যার তো ভুল কিছু বলেননি; তুই যে পরিমাণ পড়া-চোর, তাতে তো স্যার ঠিকই বলেছেন!’ কিন্তু মুখে সে রিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “দূর পাগলী, স্যারের কথায় মন খারাপ করতে হবে না। তুই যে ভালো করিস, সেটা উনি বোঝেন, শুধু মুখে বলেন না!”
সান্ত্বনার সুরে রিদিকে আশ্বস্ত করে পৃথা ঝটপট হাতে নাস্তাগুলো গুছিয়ে নিল। হঠাৎ কিছু মনে পড়তে। সে রিদির দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আচ্ছা, একটা কথা ভেবেছিস? সুমিকে আজকাল কেমন যেন লাগছে না? সারাদিন কেমন মনমরা হয়ে থাকে, কী যেন একটা হয়েছে ওর।”
রিদিও যেন তার মনের কথাটাই শুনল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হুম, আমারও একদম তাই মনে হচ্ছে।”
কথায় কথায় নাস্তাগুলো ডাইনিং টেবিলে সাজিয়ে রেখে, এক কাপ গরম কফি হাতে রিদি ধীর পায়ে এগিয়ে গেল সৌহার্দ্যের ঘরের দিকে।
সৌহার্দ্য তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শার্টের বোতামগুলো নিখুঁতভাবে আটকে নিচ্ছে। রিদি ঘরে ঢুকতেই সে আড়চোখে একবার তাকাল। তারপর রিদির হাতের কফির কাপটা নিজের হাতে নিয়ে নিয়ে এক চুমুক দিয়েই শীতল গলায় বলল, “রেডি হয়ে নাও, আমার লেট হচ্ছে!”
রিদি কিছুটা থমকে দাঁড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আমার জন্য দেরি করতে হবে না। আপনি বরং বেরিয়ে পড়ুন, আমি পৃথার সাথে চলে যাব।”
সৌহার্দ্যের কপালে তৎক্ষণাৎ বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে রিদির দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “স্টুপিড! যেটা বলছি সেটা করো। নাকি আমার সব কথার অবাধ্যতা করবে বলে ঠিক করে নিয়েছো তুমি?”
রিদি মুখটা ভার করে নিল, তার চোখের কোণায় অভিমানের ছায়া। সে নিচু গলায় বিড়বিড় করল, “আপনিই তো বললেন আপনার দেরি হচ্ছে, তাই তো বললাম।”
সৌহার্দ্য কোনো কথা বলল না। সে নিজের পারফিউমের বোতলটা তুলে নিয়ে স্প্রে করল, তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে থমকে দাঁড়াল। রিদির দিকে তাকিয়ে গমগমে স্বরে বলল, “আজকের টেস্টে একটা টপিকও যদি ভুল হয়, তবে কিন্তু মার মিস হবে না—মনে থাকে যেন!”
কথাটা বলেই সে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার পদশব্দ মিলিয়ে যেতেই রিদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখটা মুচড়ে বিরবির করে উঠল, “হুম, মার মিস হবে না! খবিশ লোক একটা! প্রশ্নটা অন্তত আগেভাগে বলে দিলেই তো পারতেন—ভালো করে শিখে নিতাম। প্রফেসর জামাই পেয়ে কি লাভ হলো আমার? নামেই প্রফেসর, কাজে যেই লাভ সে কদু!”
বলেই বিরক্তিতে গাল ফুলিয়ে সে-ও তৈরি হওয়ার জন্য আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।
ক্যাম্পাসের মাঠের এক কোণে তিন বান্ধবী—রিদি, সুমি আর পৃথা। ক্লাসের চাপ কাটিয়ে সবেমাত্র তারা একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু সুমির মুখটা দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভেতরে কোনো একটা দহন চলছে।
রিদি কৌতূহলী চোখে সুমির দিকে তাকিয়ে আলতো করে ওর হাত ধরল। নরম স্বরে বলল, “কিরে জানু, কী হয়েছে তোর? কয়েকদিন ধরে দেখছি মনটা একদম ভার করে আছিস। কী হয়েছে বলবি তো?”
সুমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকাল। বিষণ্ণ গলায় বলল, “বাবার জেদ আর কমাতে পারছি না, রিদি। বিয়ের জন্য বড্ড চাপ দিচ্ছে। ছেলে নাকি আমাদের কলেজেরই একজন ডাক্তার। আজ দেখা করতে বলেছে। আমি এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারছি না, কিন্তু বাবাকে কিছুতেই বোঝাতে পারছি না রে।”
রিদি ভ্রু কুঁচকে একটু ভেবে বলল, “তুই না বললি তোর বাবার বন্ধুর ছেলে?
সুমি মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, এই হাসপাতালেরই কার্ডিওলজিস্ট। সৌহার্দ্য স্যারের মত!
রিদি সান্ত্বনার সুরে বলল, “আরে পাগলি, দেখা করলেই কি বিয়ে করতে হবে নাকি? আগে দেখ না মানুষটা কেমন। যদি মনের মতো না হয়, তবে সরাসরি বলে দিবি তুই অন্য কাউকে ভালোবাসিস—ব্যাস, সব ঝামেলা চুকে যাবে। এত জটিল ভাবছিস কেন?”
পৃথা পাশে বসে মাথা নাড়ল, “একদম ঠিক বলেছে রিদি। আগে পরিস্থিতিটা দেখ, তারপর সিদ্ধান্ত নিস।”
তিনজনের এই গভীর আলোচনার মাঝেই হঠাৎ একটি ছেলে এগিয়ে এসে রিদির দিকে একটি খাবারের বক্স বাড়িয়ে দিল। ছেলেটি হাসিমুখে বলল, “ম্যাম, সৌহার্দ্য স্যার পাঠিয়েছেন। আপনাকে বলেছেন, এটা খেয়ে নিতে।”
রিদি হকচকিয়ে গেল। সুমি পৃথার হাসি দেখে তার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। পৃথা সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ বুঝে টিপ্পনী কাটল, “বাপ রে! এমন আগলে রাখা জামাই থাকলে কার না ভালো লাগে, ভাই!”
সুমিও হাসতে হাসতে যোগ দিল, “একদম! স্যারের তো দেখি নজর সবসময় তোর দিকেই। বাবা ক্লাসে যেমন করে তাকিয়ে থাকে মনে হয় তার বউ কেউ চুরি কর নিয়ে যাবে!
রিদি কোনো কথা বলল না, শুধু লজ্জা ঢাকার চেষ্টায় চটজলদি বক্সটা খুলে ফেলল। বাড়িতে বেরোনোর তাড়ায় আজ সকালে ঠিকমতো নাস্তা করা হয়নি তার। সৌহার্দ্য ঠিক কীভাবে বুঝে গেল যে সে না খেয়ে বেরিয়ে এসেছে—তা ভেবে রিদির বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক উষ্ণতায় ভরে গেল। বান্ধবীদের সাথে খাবারটা ভাগ করে নিতে নিতে সে মনে মনে হাসল। সৌহার্দ্য বাইরে যতই রাগী হোক, তার ভেতরের এই যত্নটুকুই রিদির সব অভিমান ধুয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
সুমির থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় পৃথা হঠাৎ থামল। “রিদি, দিকে তাকিয়ে বলল, তোর ভাইয়ের -এর সাথে একটা জরুরি কথা আছে। তুই একটু দাঁড়া, আমি দেখা করে আসছি।”
বলেই পৃথা হাসপাতালের দিকে এগিয়ে গেল। রিদি করিডোরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। দশ মিনিট পেরিয়ে গেছে, ক্লান্তিতে যখন রিদি কিছুটা আনমনা, ঠিক তখনই করিডোরের এক পাশে সৌহার্দ্যের চেম্বারটি তার চোখে পড়ল। দুষ্টুমির এক ঝলক হাসি খেলল রিদির ঠোঁটের কোণে। সে পা টিপে টিপে চেম্বারের সামনে গেল, বাইরের সেই অপেক্ষমান ছেলেটির কাছ থেকে সিরিয়াল নম্বরটি ম্যানেজ করে নিল। কিছুক্ষন পর নিজের নামের ডাক আসতেই সে বুক ফুলিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সৌহার্দ্য তখন মনোযোগ দিয়ে প্রেসক্রিপশন লিখছিল, মাথা না তুলেই গম্ভীর স্বরে বলল, “নাম আর বয়স বলুন।”
রিদি টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “মিসেস সৌহার্দ্য চৌধুরী।”
নামটা শোনা মাত্রই সৌহার্দ্যের কলম থেমে গেল। ভ্রু কুঁচকে সে মুখ তুলে তাকাল। রিদিকে সেখানে দেখে তার চোখ সরু হলো, কিন্তু মুখে কোনো বিস্ময় প্রকাশ না করে সে আবার স্বাভাবিক ভাবে। নির্বিকার স্বরে বলল, “সমস্যা কী?”
রিদি ঠোঁটের কোণে সেই দুষ্টু হাসিটা ঝুলিয়ে বলল, “বুকে ব্যথা করছে, ডাক্তার সাহেব!”
সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্ত বসল না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দ্রুত রিদির কাছে চলে এল। নিমেষের মধ্যে সে রিদির কোমরটা টেনে নিজের শরীরের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। গলায় ঝোলানো স্টেথোস্কোপটি হাতে নিয়ে সে রিদির বুকের ওপর রাখল, কিন্তু তার দৃষ্টি রিদির চোখের গভীরতায় আটকে ছিল।
সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক ও উষ্ণ স্পর্শে রিদির হৃৎপিণ্ড যেন ধক করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলে কাঁপা গলায় বলল, “প্লিজ… ছাড়ুন ডাক্তার সাহেব!”
সৌহার্দ্য তার নেশালো কন্ঠে ফিসফিস করে বলল, “কেন ছাড়ব? ডাক্তার তো রোগিই দেখছে, ভুল কিছু কি করলাম?”
রিদি নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে লজ্জায় রাঙা হয়ে বলল, “ছিঃ! আপনি একদম লুচ্চা ডাক্তার! কেউ এভাবে রোগী…” কথা শেষ করতে পারল না সে, লজ্জায় তার কন্ঠ বুজে এল।
সৌহার্দ্য তার মুখটা রিদির কানের খুব কাছে নিয়ে এল। সেই উষ্ণ নিশ্বাসের ছোঁয়ায় রিদির শরীর কেঁপে উঠল। সৌহার্দ্য ফিসফিস করে বলল, “আমি শুধু আমার একান্ত রোগিকেই এভাবে দেখি।” শুধু এই ভাবে না, আরো অনেক ভাবে দেখতে চাই? আপনি কি দেখাতে ইচ্ছুক মিসেস সৌহার্দ্য?
কথাটা বলেই সে রিদির দুই গালে দুটো গাঢ় চুমু খেল। তারপর আলতো করে তার ঠোঁটের কোণে একটি চুমু খেতেই রিদির সারা শরীর শিউরে উঠল। সে নিজের অজান্তেই সৌহার্দ্যের শার্টটা শক্ত করে খামচে ধরল।
সৌহার্দ্য মৃদু বিরক্তি আর ভালোবাসার সংমিশ্রণে বলল, “স্টুপিড, এই কাঁপুনি বন্ধ করো। আজ রাতে যদি তুমি নিশ্বাস বন্ধ করেও মরে যাও, তবুও তোমাকে আমি ছাড়ছি না, মনে রেখো মিসেস সৌহার্দ্য!”
কথাটা বলে রিদির নাকে আলতো করে একটা কামড় দিলো । তারপর আলতো হাতে রিদির কিছুটা এলোমেলো হয়ে যাওয়া হিজাবটা ঠিক করে দিয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “যেতে পারবে? নাকি আমি পৌঁছে দেব?”
রিদি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ধীর স্বরে বলল, “পারব… পৃথা বাইরে আছে।”
সৌহার্দ্য রিদিকে ছেড়ে দিয়ে নিজের শার্ট ঠিক করতে করতে চেয়ারে বসল। তারপর নির্বিকারভাবে বলল, “ঠিক আছে, যাও। আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি, সে তোমাদের নামিয়ে দিয়ে আসবে।”
রিদি মাথা নেড়ে সায় দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল, তারপর লাজুক পায়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল।
ফারিস পাঞ্জাবির হাতা গুটাতে গুটাতে ঘর থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই রিভা এসে তার গলা জড়িয়ে ঝুলে পড়ল। রিভা কাল রাতে সৌহার্দ্যর সাথে এসেছে, সৌহার্দ্য একটা দরকারে ফারিসের কাছে আসবে শুনে ভাইয়ের পিছু নিয়েছে!
ফারিস বিরক্তির ভান করে বলল, ” শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, সর আমার ওপর থেকে! এভাবে বান্দরের মতো ঝুলে আছিস কেন?”
রিভা মুখ বাঁকিয়ে, বাচ্চা মেয়েদের মতো করে বলল, “নির্লজ্জ এমপি সাহেব, আমাকে ইগনোর করছেন কেন? একটা ফুটফুটে মেয়ের প্রতি এত অবিচার আল্লাহ সইবেন না কিন্তু!”
ফারিসের ভীষণ হাসি পাচ্ছিল, কিন্তু সে তা কঠোরভাবে চেপে রাখল। ধমক দিয়ে বলল, ” শ্বশুরের বেয়াদব মেয়ে, নাম আমার গায়ের ওপর থেকে! নইলে একটা চড় দিয়ে তোর ফোকলা দাঁত ফেলে দেব!”
ফারিসের হুমকিকে রিভা কানাকড়িও পাত্তা দিল না, বরং গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আদুরে কণ্ঠে বলল, “আপনি আমার সাথে এমনটা করতে পারেন, চুনু-মুনুর ফাফা!” বলেই ঝপাঝপ কয়েকটি চুমু খেয়ে নিল ফারিসের গালে।
ফারিস যেন পাথর হয়ে গেল। তাকে এমন স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিভা দুষ্টুমি ভরা গলায় বলল,
“কী হলো ফারিস ভাই? আপনি কি ফিট খেয়ে গেলেন? আমি কি ভাইয়াকে ডাকব?”
রিভার কথায় ফারিস যেন বিদ্যুতস্পৃষ্ট হলো। সে তেতে উঠে বলল, “পকেট সাইজের ঝড়, এই মুহূর্তে আমার তোর ভাইকে নয়, তোকেই দরকার।” বলেই ফারিস রিভার ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে দিল। হাতের এলোমেলো আর উষ্ণ স্পর্শে মুহূর্তেই রিভাকে দিশেহারা করে তুলল সে। রিভা দুহাতে ফারিসের পিঠের শার্ট খামচে ধরে তার আবেগে সাড়া দিতে লাগল।
দুজনের উষ্ণ নিশ্বাসে ঘরের বাতাস যখন ভারী হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই ফারিসের ফোনটা বেজে উঠল। ফারিস সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে রিভায় মগ্ন রইল। ওষ্ঠের ভাঁজে নিজের ওষ্ঠ রেখেই সে হাত বাড়াল রিভার জমার পিঠের চেইন বরাবর। কিন্তু ফোনটা আবার চিৎকার করে বেজে উঠল।
বিরক্তিতে ফারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। রিভার থেকে একটু সরে এলো ,ফোনের স্ক্রিনে ‘সুজন’-এর নাম দেখে রাগে বিড়বিড় করে বলল, “সৌহার্দ্য একদম ঠিক কাজই করে, বেয়াদব টাকে ব্লক করে দেওয়া উচিত! নিজে তো বিয়ে করবে না, কাউকে বউ নিয়ে শান্তিতে থাকতেও দেবে না!”
বলেই ফোনটা কেটে দিয়ে ফারিস ফিরতেই দেখল, লজ্জায় রিভার পুরো মুখটা লাল টমেটোর মতো হয়ে আছে। ফারিস ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রিভাকে নিজের বুকের ভেতর মিশিয়ে নিল। শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল, “শশুরের বেয়াদব মেয়ে, এভাবে আমাকে সিডিউস করে এখন লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”
রিভা ফারিসের বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, “ফারিস ভাই, একদম বাজে কথা বলে লজ্জা দেবেন না! ইশ, আমার বুঝি লজ্জা করে না?”
ফারিস শব্দ করে হেসে দিয়ে বলল, “হুম, তোর যে লজ্জা আছে, তার প্রমাণ তো আজ হাতে-নাতে পেলাম।” বলেই সে আবার ঝুঁকে রিভার ওষ্ঠের ভাঁজে নিজের ওষ্ঠ গুজে দিল। দীর্ঘ এক চুম্বনে রিভাকে আচ্ছন্ন করে দিয়ে, তাকে ছেড়ে দিয়ে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “পকেট সাইজের ঝড়, আমার বাচ্চার মা হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে নে!”
দ্রুত পায়ে ফারিস বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। রিভা লজ্জা আর আবেশে নিজের দুহাতে মুখ ঢেকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান দুটো তখনো লজ্জার রঙে জ্বলছে।
কলেজের ব্যস্ততা শেষে রিদি ও পৃথা গল্প করতে করতে গেটের দিকে এগিয়ে আসছিল। পৃথা হঠাৎ রিদির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “কিরে, তোকে ছেড়ে কিছু সময়ের জন্য একটু আলাদা হয়েছিলাম, ফিরে দেখি তুই গায়েব! তোকে খুঁজতে খুঁজতে আমার পাগল হওয়ার দশা, কোথায় গিয়েছিলি তুই?”
রিদি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “কোথায় আর যাব, একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম ভাই!”
পৃথা যেন ছাড়ার পাত্রী নয়, সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছোট করে বলল, “ও আচ্ছা? কিন্তু আমি তো সেদিকেও খুঁজেছি, পেলাম না তোকে!”
রিদির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। পৃথা এখন সিআইডির মতো জেরার ওপর জেরা করছে। সত্যিটা বললে যে সে কী পরিমাণ পচাবে, সেটা রিদি ভালো করেই জানে। সে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ মেরে রইল। পরিস্থিতির মোড় ঘোরাতে চট করে বলল, “আরে চল তো ভাই, বাড়ি ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
কথামতো দুজনে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রিদি গাড়ির দরজা খুলবে এমন সময় হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এল এক অচেনা, ভারী আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর, “কেমন আছেন, মিষ্টি ম্যাডাম?”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৩৬
কণ্ঠস্বরটি এতই রহস্যময় ছিল যে রিদি থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদেহী এক সুদর্শন যুবক। লোকটার চোখগুলো অদ্ভুত—ঠিক যেন বিড়ালের মতো তীক্ষ্ণ। রিদি কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার মনে হলো, এই সম্বোধনটা—’মিষ্টি ম্যাডাম’—সে যেন আগেও কোথাও শুনেছে। হৃদপিণ্ডের গতি যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, কিন্তু স্মৃতি হাতড়েও সে জায়গাটা মনে করতে পারল না।
রিদি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার ভেসে এল সেই একই কণ্ঠস্বর, কিছুটা ধীর আর গম্ভীর, “ম্যাডাম কি খুব তাড়া আছে বাড়ি ফেরার?”
