অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৭ (২)
রিদিতা চৌধুরী
দরজার ওপাশে মায়ের কণ্ঠস্বরের তীব্রতা আর নিজের ভেতরের প্রবল অস্থিরতা—সব মিলিয়ে ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে আছে। সৌহার্দ্য কোনোরকম তড়িঘড়ি করে এলোমেলো শার্টটা টেনেটুনে গায়ে জড়াল। তার চোখে-মুখে তখনো আগের আবেশের রেশ লেগে আছে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে কঠিন পাথরের মতো শক্ত করে নিল।
গভীর একটা শ্বাস নিয়ে সে দরজার লকটা খুলল। সামনে মাকে অস্বাভাবিক রকমের বিচলিত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্য কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলল। কণ্ঠস্বরে যতটা সম্ভব স্বাভাবিকতা টেনে এনে সে ধীর-স্থির গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আম্মু? তোমাকে এত টেন্স লাগছে কেন?”এভরিথিং ওকে?”
শাহেদা চৌধুরীর স্থির দৃষ্টি ছেলের ওপর পড়তেই তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে দেরি করলেন না। সৌহার্দ্যের এলোমেলো অবয়ব দেখে তাঁর চোখের কোণে এক চিলতে বিষণ্নতা খেলে গেল। তিনি কিছুটা সতর্ক ভঙ্গিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে নিচু গলায় বললেন, “তোর আব্বুর হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠেছে। একটু দেখবি বাবু?”
মায়ের সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে সৌহার্দ্য নিজের অবিন্যস্ত পোশাকের দিকে তাকাতেই অস্বস্তিতে পড়ে গেল। স্বভাবতই সে এসবের ধার ধারে না, কিন্তু আজ কেন জানি এক অদ্ভুত লজ্জা তাকে গ্রাস করল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে কোনোমতে ধীর গলায় বলল, “ঠিক আছে, তুমি যাও। আমি আসছি।”
দরজাটা সামান্য ঠেলে সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দ্রুত নিজেকে গুছিয়ে নিল। আয়নায় রিদির দিকে তাকাতেই দেখল, মেয়েটা লজ্জায় একদম পাকা টমেটোর মতো লাল হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সৌহার্দ্য রিদির খুব কাছে গিয়ে তার চিবুক ছুঁয়ে একটু ঝুঁকল, তারপর ঠোঁটে আলতো একটা চুম্বন এঁকে আদুরে গলায় ফিসফিস করে বলল, “ওয়েট করো, আসছি আমি, ওকে?”
রিদি লজ্জা আড়াল করতেই বোধহয় আরও বেশি কুঁকড়ে গেল। মিনমিনে গলায় শুধু বলল, “ঠিক আছে।” রিদির সম্মতির পর সৌহার্দ্য দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে বাবার ঘরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য বেরিয়ে যেতেই রিদি এতক্ষণ আটকে রাখা দীর্ঘশ্বাসটা এক নিমেষে ছাড়ল। লজ্জায় তার গাল দুটো আগুনের মতো গরম হয়ে আছে। নিজের দিকে তাকিয়ে সে অবাকই হচ্ছে—কীভাবে সে এমন নির্লজ্জের মতো সৌহার্দ্যকে কাছে পাওয়ার আবদার করল! ভাবতে গিয়েই সংকোচে তার মুখটা রাঙা হয়ে উঠল।
অন্যদিকে, সারহান চৌধুরীর ঘরে ঢুকে সৌহার্দ্য দেখল, তার বাবা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে বুক চেপে বসে আছেন। বাবাকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দ্রুত পায়ে বাবার শিয়রে গিয়ে বসে সে উদ্বিগ্ন হাতে পরীক্ষা করতে লাগল। তারপর বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, “মেডিসিন খাওনি তুমি? মেডিসিন নিলে তো এমনটা হওয়ার কথা নয়।”
সৌহার্দ্যের সরাসরি প্রশ্নে সারহান চৌধুরী কিছুটা থমকে গেলেন। সত্যিটা বললেই ছেলেটা রেগে আগুন হবে, অথচ মিথ্যে বলার মতো মানসিক শক্তিও যেন তাঁর শরীরে নেই। তিনি কিছুটা আমতা-আমতা করে বললেন,
“না মানে… আসলে…”
বাবার জড়তা দেখেই সৌহার্দ্য পুরোটা বুঝে গেল। সে বিরক্তিতে চোয়াল শক্ত করে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “মেডিসিন বক্সটা দাও আম্মু।”
সৌহার্দ্যের কণ্ঠের শীতলতা বুঝতে পেরে সারহান চৌধুরী নিজেকে সামলানোর চেষ্টায় কিছুটা আড়ষ্ট গলায় বললেন, “ওষুধ তো শেষ হয়ে গিয়েছিল, আনতে মনে ছিল না আমার।”
বাবার এহেন দায়িত্বহীনতা আর নিজের অসুস্থতা নিয়ে এই হেয়ালিপনায় সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। তার রাগ যেন মাথায় উঠে গেছে। কোনো প্রতিউত্তরে না গিয়েই সে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। সারহান চৌধুরী ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন, তার অবহেলায় সৌহার্দ্য কতটা ক্ষুব্ধ হয়েছে।
প্রায় এক ঘণ্টা পর সৌহার্দ্য ওষুধ নিয়ে ফিরল। বাবার শিয়রে বসে অত্যন্ত যত্নসহকারে তাকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে সে বাবার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তারপর অভিমানী গলায়, অনেকটা ক্ষোভ আর ভালোবাসার মিশেলে বলল, “কেন এমন করো আব্বু? তোমরা দুইজন ছাড়া তোমার এই ছেলের আর আছেই বা কে? নিজের শরীরের প্রতি এত অবহেলা কেন? আমাকে কি একটুও টেনশন-ফ্রি লাইফ লিড করতে দিবা না? দিন দুয়েক পরপরই ওষুধের বেলায় এমন হেয়ালিপনা কেন?”
ছেলের এমন আকুতিভরা কণ্ঠস্বর শুনে সারহান চৌধুরীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন, তার ছেলে বাইরে থেকে যতই কঠিন হওয়ার ভান করুক, ভেতরটা আসলে অনেক বেশি নরম। তিনি ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “আর এমন হবে না, তুমি টেনশন করো না। রাত অনেক হয়েছে, এখন গিয়ে ঘুমাও।”
সৌহার্দ্য বাবার দিকে শেষবার একপলক তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বাবার খেয়াল রাখার ইঙ্গিত দিয়ে সে ধীর পায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য রুমে ঢুকে দেখল রিদি ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে শার্টটা খুলে ফেলল, তারপর আলতো করে রিদির পাশে শুয়ে পরম যত্নে মেয়েটাকে নিজের বুকে টেনে নিল। রিদির কপালে একটা স্নিগ্ধ চুম্বন এঁকে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “একটা নড়বড়ে জেনারেটর জুটেছে কপালে! কাছে গেলেই যেন মাইনফিল্ডের মতো ফেটে পড়ে। করব না বালের বাসর? স্টুপিড মহিলা, একটু জেগে থাকলে কী হতো?”
কথাগুলো বলেই সৌহার্দ্য যেন রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। নিজের উন্মুক্ত বুকে রিদির মুখটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল সে, যেন কোনো অভিমান বা অস্থিরতা তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে আছে। রিদির গায়ের ঘ্রাণটুকু গভীর শ্বাসে টেনে নিয়ে সে চোখ বুজল।
সকাল প্রায় আটটা। রিদি তখনো ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন। সৌহার্দ্য কিছুক্ষণ আগেই উঠে ফ্রেশ হয়ে এসেছে। নিজের স্ত্রীকে এখনো ঘুমের অতলে হারিয়ে যেতে দেখে তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। সে ঝুঁকে রিদির কপালে আলতো করে চুমু খেল, তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “হার্ট, ওঠো। কলেজে যেতে হবে জান আমার! ওঠো সুইটহার্ট?”
রিদি চোখ মেলে তাকাল। চোখের সামনে সৌহার্দ্যকে এতটা কাছে পেয়ে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। সে দুই হাতে সৌহার্দ্যকে জড়িয়ে ধরে আদুরে ও ঘুম-ঘুম কণ্ঠে বলল, “আজ না গেলে হয় না?”
রিদির এমন আবদার শুনে সৌহার্দ্য তাৎক্ষণিক নিজের মুখটা কঠোর করে নিল। একরাশ বিরক্তি ফুটিয়ে সে রিদির হাত নিজের গলা থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বলল, “নোপ। ওঠো, হারি আপ।” বলেই সে নিজের শার্টটা প্যান্টের ভেতর ইন করতে আবার বলল, “আমার লেট হচ্ছে রিদিতা, দ্রুত ওঠো।”
সৌহার্দ্যের এই হুট করে বদলে যাওয়া মেজাজ দেখে রিদি কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। অলসতা ঝেড়ে সে বিছানা থেকে কোনোমতে উঠে বসল। টেবিলের ওপর খাবার রাখা দেখে সে বুঝল শাহেদা চৌধুরী দিয়ে গেছেন; ইদানীং তিনি প্রায় সকালেই এমনটা করেন। রিদি কাপড় নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। বাইরে বেরিয়ে এসে তাড়াহুড়ো করে হালকা নাস্তা সেরে সৌহার্দ্যের সাথে সে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
ক্লাসরুমের নিস্তব্ধতাকে চিরে রিদি, সুমি আর সায়েমের ফিসফাস যেন এক গোপন জগৎ গড়ে তুলেছে। বাইরের পৃথিবীর সাথে তাদের কোনো সংযোগই নেই। ক্লাসে সৌহার্দ্যের উপস্থিতি দশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়েও যখন সে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হলো, তখন তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ভেতর থেকে একটা বিষাক্ত আগ্নেয়গিরি যেন ধিকিধিকি জ্বলছে।
হঠাৎ সায়েমের চোখাচোখি হতেই সে ভড়কে গেল। গলার ভেতরে শুকনো ঢোক গিলে সে একটু সরে বসল। সায়েমের মনে পড়ে গেল সেই দুঃসহ স্মৃতির কথা—কদিন আগেই রিদির সাথে এভাবে ঘেঁষে বসার অপরাধে তাকে যে চেম্বারে ডেকে নিয়ে সৌহার্দ্য এক ঘণ্টা এক পায়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল! সায়েমের মনটা বিদ্রুপে ভরে উঠল। সে জানে, দোষটা আসলে রিদির—নিজ থেকেই সে এসে এমনভাবে জুড়ে বসে যে সায়েম কোনোমতে নিস্তার পায় না। অথচ সব দোষ তো শেষমেশ ওই অসহায় সায়েমেরই হয়! বিড়বিড় করে সায়েম আক্ষেপ করল, “খাটাশ বউটাকে তো কিছু বলার সাহস নেই, সব আক্রোশ দেখায় আমার মতো অবলা প্রাণীর ওপর!”
সায়েমের স্বগতোক্তি শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্যের গমগমে, গম্ভীর স্বর পুরো ক্লাসরুমে বিদ্যুতের মতো আছড়ে পড়ল, “আজ পুরো ব্যাচের অ্যাসাইনমেন্টের দায়িত্ব তোমার, সায়েম। আজকের দিনের শেষেই আমার টেবিলে সব রেডি চাই।”
সায়েমের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এবার সৌহার্দ্যের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল রিদির ওপর। কণ্ঠটা আগের চেয়েও শীতল, কঠোর, “ইউ, মিসেস চ্যাটারবক্স! স্ট্যান্ড আপ।”
রিদি চমকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। তার সারা শরীরে ভয়ের একটা কাঁপন। সে খুব ভালো করেই জানে, ক্লাসের চার দেয়ালের মাঝে সৌহার্দ্যের সাথে তার কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক নেই। এখানে সৌহার্দ্য কেবল একজন কঠোর, গম্ভীর শিক্ষক। সৌহার্দ্য তিরিক্ষি মেজাজে প্রশ্ন করল, “আজকের লেকচার সম্পর্কে সংক্ষেপে বলো?”— কথাটি শুনে রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। সে তো মনোযোগ দিতেই পারেনি, কী বলবে এখন? শুকনো ঢোক গিলে সে আমতা-আমতা করে বলল, “সরি স্যার, আর হবে না!” সৌহার্দ্যের বিরক্তি যেন বাঁধ মানল না। সে কর্কশ কণ্ঠে নির্দেশ দিয়ে বলল, “ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকো!”
হঠাৎ ক্লাসের এক কোণে তনিমার বাঁকা হাসি সৌহার্দ্যের নজরে পড়ল। রিদির অসহায়ত্ব নিয়ে সেই বিদ্রুপাত্মক হাসি সৌহার্দ্যকে যেন আরও অস্থির করে তুলল। সে রিদির দিক থেকে নজর না সরিয়েই রাগে গর্জে উঠল, “ইউ! হোয়াটএভার, গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস!” তনিমা কিছু বলার চেষ্টা করতেই সৌহার্দ্য তার দিকে না তাকিয়েই কঠোর কণ্ঠে বলল, “আউট!” তনিমা ভয়ে তড়িঘড়ি বেরিয়ে যেতেই সৌহার্দ্য ক্লাসে মনোযোগ দিল।
দীর্ঘ এক ঘণ্টা পর ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সৌহার্দ্য দেখল, রিদি রাগে টমেটোর মতো লাল হয়ে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই দৃশ্য দেখে সৌহার্দ্যের ভেতরের রাগটা যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল। সে একটা ফাইল নিয়ে রিদির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফাইলটা ওর দিকে এগিয়ে দিল। কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে গভীর দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু স্বরে বলল, “সিট ডাউন, মিসেস সৌহার্দ্য। এই ফাইলটা নিয়ে আমার চেম্বারে আসো, আর্জেন্ট!”
সৌহার্দ্য বেরিয়ে যেতেই রিদি রাগে ফুঁসে উঠে বিড়বিড় করে উঠল, “গন্ডার একটা! যাব না আমি আপনার কাছে। ক্লাসে এসে টিচারগিরি দেখাবে, চেম্বারে নিয়ে জামাইগিরি দেখাবে—ছেঁচড়া লোক একটা!”
রিদি দাঁড়িয়ে আছে সৌহার্দ্যের চেম্বারের সামনে। “না আসব না” বলেও শেষ পর্যন্ত আসতে হয়েছে। মনে নিজেকে বারবার শক্ত করছে—ফাইলটা যদি সৌহার্দ্যের জরুরি কোনো কাজের হয় আর সেটা না পেলে যদি কোনো বড় বিপদ ঘটে, সেই চিন্তাতেই সে এসেছে। তবে ঠিক করে এসেছে, ফাইলটা দিয়েই এক সেকেন্ড দাঁড়াবে না। এই লোকের সাথে একটা কথাও বলবে না। কী পেয়েছে তাকে? যখন যা খুশি তাই বলবে, আবার দুই মিনিট পর ভালোবাসা দেখাবে—রিদির এমন ভালোবাসা চাই না।
রিদি সবেমাত্র চেম্বারের দরজায় পা রাখতে যাবে, ঠিক তখনই দুটি বলিষ্ঠ হাত তাকে টেনে নিয়ে দরজার পাল্লার সাথে পিঠ চেপে আটকে ধরল। রিদির পিঠ দরজার কাঠের সাথে ঠেকে গেল, আর সামনে থেকে সৌহার্দ্যের শরীরের উষ্ণতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে ফেলল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সৌহার্দ্যের আঙুলগুলো আলতো করে রিদির হিজাবটা টেনে সরিয়ে দিল।
রিদি যখন ভীত-বিহ্বল চোখে সৌহার্দ্যের দিকে তাকাল, দেখল তার চোখের গভীরে এক মাতাল করা নেশা আর উন্মত্ত অধিকারবোধ উপচে পড়ছে। সৌহার্দ্যের বুকের ধুকপুকানি তখন রিদির প্রতিটি স্পন্দনের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। রিদির শরীরের প্রতিটি লোমকূপ তখন উত্তেজনায় কাঁপছে, অথচ সৌহার্দ্য যেন সেই কাঁপুনির উৎসটাকেই চিনে নিতে মরিয়া। সৌহার্দ্য ঝুঁকে পড়ে রিদির উন্মুক্ত গ্রীবায় মুখ গুঁজে দিল। তার নিশ্বাসের উত্তাপ রিদির চামড়ায় এক তীব্র দহন সৃষ্টি করছে। সেখানে অগোছালো চুমুর তোড়ে রিদির সারা শরীর যখন শিহরিত হয়ে উঠছে, সৌহার্দ্য ঠিক তখনই আলতো অথচ জোরালোভাবে দাঁত বসাল তার নরম ত্বকে। রিদির ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এল এক অস্ফুট, যন্ত্রণামিশ্রিত দীর্ঘশ্বাস—যেখানে ব্যথার চেয়েও ছিল এক তীব্র শিহরণের মাদকতা।
রিদি ব্যথায় কাবু হয়ে নিজের হাত দুটো দিয়ে সৌহার্দ্যকে সামান্য সরানোর চেষ্টা করতেই, সৌহার্দ্যের চোখে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তি আর সেই সঙ্গে তীব্র কামনার প্রতিফলন। সে মুহূর্তের জন্য মাথা তুলে রিদির কাঁপতে থাকা চোখের গভীরে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠস্বর তখন নেশা আর পুরুষালি আবেশে ভারী হয়ে উঠেছে; “ব্যাঙের মতো লাফালাফি না করে ফিল করো আমাকে, হার্ট।”
বলেই সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রিদির ওষ্ঠের ভাঁজে গভীরভাবে ডুব দিল। সৌহার্দ্যের এই উন্মাদনা যেন সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ রিদির ঠোঁটের ওপর নিজের অধিপত্য চালিয়ে, সৌহার্দ্য মুখ তুলে হাঁপাচ্ছে। কপাল কপাল মিলিয়ে, কাঁপা-কাঁপা নেশালো স্বরে বলল, “আ-আই কান্ট কন্ট্রোল, জান। আই ব্যাডলি নিড ইউ, রাইট নাও।”
বলেই নিজের শার্টটা এক ঝটকায় খুলে ফেলে দিল। রিদি সৌহার্দ্যের এমন উন্মাদ আচরণে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে বলল, “এ-এখানে আ-আপনি এমন করছেন, আমার ভয় লা…”
রিদির কথা শেষ হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য তার সারা মুখে অসংখ্য চুমু এঁকে দিয়ে উন্মাদ অথচ শান্ত কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল, “আই প্রমিস, আই উইল বি জেন্টল। ইউ জাস্ট ফোকাস অন মি!”
সৌহার্দ্যের আলতো ছোঁয়ায় রিদির সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। নিজের অজান্তেই সে সৌহার্দ্যের চওড়া পিঠ আঁকড়ে ধরল।
সৌহার্দ্য তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “তোমার এই জড়তাটুকুই আমাকে আরও পাগল করে তুলছে, সুইটহার্ট।”
তার প্রতিটি স্পর্শে রিদি যেন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করল। একসময় শরীর ও মনের সমস্ত জড়তা কাটিয়ে সে সৌহার্দ্যের ভালোবাসার সমুদ্রে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল।
সেই নিবিড় মুহূর্তে তারা দুজনে যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সৌহার্দ্যের প্রতিটি হৃদস্পন্দন রিদির অস্তিত্বের সাথে মিশে একাকার হয়ে রইল।
দীর্ঘ সময় পর যখন চারপাশ স্তব্ধতায় ভরে উঠল, সৌহার্দ্য রিদির ঘাড়ের কাছে মুখ রেখে গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারা দুজনে যেন ভালোবাসার এক পরম আশ্রয়ে নতুন এক পৃথিবীর দেখা পেল।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। সৌহার্দ্যের উন্মুক্ত বুকের ওপর মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন রিদি।
কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থাকার পর সৌহার্দ্য তাকে পরম মমতায় সরিয়ে আলতো করে উঠে দাঁড়াল। দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে মেঝেতে পড়ে থাকা শার্টটা জড়িয়ে নিল।
রিদি তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার মুখটায় ক্লান্তির ছাপ।
সৌহার্দ্য ধীর হাতে রিদির ছড়িয়ে থাকা কাপড়গুলো গুছিয়ে নিল এবং খুব যত্ন করে তাকে পোশাক পরিয়ে দিল।
কাজটা শেষ করে সে রিদির পাশে গিয়ে বসল। শান্ত, ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতর এক গভীর মমতা কাজ করল।
সে ঝুঁকে পড়ে রিদির কপালে ও চোখের পাতায় আলতো করে চুমু খেল, যেন তার সমস্ত ক্লান্তি নিজের স্নেহের পরশ দিয়ে মুছে দিতে চাইছে।
চুমু খাওয়ার পর রিদির ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্য একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা নিজের ফোনটা তুলে নিয়ে সরাসরি সুজনকে কল করল। অপর প্রান্ত থেকে রিসিভ হতেই কোনো কিছু শোনার অপেক্ষা না করে সৌহার্দ্য বিরক্ত ভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “সুজন, ফাস্ট! আমার চেম্বারের আশপাশটা ক্লিয়ার করে দে, আমি বের হব! হারি আপ, ইন টেন মিনিটস!”
সুজন সৌহার্দ্যের কথার অর্থ বুঝতে পারল না। ছেলেটা কিছুক্ষণ আগেও সৌহার্দ্যের কেবিনের সামনে থেকে ঘুরে এসেছে। তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে জিজ্ঞেস করেও জেনেছে যে সৌহার্দ্য হাসপাতালে নেই। সুজন এক প্রকার বিরক্ত স্বরে তেতে উঠে বলল, “আশ্চর্য! হাসপাতাল কি আমার বাপের নাকি? আর তুই কী আকাম করছিস যে এভাবে চোরের মতো বের হতে হবে? তোর চেম্বারে দুইবার গিয়ে ফিরে আসলাম, তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট বলল তুই হাসপাতালে নাই—এখন কোথা থেকে টপকালি? ফোন করছি, ফোনটা পর্যন্ত বন্ধ!”
সুজনকে আর বলতে না দিয়ে সৌহার্দ্য রাগে ফেটে পড়ে বলল, “তোকে যেটা বলা হয়েছে সেটা কর, অ্যান্ড টেন মিনিটস এর মধ্যে! আর মানুষের প্রাইভেট টাইমে ডিস্টার্ব করবি না, ইডিয়েট!”
সুজন বুঝতেই পারল না হাসপাতালে সৌহার্দ্যের কিসের প্রাইভেট টাইম। সে তিড়বিড়িয়ে বলল, “হাসপাতালে তোর কিসের প্রাই…”
পুরোটা বলার সুযোগ না দিয়েই সৌহার্দ্য ঢাস করে ফোনটা কেটে দিল।
সুজন রাগ আর বিরক্তি নিয়ে যেতে-যেতে বিড়বিড় করে বলল, “আমি উপরে গিয়ে আগে আল্লাহর কাছে আমার পাপের হিসাব চাইব। কোন পাপে আমার কপালে এমন কয়টা বন্ধু নামের শত্রু জুটেছে! একটা আমার না-হওয়া বউ নিয়ে টানাটানি করছে, একটা সব সময় ফাঁসিয়ে দেয়, আর এই মুড-অফ লিমিটেডটা তো আমাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে!” বলেই গজরাতে গজরাতে চলে গেল সৌহার্দ্যের চেম্বারের দিকে।
প্রায় পনেরো মিনিট পর সুজন মোটামুটি সৌহার্দ্যের চেম্বারের আশপাশটা ক্লিয়ার করে সৌহার্দ্যকে ফোন দিল। রিসিভ হতেই সুজন বলল, “ক্লিয়ার কর…” পুরো কথা শেষ করার আগেই সৌহার্দ্য গমগমে স্বরে বলল, “ওকে, আমার চেম্বারটা ক্লিন করিয়ে রাখিস!” বলেই ফোনটা কেটে দিল।
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৪৭
সুজন বুঝল না কেন চেম্বার ক্লিন করে রাখতে হবে। সে আবার ফোন দিতে যাবে, তার আগেই সৌহার্দ্য রিদিকে পাঁজাকোলে নিয়ে বের হলো। সেদিকে তাকিয়ে সুজনের মুখটা হা হয়ে গেল। বেচারা যেন শ্বাস নিতেই ভুলে গেল! রিদিকে সৌহার্দ্যের কোলে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকতে দেখে যা বোঝার সে এক নিমেষেই বুঝে গেল। বুকে এক অদ্ভুত মোচড় দিয়ে উঠল তার। বন্ধুত্বের এক গভীর, অব্যক্ত ভার আর কিছুটা বিস্ময় নিয়ে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর নাক-মুখ কুঁচকে, গলার স্বর নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “বিয়ে করছে জঙ্গলে, বাসর করছে চেম্বারে; আর বাচ্চা কোথায় পয়দা করবে এটা! আর যেটা বের হবে সেটা কেমন হবে?”
