Home অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬১

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬১
রিদিতা চৌধুরী

দুপুর বারোটা।মাথার ওপর রোদটা যেন আগুন হয়ে চেপে বসেছে। ভ্যাপসা গরম আর প্রখর রোদের তীব্রতায় চারপাশের প্রকৃতি এক অদ্ভুত স্থবিরতায় আচ্ছন্ন। সেই রোদের ঝিলিক তিরতির করে আছড়ে পড়ছে কাচের জানালায়। প্রকৃতিতে তখন এক অলস, মায়াবী ও পরম প্রশান্তির স্তব্ধতা।
ডাক্তার শাহানা জাহানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেম্বার পেরিয়ে সৌহার্দ্য আর রিদি যখন বাইরে এসে দাঁড়াল, তখন তীব্র রোদের মাঝেও তাদের পৃথিবীটা অন্যরকম এক আবেশে মোড়ানো। রিদির ছোট্ট দুই চোখের পলক যেন আর পড়তে চাইছে না। সে অবচেতনভাবেই নিজের পেটের ওপর হাত বোলাচ্ছে আর পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবছে— সত্যিই কি তার ভেতরে একসঙ্গে দুটি প্রাণ নিঃশব্দে বেড়ে উঠছে?

রিদির বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক অচেনা কাঁপনে থরথর করে কেঁপে উঠল। নিজের অজান্তেই পেটের ওপর রাখা হাতটি সে আরও গভীর মমতায়, আরও আঁকড়ে ধরে রাখল। একজন মায়ের কাছে তার সন্তানের অস্তিত্বের ছোঁয়া পাওয়ার মুহূর্তটিই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র ও আপন মুহূর্ত— এই অদ্ভুত উপলব্ধি রিদির পুরো সত্তাকে যেন এক স্বর্গীয় সুখে ভরিয়ে দিল। একসঙ্গে দুটি সন্তান! শুধু এই ভাবনাটিই তার বুকের ভেতর আনন্দের এমন এক উত্তাল ঢেউ তুলে দিল, যা সে চোখ দিয়ে প্রকাশ করতে পারছে না।
অন্যদিকে সৌহার্দ্যের অবস্থা আরও মারাত্মক! সে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো ধন হাতে পেয়েছে। এক হাতে রিদির কোমল হাত শক্ত করে ধরে আছে, আর অন্য হাতে আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টটায় বারবার চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। রিপোর্টের পাতায় চোখ আটকে থাকলেও তার মাথার ভেতর যেন হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। আনন্দের চেয়ে এখন অদ্ভুত এক টেনশনই বেশি কাজ করছে তার মধ্যে।
সৌহার্দ্য অতি যত্নে রিদিকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে নিজে গিয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। সৌহার্দ্য উঠে বসতে না বসতেই রিদি চট করে তার কোলে উঠে এল। দুহাতে শক্ত করে তার গলা জড়িয়ে ধরে, চোখে চোখ রেখে পরম মায়াবী স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“আপনি খুশি, ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য কী উত্তর দেবে! ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হওয়ার পর থেকেই সে যেন কেমন একটা ঘোরলাগা আবেশের মধ্যে আটকে আছে। খুশির তীব্রতা তো আছেই, কিন্তু তার চেয়েও এক অদ্ভুত অজানা টেনশন যেন এই মুহূর্তে তাকে বেশি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। অনুভূতির এমন আকস্মিক ঝড়ে তার মুখ ফুটে কোনো শব্দই বের হলো না।
কোনো কথার জবাব না দিয়ে সৌহার্দ্য শুধু রিদিকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে, পরম আশ্রয়ের মতো জড়িয়ে ধরল। তারপর ওই অবস্থাতেই এক হাতে স্টার্ট দিল গাড়ি। রিদিও আর কোনো কথা বাড়াল না। ছোট্ট একটি অবুঝ খরগোশ ছানার মতো নিঃশব্দে, পরম যত্নে লেপ্টে রইল সৌহার্দ্যের বুকের ঠিক মাঝখানটায়।

সৌহার্দ্যের চেম্বার।চারপাশে যেন থমথমে একটা নীরবতা ঝুলছে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জরুরি একটি জটিল কেস ফাইল নিয়ে মগ্ন হয়ে কাজ করছে সুজন আর সৌহার্দ্য।
হঠাৎ করেই ঘরের সেই নীরবতা ভেঙে সুজন কাজ থেকে চোখ তুলে তাকাল সৌহার্দ্যের দিকে। কণ্ঠে এক অদ্ভুত চাপা অস্বস্তি নিয়ে সে বলে উঠল,
“ওই ব্যাপারটা কিন্তু একটু বেশি-বেশি হয়ে গেছে, সৌহার্দ্য!”
সৌহার্দ্য প্রথমে বুঝতে না পেরে একটু অবাক দৃষ্টিতে সুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। পরমুহূর্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুজন গলা নামিয়ে বলল,
“তোর চাচা, বীর বলল পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতেছে। আর এটাই স্বাভাবিক— এত বড় একজন ক্রিমিনাল…”
কথাটা শেষ হতে দিল না সৌহার্দ্য। বিরক্তিতে তার মুখ শক্ত হয়ে গেল। কঠোর কণ্ঠে সে উড়িয়ে দিল কথাটা,

“বাদ দে তো! আর বেশি কিছুই হয়নি। যার যেটা প্রাপ্য ছিল, সেটাই পেয়েছে!”
সুজনের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গাঢ় হলো। সে কিছুটা নিচু গলায় সতর্ক করার সুরে বলল,
“এটা নিয়ে যদি বাড়াবাড়ি কিছু হয়… কী বলতে চাচ্ছি বুঝছিস তো? বীরও কিন্তু যথেষ্ট টেনশনে আছে!”
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সৌহার্দ্য। গভীর কোনো ভাবনায় নিমগ্ন হলো সে। পরক্ষণেই কোনো রকম দ্বিধা বা চিন্তা ছাড়াই শীতল আত্মবিশ্বাসে বলে উঠল,
“কিছুই হবে না। এসব ফালতু টেনশন বাদ দে! কিছু হলেও সামলে নেব আমি!”
বন্ধুর এই দৃঢ়তায় কিছুটা যেন ভরসা পেল সুজন। সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,
“আরহান ভাইয়ের জন্য কী করলি?”
এবার সৌহার্দ্যের বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস। চোখেমুখে একরাশ ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব ফুটিয়ে সে বলল,
“চেষ্টা তো করলাম। মনে হয় মিনিমাম দুই-তিন বছর আগে কিছু করা যাবে। তবুও চেষ্টা চালাচ্ছি। দেখা যাক কী হয়!”
এরপর আর কোনো কথা বাড়াল না কেউ।দুই জন আবারও ডুব দিল তাদের কাজের গভীরে

সন্ধ্যা প্রায় সাতটা !,খান বাড়ির ড্রয়িং রুমে চলছে জমজমাট আড্ডা। একপাশে বসে আছে রিদি, পৃথা আর রিভা। তাদের সাথে যোগ দিয়েছে আরিফা খানের ননদের দুই মেয়ে— জুঁথি ও মেঘা, আর আকাশের বউ তন্বী। দুপুরবেলা সৌহার্দ্য রিদিকে খান বাড়িতে নামিয়ে দিয়েই আবার হাসপাতালের উদ্দেশ্যে চলে গিয়েছিল। গত রাতে রিদি যখন সৌহার্দ্যকে কিছুতেই রাজি করাতে পারেনি, তখন উপায় না পেয়ে শাহবীরকে ফোন দিয়েছিল। সেই ফোন কলই কাজ করেছে— শাহবীর শুধু সৌহার্দ্যকে রাজিই করায়নি, সাথে বাকিদেরও আসার জন্য বলে দিয়েছে, বিয়ে শেষ হওয়া পর্যন্ত এই বাড়িতে থাকবে।
সবার হাসিখুশি আর গল্পের আড্ডার ঠিক মাঝখানে ড্রয়িং রুমের মেইন দরজা খুলে একে একে ভেতরে প্রবেশ করল শাহবীর, আকাশ, সুজন, ফারিস এবং সৌহার্দ্য।
আরিফা খান এগিয়ে গিয়ে সৌহার্দ্যের দিকে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বললেন, “ভালো আছো, বাবা?”
সৌহার্দ্য ছোট্ট করে জবাব দিল, “জি।”

ব্যস, এটুকুই! এর বেশি আর কোনো কথা নেই। আরিফা খান মনে মনে একটু অসন্তুষ্ট হলেও মুখে তা প্রকাশ করলেন না। এই ছেলের কাঠখোট্টা স্বভাব তাঁর খুব ভালো করেই জানা আছে। তাই তিনি কোনো অস্বস্তি না রেখে বাকিদের সাথেও হাসিমুখে কুশলবিনিময় করলেন আর তাদের বসিয়ে নাস্তার ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
আরিফা খান যেতেই ফারিস আর টিকতে পারল না। সে সোফায় একেবারে চিৎ হয়ে এলিয়ে বসে দুষ্টু হাসিতে রিদির দিকে তাকিয়ে টেনে টেনে বলে উঠল, “কী গো, ভাবিজান, কেমন আছেন?”
রিদির মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে এল। ফারিস এমনি তাকে সবসময় শুধু ‘রিদি’ বলেই ডাকে, অথচ সৌহার্দ্যের সামনে আসলেই সে ইচ্ছে করে টেনে টেনে ‘ভাবিজান’ বলে ক্ষেপাতে শুরু করে। রিদি লাজুক মুখে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য নিজের মেজাজ আর ধরে রাখতে পারল না। সে সজোরে ফারিসের হাঁটুতে একটা লাথি বসিয়ে ফিসফিস করে হিসহিসিয়ে উঠল, “আর একবার তোর মুখ থেকে ওই বাজে নাম বের হলে, তোকে এখান থেকে ছুড়ে খন্দকার বাড়ি ফেলব, ইডিয়ট!”

বলেই সে রিদির দিকে ঘুরল। চোখ রাঙিয়ে রাগে আগুন হয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “স্টুপিড! এখানে বসে আছ কেন? রুমে যাও!”
সৌহার্দ্যের এমন আকস্মিক ধমকে ফারিস বিরক্ত হয়ে সোজা হয়ে বসে বলে উঠল, “আরে আমি কি তোর বউকে খে…”
কিন্তু সৌহার্দ্যের খঞ্জরের মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটা দেখেই ফারিসের বাকি কথা গলাতেই আটকে গেল। ঢোক গিলে সে সাথে সাথে ভোল পাল্টে রিভার দিকে তাকাল এবং এক মুহূর্ত নষ্ট না করে বলে বসল, “ভাই, আমার একটা খরগোশের বাচ্চার মতো নরম-সরম বউ আছে ঘরে! এভাবে চোখ দিয়ে খুন করিস না ভাই, তাহলে খরগোশের বাচ্চাটা এখনই বিধবা হয়ে যাবে! তোর বো…”
কথাটা পুরো বের হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য এক ঝটকায় তার পাশ কাটিয়ে সোফায় বসে পড়ে দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে উঠল, “ইডিয়ট!”

এত কাণ্ডকারখানার মাঝেও সুজনের এক জোড়া চোখ স্থির হয়ে আটকে আছে মেঘার দিকে। চারপাশে কী সব ঘটে গেল, কে কাকে কী বলল— তার একটা শব্দও যেন সুজনের কানে পৌঁছায়নি। একত্রিশ বছর বয়সে এসে একটা ছোট্ট মেয়ের প্রতি চোখ আটকে যাওয়াটা নিজের কাছেই অদ্ভুত ঠেকছে তার। মনে মনে ভাবছে, এই বয়সে এসে এমন একটা বাচ্চা মেয়ের ওপর নজর পড়তে হলো! ভাবতেই নিজের ওপর নিজের রাগ হচ্ছে। অথচ শত চেষ্টা করেও বারবার মেঘার ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিতে সে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে কারও নজর না পড়লেও ফারিসের তীক্ষ্ণ চোখ ঠিকই সুজনের ওপর স্থির ছিল। সুজনের এই আনমনা চাহনি দেখে ফারিস গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ মজা নিয়েই বলে উঠল, “কী দিনকালই না এল! দামড়া দামড়া সব ছেলেরা এখন বাচ্চা মেয়েদের ওপর নজর দেয়!”
ফারিসের খোঁচাটা কানে যেতেই সুজন এক মুহূর্তে চমকে বাস্তবে ফিরে এল। থমথমে মুখে চোখ সরিয়ে নিলেও চরম একটা অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরল। একটু ইতস্তত করে সে ফারিসের ঠিক পাশেই গিয়ে বসল। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফিসফিস করে বলে উঠল, “নিজের দিকে তাকিয়ে দেখ, তুই নিজেও তো একই গোয়ালের গরু!”

ফারিস কিছু একটা বলে কড়া জবাব দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ট্রে হাতে নাস্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমে হাজির হলেন আরিফা খান।
ওদিকে সৌহার্দ্যের চোখ কখন থেকে রিদির ওপর আটকে আছে। অথচ মেয়েটা একবারের জন্যও তার দিকে ফিরেও তাকাল না! চারপাশের মানুষগুলোকে কাছে পেয়ে তার বউ যেন তাকে ভুলেই বসেছে— এই অবহেলাটা সৌহার্দ্যের বুকের ভেতর কেমন যেন হু হু করে বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সহ্য করতে না পেরে সে হুট করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সোজা রিদির সামনে গিয়ে গমগমে, ভারি অথচ নিচু স্বরে আদেশ করল, “ইউ বোঁচা নাক, রুমে এসো!”
বলেই সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে গটগট পায়ে ড্রয়িং রুম ছেড়ে চলে গেল।
সৌহার্দ্যের এমন আচমকা হুকুমে ড্রয়িং রুমের সবার চোখ গিয়ে পড়ল রিদির ওপর। বিশেষ করে আকাশের বউ তন্বী, জুঁথি আর মেঘার চোখ দুটো কৌতূহলে বড় বড় হয়ে গেল। তবে সৌহার্দ্য এমন আচরণে অভ্যস্ত হওয়ায় তাদের মুখে কোনো বাড়তি প্রতিক্রিয়া নেই।
সৌহার্দ্য চলে যেতেই বাতাসে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা কেটে গেল। তন্বী কৌতূহলী দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—

“ওর নাক তো কত সুন্দর, সৌহার্দ্য ভাই বোঁচা বলল কেন?”
তন্বীর এমন নিষ্পাপ কৌতূহল দেখে রিভা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না; খিলখিল করে হেসে উঠে সে বলে উঠল—
“ভাইয়া ভাবীকে দুনিয়ার সব আজগুবি নামে ডাকে; আপনি শুনলে অবাক হয়ে যাবেন!”
রিভার কথা শেষ হতে না হতেই রিদির ভেতরটা লজ্জায় আকুল হয়ে উঠল। তার বেগতিক অবস্থার আর শেষ নেই; লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠেছে শ্যামবর্ণের মুখটা। মনের ভেতর একরাশ ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে সে ভাবছে— এই লোকটার সত্যিই কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই! কতবার শক্ত করে মানা করেছে সবার সামনে যেন এই অদ্ভুত নামগুলো বলে তাকে লজ্জা না দেয়, কিন্তু কার কথা কে শোনে? এই মানুষটা কি কখনো কারো কথা শোনার পাত্র? সে তো নিজের খেয়ালেই চলে!
ওদের এই খুনসুটির মাঝেই ফারিস হঠাৎ শাহাবীরের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল—

“দোস্ত, বারবিকিউ পার্টি করলে কেমন হয় বল তো?”
শাহাবীর একটু ভেবে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলে উঠল—
“মন্দ হয় না! যা, সব বের কর, আমি বাকি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি!”
কথাটা ফুরোতেই সুজন, ফারিস আর আকাশ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে হুল্লোড় করতে করতে বাগানের দিকে চলে গেল। ওরা চলে যাওয়ার পর তন্বীর মনে হঠাৎ এক অন্যরকম ফুর্তি জাগল। হাততালি দিয়ে সে বাকিদের দিকে তাকিয়ে প্রস্তাব দিল—
“চল, আমরা শাড়ি পরি?”
রিদি আর রিভা উৎসাহের সাথে সায় দিলেও পৃথা আলস্যভরে মাথা নেড়ে বলল—
“আমি পরব না, শরীরটা একদম ভালো লাগছে না।”
কিন্তু তন্বী কি আর সহজে ছাড়ার পাত্রী? সে নাছোড়বান্দা হয়ে জোর করাতে পৃথা শেষ পর্যন্ত আর মানা করতে পারল না। সবাই মিলে শাড়িগুলো হাতে নিয়ে ছুটে গেল আরিফা খানের কাছে; কারণ নিখুঁত কুঁচি দিয়ে অসম্ভব সুন্দর শাড়ি পরানোর জাদুকরী হাত কেবল তাঁরই আছে! আরিফা খান পরম যত্নে সবাইকে শাড়ি পরিয়ে দিলেন। এরপর মুগ্ধ হয়ে রিদির পানে তাকিয়ে স্নেহের সুরে বলে উঠলেন—

“মাশাল্লাহ, আমার চাঁদটাকে আজ সবার থেকে বেশি সুন্দর লাগছে!”
কারও নজর না লাগে— বলেই তিনি স্নেহের ছোঁয়ায় রিদির কানের কাছে একটু কালো কাজলের ফোঁটা লাগিয়ে দিলেন। ওনার এমন স্নেহের কথায় সবার চোখ গিয়ে আটকে গেল রিদির ওপর। পৃথা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে হেসে বলল—
“সত্যিই রিদি, তোকে এই কালো শাড়িতে অসম্ভব মায়াবী লাগছে! এই মুহূর্তে স্যার যদি তোকে দেখে তো একদম ফিদা হয়ে যাবেন!”
পৃথার কথায় রিদি লাজুক পায়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। সবার অকুণ্ঠ প্রশংসায় তার গাল দুটো লজ্জায় আরও টকটকে লাল হয়ে উঠল। রিদির এই মিষ্টি আড়ষ্টতা দেখে তন্বী আর নিজেকে সামলাতে পারল না, দুষ্টুমিভরা হাসিতে চোখ টিপে বলে উঠল—

“তাহলে আর দেরি করছেন কেন, ভাবি, যান না গিয়ে ভাইয়াকে একটু দেখিয়ে আসুন!”
বলেই ওরা সবাই মিলে রিদিকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে রিদির রুমের সামনে দিয়ে আসল।
রিদি মৃদু কাঁপাকাঁপা বুক নিয়ে যখন রুমে পা রাখল, তখন সৌহার্দ্য ল্যাপটপের স্ক্রিনে মুখ গুঁজে পুরোমাত্রায় নিমগ্ন। তার সবটুকু মনোযোগ তখন শুধু ওই স্ক্রিনেই আটকে আছে। রিদি একটু এগিয়ে গিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করল, কিন্তু সৌহার্দ্যের কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। সে যেন আজ পণ করে বসেছে, কিছুতেই ল্যাপটপ থেকে চোখ সরাবে না।
অবশেষে তীব্র অভিমান আর বিরক্তি নিয়ে রিদি গিয়ে একেবারে সৌহার্দ্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কোমরে হাত রেখে কিছুটা অভিযোগের সুরে বলে উঠল, “আপনি আমাকে দেখছেন না কেন?”
ল্যাপটপে টাইপ করতে করতেই বিরক্ত কণ্ঠে সৌহার্দ্য জবাব দিল, “তোমার কি এক্সট্রা দুটো শিং গজিয়েছে নাকি যে দেখতে হবে?”

আসলে রিদি রুমে প্রবেশের মুহূর্তেই সৌহার্দ্য টের পেয়েছিল। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে তাদের নতুন হাসপাতালটার উদ্বোধন; সেই প্রজেক্টের জরুরি কিছু কাজ নিয়ে সে তখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু রিদির অনবরত বকবকানিতে বিরক্ত হয়ে সৌহার্দ্য যখন বাধ্য হয়ে ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে তাকাল, তখন হঠাৎ করেই তার হাতের আঙুলগুলো কিবোর্ডে জমে গেল!
গাঢ় কালো শাড়িতে রিদিকে দেখে সৌহার্দ্য যেন মুহূর্তের জন্য নিজের সব কিছু ভুলে গেল। রুমের মৃদু আলোয় রিদিকে কোনো অপ্সরী বা স্বর্গের পরীর চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছিল না, ঠিক যেন এক জীবন্ত স্বপ্ন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সৌহার্দ্য দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে এক হাতে নিজের শার্টের দুটো বোতাম খুলে ফেলল; মনে হচ্ছিল এসির শীতল হাওয়ায়ও তার বুক চিরে নেমে আসা ভালোলাগার গরমে শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।

তবে রিদির চোখের মায় হারিয়ে যাওয়ার ভয় থেকে সে নিজেকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করল। হৃদয়ে জমে ওঠা তীব্র আকুলতা আর ভালোবাসার সেই ঘোর কাটিয়ে উঠতে সে মরিয়া হয়ে উঠল। কিবোর্ডের বোতামে বারবার আঙুল ছুঁইয়ে সে যেন এই মোহময় আবেশ থেকে নিজেকে বাঁচানোর এক প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে লাগল। রিদির চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে বুক কেঁপে উঠছিল বলেই সে কৃত্রিম বিরক্তি ফুটিয়ে তুলে বলল, “হা করে দাঁড়িয়ে আছ কেন, স্টুপিড?”
রিদি তো ভেবেছিল— আজ এত সুন্দর করে শাড়ি পরে সামনে আসলে সৌহার্দ্য মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে, মনের সুখে দু-চারটে রোমান্টিক প্রশংসা করবে। কোথায় তা, উল্টো এই লোক তাকে ধমকে বসল! রাগে আর অভিমানে রিদির গলা ধরে এল, চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, “ডাক্তার সাহেব, আপনি একটুও রোমান্টিক না! এত সুন্দর করে সেজে এলাম, একবার তাকিয়ে দেখলেনও না? কখনো একটু ‘ভালোবাসি’ও বলেন না, এ…”

নিজের ভেতরের তীব্র ভালোলাগা আর কামনার অস্থিরতা আর সামলাতে পারল না। সৌহার্দ্য রিদির কথা শেষ করতে না দিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, “স্টুপিড মহিলা, ভালোবাসি না যখন ‘ভালোবাসি’ কেন বলব? আই ডোন্ট লাভ ইউ। আর রোমান্টিক না বলে দুটো নিয়ে ঘুরছ, রোমান্টিক হলে তো ফুটবল টিম নিয়ে ঘুরতে!”
রিদি সৌহার্দ্যের এই সব কঠোর কথায় মোটেও পাত্তা দিল না। বরং অদম্য অভিমানে সে সৌহার্দ্যের আরও একটু কাছে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “দেখুন না একবার, শাড়িতে কেমন লা…”
রিদিকে নিজের এত কাছে আসতে দেখে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু হলো। রিদির কাজল কালো চোখের চাহনি আর তার শরীরের স্নিগ্ধ ঘ্রাণে সৌহার্দ্য যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে বিরক্তি আর অস্থিরতায় ঠাসা গলায় সে ধমকে উঠল, “আউট!”
রিদি এবার আর ধৈর্য ধরতে পারল না। অপমানে বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। বিড়বিড় করে সৌহার্দ্যকে অস্ফুট স্বরে গালি দিতে দিতে দুপ-দাপ পা ফেলে সে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

রাত প্রায় এগারোটা। বাড়ির সবুজ বাগানে গোল হয়ে বসে চলছে জমজমাট আড্ডা। সামনে রাখা গরম গরম পোড়া মুরগি, নরম পরোটা, জুস আর কোক— যার যেটা মন চাচ্ছে খাচ্ছে। তবে ফ্রেশ জুস দেওয়া হয়েছে শুধু রিদি, পৃথা আর তন্বীর জন্য; ওরা প্রেগন্যান্ট বলেই সৌহার্দ্য বিশেষভাবে ওদের জন্য জুসের ব্যবস্থা করেছে।
সবাই খাওয়া-দাওয়া আর হাসিখুশিতে ব্যস্ত থাকলেও, সৌহার্দ্য ঘাসের ওপর আধশোয়া হয়ে এক হাতে ফোন টিপছে আর আড়চোখে দেখছে তার বউকে। রিদির গোলগাল মুখটা তখন অভিমানে থমথমে, গাল ফুলিয়ে বসে আছে সে। সেই তখন থেকে সৌহার্দ্যের সাথে একটা কথাও বলেনি, এমনকি ফিরে তাকায়নি পর্যন্ত! সৌহার্দ্যের পাশে বসা তো দূরের কথা, সে গিয়ে বসেছে পৃথার ঠিক পাশে।

হঠাৎ করেই ঘটে বিপত্তি! জুসের গ্লাসে একটা চুমুক দিতেই রিদির নাকে-মুখে মারাত্মক বিষম লেগে গেল। কাশতে কাশতে তার একেবারে নাজেহাল অবস্থা।
তা দেখে এক মুহূর্তও দেরি না করে সৌহার্দ্য দ্রুত রিদির কাছে ছুটে গেল। তাকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে পরম যত্নে মাথার তালুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“হোয়াট হ্যাপেন্ড জান? ঠিক আছ?”
কাশির বেগ একটু কমে এলে রিদি মাথা নেড়ে শুধু বলল, “হুম।”
রিদিকে স্বাভাবিক হতেই সৌহার্দ্যের ভেতরকার চিরচেনা রাগী রূপটা বেরিয়ে এল। একরাশ বিরক্তি ঝেড়ে সে রিদিকে ধমক দিয়ে বলে উঠল,
“আস্তে-ধীরে খেতে পারছ না, স্টুপিড!”

সৌহার্দ্যের এই কড়া ধমক শুনে রিদির মনে পড়ে গেল আগের সব অভিমান। সে সৌহার্দ্যের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে অভিমানী গলায় বলে উঠল,
“ছাড়ুন আমাকে, এত দরদ দেখাতে হবে না!”
সৌহার্দ্য বিরক্তি নিয়ে পাল্টা কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফারিস হো হো করে হেসে উঠে চারপাশ মাতিয়ে দিল। টিপ্পনী কেটে সে বলে উঠল,
“বাহ! কী দিনকাল এল রে বাবা, বাঘকে এখন বিড়াল ঝাড়ি মারে! আজকাল বাঘের…”
কিন্তু ফারিসের কথা আর শেষ হলো না! সৌহার্দ্য ফারিসের দিকে বিরক্তি দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে রিদিকে একেবারে পাঁজাকোলে তুলে নিল, তারপর বড় বড় পা ফেলে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল!

সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে চলে যেতেই শাহবীর একপাশে সরে গেল তার কল আসায়। তার দেখাদেখি একে একে বাকিরাও আড্ডা ভেঙে উঠে চলে গেল। বাগানে তখন শুধু রয়ে গেল সুজন আর মেঘা। মেঘা একটু ধীরেসুস্থে খাচ্ছিল বলে তখনও তার খাওয়া শেষ হয়নি।
চারপাশে ফাঁকা হয়ে যাওয়া দেখে মেঘা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে থালাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যাবে, ঠিক তখনই কোথা থেকে হুট করে হাজির হলো ফারিস! মেঘার দিকে তাকিয়ে সে মিষ্টি হেসে বলল,
“উঠতে হবে না, সিস্টার, তুমি ধীরেসুস্থে খাও।”
এরপর সুজনের দিকে দুষ্টু একটা চোখের ইশারা মেরে সে জোরে বলে উঠল,
“তোমাকে পাহারা দেওয়ার জন্য এই আমার সিঙ্গেল বন্ধুকে রেখে গেলাম। দোয়া করি, তোমরা দুজন যেন মিঙ্গেল হয়ে ফিরে আসো!”
কথাটি বলেই ফারিস এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না, এক দৌড়ে সেখান থেকে উধাও হয়ে গেল।
ফারিসের এমন রসিকতায় মেঘা তো লজ্জায় লাল! সে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই সুজন নরম কিন্তু চটপটে গলায় বলে উঠল,

“খাওয়া শেষ করে যাও, পিচ্চি!”
মেঘার মনে হলো, এরা সবাই তার থেকে বয়সে অনেক বড়, বড় ভাইয়ের মতোই তো! এই ভেবে সে ইতস্তত করলেও শেষ পর্যন্ত আবার নিজের জায়গায় বসে পড়ল।
সুজন একদৃষ্টিতে পলকহীন তাকিয়ে আছে মেঘার দিকে। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা ভেঙে সে জিজ্ঞেস করল,
“নাম কী, পিচ্চি?”
মেঘাও লাজুক মুখে আস্তে করে জবাব দিল,
“জি, মেঘা ইসলাম, ভাইয়া!”
কথাটা কানে যাওয়া মাত্রই সুজন নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল। বিরক্তিটা কোনোমতে চেপে ধরে সে বলল,

“নামটা সুন্দর, কিন্তু আমার নামের সাথে মিলল না! আচ্ছা যাক, কোন ক্লাসে পড়ো, পিচ্চি?”
মেঘা মনে ভাবল, তার নাম ওই দামড়া মানুষটার নামের সাথে কেন মিলতে যাবে? তবুও মনে মনে মুখ ভেংচে মিনমিন করে জবাব দিল,
“ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে, ভাইয়া!”
ব্যস, ‘ভাইয়া’ শব্দটা শুনলেই যেন সুজনের রাগ এবার আকাশ ছুঁতে চায়! দাঁতে দাঁত চেপে সে কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলে উঠল,
“প্রতি লাইনে লাইনে ভাইয়া-ভাইয়া করছ কেন, পিচ্চি? আমি তোমার ভাই হতে চাচ্ছি না, সাইয়া হতে চাচ্ছি!”
সুজনের মুখ থেকে আচমকা এমন কথা শুনে মেঘা তো একদম থমকে গেল! সে ড্যাবড্যাব করে অবুঝ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুজনের দিকে। তা দেখে সুজন দুষ্টু হেসে চোখ টিপে বলে উঠল,

“প্রেম করবে, পিচ্চি? রোজ তোমাকে দুটো করে চকলেট কিনে দেবো!”
মেঘা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না সে কী শুনল! তার মাথায় যেন আস্ত একটা আকাশ ভেঙে পড়ল। এই আধা-বুড়ো লোকটার সাথে সে প্রেম করতে যাবে কোন দুঃখে? বয়স তো কম হলো না মানুষটার, অথচ শখ দেখো একটা কাঁচা বয়সের মেয়ের সাথে প্রেম করার! মনে মনে লোকটাকে আস্ত একটা আজেবাজে পাত্র হিসেবে সার্টিফিকেট দিয়ে সে ভাবল, ইস! প্রথমে মানুষটাকে কত না ভালো মনে হয়েছিল!
নাক-মুখ কুঁচকে চরম বিরক্তিতে মেঘা ঝাঁঝিয়ে উঠল,
“আমি কেন আপনার মতো আধবুড়ো লোকের সাথে প্রেম করতে যাব? একটা বুড়ো লোক হয়ে বাচ্চা মেয়ের সাথে প্রেম করতে চাচ্ছেন?”
বলেই সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না, থালাটা হাতে নিয়ে হনহন করে চলে যেতে নিল।
তা দেখে সুজন চেয়ারে বসেই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“তোমাকে দেখে নিজের বয়স ভুলে গেছি, পিচ্চি! চলো, দুজনে মিলে বাংলাদেশকে একটা ফুটবল টিম উপহার দিই, দেশের উপকার হবে, পিচ্চি!”
সুজনের এমন ফাজলামো ভরা কথা শুনে মেঘা পেছন ফিরে রাগী দৃষ্টিতে একটা দারুণ ভেংচি কাটল, তারপর আর পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

মেঘা চোখের পলকে দূরে হারিয়ে যেতেই, সুজনের বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা দীর্ঘশ্বাস। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মায়াবী মুচকি হাসি ফুটিয়ে সে ধপ করে নরম ঘাসের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন বাতাসে ভর করে হাজির হলো ফারিস! সুজনের শোয়ার ভঙ্গি নকল করে সেও ঠিক তার পাশেই ধপ করে ঘাসের ওপর গা এলিয়ে দিল। এক কনুইয়ে ভর দিয়ে সুজনের মুখের দিকে ঝুঁকে কৌতূহলী গলায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে, সেটিং হলো?”
সুজনের বুকের ভেতর তখন টানাপোড়েন চলছে। একরাশ না-পাওয়ার আক্ষেপ গলায় মেখে মাথার নিচে হাত দুটো গুঁজে সে হতাশার সুরে বলে উঠল,
“না, মনে হচ্ছে না সহজ হবে!”

কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তো ফারিস নয়! চোখের পলকে চোখের ইশারায় দুষ্টু একটা ছলাকলা ফুটিয়ে সে খিকখিক করে হেসে উঠল। সুজনের কাঁধে একটা হালকা থাপ্পড় দিয়ে পরামর্শের সুরেই বলে বসল,
“চল তোকে কট খাইয়ে দিই, এভাবে পটানোর আশা নিয়ে বসে থাকলে এই জীবনে তোর প্রেম হবে না?”
ততক্ষণে সুজনের মেজাজটা বেশ চড়ে গেছে। বিরক্তি গলায় মিশিয়ে সে পাশ ফিরে কড়া গলায় জবাব দিল,
“তোর বাজে কথা রাখ। একজন সম্মানিত কার্ডিওলজিস্ট ডাক্তার হয়ে বাচ্চা মেয়ে নিয়ে কট খাব, লোকে কী বলবে?”
ফারিস তাতে একটুও কান দিল না। হাতের এক ঝটকায় তার কথা উড়িয়ে দিয়ে বুক ফুলিয়ে সে বলল,

“আমি এমপি হয়ে কট খেলে, তুই ডাক্তার হয়ে কট খেতে সমস্যা কী? এত টেনশন নিচ্ছিস কেন? সৌহার্দ্যও তো বউ নিয়ে কট খেল! আমরা না হয় সব কট খাওয়া মাল হলাম?”
তারপর একটু ভেবে দুষ্টু বুদ্ধিতে মনটা চকচক করে উঠলে সে যোগ করল,
“বাকি রইল আকাশ আর বীর, ওদেরও কট খাইয়ে দেব। তুই একদম টেনশন করিস না!”
ফারিসের এমন পাগলপ্রায় ফাজলামো দেখে সুজনের মন সায় না দিলেও উপায় না পেয়ে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ফারিসের পাগলামিতে শেষ পর্যন্ত মাথা নেড়ে সায় দিয়ে সে বলল,
“ঠিক আছে, আগে বীরের বিয়েটা হোক, দেখি তার মধ্যে পটানো যায় কিনা?”
ফারিস হয়তো আরও একটা দারুণ কোনো ফন্দি আঁটতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই রাতের শীতল হাওয়াকে কাটিয়ে নিঃশব্দে সেখানে এসে হাজির হলো শাহাবীর আর আকাশ। একটুও শব্দ না করে তারা দুজনেই সুজন আর ফারিসের পাশে ধপ করে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। শাহাবীর চোখ দুটো একবার কুঁচকে তীক্ষ্ণ ও সন্দিগ্ধ এক দৃষ্টিতে তাকাল সুজন আর ফারিসের মুখের দিকে। ওদের ফিসফিসানি দেখে মনে সন্দেহ দানা বাঁধতেই সে গম্ভীর ও ঠান্ডা গলায় বলে উঠল—

“কী ঘোল পাকাচ্ছিস? আমরা আসায় চুপ হয়ে গেলি!”
সুজন কিছু বলার আগে ফারিস চটজলদি জবাব দিল,
“কী ঘোল পাকাব আবার? আকাশের তারা গুনছিলাম!”
আকাশ একপাশে হাত রেখে বলল,
“একজন মিসিং। সৌহার্দ্যকে ডেকে নিয়ে আয়?”
শাহবীর বাধা দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“থাক, রিদি একা!”
ফারিস নাক-মুখ কুঁচকে টিপ্পনী কেটে বলে উঠল,
“ও যখন হাসপাতালে থাকে তখন তোর বোন একা থাকে নাকি?”
শাহাবীর আর কিছু না বলে চুপ করে গেল। সে ভালো করেই জানে এই পাগলগুলোকে বুঝিয়ে কোনো লাভ নেই। তাই সে আকাশের সাথে নিজের অফিসিয়াল কাজের কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল!

খাটের এক কোণে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে রিদি। সৌহার্দ্য কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে কখন থেকে— মেয়েটাকে বারবার শাড়িটা পাল্টাতে বলছে, অথচ সে একরোখা হয়ে শুনছেই না, উল্টো তেজ দেখিয়ে বসে আছে।
অবশেষে সৌহার্দ্যের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল রিদির একদম কাছে। রিদিকে টেনে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল সে। রিদির শাড়ির আঁচল আর ঘাড়ের কাছ থেকে ব্লাউজের অংশটুকু খানিকটা নামিয়ে দিয়ে নিজের খোঁচা খোঁচা দাড়ির স্পর্শ বুলিয়ে দিল তার উন্মুক্ত ঘাড়ে। নেশাতুর কণ্ঠে ফিসফিস করে সে বলল, “আমার কথা শুনোনি, এখন আমার উন্মাদনা সহ্য করো, জান!”
লজ্জায় রাঙা হয়ে কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে রিদি মিনমিন করে বলে উঠল, “ক-কী করছেন, বেবি…”
সৌহার্দ্য নিজের আঙুল রিদির ঠোঁটে ছুঁইয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলল, “ডোন্ট ওরি, আই’ল গো জেন্টল।”

বলেই সে আলতো হাতে রিদির শাড়ির আঁচল সরিয়ে ব্লাউজের বোতামের দিকে হাত বাড়াল। ঠিক তখনই বাইরে থেকে শব্দ করে কেউ দরজা ধাক্কা দিল। কিন্তু এই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থা— তার বিন্দুমাত্র হুঁশ নেই। রিদির নরম গলার ভাঁজে উষ্ণ ঠোঁটের গভীর স্পর্শ দিতে দিতে সে যখন শেষ বোতামটি খুলতে যাবে, তখনই দরজার সেই প্রচণ্ড ঠাস ঠাস শব্দে তার ঘোর ভেঙে গেল।
রাগে ও বিরক্তিতে ফেটে পড়ে সৌহার্দ্য রিদির শাড়ির আঁচলটা তার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রিদি তখনো লজ্জায় রাঙা হয়ে বসে আছে। তার সেই লাজুক মুখের দিকে এক পলক তাকিয়ে সৌহার্দ্য মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল, “দেখে আসছি কার জীবন চলে যাচ্ছে, একটু ওয়েট করো হার্ট!”

বলে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল, এক ঝটকায় দরজাটা খুলল। সামনে সুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৌহার্দ্যের রাগে সারা শরীর কেঁপে উঠল। জিভ দিয়ে চিবিয়ে সে ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠল, “তুই কি ঠিক করে নিয়েছিস যে আমার জীবনটা ছারখার না করে ক্ষান্ত হবি না, ইডিয়ট?”
সুজনের কানে যেন সৌহার্দ্যের রাগী কথাগুলো ঢুকলই না। তার দৃষ্টি তখন সৌহার্দ্যের আধখোলা শার্টের দিকে। চিন্তিত গলায় সে বলে উঠল, “তুই এমন ঘেমে আছিস কেন? কোনো সম…”
কথা শেষ করতে দিল না অধৈর্য সৌহার্দ্য। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলে উঠল, “দূর হ আমার সামনে থেকে! কাল সকালের আগে যেন কাউকে এই রুমের আশেপাশে না দেখি। যদি অন্য কেউও আসে, তোর অবস্থা খারাপ করে দেব, ইডিয়ট!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬০

কথাটি শেষ করেই সুজনের মুখের ওপর ঠাস করে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে।
এদিকে বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে সুজন হতভম্ব হয়ে বিড়বিড় করে উঠল, “আমি আবার কী করলাম! এই জন্যই কারো ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করতে নেই!”

অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬২