অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৪
রিদিতা চৌধুরী
রাস্তার পিচঢালা কালো পথটা মুহূর্তের মধ্যে যেন রক্তে ভেসে গেল। রিভার সেই ছোট, হাসিখুশি শরীরটা বেপরোয়া গাড়িটার ধাক্কায় বেশ কিছুটা দূরে ছিটকে গিয়ে আছড়ে পড়ল। চারপাশের হাজারো কোলাহল যেন এক ফুঁয়ে নিভে গেল। রাস্তার ধারের গাড়ির হর্ন, লোকজনের চেঁচামেচি — সবকিছু মিলিয়ে এক বিভীষিকাময়, ভারী নীরবতা নেমে এল চারপাশে।
সৌহার্দ্য আর ফারিসের পা দুটো যেন মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে গেঁথে গেল। মাথার ওপর যেন আস্ত আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা! ফারিস প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না — সামনে রক্তে ভেসে থাকা মানুষটা আর কেউ নয়, তার জীবনের সবটুকু জুড়ে থাকা মানুষটা!
“রিভা…!” গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে উঠল ফারিস।
দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে। কিন্তু মুখ থেকে আর কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। রিভার ওই নিথর দেহটা ধরে সে পাথর হয়ে বসে রইল। ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে, যেন সে এক মুহূর্তে বোবা হয়ে গেছে! তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে তখন একটাই অদ্ভুত ঘোর — ‘এটা সত্যি নয়, একটা ভীষণ খারাপ স্বপ্ন! একটু পরেই হয়তো এই ঘুম ভেঙে যাবে…!’
এদিকে রিদি রাস্তায় আছড়ে পড়ার কারণে নয় মাসের ভারী পেটে মারাত্মক আঘাত পাওয়ায় যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ছটফট করতে লাগল। তার পরমুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল অবিরত ব্লিডিং।
এই দৃশ্য দেখে সৌহার্দ্য যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ল। তার শরীর অসম্ভব রকমের কাঁপছে, পায়ের তলার মাটিটুকু পর্যন্ত সরে গেছে — নিজেকে সামলানোর মতো শক্তিটুকুও তার আর অবশিষ্ট নেই। কোনো রকমে থরথর করে কাঁপতে থাকা দেহটা টেনে সে রিদির কাছে গিয়ে বসল। রিদি ব্যথায় প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলার দশায়, সে শক্ত করে সৌহার্দ্যের শার্টের কলারের অংশ খামচে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে আর্তনাদ করে উঠল, “ডাক্তার সাহেব, বাঁচান প্লিজ! যন্ত্রণা আর সহ্য হচ্ছে না আমার!”
রিদির এই আকুল আর্তনাদে সৌহার্দ্যের বুকটা ভেতর থেকে চিরে যাওয়ার মতো অবস্থা হলো। সে রিদিকে নিজের বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এরপর কোনোমতে কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে সুজনকে কল দিল। ওপাশ থেকে সুজনের গলা ভেসে আসতেই সে হাড়কাঁপানো আতঙ্কের সুরে চিৎকার করে উঠল, “সুজন! ইমার্জেন্সি… ফাস্ট অ্যাম্বুলেন্স পাঠা। লোকেশন সেন্ড করছি আমি! সাথে ওটি, ইমার্জেন্সি টিম আর নিউরোসার্জারি থেকে শুরু করে গাইনি — সব প্রস্তুতি যেন এক সেকেন্ডের মধ্যে সম্পন্ন থাকে!”
ফোনটা কেটে দিয়েই সে আবার রিদির ফ্যাকাশে মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ল। আলতো করে তার গালে হাত রাখল। ভাঙা, চূর্ণবিচূর্ণ গলায় কোনোমতে নিজের কান্না চেপে সে ফিসফিস করে বলল, “একটু কষ্ট করো লক্ষ্মীটি আমার, এক্ষুনি সব ঠিক করে দিচ্ছি আমি… প্লিজ জান, একটু ধৈর্য ধরো!”
কথাটি শেষ করেই সে চোখ তুলে তাকাল একটু দূরে রক্তে ভেসে থাকা, জ্ঞানহীন হয়ে পড়ে থাকা ছোট বোনের নিথর দেহটার দিকে।
সেই মুহূর্তে সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা এক মোচড়ে থমকে গেল। একদিকে তার জীবনের সবটুকু জুড়ে থাকা স্ত্রী আর অনাগত সন্তান, আর অন্যদিকে স্নেহের ছোট বোন — একই সাথে জীবনের এই চরম দুই বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে যেন সম্পূর্ণ দিশেহারা!
হাসপাতালের কাছাকাছি হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছাতে বিন্দুমাত্র দেরি হলো না। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সৌহার্দ্য রিদিকে নিয়ে এক অ্যাম্বুলেন্সে উঠল, আর সুজনকে ফারিসের সাথে অন্যটায় তুলে দিল। সৌহার্দ্য ভালো করেই জানে — সে আর শাহাবীর যতই পাথর হয়ে পরিস্থিতি সামলে নিক না কেন, ফারিস, সুজন কিংবা আকাশ তা পারে না। এই জায়গাগুলোয় তাদের মন বড্ড দুর্বল, কাঁচের মতো ভঙ্গুর। অথচ আজ রিদির বেলায় সৌহার্দ্যের নিজের ভেতরকার সেই পরিচিত পাহাড়সমান ধৈর্যও যেন ধুলোয় মিশে গেছে। রিদির ক্ষেত্রে সে যে কতটা অসহায় আর চরম ধৈর্যহীন, তা আজ মর্মে মর্মে টের পাচ্ছে সে।
চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে তীব্র ব্যথায় ছটফট করছে রিদি। তার বরফশীতল নরম হাতখানা নিজের বিশাল মুঠোর ভেতর শক্ত করে চেপে ধরে সৌহার্দ্যের গলাটা কাঁপতে কাঁপতে প্রায় ভেঙে এল। ফুঁপিয়ে ওঠার উপক্রম কণ্ঠে সে মিনতি করে উঠল —
“প্লিজ জান, আমাকে ভয় পাইয়ে দিও না। একটু শক্ত হও, সোনা আমার… এই তো আমরা প্রায় চলে এসেছি। আর মাত্র দুটো মিনিট সময় দাও আমাকে, প্লিজ লক্ষ্মীটি!”
কিন্তু রিদি আর পারল না; প্রচণ্ড ব্যথার নিষ্ঠুর আঘাতে নিমিষেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল মেয়েটা। আর তাতেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতর জমা থাকা ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকু এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
আতঙ্কিত চোখে, থরথর করে কাঁপতে থাকা আঙুলে রিদির হাতের পালস পরীক্ষা করতে করতে ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, “হারি আপ! প্লিজ, দ্রুত চলুন!”
এরপর রিদির ওই বিবর্ণ, ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকিয়ে সে পাগলপ্রায় হয়ে বিড়বিড় করতে লাগল — ভগ্ন হৃদয়ের রক্তক্ষরণে ভেসে যাওয়া এক আকুল আর্তনাদ:
“বাঁচব না আমি তোমাকে ছাড়া… এক মুহূর্ত আমার নিঃশ্বাস চলবে না তোমায় ছাড়া! স্টুপিড, আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারবে না তুমি। কেন আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিচ্ছ? প্লিজ, চোখ খোলো… বিশ্বাস করো, আর কখনো তোমার ওপর রাগ করব না, বকব না। তোমার সব কথা শুনব — শুধু একবার প্লিজ, লক্ষ্মীটি আমার, চোখ খোলো!”
এদিকে অন্য অ্যাম্বুলেন্সটির ভেতরে রিভার নিথর দেহটার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফারিস। সেই যে অ্যাম্বুলেন্সে উঠেছে, তারপর থেকে ছেলেটার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হয়নি। সারাদিন অনর্গল বকবক করে যে ছেলেটা চারপাশ মাতিয়ে রাখত, সে আজ যেন কথা বলতেই ভুলে গেছে!
সুজন ফারিসের কাঁপা পিঠে একটা হাত রেখে নরম গলায় সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল, “সব ঠিক হয়ে যাবে ভাই, এভাবে ভেঙে পড়িস না… এই তো আর একটু পথ, আমরা হাসপাতালেই পৌঁছে যাচ্ছি।”
কিন্তু ফারিসের মুখে কোনো টু শব্দ নেই। সে শুধু এক অদ্ভুত ও শূন্য দৃষ্টিতে রিভার দিকে তাকিয়ে রইল — ভয়ে, সংশয়ে আচ্ছন্ন সেই দৃষ্টিতে যেন এক তীব্র আতঙ্ক, যদি সে চোখের পলক একবারও ফেলে, তবে বুঝি মেয়েটা চোখের পলকেই হারিয়ে যাবে!
সুজন নিজেও এই মুহূর্তে বুঝতে পারছে না, এমন পরিস্থিতিতে ফারিসকে কী বলে সে সান্ত্বনা দেবে। তার নিজের বুকটাও তো ফাঁকা হয়ে আসছে। একদিকে ফারিসের এই নির্বাক আর্তনাদ সুজনকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে রিদির অবস্থাও তার মাথার ভেতর তাণ্ডব চালাচ্ছে। রিদির অস্তিত্বজুড়ে রয়েছে দুটি অনাগত প্রাণ, পেটে দুটি বাচ্চা — সব মিলিয়ে সুজন খুব ভালো করেই জানে, এই দুটি মেয়ে তাদের দুই বন্ধু সৌহার্দ্য আর ফারিসের আক্ষরিক অর্থেই জান! এদের গায়ে একটু আঁচড় লাগলেও ওই দুই পাগল বাঁচবে না, তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবে!
হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের করিডোরে পাথর হয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছে সৌহার্দ্য। তার ঠিক পাশেই থমথমে মুখে বসে আছেন সারহান চৌধুরী আর শাহবীর। খন্দকার বাড়ির লোক থেকে শুরু করে সবাই ছুটে এসেছে হাসপাতালে; চারপাশের মানুষের চাপা কান্না আর হাহাকারে যেন পুরো হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
ফারিসকে সামলাতে সৌহার্দ্য সবাইকে ফারিসের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। এমনকি শাহেদা চৌধুরীকেও সে অনুরোধ করেছে ফারিসের দিকটায় নজর রাখতে — দরকার হলে সে নিজেই ডেকে নেবে। সে শাহবীরকেও ফারিসের কাছে পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু শাহবীর একচুলও নড়েনি। তার চোখ দুটো কান্নায় লাল হয়ে ফুলে আছে। নিজের বোনটাকে যে বড্ড ভালোবাসে সে! আজ এতদিন পর ফিরে পেয়ে বোনটাকে আবার হারানোর সেই তীব্র আতঙ্ক তাকে গ্রাস করে নিয়েছে।
রিদিকে যখন হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তখন রিদির সাথে অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার জন্য সৌহার্দ্য ভীষণ পাগলামি শুরু করেছিল। কিন্তু ডক্টর শাহানা জাহান তখন শাহবীরকে দিয়ে তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাইরে শান্ত করে গেছেন। কারণ, সৌহার্দ্যের তখনকার বিধ্বস্ত ও উন্মাদ অবস্থা দেখেই ডাক্তার বুঝেছিলেন — ভেতরে রিদির ওই কঠিন ও সংকটাপন্ন পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখার মতো কোনো মানসিক স্থিতি বা শক্তি সৌহার্দ্যের তখন একবিন্দুও নেই!
নিস্তব্ধতা কাটিয়ে দীর্ঘ প্রায় আধা ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন ডক্টর শাহানা জাহান। করিডোরের অপেক্ষারত মানুষগুলোর বুক তখন ধুকপুক করছে। ডক্টরকে দেখা মাত্রই ঝড়ের বেগে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল সৌহার্দ্য। তার শুকনো গলা দিয়ে যেন স্বর বের হচ্ছিল না, থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় সে অস্পষ্ট স্বরে ডেকে উঠল, “ম্যা… ম্যাম, ও…”
সৌহার্দ্যের কাঁপতে থাকা কাঁধে নিজের হাত রাখলেন ডক্টর শাহানা জাহান। গম্ভীর ও দ্রুত কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, “আরও ব্লাড লাগবে, প্রচুর ব্লাড লস হয়েছে! দ্রুত ব্যবস্থা করো।”
এক মুহূর্ত থেমে, সামান্য চিন্তিত ও গম্ভীর কণ্ঠে তিনি আবার যোগ করলেন, “আর বেবিদের সেইফ করতে গেলে…”
ডক্টরের কথা শেষ হওয়ার আগেই যেন মাথার আকাশ ভেঙে পড়ল সৌহার্দ্যের ওপর। উন্মাদ ও উত্তেজিত হয়ে সে চেঁচিয়ে উঠল, “আমার বাচ্চা চাই না! আপনি শুধু আমার স্ত্রীকে বাঁচিয়ে দিন, প্লিজ! ওকে নিয়ে কোনো রকম রিস্ক নেওয়া যাবে না, আমি…”
পরিস্থিতি সামলাতে ডক্টর শাহানা জাহান দ্রুত সৌহার্দ্যের বাহু চেপে ধরে শান্ত গলায় বললেন, “প্লিজ কাম ডাউন, মাই বয়! নিজেকে সামলাও। মা এবং বাচ্চা — তিনজনকেই আমার সাধ্যমতো সেফ করার চেষ্টা আমি করব। তুমি শক্ত থাকো, ভেঙে পড়লে চলবে না! দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করো, ওকে!”
বলেই তিনি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলেন না, দ্রুত পায়ে আবার অদৃশ্য হয়ে গেলেন অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে।
এদিকে ফারিস মায়ের বুকে মাথা রেখে অপারেশন থিয়েটারের দরজার দিকেই পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছে। তার পাশে শাহেদা চৌধুরী বসে আছেন। ফারিসের পিঠে পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কাঁপা গলায় তিনি বলে উঠলেন, “এভাবে চুপ হয়ে আছিস কেন বাপ আমার? একটু শান্ত হ, কথা বল… ইনশাআল্লাহ সব ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু ফারিসের যেন বাইরের জগতের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। দীর্ঘ সময় পর, সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে সে ফিসফিস করে বলে উঠল, “ভালোবাসি বলার আগেই আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যাবি? তোর মুখে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা শোনা কি আমার এই জীবনে আর হবে না, নিষ্ঠুর রমণী?” কথাগুলো বলেই ছেলেটা আবার পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে গেল।
ওটিতে রিভাকে নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো খবরই আসেনি। সুজনও ভেতরেই রয়েছে। খন্দকার বাড়ির সবার অবস্থাই আজ শোচনীয়; রিভাকে সবাই বড্ড ভালোবাসে, সে তাদের পরিবারের প্রাণ। রায়েদা শেখকে খবর দেওয়া হয়েছে, যদিও রিভার বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থার কথা তাকে জানানো হয়নি। শুধু বলা হয়েছে — আগামীকালের মধ্যে আফজাল শেখকে নিয়ে যেন তিনি যেকোনো মূল্যে দেশে চলে আসেন, জরুরি প্রয়োজনে তাদের প্রয়োজন!
ডাক্তার শাহানা জাহান ওটিতে ঢুকেছেন, প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। করিডোরের বাতাসে যেন নিস্তব্ধতার বিষ মিশে আছে। এক ঘণ্টা ধরে কোনো খবর নেই। সৌহার্দ্যের অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে; এসির হিমশীতল বাতাসের মধ্যেও তার শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে, বুকটা ধড়ফড় করছে অসহ্য তীব্রতায়।
ছেলের এই ভঙ্গুর অবস্থা দেখে সারহান চৌধুরী আর স্থির থাকতে পারলেন না। ছেলের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে ভারী গলায় বললেন, “শান্ত হ বাবা, সব ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে নিজেকে শেষ করলে তো চলবে না।”
বাবার স্পর্শ পেতেই সৌহার্দ্য যেন আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার বুকের ওপর, কণ্ঠস্বর তার ব্যাকুলতায় চিরে চিরে বেরিয়ে এল — “আই লাভ হার সো মাচ, বাবা। আই কান্ট লিভ উইদাউট হার!”
সারহান চৌধুরীর চোখদুটোও ঝাপসা হয়ে এল। তিনি জানেন, তার ছেলের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে ওই একটি মেয়ে। তিনি আরও কিছু বলতে চাইলেন, “সব ঠিক থাক…” — কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে গেল।
ডক্টর শাহানা জাহান বেরিয়ে এলেন, তাঁর কোলে তোয়ালেতে জড়ানো ছোট্ট এক অস্তিত্ব। বাচ্চাটা তার গলার সবটুকু শক্তি দিয়ে কেঁদে চলেছে। সেই কান্নার শব্দ কানে যেতেই সৌহার্দ্য এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বাচ্চার দিকে তাকানোরও সময় পেল না সে, অস্থির চোখে ডাক্তার শাহানার চোখের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠল, “আমার ওয়াইফ? রিদিতা ঠিক আছে ম্যাম? ও… ও ঠিক আছে?”
ডক্টর শাহানা জাহান নরম হাসলেন। এরপর কোলে থাকা তোয়ালেতে জড়ানো ছোট্ট বাচ্চাটা সৌহার্দ্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “ইয়েস, মাই বয়, শি ইজ ফাইন! রিদিতা একদম ঠিক আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ওকে কেবিনে দেওয়া হবে। আর অভিনন্দন, দুটো বেবিই বয়! ওনি হচ্ছে বড় জন।”
খবরটা শোনার পর সৌহার্দ্যের বুকের ওপর থেকে যেন পাহাড়সমান একটা চাপ নেমে গেল। সে এক হাত বাড়িয়ে নিজের কাঁপতে থাকা বুকটার সাথে লেপ্টে নিল সদ্যোজাত ছোট্ট মানুষটাকে। বাচ্চার কপালে একটা আলতো চুমু এঁকে সে ব্যাকুল গলায় শাহানা জাহানকে জিজ্ঞেস করল, “ছোট জন কোথায়, ম্যাম?”
ডক্টর শাহানা হাসিমুখে আশ্বস্ত করলেন, “ওর শ্বাস-প্রশ্বাসে সামান্য একটু সমস্যা হচ্ছে, তাই ওকে এখনই চাইল্ড ওয়ার্ডে পাঠাচ্ছি; ভেতরে ওকে পরিষ্কার করা হচ্ছে।”
সৌহার্দ্যের চোখে-মুখে সামান্য ভয়ের ছায়া দেখতে পেয়ে তিনি আবার বললেন, “ঘাবড়ানোর কিছু নেই, সমস্যাটা বড় কিছু নয়।” বলেই তিনি আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত আবার ভেতরে চলে গেলেন।
করিডোরের সারহান চৌধুরী আর শাহবীরও তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। সৌহার্দ্য নিজের কোলজুড়ে থাকা এই ছোট্ট অস্তিত্বটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু গাল বেয়ে নামার আগেই সে এক অদ্ভুত মিষ্টি হাসিতে ফেটে পড়ল। কোলজাত বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বিড়বিড় করতে লাগল — “পাপার কলিজা, স্টুপিড মহিলা! শুধু বারবার কষ্ট দেই, হুম? ওই অবাধ্য মহিলা পাপার কথা শোনে না। একটু সুস্থ হয়ে নিক, এবার অবাধ্য হলে পাপা তুলে আছাড় মারব!”
কথাটা শেষ করেই সে নিজের মনেই মৃদু হাসল। বুকের ভেতরটা সুখে, কান্নায় আর ভালোবাসায় একাকার হয়ে আসছে। বুকের সাথে আরেকটু বাচ্চাটাকে মিশিয়ে নিয়ে আদুরে গলায় সে আবার ফিসফিস করে বলে উঠল — “পাপার জান, বাচ্চা তুমি… পাপার পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর একটা অংশ।”
সারহান চৌধুরী আর শাহবীর এগিয়ে এল সৌহার্দ্যের কাছে। সারহান চৌধুরী সস্নেহে নাতিকে সৌহার্দ্যের কোল থেকে নিজের কোলে তুলে নিলেন, তারপর বাচ্চাটার কানের কাছে ফিসফিস করে আজান দিলেন। আজান দেওয়া শেষে নাতির মুখের দিকে তাকাতেই তিনি যেন ভীষণ অবাক হলেন! তাঁর মনে হলো, কোলজুড়ে থাকা এই ছোট্ট মানুষটা অবিকল ছোটবেলার সৌহার্দ্য! খেয়াল করলেন, বাচ্চাটার কপালটা কেমন কুঁচকে আছে তার ছেলের মতো; মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে সে প্রচণ্ড বিরক্ত! যেন দুনিয়ায় আসার এই হুড়োহুড়ি আর টানাটানি তার মোটেও পছন্দ হয়নি!
শাহবীরও এগিয়ে এসে নিজের ভাগিনাকে আলতো করে আদরে ছুঁয়ে দিল। তবে ছোট বাচ্চা কোলে নিতে সে বরাবরই একটু ভয় পায়, তাই বেশি বাড়াবাড়ি না করে ফোন বের করে একটা ছবি তুলে দ্রুত সুমির কাছে পাঠিয়ে দিল।
এদিকে রিদির খবর পেয়ে সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে বাচ্চাটাকে দেখার দায়িত্ব ও বাকি সব সামলানোর ভার শাহবীরের হাতে সঁপে দিয়ে ফারিসের কাছে ছুটে গেল। যাওয়ার আগে শাহেদা চৌধুরীকে ফোনে রিদির সুস্থতার সুসংবাদটা জানিয়ে দ্রুত এই ওটির করিডোরে চলে আসতে বলল।
রাত তখন প্রায় বারোটা। হাসপাতালের নিস্তব্ধ করিডোরে ফারিসের পাশে চুপচাপ বসে আছে সৌহার্দ্য, শাহবীর আর আকাশ। ফারিসের দৃষ্টি তখনো একভাবে স্থির হয়ে আছে অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজার দিকে। কখন দরজা খুলবে, কখন ডাক্তার বেরিয়ে এসে বলবেন — ‘রিভা এখন শঙ্কামুক্ত’ — শুধু এই একটিমাত্র কথা শোনার জন্যই যেন তার ভেতরের নিঃশ্বাস আটকে আছে। খন্দকার বাড়ির বাকি সবাইও পাথরের মূর্তির মতো নীরব হয়ে বসে আছে সেখানে।
কিছুক্ষণ আগে সৌহার্দ্য একবার ভেতরে গিয়ে রিভাকে দেখে এসেছে। কিন্তু নিজের বোনের সেই মুমূর্ষু অবস্থা দেখার পর ভেতরে টিকে থাকার মতো মানসিক শক্তি তার আর হয়নি। বুক চিরে দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল — যে ডাক্তার শত শত অচেনা রোগীর বুক চিরে হৃৎপিণ্ড ঠিক করে দেয়, আজ নিজের আপন মানুষের সামান্য রক্ত দেখার সাহসটুকুও তার নেই! একজন চিকিৎসক হিসেবে আজ সে বড় বেশি অসহায়।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার রোমহর্ষক অপারেশন শেষে অবশেষে ওটির দরজা খুলল। ক্লান্ত মুখে বেরিয়ে এলেন সার্জন।
দরজা খুলতেই দীর্ঘক্ষণ ধরে জমে থাকা নীরবতা ভেঙে ঝড়ের বেগে ডাক্তারের দিকে ছুটে গেল ফারিস। সৌহার্দ্য দ্রুত এক পা এগিয়ে ফারিসের কাঁধে হাত রেখে ডাক্তারের মুখোমুখি হলো।
ডাক্তার ক্লান্ত পায়ে মাথাটা একটু নিচু করে কাঁপা ও অসহায় কণ্ঠে বললেন, “ওনার মাথার রক্তক্ষরণ কোনোমতে বন্ধ করা গেছে। তবে ওনাকে আমরা লাইফ সাপোর্টে রেখেছি। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছু বলা যাচ্ছে না…”
ডাক্তারের কথা শেষ হওয়া মাত্রই হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ফারিস। ঝটকা মেরে সৌহার্দ্যকে একপাশে সরিয়ে সে সজোরে গিয়ে খামচে ধরল ডাক্তারের কলার। রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সে গর্জে উঠল, “বালের ডাক্তারি করিস, যে একটা রোগীর খবর দিতে চব্বিশ ঘণ্টা সময় লাগে?! বের করছি আমি তোর…”
তার মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। সৌহার্দ্য দ্রুত দুহাতে ফারিসকে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ভাঙা গলায় বলল, “প্লিজ, ফারিস… কুল ডাউন ভাই!”
ফুলে ওঠা বুকের কষ্টে তেতে উঠে ফারিস চিৎকার করে উঠল, “বাল ডাউন হবো আমি?! তোদের এই বালের ডাক্তারিতে আমার ভরসা নেই! আমি ওকে দেশের বাইরে নিয়ে যাবো, এখনই সব ব্যবস্থা কর!”
পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে দেখে শাহবীর দ্রুত এগিয়ে এলো। ফারিসের কাঁধে হাত রেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “ঠিক আছে, ফারিস। তুই একটু শান্ত হ, আমি এখনই সব ব্যবস্থা করছি।”
সৌহার্দ্য তখন এক ইশারায় ডাক্তারকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ফারিসকে আগলে ধরে শান্ত করার চেষ্টা চালাল।
সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে হাসপাতালের নিরিবিলি কেবিনটায়। রিমঝিম আলোয় চোখ পিটপিট করে তাকাতেই রিদি দেখতে পেল, তার বেডের ঠিক পাশেই ছোট্ট একটা বেবি বেড পেতে রাখা হয়েছে। সেখানে ঘুমিয়ে আছে তার সদ্য জন্ম নেওয়া দুই টুকরো প্রাণ। আর তাদের পাশেই পরম যত্নে বসে আছে শাহেদা চৌধুরী।
রিদিকে চোখ মেলতে দেখে তিনি স্নেহে তার পাশে এসে বসলেন। চুলে হাত বুলিয়ে আলতো করে বললেন, “এখন কেমন লাগছে আম্মু?”
রিদি একচিলতে নরম হাসি ফুটিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলল, “ভালো!”
শাহেদা চৌধুরী নাতিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ওদের একটু দেখ, আমি বাথরুম থেকে একটু আসি।”
রিদি সায় জানাতেই তিনি বাথরুমের দিকে চলে গেলেন। রিদি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি — সেই ছোট্ট প্রাণ দুটির দিকে। সন্তানের মুখ দেখতেই এক নিমিষে জুড়িয়ে গেল তার ক্লান্ত বুক, যেন সমস্ত কষ্ট ধুয়েমুছে একাকার হয়ে গেল।
বাচ্চা দুটোকে একটু কাছে টেনে নেওয়ার জন্য রিদি উঠতে চাইল, আর অমনি সিজারের ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কেবিনের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল সৌহার্দ্য। রিদিকে কষ্টে কুঁকড়ে যেতে দেখে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো এবং কিছুটা উদ্বিগ্ন বিরক্তি মিশিয়ে বলে উঠল, “এত বাড়াবাড়ি করতে হয় কেন তোমার? একটু শান্ত হয়ে এক জায়গায় থাকা কি যায় না, স্টুপিড!”
যদিও কথাগুলো ঝাঁঝালো ছিল, তবুও তার স্পর্শটি ছিল ভীষণ যত্নের। আলতো হাতে সে রিদিকে সুন্দর করে পিঠে বালিশ দিয়ে বসিয়ে দিল।
সৌহার্দ্যের মুখপানে তাকিয়ে রিদি খেয়াল করল, তার মুখটা কেমন যেন গম্ভীর আর থমথমে। রিদি উৎকণ্ঠিত হয়ে সৌহার্দ্যের গালে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে আপনার?”
পরের মুহূর্তেই গতকালের দুঃস্বপ্নের মতো সেই ভয়ংকর ঘটনাটা মনে পড়ে গেল তার। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে এলে কাঁপতে কাঁপতে সে জানতে চাইল, “রিভা ঠিক আছে তো?”
সৌহার্দ্যের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ভালো করেই জানে এই মুহূর্তে রিদিকে কোনো রকম টেনশন দেওয়া যাবে না। কোনোমতে নিজের অস্থির মনটাকে শান্ত করে সে ছোট্ট করে উত্তর দিল, “হুম, ঠিক আছে।”
সৌহার্দ্যের মুখে ওই একটিমাত্র কথা শুনে রিদি যেন বুকভরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল!
সৌহার্দ্য রিদির জন্য আনা স্যুপটা বাটি থেকে চামচে তুলে আলতো করে ওর মুখের দিকে বাড়িয়ে দিল। খাইয়ে দিতে দিতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “আম্মু কোথায়?”
রিদি খানিকটা ধীর ও ক্লান্ত কণ্ঠে জবাব দিল, “বাথরুমে!”
জ্ঞান ফেরার পর হাই ডোজের ঘুমের ওষুধের প্রভাবে রিদির ঘুম ভেঙেছে সবেমাত্র সকালে। শরীরে এখনো আচ্ছন্ন ভাব। হঠাৎ উত্তেজনায় তার চোখ দুটো চকচক করে উঠল, “আমাদের কি বেবি হয়েছে ডাক্তার সাহেব?”
সৌহার্দ্য একটু গম্ভীর অথচ শান্ত গলায় বলল, “বয়!”
রিদি আরও কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ছোট ছেলেটা তার ছোট্ট গোলাপী ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠল। সৌহার্দ্য মুহূর্তের মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে তাকে কোলে তুলে নিল। তারপর রিদির দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “খাওয়াতে হবে বাবুকে, খিদে পেয়েছে ওর!”
রিদি কিছুটা জড়সড় হয়ে আমতা আমতা করে বলে উঠল, “আম্মু আসুক…”
সৌহার্দ্য নির্বিকার কণ্ঠে আশ্বস্ত করল, “আমি হেল্প করছি!”
বলেই সে যখন রিদির দিকে হাত বাড়াল, রিদির চোখে মুখে লজ্জার ছায়া দেখতে পেল সে। মুহূর্তেই সৌহার্দ্য চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি টেনে বলল, “এমন একটা ভাব করছো যেন আমার ধরা-ছোঁয়া খাওয়া ছাড়াই ওরা দুনিয়াতে চলে এসেছে?”
কথাটা শুনে রিদি লজ্জায় দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। মনে মনে ভাবল — এই লোকটার সাথে তর্কে যাওয়া মানে নিজের ইজ্জতের বারোটা বাজানো!
বাচ্চার খাওয়ানো শেষ হতেই সৌহার্দ্য তাকে রিদির কোল থেকে আলতো হাতে নিজের কোলে তুলে নিল। ছেলের কপালে একটা স্নিগ্ধ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল, “পাপার জান, ঘুমান এখন!”
খুব যত্নের সাথে ছেলেকে বেডে শুইয়ে দিল সে। এরপর একটু ঝুঁকে রিদির কপালে ছড়িয়ে থাকা উসকো-খুসকো চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে ঠিক করে দিল। তারপর রিদির কপালে নিজের কপালটা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল, “বারবার আমার অবাধ্য হয়ে আমাকে কেন এত কষ্ট দিতে হয় তোমার? কেন বোঝো না, তোমাকে ছাড়া আমার একটা মুহূর্তও নিঃশ্বাস চলে না?”
রিদি ছলছলে চোখে অপলক তাকিয়ে রইল সৌহার্দ্যের পানে। ঠিক সেই মুহূর্তেই বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হতেই সৌহার্দ্য রিদির কাছ থেকে একটু দূরে সরে দাঁড়াল। এরপর ব্যস্ত হাতে রিদির ওষুধগুলো খাইয়ে দিল এবং শাহেদা চৌধুরীকে বাচ্চাদের খেয়াল রাখতে বলে বেরিয়ে গেল!
প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিভার জ্ঞান ফেরেনি। হাসপাতালের ভারী, থমথমে বাতাসে কেবল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ আর বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস। সকালে রায়েদা শেখ আর আফজাল শেখ এসে পৌঁছানোর পর থেকেই করিডোরের পরিবেশটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে। মেয়েকে এই অবস্থায় দেখে রায়েদা বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছেন; কোনোমতে নিজেকে সামলে আবারও আইসিইউর ছোট্ট কাঁচের জানালার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন। নিষ্পলক দৃষ্টিতে ভেতরে তাকিয়ে আছেন নিজের কলিজার টুকরো, ওই নিথর দেহটার দিকে। ফারিসের অবস্থাও শোচনীয় — অপরাধবোধ আর আতঙ্কে সে যেন পাথর হয়ে গেছে।
ডাক্তার সরাসরি ফারিসকে কিছু বলার সাহস না পেলেও, সৌহার্দ্যকে ডেকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন — তাদের চেষ্টার অন্ত নেই, কিন্তু রিভার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মিলছে না। সে কোমায় চলে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে আছে, আর আদৌ তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকরাও নিশ্চিত নন। এখন একমাত্র ভরসা সৃষ্টিকর্তা!
কথাটি শোনার পর সৌহার্দ্যের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গিয়েছিল, সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভেঙে পড়ার সময় এটা নয় — তাই সে কাউকে বিষয়টি জানায়নি। এদিকে শাহবীর আগে থেকেই রিভাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। তখনই নেওয়ার কথা থাকলেও সৌহার্দ্য বাধা দেয়, কারণ ততক্ষণে রায়েদা শেখ ও আফজাল শেখ ফ্লাইটে উঠে পড়েছিলেন। সৌহার্দ্য সিদ্ধান্ত নেয়, ওর বাবা-মা দেশে না পৌঁছানো পর্যন্ত তারা একটু ধৈর্য ধরবে; এর মধ্যে শাহবীরকে বাকি সব বন্দোবস্ত নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে!
আফজাল শেখ যখন এসে পৌঁছান, তখন থেকে রাগে, ক্ষোভে আর গভীর কষ্টে তার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছিল। মেয়েকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। অথচ এই ফারিসকে তিনি কস্মিনকালেও সহ্য করতে পারতেন না, তার জন্যই মেয়েকে বাংলাদেশে আসতে দিতে চাননি তিনি। কিন্তু সৌহার্দ্য দেশে ফিরে আসার পর রিভার জেদের কাছে তাকে হার মানতে হয়।
ছোটবেলা থেকেই রিভা ছিল সৌহার্দ্যের জন্য পাগল। রিভান নিজের আপন ভাই হওয়া সত্ত্বেও রিভার যত টান ছিল সৌহার্দ্যের প্রতি, তা বলাই বাহুল্য। আর তার কারণও ছিল স্রোতের মতো স্পষ্ট — সৌহার্দ্য রিভাকে নিজের মায়ের পেটের ছোট বোনের মতো আগলে রাখতো, ভালোবাসতো পরম যত্নে। আজ সেই বোনটাই হাসপাতালের কাঁচের ওপারে মৃত্যুর সাথে লড়ছে!
রাগে গর্জে উঠে আফজাল শেখ সরাসরি রায়েদা শেখের দিকে তাকালেন। তারপর কঠিন গলায় বলে উঠলেন, “কতবার বলেছি, এই বেয়াদব ছেলের কাছে আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দেবো না? আজ শুধু তোমার জেদের জন্যই আমার মেয়ের এই অবস্থা!”
পাশে দাঁড়ানো ফারিস তখন সম্পূর্ণ নির্বাক। আফজাল শেখের প্রতিটি কথা তার কানে তীরের মতো বিঁধলেও প্রতিবাদ করার মতো কোনো ভাষা বা অধিকার তার ছিল না। সত্য তো এটাই — সে তার ভালোবাসাকে আগলে রাখতে পারেনি!
আফজাল শেখ আরও কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সৌহার্দ্য তীব্র গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “বারবার ওকে এভাবে দোষারোপ করবেন না, মামা! আপনি যতটা ভালোবাসেন, ও আপনার মেয়েকে তার থেকেও বেশি ভালোবাসে!”
সৌহার্দ্যের এমন হঠাৎ ক্ষিপ্ত রূপ দেখে আফজাল শেখ কিছুটা থমকে গেলেন এবং পরিস্থিতি বুঝে আর কথা বাড়ালেন না। নিজেকে সংযত করে গম্ভীর গলায় বললেন, “আমাদের লন্ডন যাওয়ার সব ব্যবস্থা করো। সেখানকার হাসপাতালে তোমার পরিচিত ডাক্তারদের সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিক করে রাখো। আমার মেয়ের যদি সামান্যতম ক্ষতি হয়, তবে আমি কাউকে ছাড়ব না!”
ঠিক সেই মুহূর্তে শাহবীর এগিয়ে এল। তার কণ্ঠ বেশ শান্ত অথচ দৃঢ়, “আঙ্কেল, আপনি শান্ত হন। উত্তেজিত হবেন না। আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি। আশা করি আর মাত্র আধঘণ্টার মধ্যেই আপনারা লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারবেন।”
মাঝখান দিয়ে কেটে গেছে দীর্ঘ তিনটি মাস।
এই তিন মাসে জীবনের নিজস্ব স্রোতে সবাই কমবেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেও ফারিসের পৃথিবীটা সেই থেকে থমকে আছে। সে পড়ে আছে লন্ডনের সেন্ট থমাস হসপিটালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (CCU)-এর ওই নিঃশব্দ কেবিনে। নাওয়া-খাওয়া, ঘুম — সব ভুলে ছেলেটা দিনরাত রিভার শিয়রে বসে থাকে। এই দীর্ঘ নব্বই দিন পার হয়ে গেলেও রিভা এখনও কোমার অন্ধকার ভেদ করে ফিরে আসেনি, তার শরীর থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। অথচ সিসিইউ-এর কঠোর নিয়মে সেখানে কারো থাকার অনুমতি নেই! কিন্তু ফারিসের সেই পাগলাটে, বিধ্বস্ত রূপের কাছে হার মেনে সৌহার্দ্য অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কোনোমতে একটা বিশেষ পারমিশনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এই ক’মাসে সৌহার্দ্য, শাহবীর আর সুজনেরও বহুবার লন্ডন যাওয়া-আসার মধ্য রয়েছে। বলা চলে, তারা যেন ঢাকা আর লন্ডনকে যাতায়াতের সুতোয় এক করে ফেলেছিল!
এদিকে সুমির এখন প্রেগনেন্সির পঞ্চম মাস চলছে। অন্যদিকে, সৌহার্দ্যের যমজ দুই ছেলের বয়স এখন তিন মাস। ফুটফুটে বাচ্চা দুটোর নাম রাখা হয়েছে — সাফওয়ান চৌধুরী এবং সায়ভান চৌধুরী। ছেলে দুটো একদম সৌহার্দ্যের মতো ফকফকে ফর্সা চেহারার অধিকারী; তাদের মুখের অবয়ব দেখলে মনে হয়, ছোট একটা আয়নায় যেন সৌহার্দ্যকেই বসিয়ে দেওয়া হয়েছে!
এই তিন মাসে সৌহার্দ্য আর রিদির সম্পর্কের মাঝে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য পাহাড়সম টানাপোড়েন। রিভা কোমায় চলে যাওয়ার পর থেকে সৌহার্দ্য রিদির সঙ্গে সমস্ত অপ্রয়োজনীয় কথা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে রিদিকে অনেক কটু কথাও শুনিয়েছে; তার তীব্র ধারণা, রিদির একগুঁয়েমি আর অবাধ্যতার কারণেই আজ এই মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে এনেছে।
সেদিন রিদি একটি বারের জন্যও কোনো প্রতিবাদ করেনি। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা সে করেনি, এমনকি মুখ ফুটে একটিবারও বলেনি যে সেদিন রিভার অনুরোধেই সে ঘর থেকে বের হয়েছিল! রিদি নিজেও নিজেকে অপরাধী মনে করে; তার বারবার মনে হয়, তার সামান্য অসচেতনতাই হয়তো এই সর্বনাশ ডেকে এনেছে। তাই এখন বাচ্চাদের প্রয়োজন ছাড়া সৌহার্দ্যের সঙ্গে সে আর কোনো কথাই বলে না। এক ছাদের নিচে থেকেও তাদের দূরত্ব যেন যোজন যোজন।
এত অভিমান আর দূরত্ব সত্ত্বেও রিদির প্রতি সৌহার্দ্যের যত্নের কোনো কমতি নেই। রিদি একটু ‘উফ’ শব্দ করলেই সৌহার্দ্যের বুক কেঁপে ওঠে, আকুল হয়ে সে রিদির পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু ফারিস আর রিভার ম্লান মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলেই রিদির ওপর তার জমাট বাঁধা রাগ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে সেই রাগের চেয়েও বড় এক আতঙ্ক তাকে কুড়ে কুড়ে খায় — সেদিন তো রিদি নিজেও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল! সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যটা মনে পড়লেই তার বুকটা এখনো ছটফট করে ওঠে।
ফারিস হয়তো রিভার এই অবস্থা বুক পাথর করে মেনে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে আছে; কিন্তু সৌহার্দ্যের ভাবনা — সে নিজে হলে তো এই মেয়েটিকে ছাড়া এক সেকেন্ডও নিঃশ্বাস নিতে পারত না, কবেই তার শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যেত! তবুও কেন রিদিকে এমন অবাধ্য হতে হয়? এই প্রশ্নটাই বারবার তার বুকের ভেতর রক্তক্ষরণ ঘটায়।
ড্রয়িং রুমের মৃদু আলোয় ছোট্ট সায়ভানকে কোলে নিয়ে বসে আছে সৌহার্দ্য। ছেলের হাতের ছোট্ট, নরম আঙুলগুলোর দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে সে সাবধানে তার নখগুলো কেটে দিচ্ছে। নখ একটু বড় হলেই ছেলেটা নিজের মুখ খামচে রক্ত বের করে ফেলে; আবার রিদি যখন ছেলেকে খাওয়াতে নেয়, খাবার পেতে সামান্য দেরি হলেই সেই ছোট ছোট হাত দিয়েই মায়ের বুক খামচে লাল করে তোলে। এই নিয়ে সৌহার্দ্যের বিরক্তির অন্ত নেই। অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার — নখগুলো কেটে ছোট করার মোটে দুই দিন যেতে না যেতেই সেগুলো আবার আগের মতো বড় হয়ে যায়!
সৌহার্দ্যের পাশে এসে নিঃশব্দে বসল শাহেদা চৌধুরী। ছেলের ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁর বুক চিরে বেরিয়ে এল একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস। স্নিগ্ধ গলায় তিনি ডাকলেন, “কেন এমন করছিস বাবু?”
মায়ের এই আকস্মিক কথায় সৌহার্দ্যের কপালে জমে উঠল ভ্রূকুটির ভাঁজ। সে বুঝতে পারল না, মা ঠিক কোন বিষয়ের ইঙ্গিত করছেন। মায়ের দিকে বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে শীতল গলায় বলল, “কী বলতে চাচ্ছো আম্মু, একটু ক্লিয়ার করে বলো?”
ছেলের কথায় কান না দিয়ে শাহেদা চৌধুরী ঝুঁকে পড়ে সৌহার্দ্যের কোল থেকে তার ছোট্ট নাতিকে নিজের কোলে তুলে নিলেন। এরপর মায়ামাখা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “রিদিকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছিস কেন? কেন মেয়েটার সাথে ঠিকমতো কথা বলছিস না? বিপদ-আপদ কারোর কি হাত থাকে? কপালে যা ছিল, সেটাই তো হয়েছে। এর জন্য মেয়েটার কী দোষ?”
মায়ের মুখে রিদির নাম শুনতেই সৌহার্দ্যের চোখের কোণায় একরাশ বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে কিছুটা তেজি গলায় বলে উঠল, “ও কি তোমাকে এসব কথা বলছে?”
ছেলের রাগচটা স্বভাব সম্পর্কে ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল শাহেদা চৌধুরী। তিনি বিরক্ত হলেন — তাঁর কথা শুনে ছেলে না আবার ভুল বুঝে রিদির ওপর আরও চড়াও হয়! তাই তিনি দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে একটু তেজী গলায় বললেন, “ও কেন বলতে যাবে? তোর কী ধারণা, আমার কি চোখ নেই? আমি তোমার মা, তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি!”
মায়ের কথাগুলোর আর কোনো প্রতিউত্তর করল না সৌহার্দ্য। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর বিতৃষ্ণা চেপে সে শক্ত পায়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল এবং নিজের রুমের উদ্দেশ্যে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল।
বিকালে নরম আলোয় ঘরটা স্নিগ্ধতায় মোড়ানো। রিদি শুয়ে আছে বিছানায়, আর তার বড় ছেলেটা পরম মমতায় মায়ের বুকে মুখ গুঁজে দুধ খাচ্ছে। রিদির একহাতে মোবাইল, স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ। এমন সময় সৌহার্দ্য রুমে প্রবেশ করে নিঃশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। ধীর পায়ে হেঁটে রিদির ঠিক পাশে এসে শুয়ে পড়ল সে, তারপর আলতো করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল রিদির সরু কোমর। গত তিন মাসে তাদের মাঝে মান-অভিমান আর দূরত্বের যে দেওয়াল জমে উঠেছিল তা যেন ভেঙে দিতে চাইছে তার নিবিড় ছোঁয়ায়।
হঠাৎ সৌহার্দ্যের এই গভীর ও উষ্ণ স্পর্শে রিদির বুক কেঁপে উঠল। আকস্মিকতায় তার হাত থেকে মোবাইলটি খসে পড়ে গেল বিছানায়। নিজেকে সামলে নিয়ে সে সৌহার্দ্যকে সামান্য সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে জড়োসড়ো গলায় ফিসফিস করে বলল,
“স-সরুন, বাবু খাচ্ছে!”
সৌহার্দ্য একবার মাথা তুলে তাকাল — রিদির বুকে মুখ গুঁজে আরামে খেতে থাকা ছোট্ট শিশুটির দিকে। পরক্ষণেই কোনো রাখঢাক না রেখে সে আবার রিদির ঘাড়ে মুখ গুঁজল। রিদির ঘাড় ও কাঁধে আলতো চুমু আঁকতে আঁকতে উষ্ণ স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“ও খাচ্ছে খাক, আমাকে আমার কাজ করতে দাও। কথা বলো না!”
বলে সে আরও নিবিড়ভাবে রিদিকে স্পর্শ করতে লাগল। রিদি আবার অস্বস্তিতে সৌহার্দ্যকে সরিয়ে দিতে চাইল। আর তাতেই সৌহার্দ্যের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ধৈর্য যেন ভেঙে গেল। মেজাজ হারিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে সে বলে উঠল,
“স্টুপিড! এমন করছো কেন? আদর করতে দাও!”
এই বলে সে অত্যন্ত আলতো হাতে, পরম মমতায় ছেলেকে রিদির বুক থেকে একটু সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু মায়ের উষ্ণ আশ্রয় হঠাৎ সামান্য সরে যাওয়ায় এবং খাওয়ার মাঝে অমন বিঘ্ন ঘটায় ছোট্ট সাফওয়ান ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
সৌহার্দ্য আলতো হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট পিঠে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় তাকে শান্ত করে পাশের বেবি খাটে শুইয়ে দিল। এরপর কোনো রকম চাপ প্রয়োগ না করে খুব সাবধানে রিদির ওপর ঝুঁকে এসে তার বুকে মুখ গুঁজে দিতে চাইল।
ঠিক তখনই রিদি সমস্ত বিরক্তি আর পুঞ্জীভূত অভিমান জমিয়ে মুখ ফিরিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,
“সরুন, ভালো লাগছে না আমার!”
সৌহার্দ্য কপাল কুঁচকে, চোখে তীব্র এক প্রশ্ন নিয়ে তাকাল। নরম কিন্তু গম্ভীর স্বরে জানতে চাইল,
“কী ভালো লাগছে না? আমাকে, নাকি আমার স্পর্শ?”
রিদি আর পেরে উঠল না। ভেতরকার সব কষ্ট উপচে পড়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভাঙা গলায় বলে ফেলল,
“সেদিন বেঁচে গিয়ে ভুল করে ফেলেছি! মরে গেলে…”
কথাটা সম্পূর্ণ করতে দিল না সৌহার্দ্য। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠা ক্ষোভ আর ভালোবাসার এক অদ্ভুত মিশ্রণে সে রিদির ঠোঁটের নিচে তীব্র একটা কামড় বসিয়ে দিল। তারপর ফুঁসে উঠে রুদ্ধশ্বাসে হিসহিস করে বলল,
“সমস্যা কী তোর? মরতে চাস আমার হাতে? মরার এত শখ যখন, চল জীবন্ত পুঁতে দিই তোকে! বারবার এসব কথা বলে আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস কেন তুই? চাস কী তুই, স্টুপিড মহিলা!”
সৌহার্দ্যের এই আকস্মিক রাগে রিদির বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আর নিজেকে আটকে রাখতে না পেরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কান্নায় ভারী হয়ে আসা রুদ্ধ গলায় সে সব অভিমান উগরে দিল,
“আপনি জানেন, আপনার এই অবহেলা, আপনার এই দূরত্ব আমার সহ্য হয় না! আপনি একটু কিছু হলেই সেটা করে আমাকে কষ্ট দেন, দূরে সরিয়ে দেন!”
রিদির গলার এই কান্না সৌহার্দ্যের রাগটাকে নিমিষেই ধুলোয় মিশিয়ে দিল। সে বুক চিরে একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কণ্ঠস্বর একদম নামিয়ে, অনুতপ্ত ছোঁয়ায় বলল,
“সরি বউ, আর হবে না। কষ্ট দেব না তোমাকে।”
বলেই সে আবার রিদির চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে ছিল আকুলতা আর দীর্ঘদিনের হাহাকার। ফিসফিস করে সে অনুরোধের সুরে বলল,
“হালকার ওপর ঝাপসা একটু আদর করতে দাও, অনেক দিনের উপোস আমি!”
বলে সে আলতো হাতে রিদির জামার দিকে হাত বাড়াতেই রিদি সামান্য আড়ষ্ট হয়ে, আবেশ ও লজ্জায় জড়োসড়ো গলায় বলল,
“দিনেরবেলা…”
সৌহার্দ্য রিদির ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে তার নিঃশ্বাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া মাদকতা মাখা গলায় ফিসফিসাল,
“ইম্পর্টেন্ট কাজের কোনো রাত-দিন নেই!”
রিদি তবুও আমতা আমতা করে ভয়ে ভয়ে বলল,
“বাবু যদি উঠে যায়?”
সৌহার্দ্য এক পলক ঘুমে আচ্ছন্ন নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকাল, তারপর আত্মবিশ্বাসী ও শান্ত স্বরে বলল,
“উঠবে না!”
বলেই সে রিদির বুকের মাঝে মুখ গুঁজে দিল। রিদির শরীরটা ভালোবাসার শিহরণে কেঁপে উঠল, সে মৃদু স্বরে বলে উঠল,
“কী করছেন?”
সৌহার্দ্য এক হাতে রিদির মুখ আলতো করে চেপে ধরে কানে কানে বলল,
“সাউন্ড করবা না, স্টুপিড! বাবু জেগে যাবে। খুব সতর্ক হয়ে করছি যা করার!”
আর কোনো কথা নয়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্ত বরফ, মান-অভিমান আর দূরত্ব মুছে দুজনে একাকার হয়ে পাড়ি দিল অন্যরকম এক গভীর সুখের জগতে।
লন্ডনের ঘড়িতে তখন প্রায় রাত দুটো। সেন্ট থমাস হসপিটালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) — চারপাশটা পিনপতন নীরবতা, কেবল ইনটেনসিভ কেয়ারের মেশিনগুলোর মৃদু শব্দ ভেসে আসছে।
সেই নির্জন আর ভারী বাতাসে ঘেরা কেবিনের এক কোণে, রিভার নিথর ও জ্ঞানহীন শরীরটার পাশে পাথরের মতো বসে আছে ফারিস। ছেলেটার বর্তমান অবস্থা বড় করুণ; চোখের নিচে জমে গেছে ক্লান্তিহীন কালচে ছোপ। সারাক্ষণ পরিপাটি ক্লিন-শেভড থাকা মুখটা আজ অবিন্যস্ত দাড়িতে ভর্তি — এ যেন সেই চিরপরিচিত, আত্মবিশ্বাসী ফারিস নয়, এ এক ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া মানুষ।
রিভার ছোট্ট, নিস্তেজ হাতটা নিজের ঠোঁটের সাথে আলতো করে ছুঁইয়ে ধরে আছে সে। ক্লান্ত, রক্তিম চোখে অপলক তাকিয়ে আছে মেয়েটার ওই নিষ্পাপ ও ফ্যাকাশে মুখের দিকে। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল এভাবেই। এরপর শুকনো গলায়, বিড়বিড় করে ফিসফিস করে উঠল ফারিস,
“আমাকে ছেড়ে যাওয়ার এত তাড়া কেন তোর? তুই ভালোবাসিস না বলে? তুই কি ভেবেছিস, বেয়াদব, এসব নাটক করলে আমি তোর পিছু ছেড়ে দিব? উহু… আমি তো তোর পিছু পিছু চলে আসবো। তুই যেখানে থাকবি, আমিও সেখানে থাকব! আমি তোর পিছু ছাড়ব না — মৃত্যুর পরেও না!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৩
কথাগুলো শেষ করেই সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝুঁকে পড়ে আলতো করে রিভার বুকের একপাশে নিজের মাথাটা রাখল। মেয়েটির হৃদস্পন্দনের ক্ষীণ শব্দের সঙ্গে নিজের নিঃশ্বাস মেলাতে মেলাতে, এক বুক জমাট বাঁধা কান্না গলায় চেপে ধরে আনমনে ভেঙে পড়া সুরে গেয়ে উঠল —
“ছোট্ট বুকে মেঘ জমিয়ে কেমন রে কাঁদিস পাখি?
তুই ফিরবি বলে আমি কেমন সন্ধ্যা নামায় রাখি!”
