অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৫
রিদিতা চৌধুরী
ঢাকায় যখন গভীর রাতের স্নিগ্ধ চাদর নেমে এসেছে, তখন চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত মায়াবী নীরবতায় মোড়ানো। হেমন্তের হিমেল হাওয়া জানালার কাঁচ ছুঁয়ে ঘরে প্রবেশ করছে, আর মৃদু জোছনার আলোয় ঢাকা শহরের অলিগলিগুলো যেন ঘুমিয়ে পড়েছে শান্ত এক আবেশে। রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় কুয়াশার হালকা আস্তরণ এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছে। তখনও সৌহার্দ্য-রিদির রুমটাতে মৃদু আলো জ্বলছে।
অন্ধকার ছাড়া যার এক মুহূর্ত চলত না, সেই সৌহার্দ্য আজ অভ্যাসের চাদরে মুড়ে নিয়েছে নিজেকে—শুধু সন্তানদের জন্য। খাটের পাশেই নিবিড় ছায়ায় জোড়া দেওয়া বেবি বেড, আর ঠিক মাঝখানে তাদের বিছানায় রিদিকে নিজের বাহুডোরে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রিদির বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে সৌহার্দ্য। রিদির বুকের গভীরেই যেন তার পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভোলার জায়গা, তার সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্ত আশ্রয়।
গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ ভেসে এল বাচ্চার কান্নার সূক্ষ্ম সুর। সেই শব্দেই ধড়াস করে বুক কেঁপে উঠল সৌহার্দ্যের। এক নিমেষে ঘুম ভেঙে ছিটকে উঠে বসল সে। তক্ষুনি পাশে তাকিয়ে দেখল, ছোট ছেলেটা গোল গোল চোখ করে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে চলেছে। বিন্দুমাত্র দেরি না করে আলতো হাতে ছেলেকে কোলে তুলে নিল সৌহার্দ্য। ছেলের নরম গালে একটা স্নেহের চুমু এঁকে দুধ খাওয়ানোর জন্য রিদির বুকের কাছে এগিয়ে দিল। কিন্তু অবুঝ শিশুটা মুখ ফিরিয়ে নিল। মানে সে খাবে না, অথচ কান্না তার থামছেই না।
হঠাৎ এমন কান্নার কারণ বুঝতে না পেরে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল তার। সে একবার আবছা আলোয় রিদির ক্লান্ত মুখের দিকে তাকাল। মেয়েটা তখন গভীর আরামে ঘুমাচ্ছে। রিদির ঘুম না ভাঙিয়ে সৌহার্দ্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের চোখে-মুখে অজস্র ভালোবাসার ছোঁয়া বুলিয়ে নিজেই ডাইপারটা চেক করল। দেখতে পেল, তার ছোট্ট সোনাটা ডাইপারটা নোংরা করে ফেলেছে।
বিরক্ত হওয়া তো দূরের কথা, মুখে এক চিলতে মায়ার হাসি ফুটিয়ে নিজ হাতে ছেলেকে পরিষ্কার করে দিল সে। পরম যত্নে পরিয়ে দিল নতুন একটা ডাইপার। তারপর আলতো হাতে যত্নের সাথে আবার ছেলেকে রিদির বুকের কাছে দিল।
এরপর রিদির অপর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল সৌহার্দ্য। রিদির সুডৌল কোমরটা পিছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে কেবল ক্লান্ত চোখ দুটো বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ রাত চিরে বেজে উঠল তার মোবাইল ফোনটা।
হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই সৌহার্দ্যের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ফারিস তো এখন সাধারণত কল দেয় না। সে নিজে রায়েদা শেখের কাছ থেকেই ওদের খোঁজখবর নেয়। তবে কি কোনো দুঃসংবাদ?
কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ফারিসের উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠস্বর। ফারিস প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, “সৌহার্দ্য ভাই! আমার আ- আমার রিভার জ্ঞান ফিরছে!”
খবরটা যেন বুকচাপা সমস্ত ভয় এক নিমিষে উড়ে গেল। সৌহার্দ্য বুকে আটকে থাকা একটা দীর্ঘশ্বাস স্বস্তির সাথে ফেলল। তারপর ভাঙা ও ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছে এখন ও?”
ফোনের ওপাশ থেকে খিলখিল করে হেসে উঠে ফারিস বলল, “তুই নিজের চোখেই দেখে নে তোর বোনকে!”
বলেই সে ভিডিও কল অন করে দিল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল, কেবিনের বেডের সাথে হেলান দিয়ে চুপটি করে বসে আছে রিভা। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ার পর মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। চোখের নিচে জমেছে গাঢ় ক্লান্তির কালি। সেই ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে সৌহার্দ্যের গলাটা জড়িয়ে এল। থরথরে কাঁপা গলায় সে ডেকে উঠল, “কেমন আছিস, আমার ছোট্ট পুতুল?”
রিভার ফ্যাকাসে মুখে ভেসে উঠল এক চিলতে আলতো হাসি। ক্ষীণ ও ভাঙা গলায় সে বলল, “ভালো আছি, ভাইয়া।”
তারপর একটু জিরিয়ে নিয়েই কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, “ভাবি কেমন আছে? বাচ্চারা ঠিক আছে তো? সেদিন তো আমার জন্যই ভাবির এত বড় একটা বিপদ হয়ে গেল!”
রিভার কথা বলতে যে প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে, তা বুঝতে পেরে সৌহার্দ্য সঙ্গে তাকে থামিয়ে দিয়ে নরম অথচ ধমকের সুরে বলল, “রিল্যাক্স! আমি বুঝতে পেরেছি। ওরা ভালো আছে, ডোন্ট প্যানিক! এখন রেস্ট নে, ভাইয়া পরে কথা বলব।”
ভাইয়ের কথায় সম্মতি জানিয়ে রিভা আলতো করে মাথা নাড়ল। এরপর কাঁপা হাতে ফারিসের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিল। ফোনটা হাতে নিয়ে ফারিস মুচকি হেসে কৌতুকভরে জিজ্ঞেস করল, “কিরে, তোর প্রোডাক্ট দুটো কেমন আছে?”
সৌহার্দ্য ঠোঁট কামড়ে মৃদু একটা মলিন হাসি দিল। দীর্ঘদিন পর ফারিসকে এভাবে হাসিখুশি দেখতে পেয়ে সৌহার্দ্যের বুকভরা পাথরটা যেন এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। রাজ্যের শীতল শান্তি নেমে এল তার ক্লান্ত হৃদয়ে। ঘুমের আবেশে থাকা ছোট্ট বাচ্চাগুলোর মায়াবী মুখের দিকে একবার তাকিয়ে সে বলল, “ভালো আছে।”
এরপর রিভার কখন জ্ঞান ফিরেছে, ডাক্তার কী বলছে—বর্তমান শারীরিক অবস্থা সব খুঁটিয়ে জেনে নিয়ে সে কলটা কেটে দিল।
কল কেটে রিদির বুক থেকে ঘুমন্ত বাচ্চাকে পরম যত্নে তুলে নিয়ে তার পাশে বেবি বেডে শুইয়ে দিল সে। তারপর এসে রিদির বুকের মধ্যে মুখটা গুঁজে শুয়ে পড়ল। আচমকা এই নাড়াচাড়ায় রিদি কিছুটা নড়েচড়ে ঘুমচোখে অস্পষ্ট গলায় বলে উঠল, “বাবু কই?”
সৌহার্দ্য রিদির নরম বুকে নাক ঘষতে ঘষতে গম্ভীর ও কিছুটা অভিযোগের সুরে বলে উঠল, “সেদিন তোমাকে এত বকা দেওয়ার পরও সত্যিটা বলোনি কেন?”
গভীর ঘুমের মোহে আচ্ছন্ন রিদি ঠিক বুঝতে পারল না সৌহার্দ্য হুট করে কিসের কথা বলছে। সে শুধু আলতো হাতে সৌহার্দ্যের রুক্ষ চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে ঘুমের ঘোরে জিজ্ঞেস করল, “কোন সত্যির কথা বলছেন?”
রিদির এমন উদাসীনতায় বিরক্ত হয়ে সৌহার্দ্য হুট করে বিছানা ছেড়ে সোজা হয়ে বসে পড়ল। তারপর রিদিকে টেনে সোজা নিজের কোলে বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “সেদিন বাইরে যাওয়ার বিষয় বলছি। রিভা তোমাকে জোর করে নিয়ে গেছে—কথাটা বলোনি কেন?”
রিদি সৌহার্দ্যের প্রশস্ত বুকে মাথাটা আলতো করে এলিয়ে দিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল, “ও তো আমাকে জোর করে নিয়ে যায়নি। শুধু যেতে বলেছিল। আর দোষ তো আমার নিজেরও ছিল। আমি চাইলেই তো না করতে পারতাম!”
কথাটা শেষ করেই রিদি চুপ মেরে গেল। রিদির এমন অবুঝ নিঃস্বার্থপনা দেখে সৌহার্দ্য নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে রিদিকে শক্ত করে নিজের বুকের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে গম্ভীর গলায় ফিসফিস করে বলল, “সরি, আমার জান!”
রিদির ঠোঁটে এক ফালি হালকা হাসি ফুটে উঠল। তারপর একটু ব্যথাতুর ও অভিমানী কণ্ঠে বলল, “আমি তো জানি, আপনি ফারিস ভাই আর রিভাকে কতটা ভালোবাসেন। তাই সেদিন আপনি যখন বকছিলেন আমি কিছু মনে…”
কিন্তু রিদির পুরো কথাটা মুখ থেকে শেষ হয়ে বের হওয়ার আগেই সৌহার্দ্য তাকে সপাটে বুক থেকে কিছুটা উঠিয়ে ধরল। কপালে গভীর ভ্রু কুঁচকে তির্যক চোখে তাকিয়ে বলল, “তুমি কি ভেবেছ? আমি ওদের জন্য তোমার সাথে দূরত্ব তৈরি করছি?”
রিদি সৌহার্দ্যের দিকে অবুঝ ও প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল। সে তো ভেতরে ভেতরে সেটাই ভেবে আসছিল। তা না হলে সৌহার্দ্য কেনই বা এমন দূরত্ব বজায় রাখবে?
রিদির এই অবুঝ ভাবনা দেখে সৌহার্দ্যের বিরক্তিতে তেতে উঠল। সে ব্যাকুল ও আচ্ছন্ন কণ্ঠে বলে উঠল, “আমি ওদের ভালোবাসি, এ নিয়ে মনে বিন্দুমাত্র কোনো ডাউট রেখো না। কিন্তু কারো জন্য নিজের হার্টকে কষ্ট দেব, এটা কিভাবে তোমার মাথায় আসলো স্টুপিড? তোমার থেকে বেশি আমার কাছে কেউ নয়। নো ওয়ান মিনস নো ওয়ান!”
রিদি তখন সৌহার্দ্যের চোখের গভীরে সরাসরি তাকিয়ে নরম অথচ অভিযোগের সুরে বলে উঠল, “তাহলে কেন আমাকে এত অবহেলা করলেন, এত কষ্ট দিলেন?”
সৌহার্দ্য এক মুহূর্তের জন্য নির্বাক হয়ে থেকে শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “সেগুলো তোমার প্রাপ্য ছিল!”
রিদি অবুঝ ও নিষ্পাপ গলায় প্রশ্ন করল, “কেন?”
সৌহার্দ্য আলতো করে রিদির হাতটা টেনে নিয়ে নিজের বুকের ওপর সজোরে চেপে ধরে বলল, “কিছু বুঝতে পারছ?”
রিদি দুই পাশে অবাধ্যের মতো মাথা নাড়িয়ে নিষ্পাপ হাসিতে বলল, “শুধু লাফালাফি করছে, আর তো কিছু বুঝতে পারছি না!”
রিদির এমন গোলমেলে কাণ্ডে সৌহার্দ্য বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফেলে বলল, “মাথা মোটা, স্টুপিড! তুমি বুঝবে না!”
তারপর চোখ দুটো বন্ধ করে একটা লম্বা ও ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে গম্ভীর গলায় বলল, “সেদিন যদি রিভা তোমাকে সরিয়ে না দিত, তাহলে কী হতো—একবার ভেবে দেখেছ?”
কথাটি শেষ করেই সৌহার্দ্য রিদিকে নিজের দুই হাতের মাঝে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। শক্ত করে বুকে চেপে ধরে চোখ দুটো শক্ত করে বুজে সে ফিসফিস করে বিড়বিড় করে উঠল, “এই জীবনে আমি দুজন মানুষের কাছে চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকব। একজন নিজের জীবন দিয়ে আমার জীবনটা বাঁচিয়ে দিয়েছে, আর অন্যজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে আমার জীবনটাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছে।”
বলেই সে রিদিকে পরম যত্নে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। এরপর নিজে গিয়ে রিদির বুকের ওপর মাথাটা রাখল। আর রিদির হাতটা টেনে নিজের মাথার ওপর রেখে শান্ত গলায় বলল, “আমার চুলে একটু হাত বুলিয়ে দাও জান, আমি ঘুমাব। এতদিন তোমার দূরত্বের কারণে ঘুম হয়নি আমার!”
সৌহার্দ্যের এমন মিষ্টি অভিযোগে রিদি দুষ্টুমিভরা মুখে ঠোঁট মুচড়ে অভিমানী সুরে বলে উঠল, “মিথ্যাবাদী একটা লোক! এতদিন দূরে কোথায় ছিলেন শুনি? আমি যখন গভীর ঘুমে থাকতাম, তখন তো ঠিকই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে খেতে আমার মুখটা লাল করে ফেলতেন!”
রিদির মুখে এমন কথা শুনে সৌহার্দ্য চমকে গিয়ে এক লহমায় চোখ মেলে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল, “হোয়াট! স্টুপিড মহিলা, তুমি কি তাহলে তখন সব বুঝতে পেরেও ঘুমের ভান করে শুয়ে থাকতে?”
রিদি আর টুঁ শব্দটিও করল না, চুপটি করে রইল। আর কথা না বাড়িয়ে সৌহার্দ্য মাথাটা নিজের বুকের আরও গভীরে টেনে নিল। তারপর নরম হাতে সৌহার্দ্যের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে আলতো সুরে বলল, “ঘুমান এখন!”
বলেই সে নিজেও প্রশান্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ক্লান্ত চোখ দুটো বন্ধ করে দিল।
সময়ের স্রোতে কেটে গেছে দীর্ঘ নয়টি বছর। এই নয়টি বছরে যেন বদলে গেছে সবার জীবনের চিত্র—সবাই যার যার মতো ব্যস্ত নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীটা গুছিয়ে নিতে। শাহবীর আর সুমির সুখের সংসারে এখন ভালোবাসার সুবাস ছড়াচ্ছে তিন সন্তান—দুই ছেলে আর এক কন্যাসন্তান।বছর না ঘুরতেই পরপর দুই ছেলে হওয়ায় তাদের বয়স প্রায় কাছাকাছি মনে হয়, যেন জমজ দুই ভাই।
বড় ছেলে শেহেজাদ খান একদম বাবার মতো হলেও, ছোট ছেলে শেহেতাজ খান পুরোটা সুমির অবয়ব নিয়ে এসেছে। আর তিন মাসের ছোট মেয়ে সিয়ারা খান তো যেন রিদিরই এক জীবন্ত সংস্করণ! শ্যাম বর্ণ, গোলগাল চেহারার পুরো মুখটা মায়ায় ভরা—যেন জীবন্ত এক পুতুল। আর এই ছোট্ট মেয়েটিই শাহবীরের প্রাণের আরাম!
ফারিস আর রিভার জীবনটাও এখন এক পরিপূর্ণতার নাম। কোমা থেকে ফিরে আসার পর ফারিসের ওপর সেই চিরচেনা রাগ-অভিমান আর বায়না ধরে রিভা আজ দুই সন্তানের গর্বিত মা! তাদের সংসারে এসেছে এক ফুটফুটে ছেলে ও এক সুন্দর কন্যা। ছেলের বয়স চলছে প্রায় সাত বছর, নাম ফাইজান খন্দকার; আর মেয়ের বয়স মাত্র পাঁচ মাস, নাম ফারিস্তা খন্দকার, ভালোবেসে রিভার নামের সাথে মিলিয়ে যার ডাকনাম রাখা হয়েছে রাহা। ফাইজান অবিকল তার বাবা ফারিসের মতো দেখতে, তবে স্বভাবের দিক থেকে ভীষণ শান্ত। আর ছোট্ট রাহা? সে যেন ঠিক রিভার প্রতিচ্ছবি—ফর্সা, লাল টুকটুকে, দেখতে অবিকল একটা পরীর মতো!
অন্যদিকে, ফারিস-রিভা দেশে ফেরার কিছুদিন পরেই সাতপাকে বাঁধা পড়েছিল সুজন আর মেঘা। অনেক কাঠখড় আর দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাদের কোলজুড়ে এসেছে একমাত্র কন্যাসন্তান—মায়রা হায়দার বয়স সবে দুই মাস, তাদের জীবনের সবথেকে দামি কষ্টের ফল। মেঘার শারীরিক জটিলতার কারণে চিকিৎসকদের বহু চেষ্টার পর এই আলো এসেছে তাদের ঘরে। তবে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন, মেঘার পক্ষে ভবিষ্যতে আর মা হওয়া সম্ভব নয়।
আর সায়েম ও জুথি? তারাও এখন সুখের সংসারী, বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছে নিজেদের মতো করে। তবে এই মুহূর্তে তাদের ঘরে কোনো সন্তান আসেনি, কারণ সায়েম এখন পুরোদমে ব্যস্ত নিজের ক্যারিয়ারটা শক্ত হাতে গুছিয়ে নিতে।
ওদিকে চৌধুরী বাড়ির অন্দরেও সময়ের স্রোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আরহানের বড় দুটো মেয়ে এখন বেশ বড়সড়। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার প্রায় তিন বছর কেটে গেছে আরহানের, কিন্তু সাথীর সাথে তার সম্পর্কের সমীকরণটা আজ বড় অদ্ভুত—না পারছে একসঙ্গে থাকতে, না পারছে পুরোপুরি বিচ্ছেদ ঘটাতে। এক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই চলছে তাদের দিনকাল।
অন্যদিকে, আরবান আর পৃথার কোলজুড়েও এসেছে দুই কন্যাসন্তান—অরিহা আর ছোট্ট আহিয়া, যার বয়স সবেমাত্র ছয় মাস।
সৌহার্দ্য এখন চৌধুরী বাড়িতে থাকে না। বাবা-মাকে সাথে নিয়ে তারা এখন সেই বাড়িতেই থাকে, রিদির নামে যে বাড়ির নামকরণ করা হয়েছিল। তবে পুরোনো সেই “দেড় ব্যাটারি” নামটি আর নেই! সৌহার্দ্যের ছোট ছেলে সায়ভান নিজে হাতে সেই সাইনবোর্ড খুলে সেখানে লাগিয়েছে “মাম্মাস ড্রিম হাউজ”। মাকে পাগলের মতো ভালোবাসে ছেলেটা!
সৌহার্দ্য আর রিদির যমজ দুই ছেলের বয়স এখন প্রায় নয় বছর। দেখতে অবিকল একরকম হলেও তাদের স্বভাব ঠিক উল্টো মেরুর। বড় ছেলে সাফওয়ান যেন খোদ সৌহার্দ্যের এক অবিকল ছায়া—রাগ, জেদ আর বেপরোয়া স্বভাবের দিক থেকে সে যেন বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছে! সৌহার্দ্য যদি আগুন হয়, এই ছেলে তবে আগুনের গোলা-বারুদ। এই বয়সেই তার ব্যক্তিত্ব দেখে যে কারোর চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। আর মুখে সে কখনো কারো প্রতি ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে না, পুরো বাবার মতোই তার কোনো স্বীকারোক্তি নেই মুখে; নিজের পড়াশোনা আর জগৎ নিয়েই তার যত ব্যস্ততা।
পক্ষান্তরে, ছোট ছেলে সায়ভান, অসম্ভব দুষ্টু এবং পুরোপুরি মায়ের ভক্ত। মায়ের একটু কষ্ট দেখলেই সে সহ্য করতে পারে না। সৌহার্দ্য রিদিকে একটু ধমক দিলে সোজা ব্যাগপত্র গোছাতে বসে যায় আর মাকে বলে, “চলো মামমাম, আমরা মামাবাড়ি চলে যাই, পাপা একা একা থাকুক!” ব্যস, এই কথা শুনতেই রাগে মুখ লাল হয়ে ফেটে পড়লেও সৌহার্দ্যের তখন আর টু শব্দ করার উপায় থাকে না! কারণ দুই ছেলেই তার কলিজার টুকরো!
দুপুর তখন প্রায় বারোটা। ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন সারহান চৌধুরী। একপাশে নাতি সাফওয়ান গম্ভীর মুখে বইয়ে চোখ গুঁজে পড়াশোনা করছে, আর অন্যপাশে সারহান চৌধুরী মন দিয়েছেন টিভিতে চলা খেলায়। একটু আগেই নাতিকে ডেকেছিলেন একটু গল্প করতে, কিন্তু সাফওয়ানের মনোযোগ তো কেবল তার পড়াশোনাতেই—দাদাকে পাত্তা দেওয়ার ফুরসত নেই তার! উপায় না দেখে সারহান চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার খেলায় মন দিয়েছেন।
ঠিক তখনই সদর দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল সৌহার্দ্য। ছেলেকে ডাকার জন্য সবেমাত্র মুখ খুলেছিল, কিন্তু সোফায় চোখ পড়তেই তার কণ্ঠ আটকে গেল। বাবা আর ছেলে একসঙ্গে বসে!
একরাশ বিরক্তি বুকে নিয়ে সৌহার্দ্য এগিয়ে গিয়ে ঝাঁঝালো গলায় ডেকে উঠল—
— “সাফান?”
বাবার গম্ভীর ডাক পেতেই সাফওয়ান বই থেকে চোখ তুলে সোজা তাকাল। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে সৌহার্দ্যের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে খুব নির্লিপ্তভাবে বলল—
— “ইয়েস পাপা?”
সৌহার্দ্যের ভেতরটা তখন রাগে ফুটছে, তবুও নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে জিজ্ঞেস করল—
— “তুমি মন্ত্রীর নাতিকে মেরেছো কেন?”
সাফওয়ান তার ছোট ছোট ভুরু দুটো কুঁচকে একবিন্দু ভয় না পেয়ে উত্তর দিল—
— “আমি মারিনি পাপা, শুধু হাত ভেঙে দিয়েছি!”
ছেলের এমন ঔদ্ধত্য দেখে সৌহার্দ্যের বিরক্তির পারদ যেন এক নিমিষে শতগুণ বেড়ে গেল। গলায় ক্ষোভ মিশিয়ে সে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল—
— “আশ্চর্য! ওটাকে মারা বলে না?!”
সৌহার্দ্যের চেয়ে তিনগুণ বেশি তেজ আর বিরক্তি নিয়ে সাফওয়ান তখন সটান তাকাল বাবার চোখে। ঠান্ডা গলায় জবাব দিল—
— নো”পাপা, গডের কাছে পাঠিয়ে দেওয়াকে মারা বলে। হাত ভেঙেছি, বেশ করেছি। ওটার সাহস কী করে হলো আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তোলার?”
ছেলের এই বেপরোয়া জবাব শুনে সৌহার্দ্য নিজের রাগটা কোনোমতে গিলে ফেলে একটু নরম গলায় বোঝানোর চেষ্টা করল—
— “এসব ভালো মানুষের কাজ না, পাপার জান, আমার কথা…।”
এতক্ষণ ধরে বাপ-ছেলের এই রোমাঞ্চকর দ্বন্দ্ব খুব আয়েশ করে উপভোগ করছিলেন সারহান চৌধুরী। আর থাকতে না পেরে সৌহার্দ্যের কথার মাঝখানেই তিনি খপ করে বাধা দিলেন। ছেলের দিকে তির্যক চোখে এক চোট খোঁচা মেরে বলে উঠলেন—
— “ব্যাপারটা দারুণ! চোরে শেখাচ্ছে কীভাবে চুরি না করতে হয়! উফ, কী শান্তি! মনে হচ্ছে আজকের পর থেকে আর হার্টের ওষুধটাই খাওয়া লাগবে না!”
বাবার এমন মোক্ষম খোঁচায় চোখ দুটো ছোট ছোট করে বিরক্তি নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ডিসগাস্টিং।” আর এক মুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে বড় বড় পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে দ্রুত পা বাড়াল!
রাগে ফোঁসফোঁস করতে করতে রুমে ঢুকল সৌহার্দ্য। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতামে হাত বাড়াতেই দরজায় কফির কাপ হাতে হাজির হলো রিদি। পরনে তার একটি কালো সুতির শাড়ি, আঁচলটা পরিপাটি করে কোমরে গোঁজা—রান্নাঘর থেকেই সোজা ছুটে এসেছে। আজ বাড়িতে ফারিস, শাহবীর, সুজনদের আসার কথা। কাজের ব্যস্ততায় অনেক দিন কেউ একসঙ্গে সময় কাটাতে পারেনি। সবার দুপুরের খাবারের আয়োজনে রিদি সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকলেও, সৌহার্দ্যের রাগী কণ্ঠস্বর শুনেই এক কাপ কফি নিয়ে ছুটে এসেছে সে; নয়তো আবার মেজাজ কখন চড়ে যায়! কারণ, রিদি খুব ভালো করেই জানে—সারাদিনের ধকলের পর বাড়ি ফিরে সৌহার্দ্যের প্রথম চাহনিতে অন্তত তাকে চোখের সামনে পেতেই হবে।
রিদি নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে কফির কাপটি ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল। এরপর পরম যত্নে সৌহার্দ্যের শার্টের বোতামে হাত রেখে নরম, মায়াবী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে? এভাবে রেগে আছেন কেন, ডাক্তার সাহেব?”
তেজদীপ্ত দৃষ্টি রিদির চোখের ওপর স্থির রেখে সৌহার্দ্য গম্ভীর গলায় বলে উঠল,
“তোমার ছেলের নামে কমপ্লেন আ…”
রিদির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অবচেতনভাবেই সে বলে ফেলল,
“আসতেই পারে! আপনার ছেলে ব…” বলতে গিয়েই নিজের ভুল বুঝতে পেরে রিদি জিভে কামড় দিল। মুহূর্তের জন্য তার বুকটা কেঁপে উঠল। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে কৃত্রিম হাসিতে দ্রুত বলে উঠল, “না মানে… বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে!”
তীব্র ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রিদির দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে সৌহার্দ্য প্রশ্ন করল,
“কী বলতে চাচ্ছো, স্টুপিড? আমার মতো হয়েছে? আমি কি ওরকম ছিলাম!”
গলার কাছে আটকে থাকা শুকনো ঢোকটা কোনোমতে গিলে, কাঁচা একটা ভয়ের হাসি হেসে রিদি আমতা আমতা করে বলল,
“আরে না, আমার এত সত্যি বলার সাহস…”
পুরো কথা শেষ করার সুযোগটুকুও দিল না সৌহার্দ্য। এক সুনিপুণ টানে রিদির কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের শক্ত শরীরের সঙ্গে মিশিয়ে নিল সে। রিদির নরম ঘাড়ের সুবাসে মুখ গুঁজে আলতো করে একটা কামড় বসিয়ে দিল। এরপর তার উন্মুক্ত কোমরে নিজের হাতের উষ্ণ ও গভীর আঙুলের স্পর্শ বুলিয়ে নেশালু, ভারি গলায় ফিসফিস করে জানতে চাইল,
“ছোট সাহেব কোথায়?”
সৌহার্দ্যের সেই পরিচিত, মাদকতাময় ছোঁয়া পেতেই রিদির সারা শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও আজও এই মানুষটার সামান্য স্পর্শ তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত করে দেয়, বুকটাকে কাঁপিয়ে তোলে। কম্পিত কণ্ঠে রিদি কোনোমতে উত্তর দিল,
“পড়তে বসিয়েছি…”
রিদির ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে এলোমেলো ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া বুলিয়ে নেশায় আচ্ছন্ন কণ্ঠে সৌহার্দ্য প্রস্তাব দিল,
“তাহলে হয়ে যাক?”
ঘোর লাগা চোখে কেঁপে উঠে রিদি অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ক… কী?”
রিদির উদরের গভীরে আলতো আঙুলের মাদকতা ছড়িয়ে সৌহার্দ্য উপচে পড়া এক মোহময় দৃষ্টি নিয়ে ফিসফিসাল,
“এক রাউন্ড হয়ে যাক?”
বলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে রিদিকে এক টানে কোলে তুলে নিল সে। পা দিয়ে বেডরুমের ভারী দরজাটা টেনে বন্ধ করে রিদিকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। শাড়ির অগোছালো আঁচলটা পাশ কাটিয়ে একদৃষ্টিতে তার লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে সে মুগ্ধতায় বলল,
“দিন দিন এত গ্লো করার কারণ কী, ম্যাডাম?”
লজ্জায় রিদির দুই গাল তখন রক্তিমাভ হয়ে উঠেছে। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“ছাড়ুন তো! আমার অনেক কাজ বাকি… সবাই তো চলে আসবে…”
কিন্তু রিদির সেই আকুতি ভরা কথাগুলো বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সৌহার্দ্য তার ঠোঁটের ভাঁজে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। আর ঠিক যেই মুহূর্তে রিদির শাড়ির কুঁচিতে তার শক্ত আঙুলগুলো যখন এগোতে শুরু করেছে—
ঠাস! ঠাস!
দরজায় জোরালো ও বেপরোয়া ধাক্কা পড়ল। আর তার সঙ্গেই ঘরজুড়ে ভেসে এল তাদের ছোট ছেলে সায়ভানের কচি অথচ জেদী গলা—
“মামমাম! দরজা খোলো!”
বিরক্তিতে মুখ কালো করে রিদিকে ছেড়ে একপাশে সরে দাঁড়াল সৌহার্দ্য। রাগী চোখে রিদির পানে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সে বলে উঠল,
“তুমি না বলছিলে ওকে পড়তে বসিয়েছ?”
রিদি আমতা আমতা করে কিছু একটা সাফাই গাইতে যাবে, তার আগেই সৌহার্দ্য একটা তোয়ালে খামচে নিয়ে চরম বিরক্ত মুখে বাথরুমের দিকে হেঁটে গেল। সত্যি বলতে, এ যেন তাদের নিত্যদিনের চেনা গল্প! যখনই একটু রিদিকে নিজের মতো করে কাছে পেতে চায়, অমনি ছোট ছেলের কোনো না কোনো বাহানায় আবির্ভাব ঘটে যায়। আবার রাতের বেলা মা ছাড়া সে এক মুহূর্তও ঘুমাতেও চায় না। মাঝে মাঝে সৌহার্দ্য অনেক কষ্টে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাকে দাদির কাছে পাঠিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু সময় যেতে না যেতেই সে আবার নিজের অধিকারে হাজির!
রিদি দ্রুত নিজের কিছুটা অগোছালো শাড়িটা ঠিক করে দরজা খুলে দিল। দরজার বাইরে দাঁড়ানো সায়ভান এক দৌড়ে মায়ের বুকে এসে লুকিয়ে কচি ও আদুরে গলায় বলে উঠল,
“মামমাম, পাপা দরজা বন্ধ করে তোমাকে বকা দিচ্ছিল বুঝি?”
ছেলের মায়াবী গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে রিদি চোখ বড় বড় করে বলল,
“তোমাকে না পড়তে বসিয়েছিলাম? তুমি এখানে কী করছো?”
বড়দের মতো বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে সায়ভান চটজলদি জবাব দিল,
“আরে! আমার পুরো পড়া শেষ!”
ছেলের এমন পাকা কথা শুনে রিদির মৃদু বিরক্তি হলো। এই ছেলেটা বই দেখলেই চম্পট দেয়, একটুও পড়তে চায় না; আর দু’দিন পরপর স্কুল থেকে পড়া না পারার নালিশ তো লেগেই থাকে! রিদি একটু ধমকানোর ভঙ্গিতে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই মায়ের মনের ভাব বুঝে সায়ভান একদম গলে গিয়ে মিষ্টি হেসে খিলখিল করে বলে উঠল,
“মামমাম, ভীষণ খিদে পেয়েছে!”
ব্যস, ছেলের ওই এক চিলতে হাসিতে আর কথার জাদুতে রিদির সমস্ত রাগ নিমেষে জল হয়ে গেল! গলে যাওয়া মন নিয়ে আদরের ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল।
বিকাল গড়িয়ে তখন প্রায় সাড়ে চারটা। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে ড্রয়িং রুমের সোফায় জিরিয়ে নিচ্ছিল ফারিস। কিন্তু তাকে ঘিরে জমে উঠেছে এক টুকরো রঙিন জগত—তার চারপাশের ‘বাচ্চা বাহিনী’! সাফওয়ান, শেহেজাদ, শেহেতাজ, ফাইজান—সবার বয়সের ফারাক যোজন যোজন, কিন্তু কে বলবে তাতে বন্ধুত্বের কমতি আছে? তাদের আড্ডাটা বেশ জমজমাট।
সৌহার্দ্যের বড় ছেলে আর শাহবীরের বড় ছেলে—দুটো প্রায় সমবয়সী প্রাণ, পড়ছেও একদম একই ক্লাসে। এদিকে মজার কাণ্ড ঘটিয়েছে শাহবীরের ছোট ছেলেটা! সৌহার্দ্যের ছোট ছেলের মতোই সেও ভীষণ ডানপিটে। জেদ ধরে সোজা এক ক্লাস লাফিয়ে উঠে সেও ঢুকে পড়েছে এই দলেই! ওদের বন্ধুত্বটা এমন এক সুতোয় গাঁথা, যেখানে যেন কাউকে ছাড়া কারোর এক মুহূর্তও চলে না।
ফারিসের ছেলেটা ওদের থেকে দুই বছরের ছোট হয়েও ওদের সাথে একই ক্লাসে পড়ার জন্য লাফালাফি করছিল ফারিসের সাথে! ছেলের এমন কাণ্ড দেখে বিরক্তিতে বলছে, “তোর বাপ আগে একটা পার্সোনাল স্কুল বানাক, তারপর তোদের সব কয়টাকে একসাথে এক ক্লাসে ভর্তি করাবো!” ব্যস, ছেলে কেঁদে কেটে শান্ত হয়ে গেছে!
ফারিসের দৃষ্টিটা এই মুহূর্তে বেশ তেতো। বিরক্তিতে কুঁকড়ে আছে তার মুখানা। সাফওয়ানের হাতের মুঠোয় সৌহার্দ্যের মোবাইলটা বন্দি, আর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে বাকি বাচ্চাগুলো—একেবারে গায়ে ঘেঁষে জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সবাই।
বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে ফারিস তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠল,
“এই বেজাল থেকে বের হওয়া এক নাম্বার বেজাল, তোর বাপকে ডাক!”
ফারিসের কথাগুলো কানে যেতেই সাফওয়ান একটা বিরক্তিকর দৃষ্টি হেনে কপাল কুঁচকে তাকাল তার দিকে। ফারিসকে তার একটুও পছন্দ না—সুযোগ পেলেই তার পিছনে লেগেই থাকে। তাই রাগে-বিরক্তিতে তেতে উঠে সাফওয়ান ঝাঁঝালো গলায় জবাব দিল,
“আমার পাপা ঘুমাচ্ছে, ডিস্টার্ব করা যাবে না!”
সাফওয়ানের এই কাঠখোট্টা কথাগুলো শুনে ফারিসের মেজাজটা যেন আরও তেতে উঠল। সে মুখ বাঁকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলে উঠল—
“একদম বাপের মতো, একদম মহা বেজাল বের হয়েছে। সব কিছুতে তাড়াহুড়া। তাড়াতাড়ি বের হতে গিয়ে আমার শিশু বউটাকে কোমায় পাঠিয়ে দিয়েছে। দিবো না তোর কাছে আমার কিউট মেয়ের বিয়ে!”
সাফওয়ানের কাছে এই ডায়লগগুলো একদম চর্বিত চর্বণ, শুনতে শুনতে সে ক্লান্ত। আজ আর ভেতরে জমে থাকা রাগটা চেপে রাখা গেল না। তেতে উঠে সাফওয়ান ঝাঁঝালো গলায় সোজা প্রতিবাদ করে বসল—
“জাস্ট সেটআপ আঙ্কেল, সব সময় আমাদেরকে ব্লেম করবেন না। আর আপনার ডাম গার্লকে আমি বিয়ে করবো না!”
মেয়েটা যে ফারিসের হৃদস্পন্দন, তার জান! আর এই ছেলে কিনা তাকে এমন অদ্ভুত নামে ডাকছে! ফারিসের রক্তে আগুন ধরে গেল। রাগে অন্ধ হয়ে সে তেতে ওঠা গলায় চেঁচিয়ে উঠল—
“আমি বিয়ে দিলে তো তুই করবি, বেজাল ঘরের বেজাল!”
সাফওয়ানও এতটুকু দমবার পাত্র নয়, সে যেন তার চেয়েও তিনগুণ বেশি তেতে উঠে জবাব দিল—
“আমি বিয়ে করলে তো আপনি দিবেন? একটু চুমু দিলে ভেঁ ভেঁ করে কেঁদে দেয়, হাফ টিকেট ক্রাই বেবি একটা!”
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ফারিস। তার আদরের ছোট্ট মেয়েটাকে এই ছেলে চুমু খেয়েছে?! রাগে ফেটে পড়ে সে গর্জে উঠল—
“বেজাল ঘরের বেজাল, তুই আমার মেয়েকে চুমু খেয়েছিস? আ…”
কথাটা মুখ থেকে পুরো বের হওয়ার আগেই সাফওয়ান এক ঝটকায় তেজ নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। বিরক্তি আর আক্রোশে তার মুখখানা থমথমে, সে কড়া গলায় বলে উঠল—
“আমি কেন আপনার ক্রাই বেবিকে চুমু খেতে যাব?”
চোখে চরম সন্দেহ আর অবিশ্বাস ঝুলিয়ে ফারিস তখন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল—
“বেজালের ঘরের ভেজাল, তাইলে তুই জানলি কিভাবে ও চুমু খেলে কাঁদে?”
সাফওয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। হনহন করে ঘর থেকে বের হতে পিছন ফিরে বলে গেল—
“শেহেতাজ খেয়েছে!”
বলেই ছোট ছোট পা ফেলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। এদিকে ফারিস একদম অবাক চোখে হতবাক হয়ে শেহেজাদের দিকে তাকাতেই, শেহেজাদও কোনো কথা না বাড়িয়ে উঠে চলে গেল এবং তার পিছু পিছু বাকি সবাই হুড়মুড় করে ঘর খালি করে বেরিয়ে গেল।
সাফওয়ানরা ঘর ছেড়ে চলে যেতে না যেতেই ফারিসের ঠিক পাশে এসে ধপ করে বসে পড়ল সায়ভান। গোল গোল চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে একরকম আবদারের সুরেই বলে বসল—
“ফারিস ভাই, আমার সাথে ভিডিও গেম খেলবে?”
এই ছেলেটাকে সহ্য করা ফারিসের পক্ষে অসম্ভব প্রায়! হাজারবার নিষেধ করা সত্ত্বেও সে পাত্তাই দেয় না, খালি “ফারিস ভাই, ফারিস ভাই” করে মাথা খেয়ে মরে। আর এই বদঅভ্যাসটা সে শিখেছে রিভার কাছ থেকে। ছোটবেলায় কথা ফোটার পর থেকেই তো রিভার সাথে লেপ্টে থাকত। রিভা যেমন “ফারিস ভাই” বলে অভ্যস্ত, এই ছোট শয়তানটাও ঠিক সেটাই কপি করে জপতে শুরু করেছে।
বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে ফারিস ধমকের সুরে বলে উঠল—
“দুই নাম্বার বেজাল, তোকে বলছি না আমাকে ‘চাচ্চু’ বলবি?”
এরপর কিছুটা তির্যক চোখে সায়ভানের দিকে তাকিয়ে সে আবার গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল—
“আচ্ছা, বল তো… আমার বউ তোর কে হয়?”
মোবাইলে ভিডিও গেমে মন দিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা সায়ভান এক মুহূর্তের জন্যও স্ক্রিন থেকে চোখ সরাল না। আপন মনেই সে উত্তর দিল—
“ফুফি।”
ফারিস চোখ দুটো একটু কুঁচকে আবারও প্রশ্ন করল—
“আর আমার ছেলে-মেয়ে তোর কে হয়?”
সায়ভান আগের মতোই উদাসীনভাবে জবাব দিল—
“ভাই, বোন!”
ব্যস, এই কথা শোনার পরেই ফারিস আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না! একদম ফেটে পড়ে তেতে ওঠা গলায় সে চেঁচিয়ে উঠল—
“বেজালের ঘরের ভেজাল, তাহলে আমি তোর কে?!”
সায়ভান নিষ্পাপ চোখে ফারিসের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি গলায় ডেকে উঠল—
“ফারিস ভাই!”
ফারিস কিছু একটা বলে ধমক দিতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘুমঘুম চোখে সেখানে এসে হাজির হলো সৌহার্দ্য। ধীর পায়ে এসে পাশের সোফাটায় বসে সে সায়ভানকে উদ্দেশ্য করে বলল—
“সায়ভান, পড়তে যাও। তোমার মামমাম ডাকছে, তোমার ম্যাম আসবে!”
পড়ার নাম কানে যাওয়া মাত্রই সায়ভানের সব বাহানা শুরু! এক দৌড়ে সে সোজা সৌহার্দ্যের কোলে উঠে বসল এবং দু’হাতে তার গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মিনমিন করে বলে উঠল—
“পাপা, মামমামকে বলো না, আজকে পড়ব না আমি, প্লিজ?”
ছেলের এমন কান্নাকাটি আর বাহানা দেখে সৌহার্দ্য কিছুটা বিরক্ত হলো। ছেলের গালে একটা আদুরে চুমু খেয়ে সে বোঝানোর সুরে বলল—
“এটা হবে না, পাপার জান। তুমি দুইটা বিষয়ে খারাপ করছো, স্যার কম…”
কিন্তু ছেলের আসল চাল তো অন্য জায়গায়! সৌহার্দ্যের কথাটা পুরো শেষও হতে দিল না সায়ভান। চোখের পলকে নিজের ভোল পুরোপুরি পাল্টে ফেলে সে একদম ব্ল্যাকমেইলের সুরে তেড়ে বসল—
“তাহলে আমি মামমামকে বলে তোমাকে কট খাইয়ে দিব। তুমি ওই ডাক্তার আন্টির সাথে কথা বলছো, সেটা মামমামকে বলে দিব!”
ছেলের এমন মুখে কুলুপ লাগানো হুমকি শুনে সৌহার্দ্য থমকে গেল। তারপর গলা পরিষ্কার করে খুকখুক করে কেশে উঠল। আসলে কদিন আগেই স্কুল ছুটির পর সে ছেলেকে নিজের সাথে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে একজন সিনিয়র মহিলা ডাক্তারের সাথে কিছু জরুরি কথা হয়েছিল তার। আর তাতেই এই ছোট্ট শয়তানটার হাতে আস্ত একটা অস্ত্র চলে এসেছে—একটু হলেই তাকে এই নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা!
সৌহার্দ্য যখন বিরক্তি নিয়ে ছেলেকে কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই ফারিস আনমনে নিজের মনেই বলে উঠল—
“ফসল উৎপাদন করলি তুই, কিন্তু ফসলের কোয়ালিটি হলো আমার মতো। বুঝলাম না, ভাই?”
ফারিসের এই হেঁয়ালি মার্কা কথা ঠিকঠাক বুঝতে না পেরে সৌহার্দ্য কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সন্দিগ্ধ গলায় সে জিজ্ঞেস করল—
“হোয়াট?”
নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফারিস একটু সামলে নেওয়ার ভঙ্গিতে গলা খাঁকড়ে কেশে উঠল—
“না মানে… তোর ছেলের কথা ব…”
কথাটা শেষ করতে দিল না সৌহার্দ্য। রাগে একেবারে আগুন হয়ে সে তেতে উঠে গর্জে উঠল—
“জাস্ট সেটআপ ফারিস! আজে বাজে কথা বললে ছুড়ে গেটের বাহিরে ফেলে দিয়ে আসব, ইডিয়েট!”
সায়ভান সৌহার্দ্যের কোল থেকে মুখটা সামান্য নামিয়ে সে বিরক্ত সুরে বলে উঠল—
“পাপা, তুমি ফারিস ভাইকে কিছু বলবে না!”
ঠিক এই মুহূর্তে তাদের কথার মাঝেই ড্রয়িংরুমে পা রাখল রিদি। সোজা সায়ভানের দিকে তাকিয়ে রিদি কড়া গলায় নির্দেশ দিল—
“পড়তে আসো!”
মায়ের এই ডাক শোনা মাত্রই সায়ভান এক সেকেন্ডও দেরি করল না। সাথে সৌহার্দ্যের আরও একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে নালিশের সুরে সে মিথ্যা বলে বসল—
“পাপা আজকে আমাকে পড়তে মানা করছে, মামমাম!”
ছেলের এমন মিথ্যা বলা দেখে সৌহার্দ্যের মাথায় যেন রক্ত চড়ে বসল! সে চোখ-মুখ কুঁচকে সরাসরি রিদির দিকে তাকাল। রিদিও আশ্চর্যান্বিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই সৌহার্দ্য কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বিরক্তি লুকিয়ে বলল—
“ও রাতে পড়বে যাও তুমি!”
রিদি আর কথা বাড়াল না, শুধু একবার সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। রিদি চলে যেতেই সৌহার্দ্য আর এক মুহূর্তও সেখানে টিকল না—ছেলের দিকে চরম বিরক্তিভরা একটা পারফেক্ট লুক ছুড়ে দিয়ে সেও ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
সৌহার্দ্য চলে যেতেই সায়ভান এক লাফে সোজা ফারিসের কোলে এসে চড়ে বসল। একদম পাক্কা বিজয়ী বীরের মতো ফারিসের দিকে তাকিয়ে সে আবদার জুড়ে দিল—
“ফারিস ভাই, পাপার কাছ থেকে তোমাকে বকা খাওয়া থেকে বাঁচিয়েছি, আমাকে দুইশো টাকা দাও!”
নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না ফারিস। তব্দা খেয়ে সে হতভম্ব গলায় বলল—
“আমি কেন টাকা দিব? আমি তোকে বলিও নাই আমাকে বাঁচাতে, দিবো না টাকা?”
সায়ভান এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে ছোট ছোট চোখ দুটো কুঁচকে এক্কেবারে চরম হুমকির সুরে বলে উঠল—
“দিবো না তো ঠিক আছে, ফুফিকে মিথ্যা বলে তোমাকে গত বারের মতো কট খাইয়ে দিব!”
এই থ্রেট শুনে ফারিসের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়! এই শয়তানটাকে সে জমের মতো ভয় পায়—একবার সে শুধু একটু বকা দিয়েছিল বলে রিভার কাছে এমন পেছ লাগাইছে যে তার বউ টানা একমাস তার সাথে কথাই বলেনি! আর কোনো রিস্ক নিতে চাইল না ফারিস। বাধ্য ছেলের মতো পকেট হাতড়ে দুইশো টাকার একটা নোট বের করে সায়ভানের হাতে গুঁজে দিয়ে সে ফোঁসফোঁস করতে করতে বলল—
“তোর বাপের এত টাকা, তবুও ঘুষ কেন নিস, দুই নাম্বার বেজাল?”
টাকাটা লুফে নিয়ে সায়ভান মহাখুশিতে সেটা তার ছোট্ট ওয়ালেটে ঢুকিয়ে দিল। তারপর বেশ পাকা পাকা গলায় জবাব দিল—
“পাপার টাকা সব আমার বউয়ের জন্য জমিয়ে রাখছি!”
ফারিস একেবারে বেকুব বনে গিয়ে কটমট চোখে তাকিয়ে বলল—
“তুই কোনো চাকরি-বাকরি করবি না নাকি? নিজের বউকে খাওয়াবি কী দিয়ে?”
সায়ভান তখনো মোবাইলের গেমসে বুঁদ হয়ে আছে। একবিন্দু ভ্রূক্ষেপ না করে সে উদাসীনভাবে বলল—
“কেন, পাপার টাকা আর শশুরের টাকা দিয়ে চালাব!”
ফারিস এবার মুখটা এমন এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে কুঁচকে ফেলল। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল—
“তোর কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে কে?”
সায়ভান তখনো মোবাইলের গেমসে বুঁদ হয়ে আছে। একবিন্দু ভ্রূক্ষেপ না করে সে উদাসীনভাবে বলল—
“আমার মেয়ে ঠিক করা আছে। না দিলে জোর করে নিয়ে নিব?”
কথাটা শুনে ফারিসের ভেতরে কেমন যেন সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। সে একটু ঝুঁকে, চোখ দুটো সরু করে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—
“কে?”
সায়ভান তখনো রহস্য বজায় রেখে হালকা চালে এড়িয়ে গেল।
ফারিস তখন লোভ দেখিয়ে প্রলোভনের সুরে বলল—
“পাঁচশ টাকা দিব, বল আমাকে। আমি কাউকে বলবো না!”
সায়ভান ফারিস এর দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলল—
“সত্যি?”
ফারিস জোরালো গলায় আশ্বস্ত করল—
“হুম!”
চারপাশটা একবার বুলিয়ে দেখে নিল সায়ভান। তারপর ফারিসের একেবারে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল—
“সুজন আঙ্কেলের মেয়ে। কেন জানো?”
ফারিস হতভম্ব হয়ে দুই পাশে মাথা নাড়াল—মানে সে আসলেই জানে না। তখন সায়ভান বেশ পাকা মাথার বিজনেসম্যানের মতো বুঝিয়ে বলল—
“তোমাদের সবার ছেলে আছে। সুজন আঙ্কেলের একমাত্র মেয়ে বিয়ে করলে সব সম্পত্তি আমার!”
অপরিচিতা অর্ধাঙ্গিনী পর্ব ৬৪
ফারিসের অবস্থা তখন আক্ষরিক অর্থেই কোমায় যাওয়ার উপক্রম! মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলার জোগাড় করে সে রাগে-বিরক্তিতে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
“বেজাল প্রোডাক্ট, বাল দুটো বাহির করছে, মানুষের জীবন তছনছ করে দিচ্ছে। সুজন শুনলে স্টক করবে!”
