অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১২
Maha Aarat
ভাইয়া আমি ক্ষমা চাচ্ছি।আপনার বোনকে নিয়ে আমার কোনো অবজেকশন ছিলো না।কিন্তু আমাকে এমন কিছু বলা হয়েছে যে আমি আমার সিদ্ধান্তে এগোতে পারবো না।আমি লজ্জ্বিত আপনাদের এমন খারাপ পরিস্থিতিতে ফেলায়।আমাকে আপনাদের জন্য কিছু করতে দিন আমি…
মাহের রাগে কলার চেপে ধরেন আরিফের।উনার চোখে রাগের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে।কপালের শিরাগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠেছে।আইরা স্পষ্ট দেখলো লোকটা কোনো দূর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবেন।”এক্সিডেন্টের” রাগের কারন সে জানে না।তবে ভাইকে জানাতে সে ছুটে গেলো ড্রয়িং রুমের সামনে।লোকজন উপেক্ষা করে আরহামকে ডেকে যখন নিয়ে আসলো ততক্ষণে অবস্থা বেগতিক।
মাহের দাঁতে দাঁত চেপে বলছেন, ‘বিয়েকে তোমার ছেলেখেলা মনে হয়।এতদূর এগিয়ে…
আরহাম পেছন থেকে মাহেরকে টেনে সরিয়ে অবাক হয়ে বললেন , ‘কি হলো তোমার?’
মাহেরের মস্তিষ্কে যেনো আগুনের লাভা ছোটাছুটি করছে।রাগ সংযম করতে তিনি শক্তহাতে পিলারে আঘাত করলেন।আরিফের দৃষ্টি নিচু।আরহাম তাকে জিজ্ঞেস করতেই সে সহজভাবে উত্তর দিলো, ‘বিয়েটা হচ্ছে না।’
আরহামের স্পষ্ট প্রশ্ন, ‘মানে?কেন?’
‘মামণি নিজের ক্ষতি করে ফেলবেন যদি আমি এই বিয়েটা করি।’
‘আশ্চর্য্য!তিনি কি কারনে এমন করছেন?’
‘হাফসার সমস্যার জন্য।’
‘আপনারা জানতেন না?’
‘জানতাম।’
‘তাহলে?আপনার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই?এখন এমন কিছু হলে একটা পরিবার কে কতটুকু স্ট্রেস নিতে হবে কোনো আইডিয়া আছে আপনার?ঝেড়ে ফেলুন এসব চিন্তা।আপনি শক্ত থাকলে আপনার পরিবার কিছুই করতে পারবে না।’
তবুও আরিফের স্পষ্ট উত্তর, ‘ক্ষমা করুন আমাকে।’
আরহাম কিংকর্তব্যবিমূঢ়।এমন একটা সিচুয়েশনে কি করা উচিত উনার বুঝে আসছে না।আরিফের মুখে আঁধারের ছড়াছড়ি।তাঁর আফসোস এটুক,হাফসাকে তাঁর ভীষণ পছন্দ।অথচ মা’কেও সে ফেলতে পারবে না।
নীরবতা ঝেঁকে ধরেছে চারপাশ।আঁধারের ছড়াছড়িতে এক টুকরো আলোর দেখা পাওয়া যেনো দূষ্কর।কোথাও পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ সাথে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।হুতুম ডাকছে কাছাকাছি কোথাও।আকাশে ছুটছে টুকরো টুকরো মেঘ।সাথে হালকা গর্জন তুলে বুঝিয়ে দিচ্ছে তাঁর আগমনের পূর্বাভাস।
আঁধারের বুকচিরে এক টুকরো আলোর দেখা মিলছে।বারান্দার ডিভানে জ্বলছে মোমবাতির শেষ অংশ।আরহামের পলকহীন দৃষ্টি অন্যপাশের ডিভানে।মাহেরের নীরবতা বুঝিয়ে দিচ্ছে ভেতরে চলা ঝড়ের তান্ডব।বিয়ে ভেঙেছে বলে উনি যতটুকু না আফসোস করছেন তাঁর চেয়ে বেশী আফসোস হাফসার সামনে কীভাবে দাঁড়াবেন তিনি।তাঁর জীবনকে গুটির চালে এপাশ থেকে অন্যপাশ ছোড়া হচ্ছে।অথচ সেটা সঠিক ঘরে পড়তে ব্যর্থ।
ঘন্টাখানেক আগেই বিয়ের সব আয়োজন ভেঙ্গে আগত মেহমানরা চলে গিয়েছেন।যাওয়ার আগে ক্ষমা চাইতে একটাবারের জন্য আরিফ হাফসার সাথে দেখা করতে চাইলেও সে করেনি।মাহের প্রথমে রাগলেও পরে একদম নীরব হয়ে গেছেন।চাচা আহমাদ মাহেরের সাথে তাদের উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য আইনী পদক্ষেপ নিতে চাইলে আরহাম উনাকে শান্তসুরে বুঝিয়ে বলেছেন, ‘আংকেল মাহেরের সাথে পরে এ নিয়ে কথা বলা যাবে।এখন এসবের সঠিক সময় নয়।’
আইরা গুটিসুটি মেরে হাফসার অপজিটে বসে আছে।সবার মুখে দূ:শ্চিন্তা অথচ সে বেশ হাসিখুশি।আইরা অবশ্য কোনোভাবেই চাচ্ছে না এ পরিস্থিতিতে তাঁর হাসিখুশি ভাবটুকু বাইরে প্রকাশ করতে।অথচ সে বরাবরই ব্যর্থ।হাফসার সাথে চোখাচোখি হলেই ফিক করে হেসে উঠছে সে।মাইমুনা বরাবরই তাঁর এমন বাড়াবাড়ির জন্য চোখ রাঙ্গিয়ে শাসাচ্ছেন।আম্মু তো তাকে এ নিয়ে কয়েকবার কড়াভাবে বকেও দিয়েছেন তাতেও তার কিছু যায় আসছে না।
সুযোগ বুঝে একবার হাফসাকে ফিসফিস সুরে বলল, ‘আপু আপনি কেন মন খারাপ করছেন?বিয়ে তো ভেঙে গেছে।এটা অবশ্যই খুশির খবর আপনার জন্য।’
হাফসার একধ্যানী দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ।আইরা আরও অনেক কথা বলছে।
‘আপনার জন্য আরও ভালো কেউ আছে।আল্লাহ চাননি এই ডাক্তার কাকুর সাথে আপনার বিয়ে হোক।তিনি আপনার জন্য একজন সুপুরুষ চোজ করে রেখেছেন হয়তো।যাকে বিয়ে করার দিন আপনি শুধু কেঁদেই যাবেন,কেঁদেই যাবেন….’
মন খারাপের মাঝেও হাফসার ভ্র জোড়া কুঁচকে আসলো আইরার কথা শুনে।সুপুরুষ আসলে সে কাঁদবে কেন?
আইরা খুব চতুর গলায় উত্তর দিলো, ‘আরে বুঝতে পারেন নি?আপনি তো তখন খুশিতে কাঁদবেন।বিয়ের রিয়েল ফিলিংস আসবে।যেটা আজকে আপনার আসে নি।’
হাফসা হালকা হাসলো।এই মেয়েটা একটু বেশীই সরল।সরল বাচ্চা!
আইরার মন খারাপ হলো এবার।আপুর মন ভালো করার পরিবর্তে সে কি আরো খারাপ করে দিচ্ছে?
হাফসার দৃষ্টিতে চোখ রাখলো সে।পর্দার ওপাশে এক্সিডেন্টকে” চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
“এক্সিডেন্টের” জন্য বুঝি খারাপ লাগছে আপুর?
রাতের শোনশান নীরবতা।মেহমানরা চলে যাবার প্রস্ততি নিয়ে শুয়ে পড়েছেন।কালকে ফিরে যাবেন তাঁরা।
চারিদিকে কানা ঘুষা থামছে না।হাফসার ফুপি যখন ফোনে কথা বলছিলেন তখন আজকের ইন্সিডেন্টটাতে যেনো আরো তেল মশলা লাগিয়ে কাউকে বিস্তারিক বর্ণনা দিচ্ছিলেন।শুনে হাফসার খারাপ লাগলেও সে নিরুত্তর প্রস্থান করলো।আচ্ছা ফুপিরা তো বাবার আপন বোন।এই ঘটনা অবশ্যই কোনো সুখকর কিছু নয়।এই দূ:সময়ে তাদের মাথায় ভরসার হাত রেখে একটু কি স্বান্তনা দেওয়া যেতো না?
বাইরে বৃষ্টি।একদম তুমুল বেগে বৃষ্টি।সারাদিনের উষ্ণতা যেনো ধুয়েমুছে সাফ করে দিচ্ছে।আরহাম রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে দেখলেন মাইমুনা অন্যমনষ্ক হয়ে কিছু ভাবছেন।
আরহাম পাশে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ভাবছেন?’
‘উহু।’
‘এখানে সমস্যা হচ্ছে?বাসায় চলে গেলে ভালো হতো।’
মাইমুনা মলিন সুরে উত্তর দিলেন, ‘হাফসা একদম একা হয়ে পড়তো।আশ্চর্যের বিষয় হলেও এটা সত্যি, ওর ফুপিরা তাকে বা তাঁর পরিবারকে নিয়ে একটুও চিন্তিত নয়।তারা বিয়ে খেতে আসলেও একদম তাদের মতো থাকছে।’
‘আইরা,আম্মু কোথায়?’
‘আইরা হাফসার কাছে।আম্মু পাশের রুমেই।’
‘আম্মুর কাছে চলে যান আপনি।আমি এখানে ঘুমাব না।’
‘তাহলে?’
‘মাহেরের সাথে প্রয়োজন ছিলো।’
আরহাম বেরিয়ে গেলেন।যাওয়ার আগে দীর্ঘ স্পর্শ এঁকে গেলেন প্রিয়তমার ললাটে।
সূর্যের তেজ নেই।একেবারে শান্ত সকাল।জানালা খুলে দিতেই শান্ত বাতাস উঁকি দিলো রুমে।আরহাম ফোনে তিলাওয়াত রিসাইট করছিলেন মনে মনে।মাহেরের নড়চড় পেয়ে বিছানায় চোখ যেতে দেখলেন সে উঠে বসেছে।আযানের বিশ মিনিট পরের এলার্ম বাজছে তাঁর ফোনে।মাহের ওয়াশরুম চলে গেলে আরহাম বাইরে আসেন।গত রাতটা নির্ঘুম কেটেছে বলে মাথাটা ধরেছে প্রচন্ড।মাহের নিজেও ঘুমায়নি।শেষরাতে বোধহয় চোখ লেগে এসেছিলো।
নামাজ শেষে মাহের চাচার ঘরে চলে গেলেন কোনো প্রয়োজনে।আস্তে আস্তে বাইরে থেকে আসা হট্টগোলের আওয়াজ বাড়ে।
আরহাম বেরোতে দেখলেন কয়েক জন একজোট হয়ে এদিকেই আসছে।ততক্ষণে মাহেরও ফিরে আসলেন।
সামাদ মুসতাকিমকে দেখে তাঁর চোখমুখে শত প্রশ্নের ভীড়।এ লোকটা ভুল করেও এ বাড়ির আশেপাশে পা রাখে না আর আজ স্বয়ং বাড়িতেই?
দেখতে মধ্যবয়সী লাগলেও লোকটার বয়স বেশ বোঝা যাচ্ছে।মাহেরকে দেখে ঈষৎ হেসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমন আছো?’
‘ভালো।’
‘কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করতে এসেছিলাম তোমার সাথে?’
‘তাই বলে চিৎকার চেঁচামেচি করে দলবল নিয়ে?’
সামাদ মুসতাকিম রিযালকে চোখের কঠিন ইশারা দিয়ে পুনরায় মাহেরের দিকে ফিরে বললেন, ‘ওরা দূ:খিত।’
‘ভেতরে আসুন।’
যতই শএু হোক,তবুও খারাপ ব্যবহার মোটেই কাম্য নয়।ড্রয়িং রুমে বসেই ভদ্রলোক আরহামের দিকে দীর্ঘ দৃষ্টিতে তাকালেন।আরহামও চোখে চোখ রাখলেন।এভাবে তাকানোর কি আছে?ওহহ, মনে পড়েছে।রিযাল ছেলেটা তাকে দেখিয়েই বাবাকে কি যেনো ইশারায় বলছিলো।তবে সেদিন তাঁর গাল লাল করার বিষয় টা হয়তো।
‘এতো বাইরের মানুষ কেন তোমার ঘরে?’
আরহাম লোকটার স্পষ্ট খোঁচা ভালোই বুঝতে পেরেছেন।ততক্ষণে মাহের কঠিন গলায় উত্তর দিলো, ‘আপাতত কোনো বাইরের মানুষ নেই।যারা আছে,সবাই আমার কাছের।’
‘হাফসার বিয়ে ভেঙেছে পুরো এলাকায় আজকের ব্রেকিং নিউজ এটা।চায়ের দোকানের আলাপে,বাজারের এড়িয়াতে,বাড়ির আশপাশে যেখানেই যাচ্ছি এ নিয়ে কথা শুনছি।”
মাহের কোনোরুপ উত্তর করলেন না।কাঁচা ঘা’তে লোকটা সরাসরি আঘাত দিয়ে কথা বলছে বলে খানিক রাগ হলো আরহামের।
‘ফার্মগেটের জায়গাটা নিয়ে তুমি বেশ খেটেছো।সেটায় আমার সমস্যা নেই।আমাদের বিবাদ তো কম হয়নি।এবার সবকিছুর মীমাংসা হওয়া দরকার।আল্লাহর কাছে কার ডাক কখন পড়ে যায়।’
মাহেরের স্বীয় নীরবতায় ভদ্রলোক যেনো আরও সুযোগ পেলেন।বিনয়ের সুরে বললেন, ‘মাহের আমি অনুতপ্ত আমার সব অপরাধের জন্য।ভাই তো বেঁচে নেই নইলে তার কাছে ক্ষমা চাইতাম।আমি এখন আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক টা ঠিক করতে চাচ্ছি।’
মাহেরের দৃষ্টি রিযালের দিকে।সে ভদ্র ছেলের মতো বাবার পাশে নিচুমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এমন বিনয়ী সে কবে হলো?
‘হাফসা তো আমাদেরই মেয়ে।ওর বাবা নেই,তাতে কি।আমি,আমরা তো আছি।হাফসাকে আমি একেবারে অধিকার সমেত আমার মেয়ে করে আমার ঘরে নিতে চাই।আশা করি তোমার আপত্তি থাকবে না।ঘরের মেয়ে ঘরে থাকলো, তুমিও নিশ্চিন্তে থাকলে।’
মাহের এখনো বুঝতে পারেন নি।’মানে?’
‘রিযাল ওইদিন যা করেছে আমার কাছেও ক্ষমা চেয়েছে।লজ্জায় তোমার সামনে আসে নি আর।ও হাফসাকে পছন্দ করে।ছেলেমানুষি করেই ভুল করে ফেলেছিলো।তবে পার্সোনালি তুমি তো তাকে চেনো, সে কেমন।’
মাহের প্রস্তাবটা ইনডিরেক্টলি না করে বললেন, ‘এখন আর এসব নিয়ে ভাবছি না।’
‘সমস্যা নেই।সময় নাও।কিন্তু আক্বদ হয়ে যাক।’
‘এসব চিন্তা করছি না এখন।’
‘মাহের আমি তো আমার ভাতিজিকে নিয়ে দূর্নাম শুনতে পারছি না আর।’
‘মানে?’
‘হাফসার দূ’বার বিয়ে ভেঙেছে।মানুষের কানাঘুষা বেড়ে গেছে।ওরও একটা সমস্যা আছে।তুমি কি ভাবছো এতকিছুর পরও ওর জন্য কোনো ভালো প্রস্তাব আসবে?’
মাহেরের ভীতি যেন বেড়ে গেলো আরও।মাহেরের নীরবতায় ভদ্রলোক আরেকটু মাশালা ঢেলে বললেন, ‘তোমার চাচী তো অনেক আগে থেকে হাফসাকে পছন্দ করে রেখেছে।কিন্তু কেন জানি সাহস করে প্রস্তাব রাখতে পারিনি।এখন যেহেতু সুযোগ আছে তাই বলছি।’
‘ভেবে দেখবো।’
‘তা দেখো সমস্যা নেই।তবে আমার ছোট্ট একটা রিকুয়েষ্ট আছে।’
ফার্মগেটের জায়গা টা তুমি তোমার বোনের নামে করে দিও।রিযাল’ই না হয় নিজ দায়িত্বে তাঁর চাচার স্বপ্ন টা পূরণ করলো।’
মাহের চুপচাপ শুধু শুনে গেলেন সব।উনার বলার কিছু নেই।ভেবে দেখবেন বলে তাদেরকে বিদায় দিলে আরহাম জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কি সিদ্ধান্ত নিচ্ছো?’
‘আংকেলের কথা তো খারাপ না।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১১
আরহামের এতক্ষণে জমা হওয়া রাগ যেনো ফেটে পড়লো আবার।ক্ষিপ্র কন্ঠে বললেন, ‘তোমার বোনের জীবন এতো ঠুনকো?তুমি কি বুঝতে পারছো না তোমার বোনের বিনিময়ে তাঁরা তোমাকে কনভিন্স করে ফার্মগেটের জায়গা তাদের দখলে নিতে চাইছে?আর.…আর তুমি উনাকে এমন কারো হাতে তুলে দিবে,যে আগেই তার লিমিট ক্রস করেছে?
