Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৩

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৩
Maha Aarat

মাহের তৎক্ষনাৎ আরহামের চোখে চোখ রাখলেন।আসলেই তো।অধিক শোকে কি একদম ব্রেইন ওয়াশ হয়ে গেছে যে পারিপার্শ্বিক কিছুই উনার বুঝে আসছে না।মাহের ক্লান্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,
‘আরহাম ভাবতে পারছি না কিছু।’
‘এতো প্রেসার নিয়ো না।সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ।’
‘ইন শা আল্লাহ।’
আরহাম খানিক সময় চুপ থেকে বললেন, ‘মাহের আমাদের যেতে হবে।তুমিও চলো।’

‘এখনই ফিরবো না।কয়েকদিন ছুটি নেয়া আছে।’
‘তোমার ইচ্ছা।ড্রাইভার আংকেল কিন্তু চলে আসছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোব।’
‘মানে?সকাল সকাল তুমি কি শুরু করলে?কালকে যাবে।’
আরহাম হাসলেন।বললেন, ‘যেতেই হবে।সবাই রেডি।’
‘যাও।’
‘রাগ করছো কেন?একটা কথা বলা উচিত।তুমার লাইফটা নিয়ে তুমি আগে ভাবো।তুমি যদি বিয়েটা করে নাও,ঘরের মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে।তোমারও আর টেনশন হবে না।’
মাহের সরু চোখে আরহামের চোখ চোখ রেখে বললেন, ‘আমার বিয়ের বয়স হয়েছে?’
‘কি বলে!বিয়ে করে দূ-তিন বাচ্চার বাবা থাকার কথা ছিলো এখন।’
‘তুমি তো দূ-তিন বাচ্চার বাবা হয়ে গেছো?’
‘হই আর না হই ফরজ কাজে তো দেরি করি নি।প্লিজ থিংক এবাউট দিস ম্যাটার সিরিয়াসলি।’

আম্মু,মাইমুনা,আইরা রেডি চলে যাওয়ার জন্য।আইরা হাফসাকে খুব জোর করছে তাঁদের সাথে যাওয়ার জন্য।যাওয়ার আগে হাফসাকে বলে গেলো,
‘একদম আপসেট হবেন না আপু।আপনার জন্য নিশ্চয়ই ভালো কিছু রয়েছে যার জন্য একটু কষ্টের সময় পার করতে হচ্ছে।আপনি তো স্ট্রং ইমানদার।সাময়িক কিছুর জন্য ভেঙে পড়বেন না।আর শুনুন, ওখানে গেলে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসবো আপনাকে।রেডি থাকবেন কেমন?’
হাফসা মুচকি হাসলো কেবল।যাওয়ার আগে আম্মু স্নেহের সহিত মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তুমি যে ঘরে যাবে সেটা গোটা পরিবারের সৌভাগ্য হবে।আমাদের জন্য দোয়া করো।’
মাইমুনা মুচকি হেসে তাঁর গালে গাল ঘষে ভালোবাসার স্পর্শ এঁকে বলল, ‘তোমাকে দেখে বুঝেছি আমার ইমান কতোটা দূর্বল।ইমানের মেরামত এখনো ঢের বাকি।আর শুনো,তোমার ফিউচার বর দেরি করার জন্য খুব করে বকে দিবে।আর অবশ্যই তিনি সৌভাগ্যবান।ভালো থেকো।
আসি।’

আরহাম অপেক্ষা করছেন বাইরে।আম্মু, মাইমুনা গাড়িতে উঠলেও আইরাকে তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি হলো?উঠো?’
অমনি সে নিকাবের নিচ দিয়ে বের করলো একটা কবুতর।কবুতরের দূই ঠোঁট বেঁধে এনেছে সে যাতে ডাকাডাকি না করে।
আরহাম এ দৃশ্য দেখে ভারী চমকালেন।জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা তোমার হাতে কেন?’
‘এটাকে আমি পোষ মানাবো।’
‘আইরা!তুমি বাচ্চা?’
‘উহু আমি বড়ো।তবে আমি এটা নিবোই।এটাকে ধরতে সারা সকাল আমাকে এর পেছনে ছুটতে হয়েছে।’
আরহামের পিছনে মাহের এসে দাঁড়ালেন।কোনো সমস্যা হয়েছে কি জিজ্ঞেস করতেই আরহাম বললেন, ‘একটা কবুতর নেওয়া যায়?’

‘যায়।’
‘কীভাবে নিবো?’
‘খাঁচায় করে।’
‘আশেপাশে বার্ডস সপ আছে?’
মাহের খানিক ভেবে বললেন, ‘ওয়েট আমি আনতে বলছি।’
কিছুক্ষণের মধ্যে হৃদান মিনি খাঁচা নিয়ে এসে কবুতর ঢুকিয়ে দিতে ভুলবশত সেটা হাত ফসকে উড়ে যেতেই আইরা ভেটু ভেঙে কেঁদে উঠলো।তাঁর এত কষ্ট বৃথা যাবে?আসার পর থেকে সে আপুকে বলে রেখেছিলো একটা ফুটফুটে কবুতরের বাচ্চা সে নিবেই।
ওর কান্না থামাতে আরহাম বললেন, ‘যাওয়ার পথে কিনে নিয়ে যাবে।’
‘নাহ।আমার ওটাই লাগবে।’
মাহের চুপচাপ সার্কাসের দৃশ্য শুধু প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছেন।এবার বললেন, ‘সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত এটাকে আর ধরা যাবে না।’

আইরা খানিক রাগ মিশিয়ে হৃদানকে বলল, ‘তুমি কেন দিতে গেলে ভাই?আমি ঢুকালে তো উড়ে যেতো না।’
আরহাম দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘সেটা তোমার ভাগ্যে নেই।দেরি হচ্ছে।তাড়াতাড়ি উঠো।’
আইরার অভিমান আর রাগ মিশে একাকার।ভাইটা সবসময় তাকে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দেখেন?একটা কবুতরই তো সে নিতে চেয়েছিল।গাড়িতে উঠে আর কোনো কথা বললো না।তাদের গাড়ি বাড়ির সীমানা পেরোতেই হৃদান উৎসুক হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে, ‘আপু টার কি কবুতর পছন্দ?’
‘জানিনা।’
‘হয়তো।নয়তো সামান্য কবুতরের জন্য এত তাড়াতাড়ি কারো চোখে জল আসে?’
মাহের আর প্রত্যুত্তর করলেন না।আসলেই তো,সামান্যতেই এতো ইমোশনাল?জীবনের বড় বড় ধাক্কাগুলো কীভাবে সামলাবেন!

পাএপক্ষের সামনে প্রথমবার বসা তাঁর।কিন্তু অবাক করা বিষয়ে হচ্ছে তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে না,চোখেমুখেও লাজুকতার ছিঁটেফোঁটাও নেই।ছেলেটা ঠিক তাঁর মুখোমুখি অথচ চোখ তুলে একবার তাকালোও না এশা।রায়ান বাবার দূরসম্পর্কের এক বন্ধুর ছেলে।বড়দের হালকা আলাপ-আলোচনা শেষে তাদের আলাদা মিট করতে দেওয়া হলো।
ছাদে এসে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছে দূজন।ঠিক পাশাপাশি নয়।মাঝে দূরত্ব অনেক।এশাকে নীরব দেখে রায়ান নিজেই কথা শুরু করলো,
‘কেমন আছেন?’
এশা মাথা নাড়ায় কেবল।
‘আপনার কি মন খারাপ?’

এশার বিরক্ত লাগে তাকে।বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে অন্যদিকে ফিরে সে।
‘আমি যে বুড়ো আপনি খেয়াল করেছেন?’
এশা তৎক্ষনাৎ তাকালো।রায়ান একগাল হেসে বলল, ‘যাই হোক তাকালেন।’
বললেন না, আপনার মন খারাপ কেন?’
এশার বিরক্তির মাএা আরও একধাপ বাড়ে।হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাগ আয়ত্তে আনে সে।এই লোকেট সাথে উল্টাপাল্টা বিহ্যাভ করলে বাবা অসম্মানিত হবেন।তাই বলল, ‘না।’
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনি কাউকে পছন্দ করেন…
এশা চমকে তাকালো।

রায়ান কথা চলতি রেখে বললেন, নয়তো এখন বিয়ে করতে চাচ্ছেন না এই দূইটার মাঝে যেকোনো একটা হবে, আপনার আমাকে ইগনোর করার রিজন।নির্দ্বিধায় শেয়ার করুন।কোনো সিদ্ধান্তের জন্য আমি আপনাকে মোটেও জোর করবো না।’
এশা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।লোকটাকে সত্যিটা বলা উচিত।কিন্তু সত্যি টা কি?যে সে একজন কে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে,অথচ লোকটা তাকে পছন্দ করে না?
‘আমি একজনকে পছন্দ করি।’
রায়ান হালকা হাসেন।উনার হাসিটা ঠিক খুশির, না কষ্টের সেটা বুঝা দায়।
‘তা বলেছেন উনাকে?বিয়ে নিয়ে আপনারা প্ল্যান করেছেন?’
‘না।’
‘তাহলে?’
এশা ইতস্তত করে বলল, ‘উনি আমাকে পছন্দ করেন না।’
‘কেন?অন্য কারো সাথে কমিটেড?’
‘না।’

‘যিনি আপনাকে পছন্দ করেন না তাকে নিয়ে কেন কষ্ট পাচ্ছেন?উনি তো উনার মতো এগিয়ে যাবে।আপনি কেনো মরীচিকার পেছন ছুটবেন?’
এশা কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো।সে তাঁর পছন্দের মানুষকে নিয়ে ভাববে কী ভাববে না সেটা এই লোক বলার কেউ না।একটুখানিতেই লোকটা এতো অধিকার দেখিয়ে কথা বলছে কেন?
রায়ান বোধহয় বুঝে গেলেন এশার কঠিন চোখের ভাষা।দূ:খিত হয়ে বললেন, ‘সরি।বেশী বলে ফেলেছি।তবে আমি ভণিতা না করে একটা কথা বলতে চাই,বিয়ে হচ্ছে হালাল সম্পর্ক।পবিএ বন্ধন।এই সম্পর্কে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা নিজেই ভালোবাসা ঢেলে দেন।আর ওপর পাশের মানুষ সঠিক হলে যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যায়।আমি আপনার সেই সঠিক মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে চাই।যদি সুযোগ দেন তবেই।’
এশা খানিক ভড়কালো।লোকটা সরাসরি বলে ফেলবে সে ভাবেনি বিধায় বেশ অস্বস্তিতে পড়লো।
এশার নার্ভাসনেস দেখে রায়ান মৃদু হেসে বললেন, ‘ইটস ওকে।ইউ ক্যান টেইক টাইম।পরে জানালেও হবে।চিন্তা করুন,ভেবে দেখুন নিজের জন্য কী সিদ্ধান্ত নিবেন আপনি।’
এশা প্রশ্নবিধক চাহনীতে তাকালো।রায়ান তাকে নিশ্চিন্ত করে বললেন, ‘বাবা আর আংকেলকে আমি নিজে বলবো,আমি কিছুটা সময় চাই।ততদিন আপনি ভেবে নিন।’

পরিস্থিতি অনুকূলে নয়।আরহাম দূর থেকে এগিয়ে এসে তাঁর কাঁধে হাত রাখতেই মাহের চমকান।ততক্ষণে পরিস্থিতি বেসামাল।উঠোন ভর্তি মানুষ।বিশেষ করে মহিলা।তাঁরা যে যার মতো বাজে বকছে।মাহেরের ইচ্ছে হলো, সামাদ মুনতাকিম সহ তাঁর কূটনীতিক ছেলেকে খুন করে আসতে।ঘন্টাখানেকের মধ্যেই বদনাম রটিয়ে দিয়েছে।আরহাম কান পেতে শুনলেন,মাহেরের বোনকে নিয়ে তাঁরা খারাপ ধরনের কথা বলছে।শুধু খারাপ নয়,অত্যন্ত বাজে রকমের খারাপ।
ভেতর ঘরে নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাএ কিছু সময়ের মধ্যে কি করে এমন কিছু হলো?’
‘ওই খারাপ লোক সব পারে আরহাম।এখানে থাকাটা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।আমি কি করবো!
মাহেরের কন্ঠে অসহায়ত্ব।
সামাদ মুনতাকিম বাড়ির ভেতরে আসলেন না।গেট থেকেই হট্টগোল প্রত্যক্ষ করে মুচকি হেসে প্রস্থান করলেন।

হাফসা নীরবে কাঁদছে।সে জানে তাঁর ক্যারেক্টার নিয়ে যা কিছু কানে আসছে তাঁর একবিন্দুও সত্যি নয়।তবুও তাঁর কান্না থামছে না।মানুষ এতো খারাপ মস্তিষ্কের কেন?
মাইমুনা তাকে দেখছেন।আইরা একবার জানালায় উঁকি দিয়ে উঠোনে ভীড় হওয়া লোকদের রাগে ভালো ভাষায় গালি ছুঁড়ছে আরেকবার হাফসার পাশে এসে তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে।
বাড়ি থেকে বেশ দূরে গিয়েও তাদের ফিরে আসতে হয়েছে।আরহাম বাজারের সরু গলি পেরোতে না পেরোতেই কিছু কথা শুনলেন।উনার মনে হলো,এই কথাগুলোই যথেষ্ট কারো সম্মানে আঘাত হানার জন্য।ততক্ষণে গাড়ি থামিয়ে কল দিলে মাহের ফোন রিসিভ করলেন না।বেশ ক’বার কল দিতেই শেষের বার যখন কল তোলা হলো,হট্রগোলের আওয়াজ শুনেই আরহাম কিছু টের পেয়ে গেলেন।গন্তব্য ঘুরিয়ে পুনরায় ফিরে আসতেই এমন দৃশ্য।

পাশের ঘরেই আরহাম।মাইমুনা তাকে নিয়ে সিটিং রুমে গেলেন।জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক সিদ্ধান্ত তিনি হাফসার পাশে পাঁচ মিনিট বসেই নিয়ে নিয়েছেন।এতটুক বুঝেছেন শুধু,আজ যদি উনি হাফসার জায়গায় থাকতেন, তবে মিথ্যে অপমান আর সম্মানহানির বানানো কৌতুক শুনে ভয়ংকর কোনো ক্ষতি হয়তো করে ফেলতেন নিজের।
বুকের মধ্যে পাথর চেপে তিনি মা আর আইরার সাথে এ বিষয়ে কথা বলে এসেছেন।আরহামের সংলগ্নে আসতেই বলল,
‘শাহ, আপনি আজ হাফসাকে বিয়ে করে নিন।’
আরহাম একেবারে স্বাভাবিকভাবে তাকালেন।যেনো মাইমুনা সহজ কিছু বলছেন।
আরহামকে এমন ভাবলেশহীন দেখে আবারও বলল, ‘আমি সিরিয়াসলি বলছি।আপনি পাত্তা দিচ্ছেন না?’
‘নো হানি।নেভার সে দিস টাইপ ওফ সামথিং।আমি এর আগেই যে ভুল করেছি সেটার সারা জীবন আপনার কাছে ক্ষমা চাইলেও কম হয়ে যাবে।’
মাইমুনা অধৈর্য্য হয়ে বলল, ‘আমি তো আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।আমি জানি একটা মেয়ের জন্য এমন সিদ্ধান্তের থেকে কঠিন কিছুই নেই।তবুও আমি বলছি।ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েই বলছি,আপনি ওকে বিয়েটা করে নিন।’

‘কি বলছেন মাইমুনা এসব?পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।সাময়িক খারাপ সময়টা থাকবে না।’
‘তবে ওর যে সম্মানে আঘাত লাগছে?একটা মেয়ের সবচেয়ে দামী জিনিস তাঁর সম্মান।সত্যিটা মানুষ খুঁটিয়ে দেখে না।তারা তিল থেকে তাল করে।অথচ একটা মেয়ের নিজের লাইফ লস্ট করার জন্য তাদের কয়েকটা কথাই যে যথেষ্ট তাঁরা হয়তো জানে না।আম্মু,আইরা দূজন রাজি।আপনি না করবেন না আর।’
আরহাম উনার সিদ্ধান্তে অটল থেকে বললেন, ‘কখনোই না।হানি,এটা কোনো আবেগের সিদ্ধান্ত নয়।সারা জীবনের ব্যাপার।আমি সন্তুষ্ট থেকেই আপনার সাথে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে চাই।”
মাইমুনা অধৈর্য্য হয়ে বলল, ‘কিন্তু আমি তো সন্তুষ্ট থাকতে পারবো না।কথার আঘাত বুঝেন আপনি?আপন জনেরা সামনে মুখে মধু মেখে কথা বলে,আড়ালে যা বলে আমি সেটা সহ্য করতে পারি না।আমি এসব থেকে মু্ক্তি চাই।আপনারও তো ইচ্ছে থাকতে পারে একটা প্রজন্মের।আমি তো অসুস্থ….
আরহাম মাইমুনার ঠোঁটে আঙ্গুল রাখলেন।তাকে বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘এনাফ।আমি আপনার অসুস্থতা জেনেশুনেই আপনাকে নিকাহ করেছি।আর কে কি বলে আপনাকে?আমাকে বলুন?কারা বলেছে?কারা হার্ট করে কথা বলেছে?’

মাইমুনা আরহামের হাত সরিয়ে বলল, এখন এসব জানার সময় নয়।আমি না হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় জিনিসের অর্ধেক ভাগ স্যাকরিফাইস করলাম।পরপারে এর দামি বিনিময় পাবো ইন শা আল্লাহ।আমার কোনো আপত্তি নেই আপনি ওকে….
‘পারবো না।’ আরহামের স্পষ্ট উত্তর।
‘কেন?মনে হারাম ফিলিংস নিয়ে ঘুরতে পারবেন অথচ হালাল করতে পারবেন না?শাহ?আমি বুঝি,পছন্দের কাউকে ভোলা সহজ নয়।হাফসাকে তো ওর ছোটবেলা থেকে আপনি পছন্দ করতেন।অস্বীকার করতে পারবেন না।এতদিনের ফিলিংস এতো সহজে ভুলে যাবেন আমি এটা বিশ্বাস করব?’
‘জাস্ট সাট আপ।কতবার বলেছি সেটা অতীত।আর উনাকে পছন্দ করলে আজকে উনার কঠিন পরিস্থিতিতে আমি নিজেই তাকে বিয়ে করতে চাইতাম আপনার বলার আগে।’
আরহামের রাগী গলায় উঁচু আওয়াজ শুনে মাইমুনা ভয়ে আটসাট হয়ে বসে রইলো।আরহাম তাঁর সাথে কখনো রেগে কথা বলেন না কিন্তু হুটহাট যখন রাগেন,তখন মাথা ঠিক থাকে না।

পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।আরহামের মনটা চাচ্ছে সবার মুখের ওপর কিছু কথা শুনিয়ে দিতে।ঘরে আরহাম একমাত্র পুরুষ যার সাথে হাফসার কোনো আত্নীয়তা বা আলাদা সম্পর্ক নেই।এটাই যেনো তাদের মোক্ষম হাতিয়ার।এবার হাফসার নামের সাথে আরহামকে জুড়ে দিতেও তাঁরা দ্বিধাবোধ করছে না।মাইমুনা আর কথা বলেন নি।আম্মু আইরা উনাকে আড়ালে নিয়ে বুঝিয়েছেন সময়ে সময়ে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার নয়।বরং স্বাভাবিক হতে চাইলেও তা হতে দিবে না সামাদ মুসতাকিম।

সন্ধ্যে নিভতে শুরু করেছে আঁধারে।যেনো বহুদিনের অভিযোগ ঘরে তুলে সন্ধ্যে আকাশে কালো রং ছড়াচ্ছে।ভেতর ঘর থেকে আসা কান্নার আওয়াজ আরহামের কান অব্দিও পৌঁছালো।মানুষ কীভাবে এত ঘৃণ্য কথা বলতে পারছে ।তাঁরা সংখ্যায় কম হলে কিছু করা যেত অথচ তাঁরা বহুজন।মাহেরের চোখেমুখে অসহায়ত্ব।উনার একটাই কথা,আজকের এসব পরিস্থিতি তৈরী হওয়ার জন্য তিনিই দায়ী।হাফসার কথা ভেবে রিযালকে নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে গেলেই আম্মু, চাচা তাকে কঠিনস্বরে বললেন, ‘যারা তোমার বোনকে নিয়ে বিয়ের আগেই কুৎসা রটাচ্ছে তাঁরা বিয়ের পর তোমার বোনকে সম্মান দিবে ভাবছো কী করে?’
দরজায় তালা দেওয়া।সিটিং রুমের থাই’য়ের অপর পাশে চোখ রাখলেই দেখা যাচ্ছে অঢেল ভীড়।যেনো তাঁরা তাদের লুটে খাওয়া সম্পত্তি ফিরিয়ে নিতে ভীড় জমাচ্ছে।
এতক্ষণে পরিস্থিতি সামলানোর কোনো একটা উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হলেও মাহের আর আরহাম দুজনই আতঙ্কে পড়লেন যখন গ্রামের মুরব্বিরা বাড়িতে প্রবেশ করলো।মাহের দিশেহারা হয়ে বসে পড়লেন।গ্রামের মানুষেরা আগে থেকেই মাহেরের পরিবারে বিপরীত।আর এখন কোন ভরসা রাখা যায় যে তাঁরা সত্যিটা বিশ্বাস করবে?

তাদের হুকুমে ঘরে আলাদা বসে বৈঠক শুরু করলে তাঁরা সামাদ মুসতাকিমের পক্ষে কথা বললো।তাদের সিদ্ধান্ত এটাই হয় হাফসাকে রিযালের সাথে বিয়ে দেওয়া হোক,নয়তো কঠিন শাস্তি দেওয়া হোক।অধিকাংশরাই প্রথম প্রস্তাবকে সামনে রেখে বলছে,ভালোয় ভালোয় বিয়েতে রাজি হয়ে যাও।নয়তো বিপরীত ঘটবে।
মাহের যখন একেবারে নীরব শেষ সিদ্ধান্ত দেওয়ার অপেক্ষামাএ তখুনি আরহাম সবার সামনে বললেন, ‘আমি তোমার বোনের দায়িত্ব নিতে চাই যদি তোমার আপত্তি না থাকে?’
আচমকা এমন কথায় সারা ঘরময় নীরবতা নেমে এলো।মাহের চমকে তাকালেন আরহামের দিকে।বোনের সম্মানের জন্য আরহাম এতো বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবে?
মুরব্বিদের উঁচু আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।আরহামের প্রস্তাব তাঁরা মানতে নারাজ অথচ আরহাম এখনো মাহেরের সম্মতি শোনার অপেক্ষায়।

‘এসব মিথ্যে অভিযোগগুলোর জন্য তুমি কেন সাফার করবে?’
মাহেরের প্রশ্নের বিপরীতে আরহাম শুধু জানতে চাইলেন, ‘তোমার আপত্তি আছে আমাকে নিয়ে?হ্যাঁ অথবা না?’
মাহের এমন সিদ্ধান্ত নিতে চান না।ভুল তো করেছেন উনি।আরহাম কেনো সেটার শাস্তি নিবে!
বাকিদের হইচই বেড়ে যাচ্ছে।বাইরের মানুষ ও শোনানির অপেক্ষায়।আরহাম অধৈর্য্য হয়ে মাহেরকে বললেন, ‘তুমি বলো আমাকে নিয়ে তোমার আপত্তি আছে, নয়তো নেই?আমার কথা চিন্তা করতে হবে না।তোমার আমাকে নিয়ে আপত্তি আছে কী না সেটা বলো?’

মাহের এখনো দ্বিধায়।আরহাম তাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার এখন আমাকে নিয়ে ভাবা মানে স্বার্থপরতা করা।তোমার বোনকে নিয়ে একটাবার ভাবো উনি কেমন সিচুয়েশন ফেইস করছেন।’
মাহের উত্তর দিলেন, ‘আপত্তি ন্ নেই।আমার আপত্তি নেই।’
মাহের সম্মতিতে যেনো রাগে ফুঁসে উঠলো অন্যরা।একেকজন একেকরকম বাঁধা তুলছে।তাদের একটাই দাবি,রিযালের সাথে হাফসার নিকাহ।অথচ আরহাম সবার সামনে কঠিন স্বরে নিজের সিদ্ধান্ত শুনিয়ে বললেন, ‘আমি তাকে বিয়ে করবো।এখনিই সবার সামনেই।উনি আমার স্ত্রী হওয়ার পর আমি দেখতে চাই কে খারাপ কথা বলে তাকে নিয়ে?জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম।’

হাফসা সম্মতি দিচ্ছে না।এলাকার পক্ষ থেকে শুধু পান্চায়েত প্রধান,কাজী আর দূ পক্ষের পরিবার।নিকাহনামা পড়ে শোনানো হলে আরহাম সবার আড়ালে মাইমুনার দিকে একবার তাকাতেই সে হাসিমুখে ইশারা করলো সাইন করে দিতে।আরহাম সাইন করে দিয়ে পেপারটা হাফসার দিকে এগিয়ে দিলে সে সাইন করতে চাইলো না।হাফসাকে আরহামের প্রস্তাব শোনানোর পর থেকেই সে নারাজ।সে মত দিচ্ছে না আপুর কথা ভেবে।সে কীভাবে একটা সুন্দর সংসারে আঘাত করবে?সে মোটেই পারবে না।মেয়েরা প্রিয়তমের ভাগ কাউকে দিতে চায় না তবে আপু কেন দিবেন?আর দিলেই সেটা মেনে নিতে হবে?এতোটা স্বার্থপর সে হয়ে যায়নি।
মাহের আদেশের সুরে বলল, ‘সাইন করো হাফসা।’
তবুও হাফসা টলছে না।আরহাম অধৈর্য হয়ে তাঁর উদ্দেশ্যে ধীরসুরে বললেন, ‘সাইন করুন।’
আঁতরের সুন্দর সুঘ্রাণ টা আরো কাছাকাছি আসলো হাফসার।এই প্রথম সে তাঁর অতীতকে নিজচোখে দেখলো।যাকে দেখার অধিকার সে সেদিন হারিয়েছে যেদিন সে তাঁর কথা হারিয়েছিলো।

হাফসাকে একপ্রকার জোর করে সাইন করতে দেওয়া হলো।আইরা যখন তাঁর হাতে জোর করে কলম তুলে বলছিলো, ইসস আপু তাড়াতাড়ি আপনাকে ভাবি ডাকার সুযোগ করে দিন মাহের তখন অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।এ মেয়ের কি আগে থেকেই প্ল্যান ছিলো হাফসাকে ভাবি ডাকার?
সাইন করলেও সম্মতি দিতে সে অপারগ।মাহের যখন বিনয়ের সুরে বললেন, ‘আমি বারবার তোমার জন্য ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলাম এবার যখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি এখন আর আপত্তি করো না।’
হাফসার সম্মতিতে সুষ্ঠুমতেই বিবাহ সম্পন্ন হলো।এবার আরহাম বাইরে গিয়ে প্রত্যুত্তর চাইতেই জনগনের মুখ ভোঁতা হয়ে গেলো।এই সেলিব্রিটিকে তাঁরা মোটামুটি চিনে।যেমন তাঁর নাম-যশ তেমন ক্ষমতা।এতক্ষণ তো আবেগে বুলি ছোঁড়া হয়েছে অথচ সত্যি টা তো কারা জানা নেই।মুখে কুলুপ এঁটে গ্রামবাসী ফেরত যেতেই মাহের স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে আরহামের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন। আরহাম তাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আজকে ফিরতে দাও।পরে অনুষ্ঠান হবে।’

মাহের কোনোরুপ বাঁধা দিলেন না।আরহাম তাঁর স্ত্রীকে কতটা পছন্দ করেন,সেটা একটু হলেও জানা আছে মাহেরের।আজকের সিদ্ধান্ত তাদের দুজনের জন্যই কষ্টদায়ক।আরহাম সেটা বুঝতে না দিলেও ঠিকই বুঝে নিলেন মাহের।
তারা যখন যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলে আইরা বায়না ধরে বলল, ‘এখন তো আমার থাকার অধিকার আছে।আজ আমি কোনোভাবেই যাবো নাহ্ ভাবির কাছে থাকবো মানে থাকবোইইই।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১২

তাঁর জিদে হার মানতে হলো।যাওয়ার আগে আরহাম হাফসার সাথে মিট করে শুধু বললেন, ‘ভাববেন না আপনার প্রতি আমি করুনা অথবা দয়া করেছি।আমি শুধু বিশ্বাস করি আল্লাহর হুকুম ব্যাতীত কিছুই হয় না।আর এটা অবশ্যই আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে।আপনি সময় নিন।আর চাইলে সিদ্ধান্ত বদলাতেও পারেন আমি সময় দিবো যদি আপনার অন্য কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে থাকে।তবে আপনি এক সেকেন্ডের জন্য ও আমার ওয়াইফ ছিলেন এই সত্যি মুছে যাবে না।’

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৪