অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৫
Maha Aarat
“তারপর?তারপর কি হলো?’
আরহাম এক লাইনে কথার সমাপ্তি টেনে বললেন, ‘তারপর মাহের পানি নিয়ে আসলো।উনি আর আসেননি।’
মাইমুনা তৎক্ষণাৎ ফিক করে হেসে ফেলে।রম্যসুরে বলেন, ‘এতো ভয় দেখালেন হাফসা আর আসলো না?’
‘আমি ভয় কোথায় দেখালাম?’
‘ওরকম উসখুস করলে, এবনরমাল বিহ্যাভ করলে মেয়েটা তো ভয় পাবেই।’
আরহাম আর প্রত্যুত্তর করলেন না।মাইমুনার এলোচুলে বিলি কাটতে কাটতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি যদি বলি,আপনি আমার কাছে সেরা কিছু চান যেটা দিতে আমি বাধ্য, আপনি কী চাইবেন হানি?’
মাইমুনার গোপন দীর্ঘশ্বাস মিররে চোখ এড়ায় না আরহামের।হাত এগিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে রইলেন।মাইমুনা উত্তর দিলেন, ‘দুনিয়াতে তো আমার সবচেয়ে বড় স্যাকরিফাইস স্বয়ং আপনি।আখেরাতে আল্লাহর কাছে আমার প্রথম চাওয়াই থাকবে,আপনার যেনো সেখানে আর কোনো ভাগ না হয়।’
‘আচ্ছা।’
মাইমুনা আরহামের দিকে ফিরে আহত সুরে বললেন, শাহ আপনাকে নিয়ে আমি কেমন দূর্বল হয়ে যাচ্ছি।আমাকে এমন কিছু বলুন, যাতে আমার ইমান স্ট্রং হয়।আমি ভুল করেও চাই না শয়তানের কুমন্ত্রণায় আপনার মাসনার সাথে অন্যায় কিছু করতে।’
আরহাম মাইমুনার দৃষ্টিতে পলকহীন দৃষ্টি রেখে বললেন ‘আমি আপনাকে ভরসা করি হানি।আপনি আমার একান্ত ব্যক্তিগত শুভাকাঙ্ক্ষী।বাহির থেকে যখন আমি মাথাভর্তি চাপ আর টেনশন নিয়ে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরি,তখন আপনার দর্শন আমার এলেমেলো মস্তিষ্ক শান্ত করে দেয়।আপনার সান্নিধ্যে আমার মন খারাপ উবে যায়।আপনার একেকটা ভরসা নিয়ে আমি যেনো আকাশ ছুঁতে পারি।আপনি আমার জীবনে অফুরন্ত নিয়ামাহ নিয়ে এসছেন।আপনি আমার স্ত্রী তার আগে আপনি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।আম্মুর সাথে আমি সবকিছু শেয়ার করতে পারি না,কিছু কিছু বিষয় আব্বুর সাথেও না,আইরার সাথে তো না-ই কিন্তু সেই কথাগুলো আমি নির্দ্বিধায় আপনাকে শেয়ার করতে পারি।আমার জীবনে দ্বিতীয় কেউ হলেও আপনি অদ্বিতীয় হয়ে থাকবেন।আই লাভ ইউ ভেরী মাচ হানি।
আপনাকে ভালোবাসায় যেনো আমার কখনো কমতি না হয়।সেই ভয় হয়।আমি মোটেও যোগ্য নই দুইজনের মধ্যে সমান সমতা করতে।ব্যর্থ হলে আমি আল্লাহর কাছে কি জবাব দিব?’
আরহামের কন্ঠে অসহায়ত্ব।মাইমুনা তাকে সাহস জুগিয়ে বললেন, ‘আমি আপনাকে অনুমতি দিয়েছি,আপনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিন্তু এসবের আগে আরশে আযীম থেকে এ সিদ্ধান্তের ফয়সালা হয়ে গিয়েছিলো।আল্লাহ নিজেই আপনাকে এর জন্য চোজ করেছেন।তিনিই আপনাকে সাহায্য করবেন নিশ্চয়ই।হতাশা তো শয়তানের পক্ষ থেকে আসে।’
‘ইন শা আল্লাহ।’
রায়ানের সাথে দ্বিতীয় সাক্ষাৎ এশার।আজকে এশার সিদ্ধান্ত শোনানোর কথা।রায়ান বেশ প্রস্তুত হয়েই আসছেন।কিন্তু মেয়েটার নীরবতা তাকে ভাবিয়ে তুলছে।এশার থেকে নেগেটিভ উত্তর পেলে রায়ান আহত হবেন।
এশা চুপচাপ নিচুমুখে বসে আছে।ক্যান্টিনের পাশেই এই স্পেশাল ক্যাফে।এশার ওয়ার্কপ্লেস থেকে পাঁচ মিনিটের পথ।এশা মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে তাঁর কথাগুলো।লোকটাকে সে গতরাতেই বার্তা পাঠিয়েছিলো, ‘যেকোনো সিদ্ধান্ত শোনার জন্য প্রস্তত হয়ে আসবেন।’
রায়ান এশার উত্তরের অপেক্ষা করলো না।উনার ঠোঁটে খেলে গেলো মলিন হাসি।মেয়েটার নীরবতা তাঁর অসম্মতি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে।সেটা আলাদা করে জেনে নেওয়ার আর কোনো মানে হয় না।রায়ান গলা কেশে প্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘নার্ভাস ফিল করতে হবে না।আজ আমি বলবো আমার গল্প,আপনি আজ নীরব শ্রোতা হয়ে শুনুন।’
এশা দৃষ্টি তুললো।তাঁর চোখে উৎসাহ।অথচ গরমে তাঁর হাসফাঁস অবস্থা।নিকাবের আড়ালে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে ঘাম ঝরে পড়ছে।তবুও তাঁর আগ্রহ,সে শুনবেই এই লোকটার ব্যক্তিগত গল্প।
‘ভার্সিটি লাইফ থেকে ‘তানজুম’ নামের একটা মেয়ের প্রতি আমার দূর্বলতা।পছন্দের কথা তাকে ঘটা করে বলা হয়নি।তবে আমার কিছু বোকা বোকা কর্মকান্ডের জন্য সে ততদিনে আন্দাজ করে নিয়েছিলো।আমি এ বিষয়ে ভীতু ছিলাম।কারন মেয়েরা জেদী হয়, রাগী হয়।আমি সেটা আসলেই ভয় করি।তাই তাদের সাথে উচ্চবাক্য ব্যয় করার সাহস বা ইচ্ছে কখনো হয়নি।তানজুম বুঝে গিয়েছিলো আমি তাকে এভাবেই আড়ালে ভালোবেসে যাবো।মুখফুটে বলবো না হয়তো তাই সে একদিন নিজ থেকেই আমাকে বলে দিলো।আমিও একসেপ্ট করে নিলাম।শুরু হলো আমাদের একসাথের পথচলা।গ্রেজুয়েশন শেষ করে আমি চাকরির খোঁজে,আর সে মন দিয়ে ডিপ্লোমা শেষ করতে ব্যস্ত।এরইমধ্যে আমাদের প্রেম ছুটিয়ে চলছিলো।ও একটু বাচ্চা বাচ্চা স্বভাবের, কিছুটা বোকাসোকাও।কিন্তু আমার খুব কেয়ার নিতো।রাস্তায় একসাথে হাঁটলে আমি দেখতাম সে অন্য কোনো ছেলের দিকে চোখতুলে তাকাতো না অব্দি।এমনকি আমার অগোচরে ও না।তাঁর ভালোবাসায় একটুও খাদ ছিলো না এটা সত্য।’
রায়ান থামলেন।এশার চঞ্চল দৃষ্টি তাঁর দিকে নিবদ্ধ।এতো মাখোমাখোনভালোবাসার ইতি টা খুব ইচ্ছে হচ্ছে তার।
সন্ধ্যার পরপরই লম্বা একটা ঘুম দিয়ে উঠলো হাফসা।পাশটা খালি দেখে মন খারাপ হলো তাঁর।আইরা মেয়েটা নেই।তাঁর চঞ্চলতা,বাচ্চামো বা কেয়ারিং গুলো বড্ড মিস করছে সে।যাওয়ার আগে সে বলেই গিয়েছিলো, ‘আমি জানি আপনি আমাকে মিস করবেন।তবে মন খারাপ করার কোনো কারন নেই।মাএ কিছুদিন পরেই আমার বাসায় পার্মানেন্ট হয়ে যাবেন।তবে জানেন,ভাবি যেমন ভাইয়াকে আপনার সাথে ভাগ করেছে ঠিক তেমনি আপনাকেও ভাইয়ার সাথে আমার ভাগ করতে হবে।’
আনমনে ভাবতেই লজ্জ্বায় লাল হয়ে গেলো সে।লোকটার সাথে আজকের আলাপন সত্যিই তাঁর কাছে ভয়ানক মুহূর্তে ছিলো।ভাগ্যিশ লোকটা পানি খাওয়ার আবদার করেছিলেন বলেই পালিয়ে আসতে পেরেছে সে।কিচেনে এসে ভাইয়ার হাতে যখন পানির গ্লাস তুলে দিয়েছিলো তখন তাঁর হাতের কাঁপাকাঁপি দেখে মাহের গম্ভীরসুরে বলেছিলেন, ‘তোমার মানুষই তো।এতো ভয় পাচ্ছো কেন?’
বিছানা ছেড়ে উঠে অযু করে সালাত আদায়ের সাথে কুরআন তিলাওয়াত শেষ করলো।খাবার সার্ভ করতে করতে কানে হেডফোন লাগিয়ে তিলাওয়াত শোনার সুবাদে ফোন হাতে নিতেই দেখলো, অপরিচিত নাম্বার থেকে টেক্সট।হাফসা অবাক হলো ভীষণ।এটা তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত নাম্বার।ভাইয়া, আর এখন আইরা ছাড়া কারো জানা নেই।
উপর থেকে টেক্সট পড়লো সে।সালাম এসেছে।
হাফসার কেন জানি ভয় বাড়তে থাকলো।পরিচিত হলে তো সে চেনার কথা।কনভারসেশন টা কেটে ফেললো সামনে থেকে।
আধঘন্টা পর আবার টেক্সট আসলো।দূই লাইনে হয়তো কিছু লিখা।হাফসা সেটা পড়ে ভয়ে কাঁপতে থাকলো।আশ্চর্য লোকটা তো সামনে নেই।তাও কেন ভয় পাচ্ছে সে?
কয়েকটা লং গাউনের পিক দিয়ে লিখা, ‘চোজ ওয়ান,হুইচ ইউ লাইক।'(আরহাম)
আরহাম চোখ রাঙিয়ে ফোন কেঁড়ে নিলেন আইরার থেকে।গম্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘এসব পাগলামি বন্ধ করো।উনি রিপ্লাই দিবেন না।’
আইরা গোমড়া মুখে বলল, ‘আমি তো তোমার নাম লিখে দিলাম ভাইয়া।’
‘যিনি সামনে এসেও আমার দিকে তাকাননি তিনি টেক্সট এর রিপ্লাই দিবেন ভাবো কি করে?’
‘আমি হয়ে মেসেজ দিলে অবশ্যই রিপ্লাই দিবেন আপু।’
আরহাম তাকে এড়িয়ে চলে যেতে চাইলে আইরা বাঁধা দিয়ে বসে।আরহামের ফোন নিয়ে চট করে হাফসার নাম্বারে একটা মেসেজ সেন্ড করে আরহামের উদ্দেশ্যে বলে, ‘যাস্ট ওয়েইট এন্ড ওয়াচ।’
আরহাম আইরার কান্ডে বিরক্ত এটা উনার চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে।তাকে পাত্তা না দিয়ে আম্মুর রুমের দিকে এগোলেন তিনি।আইরা অপেক্ষা করতে করতে রুমে এসে দেখলো মা-ছেলের জমিয়ে খোশালাপ হচ্ছে।আইরা রুমে প্রবেশ করতেই শুনলো, ‘আইরা তো বুড়ী হয়ে যাচ্ছে আম্মু।ওকে বিয়ে দিয়ে বিদেয় করা দরকার না?কোথায় তাঁর না হওয়া হবু হাজবেন্ড তার আশায় বুড়ো হয়ে যাচ্ছে হয়তো…
ভাইয়ের কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো সে।কাবার্ড থেকে চাবির ঝুটিটা আরহামের দিকে ছুঁড়ে মেরেই কেবল শান্ত হলো না।চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘নিজের পথ ক্লিয়ার করার জন্য আমাকে বিদায় করার এত তাড়া তাই না?আমার মোটেও বিয়ের বয়স হয়নি।আব্বু বলেছেন সময় হলে তিনি নিজেই একটা রাজপুত্র এনে দিবেন।মাঝখান থেকে আম্মু তুমি, তোমার ছেলের কুবুদ্ধিতে সায় দিবে না।”
আরহাম তাকে ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘রাজপুত্র?এ্যাহহহ!’
‘অবশ্যই অবশ্যই।’
‘আচ্ছা বেশ দেখবো।’
‘জ্বলেপুড়ে ছাঁই হয়ো না শুধু।’
আম্মু আইরাকে শাসানোর সুরে বললেন, ‘আইরা আরহাম মজা করে বলেছে তোমাকে তাই বলে আঘাত করবে?ওর কপাল লাল হয়ে গেছে দেখো।যদি কোনো দূর্ঘটনা হতো?’
‘আপনি শুধু আপনার ছেলের পক্ষ নিবেন?ভাইয়ার কথার প্রতিবাদ করলেন না? ‘
আরহাম ঠোঁট কামড়ে হাসলেন।আইরা যখন রাগ করে তখনই সে আম্মুকে আপনি সম্বোধনে কথা বলে।
আম্মু জবাব দিলেন ‘ও ঠিক বলেছে।’
‘আচ্ছা আমি এক্ষুণি আব্বুকে বলছি।এ বাসায় সবাই আমার পর…বলতে বলতে সে সত্যিই আব্বুর উদ্দেশ্যে ফোন দিতে গেলো।
আইরা যেতেই আরহাম আম্মুর আঁচলে নখ প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে মন খারাপ করে বললেন, ‘আম্মু রাগালেন কেন পিচ্চিটাকে?’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ১৪
‘রেডি হই আমরা তোমার আব্বুর ঝাড়ি খেতে।’
আরহাম সশব্দে হাসলেন।অমনি আচমকা টিউন আসলো এস এম এস এর।আরহামের ভ্রুদ্বয় কুঁচকে এলো।উনার পক্ষ থেকে কি সত্যিই কোনো বার্তা আসলো?
