Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৬
Maha Aarat

মাধ্যমিক ভালো রেজাল্টে কমপ্লিট করলেও ভার্সিটি উঠে তাঁর একঘেয়েমি উঠে যায়।সায়েন্স নিয়ে পড়ার তীব্র ইচ্ছার সমাপ্তি হয়েছে কবেই।আব্বুর খুব ইচ্ছে ছিলো,আইরা মেডিকেলে পড়ুক।এটা উনার স্বপ্ন ছিলো বলা যায়।অথচ ভার্সিটি লাইফে উঠে তাঁর খামখেয়ালি দেখে আব্বু নিজেই পিছপা হোন।মেয়ের উপর কোনো প্রেসার ক্রিয়েট করতে চান না তিনি।সেজন্য ফার্স্ট ইয়ারে রেজাল্ট খারাপ করায়ও তিনি কিছুই বলেননি।
পড়াশোনা রীতিমতো বিরক্ত লাগে আইরার।একসময় ইচ্ছে হতো,সে একজন ভালো ডাক্তার হবে।বাট স্বপ্ন পূরনের প্রথম ধাপে কনসেনট্রেইট করার আগেই পড়াশোনা বিমুখ হয়ে পড়ে।তবুও মাসে একবার অন্তত তাকে ছুটতে হয় ভার্সিটিতে।একমাসের এবসেন্ট হওয়ার গালি একদিনেই শুনে সাথে কিছু ফর্মালিটি মেইনটেইন করে আসা তাঁর অভ্যেস হয়ে গেছে।
তবে এবার নোটিশ আসছে রেগুলার ক্লাস জয়েন না করলে টিসি দিয়ে দিবে।মেসেজ টা পাওয়ার পর আইরা নিজের প্রতি চরম বিরক্ত হচ্ছে।কে বলেছে এতো নামি-দামি ভার্সিটিতে এডমিশন নিতে।জীবনটাই পাল্টে যাবে তাঁর।

ভার্সিটিতে তাঁর কোনো কাছের বন্ধু নেই।একটা মেয়ে ছিলো নিসা।মেয়েটার বিয়ে হয়েছে লাস্ট মান্থ।তাঁরও হলে তো বেঁচে যেতো এই প্যারা থেকে।
ক্লাসের টাইম হয়ে গেছে।চুপচাপ এক কোণায় বসে রইলো সে।মেয়েগুলোর সাথে কথা বলতে গেলে তারা ভাব দেখায়।আইরাও আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চায় না আর।মেজাজ টা তাঁর ছাপ্পান্ন থেকে ছিয়াত্তুরে চলে গেছে তাদের আজেবাজে আলাপ শুনতে শুনতে।তবে সেটা এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে গেলো যখন লেকচারার হিসেবে দেখলো এক্সিডেন্টকে।আইরা প্রথম সারির ডেস্কে বসায় ক্লাসে প্রবেশ করেই চোখাচোখি হলো মাহেরের।ভ্রু কুঁচকে এক সেকেন্ড তাকিয়ে তিনি পড়ার প্রসঙ্গে চলে গেলেন।একটা কথাও অন্যথায় ব্যয় করলেন না।বোটানির নতুন বইটা হাতে নিয়ে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলো আইরা।কিন্তু মস্তিষ্ক কোনো হিসেব মেলাতে পারছে না।এই ডাক্তার সাহেব হসপিটাল ছেড়ে ভার্সিটিতে কেন আসলেন তাও ক্লাস নিতে?আর সে তো মাসে একবার হলেও ভার্সিটিতে আসে।কখনো তো চোখ পড়েনি।তবে?
বেশ কিছুক্ষণ ডাক্তার সাহেবের আলোচনা শুনে বুঝতে পারলো তিনি নতুন জয়েন হয়েছেন।হয়তো এর আগে আর একটা ক্লাস করিয়েছেন।থার্টি মিনিটস বায়োলজির কোন বিষয়ে বিস্তর আলোচনা করে চলে গেলেন আইরার সব মাথার ওপর দিয়ে গেলো।

মাহেরের ক্লাস শেষ হতেই আস্তে আস্তে ক্লাস ফাঁকা হতে থাকলো।পিছনে মেয়েদের কথা শোনা গেল, ‘ইয়াং স্যারটা কি বিবাহিত?এতো গম্ভীর কেন?প্রয়োজন ছাড়া তাকানও না অব্দি’ কেউ কেউ ক্রাশ খেয়ে বলল, ‘ডাক্তার টা হ্যান্ডসাম।একজন আরেকজন গায়ে হেলেদূলে পড়ে বলল, ‘তানিশা ঠিক এরকম একটা ডাক্তারের অপেক্ষায় এখনো কাউকে লাইফে জড়ায়নি রে’ ‘এখন দেখি আর কোনোভাবেই ক্লাস মিস দেওয়া যাবে না’ ‘ ‘ব্ল্যাক কালারে যাস্ট লুকিং এ্যা ওয়াও লাগছিলো’ ‘পড়াটা মাথার ওপর দিয়ে গেলো।আমি তো স্যারের থেকে চোখ সরাতে পারছিলাম না!’
এসব লো কোয়ালিটির মন্তব্য শুনে আইরার মাথাটা খারাপ হয়ে গেলো।সে কি না এদের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাইছিলো যাদের কাছে সুদর্শন পুরুষ মানেই চোখের যিনাহ’র বস্তু।
তাঁর খিদেটা বেড়েছে।সকালে উঠেই সে কিছু খেতে পারে না।এখন ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে তাঁর খিদেটা সামলাতে হবে।তারপর ঠান্ডা মাথায় একটা উপায় বের করতে হবে,কিভাবে ভার্সিটিতে আসা বাঙ্ক দেয়া যায়।এরকম স্ট্রাগল করে সে প্রতিদিন ক্লাসে জয়েন হতে পারবে না।এত প্যারা সে নিতেই পারবে না।

বিকেলের রোদ নুয়ে পড়েছে।ছায়া সঙ্গ নিয়েছে সাথে সাথে।রোদ্রজ্জ্বল দিনের আবহাওয়া হুট করেই কেমন নীরব হয়ে গেলো।গাড়ি করে যাতায়াতের সময় রাস্তার পাশের দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা ঠান্ডার বোতলে চোখ আটকালে পিপাসা বেড়ে গেলো তাঁর।তবুও সে যাবে না।ইদানীং ওই ঘটনার পর থেকে একা নিজেকে খুব অনিরাপদ লাগে।
ভাবতে ভাবতে সে পৌঁছে গেলো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।গাড়ির পাওনা মিটিয়ে এগিয়ে গেলো ভেতরটায়।পাঁচতলা প্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিতেই তাঁর মাথা ঘুরে এলো।এতো এতো রুমের মাঝে সে আপুটাকে কীভাবে খুঁজে পাবে।ভাবতে ভাবতে কল লাগালো কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে।কিছুক্ষণের মধ্যে রিসিভ হতেই ফ্লোর আর রুম নাম্বার জেনে সেদিকে পা বাড়ায়।
ভেতরে চলছে তালিমের ক্লাস।সে যতক্ষনে পৌঁছলো আপুটা ততক্ষণে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন যাতে রুম চিনতে তাঁর কোনো অসুবিধা না হয়।তাদের সাক্ষাৎ হতেই তিনি তাকে নিয়ে গেলেন ভেতরে।পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ও হচ্ছে আদওয়া।জেনারেল থেকে উঠে আসা একজন প্র্যাক্টিসিং মুসলিমাহ।যেহেতু তালিমের পঞ্চম ক্লাসে সে জয়েন হচ্ছে সুতরাং আগের বিষয়গুলো তাঁর অজানা।আশা করি আপনারা তাকে হেল্প করবেন।’
কক্ষে উপস্থিত সবাই বোরকা নিকাবে ঢেকে আছে।আর এতজনের মাঝে সে একা লং ড্রেসের সাথে হিজাবে জড়ানো বলে বিব্রতবোধ করছিলো।সেটা দেখে হালিমা এগিয়ে এসে বললেন, ‘নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই।আজকে আমরা পর্দার হুকুম নিয়ে আলোচনা করবো ইন শা আল্লাহ।’

নিয়নের আলো জ্বলছে চারিদিকে।চারিদিকে ঝলমলে আলোকবাতির সাথে গাড়ির উচ্চ আওয়াজের হর্ন।এ শহর রাতেও বিশ্রাম নেয় না।যেমন বিশ্রাম নেয় না খেটে খাওয়া কর্মজীবী মানুষগুলো।যেমন ল্যাম্পপোস্টের আলোর নিচে এখনো পক্কর্ণ ওয়ালা কাস্টমার খুঁজে।দূরের টং দোকানে এখনো সাটার পড়ে নি।বড় বড় মার্কেটহল তো খোলা থাকে রাত অবধি।ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততা গুছিয়ে কিছু মানুষ হয়তো বিশ্রাম পায় তাদের কর্মস্থল থেকে।যেমন মুদি দোকানের বাচ্চা ছেলেটা।যার বয়স চৌদ্দ তে পড়েনি এখনো,তবুও তাঁর সংগ্রাম যেনো ২৪ বছরের যুবককে হার মানায়।ছুটি পেয়ে পলিথিনে দূটো ডিম মুড়িয়ে সে ছুটে চলে তাঁর গন্তব্যে।ঘরে তাঁর অনাহারী মা-বাবা বা ছোট্ট বোনটা হয়তো তাঁর হাতের উপকরণের অপেক্ষায়।

গাড়ির সারি ছাড়িয়ে নির্জন জায়গা খুঁজে পাওয়া দায়।আর পেলেও সেখানে মানুষের আনাগোনা বেশী।আরহাম যেখানে গাড়ি পার্ক করলেন তাঁর কিছুটা দূরেই ব্রিজ।চারিদিকের আলোকজ্জ্বল বাতিগুলো যেনো অন্ধকারকে পিষে দিচ্ছে নিজের উজ্জ্বলতায়।গভীর রাতেও এখানে আঁধারের হাতছ্বানি পড়ে না।হয়তো কোলাহল কমে যায়,আওয়াজ কমে যায় তবুও নিয়নের বাতিগুলো ঠায় জ্বলতে থাকে ভোরের আলো ফোঁটা অবধি।
গাড়ি পার্ক করে মাইমুনার দিকে ঘুরে তাকালেন আরহাম।জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যেতে চান?’
মাইমুনা সহাস্যে উত্তর দিলো, ‘আপনি যেখানে নিয়ে যাবেন।’
‘নিয়ে যাওয়ার মতো তেমন কোনো জায়গা নেই।পার্কের এড়িয়াটায় হয়তো যাওয়া যেতো কিন্তু ওখানে খারাপ মানুষই বেশী থাকে এ সময়।যদি দিনে আসতে চাইতেন,তবে নিরিবিলি জায়গা ছিলো,কিন্তু এখন সেগুলো আতঙ্ক।’
‘তাহলে?’
‘রাতের শহর তো দেখতে এসেছেন।গাড়িতে বসেই দেখুন।’
‘আপনি আসুন পাশে।’

আরহাম কিছুক্ষণ কি ভেবে গাড়িটা নিয়ে গেলেন কোনো শপের সামনে হয়তো।তাকে গ্লাস খুলতে বাঁধা দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলে মাইমুনা আটসাট হয়ে বসে রইলো।কালো গ্লাসের অপজিট সাইড ঘেষে মানুষের যাতায়াতে একা বসে থাকতে তাঁর ভয় লাগতে শুরু করলো।।শাহ’ না বলে কোথায় চলে গেলেন!
মিনিট পাঁচেক পেরোলেও তিনি আসলেন না।মাইমুনা কথামতো গ্লাসও নামালো না।উঁকি মেরে দেখতে চেয়েও ব্যর্থ হলো।হঠাৎ করেই গাড়ির গ্লাসে ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হতে মাইমুনা আঁতকে উঠলেন।
এর কিছুক্ষণ পরে আরহাম যখন হুট করেই পেছনের সিট খুললেন মাইমুনার আঁতকে উঠা দেখে আতঙ্কিত হয়ে বললেন, ‘এনি প্রবলেম?ভয় পেয়েছেন কেন?’
‘আপনি কোথায় চলে গিয়েছিলেন?’
‘এখানেই তো ছিলাম।’
‘বলে যাবেন না?আমার তো একা ভয় লাগছিলো।’
আরহাম হেসে বললেন, ‘আমি তো গাড়ির পাশেই ছিলাম।একদম আপনার পাশে।আমার এত দামী সম্পদ রেখে কোথায় যাবো বলুন তো!’
বলতে বলতে এক গুচ্ছ বেলিফুলের তোড়া এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘বেলিফুলের বুকে’ দেয় না উনারা।গোলাপের নিয়ে আসবো?’

বেলিফুল দেখে খুশিতে আটখানা অবস্থা মাইমুনার।বেলিফুল যে তাঁর এতো পছন্দ শাহ ভালো করেই জানেন।ফুলগুলো শুঁকতে শুঁকতে বলল, ‘আপনি আমার জন্য যা পছন্দ করেন সেটাই আমার জন্য সেরা।বুকে’ লাগবে না।’
বাদাম ছিলতে ছিলতে আরহাম বলতে লাগলেন, ‘আই থিংক,এ্যাজ এ্যা হাসবেন্ড আমি আপনার ২ রেটিং ও পাবো না।কজ ভালো হাসবেন্ড রা তাদের ওয়াইফ কে বেশি সময় দেন,ঘন ঘন ঘুরতে নিয়ে যান,বাইরে একসাথে লাঞ্চ,ডিনারে পার্টসিপেইট করেন,ট্যুরে যান,শপিং করে দেন বা সবসময় ফুল বা যেকোনো কিছু উপহার দেন আমি তো এসব কিছুই করি না।’
মাইমুনা অসন্তোষ স্বরে বললেন, ‘মোটেও না।গায়রতওয়ালা কেউ ঘন ঘন তাঁর স্ত্রীকে ঘুরতে নিয়ে যাবে না।বিকজ এখন ফিতনার শেষ নেই।আর আমি না হয় উনএিশ দিন অপেক্ষা করবো আপনার সাথে একদিন ঘুরতে আসার জন্য।আর ফুল?সেটা প্রতিদিন দিলে সুবাস পানসে হয়ে যায়।আর প্রতিদিন দিলে আমি এখন যতটুকু খুশি হয়েছি ওতো খুশি হতে পারতাম না।আর আমি একটা হাই ক্লাস লাইফ লিড করার পরও বলবেন শপিং করে দেন না?আর ট্যুরিস্ট স্পট বলতে আমি আমাদের বাসাকেই বুঝি।যেখানে গায়রে মাহরামের আনাগোনা নেই,ইচ্ছেমতো থাকতে পারি,এটাই তো শান্তি।’

‘সব এুটিকে ভুল প্রমান করে হলেও আপনি আমাকে জিতিয়ে দিতে চান?’
‘ভুল কোথায় প্রমান করলাম।আপনি যেগুলো এুটি বললেন এগুলো আমার এুটি মনে হয়নি।’
আরহাম বাদামের খোসা ছাড়িয়ে তাঁকে খাইয়ে দিচ্ছেন।মাইমুনা একা কথা বলতে বলতে একসময় ভাবুক হয়ে বলল, ‘হাফসাকে নিয়ে আসলে ভালো হতো।ওর একা সময় কীভাবে কাটছে?কী ভাববে?’
‘ভাববেন আমি আপনাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছি আর সুন্দর সময় কাটাচ্ছি।’
‘কষ্ট পাবে না?’
‘সেসব ছাড়ুন মাইমুনা।আমার এই সামান্যটুকু যদি ভালোবাসার সীমায় পড়ে, তবে আমিও কিছু রিপিট চাই।’
‘আপনাকে ফুল কিনে দিব?বাদাম ছিলে খাইয়ে দিব।’
‘নাআআ।আমি কি এসব চেয়েছি?’

আরহাম তাঁর আঙ্গুলের ভাঁজে চুমু আঁকছেন মাঝে মাঝে আর সে বাইরের শহর দেখতে ব্যস্ত।রাতের গভীরতার সাথে ব্যস্ততা কমছে তবে তখনো যানবাহনের আনাগোনা আছে।হুট করে অনুভব করলো তাঁর হাতে ভারী কিছু।অমনি হাতের দিকে তাকিয়ে চমকায় সে।বেলিফুলের গাজরা দেখে খুশিতে আরহামকে জড়িয়ে ধরে।গালে টুসটাস কয়েকটা চুমু এঁকে বলে, ‘আপনি ইচ্ছে করেই আমার দূর্বল জিনিস উপহার দিয়ে ভালোবাসা নিয়ে নিলেন।’
আরহাম মুচকি হেসে বললেন, ‘এতক্ষণে!!দূই তিনটা!’
‘এগুলো যথেষ্ট না?’
‘মোটেই না।’
‘আপনি দিন দিন লোভী হয়ে যাচ্ছেন শাহ।’
আরহাম এবার প্রস্তুত হলেন উনার ভালোবাসা প্রকাশ করতে।আর চুপিচুপি কেবল বললেন, ‘ওয়াইফকে ভালোবাসার লোভ হওয়া আল্লাহ জায়েজ করে দিয়েছেন।বি রেডি,আমি আবার এতো কৃপণ না।’

ফজরের তিলাওয়াতের পর সবাই যে যার রুমে চলে গেলেন।হাফসার চোখে ছিল গাঢ় তন্দ্রা।গতরাতে তাঁর কেনো জানি ঘুম আসেনি।বিশেষ কোনো কারন ছাড়াই।তবে একটা কারন আছে,ভাইয়ের কথা তাঁর হুট করে ভীষণ মনে পড়ছিলো।গতকালই তিনি ঢাকায় শিফট হয়েছেন অথচ একটাবার দেখা করতে আসলেন না।ব্যস্ততার কারনে ফোনের যোগাযোগ ও কম হয়।মাএ গতকালই হাফসা ফিরেছে বাড়ি থেকে।নয়তো ভাইয়ের কাছে থাকতে চাইতো।এখন এই আবদার টা করার জন্য তাকে বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।এখানে তাঁর সবই আছে,গোটা একটা পরিবার আছে তবুও হাফসার একা একা লাগে।আইরাও ইদানীং পড়ায় সময় দেয়।তাঁর সাথেও আগের মতো কথা হয়না।আম্মু প্রায় সময় ব্যস্ত থাকেন কিচেনে।তারপর ইবাদতে,আর বাকি সময় বিশ্রামে।মাইমুনা আপু অসুস্থ থাকায় ইদানীং একটু ঘুমান বেশী।আর লোকটার সাথে খুব কম দেখা হয়।গতকাল রাত করে যখন বাসায় ফিরছিলেন তখন একবার হাফসার রুমে এসেছিলেন।উনার গায়ে লেগে ছিলো বেলিফুলের তীব্র ঘ্রাণ।চোখদূটো বন্ধ করে ঘুমের মতোই জেগে ছিলো হাফসা।মাসনা হওয়ার জন্য ভীষণ রকমের ধৈর্য্যের প্রয়োজন এ জিনিসটা সে বুঝে নিয়েছে।রাত গভীর হয়,তার চোখের পাতা এক হয় না।ইদানীং ঘুমটাও তাঁর নিয়ম ভেঙে নিয়েছে।

হাফসার মনে হয়,সবাই থেকেও এই বাসায় সে একদমই একা।অথচ বাড়িতে কেউ না থেকেও তাঁর এমনটা অনুভব হতো না।ইবাদতের সময়টুকু ছাড়া তাঁর কিছু সময় কাটতো খালার সাথে গল্প করে,কিছু সময় নিজের কাজে আর বিকেলটুকু ছাদে।কবুতরগুলোর ঠিকঠাক যত্ন নেওয়া হচ্ছে কি।আর কি বাড়ি যাওয়া হবে?ভাইয়া তো সেদিন বলেই দিয়েছিলেন, হাফসা বেড়াতে চাইলে ঢাকায় মাহেরের কাছে যাবে।বাড়িতে যাওয়া হবে না আর।
রুমে এসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে এসব ভাবছিলো সে।বাড়ি যাওয়া হবে না ভাবতেই তাঁর বুকটা ফেটে যাচ্ছে।মায়ের স্মৃতি, বাবার স্মৃতি বা ছেলেবেলার পরিবেশ হুট করেই কেমন পর হয়ে গেলো।বেড়ে গেলো এত দূরত্ব।প্রিয় পরিবেশের সাথে আর দেখা হবে কতদিনে কে জানে।তাঁর বারান্দায় প্রিয় গাছগুলোতে খালা ঠিকঠাক পানি দিবেন তো?বা বৃষ্টির দিনে কবুতরের ছাউনির ওপর চাদর দিবেন তো!বাবার রুমটায় গিয়ে মাঝে মাঝে জানালাগুলো খুলে রাখবেন?কাবার্ডে মায়ের শাড়িগুলোতে পোকা ধরবে না তো!
তাঁর গলাটা ক্রমশ ভারী হয়ে যাচ্ছিলো কান্নার ঢেউয়ে।একসময় হাফসা মুখে হাত চেপে কেঁদে দিলো।একটা এক্সিডেন্ট তাঁর জীবনের মোড় টা এত দ্রুত বদলে দিলো।মায়ের টুকরো টুকরো স্মৃতি আর বাবার কিছু প্রিয় জিনিস আঁকড়ে বেশ তো ছিলো সে!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৫

আরহাম রুমে প্রবেশ করে দেখলেন রুমের বাতি বন্ধ।এ সময় তো ঘুমাতে দেখেননি উমায়েরকে।তিনি হয় ছাদে যেতেন,বা বেলকনিতে তাসবিহ পড়তেন।শরীর ঠিক আছে চেক করতেই ওর কাছাকাছি গিয়ে মাথায় হাত রাখতে চাইলেন।কিন্তু মুখটা ঢেকে রেখেছেন ওরনা দিয়ে।আরহাম সেটা সরাতে গেলে হাফসা শক্ত করে ধরে রাখলো।তাঁর ভেজা চোখমুখ মুছার আগেই লোকটা কেন আসলেন।সে তো উনার রুমে গেলে নক করেই ঢুকে।
আরহাম চুপচাপ অন্যপাশে শুয়ে পড়লেন।নিজের কাছে নিজেকেই এতোটা খারাপ লাগছে উনার।একজনকে খুশি রাখতে গিয়ে আরেকজনকে আঘাত দিয়ে ফেলছেন।তাঁর হিজাবের ভেজা অংশটুকু বুঝিয়ে দিচ্ছে উমায়ের কাঁদছিলেন।পাশাপাশিই তো দূটো মানুষ।তবুও অজানা কোনো কারনে আরহাম তাকে একটু আশ্বাস দিতে পারলেন না!মুখফুটে ক্ষমা চাইতে পারলেন না।কেনো জানি সম্পর্ক টা প্রথম থেকেই খাপছাড়া।এতদিনেও মনের দূরত্ব যেনো একটুও ঘুচেনি।ভুলটা তো আমারই।আমি নিজেই দায়িত্বে এুটি করছি!

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ২৭