অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪১
Maha Aarat
হৃদয় পোড়ার অনুভূতিটা ম্যাজিক্যাল।একটা মানুষ আপনার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলবে,হাসবে, অথচ ভেতরে যে অন্তর পুড়ে ধোঁয়ায় ধোঁয়াশা হয়ে আছে সেটা একটুও টের পাওয়া যাবে না।সৃষ্টিকর্তা খুব যত্নে হৃদয়কে বুকের বা পাশে স্থান দিয়েছেন।সেটা কখনো বা সুখের অনুভূতিতে আলোড়িত হয় আবার কখনো দূ:খের তান্ডবে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
কর্মক্ষেত্রে আজকাল মন বসে না ইমানের।পড়াশোনা শেষ হতেই বাবা চাইছিলেন ছেলে উন্নত দেশে গিয়ে এস্টাবলিসড হোক, অথচ হুটহাট কিছু দূর্ঘটনা কখনো কখনো অনেক বড় সিদ্ধান্তের মুখে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।ইমরানের এক্সিডেন্ট হয়েছে মাস ছ’য়েক আগে।এক হাত,এক পা অবশ হয়ে পড়ে থাকা মানুষটা যেনো বড্ড বড় বোঝা।বোনের বিয়ে হয়ে শ্শুরবাড়ি ,আর এদিকে ঘরে অসুস্থ মা’কে ছেলের যন্ত্রণা দেখে ছটফটাতে হয়।মাঝে মাঝে এমন বেদনাদায়ক আহাজারি সহ্য করতে না পেরে মুখ ফুটে অনেককিছু বলে ফেলেন।পাশের ঘরে শুয়ে থাকা যন্ত্রমানবের কানে সে কথাগুলো যায়।সে আড়ালে অশ্রু ফেলে,আফসোস করে।তাঁর জীবনে এমন কিছু ভুল আছে যেগুলো চাইলেও হয়তো শুধরে নেওয়া যাবেনা।সারাজীবন অভিশাপের ভার বইতে হবে কাঁধে।
ইমান ভাইয়ের সাথে সকাল-বিকাল প্রজাপতির মতো ছুটতে থাকা কিশোরী আদওয়াকে বড্ড মায়া লাগতো তাঁর।সে ইমান ভাইয়ের সাথে কেনো বেশীরভাগ সময় কটাতো বলে খুব হিংসে হতো। সে কি ইমান ভাইয়ের লিখিত কেউ? না তো,তবুও তাদের কেন এতো ঘনিষ্ঠতা?
ছুটি কাটিয়ে মাসশেষে ইমান ভাইয়ের যখন শহরে ফিরার সময় হতো ছোট্ট আদওয়ার ভীষণ মন খারাপ হতো।সে প্রায়ই বিলের পাশে একা বসে থাকতো।বিলের হাটুজলে পাথর ছোঁড়া বা ঘাস দিয়ে আংটি বানানো বা ফুল কুড়ানো এতেই সে ব্যস্ত।ইমরান কখনো তাঁর সাথে খেলতে চাইলে সে পাত্তা দিতো না।একটা সময় ইমরান নিজেই সরে আসে।সে বুঝে নেয়,যেখানে ইমান ভাই স্বয়ং আদওয়ার অলিখিত অভিভাবক সেখানে নিজে তাকে আশা করাটা বোকামী।প্রতিবার ইমান ভাই ফিরার সময় তাকে খুব সুন্দর করে বলতেন,আদওয়ার খেয়াল রাখিস।ও যেনো ভালো থাকে।ইমরান চোখ হেসে মুখ বুজে সহ্য করে নিতো সেই ধনুকছোঁড়া কথা।তাঁর চোখে হিংসার আগুন দাউদাউ করে জ্বলতো।ইচ্ছে করতো আদওয়াকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে যেতে।কিন্তু সে সুযোগ বা সাহস তো তাঁর কোনোকালেই ছিলো না।কিন্তু একদিন সে সুযোগ আসলো।আদওয়ার সাথে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং যেদিন হলো,ওদিন সন্ধ্যার পর সে বাড়ি আসছিলো।এ মুখ ও মুখ থেকে শোনা গেলো তাঁর আর আদওয়ার নিছক প্রেমের গল্প।এই সুযোগ টা হাতছাড়া করলো না সে।সেদিন রাতেই ইমান ফিরেছিলেন ঢাকা থেকে।বাসায় ফিরেই এলোমেলো অবস্থায় প্রথমেই আসছিলেন তাঁর কাছে।হূলোস্থুল করে বলতে আরম্ভ করলেন , ‘তুই শুধু বল যা শুনেছি সব মিথ্যে।আমি জানি আদওয়া তোকে পছন্দ করে না।ও আমাকে পছন্দ করে।বল,ওগুলো সব মিথ্যা।বল,ইমরান।আমি জানি তুই এটাই বলবি।’
‘স্ সত্যি ভাই…
বলতে না বলতে গালে সপাটে পাঁচ আঙুল পড়ে তাঁর।ইমরানের কলার চেপে ইমান ক্ষুব্ধ হয়ে বলে, ‘ফাজলামো করিস?সিরিয়াস বিষয় নিয়ে হেয়ালি আমি পছন্দ করি না,ইমরান।’
ইমরান থামে না।দম নিয়ে পুনরায় বলে, ‘সত্ সত্যি সব।’
‘তোর কাছে না আমি আমানত দিয়ে গিয়েছিলাম আমার বোকাফুলকে।মানুষ কি আমানত দেয়?যেটা তাঁর সবচেয়ে প্রয়োজন,সবচেয়ে দামী কিছু।কি করে আমানতের খেয়ানত করলি?’
শুরু হয় ইমরানের বানোয়াট গল্প।যে গল্পের শুরু আদওয়াতেই আর শেষ উক্ত দূর্ঘটনাতেই।এতো রসালো,মজাদার মিথ্যে গল্প শোনাবার পরও ইমানের হা-হুতাশ কমে না।সে সামনাসামনি আদওয়াকে জিজ্ঞেস করতে চায় এর সত্যতা।সেখানেই সুতা কাটে ইমরান।আদওয়াকে দেওয়া ইমানের একটা উপহারই ছিলো কেবল।এক সোনালি ঈগল।আদওয়া সবসময় তাঁর সাথে রাখতো সেটা।এটা তাদের দূজনের মধ্যকার সবচেয়ে গোপন জিনিস।অথচ ইমরানের ঘরে সেটা দেখে থমকায় ইমান।কথা ছিলো এটা সবসময় আদওয়ার কাছেই থাকবে।সে যে জায়গায় ই যাক না কেন।এটা ইমরানের হাতে মানে এই সম্পর্কটা ছিলো নিছক ছেলেখেলা!
ইমরানের হাত থেকে সেটা এনে দীর্ঘসময় তাকিয়ে দেখছিলেন ইমান।অতপর আস্তে আস্তে কেন জানি বিশ্বাস হতে শুরু হলো এক মিথ্যে প্রেমের গল্প।মুহুর্তেই বিশ্বাসের জাল আড়াল করে দিলো এক মুঠো তীব্র ঘৃণায়!
আদওয়ার থেকে ফিরে আসার পরের প্রতিটা মুহুর্ত ইমানের জন্য ছিলো অমানষিক যন্ত্রণার।ইমান পারলে তাকে উনার হৃদয়ের ঈগল বানিয়ে রাখেন,কিন্তু সেই মানুষটা ভীষণ কঠিন হয়ে গেছে।সারাদিন ইমান ভাই ইমান ভাই বলে দম ফেলতে না পারা আদওয়ার পরিবর্তন উনার পোড়া হৃদয়ে আরো জখম করে দিচ্ছে।খুব বেশী ক্ষতি হয়ে যাবে না যদি সে এই অধমকে ক্ষমা করে আপন করে নেয়।ইমান না হয় সারাজীবন সময় দিবেন তাকে,পুরনো ভুলের শাস্তির জন্য।সারাজীবন তাঁর জেলখানার কয়েদি হয়ে কাটিয়ে দিবেন যদি সে একবার ইতিবাচক ঘোষণা দিয়ে দেয়।
বাসায় হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ ছাড়া কেউ নেই।দোতলার পুরো ফ্ল্যাটটা নিয়েছেন মাহের।উনি থাকবেন,পাশের ঘরে চিৎকার-চেঁচামেচি হবে,বাসন-পাতির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হবে,একে অপরের ঝগড়া হলে ছাদ উড়িয়ে দিবে,কান চেপে সহ্য করা ছাড়া কিছু করার থাকবে না,এটা মাহের মেনে নিতে পারবেন না।সারাদিনের ক্লান্তি শেষে দূচোখ বুজার সময়টুকু শান্তির হোক।
সন্ধ্যার পর বাসা থেকে আরহাম আর আইরার কাজিন আসলেন।ড্রয়িং এ বসে মাহেরের সাথে আলাপ করছিলেন আরহাম।কিচেন থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে।মাহেরের সাথে কথায় থাকলেও না চাইতেও কেন জানি আরহামের দৃষ্টি এদিক-সেদিক ঘুরছে।কিছুক্ষণের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত মানুষের দেখাও মিললো।কিচেন থেকে বেরিয়েই আরহামকে দেখে হাফসা থমকালো।তাঁর হাতে নাস্তার ট্রে।এগিয়ে এসে সেটা সেন্টার টেবিলে রেখে সে আবার ভেতরে গেলো।পুনরায় ফিরে এলো আরেক ট্রে হাতে নিয়ে।ভাইয়ের হাতে দিয়ে ইশারা করলো এটা গেস্ট রুমের মেহমানদের জন্য পাঠিয়ে দিতে।
হাফসার পরনে পাতলা একটা চাদর।আর পাতলা সোয়েটার হয়তো।এই হিম শীতেও তাঁর চোখমুখ লাল,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখে আরহাম দ্বিতীয়বার আর তাকালেন না।মাহের গেস্টরুমে।এ মুহুর্তে ড্রয়িং রুমে তাঁরা ছাড়া কারো অস্তিত্ব নেই।আরহামও চুপচাপ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন।হাফসার গলা পর্যন্ত কথা আসলেও ঢোক গিলে সে খুব সতর্কে কথাগুলো গিলে ফেলছে।
কিছুক্ষণ কেটে যায় নীরবতায়।সেন্টার টেবিলে থাকা নাস্তার ট্রে টা আরহামের দিকে আরেকটু এগিয়ে দিলো সে।আরহাম যেনো পারছেন না এই মেয়েকে আস্তো পেটে চালান দিয়ে দিতে।আরহামের এমন আঁটসাঁট অবস্থা দেখে হাফসা এক লহমায় বুঝে নিলো তিনি প্রচন্ড রেগে।আশ্চর্য! আরহাম এখন তাঁর তালাতো ভাই থুক্কু জামাই।এখন তো তিনি এ বাসার উপরের লেভেলের মেহমান।এতো স্পেশাল মেহমানকে সে একটু খাতির-যত্ন করবে না?এটা কি করে হয়?তাঁর একমাত্র ভাবির একমাত্র ভাই বলে কথা!
আইরার সাথে দেখা শেষে মাহের আরহামকে হাফসার রুমে পাঠালেন।আরহাম কিছুক্ষণ একা একা বসে রইলেন।শেষ মুহুর্তে অসহিষ্ণু হয়ে উঠে যেতে নিলে হাফসা আনমনে প্রবেশ করে আচমকা।প্রথমে আরহামকে খেয়াল করেনি সে।পরক্ষণেই খেয়াল করতেই মুখের রমরমা ভাব পানসে হয়ে আসে।লোকটার এই ভয়ানক দৃষ্টি তাকে জ্বালিয়ে ছাই করে উড়িয়ে না দেয়।আরহামের আনা সুইট’স এর প্যাক থেকে মিষ্টি পিরিচে নিয়ে খেতে ব্যস্ত ছিলো সে।আরহাম যত তাকে দেখছেন অবাক না হয়ে পারছেন না।উনার কাছে হাফসা এক নীরব জড় পদার্থ।এদিকে বাড়িতে এসে তাঁর খুশির সীমা থাকছে না।তাহলে কি এতোদিন সে জেলখানায় বন্দী ছিল?
আরহামের সামনে এসে চুক চুক করে খেতে খেতে একবার খেতে সাঁধলো আরহামকে।কোনো রেসপন্স না পেয়ে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগ দিতেই আরহাম উঠে এসে ধীরপায়ে দরজা লক করে আসলেন।মুহুর্তে হাফসা মিষ্টি রেখে উঠে দাঁড়ালো।তিনি নিশ্চয়ই কোনো সিনক্রিয়েট করবেন এখন ভেবে ভয় হচ্ছে তাঁর।
আরহাম একটু দূরে দাঁড়িয়ে।সে এই সুযোগে কোনোমতে চাইছিলো চট করে বেরিয়ে যেতে।আরহাম তাঁর হাত টেনে দরজায় ঝাপটে ধরে বললেন , ‘সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন।আমি কিন্তু জানে মেরে ফেলবো উমায়ের।একটুও দয়া করবো না।’
হাফসা পিটপিট করে তাকালো।আশ্চর্য্য!সে কি করেছে?একটু মিষ্টি খাওয়া কি তাঁর অপরাধ?
আরহাম বোধহয় তাঁর চোখের ভাষা বুঝে ফেললেন।মাথায় হাত দিয়ে মনে মনে ভাবলেন, এ বোকা মেয়েটাকে নিয়ে তিনি কি করবেন?কোথায় যাবেন!
ভাই আর বান্ধবীরা চলে যেতেই মন ভার হয়ে এলো আইরার।সময় যতো গভীর হচ্ছে,আজকের এই কঠিন বাস্তবতা যেনো খুব করে টের পাচ্ছে সে।সম্পূর্ণ নতুন একটা জীবন।সম্পূর্ণ এক নতুন মানুষ!কিন্তু আব্বু-আম্মু ছাড়া সে কীভাবে থাকবে?ভাবতে ভাবতে বুকের চেপে রাখা কান্নাটা টুক করে বেরিয়ে আসে।বিছানার এক কোণায় বসে নাক টেনে কাঁদছিলো সে।এরই মধ্যে মাহের ঢুকলেন।এক পলক তাকে দেখে আবার বেরিয়েও গেলেন।এর কিছুক্ষণ পর ভাবি’পু আসতেই সে বুঝে নিলো এটা লোকটার কাজ।
হাফসা তাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।চোখমুখ মুছে হয়তো এভাবে বুঝালো, এত তাঁর কান্না কিসের।তাঁর তো এখন দূটো বাড়ি।আর সে চাইলেও চট করে আম্মু আব্বুর সাথে দেখা করে আসতে পারবে।
এভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে তাঁর কান্না সামলে আসতেই হাফসা বেরিয়ে গেলো।কাকামণি আর মেহমানদের জন্য ডিনার রেডি করতে হবে তাকে।দ্রুত হাতের কাজ গোছাতে লাগলো সে।
রুমের মধ্যে চুপচাপ বসে আছে আইরা।তাঁর ঠান্ডা লাগছে কিন্তু লাগেজ কোথায় আর সোয়েটার কোথায় সেটা দেখার সময় নেই তাঁর।হ্যাঙ্গারে উলের খুবই আরামদায়ক একটা ব্লেজার দেখে আর কিছু না ভেবে সেটা গায়ে জড়িয়ে বসে রইলো।
মাহের যখন রুমে প্রবেশ করলেন ঘড়িতে তখন সাড়ে নয়’টা।বসে বসে হাই তুলছিলো আইরা।মাহের তার গায়ে নিজের ব্লেজার দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে ড্রয়ারে উনার গুরুত্বপূর্ণ কিছু খুঁজতে খুঁজতে বললেন , ‘নাস্তায় কি খাওয়া হয়?’
‘হরলিক্স,ডিমপোচ,রোল,নুডুলস,লাচ্ছি,পায়েস….
মাহের তাঁর অর্ধেক কথায় থামিয়ে বললেন , ‘ব্যস।’
আইরা বলতে লাগলো, ‘আর আপনি?’
‘কফি।’
‘শুধু কফি?খিদে লাগে না?আমি হলে তো খিদেয় পাগল হয়ে যেতাম।’
‘আমি হই না।
মাহের চলে গেলেন রুম থেকে।আইরা একটু হলেও হতাশ হলো।কেন এতো স্বল্পভাষী তিনি?’
ডিনারের ডাক এলো কিছুক্ষণ পর।হাফসা,আইরা মাহের একসাথে ডিনার করছিলেন।মাহের খেতে খেতে বলছিলেন , ‘তোমার রুমে আরেকটা কমফোর্টার নিয়ে নিও মনে করে।’
একটা কমফোর্টার তো আছেই?আরেকটা কেন লাগবে?ভাইয়ের দিকে জিজ্ঞাসাদৃষ্টিতে তাকালো সে।মাহের স্বাভাবিক ভাবে বললেন , ‘দূজন ঘুমাবে তো।’
দূজন কে?পুনরায় তাঁর প্রশ্ন।মাহের আইরার দিকে ইশারা করে বললেন , ‘তুমি আর সে।’
এটা কোনো কথা?তাঁর ভাই এতো নিরামিষ কেন?বিয়ের দিনও মানুষ আলাদা ঘুমায়?অবশ্য সে ঘুমিয়েছিলো।আর সেটার পিছনে যৌক্তিক কারন ছিলো।যাক গে,এসব হতে দেওয়া যাবে না।তাঁর ভাইয়ের গিলুতে ঢুকাতে হবে,আজ থেকে উনার নতুন একটা দায়িত্ব আছে।একজন নিজের মানুষ আছে।
খাওয়ার পর হাফসা পারমিশন নিয়ে রুমে এসে দেখলো মাহের ওয়াশরুম থেকে ফিরছেন আর আইরা লাগেজ খুলছে।হাফসাকে দেখে মাহের বললেন , ‘কমফোর্টার আলমারিতে প্যাক করা।’
হাফসা মাথা নাড়ায়।তাঁর কমফোর্টার চাই না।মাহের বলতে যাচ্ছিলেন তাহলে দূজনে কীভাবে ঘুমাবে?এর আগেই সে ইশারা ইঙ্গিতে বুঝালো তাঁর বিছানায় তেলাপোকার বাচ্চা ছোটাছুটি করছে।এ অবস্থায়…
কথা শেষ করার সুযোগ হলো না আর।আইরা এক লাফে বিছানায় উঠে বলল, ‘আমি ও রুমে ঘুমাব না।’
মাহের অবাক হয়ে বললেন , ‘আমি তো ঘুমালাম।তেলাপোকা কখনো দেখলাম না তো।’
আরে না দেখলে কি।থাকতে পারে না?মাহের খাপছাড়া ভঙ্গিতে বললেন , ‘আচ্ছা এখানে ঘুমাও।আমিই যাচ্ছি ওখানে।’
হাফসা ঝটপট বাঁধা দিয়ে বলে, ‘এটা আর সম্ভব নয়।সে অলরেডি তাঁর বিছানা করে আসছে।আজকের রাতটা কোনোভাবে ম্যানেজ করে নিতে বলে সে চলে গেলো।মাহের এতোক্ষণে কিছু একটা আন্দাজ করতে পারলেন।আইরা কাপড় চেইন্জ করে হাই তুলে দরজার দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘বা পাশের রুমটা আপুর না?’
মাহের দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এখানে ঘুমান।’
আইরা আর প্রত্যুত্তর না করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো।মাহের বেলকনিতে গিয়ে কেন জানি গ্লাস বন্ধ করে নিলেন।সে আশ্চর্য হলো খুব।কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল আইরা।তাঁর প্রতিটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে মিশে আছে কোনো ভারী যন্ত্রণা হজম করার গল্প।
মাহের রুমে এলেন আধঘন্টা পর।একটা কমফোর্টার।শেয়ার করতেই হবে।একপাশ হয়ে শুয়ে গায়ে জড়িয়ে নিতেই ওপাশে নড়াচড়ার আওয়াজ হলো।না চাইতেও কেন জানি ওপাশ ফিরে তাকালেন মাহের।দেখলেন এক টানে পুরো অংশটুকু নিজের আয়ত্ত্বে।সরি হয়ে তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন।আইরার চোখদূটো বুজা।ড্রীম লাইটে দেখলেন , এক টুকরো লাল কারনেশান।
হাত বাড়িয়ে টেবিলল্যাম্পটা জ্বালালেন মাহের।বললেন ,
‘তোমার আজকের পুরো সাজটুকু ছিল আমার জন্য।অথচ আমি একবারও বলিনি তোমাকে সুন্দর লাগছে।খারাপ লাগেনি?’
তাঁর চোখ ছলছল হয়ে উঠলো মুহুর্তেই।চেপে রাখা যন্ত্রণা তিনি কেন টেনে হিচড়ে বের করে আনতে চাইছেন?তবুও সে কাঁদলো না।আপনার সব অবহেলা তো আমি যতনে কুড়িয়ে নিয়েছি।তাহলে খারাপ লাগবে কেন?’
‘জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তোমাকে সঙ্গ দিইনি,হেয়ালি করছিলাম।গাড়িতে পুরো সময়টুকু মিররে তোমার কান্না দেখেছি কিছু বলতে পারিনি।খাবার টেবিলে মাছ বেছে খেতে পারছো না দেখেও সাহায্য করিনি।অথচ বাসায় তোমার আম্মু আব্বু তোমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন।সবশেষে তোমাকে বোনের সাথে থাকতে বলেছি অথচ আজকের সুন্দর রাতটুকু কেবল একদিনেরই।এতো অবহেলা তাও চুপ।কেন?
গলা পযন্ত কান্না চলে এসেছে তাঁর।এই কান্নার বাঁধ ছুটলে সারারাতেও বাঁধন দেওয়া সম্ভব নয়।ঠোঁট উল্টে বোকাসোকা ভাব করে তার উত্তর দিলো, ‘এমনিই।’
মাহের আরও কয়েক পলক তাকালেন।অতপর তাঁর মাথায় হাত রেখে কোমলসুরে বললেন , ‘এতো ম্যাচিয়ুর হয়ো না,বাচ্চা বাচ্চাই থেকো।’
ব্যস!এতটুকুই যথেষ্ট ছিলো তাঁর ভারী অভিমানের দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিতে।এক নিমিষেই মন খারাপ উবে গেলো লোকটার সামান্য কথায়।এত খুশি সে কই রাখবে।মুখে হাত চেপে হাসতে চেয়েও হাসি লিক হয়ে যাচ্ছিলো তার।কোনোমতে হাসি থামিয়ে অনুরোধের সুরে বলে, আপত্তি না থাকলে একটু জোরে হাসছি।’
বলেই খিলখিল করে হাসছিলো সে।মাহের মনে মনে ভাবছিলেন , প্রতি রাতে অপ্রকাশিত কতো অভিমান বুকেচেপে সে ঘুমাবে। কখনো সেটা কি টের পাবেন তিনি?
উনি (হাফসা)তো দিব্যি খুশিতে আছেন।আরহামের কথা তার একটুও মনে পড়ে না হয়তো।এদিকে এত মানুষের ভীড়েও ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল উনার।মাইমুনার কাছে যাচ্ছিলেন আবার ক্ষমা চাওয়ার জন্য।সুপারিশ করে শাস্তি টা যদি কমানো যায়?এই শাস্তি টা বড্ড বেশি হয়ে যাচ্ছে।
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৪০
অথচ রুমে মেয়েরা কিলবিল করছে দেখে খবর পাঠালেন একটু আলাদা দেখা করতে।অথচ মাইমুনা আরহামের অনুরোধ সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে খবরের উত্তরে খবর পাঠালেন , কয়দিন যাবত বেশ বিজি তিনি।পরে যোগাযোগ করতে।
হতাশ হয়ে রুমে ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলেন , দেখা তো করলেনই না বরং তিনদিনের শাস্তির কথাও তিনি আকারে ইঙ্গিতে মনে করিয়ে দিলেন।আরহামের সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই।দূজন থাকা বাদেও উনার কেউই নেই।
