অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৩
Maha Aarat
“স্যার আমি একটা কথা কবিতা শোনাই।শোনাবো স্যার?’
‘না।’
‘প্লিজ স্যার!’
‘তোমার কবিতা আমার ভয় লাগে।’
‘এটা ভয় পাওয়ার মতো কবিতাই না স্যার,বোকাসোকা টাইপের,সহজ সরল,আমার মতো।বলি?’
মাহের চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন।
আইরা তার স্বভাবসিদ্ধ হাসিমুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে, মুখে একগাল দুষ্টু আনন্দ।
প্রথমেই গলা খাঁকারি দিয়ে বললো , “উহুম উহুম,কবিতার নাম “আমাদের পড়াশোনা” লিখেছেন কবি আইরা তাজওয়ার!
মাহের কেমন বাঁকা দৃষ্টিতে তাকাতেই আইরা মিনমিনে স্বরে আওড়ালো, ‘কবিতা বলবো কবির নাম বলব না?’
শুরু করলো কবিতা,
‘আমাদের পড়াশোনা ,
কবিতা শুরু করতেই মাহেরের ভ্রু একটু কুঁচকে গেলো।
তবু কিছু বললেন না। শুধু একধরনের চাপা ধৈর্যের ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইলেন।
আমাদের পড়াশোনা
চলে বাঁকে বাঁকে,
পরিক্ষার সময় হলেই
চাপ বেশী থাকে।
পার হয়ে যায় দিন,
পার হয়ে রাত!
পরিক্ষার সময় তাই,
মাথায় দেই হাত।
সারাবছর দিলাম ফাঁকি,
এখনো পুরো সিলেবাস বাঁকি,
রেজাল্ট হবে ফাটাফাটি
এই আশায় আমরা থাকি।
কবিতা চলছিলো —
বাচাল ছন্দ, ছেলেমানুষি ভরা লাইন।
আইরার গলা কখনো উঁচু, কখনো নিচু হচ্ছিলো, সে নিজের মজাই উপভোগ করছিল।
খাতা খুলে দেখি শুধু ধূলো,
মাথায় তখন বাজে ঢোলের তুলো।
আম্মু বলেন, “বসো পড়তে এখনই,”
আমি ভাবি, “আরো ঘুমাই একটুখানি!
বইয়ের পাতা যেন হায়, পাথরের মতো,
দেখলেই চোখ চায় বন্ধ করতে সব আলো।
মোবাইলে পড়া, কবে যে শুরু হবে,
ফেসবুক আর রিলেই পুরো সময় ভেসে যাবে!
পড়া মানেই মনে হয় যুদ্ধের মাঠ,
প্রশ্ন দেখে চমকে উঠি, দেই মাথায় হাত।
তবু স্বপ্ন দেখি হবো একদিন……
“শাট আপ!
এসবে এক্সপার্ট অথচ বইয়ের সঙ্গে তোমার কোনো সম্পর্কই নেই মনে হচ্ছে!”
হঠাৎ গভীর, কঠিন, অতর্কিত আওয়াজে আইরা আঁতকে উঠলো।
হাতের কবিতার খাতা পড়িমরি করে পড়ে গেলো মেঝেতে।
সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো — কান পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে।
বুকের ভেতর ধকধক করছে।
মাহের কোনো কথা বললেন না।
চোখে যেনো বাজ পড়া ঝড়।
সোজা উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে চলে গেলেন।
‘তুমি করোটা কি আমি বাসা থেকে চলে গেলে? ”
ঘরে একধরনের ভারী নীরবতা নেমে এলো।
আইরা দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে… একসময় কাঁপা হাতে খাতা তুলে নিলো।
চুপচাপ বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
না দৌঁড়ে, না হাঁটে —
কেমন অদৃশ্য একটা ভার নিয়ে।
সারাদিন আইরা আর কিছু বললো না।
না খাবার সময়,
না পড়ার সময়।
চুপচাপ এক কোণে বসে বইয়ের পাতায় তাকিয়ে থাকলো।
চোখ বইয়ের ওপর, মন কোথাও না।
তাঁর বুকটা ধুরুধুরু কাঁপতেই থাকলো,তার কেবল মনে হলো, ‘নিজেকে যদি সংযত না করো,হৃদয়ের শেষ অংশটা নিজের হাতেই পঁচাবে।’
দুপুরেও আইরা কিছু খেতে চাইলো না।
আহত পাখির মতো নিস্তেজ হয়ে বসে রইলো।
মাহের নিজের ভেতরেও একটা অস্বস্তি টের পাচ্ছিলেন।
উনার কঠিন আচরণ যে ওর ছোট্ট হৃদয়ে কী গভীর দাগ কেটে দিয়েছে, তা বুঝছিলেন।
কিন্তু মাহের, যে স্বভাবতই গম্ভীর, উনার পক্ষে মুখ ফুটে “সরি” বলা সম্ভব হলো না।
ঘরটা আজ যেন একটু বেশিই শান্ত। জানালার বাইরে গোধূলির মৃদু আলো, ভিতরে নরম বাতাসে পর্দা দুলছে। এশা এক কোণে বসে হালকা একটা বই হাতে, চোখে ঘোর ঘোর ভাব।
রায়ান টেবিলের ওপর রাখা কাপে কফি ঢালতে ঢালতে হাসি চাপলেন এমন অন্যমনস্ক এশাকে উনি যেন নতুন করে ভালোবেসে ফেলেছেন।
আস্তে পেছন থেকে গিয়ে এশার কানে ফিসফিস করে বললেন,
“কী ভাবছো? আমাকে নিয়ে তো?”
এশা লাজুক হেসে বই দিয়ে তার মুখ আড়াল করলো।
“হুম, ভাবছি।আপনাকে দিয়ে কতটা ঝামেলা পোহাতে হবে আজীবন!”
রায়ান নকল রাগের ভান করে বললেন,
“এই মেয়ে! এত বড় সাহস? আমি তোমার জন্য জান দিতেও রাজি, আর তুমি আমাকে ঝামেলা বলছো?”
এশা হালকা করে হাসলো,একটু গাল ফুলিয়ে বললো,
“আরো বড় ঝামেলা আপনি!”
রায়ান হেসে এশার গাল দুটো আলতো করে টেনে বললেন,
“তোমার ফুলে থাকা গালে একটা চুমু না খেলে পাপ হবে মনে হচ্ছে।”
বলেই ধপ করে একটা নরম চুমু এশার ফোলা গালে এঁকে দিলেন।এশা চোখ বড় বড় করে তাকালো, তারপর রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
“উফ্! এত দুষ্টুমি করেন কেন? আমি রাগ করেছি।”
রায়ান তখন আর দেরি না করে এশাকে হালকা শক্ত করে নিজের বুকে টেনে নিলো।
“রাগ করো না,এশাপাখি।রাগ করলে তোমার এই সুন্দর মুখটা কুঁচকে যায়। আমার তো মনটাই খারাপ হয়ে যায় তখন।”
এশা নরম হয়ে এলো। রায়ানের বুকের গন্ধে, তার কণ্ঠের উষ্ণতায় মন গলে গেলো তার। দু’জনের মাঝখানে যেন অদৃশ্য একটা ভালোবাসার দীপ্তি ফুটে উঠলো।
রায়ান এবার নিচু স্বরে বললেন,
“দোয়া করি, আল্লাহ যেন আমাদের এ ভালোবাসা জান্নাত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। তোমার হাত ধরে যেন জান্নাতে হাঁটতে পারি, এশা।তবে…
এশা ভ্রু কুঁচকালো।জিজ্ঞেস করলো, ‘তবে?’
রায়ান একটু ইতস্তত করেও অবশেষে বললেন , ‘আ্ আসলে আমার মনে হচ্ছে ,এখন আমি একজন বাবা হওয়ার জন্য প্রস্তুত।’
এশার চোখ নিভে এলো।মুখ লাল হয়ে এলো তীব্র লজ্জ্বায়।মিনমিনে স্বরে সে জবাব দিলো, ‘তবে আল্লাহর কাছে চান।’
‘তোমার মতামত চাইছি।’
‘আ্ আমি চাই,আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হোক!’-এশার নীরব সম্মতি।
রায়ান মুচকি হাসলেন।এশাকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করতে মজা করে বললেন , ‘তবে আমার বাচ্চারা তোমার মতো না হোক।তাহলে তোমার মতো মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলে আমাকে ফাঁসাবে।”
এশা হেসে উঠলো।
“আর আপনার মতো বুদ্ধিমানও না হোক,যে চোখ দেখেই মন বুঝে ফেলেন।তবে আমরা তখন আপনাকে দিয়ে কাজ করাবো,যেমন সকালের কফি থেকে শুরু করে..
রায়ান ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“এই মেয়ে! আমি কফি বানাবো, আর তুমি আর তোমার বাচ্চারা কি শুধু রাজকুমারী সেজে বসে থাকবে?”
“আমরা তো আপনাকে রাজা বানাবো, তাই না? রাজাদেরও তো সেবা করতে হয়!”
রায়ান হেসে হেসে এশার নাক চেপে ধরলেন ,
“তাহলে তো আমার জীবনের রাজত্ব দুনিয়াতেও শুরু হলো!”
ওরা দুজনেই হাসতে হাসতে একে অপরের কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকলো।
সন্ধ্যার আলোয়, হালকা বাতাসে, ভালোবাসা আর দোয়ার নরম নরম আবরণে তাদের ছোট্ট জগৎটা ভরে উঠলো আল্লাহর রহমতে।
ঘড়ির কাঁটা টুপটাপ শব্দ করে এগোচ্ছিল।বাইরে বৃষ্টি থেমে থেমে ঝরছিল।মাঝে মাঝে দূরে বাজ পড়ার মৃদু গর্জন ভেসে আসছিল জানালার ফাঁক দিয়ে।সেই শব্দে তাঁর কেঁপে কেঁপে উঠার নরম দৃশ্য মাহেরের চোখ এড়াচ্ছে না।ঘরজুড়ে ছায়া আর ম্লান আলো।মাহের টেবিলের একদিকে বসে ছিলেন, ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ, কিন্তু মন যেন অনুপস্থিত।
আইরার মন এখন বেশ ভালো।তার বারবার মনে পড়ছিলো বিকেলের মুহূর্তটা,
ফ্ল্যাশব্যাক_
আকাশের মুখ এখনো মেঘলা।
হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে।
আইরা নিঃশব্দে পড়ার টেবিল গুছাচ্ছিল।
মাহের যথারীতি টেবিলের একপাশে বসে উনার কাজ করছিলেন।আজকে অফ ডে।
ঘরটা নীরব।
তাদের মাঝেও নীরবতা।
কেবল কাগজের পাতার মৃদু আওয়াজ।
হঠাৎ—
মাহের আইরার দিকে একটা পাতলা নোটবুক এগিয়ে দিলেন।কিন্তু কিছু বললেন না।চোখে কোনো বিশেষ ভাব নেই।
আইরা ভয়ে ভয়ে নোটবুক খুলে দেখলো—
ভেতরে সুন্দর করে লেখা:
“আজকের হোমওয়ার্ক:
১। ২টি কবিতা লিখবে।
২। প্রথমটি নিজের পছন্দমতো।
৩। দ্বিতীয়টি— আমার জন্য, একটু ভালোবাসা মিশিয়ে।”
পড়তে পড়তেই আইরার গাল গরম হয়ে উঠলো।
সে অবিশ্বাস্যে তাকালো মাহেরের দিকে।
মাহের তখনও গম্ভীর মুখে কীবোর্ডের ওপর আঙ্গুল নাড়িয়ে চলেছেন।
কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে লুকোনো এক টুকরো হাসি —
যেটা আইরা ঠিকই ধরে ফেললো।
আইরার মনটা এক লাফে নরম হয়ে গেলো।
সারাদিনের দুঃখ মিলিয়ে গেলো এক মুহূর্তে।
সে লাজুক চোখে মাথা নিচু করে নোটবুকটা বুকে জড়িয়ে ধরলো —
চোখের পাতার কোণে মিষ্টি এক আনন্দের কুয়াশা জমে উঠলো।
আর তখনি আইরার মনে হলো,
“স্যার আসলে রাগ করেননি…
শুধু নিজস্ব নিয়মে, নিজের মতো করে ভালোবাসেন…
বর্তমান…
আইরা পাশে বসে চুপচাপ বইয়ের ওপর ঝুঁকে ছিল। একসময় সে হালকা কাঁপা গলায় বললো,
— “স্যার… একটু বৃষ্টি দেখবো? জানালার কাছে দাঁড়ালে ভালো লাগবে…”
মাহের চোখ তুলে তাকালেন।চোখে কঠিন কিছু ছিল না, ছিল একধরনের ধীর, সংযত প্রশ্রয়।নীরবে মাথা হালকা নাড়িয়ে অনুমতি দিলেন।
আইরা উঠে গিয়ে জানালার সামনে দাঁড়াল।বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, মাটির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে। কোনো এক তীব্র আবেগ তাকে আচ্ছন্ন করলো।সে হাত বাড়িয়ে জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে রইলো।একপলকেই তার জামাটা একটু ভিজে উঠলো জানালার ফাঁক দিয়ে ছিটকে আসা বৃষ্টির ফোঁটায়।
পেছন থেকে টেবিলের চেয়ার সরানোর মৃদু শব্দ হলো।
মাহের উঠে দাঁড়িয়েছেন।
চুপচাপ পায়ের শব্দে তিনি তার দিকে এগিয়ে এলেন।উনার অভ্যস্ত, মেপে চলা পায়ে হালকা অনুশাসন ঝরে পড়ছিল
— তবু আজকের রাতের বৃষ্টিমাখা হাওয়া মনে হয় সেই নিয়ন্ত্রণটাকেও একটু ভিজিয়ে দিয়েছে।
আইরা চমকে তাকাল মাহেরের দিকে।চোখে কেমন একটা ভীত, আবার কেমন একটা শিশুসুলভ বিশ্বাস।মাহের তার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপরে দূ পকেটে হাত গুজে খুব নিঃশব্দে, গভীর মমতামাখা কন্ঠে বললেন,
— “ভিজে যাবে… ঠান্ডা লাগবে…” মাহেরের কণ্ঠ নরম, ভেতরে কোথাও চাপা গর্জন।
আইরা চুপ। নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে মাহেরের চোখের দিকে। মাহের একটু ঝুঁকে তার চোখের দিকে তাকালেন।মাহেরের গম্ভীর চোখেও আজ এক অদ্ভুত কোমলতা।কণ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় আরও নরম, আরও মৃদু।বাইরে বৃষ্টির শব্দ আরও বেড়ে যায়।যেন পুরো পৃথিবীটা তাদের ছোট্ট ঘরের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে।
মাহের তার হাত ধরে টানলেন আলতো করে।এতদিনের দুরত্বের দেয়াল যেন অদৃশ্য কোনো বৃষ্টিতে ভেঙে যাচ্ছে।
পড়ার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা চেয়ারটায় বসিয়ে দিলেন আইরাকে।তারপর নিজে চুপচাপ হাঁটু মুড়ে আইরার সামনে মেঝেতে বসে পড়লেন।চোখ তুলে তাকালেন তার দিকে।গভীর, ধীর, সংযত ভালোবাসার এক অসম্ভব মূহুর্ত।
“কিছু পড়া লাগবে না আজ। শুধু থাকো আমার পাশে।” মাহেরের কণ্ঠ স্বাভাবিকের তুলনায় একটু নিচু।
আইরা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকায়। তার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। সে খুব ধীরে মাহেরের দিকে হাত বাড়ায়, তারপর আবার সংকোচে সরে আসে।
মাহের তার এই সংকোচ অনুভব করেন।একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আইরার হাত দুটো নিজের হাতে নিয়ে নেন — স্থির, নিরাপদ এক বন্ধনে।
আইরা চোখ তুলে একপলক তাকাল মাহেরের দিকে। তারপর আবার লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো।
মাহের নিঃশব্দে হাসলেন, চোখে একচিলতে মমতা। এরপর নিচু গলায় সংযত স্বরে বললেন,
“আজ… আমি তোমার কোনো শব্দ চাই না।শুধু তোমাকে চাই, যেভাবে তুমি আছো।”
আইরার হাত কাঁপছিলো হালকা।মাহের তা অনুভব করলেন।তিনি খুব আস্তে আইরার কপালে একটা নরম চুমু রাখলেন।
কোনো তাড়া নেই, কোনো তৃষ্ণা নয় — শুধু একটুকরো নির্ভরতা, নিরাপত্তা।
আইরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিলো।মাহেরের এমন স্পর্শে তার সমস্ত শরীর-মন কেমন করে কেঁপে উঠলো।
তারপর মাহের ধীরে ধীরে আইরাকে নিজের বাহুতে টেনে নিলেন। বললেন খুব নিচু স্বরে, কানের কাছে ফিসফিস করে,
— “বৃষ্টি থামলেও, আজ রাতে তুমি আমার থেকে সরে যেও না,বেবিগার্ল! ‘
আইরার চক্ষু চড়কগাছ।তার কান কি সত্যি শুনছে?না এটা ভ্রম?
কিন্তু সেই শব্দগুলো যে এত কোমল, এত গভীর ছিলো যে আইরা নিজের অজান্তেই চোখ বন্ধ করে মাথা রাখলো মাহেরের বুকের ওপর।
এইভাবে ধীরে ধীরে, বৃষ্টির নরম সুর আর ভেজা আবহাওয়ায় — দুইটি মানুষ একে অপরের কাছে হারাতে লাগলো…তাদের মাঝখানে কোনো অবৈধ আবেগ ছিল না। ছিল স্বামী-স্ত্রীর হালাল ভালোবাসার এক চুপচাপ ফুল ফোটা রাত।
আল্লাহ্র অনুমতিপ্রাপ্ত, পবিত্র ভালোবাসার মিষ্টি বন্ধন।
বাইরে অঝোর বৃষ্টি।ভেতরে দুইটি প্রাণ প্নির্ভয়ে, শান্তিতে একে অপরের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে।মাহের ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলেন — স্নেহের, সুরক্ষার এক গভীর ছোঁয়া। আইরা চোখ বন্ধ করলো। তার সমস্ত চঞ্চলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেল মাহেরের সেই সংযত ভালোবাসার ছায়ায়।
ঘরের চারপাশে শুধু বৃষ্টির নরম শব্দ। ভেতরে নিঃশব্দে গড়ে উঠছে দুই হৃদয়ের অটুট বন্ধন।
আজকে মাহেরের বাসায় আরহামসহ স্ব-পরিবারের দাওয়াত।সেই উদ্দেশ্যে সবকিছু গোছগাছ করতে সাহায্য করতে মাহের গতকাল বিকেলে হাফসাকে যখন নিয়ে আসছিলেন আরহাম তখনো অফিসে।টেক্সট সিন করলেও কোনো রিপ্লাই দেওয়ার সময় পান নি ব্যস্ততায়।এদিকে মাহেরও জানতেন,আরহাম মানা করবেন না।
এদিকে সন্ধ্যার পরপরই বাসায় ফিরে হাফসাকে দেখতে না পেয়েই আরহামের মাথায় উঠলো ঝড়।আম্মুর কাছ থেকে ঘটনা শুনে ফোন চেক করতে গিয়ে মনে পড়লো মাহেরের টেক্সট তিনি পড়েছিলেন।ফোন সাইলেন্ট থাকায় উমায়ের এর কলেরও কোনো রেসপন্স করা হয়নি।আরহামের মনে হলো,উনার এই ক্লান্ত মুহুর্তে হাফসাকে এক পলক দেখার চেয়ে বড় ওষুধ আর নেই।
আজ~
হাফসা জিজ্ঞেস করলো,
‘এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?’
‘কীভাবে এতো টেইক কেয়ার করছেন,দেখছি।’-আরহাম।
‘আমার একমাত্র ভাবির ভাই বলে কথা! করবো না?’
‘তাহলে আমি কি আপনার বেয়াই?’
‘সম্ভবত।’
আরহাম নিরুত্তর তাকিয়েই রইলেন।
‘ঘরে বউ রেখে বাইরের মেয়ের দিকে তাকাতে লজ্জ্বা লাগে না?’
আরহাম ঘোর লাগা কন্ঠে ঠোঁট কামড়ে হেসে বললেন , ‘না,লাগে না।এত সুন্দর বেয়াই,আমি তো রীতিমতো প্রেমে ডুবতে যাচ্ছি।’
‘ছিহ!’
‘আমার বোনের ননাস,আমার বেয়াই,সো মিস,আপনাকে আমার ভালো লেগেছে।আই ওয়ান্ট ইউ।’
হাফসা মিছিমিছি চোখ রাঙ্গায়।অবাক হওয়ার মতো করে বলে, ‘হাউ ডেয়ার ইউ!’
‘জ্বি।এখন আপনাকে চুমু খেতেও ইচ্ছে করছে।’
‘এখুনি আমার ভাইয়ের কাছে বিচার দিচ্ছি।আপনি আমাকে উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন।’
‘আপনার ভাইকে গিয়ে বলুন,আমি তার বোনের সাথে একান্তে কিছু হিসাবনিকাশ করতে চাই!”
হাফসার গাল গলে গেলো লজ্জ্বায়।চোখ সরু করে সে তাকাল এবং হার মানতে পরাস্ত হলো।
‘আপনার সাথে আমি পারব না।আপনি খুব…
‘খুব?’
‘সেইমলেস!’
আরহাম এবার বেশ শব্দ করেই হাসলেন।উঠে এসে তাকে মৃদু আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়ে বললেন , ‘সেইমলেস যখন বলেই ফেলেছেন তাহলে আমি আর কোনো সীমানা রাখছি না আর।’ বলেই হাফসার সমস্ত মুখে উষ্ণ স্পর্শ আঁকার একপর্যায়ে দরজার আওয়াজ কানে আসে।
আরহাম তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।হাফসা লজ্জ্বায় ডুবতে ডুবতে দ্রুত রুম ছেড়ে পালালে আরহাম কিছুটা অসন্তোষ সুরে বললেন , ‘তুমি আসার আর সময় পেলে না!এত জেলাসি কেন বলো?তোমার বউও তো তোমার কাছে,ভাই।’
মাহের নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন , ‘ইউ সুড হ্যাভ মেইনটেইনড ইয়োর প্রাইভেসি।’
‘আমি আর উনি একসাথে কথা বলছি মানেই এই এড়িয়ায় প্রবেশ নিষেধ।যা হোক, বলো কেন এই বিশেষ মুহুর্তে বাগড়া দিতে এসেছো?’
‘খাবার রেডি করা হয়েছে।’
‘আমি খাবো না।আমার স্ত্রী’দের দাও।আমি এখন বাসায় চলে যাবো।’
অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭২
মাহের মুচকি হেসে প্রস্থান করার ব্যাপারটা আরহাম প্রথমে না বুঝলেও পরে যখন দেখলেন উনার পিছনেই আম্মু দাঁড়িয়ে তখন লজ্জ্বায় মাথা কাটা যাচ্ছিলো আরহামের। তিনিও আরহামকে ডাকতে আসছিলেন।আরহাম চুপিচুপি চলে আসতে আসতে মুখ নিচু করে বললেন , ‘খাবার দাও।খিদে লেগেছে।’
