Home অপেক্ষা সিজন ২ অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৬

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৬
Maha Aarat

বিকেলটা ছিল সোনালি।জানালা দিয়ে নরম আলো এসে পড়ছে ঘরে, যেন কেউ আজ নিজ হাতে সাজিয়েছেন এই ঘরটাকে, শুধু মাইমুনা আর হাফসার জন্য।বিছানার এক পাশে আধশোয়া হয়ে বসে আছে হাফসা, আরেক পাশে হেলান দিয়ে বসা মাইমুনা।কাঁধে চাদর,হাতে বই।মুখে সেই চিরচেনা কোমল হাসি।
“তুমি জানো,আমি সবসময় ভাবতাম—একই মানুষকে ভালোবাসা মানে ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা।কিন্তু তুমি আসার পর বুঝলাম, ভালোবাসা মানে ভাগাভাগি নয়, বরং একে অপরকে জড়িয়ে রাখা।”
হাফসা নিচু স্বরে বলল, “সত্যিই!”
মাইমুনা একটুখানি হেসে বললেন, “তুমি আমার বোন না, তুমি আমার আয়না।আমি যেমন অনুভব করি, তুমিও তাই করো।এই অনুভবটাই আমাদের এক করে রেখেছে।”

হাফসা নিচু হয়ে মাইমুনার হাতে চুমু খেলো।বলল, “আপু আপনি আমার দুআ,আমার সাহস।”
একটা পাখি জানালার পাশে বসে ডেকে উঠলো। আলোটা একটু বদলে গেলো।দুজনের মাঝখানে যেন এক অদৃশ্য শান্তি এসে দাঁড়াল।
হাফসা ধীরে মুখ ঘুরিয়ে মাইমুনার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপু… আজ কি আপনি আমাকে সেই অংশটা পড়ে শোনাবেন?”
মাইমুনা মুখ তুলে তাকালেন, চোখে অবাক ও মায়া।
“কোন অংশটা হাফসা?”
“সূরা মারইয়ামের সেই জায়গা… যেখানে মারইয়াম (আঃ) ব্যথায় খেজুর গাছের নিচে চিৎকার করেছিলেন। আমি… আজ সকাল থেকেই কেমন যেন অস্থির অনুভব করছি।সেই আয়াতগুলো শুনলে মনে হয়… নিজের কষ্টটাও যেন হালকা হয়ে যায়।”

মাইমুনার কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল।এই মেয়েটার মধ্যে সে যেন নিজেরই একটা ছায়া খুঁজে পেয়েছে। তার কষ্টে কাঁদে, তার হাসিতে হাসে।আজ সেই কষ্টকে শব্দের সাহস দিতে হবে।
তিনি ধীরে কুরআনের একটি সফট কপি খুললেন মোবাইলে। তারপর শুরু করলেন সূরা মারইয়ামের সেই অংশ—
(তখন প্রসব বেদনায় সে খেজুর গাছের কাণ্ডের কাছে এসে পৌঁছল। সে বলল, ‘হায়, আমি যদি এর আগেই মারা যেতাম! যদি একেবারে বিস্মৃত হয়ে যেতাম!’)
মাইমুনার কণ্ঠ নরম, ধীর, কিন্তু ভারি।প্রতিটি হরফ যেন ভরে আছে বেদনা আর ভালোবাসার ভারে।
হাফসা মনোযোগ দিয়ে শোনে।সে যেন শব্দের মধ্যে ডুবে যেতে চায়।তারপর মাইমুনা থেমে গেলেন। চোখে জল চিকচিক করছে।
হাফসা ফিসফিস করে বলল,

“মারইয়াম (আঃ) যখন এটা বললেন, তখন তো তিনি একা ছিলেন? তাঁর কেউ ছিল না… এমনকি কোনো মানুষের ছায়াও না… কিন্তু আল্লাহ্‌ ছিলেন, তাই না?”
মাইমুনা ধীরে মাথা নেড়ে বললেন,
“আল্লাহ্‌ ছিলেন… তিনি সবসময় থাকেন। শুধু আমরা বুঝতে পারি না। একাকিত্বের মধ্যেও তিনি আছেন। কষ্টের গভীর সাগরেও তার রহমতের ঢেউ থাকে।”
হাফসা আবেগে মাইমুনার হাত ধরে বলল,
“আমার মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমি যদি আপনার মতো ধৈর্য ধরতে পারতাম… আমি যদি আপনার মতো করে আল্লাহ্‌কে আঁকড়ে ধরতে পারতাম… তাহলে হয়তো আমার এত ভয় লাগতো না।”
মাইমুনা হেসে ফেলেন।ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা প্রশান্তি।
“আমি ধৈর্যশীল নই হাফসা। আমি কেবল কাঁদি। আল্লাহ্‌র কাছে, রাতে, দিনে, যখন একা থাকি তখন… আমি ওনার কাছে বলে ফেলি সব। আর তাতেই হয়তো তিনি আমার ভেতরটা কিছুটা শান্ত করে দেন।”
ওদের কথার মাঝে কখন যেন সূর্য ঢলে পড়েছে। ঘরটা আবছা আলোয় ঢাকা।
হাফসা হঠাৎ বলে উঠল,

“আচ্ছা আপু… আল্লাহ্‌ কি জান্নাতে আমাদের একসাথে রাখবেন?”
“ইনশাআল্লাহ, যদি আমরা একে অপরের জন্য দোয়া করি, একে অপরের কষ্টে পাশে থাকি… তাহলে আল্লাহ্‌ দুনিয়ার সম্পর্ককে জান্নাত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাবেন,ইন শা আল্লাহ ।”
“তুমি কি জান্নাতে আমার পাশের ঘরে থাকবে?”
“না, আমি তো তোমার ঘরেই থাকবো।”
দুজনে চোখের জল লুকাতে লুকাতে হেসে ফেলল।
ঘরের দরজার একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরহাম। দূর থেকে সব দেখছিলেন।উনার চোখে ছিল প্রশান্তির ঝিলিক। মাইমুনা আর উমায়েরের এই বন্ধন, এই ভালোবাসা, এই চিরন্তন সহমর্মিতা উনার ভিতরে এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিয়েছিল।উনার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক অনাবিল মুচকি হাসি—“আলহামদুলিল্লাহ।”
বেশ কিছুক্ষণ পর…
দরজায় ঠকঠক শব্দ।
আম্মু ঢুকলেন।হাতে ফালুদার ট্রে,মুখে ক্লান্তির ছায়া, কিন্তু চোখে অপার প্রশান্তি।একটু থেমে বললেন, “তোমাদের একসাথে হাসতে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে চমৎকার দৃশ্যগুলোর একটি আমি দেখছি!”
বলতে বলতে অশ্রুমাখা চোখে দুজনের কপালে চুমু আঁকলেন তিনি।অতপর বললেন , “আমার ঘরে কোনোদিনও যেনো এই চক্ষুশীতলকারী দৃশ্যের ইতি না ঘটে।”

ইশার নামাজ শেষে আহনাফ তাজওয়ার জায়নামাজ ভাঁজ করতে করতে দেখেন, পাশের রুমে আফসানা চুপচাপ বসে আছেন।তিনি এগিয়ে এসে বলেন,
“আজ একসাথে বসি? আমি কুরআনের তিলাওয়াত করি, আপনি পাশে বসুন।”
আফসানা অবাক হয়ে তাকান।এতদিন পর এমন আহ্বান!
তিনি কিছু না বলে কেবল মাথা নাড়েন।
জায়নামাজে বসে আহনাফ তাজওয়ার সূরা আর রহমান তিলাওয়াত করেন।উনার কণ্ঠ ধীর,কিন্তু শান্ত সুরে কুরআনের শব্দ যেন ভরিয়ে দেয় ঘর।
আফসানার চোখ ভিজে ওঠে।
এই লোকটা একসময় খুব দূরে ছিলেন,কিন্তু আজ যেন অনেক কাছে।
কুরআন পড়া শেষে পুরনো স্মৃতিচারন হয়ে যায় একাংশে।একদিন দুপুরে হঠাৎ কারেন্ট চলে যায়।গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে তাজওয়ার বলছিলেন,
– “মনে পড়ে, আমরা বিয়ের পর প্রথম গ্রীষ্মে কুমিল্লায় গিয়েছিলাম? তখনো এমন গরম পড়েছিল।আপনি গরম সহ্য করতে পারতেন না।আপনার মাথায় পানি ঢেলে দিতাম, মনে আছে?”
আফসানা হেসে ওঠেন। হালকা, নিঃশব্দ হাসি।
“আর আপনি ঠান্ডা শরবতের বদলে গরম দুধ এনেছিলেন।তারপর আমি রাগ করেছিলাম!”
দুজনেই একসাথে হেসে ওঠেন।
এই হাসির কোনো শব্দ নেই, কিন্তু ব্যথাগুলো যেন একটু একটু করে হালকা হতে থাকে।

চারিদিক অন্ধকার।রাত দশটা..
কি হলো আপনি যাচ্ছেন না কেন?”
“আম্মু,আব্বু,আরহাম আমাকে থাকতে বলেছেন।”
আইরার রাগ নিভে গেলো।খামোখা এই পরনারীর হাজব্যান্ডের সাথে আলাপ জমাতে ইচ্ছে হচ্ছে না তাঁর।চুপচাপ উপরে উঠতে লাগলো সে।রুমে ঢুকার এক মুহুর্ত আগ পর্যন্তও দেখলো,উনার দৃষ্টির নড়চড় হয়নি।
অন্ধকার রুম।বেলকনির ফ্ল্যাশের সামান্য আলোয় রুম একটু আলোকিত।আইরা আর কাঁদলো না।কাঁদতে কাঁদতে সে ক্লান্ত।মাঝে মাঝে কান্না করলে মন হালকা হয়,অথচ এখন কাঁদলে মনে হয় বুকটা আরও ভারী হয়ে আছে।
দরজায় ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হতেই সেদিকে দৃষ্টি ফেললো সে।আধো অবয়বে টের পেলো তিনি ঢুকেছেন।চট করে উঠে বসলো সে।মাহের সেদিকে কোনো কর্ণপাত করলেন না।তার পাশে এসে শোয়ার প্রস্তুতি নিতেই আইরা কড়াগলায় এবার বলে, ‘এমন বিহ্যেইভের কারন কি?আপনার কি মনে হয় না,আপনাকে ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্তে আমি সিরিয়াস?”

‘সত্যিই চাচ্ছো ছেড়ে দিতে?”
“সন্দেহ আছে?”
“পাঁচ মিনিট পরেও তোমার এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত থাকতে হবে।আই হোপ,তোমার কথার নড়চড় হবে না।”
আইরা থমথমে মুখে তাকিয়ে রইলো।উনার কথার আগামাথা সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
মাহের তার মুখোমুখি বসলেন।দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক শ্বাসেই বলতে শুরু করলেন,
“মায়ের শরীর থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছি,হাফসাকে আদরে-শাসনে বড় করেছি।এরপর তুমিই হচ্ছো একমাত্র নারী,যার এত কাছাকাছি আমি এসেছি।তুমি একমাত্র যাকে আমি ছুঁয়েছি,লাভিং আইজ এ তাকিয়েছি,একসাথে স্টে করেছি।এছাড়া আমার জীবনে কোনো নারীর অস্তিত্বই নেই।আর না ছিল।এরপরও তুমি ডাউট করো আমাকে।হুয়াই?তোমার বিলিভ হয়,আমার আরেকটা ফ্যামিলি আছে,আর আমি তোমার কাছে লুকাচ্ছি?আইরা,আমাদের জীবনে এমন কিছু প্রাইভেসি থাকে,যেটা একান্তই ব্যক্তিগত।আর এই ব্যাপারটা তেমনই। বাট আই রিপিট ,তুমিই একমাত্র,যার সাথে আমার প্রণয়,পরিণয়,সবকিছু।অন্য কোনো নারী আমার জীবনে নেই।”
বলেই আইরার দিকে কোমলদৃষ্টিতে তাকালেন তিনি।উঠে যেতে যেতে বললেন, “তুমি এত কান্না করেছো,আমার অনেক খারাপ লেগেছে।কিন্তু তোমার ব্যবহার আমাকে ক্ষেপিয়ে দিয়েছিল।যাই হোক,ছেড়ে দিতে পারো আমাকে।”
মাহের চলে আসতে নিলেন।আইরা ছুটে এসে হাত ধরলো।আইরা অবাক হলো।উনার চোখ জল চিকচিক করছে।শেষের কথাটা ধরা গলায় বলছিলেন কেন!
আইরা চঞ্চল কন্ঠে বলল , ‘এখন বুঝতে পেরেছি।আর কখনো আপনাকে সন্দেহ করবো না।কখনো না।আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

মাহের অবহেলার সুরে বললেন, ‘ক্ষমা করাতে কৃপন না আমি।লেট মি গো।”
আইরার গলা ধরে এলো এবার।কান্না আর আটকাতে পারলো না।ভেজাকন্ঠে বলল, “না।আমি আপনাকে কখনো ছাড়তে চাই না।ক্ষমা করুন না!”
“তুমি আবারও সন্দেহ করবে আমাকে।”
“করবো না।বলছি করবো না।”
“প্রমিস?”
“প্রমিস প্রমিস প্রমিস।”
তিনি কোমল স্পর্শে ভেজা গাল মুছে দিয়ে বললেন, “রাগটাগ কি কিছু কমেছে?”
“কমেছে।”
“বাকি থাকলে বলো অন্য ব্যবস্থা করছি।”
“কী ব্যবস্থা?”
“ভাবতে হবে।”
আইরা আর ভাবার সুযোগ দিলো না।
না কোনো অনুমতির অপেক্ষা,
না কোনো দ্বিধার দেয়াল—
এক নিঃশ্বাসে, এক টানে
সে মাহেরকে জড়িয়ে ধরল।

অন্যসব আলিঙ্গনের মতো না—এটা ছিল একটু বেশি চাওয়া, একটু বেশি ভরসা,একটু বেশি অসহায় ভালোবাসা।
মাহের থমকে গেলেন।প্রথমে অবাক হলেন।তারপর এক অজানা ব্যথার সাথে বুকের ভেজা অনুভব করলেন।চুপিচুপি ঝরছে কিছু অশ্রু।কিন্তু শব্দহীন এই কান্না অনেক কিছু বলছে।
তিনি থামলেন না।পিছু হটলেন না।বরং শক্ত হাতে আগলে নিলেন আইরাকে।চিবুকটা রাখলেন ওর মাথার ওপর,তারপর কণ্ঠে এমন এক অস্থির প্রশান্তি নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
“আমি যেরকমই আছি,আমাকে রেখে দাও। ভেঙে গেলে জোড়া দিও, কিন্তু…কখনো ছেড়ে দিও না।”

এশা কিছুদিন ধরে শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত পরিবর্তন অনুভব করছিল।হঠাৎ হঠাৎ বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, এবং হরমোনের অস্থিরতা তার চোখে-মুখে ছায়া ফেলেছিল।সে বুঝছিল কিছু একটা বদলাচ্ছে তার শরীরে, কিন্তু এখনো সে নিশ্চিত নয়।
রায়ান একদিন তাকে গ্লাসে পানি দিয়ে বললেন,
“তোমাকে আজকাল এত ক্লান্ত লাগে কেন? কোনোকিছুতে মন নেই, খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করোনি।আমি কি ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দিব?”
এশা কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
“না… তেমন কিছু না… হয়ত ঘুম ঠিক হয়নি।”
কিন্তু রায়ান দমবার পাত্র না।উনি প্রতিদিন সকালে দুধ গরম করেন,ফল কেটে প্লেট সাজিয়ে দেন, মাথায় তেল দিয়ে দেন,পায়ের ব্যথা কমাতে ম্যাসাজ করে দেন।এশা রায়ানের চোখের ভেতরে এক অপার মমতা দেখতে পায়—যেটা হয়ত ভালবাসার থেকেও বেশি কিছু।

ঘন্টাখানেক পর….
‘স্যার!’
‘হু?’
‘একটু ফোনের ফ্ল্যাশটা জ্বালান না!’
‘কেন?’
‘অন্ধকারে ভয় করছে।’
‘কিসের ভয়?’
‘ভূতের ভয়!’
মাহের কিছুটা ধমকে উঠে বললেন, ‘ভূত মানে?ভূত বলে কিছু নেই!’
‘এটা দিনে বিশ্বাস করি,রাতে করি না।রাত হলে আমার মনে হয় ভূত বলে সত্যি কিছু একটা আছে।’
‘একজন সায়েন্সের স্টুডেন্ট থেকে এমন থিয়োরি আশা করা যায় না।’
‘আপাতত আশা করে লাইট জ্বালান প্লিজ।’
মাহের আর কথা বাড়ালেন না।অন্ধকার হাতড়ে ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে টেবিলে রাখলেন ফোন।
আইরা এবার শঙ্কামুক্ত হলো।কাঁথা থেকে মুখ বের করতে নিমিষেই যেন সহস্র ভয়েরা ওর কলিজা খামচে ধরলো। নিশ্চিন্ত হতে গিয়েও আচমকা চিৎকার করে মাহেরের বুকে লুকালো।
ভীতস্বরে আবার বলতে লাগলো, ‘স্ স্যার…

‘কি হলো?কি হয়েছে?ভয় পেয়েছো?’
ভয়ে তাঁর চোখ মুখের রং উবে গেলো।বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা বুঝি গলা কাটা কবুতরের মতো লাফাচ্ছে।আইরা চোখখিঁচে নখ দিয়ে বুক ঝাপটে ধরে ফিসফিসিয়ে শঙ্কিত ভয়ার্ত অনুচ্চস্বরে বলতে লাগল, ‘দ্ দেয়ালে তাকান স্যার।ভূত দেখা যায়!আমার ভয় করছে!’
মাহের দেয়ালে তাকালেন।দেখলেন ফোনের সামনে থাকা ছোট্ট এলার্ম ঘড়ির চিত্রের রিফলেকশন হয়েছে দেয়ালে।হঠাৎ তাকালে ভয়ানক কিছুই বুঝা যায় দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দেখো ভালো করে।এটা ভূত না অন্যকিছু?
আইরা প্রথমে দেখতে চাইলো না।খানিক পর লুকিয়ে চোখ বের করে কিছুসময় দেখে আশ্বস্ত হয় সে।নিজের বোকামীর জন্য জিভ কেটে বুকে ফুঁ দিয়ে সরে আসে।মাহের এখনো অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।স্যারের সাথে চোখ মিলাতে গিয়ে লজ্জ্বায় পড়লো সে।কি বোকামিটাই না করলো ভেবে ভ্যাবলা হেসে বলতে চাইলো, ‘স্ সরি।’
আইরা অপরপাশে ঘাপটি মেরে শুয়েছে।মাহেরের কেমন অস্থির লাগছে।কেউ জড়িয়ে ধরে ঘুমালে খারাপ লাগে না তো।কিছুক্ষণ সময় নিয়ে গলাকেশে বলতে চাইলেন, ‘ভূত-টুত এর আসা যাওয়া বুঝতে পারলে আগে আমাকে….
বলতে দেরি সে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরতে দেরী না।অস্পষ্ট স্বরে বলতে লাগলো, ‘ভূত তো আছে।ভূত তো সত্যি আছে।আপনিও জানেন,মানেন।’
মাহের আড়ালে মুচকি হাসলেন।ফোনের ফ্ল্যাশ নিভিয়ে বললেন, ‘অন্ধকারে ভূত দেখবে না,ভয়ও পাবে না।’
ভয়ে তাঁর শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো।মাহেরের হাসি পাচ্ছে, তাঁর এমন আচরনে।ফিসফিসিয়ে বলল, ‘সকালের আলো ফোটার আগ অব্দি আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না!’
‘কখনোই যাবো না।’ মনে মনে আওড়ালেন মাহের।

আলো নিভে যাওয়ার পর ঘরটা যেন আরও নরম, আরও গভীর হয়ে উঠলো।ঘরের ভেতর তুমুল নিস্তব্ধতা। কেবল দেয়ালের ঘড়িতে টিকটিক শব্দ আর মাঝে মাঝে দূরের কুকুরের হালকা ডেকে ওঠা।
মাহের কিছুটা নরম গলায় বললেন,
“ভয় পাচ্ছো এখনো?”
আইরা তার বুকের কাছে মাথা রেখে নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। শীতল আঙুলগুলো হালকা করে আঁকড়ে ধরেছে মাহেরের শার্টের কাপড়।মাহের চুপচাপ এক হাত বাড়িয়ে ওর মাথার ওপর রাখলেন—কোনো উষ্ণতা, কোনো শব্দ ছাড়া। শুধু একটানা আলতো স্পর্শ, যেন বলছেন,
“ভয় নেই।আমি আছি।”
কিছুক্ষণ পর আইরা একটু নড়ে উঠে বলল,
“স্যার… আপনার কণ্ঠটা শুনলে মনে হয়, বুকের ওপর মেঘ নেমে আসে… আবার সেই মেঘেই আশ্রয়ও পাওয়া যায়।”
“তাই?”
“হুম।আপনার কণ্ঠটা এত গম্ভীর কেন জানেন? শুনলে মনে হয় বুকের ভেতর আলগোছে কাঁপে সব। ভয় পাই, আবার ভালোও লাগে।”

মাহের কিছু বললেন না। শুধু ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন।
তারপর হঠাৎ করেই আইরাকে আরো কাছে টেনে বললেন, খুব নিচু গলায়—
“তুমি যখন এমন নির্ভয়ে আমার কাছে এসে লুকাও… তখন আমার মনে হয়, হয়তো আমি আদৌ এতটা খারাপ মানুষ না।”
আইরার শরীর কেঁপে উঠল—লাজে, প্রশয়ে, আর অজানা কোনো মিষ্টি শঙ্কায়।চুপচাপ চোখ বুজে বলল,
“আপনি আমার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।”
“শিওর?”

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৫

আইরা কিছু বলল না। শুধু চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করে রাখলো—কিন্তু সেই নীরবতা ছিল গাঢ়। তার কপাল ঘেমে উঠেছে, কিন্তু ঠোঁটে তখন এক লাজুক হাসি।
সেই রাত ছিল রহস্যময় ,দীর্ঘ—কিন্তু শব্দহীন।
মাহের খুব বেশি কিছু বললেন না, তবুও উনার প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন বলছিল—
“আমি কৃতজ্ঞ আল্লাহর কাছে, তোমার মতো একজন স্ত্রী পাওয়ার জন্য।”

অপেক্ষা সিজন ২ পর্ব ৭৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here