Home অবাধ্য হৃদয় অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭ (২)

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭ (২)

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭ (২)
নুরিয়া ইসলাম

বাড়ির গেটের বাইরে গাড়ির হেডলাইটের আলো ফ্ল্যাশ করতেই মারিয়া বুঝতে পারল, তানভীর এসেছে। গাড়ি থামতেই দরজাটা ধপ করে খুলে তানভীর লম্বা পা ফেলে ভেতরে ঢুকল, কাঁধে ঝোলানো অফিস ব্যাগটা একপাশে ছুড়ে দিয়ে এক গভীর, ভারী শ্বাস নিল। মুখে এমন গম্ভীরতা যে তার চোখে তাকাতেই মারিয়ার বুক ধক করে উঠল। সে জুতো খুলে সরাসরি লিভিং রুমে গিয়ে দাঁড়াল, তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

— “মারিয়া, সব গুছিয়ে নাও। আজ রাতেই ফ্লাইট।”
মারিয়া হতবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল।
— “কি?! রাতের ফ্লাইট? কিন্তু হঠাৎ… কী হলো তোমার?”
তানভীর হাত দুটো কোমরে রেখে গভীর শ্বাস নিল, যেন নিজের ভেতরের ঝড়কে চেপে রাখতে চেষ্টা করছে।
— “কোনো প্রশ্ন নয়, মারিয়া। যা বলছি তাই করো। ওই ছেলের থেকে আমার বোনকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার এটাই শেষ সুযোগ। আমি আমার বোনকে কিছুতেই ধর্মের নিয়ম ভেঙে নিষিদ্ধ জিনিসের দিকে অগ্রসর হতে দেব না।”
মারিয়া কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল, তারপর স্বামীর দিকে এগিয়ে এসে নিচু গলায় বলল—

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

— “কিন্তু আইন মতে তো ওরা বিবাহিত, তানভীর। তুমি কি সেটা অস্বীকার করবে?”
বৈধতাবিহীন বিয়ের কথা শুনতেই তানভীরের চোখে রাগের আগুন জ্বলে উঠল।
— “এই বিয়ে আমি মানি না। তাছাড়া, আমাদের ধর্মে এই বিয়ের কোনো বৈধতা নেই।”
সে সামান্য থেমে ঠাণ্ডা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল—
— “একবার পাকিস্তানে ফিরে গেলে, আমি আমার বোনের আবার বিয়ে দেব একজন ধার্মিক ছেলের সঙ্গে; যার সাথে সে নিরাপদ থাকবে, আর আমাদের সমাজে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। আমি কিছুতেই আমার মান-সম্মান ধূলিসাৎ হতে দেব না।”
মারিয়া ধীরে বলল—

— “কিন্তু ইনায়া? সে কি রাজি হবে? তুমি কি ভাবছো, এভাবে জোর করে নিয়ে যাওয়া…?”
তানভীর হাতের তালু দিয়ে টেবিল চাপড়ে দিল, শব্দে ঘর কেঁপে উঠল।
— “আমাকে জোর করতে হবে, মারিয়া! এখন যদি না করি, আগামীকাল হয়তো আমাকে আমার বোনের জন্য কান্না করতে হবে। আমি কিছুতেই তাকে সেই ছেলের হাতে ফেলে দেব না। তুমি জানো না, রিচার্ড অ্যাসফোর্ড কীভাবে কথা বলেছে আমার সঙ্গে— স্পষ্ট হুমকি দিয়েছে, আমার বোন এইখানে থাকলে, সে বাঁচতে দেবে না। আমি ওর ভাই, আমার দায়িত্ব আমার বোনকে রক্ষা করা।”

মিস্টার তানভীরের কথা শুনে মারিয়া চুপ করে গেল। হয়তো তানভীর ঠিক বোনের জন্য তার চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। তবুও, মনের এক কোনায় তিনি স্বামীর সাথে একমত হতে পারলেন না। ধীর কণ্ঠে বললেন—
— “তুমি জানো তো, তোমার বোনও কিন্তু সেই ছেলেকে ভালোবেসে ফেলেছে…”
এই কথা শুনে তানভীর ছলছল নয়নে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
— “হায় আল্লাহ, এটা কী করে ফেলেছে তার বোন! শেষ পর্যন্ত ওই বিধর্মী ছেলেটার উন্মাদনা, তার বোনকেও ডুবিয়ে ছাড়ল।”
বোনের বোকামির কথা ভেবে তানভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাকে অন্য দিকে মনোযোগী দেখে মারিয়া ডেকে উঠল,

— “কী হলো, চুপ করে গেলে কেন?”
তানভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, ঠোঁট চেপে ধরে শুধু বলল—
— “ভালোবাসা? ওটা ভালোবাসা না, ওটা শুধু মোহ; যা হারাম। তাছাড়া নিষিদ্ধ জিনিস বরাবর ধ্বংসই ডেকে আনে।”
কথাটি বলে তানভীর স্ত্রীকে তাড়া দিয়ে বললেন—
— “দ্রুত রেডি হও!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ গেল সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার দিকে,যে হয়তো সব কথা শুনে ফেলেছে।

ICU, রাত ২টা ১৭ মিনিট,
মেশিনের অবিরাম বীপ বীপ শব্দে ভরা ঘরের মাঝখানে এরিক হঠাৎ কেঁপে উঠল। চোখ ধীরে ধীরে খুলতেই সাদা আলোয় ঢাকা সিলিং ঝাপসা হয়ে এলো। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, তবুও তার মাথায় প্রথম যে নামটা বাজল
— ইনায়া! “ইনায়া কোথায়?”গলা ভাঙা, কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বর বেরিয়ে এলো তার ঠোঁট থেকে। পাশেই বসা এলেক্স চমকে তাকাল। — “এরিক… তুই—”এলেক্সের কথা কানে যেতেই, এরিকের ধারালো চোখদুটো এলেক্সের দিকে ঘুরে গেল, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো তার। দাঁত কিটমিট করে সে গর্জে উঠল,
—”আমার ফোনটা দে।” এলেক্স ভ্রু কুঁচকে বলল,
—”কেন?” এরিকের চোখে আগুন জ্বলে উঠল, রাগে তার পেশিবহুল হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে গেল। সে দাঁত কটমট করে বলে উঠল,

—”শালা, আমি তোর মতো সিঙ্গেল নাকি? বউ আছে না আমার! আমার নীতিবান বউটাকে কল দিবো, স্বামীকে হাসপাতালে একা ফেলে সে কী করছে?”
এলেক্স হতভম্ব হয়ে ফোনটা এগিয়ে দিল। এরিক ছিনিয়ে নিয়ে তৎক্ষণাত ডায়াল করল ইনায়ার নাম্বারে, যেটা তার ফোনে ‘মাই মুনলাইট ‘ বলে সেভ করা ছিল। কল যায়, কিন্তু রিং হয় না। সুইচ অফ। এরিকের চোখদুটো লাল হয়ে উঠল, রাগে তার শিরায় শিরায় আগুন জ্বলে উঠল।
—”ফাক!” সে গর্জে উঠল, ফোনটা সজোরে ছুড়ে মারল দেওয়ালে। ফোনটা ভেঙে চৌচির হয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। এলেক্স চমকে উঠে বলল,
—”এরিক, শান্ত হ!” কিন্তু এরিকের কানে কিছু ঢোকে না। সে হাতের ক্যানুলা টেনে ছিঁড়ে ফেলল, রক্ত বেরিয়ে এলো তার হাত থেকে, কিন্তু সে পাত্তাই দিল না। রাগে কাঁপতে কাঁপতে সে বলে উঠল,
“ওর সাহস কত বড়, ও আমাকে ইগনোর করে? এরিক অ্যাসফোর্ডকে? আমাকে এখনো চেনে না ও!”
এরেন তড়িঘড়ি এগিয়ে এসে তার বাহু চেপে ধরল,
— “তুই এখনো দাঁড়ানোর মতো অবস্থায় নেই! ডাক্তারকে ডাকি—” কিন্তু এরিক তাকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিয়ে দাঁত পিষে বলল,

—”থাম!ও নিজেকে কী ভাবে, আমাকে এইখানে চিন্তায় রেখে নিশ্চিতে ঘুমাচ্ছে। ছুটাচ্ছি ওর ঘুম। ”
রাগে এরিকের মাথা ফেটে যাচ্ছে। অসুস্থ শরীরটা বারবার ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। কিন্তু সে থামল না। দরজার বাইরে দাঁড়ানো গার্ডদের দিকে গর্জে বলে উঠল,
— “গাড়ি বের কর। এখনই। না হলে এখানেই শুট করে দেব সবাইকে!”
গার্ডরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়ি নিয়ে এল। এরিক টলতে টলতে বেরিয়ে গেল হাসপাতাল থেকে, তার চোখদুটো অনুভূতিশূন্য, কিন্তু ভিতরে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে উঠে সে হুকুমের সুরে বলল,

—”ইনায়ার বাসায় চল। ফাস্ট।” ড্রাইভার ঘামতে ঘামতে গাড়ি ছোটাল। পথে এরিকের মন বলছে ইনায়ার সাথে কিছু একটা হয়েছে, সে ইনায়াকে যেইভাবে হুমকি ধামকি দিয়েছে তাতে ইনায়ার সাহস হবে না তার কল-কে ইগনোর করার। ইনায়ার চিন্তায় তার মধ্যে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। সে এই অস্থিরতা কমাতে, ড্রাইভারকে ধমকে বলে উঠে,
—”স্টপ দ্যা কার,রাইট নাও!” এরিকের ধমকে ড্রাইভার কেঁপে উঠে। মনে মনে ভাবতে থাকে, সে কোন ভুল করে ফেললো কিনা।তাইতো, সে কোনকিছু না ভেবেই, রুক্ষ, বদমেজাজি এরিককে কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে,
—”কী হয়েছে স্যার?” এরিকের মেজাজ এমনিতেই হট হয়ে আছে, তার উপর ড্রাইভারের পুনরায় তাকে প্রশ্ন করায়, তার রাগটা যেন তিড়তিড় করে বেড়ে গেল। সে একটা কথা একবারের বেশি বলা পছন্দ করে না। কিন্তু বেচারা ড্রাইভার যেন সেই ভুলটাই করেছে, এক রুক্ষ মানবকে প্রশ্ন করে। এরিক দাঁতে দাঁত পিষে ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে, রাশভারি কন্ঠে বললো,

—”আই সেইড,স্টপ দ্যা কার,ডোন্ট রিপিট মাই সেল্ফ!” এরিকের গম্ভীর স্বর শুনে, ড্রাইভার ভয় পেয়ে গাড়িটি থামিয়ে দিল।গাড়ির ব্রেকের ধাতব চিৎকার থেমে যেতেই, এরিক গম্ভীর কন্ঠে ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
—”গেট আউট!”
অপ্রস্তুত ড্রাইভার চোখ-মুখ কাঁচুমাচু করে শুধু বলল, “স্যার…”
শব্দ থেমে গেল মাঝপথে, কারণ এরিকের দৃষ্টির আগুন তার কণ্ঠের পথ রুদ্ধ করে দিল। সেই চোখে ছিল কড়া শীতলতা আর অদৃশ্য শাসন, যা মেরুদণ্ড পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিলো ড্রাইভারের।
ড্রাইভার আর কোনো কথা না বলে তড়িঘড়ি দরজা খুলে বাইরে নেমে দাঁড়াল। এরিক ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল, স্টিয়ারিং ঘুরাতে লাগল তার দৃঢ় হাতে, আর মুহূর্তের মধ্যেই রোলস্ রোয়েস গর্জন তুলে সড়কে ছুটে গেল, ঠিক এক অবাধ সম্রাটের মতো নিজের পথে।

কিছুক্ষণ পর, গাড়ি থামল ইনায়াদের দোতলা বাড়ির সামনে।এরিক এক প্রকার জোরে গাড়ির দরজা খুলে, বাড়িরটির দিকে দৌড়ে গেল দেখল, লোহার গেটে বড় তালা ঝুলছে।গেটের তালা ঝাঁকিয়ে দেখতে লাগল।রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে, সে এক প্রকার গগনকাঁপানি হুংকার ছেড়ে ইনায়াকে ডেকে উঠলো।গলার স্বর ফাটিয়ে উঠল, যেন কোনো আহত বন্য জন্তুর ডাক। রাগে চোখ রক্তিম হয়ে উঠল। হঠাৎ আশেপাশে রাখা একটা লোহার রড তুলে নিয়ে তালায় সজোরে আঘাত করল। দু’বার, তিনবার— আরেকটা আঘাতেই তালাটা ভেঙে পড়ল। এরিক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ঘর অন্ধকার, ফাঁকা। যেন বহুদিন কেউ থাকেনি এখানে। তবুও সে একে একে সব রুমে ঢুকল, চোখে ইনায়াকে এক নজর দেখার উন্মদনা ফুটে উঠেছে । শেষমেশ সে ইনায়ার রুমের সামনে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার চোখে পড়ল বিছানার ওপর পড়ে আছে একটা ওড়না। সেই গন্ধ, সেই নরম কাপড় যা তার প্রতিটা স্মৃতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে তুলল।

এরিক ধীরে ধীরে ওড়নাটা তুলে নিল। হাতের মুঠোয় জড়িয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করল। এক মুহূর্তের জন্য তার মুখে যন্ত্রণার ছাপ ভেসে উঠল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা বদলে গেল ভয়ঙ্কর দৃঢ়তায়। সে ওড়নাটায় মুখ ঘুষে, ফিসফিস করে বলল,
—”পালিয়ে গিয়ে, এরিক অ্যাসফোর্ডের থেকে মুক্তি পাবে,ভেবেছো?
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে উঠলো রাগে। ”
—”মৃত্যুর শেষ মুহুর্তে, আমাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে এভাবে ছেড়ে যাওয়ার মানে কী? ”
ওড়নাটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে এরিক গর্জে উঠল, তার চোখদুটো ক্লান্ত হয়ে উঠেছে । রাগে সে দেওয়ালে ঘুষি মারল, হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। মনে মনে সে শপথ করল,
— “আই সয়ার, মুনলাইট ,
একবার শুধু হাতের কাছে পায় তোমায় , এরপর তোমায় বোঝাব তোমার husband ঠিক কতটা dangerous. আমার আসল রূপ এখনো তুমি দেখনি so be prepared!”

রাতের নিস্তব্ধ শহরের উপরে,এরিক তার বিলাসবহুল পেন্টহাউসের রুফটপে দাঁড়িয়ে আছে। রুফটপের ঠান্ডা হাওয়া এরিকের মুখে আঘাত করছে, কিন্তু তার ভিতরের আগুন তাতে মোটেও নিভছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে সিগারেট, নিকোটিনের ধোঁয়া উড়িয়ে। তার চোখদুটো আকাশের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু দৃষ্টি হারিয়েছে ইনায়ার মাঝে। তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কটা ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু একটা জায়গায়— ইনায়ার ভাই তানভীর তাকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে? সে তো ইনায়া সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না।কীভাবে খুঁজবে তাকে?কোথায় সে? কোন শহরে, কোন দেশে? এই অজানা প্রশ্ন তার মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ইনায়া তার থেকে দূরে চলে গেছে— এই ভাবনাটাই তার ভিতরের উন্মাদনাকে ভয়ঙ্কর রূপ দিচ্ছে। রাগে তার পেশিবহুল হাতদুটো মুঠোবদ্ধ হয়ে উঠল, সিগারেটটা শেষ টান দিয়ে ছুড়ে ফেলল নীচে। ধোঁয়ার সাথে তার যন্ত্রণা উড়ে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু না, বরং তা আরও বেড়ে গেল।

—”এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে আমি মরে যাবো,” সে বিড়বিড় করে বলল, দাঁত পিষে। তার হৃদয়টা ছিঁড়ে যাচ্ছে, ইনায়ার দৃঢ়তা, ওর গন্ধ, ওর ওড়না সবকিছু তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
হঠাৎ তার মস্তিষ্কে একটা সূক্ষ্ম চিন্তা উদয় হলো। তানভীর! ইনায়ার ভাই। তাকে খুঁজে পেলে ইনায়া তার হাতের মুঠোয়। এরিক তৎক্ষণাত পকেট থেকে তার সেকেন্ডারি ফোনটা বের করল, জ্যাকের নাম্বারে ডায়াল করল। জ্যাক ফোন ধরতেই এরিক কোনো ফর্মালিটির ধার ধারল না। তার গম্ভীর, রাশভারি কন্ঠ ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো,

— “জ্যাক, দ্রুত মিস্টার তানভীরের লোকেশন ট্র্যাক করে আমায় জানাও। এখনই।”
জ্যাক কিছু বলার আগেই এরিক ফোনটা কেটে দিল, যেন এক মুহূর্তও নষ্ট করার মতো সময় নেই,তার। ফোনটা হাতে চেপে ধরে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে । ইনায়ার কথা ভাবতে ভাবতে তার মনটা উথালপাথাল হয়ে উঠলো। সে মনে মনে গর্জে উঠল,
— “কেন নিজের ভিতরের অনুভূতির সাথে আমাকে পরিচয় করে দিয়ে এখন, আমার থেকে দূরে পালাচ্ছো।” এই দহন যে আমি সহ্য করতে পারছি না। কেন নিজেকে বার বার আমার রাগের কারণ করে তুলছো? আমি আগেই বলেছি, আমি মোটেও ভালো ছেলে নই।

—”আমি ভালো ছেলে নই, ইনায়া… আমি যা চাই, তা আমি ছিনিয়ে নিই। আর তুমি যদি ভেবে থাকো, আমার কাছ থেকে পালিয়ে বেঁচে যাবে তাহলে ভুল ভেবেছো। পৃথিবীর যে প্রান্তেই তোমার ভাই তোমায় লুকিয়ে রাখুক না কেন, আমার চোখ এড়িয়ে যেতে পারবে না কখনো।”
হঠাৎ তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। জ্যাকের মেসেজ। —”তানভীরের লোকেশন পাওয়া গেছে, বস। লাস্ট সিগনাল, এয়ারপোর্টে দেখাচ্ছে।” কথাটি পড়তেই এরিকের মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠলো, চোয়াল শক্ত হয়ে গেল তার।

— “আমি আসছি বেবিগার্ল, নিজেকে প্রস্তুত রেখো, আমার দেওয়া শাস্তি ভোগ করতে!” সে গর্জে উঠল আর দাঁড়াল না, সিগারেটের প্যাকেটটা পকেটে গুঁজে দ্রুত পায়ে রুফটপ থেকে নেমে এলো। তার বিলাসবহুল ব্ল্যাক রোলস্ রোয়েস গাড়িটা অপেক্ষা করছে নীচে। নিজেই স্টিয়ারিংয়ে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট করল, আর গাড়িটা যেন একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো গর্জন তুলে রাস্তায় ছুটে বেরিয়ে গেল।
এরিকের গতি বা গাড়ির অবস্থা এত বেশি যে স্পিডোমিটারের সূচক ১৫০-এর উপরে উঠছে, রাস্তার বাঁকগুলোতে টায়ারে ঘর্ষনে আওয়াজ তীব্র হচ্ছে, কিন্তু সে পাত্তা দিচ্ছে না। হর্ন বাজিয়ে অন্য গাড়িগুলোকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে, চোখদুটো লাল হয়ে উঠেছে রাগে।

— “ফাক! তুমি পালাতে চাইছো? আমার থেকে?” সে গর্জে উঠল নিজের মনে, স্টিয়ারিংয়ে সজোরে পাঞ্চ মেরে। হাত থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো, কিন্তু সে দেখলও না। এয়ারপোর্টের কাছে পৌঁছাতেই তার মাথার উপর দিয়ে একটা প্লেনের গর্জন শোনা গেল, আকাশ কেঁপে উঠল। এরিকের চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল, রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

—”না! এত সহজে তুমি আমার থেকে দূরে যেতে পারবে না!” সে দাঁত পিষে বলল, গাড়িটা সজোরে ব্রেক কষে থামিয়ে দিল এয়ারপোর্টের গেটের সামনে।
দরজা খুলে লাফিয়ে নামল সে, দৌড়ে ছুটে গেল গেটের দিকে। গার্ডরা তাকে দেখে এগিয়ে এলো বাধা দিতে,
—”স্যার, আপনি এভাবে ঢুকতে পারবেন না! টিকিট দেখান!” কিন্তু এরিকের চোখে আগুন, সে একজনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল, অন্যজনের কলার চেপে ধরে গর্জে উঠল,
— “আউট অফ মাই ওয়ে! না হলে এখানেই শুট করে দেব তোদের!” গার্ডরা ভয়ে পিছিয়ে গেল, এরিক ছুটে ভিতরে ঢুকে গেল। কাউন্টারে গিয়ে দাঁত পিষে জিজ্ঞাসা করল, —”মিস্টার তানভীরের ফ্লাইট কোনটা? কখন গেল?” ক্লার্ক ভয়ে ভয়ে বলল,

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৭

— “স্যার, ফ্লাইট ইতিমধ্যেই টেক অফ করেছে। লাস্ট কল হয়ে গেছে।” এরিকের মুখটা বিকৃত হয়ে গেল রাগে, সে কাউন্টারে সজোরে ঘুষি মারল,
—”ফাক! লেট!” তার চোখদুটো লাল হয়ে গেল মুহূর্তেই,দাঁতে দাঁত পিষতে পিষতে সে বেরিয়ে এলো। প্লেনটা আকাশে উড়ে গেছে, এরিক সেইদিকেই এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি যেখানেই যাও, মুনলাইট, আমি তোমাকে খুঁজে বের করবো।

অবাধ্য হৃদয় পর্ব ২৮