Home অবেলায় ফোঁটা পুষ্প অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৬ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৬ (২)

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৬ (২)
রুপা

আর্য শাওয়ার নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে তাদের প্যারিসের ব্রাঞ্চ থেকে কল এসেছে, তাকে একবার সেখানে যেতে হবে। প্রতি ছয় মাস অন্তর তাকে একবার যেতে হয় অফিস ভিজিট করতে। আর্য ব্যবসায় জয়েন করার আগে আমজাদ সরকার যেতেন, কিন্তু আর্য ব্যবসায় আসার পর থেকে আমজাদ সরকার আর যান না, আর্যই যায়।
আর্য চার দিন আগে ফ্লাইট বুক করেছিল, কিন্তু এখন তাকে আগামীকালই যেতে হবে। কিন্তু আর্যর মন সায় দিচ্ছে না। আর্য পুষ্পর কাছ থেকে দূরে থাকার জন্য আগেই ফ্লাইট বুক করেছিল, কিন্তু এখন মেয়েটাকে একদিন না দেখে অস্থির হয়ে ওঠে; তার সব শান্তি যেন অশান্তির রূপ নেয়। তার ওপর বাড়িতে নিশি আর ওই মহিলা আছে, তার অনুপস্থিতিতে যদি ‘ফ্লাওয়ার’-কে হার্ট করে বসে! ফ্লাওয়ার তো কাউকে কিছু না বলে নিজে আড়ালে এসে কাঁদবে। মেসেজটা কে করেছিল, সেটার কোনো আপডেট এখনো পায়নি আর্য—সব মিলিয়ে সে আর ভাবতে পারছে না।

কিছুক্ষণ পরে আর্য রুমে এসে দেখল পুষ্প সোফায় ঘুমিয়ে আছে। আর্য নিজের ভাবনাতেই মশগুল ছিল, কখন পুষ্প রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়েছে তা টের পায়নি। তবে পুষ্পকে সোফায় ঘুমাতে দেখে মোটেও ভালো লাগল না তার। সে এগিয়ে এসে পুষ্পকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। পুষ্পকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ভালো করে কম্বল জড়িয়ে দিল। তারপর নিজে খাটে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে পুষ্পর মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এই মেয়েটার থেকে সে দূরে থাকতে চেয়েছিল, অথচ এখন এই মেয়েটার থেকে দূরে যেতে হবে—এই ভাবনাটা মাথায় আসতেই ভেতরে ঝড় শুরু হয়ে গেছে।
পুষ্পর মুখে কিছু অবাধ্য চুল এসে পড়েছে; সেটা দেখে আর্য আস্তে করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। রমণীর মুখের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল—

– “মেয়ে, তোমার থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলাম। অথচ তুমি আমার অবস্থা এমন পর্যায়ে এনেছ যে, এখন তোমার থেকে দূরে যাওয়ার কথা ভাবতেও চাইছে না আমার মস্তিষ্ক!”
পুষ্পর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন ফজরের আজান হয়ে গেছে, টের পায়নি আর্য। হঠাৎ পুষ্পকে নড়তে দেখে আর্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল সকাল সাড়ে পাঁচটা বাজে। আর্য এবার উঠে ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আর্য রুম থেকে বেরোনোর কিছুক্ষণ পরে পুষ্প আস্তে আস্তে উঠে বসল। নিজেকে আবারো বিছানায় আবিষ্কার করে সে অবাক হয়। সে বুঝতে পারছে না, গত দুইদিন সে রাতে ঘুমায় সোফায় আর সকালে উঠে নিজেকে বিছানায় দেখে! সে বিছানায় কীভাবে এল? এতদিন তো এরকম কিছু হয়নি। সে কি ঘুমের মধ্যে হাঁটাচলা শুরু করেছে? কিন্তু সরকার সাহেব তো কিছু বললেন না! নাকি সরকার সাহেব উঠে যাওয়ার পরে বিছানায় এসেছেন? পুষ্প ভাবতে পারছে না, মাথায় কিছু ঢুকছে না। নাহ, তাকে সরকার সাহেবকে জিজ্ঞেস করতে হবে। পরক্ষণেই ভাবল, কিন্তু যদি রেগে যান? নাহ, নাহ! সে বরং ঘুমানোর আগে নিজের দুই পা বেঁধে রাখবে, তাহলে হাঁটতে পারবে না, বিছানায়ও আসবে না। পুষ্প এবার নিজে ফ্রেশ হতে চলে গেল।

পুষ্প কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে। ব্যাগে বই-খাতা সব গুছিয়ে এখন হিজাব পরছে। এর মধ্যে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে আর্য। দেখে বোঝা যাচ্ছে শাওয়ার নিয়েছে, মাথা ভর্তি চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সে এসে বিছানা থেকে টাওয়াল নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে পুষ্পর দিকে তাকায়, যে এখন আয়নার সামনে একমনে হিজাব বাঁধায় ব্যস্ত। আর্য এগিয়ে গিয়ে একদম পুষ্পর সামনে দাঁড়ায়। হঠাৎ আর্যকে নিজের সামনে দেখে চমকে ওঠে পুষ্প। এক পা পিছিয়ে যেতে চাইলে আর্য তা হতে দিল না। দুই হাতে কাঁধ ধরে নিজের নিকট টেনে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
– “আমার কাছ থেকে সবসময় পালাতে চাও কেন, ফ্লাওয়ার?”
পুষ্প কিছু বলল না, চোখ নামিয়ে নিল। আর্যকে নিজের এত কাছে আবিষ্কার করে পুষ্পর হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে; মনে হচ্ছে হৃদপিণ্ড নামের বস্তুটা খাঁচা থেকে বেরিয়ে আসবে! বুকের বাম পাশে ঢিপঢিপ করছে। পুষ্প হাঁসফাঁস করে উঠল। আর্যর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য মিনমিন করে বলল—

– “সরকার সাহেব, ছাড়ুন আমাকে! দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
– “আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, ফ্লাওয়ার!”
– “কী প্রশ্ন?” পুষ্প মিনমিন করে জিজ্ঞেস করল।
– “আমার থেকে দূরে দূরে থাকছ কেন?”
– “আপনি তো বলেছেন আপনার থেকে যেন দূরে থাকি!”
– “আমি বলেছি তাই দূরে থাকছ?”
পুষ্প ওপর-নিচ মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ‘হুম’ বলে। আর্য সেদিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে বলল—
– “আমার সব কথা শুনবে?”
সাথে সাথে পুষ্প চোখ তুলে তাকাল আর্যর দিকে। আর্য তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, দুচোখের মিলন হলো। পুষ্প চোখ নামিয়ে নিল, কিছু বলল না। এতে আর্য আর কিছু বলল না, পুষ্পর হিজাবটা আরেকটু টেনে দিয়ে বলল—

– “আমি সাতদিন বাড়িতে থাকব না। তুমি নিজের খেয়াল রাখবে, কলেজে যাবে, মন দিয়ে ক্লাস করবে। ছুটির আগে গেটে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, ছুটির পরে কোথাও দাঁড়াবে না, সোজা বাড়িতে চলে আসবে। ভুল করেও কোনো ছেলের আশেপাশে যাবে না। মনে থাকবে?”
আর্যর সব কথা মন দিয়ে শুনল পুষ্প। আর্য সাতদিন বাড়িতে থাকবে না কেন, কোথায় যাবে—এই প্রশ্নটা মনে তীব্র ধাক্কা দিল, তবুও মুখ ফুটে বলার সাহস হলো না; শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আর্য আবারো বলল—
– “আর বাড়িতে আসা মেহমানদের থেকে দূরে থাকবে। নিশি অথবা ওই মহিলা কিছু বললে একদম কাঁদবে না, কথার উচিত জবাব দেবে। ইউ নো না, আই হেট টিয়ারস! ওই ভীত চোখের পানি সহ্য হয় না। সবসময় আম্মুর সাথে থাকবে। কিছু প্রয়োজন হলে আম্মুকে বলবে, নাহলে আমাকে কল করে বলবে…!”
আর্য হঠাৎ চুপ করে গেল। কিছু একটা ভেবে আবার বলল—

– “তোমার তো ফোন নেই, কল করবে কীভাবে?”
আর্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর কিছু একটা মনে করে বলল—
– “আলমারির সেকেন্ড ড্রয়ারে আমার আরেকটা ফোন আছে, ওটা থেকে কল করবে। আমি এসে নতুন ফোন কিনে দেব। ওকে?”
পুষ্প আবারো মাথা নেড়ে সায় দিল। এতে এবার আর্য আলতো হাতে পুষ্পর চোয়াল চেপে ধরে বলল—
– “আল্লাহ তোমাকে মুখটা কেন দিয়েছে? কথা বলার জন্য! তাহলে কথা বলার জায়গায় এভাবে বারবার মাথা নাড়ছ কেন? এখনো হিউম্যান বডির কোনো পার্ট কীভাবে ইউজ করতে হয় সেটাও জানো না! আর এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করলে, বিয়ের পর কী কী হয় জানো?”
আর্যর আকস্মিক কথায় পুষ্প কিছু বুঝতে পারল না, সে বোকা বোকা সরল চোখে তাকিয়ে রইল আর্যর দিকে। পুষ্পর এই বোকা বোকা চাহনি দেখে আর্য চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ের এই চাহনি তাকে অস্থির করে তুলছে। ইদানীং এটা একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে; এই মেয়ের কাছে থাকলে একরকম অশান্তি, দূরে থাকলে আরেক রকম অশান্তি—কোনোদিকেই শান্তি নেই। দূরে গেলে কাছে আসতে মন চায়, আবার কাছে আসলে… আর ভাবতে পারল না আর্য। পুষ্পর চোয়াল ছেড়ে দিয়ে বলল—

– “সবসময় এরকম থাকবে, ওকে? তোমাকে এখন কিছু জানতে হবে না, যখন সময় আসবে আমিই শিখিয়ে দেব। শুধু এতটুকু ম্যাচিউর হও যাতে বাইরে গেলে কেউ তোমার সরলতার সুযোগ নিতে না পারে। সেফলি যেন বাড়িতে ফিরে আসতে পারো! এখন রেডি হয়ে নাও, চলো।”
পুষ্প আর কিছু বলল না। চুপচাপ রেডি হয়ে ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রুম থেকে বেরোতে লাগল। আর্যও পুষ্পর পেছন পেছন বেরিয়ে গেল। সে আজকে অফিসে যাবে না, এগারোটায় তার ফ্লাইট। এখন সে সবাইকে তার এই বিজনেস ট্রিপের কথা জানিয়ে দেবে।

সবাই টেবিলে বসে নাশতা করছে। পুষ্প আর আর্যকে নিচে নামতে দেখে নিশির খাওয়ার হাত থেমে গেল। তবে কিছু বলল না, মিনারা বেগমও এক পলক তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে খাওয়া শুরু করলেন। পুষ্প প্রতিদিনের মতো গিয়ে শেহনাজ সরকারের পাশের চেয়ারে বসল। আর্যর পাশের চেয়ারে বসে আছে নিশি, তবে আজকে আর্য নিজের চেয়ারে বসল না; গিয়ে পুষ্পর পাশে শেহনাজ সরকারের খালি চেয়ারটাতে বসল। হঠাৎ আর্যকে শেহনাজ সরকারের চেয়ারে বসতে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল আর্যর দিকে। এতে আর্যর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না, সবাই নিজেদের সামলে নিয়ে আবার খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
তবে আর্যকে পুষ্পর পাশে বসতে দেখে নিশি রাগে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে, পারলে পুষ্পকে চিবিয়ে খায়। তবে নিজেকে সামলে নিল; তাকে যা করতে হবে খুব সাবধানে করতে হবে। এদিকে শেহনাজ সরকার অবাক হলেও বেশ খুশি হলেন ছেলের পরিবর্তনে। আর্য একবার সবার দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বলল—

– “আব্বু, এগারোটায় ফ্লাইট আমার।”
আর্যর কথা শুনে আমজাদ সরকারের বুঝতে অসুবিধা হলো না আর্য কোন ফ্লাইটের কথা বলছে। ওনার কাছে ইমেইল এসেছিল যে ওনাদের প্যারিসের ব্রাঞ্চে ভিজিট করতে যেতে হবে—সেটা আর্যই যায়। তিনি স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলেন—
– “তো সব গুছগাছ করেছ?”
আর্য ‘হুম’ বলে খেতে থাকে। একবার আড়চোখে পাশে বসা পুষ্পর দিকে তাকাল। পুষ্প মনোযোগ দিয়ে খেতে ব্যস্ত, যেন চারপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার কোনো খবরই নেই। এতে পুষ্পর ওপর মনঃক্ষুণ্ণ হলো আর্য। সে সাত দিনের জন্য প্যারিস যাচ্ছে, এই মেয়ের কি একটুও মন খারাপ হচ্ছে না? এত স্বাভাবিক আছে কী করে? আবার নিজেকেই বোঝাল, তাদের মধ্যে তো স্বাভাবিক কোনো কাপলদের মতো কিছু নেই, তাই মন খারাপ কেন হবে? তবুও কোথাও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—সত্যিই কি একটুও মন খারাপ করবে না মেয়েটা? সে চলে গেলে কি তার বিন্দুমাত্র অভাব বোধ করবে না?

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৬

সবাই নাশতা শেষ করে যে যার কাজে চলে গেল। শেহনাজ সরকার পুষ্পকে ড্রাইভারের মাধ্যমে কলেজে পাঠিয়ে দিয়ে নিজে আর্যর রুমে গেলেন ছেলের গোছগাছ কতদূর তা দেখতে। এদিকে নিশি যেন না চাইতেই হাতে চাঁদ পেয়ে গেল। আর্য এখন পুষ্পর আশেপাশে থাকবে না, তাকে যা করতে হবে এই সাতদিনের মধ্যেই করতে হবে।

অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here