অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৭
ফাহিমা ইসলাম
দিবাভাগ আজ প্রখর রৌদ্রের দহনময় আধিপত্যে নিমজ্জিত। আকাশজুড়ে একফোঁটা মেঘের অস্তিত্ব নেই; যেন নীলিমার বিশাল ক্যানভাসে সূর্য আপন প্রখরতা উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে। উত্তপ্ত বায়ুর ঢেউ স্থবির বৃক্ষরাজির পাতায় পাতায় ক্লান্তির ছাপ এঁকে দিচ্ছে। অথচ এই দহনময় দুপুরের মাঝেও কিছু মানুষ থাকে, যাদের অন্তরে সংসারের ক্ষুদ্র সুখে এমনভাবে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে যে বাহ্যিক তাপদাহ তাদের স্পর্শ করার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। সেই মানুষদের একজন তূর্ণা। রান্নাঘরজুড়ে ছড়িয়ে আছে মসলার মনোহর ঘ্রাণ। তূর্ণা তার শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে একমনে রান্না করে চলেছে সে।গলায় সূক্ষ্ম সোনালি চেইন,সমস্ত সত্তাজুড়ে যেন এক প্রশান্ত গৃহলক্ষ্মীর আবির্ভাব ঘটেছে তার মাঝে। চুলগুলো খোঁপায় আবদ্ধ হলেও কানের পাশে কয়েকটি অবাধ্য গোছা বারবার উড়ে এসে গাল স্পর্শ করছে।
একটা সময় ছিল যখন তার দৃষ্টিতে স্থায়ীভাবে বাস করতো শূন্যতা। হাসি ছিল ক্ষণস্থায়ী, অনুভূতি ছিল বিক্ষিপ্ত। অথচ আজ সে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজ সে কারো জন্য দুপুরের খাবারে কোন পদটি বেশি পছন্দ হবে, সেই চিন্তায় ব্যস্ত। জীবন সত্যিই বিস্ময়কর! কখন কাকে কোথায় এনে দাঁড় করাবে সেটা বোঝা বড়োই মুসকিল! রৌদ্রিকের নিঃশর্ত ভালোবাসা যেন ধীরে ধীরে তূর্ণার অন্তর্গত ভাঙাচোরা অংশগুলোকে জোড়া লাগিয়ে দিয়েছে। এখন আর সে এলোমেলো চুলে উদাসীন হয়ে ঘুরে বেড়ায় না। এখন তার পরিধানে থাকে স্নিগ্ধ শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি, আর মুখভর্তি প্রশান্তির আভা। সে এখন সত্যিই একজন গৃহিণী, রৌদ্রিকের গিন্নী, রৌদ্রিকের বউ!
তার সৌন্দর্যেও এসেছে এক অপার্থিব পরিবর্তন। পূর্বের নিষ্প্রভ মুখশ্রী আজ অদ্ভুত কোমল আলোয় দীপ্ত। ভালোবাসা বোধহয় এমনই,এটি কেবল একটা হৃদয়কে নয়, মানুষটিকেও সুন্দর করে তোলে। তার হাসিতে এখন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আছে, চোখে আছে আপন ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার প্রশান্তি। রৌদ্রিকের পছন্দের বিরিয়ানির রান্নায় ব্যস্ত, রুমা সিকদার তাকে সব শিখিয়ে দিয়েছে। সেই অনুযায়ী রান্নায় ব্যস্ত, তার পাশে চেয়ারের উপর বসে রোদেলাও হেল্প করছে। শ্বাশুড়িদের কাছ থেকে এখন সে টুকটাক রান্না শিখেছে। সেইগুলোই মাঝে মাঝে রান্না করে খাওয়ায় সবাইকে সে, আজকে বিরিয়ানির রান্না করে রৌদ্রিকের হসপিটালে নিয়ে যাবে। বিরিয়ানির দম দেওয়া শেষ, রান্না শেষ হওয়ায় এতক্ষণ সালাদ বানাচ্ছিলো। কাজ শেষ হতেই রোদেলাকে কোলে তুলে নিলো।
“ চল পুতুল তোমাকে আগে গোসল করিয়ে দেই, তারপর পাপার হসপিটালের সারপ্রাইজ দিতে যাবো।”
রোদেলা ভদ্র বাচ্চার মত মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়। রোদেলাকে নিয়ে কক্ষে দিয়ে জামা-কাপড় নিয়ে রোদেলাকে নিয়ে গোসলে চলে যায়।
তূর্ণা পরিধান করলো হালকা আকাশি রঙের একটি সুতির শাড়ি। পিঠ ছাপিয়ে নেমে আসা ঘন কালো চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে একপাশে নিয়ে রাখলো। কানে ছোট মুক্তোর দুল, হাতে কাঁচের চুড়ি, ঠোঁটে হালকা হাসি। কোনো ভারী সাজ নয়। তবুও তাকে দেখলে মনে হচ্ছে, সংসারের সুখ যেন নারীর রূপ ধারণ করে তার মাঝে অবতীর্ণ হয়েছে।অন্যদিকে রোদেলার জন্যও তার সঙ্গে মিল রেখে ছোট্ট সাদা-নীল ফ্রক পরিয়ে দিয়োছো। চুল দু’পাশে ভাগ করে ছোট ছোট ঝুঁটি বাঁধতেই সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল।
“ মা. আমি তুন্দুল?”
তূর্ণা হাসিমুখে তার নাক টিপে দিল।
“ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। আমার পুতুল যে তুমি”
রোদেলা গর্বিত ভঙ্গিতে কোমরে হাত রেখে দাঁড়ালো।
“ পাপা তালপ্রাইজ পেয়ে, খুতি হয়ে যাবে।
তূর্ণা হেসে ফেললো।
“ তাই নাকি?”
“ হুম!”
বলেই ছোট্ট দুই হাত বাড়িয়ে তূর্ণার গলা জড়িয়ে ধরলো সে।
এক মুহূর্তের জন্য তূর্ণার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কোমলতায় ভরে উঠলো। একসময় জীবন তাকে শুধু অন্ধকার দেখিয়েছিল। অথচ আজ তার পৃথিবী জুড়ে রয়েছে একজন ভালোবাসার মানুষ আর একটি ছোট্ট নিষ্পাপ প্রাণ। জানালার বাইরে প্রখর রৌদ্র এখনো জ্বলছে। কিন্তু তূর্ণার অন্তর্জগতে আজ কেবলই শান্তির ঋতু। কারণ কিছু মানুষ থাকে, যাদের ভালোবাসা ভাঙা আত্মাকেও পুনর্জন্ম দিতে পারে। আর রৌদ্রিক ঠিক তেমনই একজন মানুষ। যার সান্নিধ্যে তূর্ণা কেবল সুস্থই হয়নি,বরং নতুন করে বাঁচতে শিখেছে। রৌদ্রিক তাকে শাড়ি পরতে আর বারণ করে না, কারণ সে তো এখন রৌদ্রিকের বউ। আগে নাহয় পিচ্চি বলে তাকে, শাড়ি পরা থেকে বারণ করতো। কিন্তু তূর্ণা এখব রৌদ্রিকের বারণ শোনে না।
হাসপাতালের করিডোরজুড়ে তখন এক চিরচেনা ব্যস্ততার স্রোত প্রবাহমান। কোথাও নার্সদের দ্রুত পদচারণা, কোথাও চিকিৎসকদের গম্ভীর আলোচনার মৃদু গুঞ্জন, নিজের কেবিনে বসে আছে রৌদ্রিক। সামনে রোগীর ফাইলের স্তুপ। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন মেডিকেল রিপোর্টে নিবদ্ধ তার দৃষ্টি। কপালের মাঝ বরাবর হালকা ভাঁজ পড়েছে। গভীর মনোযোগে একটি রিপোর্ট পর্যালোচনা করছিল সে। ততঃপর হঠাৎই কেউ বক করে। দরজায় মৃদু শব্দ হতেই দৃষ্টি তুললো রৌদ্রিক।
“কাম ইন।”
পরক্ষণেই দরজার পাল্লা ধীরে সরে যেতেই, প্রথমে উঁকি দিলো ছোট্ট একটি মুখ। তারপর আরেকটি। দরজার আড়াল থেকে একইসঙ্গে উঁকি দিচ্ছে তূর্ণা এবং রোদেলা। দৃশ্যটা এতটাই অপ্রত্যাশিত ছিল যে রৌদ্রিক কয়েক সেকেন্ড কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাতে পারলো না।রোদেলাই প্রথম চিৎকার করে উঠলো—
“পাপপপপপপা!”
পরমুহূর্তেই ছোট্ট পা দুটো নিয়ে ছুটে গেল বাবার দিকে।
রৌদ্রিকের সমস্ত গাম্ভীর্য মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক গভীর, প্রশান্ত হাসি। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে মেয়েটাকে তুলে নিলো সে।
“আমার রাজকুমারী এখানে?”
রোদেলা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো।
“আনি মাকে নিয়া এতেছি।”
রৌদ্রিক ভ্রু তুললো।
“ওহ্, তাই নাকি?”
“হুম। মা পত তিনে না।”
কথাটা শুনে তূর্ণার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“পুতুল !”
ছোট্ট মেয়েটা আবারও বাবার কাঁধে মুখ গুঁজে হেসে উঠলো। রৌদ্রিকও হাসি চাপতে পারলো না। তার দৃষ্টি ধীরে গিয়ে স্থির হলো তূর্ণার উপর। আর মুহূর্তেই তার চোখদুটো যেন কিঞ্চিৎ গভীর হয়ে উঠলো। তূর্ণা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আকাশি রঙের শাড়ি, কপালে ছোট্ট টিপ, হাতে কাঁচের চুড়ির মৃদু ঝংকার, আর মুখজুড়ে এক অদ্ভুত লাজুক আভা। কিছু সৌন্দর্য থাকে যা অলংকারে নয়, প্রশান্তিতে ফুটে ওঠে। আজ তূর্ণাকে ঠিক তেমনই লাগছে। কয়েক সেকেন্ড নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রিক। তূর্ণা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠলো।
“এভাবে কি দেখছেন?”
রৌদ্রিক শান্ত কণ্ঠে বললো-
“ভাবছি।”
“কি?”
“আমার হাসপাতালে এত সুন্দর কাউকে ঢুকতে দেওয়া ঠিক হয়েছে কি না।”
এক মুহূর্তে তূর্ণার মুখশ্রী লাল হয়ে উঠলো।
“কি বলছেন এইসব!”
তার কণ্ঠে প্রতিবাদ থাকলেও চোখেমুখে স্পষ্ট লজ্জার ছাপ। রোদেলা অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকালো।
“মা লাল হইয়া গেতে কেনু?”
এইবার রৌদ্রিক সরাসরি হেসে ফেললো। আর তূর্ণা মনে মনে চাইলো মাটিটা ফেটে যাক। কিছুক্ষণ পর রোদেলাকে কোলে বসিয়ে নিজের চেয়ারে বসল রৌদ্রিক। সামনের চেয়ারটিতে বসলো তূর্ণা। তবে বসেও শান্তি নেই। কারণ রৌদ্রিকের দৃষ্টি বারবার তার দিকেই চলে যাচ্ছে। ফাইলে চোখ রাখলেও তূর্ণা অনুভব করতে পারছে। রৌদ্রিকের দৃষ্টি তার দিকেই রয়েছে,অবশেষে বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো-
“আপনি কাজ করবেন, নাকি শুধু তাকিয়ে থাকবেন?”
রৌদ্রিক কলম ঘোরাতে ঘোরাতে উত্তর দিলো-
“দুটোই করছি।”
“মানে?”
“ফাইল দেখছি।”
“আর?”
“আমার বউকেও দেখছি।”
তূর্ণা প্রায় কাশতে বসলো। রোদেলা আবারও কৌতূহলী হয়ে উঠলো।
“ পাপা, বউ কি?”
রৌদ্রিক অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বললো-
“যাকে দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছা করে।”
রোদেলা কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করলো।তারপর তূর্ণার দিকে আঙুল তুলে বললো,
“তাইলে মা বউ।”
“একদম ঠিক।”
তূর্ণা এবার সত্যিই আর সহ্য করতে পারলো না।
“আপনারা দুজন আজকে আমাকে জ্বালানোর জন্য একসাথে হয়েছেন?”
রৌদ্রিক নির্দোষ মুখে বললো-
“আমি তো সত্যিই বলছি।”
“আনিও কিতু করিনি।”
রোদেলাও সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলো। বাবা-মেয়ের একজোট হওয়া দেখে তূর্ণা ভীষণ অসহায় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিন্তু সেই দীর্ঘশ্বাসেও বিরক্তির চেয়ে সুখের পরিমাণই বেশি ছিল। কারণ এই মুহূর্তগুলো,এগুলো কোনো বড় ঘটনার অংশ নয়। না আছে নাটকীয়তা, না আছে অসাধারণ কোনো বিস্ময়।
তবুও এদের মূল্য অসীম। কারণ কখনো কখনো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায়গুলো লেখা হয় এমনই ছোট্ট ছোট্ট মুহূর্ত দিয়ে। তূর্ণা টেবিলের উপর খাবারের বাটি রাখলো, একে একে মা-মেয়ে তোতাপাখির মত বলতে শুরু করে দিয়েছে তারা কি কি করেছে। রৌদ্রিক বাসায় ফিরলে এই তোতাপাখি দু’টো সারাদিনের বর্ণনা তাকে দিবে, তারা কি করেছে, কেনো করেছে। রৌদ্রিকের কাজ হলো তাদের কথা মন দিয়ে শোনা, রৌদ্রিক বিরক্ত হয় না কোনোদিনও এইসবে। বরং তার ভালো লাগে এইসব শুনতে।
দুপুর গড়িয়ে অপরাহ্নের শেষভাগ।আকাশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিবর্ণ সোনালি আলো,যেন দিবাকর বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে ধরণীর বুকে শেষবারের মতো স্নেহস্পর্শ রেখে যেতে চেয়েছে। বারান্দার একপ্রান্তে নিঃশব্দে বসে রয়েছেবরূপা। সামনের চায়ের কাপের ধোঁয়া বহুক্ষণ পূর্বেই মিলিয়ে গেছে,তবু সে তাতে একবারও চুমুক দেয়নি। তার শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে বহুদূরের আকাশসীমায়,কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে কিছুই দেখছে না।তার অন্তর্দৃষ্টি এখনও বন্দি হয়ে আছে সেই রাতের অপমানের প্রাচীরে। রৌদ্রিকদের বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকে যেন তার ভেতরের সমস্ত কোলাহল হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। একসময় যে অহংকারকে সে অলঙ্কারের ন্যায় ধারণ করতো,আজ সেই অহংকারই তার বক্ষগহ্বরে কণ্টকমালার ন্যায় বিঁধছে। সহসাই পিছন থেকে ভেসে এলো শান্ত পদধ্বনি। পিছনে না ফিরেই বুঝতে পাটলো এটা তূর্য,কোনো কথা না বলে এসে রূপার পাশের চেয়ারটিতে বসল সে।কিছুক্ষণ নীরবতা মুখরিত রইলো মুহুর্তটা।
“ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় কখন জানো?”
হঠাৎ শান্ত,গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করলো তূর্য। রূপা নির্বিকার রইলো। তূর্য মৃদু হাসলো।
“ যখন সে বুঝতে পারে,যাকে অবহেলায় হারিয়েছে,সে আসলে তার প্রাপ্যের চেয়েও মূল্যবান ছিল।”
বাক্যটি শুনে রূপার ভেতরটা কেঁপে উঠলো।চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।
“ উপদেশ দিতে এসেছেন?”
কর্কশ শোনালো কণ্ঠস্বর,তূর্য মাথা নাড়লো।
“ না।শুধু ভাবছিলাম,অনুতাপ বড় অদ্ভুত জিনিস।এটা মানুষকে কাঁদায় না,বরং প্রতিদিন একটু একটু করে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়।”
রূপা এবার মুখ ফিরিয়ে তাকালো তার দিকে। চোখদুটি লালচে আকার ধারণ করেছে, রূপা ঠোঁট কামড়ে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে-
“ সবাই কেন ভাবছে আমি অনুতপ্ত?”
মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলো সে।তূর্য কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“ কারণ আপনার চোখ আপনার হয়ে উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।”
বাতাস হঠাৎ একটু জোরালো হয়ে উঠলো।রূপার কপালের উপর পড়ে থাকা চুল উড়ে এলো মুখের সামনে। রূপা ধীরে চোখ নামিয়ে ফেললো। আজ বহুদিন পর তার মনে হলো,সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে নির্মম শাস্তি প্রতিশোধ নয়,বরং সেই দৃশ্যটা,যেখানে নিজের হাতে হারিয়ে ফেলা মানুষটিকে অন্য কারো প্রতি নিঃশর্ত যত্নশীল হতে দেখা যায়। আর তূর্য? মানুষটা তার হয়েও কোথাও যেনো, তার নয়। লোকটা তাকে ডিভোর্সও দিবে না। আবার কাছে টেনেও নিবে না, এইসবের কারণ কি? তার বন্ধুর সঙ্গে প্রতারণার কারণ কি হতে পারে?
” আপনি কি আপনার বন্ধুর সঙ্গে হওয়া প্রতারণার প্রতিশোধ নিচ্ছেন?”
রূপার প্রশ্নে তূর্যের মুখাবয়বের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো। তার দৃষ্টি আকাশপানে চেয়ে আছে।
“ আপনি আমার বন্ধুর এক্স বাগদত্তা ছিলেন সেটা আমি জানতাম না বিয়ের আগে। তাহলে প্রতিশোধ নিবো কিভাবে? রৌদ্রিকের বিয়ের সময় আমরা অনেক বন্ধুই উপস্থিত ছিলাম না।”
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩৬
” তাহলে যা কিছু করছেন ইচ্ছে করে? আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য?”
” আপনার সঙ্গে কিছু হওয়ার মত কি সম্পর্ক আমাদের মিসেস তূর্য?”
তূর্য তার তীক্ষ্ণ ধূসর নেত্রজোড়া রূপার দিকে তাক করে, প্রশ্নটা করতেই কেঁপে উঠলো সে। রূপা নিজেই হকচকিয়ে গেছে। সত্যি না সে এই বিয়েতে আগ্রহী ছিল না,আর না যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে তার সম্পর্কের জানার। তূর্যকে যতটুকু চিনেছে এই কয়েকদিনে, বিয়ের একটা রাতও যদি তারা ঠিক মত কথা বলে থাকে। তারপর সে তার বাবার বাড়িতে চলে যাওয়ার পর, এই বাড়ির মুখ হয়নি। তাদের সম্পর্কের মাপকাঠি বিয়ে অব্দিই সীমাবদ্ধ, এর বেশি তারা কেউ-কাউকে না চেনে আর না জানে।
