Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫ (২)
ফাহিমা ইসলাম

রাত্রির শেষ প্রহর পেরিয়ে ফজরের আজানও অনেকক্ষণ পূর্বেই স্তব্ধ হয়েছে। অথচ প্রভাত যেন আজও পূর্ণরূপে জাগ্রত হওয়ার অনুমতি পায়নি। ধূসর আলোয় আবৃত আকাশের নিচে নিস্তব্ধ পৃথিবীটাকে দেখে মনে হচ্ছে, সূর্য নিজেও যেন কোনো গভীর শোকের দায় কাঁধে নিয়ে দিগন্তের আড়ালে নির্বাক হয়ে বসে আছে। ক্লান্ত নিশ্বাস নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো তূর্ণার বুক চিরে। গত সমগ্র রজনী সে এক মুহূর্তের জন্যও শয্যার আশ্রয় নেয়নি। সারা রাত একটি মুহূর্তের জন্যও চোখের পাতা এক করতে পারেনি তূর্ণা। নামাজের পাটিতে এখনো বসে রয়েছে। অসংখ্য দীর্ঘ সিজদা, অসংখ্য মুনাজাত, আর অসংখ্য নির্বাক কান্নায় পাটিটির একাংশ ভিজে গাঢ় বর্ণ ধারণ করেছে। চোখ দুটো এতটাই ফুলে উঠেছে যে পাপড়ি তুলতেই যেন অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে।
দীর্ঘক্ষণ অশ্রুপাতের ফলে নীলচে শিরাগুলো চোখের শুভ্রতার ওপর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিবর্ণ ঠোঁটদুটো রক্তশূন্য, মুখমণ্ডল অস্বাভাবিক রকমের ফ্যাকাশে। গতকাল রাত পর থেকে একফোঁটা খাবার পর্যন্ত মুখে তোলেনি সে। অবিরাম মানসিক অভিঘাত আর উপবাসে শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে গেছে। রৌদ্রিক উপস্থিত থাকলে হয়তো এই দসা তার কোনোদিনও হতো না, মানুষটা তার প্রতিটি মুহুর্ত শুক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করে।

রৌদ্রিক যদি জানতো তার অনুপস্থিতিতে নিজের এমন অবস্থা করেছে মানুষটা তার দিকে তাকাতো না অব্দি, কিন্তু তূর্ণার অবুঝ মন এইসব কিছু মানতে নারাজ তার মন পরে আছে সুদূর সেই হসপিটালে থাকা মানুষটার উপরে। কেউ তাকে কিছুই বলছে না, তবে তূর্ণা ঢের বুঝতে পারছে তার বর ভালো নেই। এইসব ভাবতে ভাবতে তূর্ণার মুনাজাতের মধ্যে আবারও ফুঁপিয়ে উঠলো। সারা রাত রৌদ্রিকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য করা প্রতিটি দোয়া যেন তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণের ভাষান্তর ছিল। চোখের জলে ভিজে গেছে জায়নামাজের অর্ধেক অংশ, অথচ আল্লাহর দরবারে নিবেদিত আকুতিগুলোর শেষ হয়নি একবারের জন্যও।
জায়নামাজে বসে থাকায় তূর্ণার অশ্রুসজল দৃষ্টি বারবার স্থির হয়ে যাচ্ছে সেই দরজাটার দিকে, যেদিক দিয়ে প্রতিদিন সময় করে রৌদ্রিক ঘরে ফিরত। মস্তিষ্ক বাস্তবতাকে মেনে নিতে শুরু করলেও হৃদয় এখনো নিষ্ঠুরভাবে অস্বীকার করে চলেছে। প্রতিটি ক্ষণ তাকে বিভ্রম দেখাচ্ছে যে, এই বুঝি দরজার ওপাশে পরিচিত পদধ্বনি শোনা যাবে, এই বুঝি গভীর কণ্ঠে কেউ বলে উঠবে
“রোদ,তূর্ণা!”

কিন্তু প্রতিবারই সমস্ত প্রতীক্ষা গিয়ে ঠেকে একরাশ নির্মম নৈঃশব্দ্যের কাছে। হঠাৎ ই তখন সেখানে উপস্থিতি হলো রোদেলা, তার পা দু’টো দুলছে টলমলে।
দরজার চৌকাঠ অতিক্রম করতেই তার নিষ্পাপ দু’চোখ স্থির হয়ে গেল জায়নামাজের ওপর বসে থাকা তূর্ণার দিকে। তূর্ণা আবারও কাঁদছে, ঘুমানোর আগে তূর্ণাকে অনেক কাঁদতে দেখেছে। কিন্তু কেন কাঁদছে,সে জানে না। নরম নরম টলমলে পায়ে হেঁটে তূর্ণার কাছে এসে দাঁড়ালো সে। ঘুম থেকে উঠেই প্রতিদিনের মতো সে প্রথমে নিজের পাপাকে খুঁজেছে। পুরো বাড়ি ছোট ছোট পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেছে। ড্রয়িংরুম, বারান্দা, ডাইনিং কোথাও নেই তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা। রাতেও সে ইরা আর সায়রা বেবির সঙ্গে ঘুমিয়েছে, তূর্ণার তখন তার পাশে ছিলো। কিন্তু তূর্ণা কান্না করছিলো তাকে বুকে জড়িয়ে। রোদেলার শিশুমস্তিষ্ক এখনো মৃত্যু, দুর্ঘটনা কিংবা হাসপাতালের নির্মম অভিধান পড়তে শেখেনি। সে শুধু জানে, প্রতিদিন সকালে তার পাপা তাকে কোলে তুলে ঘোরায়।
আজ সেই মানুষটা নেই। সব জায়গায় খুঁজেছে সে ঘুম থেকে উঠেই, কিন্তু রৌদ্রিকের দেখা মিলেনি তার। তার পাপা আগে এসে তার ঘুমটাও ভাঙিয়ে দেয়নি। তাই তার মনটাও ভীষণ রকমের খারাপ, তাই মুখ ভার করে ধীর পায়ে মায়ের কাছে এগিয়ে এলো রোদেলা। তূর্ণার কাছে যেতেই আবারও তার গাল বেয়ে টুপটাপ অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়তে দেখে গোলগাল মুখখানা কুঁচকে গেল তার। শিশুরা কান্নার কারণ বোঝে না, কিন্তু প্রিয় মানুষের কষ্ট ঠিকই অনুভব করতে পারে। নরম,ছোট্ট আঙুল ডগা দিয়ে মায়ের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া উষ্ণ অশ্রুবিন্দুগুলো যত্ন করে মুছে দিলো। হঠাৎ নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে তূর্ণার ঘোর থেকে বের হয়ে এলো। এইদিকে রোদেলা মায়ের ভেজা গাল স্পর্শ করে অত্যন্ত আদুরে স্বরে বলল-

“ মা কাঁতে না। তুমি কাঁতলে তোদের অনেক কত্ত হয়!”
কথাটা বলেই সে দুই হাত দিয়ে তূর্ণার মুখখানা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর ঠোঁট গোল করে ফুঁ দিয়ে মায়ের চোখের জল শুকিয়ে দেওয়ার নিষ্পাপ চেষ্টা করল।
“ব্যতা হইছে? আনি ফুঁ দেই… সব ঠিক হয়ে জাবে।”
তূর্ণার বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তেই ভেঙে অসংখ্য টুকরো হয়ে গেল। যে মানুষটার জন্য সারারাত আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে নিজের অস্তিত্বটুকু বিলিয়ে দিয়েছে, সেই মানুষটারই রক্তমাংসের ছোট্ট প্রতিচ্ছবি আজ নিজের নিষ্পাপ ভাষায় তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছে। অবচেতনেই দুহাতে রোদেলাকে বুকে জড়িয়ে ধরল তূর্ণা। এতটাই শক্ত করে, যেন পৃথিবীর সমস্ত বিপর্যয় থেকে নিজের শেষ আশ্রয়টুকুকে আড়াল করে রাখতে চাইছে। রোদেলা কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ছোট ছোট হাত দিয়ে বারবার তার পিঠে চাপড়ে দিচ্ছে।

“মা! কাঁতে না,তোদ আতি তো! তোদ এত্ত এত্ত আদল করে দিবো। কাঁতে না!”
তূর্ণা ঠোঁট কামড়ে কান্না দমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলো। রোদেলাকে বুকে চেপে কেঁপে উঠছে তূর্ণার দূর্বল দেহাবশেষটা। তূর্ণার মনে হচ্ছে স্বয়ং তার বর কাছে রয়েছে, রোদেলা ঠিক তার পাপার মতো। কাউকে কষ্টে দেখতে পারে না, ঢাল সরূপ দাঁড়িয়ে রয়েছে সর্বদা তার পাশে। এইযে এতক্ষণের বিক্ষিপ্ত মনটা শান্ত হলো কিছুটা, রোদেলা এখনো চুপটি করে লেপ্টে রয়েছে তূর্ণার বক্ষস্থলে। বড্ড আড়ামের জায়গায় এটা তার, পাপার পর তূর্ণার বক্ষেই রোদেলা শান্ত হয়। হয়তো কিছু সম্পর্ক থাকে, যা রক্তের চেয়েও বেশি। যাকে বলে আত্মার সম্পর্ক, তারা সবাই তো রক্তে গড়া মানুষই, তাই রক্তের মিল থাকলেই সে টান আসবে এমনটা কোথায় লিখা রয়েছে। এইযে সে আর রোদেলাকে একে-অপরকে সঙ্গে মিশে আছে, কেউ কি বলতে পারবে এটা তার সন্তান নয়। তার গর্ভের প্রথম সন্তান না হলেও তার ভাগ্যের অপরূপ মূল্যবান সম্পদ হলো রোদেলা। তাকে খুব ভাগ্য করেই তূর্ণা পেয়েছে।
রোদেলা কিছুখন পর তূর্ণার বুকে মিশে থেকেই প্রশ্ন করে-

“ পাপা আতেনি কেনু? পাপা কখন আতবে মা? আমলা তো অনেত মজা করবো তাই না?”
নিষ্পাপ প্রশ্নটি শুনে তূর্ণার দম আটকে এলো। কণ্ঠনালী যেন কেউ অদৃশ্য মুঠোয় চেপে ধরেছে। উত্তর দেওয়ার মতো একটি শব্দও খুঁজে পেল না সে। শুধু রোদেলার নরম চুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করল। কারণ কখনো কখনো মানুষের জীবনে এমন কিছু প্রশ্ন আসে, যার উত্তর জানলেও উচ্চারণ করার সাহস থাকে না। তূর্ণা নীরব রইলো পুরোটা সময়, দূর্বল শরীরটাও আর সায় দিচ্ছে না, রুমা সিকদার,রোমান সিকদার বকাঝকা করে গেছে তাকে এমন না খেয়ে থাকায়। কিন্তু তাদের সে কি করে বোঝাবে এমন অবস্থা তার গলা দিয়ে একটা দানাও নামবে না।

দুপুর গড়িয়ে এসেছে অনেকক্ষণ। অথচ আজ সময় যেন তার স্বাভাবিক গতি ভুলে গেছে। বিশাল বাড়িটাজুড়ে এমন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, যেখানে কারও উচ্চস্বরে কথা বলার সাহস পর্যন্ত হচ্ছে না। ড্রয়িংরুমে উপস্থিত প্রত্যেকটি মুখে উৎকণ্ঠার গাঢ় ছায়া, প্রতিটি দৃষ্টিতে অনিশ্চয়তার নিঃশব্দ আর্তনাদ।
সকালের পর থেকে হাসপাতাল থেকে তেমন কোনো সুসংবাদ আসেনি। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা প্রত্যেকের মানসিক স্থৈর্যকে ক্রমশ ক্ষয় করে দিচ্ছে। সবাই চিন্তায় আছে, কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না।
ঠিক এমন সময় সদর দরজার বাইরে গাড়ির ব্রেক কষার কর্কশ শব্দ ভেসে আসতেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে সকলের দৃষ্টি একযোগে প্রবেশদ্বারের দিকে নিবদ্ধ হলো। পরক্ষণেই দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল শ্রাবণ। চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তির রেখা। এলোমেলো চুল, কুঁচকে যাওয়া শার্ট, আর রাতভর জেগে থাকা মানুষের মতো অবসন্ন অবয়ব যেন নিঃশব্দেই বলে দিচ্ছে। গত কয়েক ঘণ্টা তার ওপর দিয়েও কম ঝড় বয়ে যায়নি। তূর্ণা তখন সিঁড়ির ধাপে নিশ্চল বসেছিল। শ্রাবণকে দেখামাত্রই তার নিস্তেজ শরীরে যেন আচমকা প্রাণ ফিরে এলো। মুহূর্তের মধ্যে উঠে দাঁড়াতেই কয়েক ঘণ্টার উপবাসে দুর্বল হয়ে পড়া দেহটা দুলে উঠল। তবুও নিজেকে সামলে একরকম ছুটেই শ্রাবণের সামনে এসে দাঁড়াল সে। অধীর, কাঁপা, শ্বাসরুদ্ধ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল সে।

“শ্রাবণ ভাই, উ..উনি কেমন আছে? ডাক্তার কী বলেছে? ও… ওনি কি চোখ খুলেছে? আমার সঙ্গে একবারও কথা বলতে চায়নি?”
এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন করে থেমে গেল তূর্ণা।
তার কাঁপতে থাকা দুটি হাত অজান্তেই আঁকড়ে ধরেছে শ্রাবণের বাহু। চোখদুটোতে এমন এক অসহায় আকুতি, যেন এই পৃথিবীর সমস্ত উত্তর আজ একমাত্র এই মানুষটার কাছেই বন্দী। শ্রাবণ নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলো তূর্ণার আকুতি ভরা মুখশ্রী পানে। সে জানে,এই মুহূর্তে কোনো মিথ্যে আশ্বাস দেওয়া নিষ্ঠুরতা, আবার নির্মম সত্য উচ্চারণ করার মতো হৃদয়ও তার নেই। কিন্তু তূর্ণার অবস্থা দেখে সত্যিটা বলার সাহস ও হচ্ছে না তার। একটু থেমে ধীর স্বরে বলল,

“ভাবি… ডাক্তার এখনো পর্যবেক্ষণে রেখেছে। অবস্থা আগের চেয়ে স্থিতিশীল, তবে এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলার মতো সময় আসেনি। আপনি শান্ত হন, সবঠিক হয়ে যাবে।”
কথাটা শেষ করেও নিজের চোখ দুটো নিচু করে রাখল সে।কারণ তূর্ণার চোখের দিকে তাকানোর সাহস তার হচ্ছে না। অথচ তূর্ণা যেন সেই উত্তর শুনতেই পায়নি। তার অঊর জোড়া থরথর করে কেঁপে উঠল।
“আ… আমি ওনার কাছে যাবো, শ্রাবণ ভাই। এক্ষুনি নিয়ে চলুন আমাকে। এক.. একবার… শুধু একবার ওনাকে দেখব। দূর থেকে হলেও দেখব। আমি আর পারছি না।”
শ্রাবণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীর স্বরে আবারও বলে-
“ভাবি, আইসিইউতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছে না। ডাক্তার কড়াভাবে নিষেধ করেছে। আপনার না..
শ্রাবণের বাক্য ফুরানের আগেই তূর্ণা চিৎকার করে বলে ওঠে –
“আমি কিছু শুনতে চাই না!”

আচমকাই ভেঙে পড়ল তূর্ণার সংযমের প্রাচীর। কণ্ঠস্বর ভেঙে কান্নায় ডুবে গেল।
“কাল রাত থেকে একটা মুহূর্তও আমি চোখ বন্ধ করতে পারিনি। আপনারা কেউ আমাকে বরের কাছে নিয়ে যাচ্ছেন না। আল্লাহর কাছে শুধু একটা কথাই বলেছি— আমার মানুষটাকে ফিরিয়ে দিন। আমি ওনাকে না দেখে আর একটা মুহূর্তও থাকতে পারছিনা প্লিজ, আমাকে নিয়ে চলুন। আমি কোনো ঝামেলা করব না। দূর থেকে শুধু একবার দেখব। ওর হাতটা একবার ছুঁয়ে বলব আমি এসেছি… তারপর চাইলে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসব।”*

কথাগুলোর শেষে তার কণ্ঠ যেন নিজেই নিজের ভার বহন করতে পারল না। অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল অবিরাম। শ্রাবণের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
রৌদ্রিকের এখনো তেমন কোনো রেসপন্স নেই, কি হতে চলেছে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। কারো ফোনেই সেখানে চার্জ নেই, কালকে রাত থেকে সবাই না খাওয়া। তাই সবার জন্য খাবার নিতে এসেছে, কেউ খাবারা খাওয়ার পরিস্থিতিতে নেই। কিন্তু তারপরও এইভাবে থাকলে সবাই অসুস্থ হয়ে পারবে। তূর্ণা হঠাৎই দুই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“শ্রাবণ ভাই, আমি আপনার কাছে হাতজোড় করছি। আমাকে নিয়ে চলো। যদি আজও ওকে না দেখি, আমার দম বন্ধ হয়ে যাবে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর থেকে কেউ আমার প্রাণটা টেনে বের করে নিচ্ছে। আমি শুধু ওনার কাছে থাকতে চাই… শুধু ওনার কাছেই।”
চারপাশে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষ নির্বাক। শ্রাবণ কি বলবে খুঁজে পেলো না।

হসপিটালের সামনে গাড়ি থামা মাত্রই দ্রুত বেগে গাড়ির দরজা খুলে নেমে পরে তূর্ণা। কোনোদিকে না তাকিয়ে এলেমেলো পায়ে হসপিটালের ভিতরে চলে যায়, শ্রাবণ পিছনে পিছনে দ্রুত পায়ে তার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। পরে-টরে গেলে পরে সমস্যা হতে পারে। তিন তালায়া আসা মাত্রই বাহিরে রাশেদুল সিকদার আর বাকিদের দেখতে পায় তূর্ণা। তূর্ণা সেদিকে গিয়ে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করে-
“ বা..বাবা উনি কোথায়? আমায় একটু ওনাকে দেখতে দিন না!”
রাশেদুল সিকদার তূর্ণাকে এখানে আশা করেনি। ভালো করে তূর্ণাকে পর্যবেক্ষণ করতেই বুঝতে পারে মেয়েটার মনের অবস্থা। তিনি দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন, তূর্ণা বসার জন্য আদেশ করেন। বেশ দূর্বল লাগছে তূর্ণাকে, তারা সকলেই চিন্তিত সেখানে তূর্ণার এমন হাল হওয়াটা স্বাভাবিক। জবা সিকদার জ্ঞান হারিয়েছেন ছেলের চিন্তায়, তাকে আলাদা কেবিনে রাখা হয়েছে; আপাতত ঘুমের মধ্যে রয়েছেন।

“ শান্ত হও মা। এখানে বস, ডাক্তার আসুক তারপর দেখছি।”
তূর্ণা যেনো শান্ত হতে পারছে না, সবাই তাকে কেনো শান্ত হতে বলছে? এমন মুহুর্তে সে কি করে শান্ত থাকবে? কিছুখন পর সেখানে ডাক্তার এলেন।
“ ডাক্তার এখন আমার ছেলের অবস্থা কেমন? আপনারা কিছু বলছেন না কেনো?”
ডাক্তার অত্যন্ত গম্ভীর স্বরে বলেন-
“ দেখুন,আপাতত আমরাও কিছু বুঝতে পারছি না। পেশেন্টের কোনো বডি রেসপন্স এখন অব্দি পাওয়া যায়নি। আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যতই পেশেন্ট রেসপন্স না করে, তাহলে আমাদের হাতে কিছুই করার নেই। বাকিটা এখন আল্লাহ ভরসা!”
ডাক্তারের কথা শোনা মাত্র তূর্ণার যেন পাগল হয়ে উঠলো। ডাক্তার এসব কি বলছে? তূর্ণা তেজস্বী স্বরে বলে-
“ আপনি এমনটা কেন বলছেন? আমার বর একদম ঠিক হয়ে যাবে, শুধু শুধু কেন এসব বলছেন? আমি ওনার সঙ্গে দেখা করব, আমাকে ওনার সঙ্গে দেখা করতে দিন।”
বলতে বলতে তূর্ণা আইসিটির দিকে এগিয়ে গেলো। তাকে আটকানোর চেষ্টা করলেও তার থামার না নেই। কান্না করেই যাচ্ছে, তূর্ণা সবার দিকে অশ্রুসজল দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলে-
“ ডাক্তার আমায় ওনার কাছে যেতে দিন না! এ..একটু খানির জন্য দিন। আম..আমি কথা দিচ্ছি আমি কোনো শব্দ করবো না। একদম দূরে থাকবো, তাও আমাকে ওনার কাছে যেতে দিন। ও বাবা বলুন না ওনাকে, একটু খানি যেতে দিতে বলুন না।”

বলতে বলতে তূর্ণার দূর্বল শরীরটা পরে যেতে নিলে শ্রাবণ সামলে নেয়। সবারই খুব মায়া হলো, তাই ডাক্তারের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বললেন। প্রথমে তিনি যেতে দিতে চাননি, কিন্তু অনেক জোরাজোরির পর রাজি হওয়ায় তূর্ণা ভিতরে যাওয়ার অনুমতি পায়। তবে সেটা পাঁচ মিনিটের জন্য, তূর্ণা এতেই খুশি। কেবিনের ভিতরে প্রবেশ করা মাত্রই অক্সিজেন পরা মাক্সে রৌদ্রিকের ব্যান্ডেজ যুক্ত শরীরটা দেখে পায়। আশেপাশে আরও অনেক যান্ত্রিক জিনিস-পাতি রেয়েছে। তূর্ণার পা দু’টো কেমন অচল হয়ে গেছে, ঠোঁট কামড়িয়ে নিজের কান্নাকে দমানোর চেষ্টা করলো। কতখানি আঘাত পেয়েছে মানুষটা, চোখের পাতা কেমন ফুলে রয়েছে। সেখানটায় র’ক্ত শুঁকিয়ে গেছে।
ধীর পায়ে রৌদ্রিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দম বন্ধ হয়ে আসচ্ছে তার! বহু কষ্টে কান্না দমিয়ে রেখেছে সে, রৌদ্রিকে ক্ষতবিক্ষত হাতটার দিকে তাকিয়ে হালকা স্বরে বলে-

“ আপনার এই স্তব্ধতা আমাকে কাঁদাচ্ছে! শুনতে পাচ্ছেন? আপনাকে এমন স্তব্ধতায় মানায় না। আপনার গম্ভীর স্বরটা এইভাবে নিস্তব্ধ হয়ে আছে কেনো? আপনার শান্ত দৃষ্টির চাহনির মাদকতার নেশায় বুদ হতে পারছি না আমি। অথচ আপনি বলেছিলেন জলদি ফিরবেন! কিন্তু কথা রাখেননি আপনি। এতটাও জলদি ফিরতে বলিনি আমি আপনায়, যে এখানে নিস্তব্ধ হয়ে থাকবে হয়।”

কাঁদতে কাঁদতে রৌদ্রিকের ক্যানুলাযুক্ত ক্ষতবিক্ষত হাতটার উপর মাথা ঠেকালো। ইসস! এই হাতখানা দিয়ে মানুষটার কতশত স্পর্শ মিশে রয়েছে তার অস্তিত্বে। অথচ এই হাতখানা আজকে বাজে ভাবে ক্ষতবিক্ষত! কি বিচ্ছিরি ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে মানুষটার হাত দু’টো। তূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে রৌদ্রিকের ক্ষতবিক্ষত হাতখানিতে অসংখ্য চুমুর বর্ষণ করে দিলো। নেত্রপল্লব দিয়ে শ্রাবণধারার মত টপ টপ করে অশ্রুবারি ঝড়ছে। অথচ সামনে থাকার মানুষটা আজকে একটি বারের জন্য তার অশ্রু মুছে দিলো না অতি যত্নসহকারে! থামালো না তাকে কান্না করা থেকে। এই মানুষটা তার প্রতিদিনের একটা অভ্যাস! মানুষ কিভাবে তার অভ্যাস ছাড়া থাকতে পারে?

কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে মানুষটা মৃ’ত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। কতটা কষ্ট হচ্ছে মানুষটা, সহ্য হচ্ছে না রৌদ্রিকের এমন করুন অবস্থা! মানুষটা তার দিকে তাকিয়ে সেই শান্তিময় হাসি হাসচ্ছেনা। যে হাসি দেখার জন্য ব্যাকুল সে, অথচ মানুষটার ওষ্ঠপুটাও একই রকম ভাবে ক্ষতবিক্ষত। মানুষটা খাবার খাবে কিভাবে? ভীষণ জ্বালাপোড়া করবে তো! মানুষটা এত কষ্ট কিভাবে সে নিজ চোখে দেখবে। তূর্ণা দূর্বল শরীরটা সায় দিচ্ছে না, তবুও সে রৌদ্রিকের পাশ ছেড়ে উঠছে না। মনের দূর্বলতার কাছে শারিরীক দুর্বলতা যেনো ফিঁকে হয়ে গেছে।

“ ফিরে আসুন প্লিজ, কথা দিচ্ছি একদম আপনার লক্ষী বউটি হয়ে সব কথা মানবো। একদম অবাধ্য হবো না আপনার! একবার চোখ মেলে তাকান!”
কিন্তু রৌদ্রিক আজকে তাকালো, একটি বারের জন্যও না। তূর্ণার নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না, দূর্বল শরীরটা সেখানেই নেতিয়ে পরতে চাইছে। কিছুখন পরে ষেখানে একটা নার্স উপস্থিত হলো। তূর্ণা অবস্থা দেখে সে তাড়াতাড়ি করে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৫

” চলুন বাহিরে, পেশেন্টের সামনে এইভাবে কাঁদা যাবে না। আপনি মেবি প্রেগন্যান্ট তাই বেশি কান্না করবেন না, এটা আপনার আর বেবির জন্য ক্ষতিকর।”
তূর্ণার কানে কোনো শব্দই যায়নি, সে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে স্বামীর পানে। অথচ তার স্বামী তার দিকে তাকাচ্ছে না, তাকাতেও তো মানুষটার কষ্ট হবে। চোখের পাতায় কতখানি আঘার পেয়েছে! ইসস এত ব্যথা কেনো পাচ্ছে মানুষটা?

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৪৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here