Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪ (২)
ফাহিমা ইসলাম

চাঁদের রূপালি দীপ্তি আজ মেঘের শববস্ত্রে আবদ্ধ; তার অবশিষ্ট আলোটুকুও মৃতপ্রায় প্রদীপের শেষ কম্পনের ন্যায় কাঁপছে দিগন্তের প্রান্তসীমায়। মসজিদের অজুখানার শীতল জলে মুখ ধুতে ধুতে রৌদ্রিকের বুকের ভেতরে জমে থাকা ভার যেন আরও প্রকট হয়ে উঠল। প্রতিটি পানির ফোঁটা তার অস্থিরতাকে ধুয়ে নিতে পারল না; বরং আরও স্পষ্ট করে দিল নিজের অসহায়ত্ব। মসজিদের ভেতরে এখন গভীর নীরবতায় আবদ্ধ। রৌদ্রিক শুভ্র জায়নামাজের ওপর দাঁড়িয়ে তাকবিরে তাহরিমা বলতেই তার অন্তর কেঁপে উঠল।
আজকের সালাত অন্যসব দিনের মতো নয়। জায়নামাজের দাঁড়াতেই তার অশান্ত মনটা খালিকটা শান্তি মিললো বোধয়, আল্লাহ দরবারে দাঁড়ালে সে সকল দুশ্চিন্তার বেড়াজাল থেকে মুক্তি দেয়।
অনেক সময় নিয়ে রৌদ্রিক তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করলো। মনের মধ্যে থাকা ভাড় অনেকটা কমে এসেছে তার, দীর্ঘ সিজদায় কপাল মাটিতে ঠেকিয়ে রইল সে।

চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে ভিজিয়ে দিলো জায়নামাজের সাদা বুনন। অন্যদিনের তুলনায় আজকে রৌদ্রিকেট সিজদা থেকে মাথা উঠাতে মন চাইলো না, আজ সে শুধু এক অসহায় বান্দা। যে আল্লাহর দরবারে মিনতি করতে এসেছে, আল্লাহ চায় বান্দা তার নিকট হাত পাতুক, যাতে সে প্রাণ ভরে সেই মিতনি পূর্ণ করতে পারে। রৌদ্রিক অসহায় বান্দার হয়ে আল্লার নিকট বলে ওঠে-
“হে আল্লাহ! আপনি তো অন্তরের প্রতিটি অশ্রু দেখেন, প্রতিটি নীরব আর্তনাদ শুনতে পান। আমার স্ত্রীকে সুস্থতা দান করুন। যে নারী নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার সন্তানদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে, তার জীবনটাকে আপনার রহমতে নিরাপদ করে দিন। আমার ছোট্ট মেয়েটার দিকে রহমতের দৃষ্টি দিন, ইয়া রব। ওর ক্ষুদ্র বুকে আপনি শক্তি দিন, ওর প্রতিটি নিঃশ্বাস সহজ করে দিন। লাগলে আমার নিঃশ্বাস কে’ড়ে নিন তবুও আমার মেয়ে আর আমার স্ত্রীর উপর রহম করুন! ও যেন সুস্থ হয়ে তার মায়ের বুকে ফিরে যেতে পারে। আপনি চাইলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায়। তাই আজ আমার সমস্ত আশা, সমস্ত ভয়, সমস্ত অশ্রু আপনার কাছেই সঁপে দিলাম।”

দোয়া শেষ করেও উঠে দাঁড়াতে পারল না রৌদ্রিক।সিজদার ভঙ্গিতেই আরও কিছুক্ষণ স্থির রইল।কারণ যখন মানুষের নিকট যখন সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়, চারিদিকে অন্ধকারে হাহাকার হলেও আরশের মালিকের রহমতের দুয়ার কখনো সংকীর্ণ হয় না। আল্লাহ কখনো তার বান্দাকে ফিরিয়ে দেয় না খালি হাতে। রৌদ্রিক কিছু সময় পর উঠে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। এখন অব্দি সে ছেলেকে কোলে নেয়নি, দূর থেকেই দেখে গেছে। সবাই কত করে বললো তাকে কোলে নেওয়ার জন্য অথচ সে নেয়নি। তার দু’টো সন্তান একসঙ্গে পৃথিবীতে এসেছে সে কি করে অপর জনকে ছাড়া কোলে নিবে? বুকে আগলে নিলেও তার পিতা সত্তা শান্তি পাবে না। নিলে সে একসঙ্গে তার দু’টো প্রাণকেই নিবে।

হসপিটালের করিডোর দিয়ে হেটে সোজা একটা বড় কেবিনের সামনে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রিক। স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালের ওপাশে ইনকিউবেটরের ভেতর শুয়ে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণটাকে দেখেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল রৌদ্রিকের অন্তরাত্মা। ক্ষুদ্র বুকের ওঠানামা অস্বাভাবিক ধীর, শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্রের সহায়তায় চলছে। শিশুটির রেসপন্স আশঙ্কাজনকভাবে কম। রৌদ্রিক হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাইলো তবুও পারলো না, না চাইতেও অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো তার নেত্রজোড়া। তাকিয়ে থাকতে পারলো না সেদিকে বেশিক্ষণ। দ্রুত সরে গেলো সেখান থেকে। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো তূর্ণার কেবিনের দিকে,তূর্ণার জটিল সিজারিয়ান অপারেশনের ফলে দীর্ঘ রক্তক্ষরণের অভিঘাতে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে তার সমগ্র দেহ। অক্সিজেন মাস্কে ঢাকা ফ্যাকাশে মুখশ্রী, বিবর্ণ অধর, স্যালাইনের স্বচ্ছ ফোঁটাগুলো ধীরলয়ে শিরায় প্রবেশ করছে।যেন নিভে যেতে বসা এক প্রদীপকে শেষবারের মতো জ্বালিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রয়াস।

রৌদ্রিকের অসহায় মনে হলো নিজেকে আজকে বড্ড! একদিকে তূর্ণাও নিস্তেজ হয়ে শুয়ে রয়েছে অন্যদিকে সদ্য জন্মানো তার আর একটা পবিত্র ফুলও। বাড়ির সবাই তূর্ণা আর তাদের মেয়ে সন্তাকে নিয়ে চিন্তায় আছে। কি হবে বলা যাচ্ছে না, রৌদ্রিকের সারা মুখশ্রীতে নেমে এসেছে এক কালবৈশাখী ঝড়! লোচন জোড়া অসম্ভব রকমের লালচে আকার ধারণ করেছে। তূর্ণার কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে সে এই মুহুর্তে। বাড়ি থেকে রিনি, ইরা সবাই এসেছে। একে একে সবাই ছেলে বাচ্চাকে দেখেছে আর আদরও করছে। ছেলে বাচ্চাটা এখন ইনকিউবেটরে বাহিরে, সবার বসার জন্য আলাদা একটা কেবিন নেওয়া। রৌদ্রিক ইনকিউবেটরে ভিতর থাকা নিজের কন্যা সন্তাকে দেখে এসেছে তূর্ণার কেবিনের সামনে দাড়িয়েছে। হাতে থাকা টুপিটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললো।

ধীরে ধীরে আইসিইউর কেবিনে প্রবেশ করল রৌদ্রিক। তূর্ণার সামনে এসে দাঁড়ালো নিঃশব্দে। স্ট্রেচারের পাশে এসে কাঁপা হাতে আলতো করে মুঠোবন্দি করল তূর্ণার শীতল আঙুলগুলো। সেই স্পর্শে কোনো সাড়া নেই। তূর্ণার বন্ধ চোখের পাতাগুলো নিশ্চল, ঠোঁটদুটো বিবর্ণ, নিঃশ্বাসের ওঠানামাও কেবল যন্ত্রের পরিমিত শব্দে টিকে আছে। গভীর দৃষ্টিতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল সে। তূর্ণা জেগে থাকলো নিশ্চয়ই কান্না করতো মেয়ের এমন অবস্থা শুনে, তাদের ছেলে বড় সে মেয়ের পাঁচ মিনিট আগে দুনিয়াতে এসেছে। বাড়ির সবাই খুশির পাশাপাশি দুঃশ্চিন্তায় ভুগছে মা-মেয়ের অবস্থা নিয়ে। রৌদ্রিক কিছুক্ষণ পর অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে বললো-

” জলদি উঠে পরো, বাড়ি ফিরতে হবে। আমার ঘর যেনো তোমাদের ছাড়া বড্ড শূন্য হয়ে আছে। চড়ুই পাখির পাখির মতো কিচিরমিচিরে মুখরিত করতে হবে আমার নীড়। জলদি সুস্থ হও বউ! তোমরা দু’জন ফিরে আসো জলদি।”
বলতে বলতে আঙুলের ডগা দিয়ে তূর্ণার এলোমেলো কেশ সরিয়ে কপালে দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দিল সে।নিমিষেই চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল তূর্ণার হাতের পিঠে। এখানে কেউ উপস্থিত থাকলে হয়তো অবাক হতো, একমাত্র রোদেলা অসুস্থ হলে রৌদ্রিকে এতটা অসহায়, এলোমেলো দেখাতো। মেয়েকে সর্বদা বুকে জড়িয়ে থাকতো। এখন মেয়ের সঙ্গে আরও তিনটা মানুষ তার জীবনের সঙ্গে জুড়ে গেছে তাই চিন্তার বোঝাটাও বেড়ে গিয়েছে আগের থেকে।

ধরণিজুড়ে আজ এক ভিন্নতর প্রভাতের অভ্যুদয়। রজনীর অন্তিম প্রহরে সঞ্চিত তমসার স্তূপ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে ঊষার শুভ্র করুণাধারায়। রিনির কোলে করে বাচ্চাকে নিয়ে নিয়ে হাঁটাহাটি করছে, তারা এনআইডিইউর এর বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই রৌদ্রিকও অস্থির চোখে ভিতরে দেখার চেষ্টা করছে।
এনআইসিইউর স্বচ্ছ কাঁচঘেরা কক্ষে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা ক্ষুদ্র কন্যাশিশুটির শারীরিক সাড়া ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে এগিয়েছে। যন্ত্রের পর্দায় ভেসে ওঠা প্রতিটি সূচক আর আগের মতো আতঙ্ক জাগাচ্ছে না। ক্ষুদ্র বুকের ওঠানামা এখন তুলনামূলক নিয়মিত, ক্ষীণ আঙুলগুলো মাঝেমধ্যে নড়ছে, ক্ষুদ্র অধরও যেন জীবনের অস্তিত্ব ঘোষণা করতে চায়। ভিতরে থাকা নার্স সেখানে থাকা আরও কয়েকটা বাচ্চাকে দেখছে। কিছুখন পর নার্সের সঙ্গে ডাক্তারও বেরিয়ে এলেন। রৌদ্রিক দ্রুত সামনে এলো, রৌদ্রিকে দেখে ডক্টর হালকা স্বরে বলে-
“সম্পূর্ণ বিপদ কেটে যায়নি। তবে ওর রেসপন্স আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে।”

এই একটি বাক্যই যেন রৌদ্রিকের অন্তরজুড়ে জমাট বাঁধা অসংখ্য অন্ধকারকে ভেঙে দিলো। কয়েক মুহূর্ত সে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তার বিস্ফারিত দৃষ্টিতে একসঙ্গে মিশে রইল বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা, অবিশ্বাস আর অবর্ণনীয় স্বস্তি। স্বচ্ছ কাঁচের ওপাশে ইনকিউবেটরের ভেতর শুয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি আচমকা তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আঙুল নড়িয়ে দিল। নগণ্য সেই আন্দোলন যেন রৌদ্রিকের সমগ্র অস্তিত্বকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল। রৌদ্রিক কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করে বসে-
“ ও..ওকে কি একটু নেওয়া যাবে?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে ডাক্তার হাসলো হালকা। তিনি নার্সের দিকে তাকিয়ে বলে-
“ ওনাকে কিছুখনের জন্য দাও বেবিকে। আর হ্যাঁ খালি একজনই যেতে পারবেন, আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।”
রৌদ্রিকের মরুর মতো খা খা করা বক্ষপটে যেনো হালকা পানি এলো। রিনি এগিয়ে এলো, নার্সের দিকে তার কোলে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটাকে এগিয়ে দিয়ে বলে-

“ নিন, দুইজনকে ভাইয়া একসঙ্গে কোলে নিবে। ওকে নিতে তো সমস্যা নেই?”
নার্সটা হালকা হেসে অতি সাবধানে বাচ্চাকে কোলে নিলো। তারপর ধীরে দরজা খুলে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করল তারা। নার্সটা রৌদ্রিকের হাতের দিকে তার কোলে থাকা বাচ্চাটা এগিয়ে দিলো, রৌদ্রিক হাত কাঁপছে! রোদেলার থেকেও এরা ছোট মনে হচ্ছে তার নিকট। রৌদ্রিক নিলো অবশেষে নিজের ছেলেকে কোলে, নার্সটা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তার কন্যাকে কোলে তুলে দিল। সময়য়ের প্রবাহ যেন এই মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। রৌদ্রিকের অপর বাহুতে নার্সটা তার কন্যা সন্তাকে তুলে দিলো। প্রথমবারের মতো নিজের কন্যাকে বক্ষে আগলে নিল রৌদ্রিক। এত ক্ষুদ্র,এত কোমড়,এত উষ্ণ। রৌদ্রিক অশ্রুসিক্ত চোখে তার দু’টি অংশের দিকে তাকালো। তার বক্ষে মিশে থাকা ছোট্ট,ক্ষুদ্র প্রাণগুলো দেখতে একদম সদ্য পোটা গোলাপের মতো। গোলাপের পাপড়ির মতো নরম অধর, শিশিরে ভেজা কাশফুলের মতো শুভ্র কোমল ত্বক, অতি ক্ষুদ্র আঙুলগুলো বারবার বাতাস আঁকড়ে ধরার ব্যর্থ প্রয়াস চালাচ্ছে। চোখদুটি এখনো সম্পূর্ণ মেলেনি, অথচ আধখোলা সেই আঁখিপল্লবের ফাঁক দিয়েই যেন সমগ্র মহাবিশ্বের নিষ্পাপতম আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। রৌদ্রিক সতর্ক হাতে এক নবজাতকের কচি মুঠোয় নিজের তর্জনী ছুঁইয়ে দিতেই অবিশ্বাস্য দৃশ্য ঘটল। ক্ষুদ্র আঙুলগুলো সর্বশক্তি দিয়ে তার আঙুল আঁকড়ে ধরল।
মুহুর্তটুকুতে সময় যেন থমকে দাঁড়াল। রৌদ্রিকের সমগ্র সত্তা কেঁপে উঠলো নবজাতকের কোমল স্পর্শে। বুকের ভেতর অস্ফুট স্বরে উচ্চারিত হলো-

” পাপার কাছে চলে এসেছো আমার পাখিরা? পাপার যে বড্ড ভয় লাগছে তোমাদের স্পর্শ করতে। আমার স্নিগ্ধ পাখিরা!”
রৌদ্রিকের চোখ আজ অশ্রুর স্বচ্ছ আবরণে ঝাপসা হয়ে উঠেছে। সে তাকিয়ে রইলো, তার বুকের মধ্যে থাকা বিশাল একখান পাথর নামলো মনে হলো। কন্যা শিশুটা চোখ মেলে না তাকালেও তার হালকা নড়নচড়নে রৌদ্রিকের অশান্ত মনটা খালিকটা শান্ত হয়েছে। রিনি বাহিরে থেকে ফটাফট মুহুর্তটা ক্যামেরা বন্দী করে নিয়েছে। রৌদ্রিকের কণ্ঠনালী ভারী হয়ে এল। সে অত্যন্ত মৃদু স্বরে ফিসফিস করে বলল*
“ পাপার কাছে তাড়াতাড়ি আসবে হ্যাঁ? পাপার বুকটা তোমাদের জন্য খালিন হয়ে রয়েছে। দেখো আমি এসেছি…তোমার পাপা এসেছি। এতদিন শুধু তোমাদের জন্য অপেক্ষা করেছি। আর এর একটু করবো, তারপর আমার কাছে ফিরে আসতে হবে।”
শিশুটি আবারও ক্ষীণভাবে আঙুল নাড়ল। রৌদ্রিক যেন নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পেল।তার দুই বাহুতে দুই সন্তান। ডানদিকে তার রাজপুত্র। বামদিকে তার আর একটা প্রাণের রাজকন্যা। তার সমস্ত পৃথিবী যেন মুহূর্তেই সংকুচিত হয়ে এসে আশ্রয় নিল সেই দুটি ক্ষুদ্র প্রাণের নিঃশ্বাসে। রৌদ্রিক নীরবে মাথা নিচু করে দু’জনের কপালে একে একে দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিল। তার অধর কাঁপছে। তার চোখের অশ্রুবিন্দুগুলো গড়িয়ে পড়ছিল শিশু দুটির নরম কম্বলের ওপর।

“ তাড়াতাড়ি ফিরে এতো পাপার বুকে!”
নার্সটা কিছুখন পর নিয়ে নিলো কন্যা সন্তানকে।।আবারও ইনকিউবেটরের ভেতর রেখে দিলো। রৌদ্রিক কিছুখন চেয়ে থাকলো সেই দিকে, তারপর নার্সের সঙ্গে বেরিয়ে এলো। রৌদ্রিক বের হতেই রিনি দৌড়ে এসে হাসি মুখে বলে-
“ ভাইয়া চলো, ভাবির জ্ঞান ফিরেছে।”
রৌদ্রিক ছেলেকে নিয়েই সেদিকে পা বাড়ালো। একসঙ্গে দু’টো সুখবর পেলো। বুকের ভিতরে থাকা পাথরটা নেমে এসেছে অনেকটা। কেবিনে প্রবেশ মাত্রই রৌদ্রিক তূর্ণার ক্রন্দনরত মিশ্রিত মুখশ্রী দেখতে পেলো। নীল বর্ণ ধারণ করেছে মেয়েটা মুখশ্রী। রৌদ্রিক আসতেই তূর্ণা হালকা ফুঁপিয়ে উঠলো। কাঁদতেও কষ্ট হচ্ছে তার, গলার নিজের জায়গা যেনো প্রাণহীন মনে হচ্ছে। রৌদ্রিকের কোলে থাকা ছোট্ট সাদা রঙের মোড়ানো বাচ্চাটা দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-

“ ও..ওকে.. আমায় একটু দ..দিন!”
রৌদ্রিক এগিয়ে এলো ছেলেকে নিয়ে তূর্ণার কাছে। হাতে তূর্ণা বহু কষ্ট হাত পেতেছে সামনের দিকে, রৌদ্রিক অত্যন্ত সাবধানে এগিয়ে দিলো ছোট্ট প্রাণটাকে তার মায়ের কোলে। তূর্ণাকে বাচ্চাকে কোলে নেওয়া মাত্রই শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো। তাকালো নিজের মধ্যে থাকা ছোট্ট প্রাণটার দিকে। কেমন চোখ মেলে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। তূর্ণা তার ফ্যাকাশে অধরজোড়া কোমল ললাটে ছুঁইয়ে দিলো। মুহুর্তেই মনে হলো তার এতো কষ্ট,এতো ব্যথা এই সুখের কাছে কিছুই নয়! তূর্ণার হঠাৎ কিছু একটা মাথায় আসতেই সে চমকে জিজ্ঞেস করে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৪

“ আর..আর একজন কই আমার?”
রৌদ্রিকের মুখটা কিছুটা মলীন হলো। সে একটা শুঁকবো ঢোক গিলে বলে-
“ আছে!”
” তাহলে ওকে আনুন! আর আ..আমার রোদ কোথায়? ব..বেবিকে কোলে ন..নিয়েছে,,আহহ!!”
কথা বলতে বলতে তূর্ণা আর্তনাদ করে উঠলো ব্যথায়।
“ আছে, কথা বলো না আরও ব্যথা পাবে!”
” ওদের আ..আনুন তাহলে।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here