অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯
ফাহিমা ইসলাম
সকাল থেকেই সারা বাড়িতে তোরজোর শুরু হয়ে গেছে। রিনি, রোহান, শ্রাবণ, বাড়ির সকলেই মিলে বাগানে চড়ুইভাতির আয়োজনে মেতে আছে। সব কাজিনরা একসঙ্গে হলে তারা একদিন হলেও চড়ুইভাতির আয়োজন করবেই করবে। এইদিন বাচ্চারা মিলেই সব রান্না-বান্না করে। বড়রা সব তাদের মত গল্পগুজবে মেতে থাকে। আজকের দিনটা বেছে নিয়েছে তাদের চড়ুইভাতির জন্য, আজকেট দিনটা বেশ মেঘলা মেঘলা। না আছে অতিরিক্ত রোদ আর না বৃষ্টি আসার কোনো চিহ্ন। ছেলেরা সব বাজারের জন্য বের হয়েছে, কাল রাতেই সব লিস্ট করা হয়েছে। মেয়েরা সব বাগানে একদিকে গোল হয়ে বসে আছে। রৌদ্রিকের দুইটা মামা জবা সিকদার সবার ছোট, একটা মাত্রই বোন। বড় মামার দুই মেয়ে, আর ছোট মামা একটা ছেলে একটা মেয়ে। মিথিলা নাজমিন বড় মামার মেয়ে, এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষের। দেখতেও বেশ মিষ্টি প্রকৃতির মেয়ে, তবে অন্যসময়ের তুলনায় মিথিলা আজকে বেশ চুপচাপ,শান্ত হয়ে আছে। আসা হাতেই কারো সঙ্গে তেমন ভাবে না কথা বলেছে আর না সবার সঙ্গে আড্ডায় মেতেছে। সবাই ডাকলেও একটাই বাহানা দিয়েছে, তার মাথা ব্যথা করছে এতখানি জার্নি করে তাই কেউ বিরক্ত করেনি আর।
মিথিলা শান্ত দৃষ্টিতে রিনির পাশে হলুদ রঙের শাড়ি পরিহিত হাসতে থাকা তূর্ণাকে দেখছে। নিঃসন্দেহে তূর্ণাকে রৌদ্রিকে পাশে ভীষণ রকমে বাজে লাগবে এই মেয়েটাকে তাই না? মিথিলা কয়েকবার কল্পনায় তূর্ণা আর রৌদ্রিক’কে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দেখতে চাইলে। প্রতিবারই তাদের মানিয়েছে, কিন্তু এটা মিথিলার মন মানতে নাড়াজ! রৌদ্রিকে পাশে মেয়েটাকো মানাচ্ছে না এটা বোঝাচ্ছে বার বার। সকলেই এত সহজে তূর্ণার সঙ্গে মিশে যাওয়াটাও সে মেনে নিতে পারছে না। আজকে সকলের এই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ একদমই বিরক্তির কারণ লাগছে। সবাই এত দরদী হয়ে উঠেছে কেনো? তার কষ্টটা কি কারো চোখে পরছে না? সে কারো বিরহে পুরে ছাই হয়ে যাচ্ছে সেই দহনের আগুন কি কেউ দেখছেনা? তার ভিতরটা মরুভূমির মত শুঁকিয়ে খা খা হয়ে গেছে! রৌদ্রিক তো তাকেও মেনে নিতে পারতো। সে কি খুব খারাপ ছিল এই পাগল তূর্ণার থেকে? রোদেলাকে কি সে ভালোবাসতে পারতো না একজন মায়ের মতো? তাহলে কেনো রৌদ্রিক তাকে তূর্ণার জায়গাটা দিলো না? আজকে তো সে থাকতে পারতো এই জায়গাটায়। থাকতে পারতো? হাসি পেলো বড্ড, তার চাওয়া শুধুই এই পারতো অব্দিই আটকে আছে। মিথিলা আর বসে থাকতে পারলো না তূর্ণাকে দেখে তার ভিতরকার ব্যথাগুলো আরও নাড়িয়ে তুলছে তাকে। মিথিলা উঠতে নিলে রোহানের মামাতো বোন নিশিতা মিথিলার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আরে কোথায় যাচ্ছো মিথিলা? শরীর কি বেশি খারাপ তোমার?”
সকলেই মিথিলার দিকে তাকিয়ে আছে, মিথিলা শান্ত চোখে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে অনুভূতিশূন্য ভাবে বলে ওঠে-
“ তোমরা বরং তোমাদের নতুন ভাবিকে নিয়েই মেতে থাকো। আমাকে একলা ছাড়, যখন ভালো লাগবে তখন নিজ থেকেই আসবো।”
বলেই নিজের হাতটা ছাড়িয়ে কারো উত্তরের আশায় না থেকে সেখান থেকো সোজা বাড়ির ভিতরে পা বাড়ায়। সকলেই একটু অবাক হয়, কারণ এর আগে কোনোদিন মিথিলা এমনটা করেনি। মিথিলা নিজেও মিশুল একটা মেয়ে, সহজেই সকলের সঙ্গে মিশে যায়। সেখানে আজকে তার এমন ব্যবহার সকলের নিকটই বেশ বিস্ময়কর লাগলো। কেউ বুঝলো না ব্যাপারটা, তূর্ণা একবার মিথিলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। কালকে রাতেই তার সকলের সঙ্গে ভাব হয়ে গিয়েছে, সবাই তাকে খুব অল্প সময়ের মাঝেই আপন করে নিয়েছে। কিন্তু মিথিলা বাদে, সকলেই তার সঙ্গে কথা বললেও মিথিলা চোখ তুলে তাকায়নি অব্দি তার দিকে। সকাল সকাল সবার সঙ্গে সেও এখানে এসেছে, জবা সিকদারের কথা অনুযায়ী আজকেও শাড়ি পরেছে। সে আর রোদেলা মিলিয়ে শাড়ি পরেছে, রোদেলার জামাটা হলুদ হলেও গোল ফ্রক৷ ফর্সা শরীর, তারউপর আদুরে চেহারার গঠনের কারণে রোদেলাকে ভীষণ রকমের মিষ্টি লাগছে। সেও সবার মত সবার গল্প শুনছে, একটু পর পর এটা-ওটা বলছে, বড়দের আলাপ না বুঝতে পারলেও। সবাই যখন হেসে উঠছে সে নিজেও হাসচ্ছে অবুঝ মনে!
হুট করে মিথিলার ছোট বোন মাইশা তূর্ণার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে বসে-
“ তূর্ণা ভাবি তুমি কিসে পড়?”
তূর্ণা বোকা বোকা চোখে মাইশার দিকে তাকালো। সে বুঝলো না কি পড়ার কথা বলছে, রিনি সেটা বুঝতে পেরে এই প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলো। কিন্তু মাইশা তারপরও ছাড়লো না বিষয়টা। মাইশা আবারও বলে-
“ তুমি কোনোদিন স্কুলে যাওনি?”
তূর্ণা কি বলবে এবারও বুঝলো না, তার জীবনের গন্ডি পেরিয়েছে চার দেয়ালের মাঝো। সেখানে স্কুল নামক জায়গায় তার পা আজ অব্দি পরেনি, রূপা তার কোনো জিনিস-পত্রই তাকে ধরতে দেয় না। তূর্ণা অবুঝ মনেই বলে ওঠে-
“ স্কুলে তো রূপা আপু আর সোহেল তো যায়। আমি তো স্কুলে যায়নি, আচ্ছা স্কুলে কি করে?”
মাইশা এবার টেনে সামনের বছর এসএসসি পরীক্ষা দিবে। মাইশা অবাক হয়ে বলে ওঠে-
“ তুমি সত্যিই স্কুলে যাওনি? তোমাদের স্পেশাল স্কুলেও না?”
রিনি মাইশাকে থামিয়ে দিলো, রিনি মাইশার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলে-
“ মাইশা এইসব বলিস না, ভাবির পরিবার ওমন না যেমনটা তোরা ভাবছিস। এইসব বিষয়ে বেশি কথা বলিস না। এইভাবে আছিস এইভাবেই থাক না।”
“ আচ্ছা সব মানলাম তাই বলে রৌদ্রিক ভাইয়ের সঙ্গে ভাবির কোনো ভাবে যাচ্ছে না। রৌদ্রিক ভাইয়া কত বড় সার্জন ভাবি স্কুলেও যায়নি।”
“ জানি, কিন্তু ভাইয়া ভাবিকে মেনে নিয়েছে। আর ভাইয়ার সমস্যা না থাকলে আমরা সমস্যা করে কোনো লাভ আছে বল? আর ওনাকে এইসব প্রশ্ন করিস না। ওনার সাথে নরমাল থাকার চেষ্ট কর, এমনি ভাবি অনেক ভালো।”
তূর্ণা শুধু তাকিয়ে দেখলো সে কিছুই বুঝলো না। তাই রিনির দিকে তাকিয়ে বলে-
“ রিনি স্পেশাল স্কুল কি? ওইখানে কি অনেক বন্ধু আছে? জানো রূপা আছো এত এত বন্ধু আছে, ওরা মাঝে মাঝে আপুর কাছে আসতো। স্পেশাল স্কুলে কি বন্ধু আছে।”
রিনি হালকা হেসে বলে-
“ সব স্কুলেই বন্ধু আছে ভাবি। এইসব বিষয় বাদ দাও, আমরা সবাই মিলে চল, যেসব কাজ আছে সেগুলো সেরে ফেলি। ওরা বাজার আনলে রান্নার তৈয়ারি করবো।”
রিনিদের কথার মাঝেই সব ছেলেরা বাজার নিয়ে এদিকটায় আসে। সবাই উঠে পরলো সবার মাঝে তূর্ণার নজর গেলো সবার পিছনে আসা জিয়ানের দিকে। হুট করে আবারও জিয়ানকে দেখে তূর্ণা কেমন ভয়ার্ত দৃষ্টিতে; সেদিকে একজন তাকিয়ে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। মেয়েরা বাজার নিয়ে যে যার কাজে লেগে পরেছে, জিয়ান ফোনে কথা শেষ করে তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে দূরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তূর্ণা দিকে। তূর্ণাকে দেখে বাঁকা একটা হাসি দেয় জিয়ান, সেটা দেখে তূর্ণা আরও কিছুটা ভয়ে ছিটিয়ে গেলো! ধীরে ধীরে তূর্ণার দিকে জিয়ান এগিয়ে আসতে নিলে তূর্ণা কোনো রকমে দৌড়ে রিনির পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে। তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে, রিনি কিছুই বুঝলো না তাই সেইভাবেই থাকলো। তূর্ণা ভয়ে ভয়ে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জিয়ানকে একনজর দেখে নিলো। জিয়ান এইদিকেই তাকিয়ে আছে, তূর্ণা রিনির দিকে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে-
“ রিনি আমি এখানে থাকবো না। আমি রুমে যাবো, আমি রুমে যাবো।”
রিনি এবার তূর্ণার দিকে তাকালো, তূর্ণার মুখাবয়বের ভয়ের ছায়া স্পষ্ট লেপ্টে আছে। রিনি ভ্রু কুঁচকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ কি হয়েছে ভাবি? কোনো সমস্যা?”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়।
“ ওই পঁচা লোক আবারও এসেছে। আমি এখানে থাকবো না, আমি রুমে যাবো।”
রিনি বুঝলো না পঁচা লোক বলতে কাকে বুঝিয়েছে। তূর্ণা ভয়ের কারণটা তার কাছে স্পষ্ট নয়।
“ আচ্ছা তুমি রুমে যাও তাহলে। একা যেতে পারবে?”
তূর্ণা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানিয়ে, কোনো রকমে বাড়ির ভিতরের দিকে চলে যায়। এদিকে তূর্ণার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রিয়ান হেসে উঠলো অদ্ভুত ভাবে, সেদিনের সে এখনে ভোলেনি। তূর্ণার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভাবে বলে ওঠে-
“ সেদিনের শোধটা নাহয় আজকে তোলা যাক ভাবিজী।”
“ কিসের শোধ?”
পিছন থেকে শ্রাবণ প্রশ্ন করলো। শ্রাবণের কণ্ঠস্বর পেয়ে রিয়ান কিছুটা হকচকিয়ে উঠলো, শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বোকা বোকা হেসে বলে-
“ আরে কিছু না, চল সবাই মিলে ছাদে গিয়ে আড্ডা দেই। তোমাদের তো পাওয়াই যায় না।”
বলেই রিয়ান অন্যদেরও ডাকতে থাকে। শ্রাবণ সহ বাকি ছেলেরা উপরে চলে যায়, বাড়ির কাজের লোক মেয়েদের হাতে হাতে সাহায্য করছে।
তূর্ণা রুমে এসেই দরজা চাপিয়ে একসাইডে ভয়ে কাপড় আঁকড়ে ধরে বসে আছে। বাহিরে সে আর পা রাখবে না, রিয়ানকে যেনো জিসান ভাইয়ের মত লাগে তার নিকট। সবে পনেরো বছর তূর্ণা, দেখতে শুনতে রূপার থেকেও ভালো। যার জন্যও কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি, জিসান হলো রূপার মামাতো ভাই। প্রায় এই তাদের বাড়িতে আসতো, জিসান স্বভাব ছিল ভীষণ রকমে খারাপ। মদ-গাঁজা খেয়ে মাতাল হয়ে যেখানে-সেখানে পরে থাকে। তাদের বাড়িতে গেলেই তূর্ণাকে নিজের কাছে বসিয়ে বেশ বা*জে ভাবে স্পর্শ করতো। অবুঝ তূর্ণা একটু আদরের আশায় থাকতো সারা বাড়িতে দাদি বলতে আর কেউ একটুও আদর করে না তাকে। তাই আদরের বড় কাঙ্গালি সে, জিসান চকলেটের লোভ দেখিয়ে নিজের কাছে ডেকে বা*জে ভাবে স্পর্শ করতো। এমনই একদিন বৃষ্টির দিনে জিসান হুট করে তাদের বাড়িতে আসে, বাড়িতে তখন কেউ ছিল না তূর্ণা আর তার দাদি বাদে। সবাই এক জায়গায় দাওয়াতে গিয়েছিল, জিসান মাতাল হয়ে বাড়িতে প্রবেশ মাত্রই শিকারকে নিজের অতি নিকট দেখে। তার পুরুষত্ব কাম*না জেগে ওঠে, অবুঝ তূর্ণাকে টানতে টানতে রুমের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে মা*রে। হিংস্র বাঘ অনেকদিন পর নিজের শিকারকে নিজের নিকট পেলে যেমন খুবলে খাওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পরে। তেমনি জিসান ফাঁকা বাড়িতে অসুস্থ তূর্ণাকে একা পেয়ে ঝাঁপিয়ে পরে। সারা গায়ে জিসানের বা*জে স্পর্শের মাখামাখি! সারা গায়ে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন বসে গিয়েছে, নিজের অবস্থা বুঝতে পেরে গলা ফাটিয়ে সেদিন তূর্ণা কেঁদেছিল। আকাশ সেদিন হয়তো তার সর্বনাশের বার্তা আগেই পেয়ে গিয়েছিলো, তাই আকাশও ক্ষণে ক্ষণে গর্জে উঠছিলো। মুষলধারে বর্ষণ হচ্ছিলো বাহিরে। নিস্তব্ধতায় ঘেরা সারা বাড়িতে বৃষ্টি শব্দের সঙ্গে তূর্ণা আর্তনাদ যেনো ভয়ংকর ভাবে সারা বাড়িকে কাঁপিয়ে তুলছিলো!
ওইটাই ছিল তূর্ণার জীবনে বা*জে স্পর্শের প্রথম ছোঁয়া। তূর্ণার ওমন চিৎকারে তূর্ণার দাদি ছুটে এসেছিল নাতনির নিকট, ততক্ষণে তূর্ণার গায়ে থাকা জামাটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গিয়েছিলো। নাতনির এত বড় সর্বনাশ হতে দেখে লাঠি এনে জিসানের মাথায় আঘাত করার কারণে জ্ঞান হারিয়ে সেখানে পরে যায় জিসান। একেই অধিকমাত্রায় নেশায় বুদ হয়ে ছিল৷ তারউপর মাথায় আঘাত করার কারণে জ্ঞান হারিয়েছিল। তবে তার পর থেকে তূর্ণার স্মৃতির পাতায় বিষাদময় এক অধ্যায় হয়ে আটকে আছে সেই দিন। আজও সেটা ট্রমা হয়ে তূর্ণার মধ্যে বহাল হয়ে রয়েছে, সেদিন যদি সঠিক সময় তূর্ণার দাদি না আসতো। তাহলে হয়তো সেদিনই তার শেষ দিন হতো, বিপদমুক্ত হলেও সেটার ভয়ানক স্মৃতি আজও হানা দিলে তূর্ণা উত্তেজিত হয়ে উম্মাদের মত আচরণ শুরু করে দেয়। প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে যায়, জিসানের মত কেউ তাকে স্পর্শ করলে সে এখন বুঝে যায় কোনটা খারাপ স্পর্শ আর কোনটা ভালো।
দুপুর পেরিয়ে গোধূলির লগ্নে সেজে উঠেছে ভুবন। পক্ষীরাজের ঝাঁক উড়ে নিজেদের নীড়ের পথে উড়ে চলেছে। জবা সিকদারের কারণে সকলের সঙ্গে নিচে এলোও রুমা সিকদারের পিছনে পিছনে সারাটাক্ষন ছিল তূর্ণা। জিয়ানের নিকট কোনো ভাবেই সে যায়নি রুমা সিকদার বলেও তূর্ণাকে নিজের কাছ থেকে সরাতে পারেনি। সবাই এখন রুমের মধ্যে এখন, রুমা সিকদার সকলের জন্য এখন চা বানাবেন। এই সময়টাতে সবাই চা খেতে পছন্দ করেন। রুমা সিকদার তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ কি হয়েছে এইভাবে ঘুরছো কেনো? রুমে যাও আমি একটু পর আসচ্ছি। চা বানিয়ে রুমে যাবো, যাও উপরে গিয়ে শাড়িটা খুলে জামা পর।”
তূর্ণা ভয়ে ভয়ে চারিপাশটা দেখে নিলো জিয়ান আছে কিনা। জিয়ানকে দেখতে না পেয়ে ভদ্র বাচ্চার মত রুমা সিকদারের কথা মেনে রুমে ছুটে চলে যায়। রুমা সিকদার সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়লো৷ কেউ সন্তান পেয়েও পায় না, আর যারা পায় তারা পেয়েও মূল্য দেয় না। সেটা তূর্ণাকে দেখে বোঝা যায়, রুমা সিকদারের কোনো সন্তান যদি এমন অসুস্থও হতো তার আক্ষেপ থাকতো না। বাবা-মার কাছে সকল সন্তানই সমান হয়ে থাকে, তবে সেটা সকলের নিকট না হলেও কেউ নিজের সন্তানকে এইভাবে অবহেলায় ফেলে রাখে না। তূর্ণা মা নাহয় সৎ কিন্তু বাবা! সে তো আর সৎ নয় তারপরও নিজের মেয়েকে কিভাবে এমন ভাবে বড় করতে পারে। রুমা সিকদার তূর্ণাকে নিজের সন্তানের মতই আগলে রাখা চেষ্টা করেন। মেয়েটাকে দেখলে আলাদা মায়া কাজ করে, কি মায়ায় ভড়া চেহারাখানা!
তূর্ণা রুমে এসে রুমা সিকদারের কথা মত জামা নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। রুমের দরজা চাপানো, তূর্ণা শাড়ি সবে মাত্র গাঁ থেকে খুলে রেখেছে। এরমাঝেই লাইট অফ হয়ে যায়, হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তূর্ণা ভয়ে চমকে ওঠে। অন্ধকারে বেশ ভয় আছে তার! দরজাটা আস্তে করে খুলতেই দেখতে পায় রুমের ভিতরকার লাইটও অফ। সারা রুম জুড়ে অন্ধকারে আচ্ছন্ন, রুমের পর্দা থেকে শুরু করে সবকিছু লাগিয়ে দেওয়া। তূর্ণা শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো, ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে মিহি শব্দের ডেকে ওঠে-
“ ছোট মা..ও ছোট মা তুমি এসেছো? তূর্ণা অনেক ভয় লাগছে। তুমি কোথায় ছোট মা?”
প্রতুত্তরে কোনো শব্দ এলো না, তূর্ণা কি করবে বুঝলো না। হুট করেই কেউ তার মুখ শক্ত করে চেপে ধরলো৷ হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তূর্ণা ভয়ে ছিটকে সরে যেতে চায়। তবে সেটা হয়ে উঠলো না কেউ তার দানবের মত হাত তার নরম উদর ভাঁজে শক্ত ভাবে চেপে ধরে। ব্যথায় তূর্ণার কুঁকড়িয়ে উঠলো, নেত্রকোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরলো। ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটপট করতে শুরু করে দেয়, তবে লোকটা ছাড়লো না। বরং আরও জোরে তার উদর চেপে ধরলো। কানের কাছে জিয়ান ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে-
“সেদিনের থাপ্পড় কিন্তু ভুলিনি ভাবিজী! আজকে নাহয় আমি এর শোধ তুলি। বেশি কিছু করবো না, অল্প একটু ছুঁয়ে দিব শুধু।”
বলেই বা*জে ভাবে তূর্ণা উম্মুক্ত উদরে হাত বুলাতে থাকে। তূর্ণার অস্বাভাবিক হয়ে উঠলো, অতীতের পাতায় থাকা বাজে স্মৃতি গুলো যেনো আবারও জ্যান্ত হয়ে তূর্ণাকে গিলে নিচ্ছে। অনবরত নেত্রকোণ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পরছে শুধু। তূর্ণা অস্বাভাবিক ভাবে ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে৷ জিয়ান শক্ত হাতে তূর্ণাকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, তারপরও কেউ যখন উম্মাদের মত আচরণ শুরু করে। তখন চাইলেও তাকে সহজে আঁটকে রাখা সম্ভব নয়। রিয়ান তূর্ণা বিছানায় ফেলে অকথ্য ভাষা গালি দিয়ে ওঠে, তূর্ণা তবু থামে না। পাগলের মত হাত-পা ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে, রিয়ানের মাথা রক্ত উঠে গেছে। শক্ত হাতে তূর্ণা নরম গালে থাপ্পড় মেরে। মুখটা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষিয়ে বলে ওঠে-
“ এই মা* থাম, তোর শরীরের তেজ বেশি বেড়ে গেছে। মা** পাগল হয়েও এত তেজ আসে কই থেকে?”
কথার মাঝেই তূর্ণা বেফাঁস রিয়ানের পেট বরাবর লাথি বসিয়ে দেয়। অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছে সে, আশেপাশে অন্ধকার ছাড়া কিছু নেই। এদিকে লাথি খেয়ে রিয়ানের মাথা আরও বিগড়ে যায়, তূর্ণা চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরে পর পর সর্বশক্তি দিয়ে থাপ্পড় দিতে থাকে। থাপ্পড়ের দাপট এতটাই যে তূর্ণার দূর্বল শরীর আর সেটা নিতে পারলো না। নাক দিয়ে র*ক্ত পরা শুরু করে দিয়েছে, তূর্ণার মনে হলো এই বুঝি সে ম*রো গেলো। অন্ধকারের মাঝে কাতুরে কণ্ঠে আকুতি করে বলে ওঠে-
“ জি..জিসান ভাই..ধরে না। তুমি নোংরা, আ..আমাকে নোংরা করিও না! জিসান ভা..ভাই আমার কষ্ট হচ্ছে খুব!”
বলতে বলতে তূর্ণার দূর্বল শরীরটা কেমন নেতিয়ে পরে যেতে নিলে রিয়ান শক্ত করে চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে বলে-
“ এই মা* ওঠ, এতটুকুতেই মরে যাচ্ছিস কেনো?”
তূর্ণা জবাব দিতে পারলো না, কেমন নিস্তেজ হয়ে পরেছে সে। নাক দিয়ে গলগল করে র*ক্ত বইছে তার, অন্ধকারে সেটা দেখা না গেলোও। তূর্ণা অনুভব করতে পারলো সেটা, নিজেকে বার বার সরানো চেষ্টা করছে জিয়ানের নিকট থেকে; তবে সে ব্যর্থ! তূর্ণা নেতিয়ে গেলেও তার পাগলামি বন্ধ হয়নি। সে হাত-পা এখনো ছোটাছুটি করছে, তূর্ণা শেষমেশ কামড়ে বসতো। হঠাৎ এমন আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না জিয়ান। তাই ব্যথার কারণে তূর্ণাকে ছেড়ে তূর্ণার থেকে নিজের হাতকে বাঁচানোর চেষ্টা করলো। তূর্ণাকে দূরে ঠেলে দিয়েলো তীব্র জোরে। তূর্ণা ছাড়া পেয়ে পাগলের মত উল্টো পথে দৌড় লাগালো, তার মথায় একটা কথাই বাজচ্ছে, সেটা হলো জিসান ভাই তাকে ভীষণ বাজে ভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
দরজার নাগাল পেতেই ওমন বিধ্বস্ত অবস্থা বাহিরে বের হয়ে যায়। তূর্ণার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই তার অবস্থা যে নাজেহাল। পাগলের মত ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে এলোমেলো পায়ে ছুটে চলেছে সে। সামনের সবকিছুই যেনো তার নিটক ঝাপসা, অপরিষ্কার! নাক দিয়ে র*ক্ত পরে ছড়াছড়ি হয়ে গেছে। ফর্সা পেটে লালচে দাগ স্পষ্ট! নরম গালে গভীট ভাবে দাগ বসে গিয়েছে হুট করেই কারো সঙ্গে বারি খেতেই নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না তূর্ণা। নিস্তেজ দেহটা পরে যেতে নিলে কেউ একজন শক্ত বাঁধনে তাকে নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়। আধখোলা শাড়িটা ফ্লোরের সঙ্গে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
তূর্ণা নেত্রজোড়া বুঁজে ফেলার আগেও দেখতে পেলো না সে কিসের সঙ্গে এইভাবে লেপ্টে আছে। রৌদ্রিক অবাক হয়ে বিধ্বস্ত তূর্ণাকে দেখছে, মাত্রই বাড়ি ফিরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো সে। হুট করেই তূর্ণাকে এমন নাজেহাল অবস্থায় কাঁদতে কাঁদতে আসতে দেখে অবাক হয়েছে। কিছু বলতে নিবে তার আগেই আঁচড়ে পরে তার বুকের উপর তূর্ণা। রৌদ্রিক একবার বিধ্বস্ত, নাজেহাল তূর্ণাকে দেখে চোখ নামিয়ে নিলো। তূর্ণার এমন হাঁক ছাড়া কান্নার শব্দ শুনে রুমা সিকদার ছুটে এসেছেন উপরে। রৌদ্রিক ফ্লোরে পরে থাকা শাড়ি দ্বারা তূর্ণাকে ঢেকে দিলো, রুমা সিকদার তূর্ণার এমন অবস্থা দেখে আঁতকে উঠলেন। কিছু সময় আগেও ফুলের মত মেয়েটা এমন বিধ্বস্ত হয়ে গেলো কি করে? রুমা সিকদার চিন্তিত স্বরে বলে-
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৮
“ ওর এমন অবস্থা কি করে হলো রৌদ্রিক?”
রৌদ্রিক সময় ব্যয় না করে তূর্ণাকে পাঁজ কোল তুলে নিলো। রুমের দিকে পা বাড়ালো, ঢুকতেই বারান্দা দিয়ে কাউকে বের হয়ে যেতে দেখতে পেলো। রৌদ্রিকের চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে, ভয়ংকর ভাবে বারান্দার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। রুমা সিকদার রুমের লাইট আন করতেই রুমের অবস্থা আর তূর্ণার অবস্থা দেখে বুঝে গেলেন কি হয়েছে।
