অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৫
নুসাইবা ইভানা
রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দ ছাড়া আশেপাশে তেমন কোনো কোলাহল নেই। হসপিটালের কেবিনটা এখন ফাঁকা। ডাক্তারের নির্দেশে সবাইকে একে একে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু জিয়ান আর জাহানারা বেগম হসপিটালে রয়ে গেছেন। জিয়ান সুনয়নার বেডের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে আছে। সুনয়না ঘুমাচ্ছে। জিয়ানের এক হাতের মুঠোয় নয়নার হাত, অন্য হাতের একটা আঙুল আলতো করে স্পর্শ করে আছে ছোট্ট মেয়েটার হাত। মেয়েটাও ঘুমাচ্ছে। ইশ! পৃথিবীতে এর চেয়ে সুন্দর অনুভূতি কি আর কিছু আছে?
জিয়ানের ইচ্ছে করছে এক্ষুনি ‘বাবা’ ডাক শুনতে। সে তাকিয়ে রইল পাশের ছোট বেবিটার দিকে। ছোট ছোট চোখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে সে। মা-মেয়ে ঘুমাচ্ছে, ছেলেটা সজাগ। কী সুন্দর ছোট ছোট হাত-পা নাড়াচ্ছে! জিয়ানের চোখের কোণে অশ্রু জমা হয়েছে—এ যেন সুখের অশ্রু।
নয়না মিটমিট করে চোখ খুলে তাকিয়ে আছে জিয়ানের দিকে। জিয়ান তখনও তাকিয়ে আছে তার ছেলেটার দিকে। নয়না বাঁ হাতটা বাড়িয়ে জিয়ানের চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে দিয়ে বলল, “কাঁদছো কেন মিস্টার প্লেন ড্রাইভার? এখন আনন্দ করার সময়।”
জিয়ান নয়নার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “কই, কাঁদছি না তো! দেখো, আমাদের ছেলেটা আমার সাথে তোমাদের পাহারাদারি করছে। আর তোমরা মা-মেয়ে ঘুমাচ্ছো।”
নয়না জিয়ানের হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে বলল, “তুমি পুরোটা সময় হাত ধরে রেখেছো!”
“হুম, রেখেছি তো। আমার রাজকন্যা আর রানি দুজনেই আমাকে ধরে রেখেছে, তাদের হাত কী করে ছাড়িয়ে নেব! দেখো, আমার রাজকন্যার ছোট আঙুলগুলো দিয়ে কীভাবে মুঠো করে ধরে রেখেছে আমার আঙুলটা।”
নয়না হেসে বলল, “দেখেছো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম? ওরা আমাদের চেয়ে আর কত বেশি কিউট হয়েছে, মাশাআল্লাহ! তুমি হলে আমাদের রাজা, আমি তোমার রানি আর এরা দুজন আমাদের রাজকন্যা আর রাজপুত্র। তবে হ্যাঁ, বড় রাজপুত্রও কিন্তু আছে—বড় রাজপুত্র আর ছোট রাজপুত্র। ওরা সবাই একসাথে মিলেমিশে বড় হবে।”
জিয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বলল, “তুমি কি জারিফের কথা বললে?”
“হুম।”
“আমার মনে হয় না মেহনুর জারিফকে নিয়ে বাংলাদেশে আর পার্মানেন্ট হবে। পার্মানেন্ট তো দূরের কথা, একবারও আসলো না। ওর মনটা কেন এতো কঠোর!”
নয়না জিয়ানের হাতের ওপর হাত রেখে বলল, “মানুষের মন কঠোর থাকে না, পরিবেশ-পরিস্থিতি কঠোর করে দেয়। মেহনুর বাবা ছাড়া একা বড় হয়েছে। কম বয়সে নিজের মাকেও হারিয়েছে। এরপর তোমাদের ধরে বাঁচতে চেয়েছিল, কিন্তু সেখানেও ভালোবাসার পরিবর্তে মিলেছে অবহেলা। আম্মু ছাড়া আমরা কেউ কখনো মেহনুরের কথা ভেবেছি? আমরা সবাই মানুষের সঙ্গ চাই। কিন্তু যখন মানুষের সঙ্গ কেবল আমাদের অবহেলা দেয়, দুঃখ দেয়, তখন মানুষ একা থাকা বেছে নেয়। একা থাকা তো সহজ নয়। তাই ভালোবাসা দিয়ে, যত্ন করে ওকে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। তাকে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দেওয়া যাবে না।”
জিয়ান নয়নার নাক টেনে বলল, “তুমি এতো ভালো কেন বাটার মাশরুম? আমি শতকোটি বার তোমার কথায় মুগ্ধ হয়ে তোমার প্রেমে পড়ি। আর কত পাগল করবে আমাকে?”
নয়না কিছু বলল না, শুধু মুচকি হাসল। এরপর বলল, “এই দেখো, ছেলেটা একদম তোমার মতো হয়েছে—অস্থির। দেখো দেখো, কিছুক্ষণ পর পর মুখ কুঁচকে শব্দ করছে।”
জিয়ান বলল, “ছেলেটা হয়েছে তার মায়ের মতো দুষ্টু।”
সুনয়না মৃদু হেসে বলল, “এহহহহ!”
এরমধ্যেই ছেলে বাবুটা কেঁদে উঠল।
“দেখেছো? তোমার ছেলে তোমার মতোই নাটুকেপনা শুরু করেছে এখনি। বাকি জীবন তো পড়েই আছে। ছেলেটা একদম তোমার কার্বন কপি হয়েছে।”
জিয়ান ভ্রু কুঁচকে বলল, “আমার ছেলে কেন? আমাদের ছেলে।”
“তাহলে মেয়েটাও আমাদের মেয়ে। শুধু কোলে নিয়েই বারবার বলছো আমার মেয়ে, আমার রাজকন্যা!”
জিয়ান একটু লজ্জা পেয়ে গলা খাঁকারি দিল, “ওটা আলাদা ব্যাপার। ওসব ধরতে নেই, বাটার মাশরুম।”
সুনয়না হেসে ফেলল। অনেকদিন পর এই হাসিটা দেখে জিয়ানের বুকের ভেতর শান্তির ঢেউ বয়ে গেল। ইশ! সারাজীবন নয়নার মুখে এমন স্নিগ্ধ হাসি লেপ্টে থাকুক। সে ধীরে ধীরে নয়নার কপালে হাত রাখল, মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ব্যথা করছে?”
“একটু ব্যথা তো করবেই।”
“আর কিছু লাগবে? আমাকে বলো, আমি ডাক্তার ডেকে আনি।”
“হ্যাঁ।”
“কী? দ্রুত বলো। কোথাও কষ্ট হচ্ছে না তো?”
সুনয়না কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “সারাজীবন পাশে থাকবে? আর ঠিক এভাবেই আমাদের ভালোবাসবে? তোমার ভালোবাসাই আমাদের বেঁচে থাকার কারণ।”
জিয়ান উত্তর দিল না। শুধু নয়নার হাতটা তুলে নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল। কিছু প্রতিশ্রুতি শব্দে প্রকাশ করতে হয় না, তারা নিজেরাই প্রতিফলিত হয় সামনের মানুষটার ব্যবহারে।
রাতের রান্না শেষ করে সোফায় বসে আছে মেহনুর। তার মনটা অদ্ভুত অস্থির লাগছে। মেহনুর চায় না তার ছেলেটা তার মতো অবহেলা পাক। এখন চৌধুরী বাড়িতে আরও দুটো সন্তান এসেছে, সেখানে জারিফকে কে মনে রাখবে? কে ভালোবাসবে, কেই বা আগলে রাখবে? এখন কি আর আগের মতো কদর পাবে জারিফ? জারিফের বাবা নেই; বাবা ছাড়া ছেলের গুরুত্ব আর কতটুকু? বাবা-হীন জীবন কেমন, সেটা মেহনুরের চেয়ে ভালো কেউ জানে না। তাই মেহনুর নিজের সিদ্ধান্তে অনড়—কিছুতেই বাংলাদেশে ফিরে যাবে না সে।
জারিফ নিজের রুমে বসে আছে, দরজাটা আধখোলা। সন্ধ্যার ধমকটা হয়তো এখনও ভুলতে পারেনি, ছোট মনে তা বেশ প্রভাব ফেলেছে। ড্রয়িং খাতা নিয়ে ড্রয়িং করছে জারিফ। আঁকতে ভীষণ পছন্দ করে সে।
মেহনুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছেলের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে পা ফেলে ভেতরে প্রবেশ করল। উঁকি দিতেই দেখল জারিফ বিছানার ওপর বসে একটা ছবি আঁকছে। ছবিতে দুজন ছোট ছেলে, একটা ছোট মেয়ে, আর মাঝখানে বড় একটা পরিবার।
মেহনুর জারিফের পাশে বসল, মৃদু স্বরে ডাকল, “জারিফ।”
জারিফ তাকাল না। মেহনুরের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল, “আমার দিকে একবার তাকাবে?”
জারিফ এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল। চোখ দুটো কেমন ভেজা ভেজা।
“এখনো রেগে আছো মমের ওপর?”
জারিফ মাথা নিচু করে বলল, “আমি শুধু বলতে চেয়েছিলাম আমার ভাই-বোন এসেছে। আমাকে আর একা থাকতে হবে না। আমরা সবাই মিলে মজা করতে পারব।”
মেহনুরের গলা আটকে গেল। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর জারিফকে বুকে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “সরি।”
জারিফ অবাক হয়ে গেল। রাগটাও কেমন মায়ের আদর পেয়েই পালিয়ে গেল। মেহনুর চোখ বন্ধ করে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রইল। হঠাৎ কেন জানি মনে হলো, তার জীবনে হয়তো অনেক অপূর্ণতা, কিন্তু সেই সব শূন্যতা যেন জারিফের কাছে আসলেই মিলিয়ে যায়। কিন্তু যখন মেহনুর একা থাকে, তখন শূন্যতারা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। আর সেই শূন্যতার কারণ সে নিজেও পুরোপুরি জানে না। সারাক্ষণ মনে হয় কী যেন নেই, কিসের যেন বড্ড অভাব!
মেহনুর জারিফের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “তুমি কি জানো, তুমি এখন বড় ভাই হয়ে গেছো? বড় ভাইদের অনেক দায়িত্ব। তুমি কি সেসব পালন করতে চাও না?”
জারিফ হেসে বলল, “চাই তো।”
“তাহলে তো পড়াশোনা করতে হবে। বারবার দেশে যেতে চাইতে পারবে না। নয়তো দায়িত্ব কীভাবে পালন করবে? তুমি কি পারবে না? না পারলে বলে দাও, কালই আমরা ফিরে যাব।”
জারিফ নিজের মমকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আমি পারব।”
মেহনুর নিজের কষ্ট লুকিয়ে জারিফকে বলল, “আজ থেকে বাংলাদেশ ভুলে যাবে। দাদু ভাই, আপুমনি, তোমার বাবা—সবার সাথে শুধু ফোনে কথা বলবে। এরপর একদিন পড়াশোনা করে তুমি অনেক বড় হবে। তারপর নিজেই প্লেন চালিয়ে চলে যাবে ভাই-বোনের কাছে। তখন তোমার ভাই-বোনরা ভীষণ খুশি হবে।”
জারিফের ছোট মন এটা মানতে চাইছে না, তবুও ‘হ্যাঁ’ বলল। মনে মনে ভাবলো—‘আমি কীভাবে প্লেন চালাব? আচ্ছা, প্লেন কীভাবে চলে?’ নিজের মনের প্রশ্ন নিজের মনেই জমিয়ে রাখল সে।
মেহনুর জারিফকে কোলে নিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে আসল। চেয়ারে বসিয়ে বলল, “তুমি একটু বসো, আমি আসছি।”
ওয়াশরুমে ঢুকে মেহনুর শব্দ করে কান্না করল। মেহনুর নিজের উদ্দেশ্যে সফল হয়েছে, কিন্তু তার ছেলেটা যদি বড় হয়ে তাকে ভুল বোঝে? মেহনুর চোখের পানি মুছে বলল, “তখনেরটা তখন বোঝা যাবে। এখন আমার ছেলের জন্য যা ঠিক, আমাকে তাই করতে হবে। কারো ভালোবাসা দরকার নেই আমার ছেলের; আমার ছেলের জন্য আমিই যথেষ্ট।”
চোখে-মুখে পানি দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে জারিফকে খাইয়ে দিল সে। এরপর দুজনে একসাথে ঘুমিয়ে পড়ল। মেহনুরের চোখে ঘুম নেই, অজানা এক কষ্টে বুকটা ভার হয়ে আছে।
পরদিন সকালে চৌধুরী বাড়িতে যেন ঈদের আমেজ। কে কখন বাচ্চাদের কোলে নেবে, তা নিয়ে ছোটখাটো যুদ্ধ লেগে গেছে। জাহানারা বেগম তো কাউকেই ঠিকমতো কোলে নিতে দিচ্ছেন না।
মিতা বেগম হেসে বললেন, “আপা, একটু আমাকেও দিন।”
“না না, তোমরা পরে নিও। এখন ওরা আমার কাছে থাকবে। এরপর তো সব সময় তোমাদের কাছেই থাকবে।”
নাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “বাচ্চাদেরও তো মতামত আছে! ওদের জিজ্ঞেস করেছেন?”
সবাই হেসে উঠল। ঠিক তখনই জিয়ান নিচে নেমে এল। সারারাত প্রায় ঘুমায়নি, তবুও মুখে এক ধরনের প্রশান্তি।
নাজিম চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাবা হয়ে কেমন লাগছে?”
জিয়ান কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দিল, “ভয় লাগছে।”
“ভয়?”
“হ্যাঁ। এখন মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আমার হারানোর মানুষের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে। দায়িত্ব বেড়ে গেছে।”
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ হয়ে গেল। তারপর মিতা বেগম চোখ মুছলেন। তাঁর জীবন থেকেও হারিয়ে গেছে তাঁর আদরের জাহিন। জাহিনের সব বায়না ছিল মিতা বেগমের কাছে, অথচ তাঁর জাহিন আজ পৃথিবীর কোনো প্রান্তে নেই। জাহিন আজ কেবলই স্মৃতি।
ভালোবাসা যত গভীর হয়, হারানোর ভয়ও তত গভীর হয়।
উপরে নিজের রুমে বসে সুনয়না জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তিন দিন পর বাসায় এসেছে সে। সূর্যের আলো ধীরে ধীরে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। তার পাশে ঘুমিয়ে আছে দুই সন্তান—আহিয়াদ অর্ণব নিহান এবং সুনেহরা তাসনিম জায়না। ‘সুনেহরা’ নামটা সে জাহিনের ভালোবাসার প্রতি সম্মান রেখেই রেখেছে। জিয়ান ভেবেছে, সুনয়নার নামের সাথে মিলিয়ে হয়তো সুনেহরা রাখা হয়েছে।
কিচেন থেকে খাবার এনে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে জিয়ান। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই নয়না হাসল, জিয়ানও হাসল।
অর্ধাঙ্গিনী দ্বিতীয় পরিচ্ছদ পর্ব ৫৪
কত ঝড়, কত বিচ্ছেদ, কত ভুল বোঝাবুঝি, কত হারানোর ভয়! সবকিছুর পরও তারা আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে
—একটা সম্পূর্ণ পরিবার তাদের। তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সত্যটা হয়তো এটাই যে, যে মানুষগুলো সত্যিই একে অপরের জন্য তৈরি, তারা হাজার বাধা পেরিয়েও শেষ পর্যন্ত একই ছাদের নিচে ফিরে আসে। নিয়তি হয়তো তাদের কখনো বিচ্ছিন্ন করে না; সব চড়াই-উতরাই পার করিয়েও তারা যেন একে অপরের পরিপূরক হয়ে বেঁচে থাকে।
