Home আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৩

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৩

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৩
অরাত্রিকা রহমান

“Expecting a cute Little baby..রিপোর্ট অনুযায়ী আমার ধারণা সঠিক। She is pregnant Mr. chowdhury.. It’s been 1 and a half month.. Congratulations to both of you..”
ডাক্তারের কথা শেষ হতেই যেন ঘরটার বাতাস কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। মিরা প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। চোখ দুটো একটু বড় হয়ে গেল, ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, মনে হচ্ছে কথাটা ঠিকমতো কানে ঢুকেছে, কিন্তু মস্তিষ্ক এখনো সেটা গ্রহণ করতে পারছে না। অন্যরকম ভয় কাজ করছে মনে। ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি নিজের পেটের দিকে নেমে এলো… যেন হঠাৎ করেই নিজের ভেতরে আরেকটা অস্তিত্বের অনুভূতি খুঁজে পেতে চাইছে। রায়ানও নিঃশব্দ, হতভম্ব। তার মুখে সেই স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাসী ভাবটা নেই—বরং এক ধরনের আশ্চর্যকর স্তব্ধতা। সে একবার ডাক্তারের দিকে তাকালো, আবার মিরার দিকে। যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এটা সত্যিই হচ্ছে তো?
“প্রেগন্যান্ট…?” খুব নিচু স্বরে, নিজের কাছেই যেন বললো সে। মিরা ধীরে ধীরে রায়ানের দিকে তাকালো। চোখে হালকা বিস্ময়, সাথে একটুখানি ভয়ও, কিন্তু তার গভীরে একটা কোমল আলো ফুটে উঠছে। অচেনা, নতুন এক অনুভূতি। দুজনের মাথায় একসাথে একই প্রশ্নের জাগরণ ঘটলো- “গত কাল রাতের ফল এক দিনে কিভাবে পাওয়া সম্ভব।”

রায়ান চটজলদি মিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো‌। দুজনের চোখে একই কৌতুহল। মিরা রায়ানের চোখে চোখ রেখে নিজের পেটের উপর তার মৃদু কাঁপতে থাকা হাতটা রাখলো। আর তারপর চোখ জোড়াও সেখানে গিয়ে স্থির হলো। রায়ান ও মিরার দৃষ্টি অনুসরণ করে মিরার পেটের দিকে তাকালো। অজান্তেই তার হাত মিরার পেটের দিকে অগ্রসর হলো। তার হাতও কাঁপছে, যেন তার এই একটা স্পর্শেও মিরার লেগে যেতে পারে এখন, যা সে চায় না। এই প্রথমবার রায়ানের মিরাকে স্পর্শ করতে ভয় করছে। মিরা অপলক দৃষ্টিতে রায়ানের সেই কাঁপতে থাকা হাত দেখছে। কিছু বলার শক্তি ও হচ্ছে না তার কিন্তু অদ্ভুত ভাবেই তার খুব ইচ্ছে করছে রায়ান তার পেটে হাত রেখে তাদের ছোট প্রাণকে অনুভব করুক। রায়ানের হাত এগোচ্ছেই না যেন কত দূরত্বের পথ পারি দিচ্ছে। রায়ান মনে মনে নিজেকে বলল-

“Come on Rayan..,এর আগে তো কত বার ছুঁয়েছিস ওই জায়গা! তাহলে আজ কেন ভয় করছে? ওখানে তো তোর নিজের অংশ আছে এখন।”
ছেলেটার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে এসিতে থাকার পরও। রায়ান হঠাৎ নিজের হাত গুটিয়ে নিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“Wait wait wait..আগে আগে খুশি হয়ে লাভ নেই, পরে যদি সবকিছু ভুল হয়! তখন কি হবে? এটা কিভাবে সম্ভব! এক রাতের চেষ্টায় ফল পেয়ে গেলাম কিভাবে?”
রায়ান মাথা এমনি ঝাঁকিয়ে ডাক্তার সাহেবাকে প্রশ্ন করলো-
“Doctor, are you sure? I mean, আমরা বেবি প্লেন করেছি খুব বেশি দিন হয়নি। এতো কম সময়ে.. কিভাবে কি হলো একটু আশ্চর্য লাগছে। তাও আবার দেড় মাস..তাই জিজ্ঞেস করছি।”
ডাক্তার সাহেবা রায়ানের কথায় একটু গম্ভীর গলায় বললেন-
“I am sure Mr, Chowdhury..She is pregnant.. রিপোর্ট সেটাই বলছে। আর আমার অভিজ্ঞতাও তাই বলছে। আপনারা ঠিক কতদিন আগে বেবি প্লেন করেছেন বলতে পারবেন?”
রায়ান মিরার চোখের দিকে তাকালো, মিরা লজ্জায় মাথা একটু লজ্জায় নিচু করে নিজের পেটের দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে একটা লুকায়িত মুচকি হাঁসি। রায়ান মিরার অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইতস্তত বোধ দূর করে বলল-

“গত কাল।”
ডাক্তার সাহেবা রায়ানের কথায় একটু আবাক হলেন। সাইনটিফিকালি এটা কখনোই সম্ভব না। ডাক্তার সাহেবার মনেও এখন দ্বিধার সৃষ্টি হলো। তিনি মিরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখলেন-
“মিসেস চৌধুরী, আপনার লাস্ট ম্যানস্ট্রেশনাল সার্কেল কবে গেছে?”
রায়ানও মিরার দিকে তাকালো। এমন হঠাৎ প্রশ্নে মিরা একটু থতমত খেয়ে গেল। মিরার ঠোঁটর কোণে থাকা হাসিটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সে। মিরার চোখে মুখে ওই অস্থিরতা দেখে রায়ান একটু হলেও আন্দাজ করতে পারছিল তার অর্ধাঙ্গিনী তার কোনো এক রাতের ভুলের সুযোগটাই নিয়েছে। রায়ান মিরার দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে বলল-
“কিছু জিজ্ঞেস করছেন উনি। উত্তর দাও।”
মিরা একটু ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল-
“লাস্ট কবে গেছে খেয়াল নেই।”

ডাক্তার সাহেবা মিরার কথা নিজের হাসি আর ধরে রাখতে পারলেন না। রায়ানের হাত কপালে যাওয়ার অবস্থায়। এটা কেমন বোকা উত্তর হলো যে মনেই নেই। মিরা নিজের মাথা নিচু করে নিল সাথে সাথে। ডাক্তার সাহেবা মিরার লজ্জার কারণ বুঝতে পেরে আর কথা বাড়ালেন না। তিনি রায়ানের হাতে মিরার রিপোর্ট গুলো দিয়ে বললেন-
“মিস্টার চৌধুরী, আমার মনে হয় আপনার ওনার সাথে একা কথা বলা উচিত। আমি এখন আসছি। কোনো প্রয়োজন হলে নার্স কে জানাবেন। Again congrats, parents to be..”
রায়ান উঠে দাঁড়িয়ে হালকা মুচকি হেঁসে ডাক্তার সাহেবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল-
“Thank you so much doctor..”
ডাক্তার সাহেবা হাঁসি মুখে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলে রায়ান মিরার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বুকের উপর আড়াআড়ি হাত বেঁধে মিরাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মিরার সেই দিকে কোনো নজর নেই যেন রায়ান সেখানে নেই। সে তো কেবল নিজের পেটের উপর হাত বুলিয়ে যাচ্ছে যেন কতো কাঙ্ক্ষিত আর আদরের জায়গা সেটা। রায়ান ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না এখন তার কি বলা উচিত বা কি করা উচিত। বউয়ের সকল মনোযোগ এখন তার পেটের ভিতরে থাকা ছোট্ট প্রাণটার দিকে দেখে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
“কয়েক মিনিট ও হয়নি বাচ্চার অস্তিত্বের জানান পেল আর এখনি এই অবস্থা। আমার দিকে তো তাকাচ্ছেও না। আমার খুশি আমি কাকে দেখাবো?!”

রায়ান নিজের মতো চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল দেখে মিরা নিচের দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো..! এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন যে? বোকবেন না আমাকে?”
রায়ান মিরার প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার পাশে বসে মাথা কাত করে মিরার নিচু মুখটার দিকে তাকালো।
কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না সে। যেন শব্দগুলো গলা পর্যন্ত এসে থেমে যাচ্ছে। চোখদুটো স্থির হয়ে রইলো মিরার মুখে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো—মেয়েটাকে এখন অন্যরকম লাগছে, অদ্ভুত রকমের সুন্দর। একটা নরম আলো যেন মিরার মুখজুড়ে ছড়িয়ে আছে। সেই পরিচিত মুখটাই, অথচ আজ যেন নতুন করে সব সৌন্দর্য ধরা পড়ছে তার কাছে। একটু আগেও মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে দেহটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মা হওয়ার খবরটা শুনে মিরার ভেতর থেকে যেন এক অচেনা দীপ্তি বেরিয়ে এসেছে—চিকচিকে, উজ্জ্বল, শান্ত একটা আলো। রায়ানের বুকটা হালকা কেঁপে উঠলো।

এত সুন্দর… হয়তো কখনোই লাগেনি মিরাকে তার চোখে। মিরার চোখের কোণে, ঠোঁটের ধারে, পুরো অবয়বজুড়ে এক অদ্ভুত পূর্ণতার ছাপ। যেন জীবনের একটা বড়ো অধ্যায় নীরবে এসে তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। একটা সাধারণ মেয়ের জীবন থেকে, তার শখের পুরুষের সংসারের আদুরে বউ… আর এখন—তার সন্তানের মা।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই মিরার চোখ নরম হয়ে এলো।
মিরা এখনও নিচু হয়ে আছে, আঙুলগুলো একসাথে জড়িয়ে রেখেছে। লজ্জা, অচেনা অনুভূতি আর চাপা খুশিতে তার নিঃশ্বাসও যেন একটু ভারী। রায়ান ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মিরার থুতনিটা আলতো করে তুলে ধরে মিরার চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করে বলল-
“এই যে আমার বাচ্চার মা, মাথা নিচু কেন? বাচ্চার মা হচ্ছেন বলে ভুলে যাবেন না আপনি কারো বউ ও।”
রায়ানের কণ্ঠটা খুবই নিচু, কোমল। মিরা চোখ তুলতেই রায়ান আবার থেমে গেল। সেই চোখদুটোতেও অন্যরকম কিছু আছে—একটু ভয়, একটু লাজ, আর তার চেয়েও বেশি… এক অদ্ভুত তৃপ্তি। “আমার বাচ্চার মা” কথাটায় মিরা একটু অবাক হয়ে রায়ানের দিকে চেয়ে রইল। সে আগাম পাকামি করেছে বলে রায়ান তাকে বোকবে এমনি ভেবেছিল সে। তাই নিজের খুশি টুকু প্রকাশ করতে পারছিল না। মিরা সামান্য লজুক আর অনুতপ্ত সুরে মিনমিনিয়ে বলল-

“সরি!”
রায়ান মুচকি হেঁসে মিরার গালে টেনে বলল-
“বোকা মেয়ে, কিসের জন্য সরি বলছো শুনি? আমার মতো একটা সাধারণ ছেলেকে বাবা হওয়ার সুখটা দেওয়ার জন্য? নাকি আমার এই তুচ্ছ জীবন টা পরিপূর্ণ করার জন্য?”
মিরা ছলছল চোখে রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনি খুশি হয়েছেন?”
রায়ান মৃদু হেসে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে মিরার কানে কানে ফিসফিস করে বললো—
“আমাকে পূর্ণতা দিয়ে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ করার জন্য কৃতজ্ঞতা মিসেস।”

কথাটা বলেই সে মিরার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো। সেই স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো উত্তেজনা নেই, শুধু গভীর এক স্বীকৃতি, এক নিঃশব্দ ভালোবাসা। মিরা চোখ বন্ধ করে ফেললো। তার বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো এক উষ্ণ অনুভূতি। “হ্যাঁ”—এই জীবনটাই সে চেয়েছিল। আর আজ… সে সত্যিই পূর্ণ সে। রায়ান মিরার দুগালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে নিচু হয়ে মিরার পেটের কাছে নেমে এলো। মিরা পুলকিত নজরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে হাসছে শুধু। ছেলেটার চোখের মণি দুটো চকচক করছে। রায়ান আলতো করে মিরার পেটের উপর হাত রাখলো যেন সেখানে কোনো চাপ না পড়ে সেভাবেই। মিরা এই প্রথম রায়ান কে এতোটা সতর্কতা খেয়াল করলো রায়ানের ছোঁয়া তে। যেখানে লোকটা তাকে ছোঁয়ার আগে কখনোই দ্বিতীয় বার ভাবতো না এমন বেপরোয়া মানুষ টাও এতোটা সতর্কতা অবলম্বন করছে আজ। মিরা মুচকি হেঁসে রায়ানের মাথায় হাত রাখলো। মনে মনে ভাবলো, এই মানুষটা তাকে কতবার না করছে বাচ্চার আবদার করাতে। অথচ আজ তাকেই আজ সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট মনে হচ্ছে সেই ছোট্ট প্রাণের প্রতি। রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে মেয়েটার নরম পেটের উপর মাথা রেখে করুন নরম গলায় বলল-

“হ্যালো বেবি, আমি তোমার পাপা বলছি। শুনছো?”
মিরা রায়ানের এমন কাল্পনিক কথায় হেঁসে উঠলো। রায়ান মুখ উঁচু করে মিরাকে চোখ দেখিয়ে বলল-
“Don’t disturb us..!”
মিরা মুখে হাত দিয়ে চুপ করে গেলো। আড়ালেও সে হেঁসে যাচ্ছে। রায়ান পুনরায় নিজের মনোযোগ মিরার পেটের কাছে দিয়ে বলল-
“প্রিন্সেস, পাপা তোমার সাথে একটা ডিল করবো।”
মিরার কপালে আশ্চর্যতার ভাঁজ পড়লো। রায়ান নিজের থেকেই বলে গেল একতরফা-
“মাম্মা তোমাকে অনেক ভালোবাসে। মাম্মার এই সুন্দর শরীর টার ভেতর যতদিন তুমি থাকবে একদম দুষ্টুমি করবে না। মাম্মা কে কোনো কষ্ট দেবে না। ঠিক আছে? মাম্মা তো খুব ছোট, ১৮বছর বয়সটা কি কোনো বয়স হলো বলো তো? কিন্তু তোমার মাম্মার সাহস আছে মাশাআল্লাহ।”
মিরা বিরক্ত হয়ে রায়ানের চুল টেনে ধরে বলল-
“ভালো ভালো কথা বলুন ওকে। কিসব বলছেন? ছোট্ট বলছেন কেন আমাকে। পড়ে বড় হয়ে আমাকে ভয় পাবে না।”
রায়ান মিরার ধমকে মিরার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-

“আমি তো পাই। বাচ্চার ভয় পেতে হবে না।”
-“আমি আপনাকে ভয় দেখাই?”
-“ভয় দেখাও তা কখন বলেছি? বললাম- আমি ভয় পাই।”
মিরা নির্বাক রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা এতোটা ঘুরিয়ে কথা বলে যে তার কিছু বলারও থাকে না কখনো। রায়ান মিরার দিকে আর পাত্তা না দিয়ে মিরার উদরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“আমার লক্ষ্মী প্রিন্সেস..তুমি তোমার মাম্মার খুব শখের, আর তোমার মাম্মা আমার। পাপার শখের জিনিসে আঘাত কিন্তু পাপাকেও খুব কষ্ট দেবে। তাই লক্ষী বাচ্চার মত থাকবে ওকে? Papa, loves you so much, a lot..but not more then your mamma…”

রায়ান অবুঝ একটা শিশুকে কল্পনা করে এই সাবধান বাণী দিয়ে মিরার উদরে মুখ ডুবিয়ে একটু দৃঢ় চুমু খেল। মিরা মুখে একটা প্রসস্থ হাঁসি নিয়েই চোখের পানি ফেলছে। সে ভাবে ছিল রায়ান হয়তো বাচ্চার খবরে বাবা হওয়ার আনন্দ পাই বড় করে দেখবে খুব বেশি কিছু ভাববে না। অথচ তাকে ভুল প্রমাণ করে ছেলেটা এতো বড় আনন্দের মাঝেও তার আরাম, স্বস্তি আর তার সুরক্ষা নিয়েই ভেবে যাচ্ছে। এমনকি নিজের অনাগত অংশ কেও তাই শিক্ষা দিচ্ছে। রায়ান আরো কিছুক্ষণ মিরার কোমর জড়িয়ে মিরার উদরে মাথা রেখে তার সাথে লেপ্টে থাকলো। মাঝে মাঝেই খুব আদর করছিল সেখানে। মিরারও কোনো বিরক্তি অনুভব হচ্ছিল না। সে সন্তুষ্ট মনে রায়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। এভাবে কখনো যে দুজন, না দুঃখিত তিনজন ঘুমের দেশে পারি জমালো তা বলা গেল না।

পরের দিন সকাল~
চৌধুরী বাড়ির সবাই একসাথে এসে মিরার সাথে দেখা করতে। কেবিনের দরজা বন্ধ। ভেতরে রায়ান মিরা দুজনেই ঘুমিয়ে আছে। এইদিকে মিরার জ্ঞান ফেরার কথা শুনে সবাই উৎকণ্ঠিত হয়ে আছে মিরার সাথে দেখা করবে বলে। সোরায়া নিজেকে আর আটকে রাখতেই পারছে না। সে একটু জোড়েই কেবিনের দরজায় নক করে চেঁচিয়ে উঠলো-
“ভাইয়া…? আপু.. দরজা খুলো।”
রুদ্র পিছন থেকে সোরায়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
“গাধি রে এইটা বাড়ি না আমাদের, হসপিটাল! গলা কমা।”
সোরায়া ব্যাথা তুর আওয়াজ করে নিজের মাথা ঘষতে থাকলো। মাহির উল্টো রুদ্রর মাথায় গাট্টা মেরে দাঁত কটমট করে বলল-

“তুই ওকে আমার সামনে মারলি কোন সাহসে? গর্দভ..! ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে ভুলে গেছিস?”
রুদ্র ও ব্যাথা তুর আওয়াজ করে মাথায় হাত ঘষতে ঘষতে বিরক্ত গলায় বলল-
“ভুলতে চাইলেও কি ভুলতে দাও? সারাদিন কথায় কথায় বিয়ে ঠিক, বিয়ে ঠিক এই উক্তি জোপতে থাকো। ভুলবো কিভাবে? বউ হওয়ার আগেই এমন অধিকারবোধ। যত্তসব ন্যাকামি হুহ…!”
মাহির ধমকের সুরে বলল-
“কেন ভুলতে দেব? কত কাজ তোর এই বিয়ে তে। ভাই বলে কথা। অথচ আমার বাচ্চা বউ টাকে মারছিস। একবার নিজের কাছে নিয়ে যেতে দে.. আর দেখতে পাবি না।”
রুদ্র ও ভাব দেখিয়ে বলল-
“মাহির ভাই, তুমিও আমার ভাইয়ার মতো বউ পাগল হয়ে গেলে? তাও বিয়ের আগে? হসপিটালে দাঁড়িয়েও বিয়ে ঠিক হয়েছে বলে ফ্লেক্স করতে হবে?”

মাহির দাঁত বের করে রিমিকে দূর থেকে রামিলা চৌধুরীর সাথে হেঁটে আসতে দেখে ডাক দিয়ে বলল-
“এই রিমি..দেখ রুদ্রর নাকি কোন নার্স কে ভালো লাগছে হসপিটালে এসেই।”
রুদ্র চটজলদি মাহিরের মুখে হাত দিয়ে মিনতির সুরে বলল-
“ভাই ভাই ভাই, পায়ে পড়ি। আমার সংসারে আগুন লাগিয়ো না। তোমার বাসর ঘর আমি আর রিমি মিলে সুন্দর করে সাজাবো প্রমিস। ভাইয়ার টার থেকেও সুন্দর করে।”
মাহির রুদ্রর হাত আঁটকে ধরে বলল-
“থাক তোর ভাই যে হিংসুটে..পরে দেখা যাবে, আমার বাসর ঘর বেশি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বলে নিজেও আবার বাসর ঘর সাজিয়ে বাসর করে নেবে। তা হতে দেওয়া যাবে না।”
রুদ্র অসহায় গলায় বলল-

“উল্টো পাল্টা অপবাদ দিও না আমার নামে প্লিজ।”
সোরায়া তার পিছনে তাদের কথোপকথন শুনে বিরক্তিকর এটা প্রতিক্রিয়া করে বলল-
“এখানে আমি আমার আপুর সাথে দেখা করতে আসছি আর এরা পড়ে আছি বিয়ে, বাসর নিয়ে। বেডা জাত..!”
মাহির রুদ্র কে ছেঁড়ে দিয়ে সোরায়ার দিকে নজর দিয়ে সোরায়ার মাথায় রুদ্র যেখানে মেরেছিল ওইখানে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“আমার জান বাচ্চা, লেগেছে বেশি? পানি দিতে হবে?”
সোরায়া বাঁকা চোখে তাকিয়ে রূঢ় গলায় বলল-
“এসব আলগা পিরিতি দেখার সময় নেই। নিজের বন্ধুকে ডাকে দরজা খুলতে বলুন। আমি আমার আপুর সাথে দেখা করবো।”
মাহির সোরায়ার মাথা থেকে মাথা নামিয়ে নিলে রামিলা চৌধুরী আর রিমিও দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সবাইকে এখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিমি প্রশ্ন করলো-

“সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
রামিলা চৌধুরী তাড়া দিয়ে বললেন-
“কি অদ্ভুত। এখানে সং এঁর মতো দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে ঢোক না।”
রুদ্র রিমির কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে মার কথার জবাবে বলল-
“তোমার গুনোধোড় ছেলে দরজা খুললে না ভেতরে ঢুকবো।”
রামিলা চৌধুরী আর রিমি অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো দরজা সত্যিই লক করা। আর এরপর শুরু হলো একেরপর এক হাক ডাক।

দরজায় করা শব্দে মিরার আগে ঘুম ভাঙল। একটু হকচকিয়ে চোখ খুলে খেয়াল করলো রায়ান তার পেটের কাছেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। মিরা তাড়াতাড়ি করে রায়ানের মাথা হাত রেখে তাঁকে ডাকলো-
“রায়ান..এই..উঠুন। বাড়ির সবাই এসেছে হয়তো। উঠে দরজাটা খুলুন।”
রায়ান ঘুমের ঘোরেই আরো শক্ত করে মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল-
“আর একটু ঘুমাই পাখি।”
মিরা করুন সুরে রায়ান কে আদুরে গলায় বলল-
“এমন করে না.. উঠুন সবাই কিনা কি ভেবে বসবে। আল্লাহ! সোনা হাব্বি আমার, উঠুন প্লিজ।”
রায়ানের কোনো হেল দোল নেই দেখে মিরা বাঁধ হয়ে মৃদু আর্তনাদ করলো-
“আউউউ্, ও মাআআআ.. আহহ্..!”
বেস! সাথে সাথে ছেলেটা অপরিপক্ক ঘুম থেকে উঠে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলো-
“কি কি কি হয়েছে? ব্যাথা করছে? ডাক্তার ডাকবো?”
মিরা দরজার দিকে হাত উঁচু করে ইশারা করে বলল-
“দরজা খুলুন গিয়ে?”

রায়ান একটু হুশে ফিরতেই বাইরের সবার ডাক শুনতে পেল। রায়ান মিরার কথা অনুযায়ী দরজার দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎ থমকে গিয়ে আবার মিরার কাছে ফিরে এসে বোকা বোকা মুখ করে জিজ্ঞেস করলো-
“হৃদপাখি..সবাইকে বেবি আসার খবরটা কিভাবে বলবে কিছু ভেবেছ?”
মিরা চোখ ছোট ছোট করে জিজ্ঞেস করলো-
“আমি আবার কি ভাববো? বাচ্চার বাবা আপনি, বেবি আসবে এই খবর কার দেওয়ার কথা?”
রায়ান একটু অবুঝের মতো মাথা চুলকালো নিজের। জীবনে এই মুহূর্ত গুলোর সম্মুখিন কিভাবে হবে তা নিয়ে তো তার আগে ভাবা ছিল না। এখন হঠাৎ করে এমন কিছু হবে তা কে জানতো। মিরা রায়ান কে এই ছোট্ট বিষয়টা নিয়ে এমন ভাবে অস্থির হতে দেখে দ্বিধায় প্রশ্ন করে বসলো-
“আপনি কি প্রেগন্যান্সির বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন?”
রায়ান এমন প্রশ্নে হকচকিয়ে উঠে বেফাঁস বলে ফেলল-
“আমি লজ্জা পেলে তুমি প্রেগন্যান্ট হতে নাকি?”
মিরা রায়ানের কথা ধরেই বলল-

“তাহলে তো হলোই। যান গিয়ে দরজা খুলুন আর বলুন গিয়ে।”
রায়ান মিরার দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে মিনতির সুরে বলল-
“বেইবি, একটু প্রেকটিস করে নিয়ে কিছু দিন পর বলি? একটু বুঝো হঠাৎ এমন কিছু বলতে কেমন কেমন
লাগে না বলো?”
মিরা একটু জোরে চেঁচিয়ে উঠেই বলল-
“প্রেগন্যান্ট কি আমি একা একা হইছি? আপনারই তো কর্ম ফল। যখন পরীক্ষা দিতে কেমন কেমন লাগে নি পরীক্ষার রেজাল্ট বলতে কেমন কেমন লাগবে কেন শুনি?”
রায়ান মিরাকে হাইপার হতে দেখে একটু চিন্তিত হয়ে গেল। এমন অবস্থায় শরীরের এমন হাল নিয়ে উত্তেজনা তার জন্য খারাপই হবে তাই মিরার কথাই মেনে নিল সে চুপচাপ-
“ওকে, ফাইন।‌ খুলছি। শান্ত হও। বেবির কষ্ট হবে। সাথে তোমার ও। মা হতে চলেছো বলে যে সব ব্যাথা ঠিক হয়ে গেছে এমন না। শরীর এখনো খারাপ তোমার।”
মিরা শান্ত হয়ে গেল সাথে সাথে। রায়ান দরজার দিকে এগিয়ে গেলে সে নিজের এক হাত পেটের উপর রেখে আদর করে বলল-

“সোনাই, তোর পাপা ভীষণ তেড়া। শুধু আমার কাছেই তার তেড়ামি ভাত পায় না বুঝেছিস? তুই এলে একসাথে মাথা খাবো তোর পাপার। বেডায় ইদানিং অতিরিক্ত উড়ছে।”
রায়ান হঠাৎ দরজার খুলে দিতেই সোরায়া মাহির রুদ্র রিমি একসাথে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে চলে এলো। রামিলা চৌধুরী সবার শেষে ঢুকলেন। সোরায়া ঘরে ঢুকেই মিরাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। বাচ্চা মেয়ে ভয়ে কেঁদেই দিয়েছে। রিমিও এগিয়ে গিয়ে মিরার পাশে দাঁড়ালো। রুদ্র মাহির রায়ানের কাছে এসে দাঁড়ালো। রুদ্র একটু অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করলো-
“কতক্ষন ধরে নক করছি দরজায়! এতক্ষণ লাগে একটা দরজা খুলতে?”
রায়ান বাঁকা চোখে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল-
“আগে হোক পরে হোক খুলেছি তো। তাই না? খুশি থাক।”
মাহির হেঁসে রায়ানের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-
“কিরে তুই এমন ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে আছিস কেন? মনে হচ্ছে, কিছু নিয়ে খুব চিন্তায় আছিস।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরের দিকে তাকিয়ে মাহির কে জড়িয়ে ধরলো হঠাৎ। মাহির একটু হতবাক হয়ে রুদ্রর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। রুদ্র ও অবাক। রায়ানের জীবন মিরা আসার পর এমন খুব কমই হয়েছে যে সে অন্য কাউকে কখনো জড়িয়ে ধরেছে। মাহির পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে রায়ানের পিঠ চাপড়ে শান্ত গলায় বলল-
“কিরে? কি হয়েছে? ভাবি তো ঠিক আছে। এমন আচরণের মানে কি? ভাবির কি কিছু হয়েছে? তোর কিছু হয়েছে? শরীর খারাপ?”

রামিলা চৌধুরী সোজা মিরার কাছে গিয়ে বসলেন। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে মিরাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন ঠিক কতটা লেগেছে মেয়েটার। শরীরের বেশ কিছু জায়গায় ব্যান্ডেজ জড়ানো দেখে তিনি একটু চিন্তিত হয়ে উঠলেন। রিমি আর সোরায়া তো একেরপর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে- মিরা ঠিক আছে কিনা কিছু লাগবে কিনা ইত্যাদি। সোরায়া তো পুকুরে থাকা জোকের মতো মিরার সাথে লেপ্টে আছে। বাড়ির সবাইকে তার জন্য এমন চিন্তায় দেখে মিরার চোখ নরম হয়ে আসছিল বারবার।
রুদ্র রায়ান কে এমন সিরিয়াস হতে দেখে মনে মনে ভাবলো- হয় তো মিরার খুব সিরিয়াস কিছু হয়েছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশেপাশে চোখ বুলালো। বেড সাইডের টেবিলের উপর রাখা রিপোর্ট ফাইলটা তার নজরে পড়তেই সেটা নিজের হাতে নিয়ে খুলে দেখলো। মিরা রুদ্র কে রিপোর্ট ফাইলটা নিয়ে দেখে মনে মনে সামান্য লাজুকতায় মুচকি হাসলো। রুদ্র আর বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি ফাইলটা খুলে মিরার সব রিপোর্ট দেখতে লাগলো। কিন্তু তার নজর গিয়ে ঠেকলো একটা জায়গায়-

“Pregnancy positive..”
রুদ্র তৎক্ষণাৎ চিৎকার করে উঠলো যেন ভুত দেখেছে সে-“আআআআআআ..”
সবার রুদ্রর এমন চিৎকারে রুদ্রর দিকে তাকালো। রিমি তাড়াহুড়ো করে রুদ্রর কাছে এসে রুদ্রর হাত ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“কি হয়েছে আপনার..? এমন ভাবে চিৎকার করলেন কেন?”
রুদ্র রিমির দিকে নির্বাক তাকিয়ে আছে। সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মিরা রুদ্রর চিৎকার শুনে নিজের কানে হাত রেখে মিটিমিটি হাসছে। রায়ান রুদ্রর হাতে রিপোর্ট ফাইলটা দেখেই বুঝলো রুদ্র কেন চিৎকার করেছে। রায়ান মিরার দিকে একবার তাকিয়ে মেয়েটার চোখে মুখে মা হওয়ার খুশি দেখে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সত্যিই তো, এতো বড় খুশির সংবাদ জানানোর মাঝেও একটা শান্তি আছে। রায়ান এগিয়ে গিয়ে রুদ্রর সামনে দাঁড়িয়ে হাত পেতে বলল-

“আমাকে দে ফাইলটা।”
রুদ্র কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ফাইলটা রায়ানের হাতে দিয়ে দিল। রায়ান সেটা নিজের হাতে নিয়ে রুদ্র কে বলল-
“Congratulations chacchu to be..”
রুদ্র রায়ানের চোখের দিকে তাকাতেই তারা একসাথে হেসে উঠলো। রুদ্র খুশিতে রায়ান কে জড়িয়ে ধরলো। উপস্থিত সবাই হতবাক। দুই ভাইয়ের হঠাৎ কি হলো কেউ বুঝতে পারছে না। কিন্তু সেই দৃশ্য মিরা খুব খুশি মনে উপভোগ করছে। একটু পর রুদ্র সরে গেলে রায়ান মিরার কাছে গিয়ে বসে। আর বাকিরা সবাই তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ করছে। সবার চোখে কৌতুহল আর রুদ্র তো এক মুহুর্ত দেরি না করে ছুটেছে মিষ্টি আনতে কাউকে কিছু জানিয়েও যায় নি। এখন সবার চিন্তা হচ্ছে ওই রিপোর্টে কি আছে তা নিয়ে। রায়ান মিরার হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে একটু মুচকি হেঁসে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল-
“আমাদের কিছু বলার আছে তোমাদের।”
সবাই খুব গম্ভীরতা নিয়ে রায়ানের কথায় তাদের দিকে মনোযোগ দিল। রামিলা চৌধুরী একটু অধৈর্য হয়েই বললেন-

“কি বলার আছে একটু তাড়াতাড়ি বল না রে বাপ। প্রেশার বাড়ছে আমার।”
রিমি রামিলা চৌধুরী কে ধরে দাঁড়ালো। রায়ান একটু অন্যভাবে তাদের প্রেগন্যান্সির কথাটা বলল অবশেষে-
“একটু কাজ বেড়েছে তোমার এই আর কি।”
-“কি কাজ বাড়িয়েছিস আমার।”
“আমরা এখন তিনজন। একটা নতুন প্রাণের দায়িত্ব কি কম বলো? দিদা হিসেবে তোমার তো অনেক কাজ।”
রামিলা চৌধুরী রায়ানের কথায় প্রথমে একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাকিয়ে থাকলেও পরে অজান্তেই হেঁসে উঠে পাল্টা প্রশ্ন করলেন-

“এটা কি সত্যি সত্যি?”
রায়ান উপর নিচ মাথা নাড়ালো। রামিলা চৌধুরী দ্রুত গিয়ে মিরার পাশে বসে মিরার দু গালে হাত রেখে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন-
“আমার সোনা মা, কি সুখবর দিলি এইটা! আমি তো খুশিতে পাগল হয়ে যাবো। আমি দাদি হবো?”
মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করে নিয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। রিমি সোরায়া মাহির হা হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। রায়ান সোরায়া আর রিমিকে উদ্দেশ্যে করে মজার ছলে বলল-

“এইযে হবু চাচি আম্মা আর খালাম্মা! আপনাদের কি সাপে কাটলো? এতো ঠান্ডা চুপচাপ কেন?”
রিমি সোরায়ার একসাথে ঘোর ভাঙলো। চাচি আম্মা খালাম্মা ডাক গুলো কেমন অদ্ভুত আনন্দের শুনালো তাদের কাছে। দুজন হাসি মুখে মিরার কাছে গিয়ে অভিনন্দন জানালো। আর সোরায়া তো একদম মিলায় পেটের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে। মিরা সোরায়ার মাথা হারকা করে গাট্টা মেরে বলল-
“এই গাধী, কি করিস? বেবি কি বড় হয়েছে যে সাড়া দেবে!”
সোরায়া খিলখিলিয়ে হেসে বলল-

“আপু এই ছোট্ট জায়গায় বেবি ঠিক মতো বড় হতে পারবে? কেমন জানি ফ্যাসিনেশন হচ্ছে আমার। আমি বেবিকে দেখার জন্য অনেক এক্সাইটেড।”
সোরায়ার কথায় মিরা ফিক করে হেঁসে উঠলো। রামিলা চৌধুরী মিরার শরীরের অবস্থা নিয়ে একটু চিন্তিত হয়ে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলেন-
“রায়ান, ডক্টর কি বলেছেন? কালকের এ্যাকসিডেন্টে মিরার এতো টা লেগেছে। বেবির কোনো ক্ষতি হয়নি তো?”
রায়ান মিরার মাথায় হাত রেখে কয়েকবার ট্যাপ করে বলল-
“স্ট্রং মায়ের স্ট্রং বেবি। ওর কি হবে? চিন্তা করার কিছু নেই। ডক্টর খারাপ কিছু বলেন নি। এখন থেকে তোমার বউমাকে কেয়ারফুল থাকতে বলো। আমার কথার অবাধ্য যেন না হয় সে।”
মিরা মাথা উঁচু করে রায়ানের দিকে মায়াবী দৃষ্টি যে তাকালে রায়ান মিরার উদ্দেশ্যে বলল-
“এমন ভাবে মায়া লাগিয়ে লাভ হবে না। আমি আমার বউ বা বাচ্চা কারোর জন্যই অবহেলা সহ্য করবো না। যা বলবো তা লক্ষ্মী বউয়ের মতো শুনবে। বুঝেছ?”

মিরা বাচ্চা দের মতো মুখ করে রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে নালিশ দিয়ে বলল-
“মামণি, তোমার সামনে আমাকে ধমকাচ্ছে। কিছু বলছো না কেন তুমি?”
রায়ান মিরার নালিশের তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে বিড়বিড় করলো-
“এই মেয়ে নাকি আবার মা হবে। ও খোদা..!”
রামিলা চৌধুরী মিরার মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিয়ে বললেন-
“থাক, তুই শুনিস না ওর কথা। ওকে আমি পরে ভোগে দেব। কিন্তু ও তো ভুল কিছু বলে নি তাইনা। বেবির কেয়ার করতে হবে তো? আর বেবি এখন তোর ভেতরে তাই তোর নিজের কেয়ার করতে হবে।”
মিরা কথার সারমর্ম বুঝে চুপ হয়ে গেল। রায়ানের চোখ হঠাৎ মাহিরের উপর গিয়ে থোমকে গেল। মাহিরের পা যেন এক জায়গায় জমে গেছে। কোনো নড়াচড়া নেই তার। রায়ানের কৌতুহলে মাহিরের কাছে গিয়ে তার কাঁধে ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“কিরে তোর কি হলো? কিছু বলছিস না। তুই তো চাচা, খালু দুইটা একসাথে হবি। তোর মাঝে কোনো আনন্দ নাই কেন?”
মাহির অসহায়ের মতো রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“তুই বাপ হয়ে গেলি? আমার তো এখনো বিয়ে টাই হলো না।”
রায়ান হতবাক হয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে বলল- “কিহ্?”
মাহির করুন সুরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“তোর সমবয়সী হয়ে তুই যখন বাচ্চা পালবি তখন আমি আমার বাচ্চা বউকে পালবো। এমন না ইনসাফি মানা যায়? তুই বল”

রায়ানের মুখে কোনো করি আসছে না। বন্ধুর মুখে এমন সব কথাও শুনবে তা সে চিন্তাও করে নি। মাহির বুকফাটা কষ্টে রায়ান কে জড়িয়ে ধরে বলল-
“আমার কি হবে রে..! আমি এখনো বিয়েই করতে পারলাম না, আব্বু ডাক কবে শুনবো?”
রায়ান কিছু না বুঝে উঠেই মাহির কে স্বান্তনা দিয়ে বলল-
“থাক কষ্ট পাস না। আমি দেখছি বিষয়টা।”
মনমরা হয়ে মাহির জিজ্ঞেস করলো-
“কি করবি তুই?”
রায়ান হালকা মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করল-
“তুই বলো- তুই কি চাইছিস এখন? কি করবো আমি?”
তৎক্ষণাৎ মাহিরের মুখ থেকে উদাসীনতা চলে গেল। রায়ান তার এমন পরিবর্তন দেখে অবাক। মাহির রায়ানের প্রতি অগ্রীম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলল-

“Thank you. Thank you so much। তাহলে আমার আর সোরায়ার বিয়ে টা একটু তাড়াতাড়ি করা। বেশি না একটু তাড়াতাড়ি.. ধর কাল পরশুর মধ্যে হলেই হবে।”
রায়ান চোখ পাকিয়ে মাহিরের দিকে তাকিয়ে বলল-
“তোর যে মাথায় ছিট আছে আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। হুদাই দরদ দেখাতে গেছিলাম। এত কম সময়ে বিয়ে হয়?”
-“তোর বিয়ের আয়োজন কয়েক ঘণ্টার মধ্যে করেছীলাম আমরা। বেইমান কোথাকার।”
রায়ান আর বেশি কিছু বলল না। একবার মিরার সাথে হেঁসে খেলে কথা বলতে থাকা সোরায়ার দিকে তাকিয়ে আবার মাহিরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-
“দুইজনেরই পছন্দের রুচি ভালো। কিউট তো লাগবে দুজনকে একসাথে।”
মাহির রায়ানের হাতে ধরে বলল-

“কিছু একটা কর না বন্ধু। তুই অন্তত আমার কষ্ট টা বোঝ।”
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির কে শান্ত গলায় বলল-
“আচ্ছা ঠিক আছে। দেখছি আমি কথা বলে দেখি সবাই কি বলে। কিন্তু আরো পাঁচ ছয় মাস পরের সিদ্ধান্ত তো কাল পরশুতে আনা যাবে না। এইটা পারবো না‌।”
-“ওকে ডান। তুই যতটা সম্ভব আগা।”
-“হুম, এবার তো খুশি হো একটু। আমি বাপ হবো ব্যাট্টা। ভাব একবার, তুই চাচা হবি।”
মাহির রায়ানের সাথে কোলাকুলি করে উৎসাহিত কণ্ঠে বলল-
“তোর কি মনে হয় আমি খুশি না? মনে মনে তো এই জন্য লাড্ডু ফুটতেছে। ছোট্ট সোনা মনি কে আমি নিজে বাইক চালানো শিখাবো।”

-“জিপার জন্য ওর মাই যথেষ্ট। তোর আর আমার কষ্ট করতে হবে না।”
দুইজন বন্ধু এখন একে অপরের জন্য বিশাল খুশি। সবার মনোযোগ এখন মিরার উপর। মিরাও বেশ খুশি সবার অ্যাটেনশন পেয়ে। রুদ্র মিষ্টি নিয়ে এলে সবাই মিষ্টি মুখ করলো। সাথে গোটা হসপিটালেও একটা আলাদা খুশির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। রায়হান চৌধুরী কাজের জন্য বাড়ি থেকেই কাজ করছিলেন। তাকে এই খবর জানানোর পর তিনি মিরাকে বাড়িতে নিয়ে আসার কথা বললে রায়ান ও তাতে সম্মতি দেয়। হসপিটালের ফর্মালিটিজ শেষ করে ২৪ ঘণ্টা মিরার দেখা শোনার জন্যে একজন নার্স হায়ার করে মিরাকে নিয়ে চৌধুরী বাড়িতে ফিরে আসা হয়। বাড়ি ফেরার সাথে সাথে একটা উৎসব মুখর পরিবেশের সৃষ্টি হলো। রায়হান চৌধুরী মিরার নজর কাটিয়ে অনাথ শিশুদের জন্য কয়েক লক্ষ অর্থ অনুদান দিলেন। মিরার দূর্ঘটনার খবর পেয়ে রোকেয়া বেগম এবং শফিক রহমান দুজনেই ঢাকা এলেন। কিন্তু এতো বাজে ঘটনার পর এমন খুশির খবর পেয়ে তারা দুজনেই খুশি।
মেয়ের আর তার বাচ্চার সুস্থতার চেয়ে বেশি তাদের কাছে কিছুই প্রাধান্য পায় নি। রায়ান কে একের পর এর কল ও অনেকে বাড়িতে এসে দেখা করে বাবা হওয়ার সাধুবাদ জানিয়ে যাচ্ছে। রায়ান কে এই প্রথমবার এতোটা লাজুক দেখছে মিরা‌। চারপাশের সব ব্যস্ত তা ঠেলে রায়ান মিরার পাশে এসে বসলেন মিরা রায়ানকে ভেংচি কেটে বলল-
“লোকের কথায়, লজ্জা তো এমন ভাবে পাচ্ছেন, যেন আমি আপনাকে প্রেগন্যান্ট করে দিয়েছি।”
রায়ান সাথে সাথে প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল-

“ছিঃ ছিঃ! কি বলো এসব পাখি। আমার কি প্রেগন্যান্ট হওয়ার ক্ষমতা আছে? আর না তোমার আমাকে প্রেগন্যান্ট করার ক্ষমতা আছে? আমাকে আল্লাহ যে ক্ষমতা দিয়েছেন তা কাজে লাগিয়েই তো আজ এই ফলাফল ও পেয়েছি।”
মিরা লাজুক হেঁসে রায়ানের বুকে আঘাত করে বলল-
“আর কিছু দিন পর বাচ্চার বাবা হয়ে যাবেন। মুখটা একটু সামলে নিন।”
রায়ান নিজের ঠোঁট দুটো চুমুর ন্যায় এগিয়ে দিয়ে বলল-
“একটু সামলে দাও তো।”
মিরা মুখ টিপে হেঁসে রায়ানের ঠোঁট টুপ করে একটা চুমু দিয়ে বলল-
“হয়েছে এবার? চুপ থাকবেন এখন।”
রায়ান মিরার ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে গিয়ে বলল-
“যতক্ষণ চুপ রাখতে পারবে ততক্ষণ চুপ থাকবো। Keep my lips busy..”
মিরা একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করে বলল-

“No.. রায়ান প্লিজ। এখন না।”
-“এখনি। আমি মিষ্টি মুখ করি নি এখনো। আমাকে বাবা হওয়ার খুশিতে মিষ্টি মুখ করাবে না?”
-“আমি বনুকে বলে দিচ্ছি ও মিষ্টি এনে দেবে।”
-“উঁহু, আমি আমার বাচ্চার মার থেকে মিষ্টি মুখ করবো। কাছে আসো।”
মিরা একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল-
“Just 5 minutes..

মিরা সম্মতি দেওয়ার আগেই মেয়েটা চুপ হয়ে গেল। তার ঠোঁট জোড়া এখন আর তার আয়ত্তে নেই বরং অন্য কারো তৃষ্ণা নিবারণে ব্যস্ত। রায়ান উন্মাদের মত মিরার ঠোঁট জোড়ার সকল মিষ্টত্ব নিজের মাঝে শুষে নিতে থাকলো। মিরা রায়ানের পাগলামির লিমিট খুব ভালো করেই জানে। ছেলেটা ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। রায়ানের হাত মিরার কোমর থেকে সরে তার উদয়ের দিকে গেল ধীরে ধীরে কখন যে জামার ভেতরে প্রবেশ করেছে সেই পুরুষালী হাত তার কোনো ধারণা নেই। মিরা ক্ষীণ নিঃশ্বাসের চাপে রায়ান বুকে মৃদু ধাক্কা দিল। কিন্তু এতে করে হয়তো রায়ানের পাগলামি বাড়লো বই কমলো না। মিরার বন্ধ চোখ জোড়া বড় বড় হয়ে খুলল নিজের বক্ষযুগলের উপর চাপ অনুভব হতেই। এমন পর্যায় থেকে সে কখনো রায়ানকে আটকাতে পারে নি। কিন্তু এখন তার শরীরের অবস্থা এমন কিছু মানতে পারবে না। তাই নিজে রায়ানের হাতের উপর হাত রেখে সেখান থেকে নামিয়ে আনলো। রায়ানের ঘোর ভাঙলে সে মিরার ঠোঁট ছেঁড়ে দিয়ে মিরার গলায় মুখ গুঁজে গভীর নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলল-
“Ohhh fuck.. I lost it..সরি পাখি।”

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭২

মিরার শরীর ও নেতিয়ে গেছে এই অল্প সময়ে। সে সুস্থ শরীরে ও রায়ানের সাথে পেরে উঠেনি কখনো আর এই অবস্থায় তো কঠিন হবেই রায়ান কে সামলানো। মিয়াও রায়ানের কাঁধে ভার ছেড়ে দিয়ে হাপাচ্ছে। রায়ান মিরার গলায় ছোট চুমু দিয়ে সোজা হয়ে মেয়েটার কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল-
“আর এমন হবে না সোনা। সরি। বেশি লেগেছে?”
মিরা না সূচক মাথা নাড়ল। রায়ান মিরাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-
“রেস্ট নাও একটু। ভালো লাগবে।”
মিরাও ওভাবে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। এরপরের দিন গুলো তাদের স্বাভাবিক ভাবেই কেটে গেল। ঠিক যেন রূপকথার গল্প।

আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৭৪