আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৬
অরাত্রিকা রহমান
ফেব্রুয়ারি, ১২~
সকাল প্রায় সাতটা। শীত আর গরমের মাঝামাঝি এই সময়টায় আবহাওয়ার ভেতর এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি থাকে। বাতাসে হালকা শীতল ছোঁয়া, কিন্তু রোদের ভেতর আবার নরম উষ্ণতা। পূর্ব আকাশে সূর্যটা ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, তার আলো মাটির ওপর সোনালি আস্তরণ বিছিয়ে দিচ্ছে।
মিরা আর রায়ানের বেড রুমের টাইলছেও সূর্যের কিরণের চাকচিক্যতা ফুটে উঠছে। বিছানার সাদা কম্ফোরটার মাঝে রায়ানে উন্মুক্ত পিঠটা উঁকি দিচ্ছে। ছেলেটার চোখে মুখে ক্লান্তি আর শান্তি দুটোই উপস্থিত। হঠাৎ রায়ান মুখের উপর ধাপ করে একটা কাপড় এসে পড়লো। রায়ান ঘুমের ঘোরে চমকে উঠে বিগড়ানো মেজাজে বলে উঠলো-
“Who the fu** is here..?!”
সাথে সাথে আরেকটা কাপড় উড়ে এসে তার মুখের উপর পড়লো। একটা মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো-
“Fu** কি হ্যাঁ!? আমি আপনার বউ।”
রায়ান ঘুম ঘুম চোখে সোজা তাকিয়ে দেখলো মিরা বিরক্ত মুখে আলমারির সব জামা কাপড় এলো মেলো করছে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানির ফোঁটা গুলো বেয়ে বেয়ে পড়ছে। রায়ান চোখ কোচলে মিরাকে ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“রোজ সকালে একা শাওয়ার নেওয়ার জন্য বকা শুনো আমার থেকে। আজকেও একই কাজ করেছ কেন জানতে পারি?”
মিরা বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“আমি রোজই আপনাকে ডাকি। আপনিই তো বলেন আপনার ঘুম পুরো হয়নি আরো ঘুমাবেন। আমি কি করবো তাহলে?”
রায়ান উঠে বিছানায় হেলান দিয়ে দিতে বলল-
“কিছু করতে হবে কেন? যতক্ষণ আমি শুয়ে থাকবো তুমি আমার সাথে শুয়ে থাকবে।”
মিরা সোজা উত্তর দিল-“পারবো না। আপনার অফিস আপনার তাই যখন খুশি যেতে পারবেন, আমার ক্যাম্পাসে এসব চলে না।”
রায়ান মনে মনে বিড়বিড় করলো-“সবকিছুর উত্তরেই এক কথা, পারবো না। পারবে টা কি তাহলে!?”
মিরা রায়ানের দিকে আর পাত্তা না দিয়ে আলমারি তে মনোযোগ দিলো। রায়ান চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো সম্পূর্ণ বিছানায় জাগায় জাগায় এলোমেলো জামা কাপড় পড়ে আছে সাথে মিরার ইনার গুলো ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রায়ান ভ্রু কুঁচকে মিরাকে জিজ্ঞেস করল-
“কি অবস্থা করেছ রুমটার! কি খুঁজছো আলমারি তে?”
-“পড়ার জন্য জামা খুঁজছি।”
রায়ান অবাক হয়ে বলল-
“কই যাবা তুমি?”
মিরা চোখ ছোট ছোট করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“এখন একদম নিজের কথা থেকে নড়বেন না বলে দিচ্ছি। আজকে আমার জীবনের প্রথম ভোট দিতে যাওয়ার কথা। ভুলে গেছেন?”
রায়ান মাথা চুলকাল- তার মনে পড়লো গত রাতের কাহিনী। মূলত গতকাল দুজনের ছোট খাটো একটা কথাকাটাকাটি হয়েছিল- মিরা তার প্রথম ভোট দিতে যেতে চায় আর রায়ান চায় না সে বাইরে বের হোক ভোটের সময় (যেহেতু ওই সময় পরিবেশ খুব বিশৃঙ্খল থাকে)। অবশেষে দুজনের মাঝে ডিল হয়েছিল সাড়া রাত যদি মিরা রায়ানের কথা শোনে তাহলে কাল সাড়া দিন রায়ান মিরার কথা শুনবে। রাত তো পাড় হয়েই গেছে। গোটা রাত মিরা লক্ষ্মী বউয়ের মতো রায়ানের সব আবদার রেখেছে। এবার রায়ানের কথা রাখার পালা।
রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে বলল-
“ওহ হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তা এতো জামা কাপড়ের মধ্যে যেকোনো একটা পড়ে নিলেই তো হয়। সবকিছু এলোমেলো করেছ কেন?”
মিরা চোখে মুখে বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে বলল-
“ধুর, একাও হয় না আমার। কি হয়েছে কে জানে কোনো জামা পড়ে শান্তি নেই। অসহ্য লাগে। আমি কি মোটা হয়ে গেছি?”
রায়ান আশ্চর্য চোখে মিরাকে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে বলল-
“তোমার এই দুই রতির শরীর আমাকে সহ্য করে নেয় এটাই আমার অনেক বড় ভাগ্য।”
মিরা হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানায় এসে ধপ করে বসে পড়লো। রায়ান মিরার কাছে গিয়ে মিরাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলো-
“আমার মিল্কিবার, কি হয়েছে? লাগলে আরো ড্রেস কিনে নিও। এগুলো আর পড়তে হবে না। ঠিক আছে? মন খারাপ করে না।”
মিরা মুখ ভার করেই রইল। রায়ান মিরাকে খেপাতে নিজের হাত গুলো উঁচু করে নিজের সামনে ধরে নিজের হাতের উদ্দেশ্যে বলল-
“Well done, Great job..so proud of you..”
মিরা রায়ানের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলো-
“পাগল হয়ে গেছেন নাকি? কিসব বলছেন?”
রায়ান সন্তুষ্ট মনে মিরাকে দাঁড়িয়ে ধরে বলল-
“আমাকে আগে অনেকেই বলেছে আমার হাতের রাশি ভালো। আজ প্রথম সেটার প্রমাণ পেলাম।
মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো-
“Excuse me Mr. Chowdhury..কি নিয়ে কথা বলছেন আপনি?”
রায়ানের চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। সে মিরার প্রশ্নের জবাবে মিরার গলা ও পেটের মাঝ বরাবর অংশে চোখ রেখে বলল-
“My sweet little butter balls are growing up..খেয়াল করেছ বেইবি?”
মিরার গলা দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। রায়ানের বুকে মৃদু আঘাত করে দূরে ঠেলে দিয়ে বলল-
“যার মাথায় যা চলে তার খেয়াল তো সেদিকেই থাকবে। আমার মাথায় এসব চলে না তাই খেয়ালও করি নি। অসভ্য একটা!”
রায়ান এক গাল হেঁসে বলল-
“ওমনি অসভ্য হয়ে গেলাম। তোমার কোনো আইডিয়া আছে, আমি কত হার্ড ওয়ার্ক করেছি ওদের বড় করতে?”
মিরা মেজাজ দেখিয়ে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে বলল-
“জি, আছে। আপনি সব হার্ড ওয়ার্ক আমার উপরেরই করেছেন।”
মিরা রেগে আলমারি টা লাগিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হতে যাবে তখনি রায়ান পিছন থেকে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
“হৃদপাখি, বলে তো যাও এর পরের বার কত সাইজ আনতে হবে?”
মিরা রায়ানের প্রশ্নে আরো রেগে ফ্লোর থেকে আরেকটা জামা তুলে রায়ানের দিকে ছুঁড়ে মেরে চেঁচিয়ে বলল-
“আপনার দাদিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন কত সাইজ লাগবে।”
রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-
“দাদির টা তো দাদা জানতো। তা দিয়ে আমার কাজ নেই। তুমি আমাকে তোমারটা বলো।”
মিরা আরেকটা জামা ফ্লোর থেকে তুলে ছুড়ে মেরে ঘর থেকে ফুঁসতে ফুঁসতে বের হলো-
“কি এক নির্লজ্জের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার। মুখে কিছুই আটকায় না।”
মিরাকে সকাল সকাল জ্বালিয়ে রায়ানের বেশ স্বস্তি অনুভব হলো। সেও উঠে ফ্রেশ হতে গেলো।
আজ ভোট বলে সবকিছু বন্ধ। সোরায়াও আজ কলেজে যেতে পারবে না, মাহিরের সাথে দেখাও হবে না তার আজকে। বেচারির মুখে বিষন্নতা চেয়ে গেছে। একা একা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আনমনা হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ফোনটা উঠিয়ে মাহির কে মেসেজ করালো। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে অপর পাশ থেকে রিপ্লাই ও এলো।
সোরায়া মাহিরের রিপ্লাই পেয়ে পুলকিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনি কি বাসায়? কি করছেন এখন?”
মাহির গাড়িতে ছিল। একহাতে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“নাহ, বাইরে। এই তো ড্রাইভ করছি। আমার জান কি করে?”
সোরায়া মাহিরের রিপ্লাইয়ের জবাবে বলল-
“সে আপাতত কিছু করছে না। আচ্ছা, আপনি সাবধানে ড্রাইভ করুন। বাড়িতে ফিরে টেক্সট দিয়েন কেমন?”
অপর পাশ থেকে সাথে সাথে রিপ্লাই এলো-
“আমি বাম হাতে টেক্সট করছি। আর সাবধানেই ড্রাইভ করছি। আমার জান পাখির কি কিছু হয়েছে?”
সোরায়ার মুখে স্বাভাবিক ভাবেই একটা মিষ্টি হাঁসি ফুটে উঠলো। জানালার সামনে থেকে সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো মেসেজ টাইপ করতে করতে।
-“তেমন কিছু না। এমনি ভালো লাগছে না কিছু।”
মাহির উদ্বিগ্ন হয়ে গাড়ি থামিয়ে মেসেজ টাইপ করলো-
“কেন? কি হয়েছে?”
-“কিছু হয় নি।”
-“কল দিবো জান?”
-“নাহ, আপনি ড্রাইভ করুন সাবধানে।”
-“কিছু খাবা? চিপস? আইসক্রিম? ফুল লাগবে?”
সোরায়া হাসতে থাকলো নিজে নিজে। কিছু হাসির ইমোজি সেন্ড করে দিয়ে লিখলো-
“আহা, কিছু লাগবে না। কলেজ নেই তাই একটু বোর হচ্ছি।”
-“আচ্ছা, শুনো না। বাইরে যাবা? ওহ, না, আজ তো ভোট। আজকে না। বাড়িতে দুই ভাই ভাবি আছে, আপু আছে ওদের সাথেই থাকো কেমন।”
সোরায়া একটা সেড ইমোজি দিয়ে লিখলো-
“I am missing you..”
মাহির একটা হার্ট ইমোজি লাগিয়ে লিখলো-
“I am coming..”
সোরায়া মাহিরের মেসেজটা পড়ে ফট করে উঠে বসলো। সোরায়া ফটাফট মেসেজ লিখলো-
“কিহ্! মানে কি?”
অপর পাশ থেকে সোজা জবাব এলো-
“মানে, I am missing you too.. তোমাকে মনে পড়ছে মানে তোমাকে দেখতে হবে আমার। আসছি আমি। বাই।”
সোরায়া বোকা বনে গেল। মাহির তাকে দেখতে আসছে এটা নিয়ে খুশি কিন্তু বাড়ির সবাই বিষয়টা কিভাবে নেবে তা ধেয়ে সে দ্বিধায় ছিল।
এই দিকে সকালের দৃশ্য রিমি আর রুদ্রর ঘরে সম্পূর্ণ বিপরীত। এই কয়েক মাসে দুজনের বেশ ভালোই ভাব হয়েছে। এখন দুজনেই সুন্দর মতো সংসার করছে। নির্ঘুম রাত পার করে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। রিমি আরামে রুদ্রর বুকের উপর ঘুমিয়ে আছে রুদ্র ও রিমি জড়িয়ে ধরে আছে। আজ রিমির ও মিরার সাথে ভোট দিতে যাওয়ার কথা। কিন্তু তার ঘুম এখনো ভাঙেনি।
দুজনেরই ঘুমের বেঘাত ঘটলো দরজার শব্দে। মিরা দরজায় ধাক্কা দিয়ে রিমিকে ডাকলো-
“রিমি…রিমি… ওই মরা..! উঠবি না? কবে ভোট দিতে যাবো? সবাই ভোট দিয়ে শেষ করে ফেলল বেলট পেপার, ওদের মার্কারের কালিও শেষ হয়ে যাবে। উঠ না।”
মিরার আওয়াজে রিমির ঘুম ভাঙলো। রিমি মিটিমিটি চোখ খুলে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ কচলে রুদ্রর বুকের উপর থেকে মাথা তুলতে নিলে রুদ্র রিমিকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুম ঘুম গলায় বলল-
“উমম্! কই যাও!? শুয়ে থাকো না..!”
রিমি ও ঘুমের ঘোরে বলল-
“উফফফ্! ছাড়ুন। সকাল হয়ে গেছে তো। কে যেন ডাকছে।”
রুদ্র রিমিকে ছাড়লো না। মিরা আবার দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল-
“ওই..রিমি..!”
রিমি আবারো উঠতে চাইলে রুদ্র বিরক্ত হয়ে রিমিকে ছেড়ে দিয়ে উল্টো দিকে ফিরে উপুড় হয়ে শুয়ে রিমিকে বলল-
“ধুরু বাল…যাও..! আমাকে তো তুমি ভালোইবাসো না।”
রিমি আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল- আর কিভাবে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করবে সে?! রিমি জেদ করে একটা বালিশ উঠিয়ে রুদ্রর পিঠে ঠাস করে মেরে বলল-
“সারা রাতের জ্বালাতন সহ্য করার পর বলছেন আমি আপনাকে ভালোইবাসি না। তাই না?”
রুদ্র আর্তনাদ করে বলে উঠলো-
“আউউউ্, রাতের খোটা দেও কেন? তখন কন্ট্রোল থাকে না তাই তো কষ্ট হয় তোমার। তা নাহলে আমি কি তোমাকে কষ্ট দেই বলো?”
রিমি বিছানা থেকে নেমে মেজাজ দেখিয়ে সোফায় পড়ে থাকা ওড়না টা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে বলল-
“হ্যাঁ হ্যাঁ, আপনি তো ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানেন না। ভালো মানুষ একদম। আর তাও বলবে আমি ভালোবাসি না তাকে।”
রুদ্র উল্টো হয়ে শুয়ে থেকেই বলল-
“ভাজা মাছ খাওয়ার ইচ্ছাও নেই আমার। আমি আমার ডাল ভাত খেয়েছি খুশি।”
রিমি চোখ বাঁকা করে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করলো-
“ভেবে ছিলাম হয়তো ভদ্র লোক। আস্ত শয়তান একটা বেডা।”
মিরা আবার দরজায় হাত দিয়ে যাবে রিমি আযম মেজাজে ঠাস করে দরজাটা খুলে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-
“ওই..কি হয়েছে তোর?”
মিরাও এক মেজাজ নিয়ে বলল-
“কি হয়েছে মানে? তুই না আজকে ভোট দিতে যাস?”
রিমি ভোট দেওয়ার কথা শুনেই নিজের রাগ ভুলে গেল। তার মাথাতেই ছিলো না আজ যে ১২ তারিখ। রিমি মাথায় হাত দিয়ে বলল-
“এই যা…মনে নাই তো।”
মিরা তাড়া দিয়ে বলল-“যাবি কিনা তাই বল।”
রিমি নিজের দিকে চেয়ে মিরাকে নরম গলায় বলল-
“মিরু, জান, তুই গিয়ে রেডি হো। আমি ৫ মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
মিরা ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে বলল-
“দরজা খুলেই আমার উপর চেঁচিয়ে এখন জান মারাও না?”
রিমি মিরার উদ্দেশ্যে দাঁত বের করে হিহি করে বানোয়াট হেঁসে বলল-
“রাগ করে না জান। মেজাজ খারাপ ছিল তোর ভাইয়ার জন্য। তুই অপেক্ষা কর একটু আমি আসছি।”
মিরা মনে মনে বিড়বিড় করলো- “দুই ভাই একই রকমের।”
সবাই ভোট দিতে বাইরে যাবে তাই সবাই তৈরি হয়েই রয়েছে। খাবার টেবিলে সবাই গবেষণা করছে ভোট কোন দলে দিবে। গবেষণায় শুধু রায়ার কোনো অংশগ্রহণ করছে না। সে দশটা কথার মাঝে একটা দুটো কথা বলছে সেটাও শুধু মিরা যেন ভোট দিতে না যায় তার জন্য রামিলা চৌধুরী ও রায়হান চৌধুরীকে উস্কানি দিতে। মিরা রায়ানের কথার ধরন ঠিকই বুঝতে পারছে। রায়হান চৌধুরী মিরাকে উৎসাহিত করতে বললেন-
“মিরা, তোর অনুভূতি বলতো মা। কেমন লাগছে প্রথমবার ভোট দিবি।”
মিরার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো। নিজের জবাবে কিছু বলতে যাবে তার আগেই রায়ান নিজের বাবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-
“আব্বু…তুমি আর ওকে উস্কানি দিও না তো। বাচ্চা মেয়ে, ওর ভোট দিতে যেতে হবে কেন এতো ভীরের মাঝে? ও না গেলেও ওর ভোট হয়ে যাবে। শুধু শুধু কেন লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিতে হবে ওর আমার মাথার ধরছে না।”
রায়ানের কথায় মিরা চোখ মুখ কালো করে নিয়ে বলল-
“আপনার মাথা ছোট তাই ধরছে না বুঝেছেন? আমি যাবো মানে যাবোই।”
রায়হান চৌধুরী রামিলা চৌধুরীর সাথে চোখাচোখি করে মিটিমিটি হাসলেন। তখনি সদর দরজা দিয়ে মাহির বাড়ির ভেতরে ঢুকলো।
-“গুড মর্নিং এভরিওয়ান।”
সবাই এক সাথে মাহিরের দিকে ঘুরে তাকালো। সোরায়া মাহিরের উপস্থিতে নিজের মাথা নিচু করে নিল। মাহির খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসলে রামিলা চৌধুরী চেয়ার থেকে উঠতে যান। তখনি মাহির ওনাকে বাঁধা দিয়ে বলল-
“আরে আন্টি তুমি উঠছ কেন? বসো বসো।”
রামিলা চৌধুরী বসে পড়লেন। মাহির গিয়ে রায়ানের কাঁধে জোরে হাত রেখে বলল-
“তুই ওঠ। এতো বড় ছেলে থাকতে মা কেন উঠবে?”
রায়ান মাহির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বানোয়াট হেঁসে বলল-
“হবু সম্বন্ধীর বাচ্চা..!একবার তোকে একা পাই পরে বোঝাবো।”
মিরা সোরায়ার দিকে খেয়াল করলো। সোরায়া আর নিজের মাথা তোলে নি। মাহিরের হাতে ব্যাগ ভর্তি স্নেক্স। রায়ানা মাহির হাত থেকে ব্যাগ গুলো নিয়ে আড় চোখে সোরায়ার দিকে তাকালো। তারপর মাহফিলের উদ্দেশ্যে বলল-
“হাহ্! বাচ্চা মানুষ কে বউ করতে চাইলে যা হয় আর কি।”
মাহির রায়ানের কথা তুচ্ছ জ্ঞ্যান করে বলল-
“তোর কি? আমার বউ যা চায় তাই খাবে। I will spoil her..”
-“বউ না, হবু বউ..!”
মাহির সোরায়ার কাছে গিয়ে ওর পাশের চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বলল-
“হয়ে যাবে। তুই চিল কর।”
মাহির পাশে বসতেই সোরায়া মাথা তুলে আর চোখে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরায়ার মাথায় হাত দিয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে চোখ টিপে ইশারা করলো। সোরায়া তৎক্ষণাৎ লজ্জায় মাথা আরো নিচু করে নিল। মাহির মুচকি হেঁসে সবার উদ্দেশ্যে বলল-
“Please don’t mind us..”
সবাই না পারতেই হেঁসে উঠলো। রায়হান চৌধুরী মাহিরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-
“মাহির, সোরা মায়ের কলেজ তো প্রায় শেষ। তোমরা চাইলে এবার পারিবারিক ভাবে বিষয় টা আগানো যায়। এখনো সোরায়ার চাচা চাচি কে কিছু জানানো হয়নি। ওনাদেরও তো জানাতে হবে। কি বলো?”
সোরায়া বিয়ের বিষয়ে কথা উঠতেই একটু মেয়েলি স্বভাবে নিজেকে মুড়ে নিল। মাহির আর সোরায়ার ব্যাপারে রামিলা চৌধুরী আর রায়হান চৌধুরী দুজনেই জানেন। সোরায়ার বয়সের জন্য এখনও বিষয় টা উভয় দিক থেকে এগোয়নি। মিরা সোরায়ার জন্য সময় চেয়েছিল আর মাহির তাতে কোনো আপত্তি করে নি।
মাহির নিজের উত্তরে খুব দৃঢ়তা নিয়ে বলল-
“আংকেল আমি তো কবে থেকেই রা..!”
পুরোটা শেষ করার আগেই সোরায়া মাহিরের হাতে চিমটি কাটলো। মাহির মৃদু আর্তনাদ করলো- “আউউউ্..”
সবাই মাহিরের দিকে তাকালো। সোরায়া কিছু না জানার ভাব ধরে বসে রইল মাথা নিচু করে। মাহির বুঝলো সোরায়া চাইছে না সে কোনো ঠোঁট কাঁটা কথা বলে তাকে লজ্জায় ফেলুক। মাহির আবার নতুন করে নিজের জবাব সাজিয়ে বলল-
“সরি। আসলে আংকেল সোরার পরীক্ষা ছিল তাই আমি আর এই ব্যাপারে আগাই নি। যদি আপনারা ভাবি চাচা চাচি সবাই সম্মতি দেন তাহলে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
রামিলা চৌধুরী মাঝ থেকে বললেন-
“মাহির, রোকেয়া আর শফিক ভাইয়ের সাথে কথা বলতে হবে এই নিয়ে কিন্তু আমরা রাজি হলেই তো হলো না। সীমা ভাবি আর ভাইজানের ও তো তাদের ছেলেকে নিয়ে একটা আশা আছে। বাড়ির একমাত্র ছেলে তুই। একবার তাদের সাথে কথা বলে দেখ।”
রায়ান ও মায়ের কথায় সম্মতি দিয়ে বলল-
“সেটাই তো আন্টি কে আগে বলে দেখ কি বলে।”
সোরায়া ঘাবড়ে মাথা তুলে মাহিরের দিকে তাকালে মিরা সোরায়ার চোখে অস্বস্তি দেখলো। মিরা সোরায়ার উদ্দেশ্যেই তাকে একটু সাহস দিতে নিজে উদ্যোগ নিয়ে বলল-
“তোমরা এতো অগ্রীম ভাবছো কেন বলো তো? চাচা চাচি কে আমি মেনেজ করে নেব। মাহির ভাই একজন এ্যালিজিবল ব্যাচেলর। চাচা চাচি কখনো আপত্তি করবে না।”
সোরায়া মিরার কথায় একটু স্বস্তি পেল। মাহির মিরার কথার প্রেক্ষিতে বলল-
“আমি যাকেই পছন্দ করবো আমার বাবা মা তাতেই আমার সঙ্গ দেবে। আর তা না হলেও তাদেরকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার তোমরা এতো ভেবে না আমি বাড়িতে জানাবো সব শীঘ্রই।”
মাহির টেবিলের নিচে সোরায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে কথাটা বলল। কথার টপিক পাল্টে রায়হান চৌধুরী সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-
“তা তোমরা কোন দলের হয়ে ভোট দিতে চাইছো?”
রায়ান মিরার উরুর উপরে রাখা হাতে হাত রেখে মিরার কানের কাছে ঝুঁকে বলল-
“আমার বউয়ের দলে..!”
মিরা না চাইতেও এক গাল হেঁসে হাত নিজের হাত রায়ানের হাতের উপর থেকে সরিয়ে নিলো। মিরা হাত সরিয়ে নিতেই রায়ানের হাত মিরার উরুর উপর গিয়ে পড়লো। রায়ান মিরাকে জ্বালাতে দুষ্টু হেঁসে নিজের হাতের বাঁধন মিরার উরুতে শক্ত করতেই মিরার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ রায়ানের হাতের উপর আঘাত করে সরিয়ে দিল। রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে নিজের মুখ আড়াল করলো। মিরা লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে রইল।
খাওয়া দাওয়া শেষে রায়ান মিরাকে আর রুদ্র রিমিকে নিয়ে বের হয় ভোট দেওয়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভোট দিয়ে দুজনেই অদ্ভুত রকমের খুশি। রায়ান রুদ্রর প্রতিক্রিয়া তাদের বউদের দেখে ছিল দেখার মতো- একটা ভোট দিয়ে এতো আনন্দ হতে পারে তাদের জানা ছিল না। যদিও দিন শেষে তাদের মাথায় একটাই প্রবাদ বাক্য-“Happy wife happy life..”
১৩ই ফেব্রুয়ারি~
ঠিক আর ১০মিনিট পাড় হলেই ভালোবাসা দিবস। সকালে রায়ান সেই যে অফিসের কাজে বের হয়েছিল আর তার পাত্তা পাওয়া যায় নি। কিছুক্ষণ আগেই রুদ্র রিমিকে নিয়ে একটা ডিনার ডেটে গেলো। প্লেন টা রুদ্ররই ছিল। রুদ্র রিমিকে রেডি হতে বলার পর রিমি ঝটপট রেডি হয়ে রুদ্রর সাথে বেরিয়ে গেছে। মাঝ রাতের পর মাহিরের সোরায়ার সাথে দেখা করার অনুমতি নেই বলে মাহির বাড়ির নিচে এসে সোরায়াকে রেপিং পেপারে মুড়া এক ঝুড়ি উপহার দিয়ে গেছে। আর এখন হোরায়রা বন্ধ ঘরে এসব এক এক করে খুলে খুলে দেখছে।
মিরা কখনো এই দিন গুলো নিয়ে কোনো চিন্তা করেনি এমনকি এসব নিয়ে আলোচনা হলেও বন্ধু দের এড়িয়ে যেত। তখন এড়িয়ে যাওয়াটা ঠিক ঠেকলেও আজ কেন যেন মেয়েটা তার চারপাশের প্রেম নিবেদনে জোড় জড়িত। মিরা একা ঘরে কিছুক্ষণ আনমনে বসে রইল।
ঘড়ির কাঁটায় এখন ১২.১৫ বাজছে। মিরা সময় দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা খুলে মেসেজ অপশনে ঢুকলো- এই আশায়, হয়তো রায়ান একটা মেসেজ করে তাকে ভালোবাসা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। কিন্তু এমন কিছুই ঘটেনি। মিরার চোখ দুটো হঠাৎ ছলছল করে উঠলো। বিছানায় ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে চোখের জল মুছতে মুছতে নিজে নিজে বলল-
“আমাকে আপনি একটুও ভালোবাসেন না। একটুও না। আই হেট ইউ।”
মিরা কম্ফোর্টারটা মুড়ি দিয়ে বিছানায় চুপ করে শুয়ে পড়লো। চোখের পানি নিজের মতো বয়ে চলেছে।
১২.৩০ মিনিট~
ড্রয়িং রুমে ঢুকতে ঢুকতে রায়ান নিজের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল-
“Oh god..I am late..আজকে আর রক্ষা থাকবে না আমার।”
সিঁড়ি দিয়ে মিরাকে চেঁচিয়ে ডাকতে ডাকতে উঠালো-
“হৃদপাখি?…মিরা…! বেইবি..!”
মিরা রায়ানের গলা শুনে সাথে সাথে নিজের চোখের পানি মুছে নিল। রায়ান ঘরে ঢুকেই মিরাকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে দ্রুত বিছানায় এসে মিরার কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-
“পাখি…কি হয়েছে? Are you sick?”
মিরা চুপ করে রইল। চোখ বন্ধ তার। রায়ান নিজের জায়গা নিয়ে মিরার পাশে শুয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করল-
“কথা বলবে না?”
মিরা নীরবতা ভেঙে কান্না ভরা গলায় বলল-
“অনেক রাত হয়েছে, আপনার খাবার নিচে টেবিলে রাখা আছে। খেয়ে এসে শুয়ে পড়ুন।”
রায়ান মিরার গলা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার যে মস্ত বড় ভুল হয়ে গেছে দেরি করে তা সে হারে হারে বুঝতে পারছে। রায়ান মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে একহাতে মাথায় রেখে তাকে কে শান্ত গলা বোঝাতে চাইলো-
“বেইবি, একবার আমার কথাটা শুনো..!”
মিরা রায়ানের হাত তার কোমর থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজের মাথাও সরিয়ে নিল। গায়ে কম্ফোর্টারটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
“আমি ঘুমাবো।”
রায়ান বুঝলো সোজা কথায় কাজ হবে এমন পরিস্থিতি আর নেই। রায়ান বিছানা থেকে উঠে সোজা মিরার পাশে গিল। হঠাৎ করেই মিরা এক ঝাঁকিতে নিজের চোখ খুলল। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে এখন শূন্যে ভাসছে। মিরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো মুখেই প্রশ্ন করলো-
“কি হচ্ছে টা কি? কেন আমাকে শুধু শুধু বিরক্ত করছেন? আমি কি কিছু বলেছি আপনাকে?”
রায়ান মিরার কথার প্রতি উত্তরে কথার রেশ ধরে রেখেই বলল-
“হাজার বার বিরক্ত করবো। আমার বউ তুমি। আমার জ্বালাতন সহ্য করতে হবে তোমার।”
মিরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। রায়ান মিরাকে আয়নার সামনে নিয়ে গিয়ে দাড়া করিয়ে দিয়ে বলল-
“২ মিনিটে রেডি হয়ে নিচে এসো আমি বাইক বের করছি। Hurry up..!”
রায়ান নিচে চলে যেতে নিলে মিরা জেদ দেখিয়ে বলল-
“পারবো না। আমি কোথাও যাবো না। আর ২ মিনিটে রেডি হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।”
রায়ান ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল-
“আমার বউ যথেষ্ট সুন্দরী, ২ মিনিট ও তার জন্য অতিরিক্ত। এখন আমার কথা না শুনার ভুল করলে মনে রেখো- ছোট্ট একটা ভুল, সাড়া রাতের কান্না। Choose wisely..!
রায়ান কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিরা মনে মনে রায়ানকে হাজারটা গালিগালাজ করে কোনো মতো তৈরি হয়ে নামলো। রায়ান বাইক বের করে মিরার হেলমেট নিয়ে বাইকে বসে আছে। মিরা মেজাজ নিয়ে হেঁটে বাইকের সামনে এসে দাঁড়ালো চোখ তার অন্যদিকে। রায়ান মিরাকে পা থেকে মাথা অব্দি একবার দেখে মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে মিরার গালে পড়ে থাকা চুল গুলো আলতো হাতে সরিয়ে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে তার ফর্সা গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল-
“চুল গুলো বেঁধে নেও পাখি। আমাকে ডিস্টার্ব করছে ওরা।”
মিরা বিরক্ত হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজের চুল খোঁপা করে নিল। রায়ান মুচকি হেঁসে মিরাকে হেলমেট টা পড়িয়ে দিয়ে বলল-
“Hoop on..baby..!”
মিরা নিজের হেলমেটের ভিসর গ্লাসটি উঠিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“আমি রাইড করবো।”
-“মিরা…সব সময় জেদ ভালো লাগে না। আমার একটা কথা শুনো না তুমি।”
-” আপনার কথা আমি অনেক শুনি আপনি আমার একটা কথা শুনেছেন কখনো? আমিও শুনবো না আর। হয় আমাকে রাইড করতে দিন নয়তো আমি চললাম।”
মিরা পিছন ফিরে বাড়ির ভেতরে যেতে নিলেই রায়ান মিরার হাত ধরে ফেলল। মিরা একটা শয়তানি হাসি দিয়ে থমকে দাঁড়ালো। রায়ান মিরাকে থামিয়ে বলল-
“ঠিক আছে।”
মিরা উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলো-“সত্যি?”
রায়ান সাথে একটা শর্ত জুড়ে দিল-
“হুম সত্যি। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
-“কি শর্ত..!”
-“রাইড করার সময় বাইকের স্পিড যত থাকবে তুমি আমাকে ঠিক ততগুলো চুমু খাবে।”
মিরা ভড়কে উঠে বলল-
“মানে? আমি মোটেও এমন কিছু করবো না। আমি না চাইলেও বাইকের স্পিড অনেক বেশি উঠে যাবে। আমার অভ্যাস নেই স্লো রাইডিং এর।”
রায়ান শয়তানি হাসি হেঁসে বলল-
“আমি তো সেটা জানি মিস রায়া। এবার তোমার ইচ্ছে বাইক চালাতে চাও না নাকি,চাও না।”
মিরা আপ্লুত নজরে রায়ানের বাইকটা কে দেখলো। রায়ান যেদিন থেকে এই বাইকটা কিনেছে সেদিন থেকেই এই বাইকটা চালানোর স্বপ্ন দেখছে সে। বরের চুমুর প্রতি আসক্তির কাছে তার বাইকের প্রতি আসক্তি মোটেও হারবে না। মিরা স্পষ্ট করে রায়ান কে বলল-
“ঠিক আছে আমি রাজি। যত স্পিড তুলবো ততগুলোই চুমু দিব। কিন্তু আমাকে আপনি প্রমিস করুন- চুমু দেওয়ার পর আর বেশি কিছু চাইবেন না।”
রায়ান খুশি মনে তখন মিরার কথায় রাজি হয়ে গেল-
“ওকে ডান, চাইবো না।”
মনে মনে নিজেকে বলল-
“বউয়ের কাছে চাওয়ার কি আছে? পরে আমার যা ইচ্ছা করবে আমি নিজেই করতে পারবো। চাইবো না।”
রায়ান বাইক থেকে নেমে মিরাকে বসতে দিল। আর নিজে পিছনে বসলো। যে মিরা একটু আগে কাঁদছিল এখন বাইক পেয়ে রীতিমতো খিলখিলিয়ে হাসছে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে জিজ্ঞেস করল-
“আমাকে একটা সত্যি কথা বলো তো- তুমি আমাকে ভালোবাসো না আমার বাইক কে।”
মিরা নিজের ঝুমকা ঝুলানো চাবিটা ঘুরিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে বলল-
“Of course, it’s you hubby.. আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর সাথে আপনার সব কিছুই ভালোবাসি। আপনার বাইকও।”
রায়ান মিরার নাটকীয় উত্তর শুনে বানোয়াট হেঁসে বলল-
“হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
মিরা ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রায়ানকে বেশ ভাব নিয়ে বলল-
“Hold on to me tight..আমি কোনো পর নারী না।”
রায়ান মিরার কোমর একহাতে জড়িয়ে ধরে বলল-
“যেইনা কোমর… এটা টাইট করে ধরলে যে, কি হবে! কে জানে। সেদিন যদি জানতাম রায়া তুমি, আমাদের বাসর টা সেদিনই হতো।”
মিরা রায়ানের পেটে কনুই মেরে বলল-
“মুখে লাগাম দিন। ওইসব দিনের হিসেব এখনো বাকি আছে। কিচ্ছু ভুলি নি আমি। শুধু সময় হয়ে উঠছে না।”
রায়ান কথা ঘুরিয়ে বলল-
“আচ্ছা নিও হিসেব পরে এখন চলো। অনেক কাজ আছে।”
৩০ মিনিট রাইড করার পর মিরা বাইকটা একটা আলোকিত বাড়ির সামনে দাঁড়া করায়। দুজন বাইক থেকে নেমে নিজেদের হেলমেট টা খুলল। মিরা কিছু বুঝতে না পেরে রায়ান কে প্রশ্ন করলো-
“এটা কার বাড়ি? আগে তো কখনো আসি নি। কোনো আত্মীয়ের বাড়ি নাকি?”
রায়ান মিরা দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“বাড়িটা সুন্দর না?”
মিরা বাড়ি টার দিকে তাকিয়ে বলল-“হুম। অনেক সুন্দর।”
-“তোমার পছন্দ হয়েছে?”
-“মানে?”
-“কিছু না। চল দেখি বাড়িটা কার।”
মিরা রায়ানের হাত ধরে রায়ান কে থামিয়ে বলল-
“আপনার কি মাথা খারাপ? কার না কার বাড়ি। আমরা দেখে কি করবো। এতো রাতে কেউ দেখলে চর ভাববে আমাদের।”
রায়ান উল্টো মিরার হাত ধরে জোর করে মিরাকে বাড়ির নেইম প্লেটের সামনে নিয়ে গিয়ে বলল-
“আরে ধুর, চর ভাববে কেন? শুধু কার বাড়ি সেটাই তো জানতে চাইছি আমরা।”
-“আমি মোটেও জানতে চাইছি না। আমি জেনে কি করবো?”
রায়ান মিরাকে জোর করে বলল-
“উফফফ্ এতো কথা বলো কেন? সব মজা শেষ করে দিচ্ছ। দেখই না কার বাড়ি।”
মিরা রায়ানের সাথে আর তর্কে পেরে উঠলো না। সোজা দাড়িয়ে নেইম প্লেটের নিচে ঝুলতে থাকা দড়িটা টানলো। সেই সঙ্গে নেইম প্লেটের উপর থেকে লাল চকচকে কাপড়টা ও সরে গেল। নেইম প্লেটটার উজ্জ্বল আলো মিরার চোখে লাগলো। মিরা ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে দেখলো খুব পরিচিত একটা নাম জলজল করছে। চারপাশে আলোর সামঞ্জস্যতা হয়ে এলে মিরা অস্পষ্ট কণ্ঠে নামটা বিড় ভিড় করে পড়লো-
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ পর্ব ৬৫
“Heartbird mention…owner- Mr and Mrs chowdhury??”
মিরা ভাঙা গলায় আওড়ালো- “মা..মানে…!”
রায়ান মিরার কাঁধের কাছে ঝুঁকে এসে মিরার সামনে একটা চাবি ঝাঁকিয়ে বলল-
“ওয়েল কাম টু আওয়ার হোম, মাই ডিয়ার হার্টবার্ড।”
