Home আদিল মির্জা'স বিলাভড আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৪

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৪

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৪
নাবিলা ইষ্ক

অতীত চলমান –
‘কিছু নিয়ে ব্যস্ত মনে হচ্ছে আপনাকে?’
ওসমান ফিরে তাকালেন স্ত্রীর মুখের দিকে। হাস্যোজ্জ্বল গুলনাহার রোদের আলোয় ঝলমল করছে যেভাবে ঠিক আসমানে তারারা করে। ওসমানের অতি প্রিয় দৃশ্য স্ত্রী, সন্তানের হাসিমুখ। মনে হয় এই জনমের সব বিষাদ একনিমিষেই মিলিয়ে যায় কোথাও একটা। প্রশান্তিতে ভরে ওঠে তার কালো কুচকুচে এই জীবন! এই হাসি রক্ষার্থের জন্য হলেও সে এমন বড়ো পদক্ষেপ নিয়ে নিয়েছে। যেই পদক্ষেপের মূল্য হিসেবে নিজের জীবনও হয়তোবা দিয়ে দিতে হতে পারে! ওসমানের কানে ভেসে বেড়াল সাইফের কথাগুলো –
‘খারাপদের সারাজীবন খারাপ হয়ে বাঁচতে হয়, বস! আমার চেয়ে তা আপনি ভালো জানেন। কেনো রিস্ক নিচ্ছেন?’

কেনো? এর উত্তর তো ওসমানের সামনেই! স্ত্রী, সন্তানের সুখ। তাদের জন্য এক স্বাভাবিক জীবন চায় ওসমান। স্ত্রীর চাওয়াটুকুর পূর্ণতা দিতে চায়। গুলনাহার চায় না সে প্রতিনিয়ত জীবন বাজি রেখে বাঁচুক। একপর্যায়ে এসে যে ওসমানেরও আর ওমন জীবন কাটাতে ইচ্ছে হয় না! যেখানে জীবন ঝুকিপূর্ণ থাকে সদা। ওসমান নিজের পরিবার নিয়ে অনেক বছর বাঁচতে চায়। স্বাভাবিক জীবন চায়! বাংলাদেশে তা সম্ভব না। এখানে যে অনেক শত্রু! নিজের স্ত্রী, সন্তানের জন্য হলেও এই দেশ সে ছাড়বে।
‘খারাপ লাগছে? মাথাটা ধরেছে আবার?’
গুলনাহার বলতে বলতে ডান হাতে ছুঁয়ে দিলেন ওসমানের কপাল। একটু গরম লাগছে! মুহূর্তে মসৃন কপালে ভাঁজ পড়ল কয়েক। বিচলিত দেখাল তাকে –
‘গরম হয়ে আছে! দেখিইই!’
বলতে বলতে গুলনাহার ওসমানের শার্টের কিছু বোতাম খুলে ঘাড়, বুক ছুঁয়ে দিলেন। ওসমান হাসেন, ছটফটে হাতটা অবশেষে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলেন –
‘জ্বর নেই। বেগমসাহেবা, শান্ত হোন!’
গুলনাহার তাকালেন স্বামীর মুখের দিকে। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অবশেষে বললেন –
‘কঠিন কিছু চেয়ে ফেলেছি?’
‘উহুঁ, আমার স্ত্রীর জন্য কঠিন বলতে এই পৃথিবীতে কিছু নেই।’
রাস্তা পরিষ্কার। আকাশ গুমোট। কালো মেঘে ঢেকে আছে। নভেম্বরের মাস তো। হুটহাট শীত নামানোর বৃষ্টি নামতে থাকে। এইতো নামবে বুঝি! গুলনাহার তাকালেন বাইরে। জায়গাটা সুন্দর। নদী গিয়েছে, বিশাল এক স্বচ্ছ জলের নদী। হঠাৎ বললেন –

‘গাড়িটা রাখো, এখানে একটু দাঁড়াব।’
গাড়ি সাথে সাথে থামালেন না ড্রাইভার। হাতজোড়া কাঁপল স্টিয়ারিংয়ে থাকা। আচমকা বললেন –
‘এখানে বেগম? দেরি হইতাসে –’
স্ত্রীর আশেপাশে থাকা ওসমানের নরম দৃষ্টি মুহূর্তে এমন ধারালো হলো যে ড্রাইভার কেঁপে ওঠে। তখুনি থামায় গাড়ি। ওসমানের শান্ত কণ্ঠের আড়ালে যে বজ্রপাত ঘটল –
‘তোকে তা জিজ্ঞেস করা কি হয়েছে? গাড়ি থামাতে বলেছে, থামাবি!’
গুলনাহার অসহায় ভঙ্গিতে মাথা দুলিয়ে তাকালেন রাগান্বিত স্বামীর মুখের দিকে, ‘থামবে? সাধারণ ব্যাপার! সোহেল ওত ভাবেনি। নাকের ডগায় শুধু রাগ আর রাগ!’
ওসমান কথা বাড়ালেন না। নামলেন গাড়ি থেকে। তাদের আশেপাশে গাড়ি থেমেছে বডিগার্ডদের। সাইফ, আসাদ এসে ঘিরে ধরেছে বসকে। ওসমান গাড়ির ওপর পাশে গিয়ে দরজা মেলে ধরলেন।হাতটা বাড়িয়ে দিলে গুলনাহার স্বামীর হাতে হাত রেখে বেরুল। প্রিন্টেড সিল্কের শাড়িটা ফুটে উঠল প্রকৃতির সবুজের বুকে। এখানে ভীষণ বাতাস। বৃষ্টি আসার আগের মুহূর্তে যে বাতাসটা গা ছোঁয় তা যে প্রাণবন্ত! আকাশটা মেঘলা, মনে হচ্ছে সন্ধ্যা নামবে বলে। অথচ সবে সকাল। ওসমান গুলনাহারের একটা হাত টেনে নিজের হাতের মুঠোর রেখে সামনে হাঁটা ধরলেন। পায়ের নিচে ঘাস, তার পাশে রাস্তা… ওখানে তাদের লোকজনে ভরে আছে। বাতাসে দোল খাচ্ছে নদীর বুকের ঢেউগুলো। ওদিকেই চেয়ে আছেন গুলনাহার। ভালো লাগছে জায়গাটা। ওসমান নিঃশব্দে স্ত্রীকে সঙ্গ দিতে হাঁটতে হাঁটতে সিগারেট ধরিয়েছেন। তার সিগারেট খাওয়া নিয়ে গুলনাহারের কখনো তেমন নিষেধাজ্ঞা আসেনি। ওই মদ সহ বাকি আজেবাজে জিনিস খাওয়াতে কঠিন বিরোধিতা করে বেড়িয়েছিল। ওসব ত ওসমান ছেড়েই দিয়েছেন। শেষ কবে মদ খেয়েছেন মনেও পড়ছে না।

‘ওটা কি সাপ? দেখ তো…’
ওসমান তাকালেন আগে গুলনাহারের মুখের দিকে। তুমিটা সচরাচর তার মুখ থেকে শোনা যায় না। অথচ ওসমানের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রীর মুখ থেকে তুমি সম্বোধন করে বলা প্রত্যেকটা শব্দ।
‘আমার দিকে তাকাতে বলিনি। নদীতে দেখ, সাপের মতন লাগছে।’
ওসমান তাকালেন নদীর দিকে। একটা কালো সাপ দেখা যাচ্ছে। সাথে আরেকটাও আছে। ঠিক পেছনেই। এই ভাসছে আবার ডুবছে। ওসমান বললেন –
‘সাপ…দুটো…’
গুলনাহার দাঁড়িয়ে দেখছেন সাপের যাওয়ার ভঙ্গিমা। তীব্র বাতাসে এলোমেলো হয়েছে গুলনাহারের খোঁপাটা। সামনে চলে এসেছে অবাধ্য কিছু চুল। চোখের সামনে ঘুরঘুর করায় তা সিগারেট ধরা হাত দিয়েই সরিয়ে দিলেন। কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে পুনরায় হাত টেনে এগুতে থাকলেন সামনে। গুলনাহার বাধ্য ভাবে এগুল তালে তালে। বললেন –

‘পোশাকের মধ্যে শাড়ি সবচেয়ে কম্পলিকেটেড, সবচেয়ে বিরক্তিকর।’
ওসমান সিগারেট ঠোঁটে চেপে মাথাটা ঘুরিয়ে তাকালেন, ‘তাই?’
‘হু, আর আমি এই কম্পলিকেটেড, বিরক্তকর শাড়ি এক ভদ্রলোকের জন্য এক জনম ধরে পরে গেলাম দিনের চব্বিশঘণ্টা।’
ওসমান মুচকি হাসেন। সব জেনেও বলেন, ‘কেনো? আপনাকে কিন্তু ফোর্সড করা হয়নি বেগমসাহেবা।’
গুলনাহার অন্যদিকে চেয়ে আছেন, ‘ভালোবাসি যে। ফেঁসে গেছি। তার পছন্দ শাড়ি পরিহিত আমাকে। আর আমার তাকে।’
ওসমানের দৃষ্টি গাঢ় হয়ে এলো। মনে হলো আকাশের কালো মেঘেরা চোখের ভেতর বাসা বেঁধেছে। কণ্ঠ খাদে নামল
‘আমার ত কিছু না পরা তোমাকেও পছন্দ।’
গুলনাহারের উজ্জ্বল মুখটা র ক্তিম হয়ে গেলো চোখের পলকে। চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। ধূসর মণি জোড়ায় যেন আকাশ সমান বিরক্তি –

‘ছিহ, অসভ্য!’
ওসমান মৃদু আওয়াজে হেসে ফেলেন। তারা অনেকটা পথ হেঁটেছে। এতক্ষণ যাবত গাড়িগুলো তাদের অনুসরণ করছিল। এযাত্রায় ফের গাড়িতে উঠে বসলেন। গাড়ি চলছে ফের। গুলনাহার পথের জন্য কফি এনেছে ওসমানের জন্য। ওসমান চা খান না। একটু কফি খেলে খায়। খাওয়াদাওয়ার প্রতি আগ্রহ কম বরাবরই। অন্যদিকে গুলনাহার চা ভক্ত। চা – কফি দুটোই এনেছেন ফ্লাস্কে। সাবানাকে বলতেই সাবানা ট্রাভেল ব্যাগ থেকে বের করে দিল দুটো মগের সাথে। স্বামীর হাতে কফির মগ ধরিয়ে নিজে চায়ের কাপে চুমুক বসালেন। ওসমান কফির মগে চুমুক বসাতে বসাতে হাতের ফাইলে চোখ বুলোচ্ছে। হঠাৎ সাইফ, আসাদের গাড়িটা সোজা চলে এলো সামনে। সাইফ চোখ রাঙাল, কণ্ঠ হিমালয় ছুঁয়েছে –
‘এই, এটা কোন রাস্তা? কোনদিকে যাচ্ছিস?’
ড্রাইভার সিটে বসা সোহেল গাড়ি থামাল না। তবে ওর হাতটা গোপনে কাঁপল সামান্য। মুখে চেনাপরিচিত সেই হাসি
‘শর্টকাট, রাস্তা এটা ক্লিয়ার।’
ওসমান তাকাতেই সোহেলের কপালে ঘাম জমল। ওসমান বললেন, ‘শর্টকাট লাগবে না।’
সোহেল আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলো না। চলল মেইনরোড দিয়েই। তার চোখে অস্বস্তি। যা লক্ষ্য করা অসম্ভব প্রায়। গুলনাহারের বাবা বাড়িতে পৌঁছাতে আধঘণ্টা লেগেছে আরও। বাড়িটা ফাঁকা। কেউ থাকে না। গুলনাহার ফাঁকা বাড়িটা ঘুরেফিরে দেখেছেন। ঘণ্টা দুয়েক ওখানেই ছিলেন। ওসমান পাশে পাশে ছিলো পুরোটা সময়।

‘ছেলেটা ফিরেছে কি-না! সকালে খেয়েছে বলে মনে হয় না! আমি পাশে না থাকলে খাওয়াদাওয়া করতে চায় না। এতো অনিহা করে!’
গাড়ি মাত্রই বেরিয়েছে ফেরার উদ্দেশ্যে। ওসমান পুরো বেলা আজ স্ত্রীর নামে লিখে দেবেন। এরপরে কদিন ব্যস্ত থাকবেন। তারপরই তো তারা সুইজারল্যান্ড যাবেন। ওটার কাজ এখনো চলমান। সপ্তাহখানেক এখনো লাগবে। স্ত্রীর চিন্তিত কণ্ঠ শুনতেই চোখে ভাসল ছেলের হাস্যোজ্বল মুখ। বললেন –
‘ফিরে একসাথে লাঞ্চ করব। খাইয়ে দিও।’
গুলনাহার হাসছিলেন হপেছনে থাকা সাইফের গাড়ি নিয়ে ছুটে এলো সামনে। নির্দেশ করল উচ্চকণ্ঠে –
‘গাড়ি ঘোরা!’

ওসমানও সতর্ক হলেন। বুঝলেন তারা আক্রমণের শিকার হয়েছেন! তবে এইসময়ে? সোহেল গাড়ি থামাল না। ভাব করল ও কিছু শুনতে পায়নি। গাড়ি সোজা টেনে নিয়ে বামে ঢুকিয়েছে। পেছনে ছুটছে বডিগার্ডদের গাড়িগুলো। ওসমানের হাত চলল সাথে সাথে। সোহেলকে আজ অদ্ভুত লেগেছে। তার চোখের ভুল নয় তবে! মুহুর্তে প্যান্টের পেছনে গুঁজে রাখা পিস্তল বের করে ধরলেন সোহেলের কপালে। গর্জে উঠলেন –
‘গাড়ি থামা…’
গুলনাহার হতভম্ব হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যে উভয় দিকে থেকে সহস্র গাড়ি তাদের গাড়িগুলোকে ঘিরে ধরেছে। সোহেলও গাড়ি থামিয়েছে। গু লি শব্দে কম্পন সৃষ্টি হলো মুহূর্তে। ওসমান বেরুতে চাইলেই গুলনাহার হাত টেনে ধরলেন স্বামীর। সুন্দর মুখ খানা আতঙ্কে এইটুকুন হয়ে আছে। কাঁপছে ঠোঁট –
‘বের হবেন না।’
ওসমান কথা শুনলেন। হাত বাড়িয়ে মাথা ছুঁয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন –
‘বের হচ্ছি না। শান্ত হও।’

গুলনাহার ওসব কানে তুললেন না। দুহাতে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ওসমানের কোমর। একচুলও নড়তে দিচ্ছে না। গু লির আওয়াজ ভেসে আসছে। সাইফ, আসাদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে। পরিস্থিতি বাজে বুঝতে পারলেন ওসমান। ড্রাইভিং সিটে সোহেল নাই। কখন বেরিয়ে গিয়েছে! বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে বুঝতে আর বাকি নেই! মুহূর্তে নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসলেন। গাড়ি স্টার্ট করতে গিয়ে বুঝলেন গাড়ি বসে গেছে। টায়ার পাংচার হয়েছে। সম্ভবত পেট্রলও শেষ! ওসমান কাঁচ নামিয়ে তাকালেন বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে গু লির ঝড় বইল তার দিকে। দ্রুতো মাথাটা ভেতরে আনলেন। গুলনাহার চিৎকার করে উঠেছে। ওসমান পাল্টা গু লি ছুঁড়ছেন। সাইফদের গাড়ির টায়ারও পাংচার। বসে আছে মাটিতে। এইযে সাজানোগোছানো হামলা তা বেশ পরিষ্কার! পরিস্থিতি বাজে বুঝে ক্রমশ ওসমানের হৃৎপিণ্ড লাফাতে শুরু করল! ওসমান তাকালেন গুলনাহারের ভয়ার্ত মুখের দিকে। সাবানা ইতোমধ্যে পেছনে গিয়ে গুলনাহারকে আড়াল করে রাখতে চাচ্ছেন। তাদের গাড়ির পাশে এসে থেমেছে আরেকটা গাড়ি। ওখানে আসাদ। চোখমুখ স্বাভাবিক নেই। চোখ লাল –
‘বস!! আপনি এই গাড়িতে বেগমকে নিয়ে উঠে বসুন। আপনি বের হোন।’
ওসমান নিজের লোক ফেলে পালাবে না। এতো অসম্ভব। তিনি ফিরে তাকিয়ে আদেশ ছুড়লেন –
‘সাবানা, তোর বেগমকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বোস। আসাদ, তোর দায়িত্ব সহিসালামত বাড়ি পৌঁছানো –’
চিৎকার করে উঠলেন গুলনাহার, ‘আমি কোথাও যাচ্ছি না। তোমাকে রেখে আমি কোথাও যাচ্ছি না।’
ওসমান রাগ হলেন। ধমকালেন, ‘গুলনাহার! কথা শোনো আমার। যাও…’
গুলনাহার উল্টো এলোমেলো শাড়ি সামলে পেছন থেকে সামনে এসে বসলেন। ওসমানের ঠিক পাশে। আসাদ চেঁচাল –

‘বস, আপনি উঠে আসুন বেগমকে নিয়ে। বস! বস!’
পেছন থেকে গাড়ি দিয়ে সজোরে আক্রমণ করা হলে হেলেদুলে ওঠে তাদের গাড়ি দুটো। ওসমান একহাতে স্ত্রীকে আগলে নেয় বুকে। অন্যহাতটা জানালা দিয়ে বের করে গু লি ছোড়েন। ওদিকে আসাদ, সাইফও সমানে গু লি ছুড়ে যাচ্ছে! গুলনাহার কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতে আওড়ান –
‘ছেলেটা অপেক্ষা করছে। আমার সাথে চলো না প্লিজ।’
ওসমান তাকালেন আসাদের মুখের দিকে। আক্রমণ সামলে যাচ্ছে সমানে। সাইফকে দেখাই যাচ্ছে না। পেছনে ওরা। সবাইকে চারিপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে। তাদের রেখে ওসমান যেতে পারবেন না। ফিরে তাকালেন স্ত্রীর কান্নারত মুখের দিকে। হঠাৎ মাথাটা নুইয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালেন কপালে। অনুরোধের সুরে বললেন –
‘যাও, আমি ফিরব। তুমি আগে ফেরো, আমি আসছি।’
গুলনাহার আজ আর শান্ত, বুদ্ধিমতী নারীটি নেই। সে বাচ্চাদের মতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে ওসমানকে। বারবার বলে যাচ্ছেন –

‘তোমায় ছেড়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না।’
চোখ বুজলেন ওসমান। হঠাৎ চিৎকারের শব্দ শোনা গেল। আসাদ চিৎকার করছে –
‘সাইফ! সাইফ!’
ওসমান চমকে ওঠেন। জানালা দিয়ে ফিরে তাকাতেই বুক কেঁপে ওঠে! কয়েকটা বুলেটের আঘাত প্রাপ্ত সাইফ র ক্তাক্ত হয়ে পড়েছে মাটিতে। ওসমান আর্তনাদ করে ওঠেন –
‘সাইফ! সাইফ!’
ওসমান আর বসে থাকতে পারলেন না। গুলনাহারকে গাড়িতে লক করে বেরিয়ে পড়েছেন। বেরিয়েছে আসাদ সহ বাকিরাও। সাইফ পড়ে আছে, বুকে তিনটা গু লি। মুখ দিয়েও র ক্ত বেরুচ্ছে। ওসমানের হাত কাঁপে।
‘সাইফ!!’
সাইফ চোখ বোঝার আগে শুধু ডাকতে পারল, ‘ব…স…’
ব্যস, চোখ বুজে ফেলল চিরতরে। ওসমান নিহত বাঘের মতো গর্জে ওঠে, ‘সাইফ! সাইফ মাই বয়! সাইফ!!’
ওসমান দুহাতে তুলে নেন র ক্তাক্ত ছেলেটাকে। ওকে নিয়ে গাড়িতে তুলতে চান। এর আগেই গাড়িগুলো থেকে বেরিয়ে আসে আক্রমণ কারীরা। তাদের হাতে বড়ো বড়ো অস্ত্র। সমানে গু লি ছুড়ছে। পাল্টা গু লি ছুড়ছে আসাদ। ওর দুচোখ টকটকে লাল। গু লি ছোড়া ওর চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ওসমান সাইফকে গাড়িতে তুলেছেন কেবলই। নিজের দিকে গু লি আসতে দেখে সরতেই গুলিটা গাড়িতে লাগল। আদেশ করলেন –
‘আসাদ গাড়িতে উঠে বোস। আমরা বের হব – ‘

ওসমান কথা শেষ করতে পারলেন না। কাঁধে গু লি এসে বিঁধল তার। গল গল র ক্ত বের হলো তৎক্ষণাৎ। আর্তনাদ করে ওঠে আসাদ। ছুটে এসে দাঁড়ায় বসের সামনে। ওসমান ওকে সরিয়ে পিস্তল তাঁক করতে চান। এরপূর্বেই টানা গু লি ছোড়া তাদের উদ্দেশ্যে। চারটা গু লি সোজা এসে গেঁথে যায় ওসমানকে রক্ষা করতে থাকা আসাদের বুকে। থমকে পড়ে ওসমানের পৃথিবী। সামনে দাঁড়ানো হিমালয়ের মতন শরীরটা একনিমিষেই ঢুলে পড়ে ফ্লোরে। ওসমান চিৎকার করে ওঠেন –
‘আসাদ!!’
আসাদের চোখ বুজে যাচ্ছে। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার আগে বড়ো ভাইয়ের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মানুষটার মুখটা দেখে শুধু বলতে পারল –
‘ব..স বেগ ম কে নিয়ে পা লান। বা বা অপে ক্ষা য়…’

ওসমান র ক্তাক্ত ছোটো ভাইয়ের মতোন সঙ্গীকে ধরতেও পারলেন না। ভালোভাবে দেখতেও পারলেন না। কাঁধে গু লি এসে বিঁধল ফের। অন্যদিকে গুলনাহারের গাড়িতেও গু লি ছোড়া হচ্ছে। গাড়িতে সমানে আক্রমণ করা হচ্ছে। ওসমান ভেজা চোখে মাটিতে পড়ে থাকা আসাদকে দেখে ছুটলেন গাড়ির দিকে। ছুটতে ছুটতে নিজেও গু লি ছুড়ছেন। অথচ ফের পায়ে এসে বিঁধল আরেকটি গু লি। গল গল করে বেরুল র ক্ত। গাড়িতে থুবড়ে পড়লেন। কাঁচের ওপাশে গুলনাহারের নীল চোখমুখ দেখা গেল। কান্না করতে করতে স্তব্ধ হয়ে আছেন। বেরুতে পারছিলেন না। অসহায় চোখে চেয়ে চিৎকার করছেন। ওসমান তাকালেন পাশে। চারপাশে লোকজন। চিনতে পারলেন ওদের মধ্যে অনেককে। করীমের লোকজন সাথে মন্ত্রী রেজওয়ান মাহমুদেরও। এতো বড়ো প্রতারণার শিকার হলেন তা অবিশ্বাসের যে রাস্তা নেই। মৃত্যু যে সন্নিকটে বুঝতে আর বাকি নেই! আশপাশ জুড়ে তাদের বডিগার্ডদের লা শ পড়ে আছে। ওসমান দেখলেন ফের স্ত্রীর পাগলামি। দরজা খুলতে ব্যস্ত। ওসমান বাচ্চামো করে বসলেন। গাড়ির লক খুলে উঠে বসলেন। লক করলেন গাড়িটা ফের। গুলনাহার পাগলের মতো হামলে পড়ল ওসমানের ওপরে। দুহাতে বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখতে চেয়ে আহাজারি করে উঠলেন –

‘না করেছিলাম বের হতে। কোথায় লেগেছে! এতো র ক্ত!’
গুলনহার কোথায় ধরবেন, কোন ক্ষ তর র ক্ত আটকাবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। চোখের সামনে থাকা কাঁধের ক্ষ ততে আঁচল চেপে ধরে রাখলেন। বাইরে থেকে গু লি ছোড়া হচ্ছে। গাড়ির কাঁচ ভাঙার চেষ্টা চলছে। সেদিকে চেয়ে দুর্বল ওসমান স্ত্রীকে নিজের শক্তপোক্ত বুকে আগলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাঁচ ভাঙল গুলনাহারের দিক। গু লি ছোড়া হয়েছে তা গুলনাহারের পিঠে নয়, ওসমানের পিঠে ঢুকল। ওসমান হাওয়ার গতিতে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে স্ত্রীকে ঘুরিয়ে নিজের শরীরের নিচে আড়াল করে ফেললেন। চিৎকার করে উঠেছেন –
‘না…গু লি করবেন না আর। মা রবেন না!’
বলতে বলতে ছোটো দুহাতে বাচ্চাদের মতো স্বামীকে পিস্তলের সামনে থেকে আড়াল করতে চাইলেন। সাবানা ইতোমধ্যে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে গু লি নিজের বুকে নিতে গিয়ে। ওসমানের ডান চোখ থেকে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গুলনাহারের কান্নারত মুখের ওপরে। দুর্বল শোনাল আজ তেজে পরিপূর্ণ গলাটা –

‘আফসোস হচ্ছে, তাই না? আমার মতন পাপীকে ভালোবেসে।’
গুলনাহার কাঁদছেন। কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন স্বামীর সারামুখে –
‘এমন পরিণতি জেনেও আমি সহস্র জনমে আপনাকেই চাইব।’
গুলনাহার দেখলেন ওরা আবার গু লি ছুড়ছে সঙ্গে সঙ্গে চেঁচালেন, ‘প্লিজ মা রবেন না!’
ওসমান সিট থেকে নামিয়ে একদম নিচে ঢোকাল গুলনাহারের শরীর। একটু ফিরে তাকাতেই টানা তেরোটা গু লি পরপরই ঝাঁঝরা করে ফেলল শক্তপোক্ত বুকটা। র ক্তে ভেসে গেল চারিপাশে। গুলনাহার পাগলের মতো চিৎকার করে ওঠেন। ঢুলে পড়া শরীরটা দুহাতে আগলে নিতে গিয়ে সমানে ডাকেন –
‘এই, ওসমান! আদিলের বা –’

ওসমান শেষ নিশ্বাস অবধি স্ত্রীকে আগলে রাখতে চাইলেন। অথচ পরপরই দুটো গু লি এসে বিঁধল গুলনাহারের বুকে। গুলনাহার ওত শক্তপোক্ত কেউ না। দুর্বল একজন। একমুহূর্তেই স্বামীকে আগলে রাখতে চাওয়া হাত দুটো ধীরে ধীরে সারাজীবনের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখ বোঝার আগে শুধু তার মৃদুস্বর শোনা গেল –
‘ওসমান আমা দের ছেলে.. আমার আদি ল…’
গুলনাহারের চোখদুটো বুজে গেল। সারাজীবনের জন্য। নিহত সিংহের মতন ওসমান হাউমাউ করে কাঁদতেও পারলেন না। নিজের চোখ দুটো বুজে আসার আগে শুধু দেখলেন স্ত্রীর মৃত মুখটা। ওসমানের বন্ধ হয়ে যাওয়া চোখের পাতায় ভাসল স্ত্রী আর একমাত্র সন্তানের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। মনে হলো এখনো কানে ভাসছে –
‘পাপা.. পাপা….’
ওসমানের বন্ধ চোখজোড়া থেকে অনবরত জল গড়িয়ে যাচ্ছে, ‘ফরগিভ মি বাবা!’
ধীরেধীরে চিরতরে স্তব্ধ হলো ওসমান মির্জার হৃৎপিণ্ড। মৃত্যুর সময়টুকু জুড়ে শুধু এই জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো চোখের পাতায় রাজ করল।

ইংলিশ মিডিয়াম হাইস্কুল থেকে বেরিয়েছে গাড়িটা। পেছনের সিটে বসে সামনের সিটে দু-পা রেখে আধশোয়া হয়ে আছে আদিল। আপেলে দাঁত বসিয়ে তাকাল বাইরে। ঝুম বৃষ্টি নামছে ঘণ্টাখানেক যাবত। কেমন দমবন্ধ কর আবহাওয়া আজ! মেঘের গর্জনে কাঁপছে গোটা শহর। আদিল আওড়াল –
‘মাম্মা – পাপা ফিরেছে কি-না!’
আনোয়ার হাত ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে বলেন, ‘ফেরার কথা এতক্ষণে!’
আদিল গলার টাই ঢিল করে আধখাওয়া আপেলটা সিটের ওপরে ফেলে দিলো। খেতে ইচ্ছে করছে না আর! বলল –
‘কাঁচ নামাও তো চাচ্চু। ভালো লাগছে না।’
আনোয়ার কাঁচ নামালেন। ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে। গাড়িটা ক্রমশ বাড়ির উদ্দেশ্যে এগুচ্ছে। আদিল সোজা হয়ে বসল। মাথাটা দুপাশে নাড়িয়ে বলল –
‘মাম্মামকে বলব চুল টেনে দিতে। মাথাটা ব্যথা করছে হঠাৎ!’
আনোয়ার হাসলেন। আদিল হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘আমরা সুইজারল্যান্ড যাচ্ছি চাচ্চু। সাথে যাবেন তো?’
আনোয়ার হেসে বলেন, ‘উহুঁ, আপনারা ঘুরে আসেন বাবা!’
শান্ত সামনে থেকে উঁকি দিয়ে বলল, ‘আমি যাচ্ছি সাথে বস!’
এলেনও পাশ থেকে সুরে সুর মেলাল, ‘আমিও যাচ্ছি।’
আদিল হাসল শব্দ করে। ঝুঁকে শান্ত আর এলেনের মাথায় মেরে বলল –

‘তোরা তো বাধ্য হয়ে যাবি! তোদের ছাড়া গেলে আমি ক্যালাব কাদের?’
গাড়ি এলাকায় প্রবেশ করেছে। বৃষ্টির মধ্যেও এক হট্টগোল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমন বৃষ্টির মধ্যে এতো লোকজন কোথায় যাচ্ছে? আদিল তেমন গ্রাহ্য করল না। কিন্তু আনোয়ারের চোখমুখ সতর্ক হলো। তিনি কাঁচ নামিয়ে তাকালেন বাইরে। কেমন যেন আশপাশটা! সবাই যাচ্ছে কোথায়? ম্যানশনের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল ম্যানশনের সামনে এই বৃষ্টির মধ্যে লোকজনের ঢেউ। পুরো দরজা আটকে আছে। কান্নার শব্দ কানে আসতেই আদিল সটান হয়ে গেছে। গাড়ি দেখে লোকজন চেপে দাঁড়িয়েছে। ড্রাইভার গাড়ি থামাতেও পারেনি। আদিল চলন্ত গাড়ি থেকে নেমে গেছে। আনোয়ার গাড়ি থামাতে বলে নিজেও নেমে গেল। নামল শান্ত, এলেনও। স্কুল ড্রেস পরনে আদিল মুহূর্তে জবজবে ভিজে গিয়েছে। তাকে দেখে সামনে থেকে সবাই সরে যাচ্ছে। রাস্তা দিচ্ছে! আদিল প্রথমে হাঁটছিল, পরপর দৌড়াল। পাগলের মতন। কেউ যেন খামচে ধরেছে তার হৃৎপিণ্ড। বাড়ির কাজের লোকদের কান্নার আওয়াজ বৃষ্টির ধ্বনি ছেপে শোনা যাচ্ছে স্পষ্ট। আদিলের ছটফটে পাজোড়া থামল ম্যানশনের সামনে আসতেই। পুরো প্রাঙ্গণ জুড়ে খাটিয়া রাখা। সবার সামনে দুটো খাটিয়া পাশাপাশি রাখা। সাদা কাপড়ে ঢাকা। র ক্তে ভেসে গেছে সাদা কাপড়টা। একমুহূর্তে বাতাসে সরে গেল মুখের ওপর থেকে সাদা কাপড়টা। ওসমান মির্জার শক্তপোক্ত মুখটা নীল হয়ে আছে। র ক্তে একটা গাল ভাসা! আদিলের পেছন থেকে আনোয়ার চিৎকার করে ছুটে গিয়েছেন। তাদের আগমনে কান্নার গতি বাড়ল। শান্ত, এলেনও খাটিয়ার পাশে গিয়ে চিৎকার করছে। অথচ আদিল নড়ল না।

গুলনাহারের সুন্দর মুখ খানা দেখা গেল কাপড় সরতেই। সকালের হাস্যোজ্জ্বল মুখটা এখন স্তম্ভিত হয়ে আছে। আনোয়ার চিৎকার করে ডাকছেন, কাঁদছেন। একপর্যায়ে তাকালেন পেছনে। নিস্তব্ধ আদিলকে দেখতেই তার ভেজা চোখমুখ আরও যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। ডাকলেন –
‘আ দিল!’
আদিলের কদম নড়ল। সে নিজের আওয়াজ বোধহয় খুঁজে পেলো, ‘কোনো প্র‍্যাংক হচ্ছে নাকি?’
আনোয়ার ডুকরে উঠলেন। নূরজাহান কাঁদছে একটা খাটিয়া ধরে। ওটায় সাবানাকে দেখা গচিরতরে চোখ বুজে আছে। জুলেখা এতক্ষণ যাবত গুলনাহারের খাটিয়ার পাশে বসে কাঁদছিলেন। এযাত্রায় দিকবিদিকশুন্য হয়ে পাগলের মতো ছুটে এলেন আদিলের দিকে।
‘বাবা, এই বাবা! আদিল.. আদিল!’
আদিল তাকাল জুলেখার মুখের দিকে। কাঁদতে কাঁদতে মনে হচ্ছে বেহুশ হয়ে যাবেন। আদিলের পায়ের কাছেই তিনি বসে পড়লেন। হাহাকার করে উঠলেন –
‘এই কী হয়ে গেল! এই কী হয়ে গেল বাবা!! আমার বেগম, আমার সাহেব আর বেঁচে নাই। বাবা আপনার বাবা-মা আর বাইঁচ্চা নাই।’

আদিলের বোধহয় সেই বাক্যে বোধ ফিরল। গর্জে উঠল সে, ‘নায়া! চোপ। সব চোপ। ফাজলামো হচ্ছে নাকি!’
আদিল দৌড়াল। দুম করে দু হাঁটুতে বসল খাটিয়ার সামনে। কম্পিত হাত বাড়িয়ে ঝাঁকাল শরীর, ‘মাম্মা? পাপা!’
কোনো সাড়াশব্দ এলো না। আদিল ডাকতে ডাকতে টেনে সরাল সাদা কাপড়। সঙ্গে সঙ্গে উন্মুক্ত হলো ক্ষতবিক্ষত শরীর দুটো। ওসমানের বুকে গু লির ক্ষত দিয়ে ভরতি। আদিল পড়ে গেল ঘাসের ওপরে। কাঁপল তার হাত, শরীর.. মুখ! পরপরই হামাগুড়ি খেয়ে এগুলো। মুখ থুবড়ে পড়ল মায়ের মৃ ত লা শের ওপরে –
‘মা? এই মা! মাম্মা! এই মা শুনো, ওঠো! মায়ায়ায়া!!’
ডাকতে আদিল পাগলের মতো এলো ওসমানের খাটিয়ার সামনে। র ক্তাক্ত বুক হাত রেখে হাউমাউ করে উঠল, ‘পাপা! বাবা!! আব্বু..ওঠো। নায়ায়ায়া! আব্বু!’
বৃষ্টির আওয়াজ ছেপে ভেসে বেড়াল আদিলের আর্তচিৎকার। আনোয়ার হাত কামড়ে কাঁদছেন। শব্দ করতে চাচ্ছেন না। আদিল পাগল হয়ে গেছে। সমানে ঝাঁকাচ্ছে ওসমানের মৃত শরীরটা। হামাগুড়ি দিয়ে আদিল ফের এলো গুলনাহারের সামনে। কম্পিত হাতে ধরল মায়ের মুখ –
‘এই মা! এমন করতে পারো না। আমাকে ফেলে যেতে পারো না! আমার কী হবে! মজা করছো না? তোমরা আমার সাথেপ্র‍্যাংক করছো তাই না? সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছো? উঠো…আমি নিতে পারছি না। এই আম্মা! মা! আমরা না ঘুরতে যাব।’

আদিলের আর্তনাদের সামনে শান্ত, এলেন মাথা ঘাসের ওপরে রেখে শব্দ করে কাঁদছে। ওদের শরীর নড়ছে। কাঁদতে কাঁদতে আদিল দেখল সাইফ, আসাদের মৃ ত শরীর। পাশেই সাবানার লা শ। তার সামনে গুলনাহার ম রার মতন বসে আছে। আদিলের চোখমুখ লাল হয়ে গেছে কাঁদতে কাঁদতে। হামাগুড়ি খেয়ে সে ফের বাবার লাশের সামনে গিয়েছে। ওসমান মির্জার মুখটা গম্ভীর। এইতো সকালেও হাসল। ডাকল –
‘আব্বাজান!’
আদিলের কণ্ঠ নেমে এলো, ‘আব্বু, প্রমিজ করেছিলে আমায় নিয়ে পাহাড় চড়তে যাবে! যাবে না পাপা! কথা রাখবে না? পাপা!’
আদিল কাঁদতে কাঁদতে মাথা রেখেছে ওসমানের ক্ষ ত বিক্ষ ত বুকের ওপরে। হঠাৎ পিঠে কেউ হাত রাখল। আদিল ফিরে তাকাল না। শুধু শুনতে পেলো করীম আর মন্ত্রী রেজওয়ান মাকণ্ঠ –
‘শান্ত হও, বাচ্চা!’
আদিল ফিরে তাকাল। ওই চোখ থেকে মনে হলো র ক্ত বেয়ে বেয়ে পড়ছে। গর্জে উঠল –
‘কে? কারা!! কী হয়েছিল!’
করীম কেঁপে ওঠেন। একমুহূর্তে জন্য মনে হলো স্বয়ং ওসমান মির্জা সামনে। রেজওয়ান মাহমুদ দুঃখী গলায় বললেন –

‘খোঁজ লাগাব বাবা। চিন্তা করো না।’
আদিল মুখ ফিরিয়ে নিলো। তাকাল ফের বাবা মায়ের মুখের দিকে। বৃষ্টির মাত্রা বাড়ছে ক্রমশ। আদিল একইভাবে বসে আছে। কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙেছে। চোখমুখ ফুলে আছে। র ক্তিম চোখ দুটো বাবা মায়ের মুখ দেখতেই ব্যস্ত যে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। একপর্যায়ে আনোয়ার এলেন। রাখলেন হাত আদিলের কাঁধে –
‘বাবা!’
আদিল ফিরে না। একইভাবে বসে আছে। নড়ছে না, কিছু বলছে না। তার চোখ নিবদ্ধ বাবার ক্ষত বিক্ষ ত বুকে। আদিল গুনেছে! তেরোটা গু লি শুধু বুকেই! বাবা মায়ের এমন করুণ মৃত্যুতে পুরো শরীর জমে গেছে। একপর্যায়ে আনোয়ার শুনতে পেলেন আদিলের কণ্ঠ যা সে চিনতে পারলেন না –
‘কারা ছিলো! কী হয়েছিল, খোঁজ লাগাও।’
আদেশ ছিল। আনোয়ার চমকে ওঠেন। পরমুহূর্তেই তিনি চোখমুখ মুছে ছুটতে চান। তার আগেই খুব গোপনে থাকা একজন ভীড় ঠেলে এসে বসল আদিলের পাশে। স্বাভাবিক পোশাক পরনে। অথচ আদিল চিনল মুখ। বাবার বডিগার্ডদের একজন। চাপা গলায় বডিগার্ড সব খুলে বলল। কারা এবং কে ছিলো পেছনে সব!! এবং এই বডিগার্ড মূলত বেঁচেই ফিরেছে জানানোর জন্য। নাহলে যে সব ধামাচাপা পড়ে যেতো! তা সে চায় না!
আদিল ফিরে তাকাল, মন্ত্রী, করীব সব বেরিয়ে গেছে। লোকজন সব ফিরে গিয়েছে। আদিল আহত সিংহের মতো গর্জন দিয়ে ওঠে –

‘আমি ওদের জিন্দা মাটিতে পুত ব। আমি ওদের পুরো পরিবার ধ্বংস করব। নির্বংশ করব।’
আদিল ফের চিৎকার করে কাঁদছে। কাঁদতে হেলে পড়েছে মায়ের বুকে। মাথাটা রাখল শেষবারের মতন। আজ আর কেউ হাত রাখল না পরমযত্নে। আদিলের আওয়াজ নিভে গেছে। এবারে সে নীরবে কাঁদছে। মাথাটা বাড়িয়ে ঠোঁট ছোঁয়াল মায়ের কপালে, গালে।
‘আমার দুনিয়াটা যে থমকে গেল মা।’

‘কী হয়েছে! রাস্তা ব্লকড নাকি?’
ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা সোহেল জবাব দিতে পারল না। তীব্র বৃষ্টি, বাতাস সাথে রাতের সময়, আশপাশটা ঝাপসা লাগছে। গাড়ির বাতির আলোয় এমন দৃশ্য দেখলেন যেন তার রুহ কেঁপে উঠল। সামনে যে ছেলে দাঁড়িয়ে আছে তাকে চিনতে ভুল হয় না। স্কুল ড্রেস পরনে আদিল। হাতে চকচকে তলোয়ার। তিনি কিছু বলতে পারলেন না। তার আগেই আদিলের আশেপাশের বডিগার্ড এসে গাড়ির কাঁচ ভেঙে ফেলল। কাউকে কিছু করার, বলার সুযোগ দেয়নি। সোহেল ভয়ে বেরিয়ে দৌড়ে পালাতে চাচ্ছিল, পারল কোথায়? আদিল এগিয়ে গিয়ে তার জীবনের প্রথম খু ন টা করে ফেলল। তলোয়ারের এক কো পে আলাদা করে ফেলল সোহেলের মাথা ঘাড় থেকে। র ক্তে ভেসে গেল ভেজা রাস্তা। করীম ভয়ে সেঁটে আছে ব্যাকসিটে। তিনি কল্পনাও করতে পারলেন না এটা ওসমান মির্জার ছেলে! আদিল! তিনি গাড়ি থেকে বেরিয়ে পালাতে চেয়ে সমানে বলতে থাকলেন –
‘আদিল, আমি না! আমি না। মন্ত্রী করিয়েছে সব। সবসময়ই ওসমানকে দেখতে পারতো না। ওই লোক করিয়েছে। আমি কিছু জানি না। আদিল! আদিল!’
পেছাতে পেছাতে করীম বসে পড়েছে ভেজা রাস্তায়। সেভাবেই পিছুচ্ছে সমানে। আদিল তাকাল হাতের র ক্তাক্ত তলো য়ারের দিকে। এরপরে করীমের দিকে –

‘কেনো করলি? কেনো আমাকে এতিম করে দিলি?’
বলতে বলতে আদিল এক কো পে আলাদা করল করীমের পা। থমথমে নীরবতা ভাঙল করীমের আর্ত নাদে। মাফ চাইছে। দু হাতে জড়িয়ে ধরতে চাইল আদিলের পাজোড়া। আদিল মৃ ত লাশের মতো আওড়াল –
‘কেনো নষ্ট করলি আমার জীবন! কেনো কেড়ে নিলি আমার সুখ? আমি দুনিয়া?’
পরমুহূর্তেই দ্বিতীয় কো পে হাত চলে গেল করীমের। হাত আর পা বিহীন র ক্তাক্ত করীম ছটফট করছে রাস্তায়। আদিল তাকাল তার মুখের দিকে –
‘আমি ওই জা **** বাচ্চাকে তিলেতিলে মার ব। ও প্রতিনিয়ত ম রতে চাইবে কিন্তু ম রতে পারবে না ওই হাল করব আমি।’
পেছনেই শান্ত, এলেন। আনোয়ার পাশেই। আরও চারজন বডিগার্ড পেছনে। রাস্তা ব্লকড করে রেখেছে। আদিলের তলো য়ার এবার সোজা গলায় বসে করীমের। র ক্তে ভেসে গেল পুরো রাস্তা। যা বৃষ্টির পানিতে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। আশেপাশে লা শের বন্যা। আদিল দুহাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রাস্তায়।

পিনপতন নীরবতা ম্যানশন জুড়ে। দুটো দিন পেরিয়ে তিনদিনে পড়ল। সেদিনের স্কুল ড্রেসেই আদিল দাঁড়িয়ে আছে ম্যানশনের সামনে। কবরস্থানেই পড়ে ছিল দুদিন। আনোয়ার ধরে এনেছেন এযাত্রায়। প্রবেশ করতে পারছে না আদিল। হাতপা কাঁপছে। যখন অবশেষে করল দেয়ালে দেয়ালে নিজের হাসিখুশি পরিবার দেখে ভেঙেচুরে গুড়িয়ে পড়ল ফ্লোরেই। জুলেখা এসে আগলে নিতে চায় অথচ সাহস হয়। হয় না আনোয়ার, শান্ত বা এলেনেরও। ওই ভয়ংকর রাতের পরে যে আদিলকে ওরা আর চিনতে পারছে না। এই আদিল যে তারা চেনে না! একপর্যায়ে আদিল উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলো ওপরে। পেছনে পেছনে শান্ত, এলেন, আনোয়ার, জুলেখা, নূরজাহানও গেলো। কেউই ছেলেটাকে একা ছাড়ছে না। ভয়ে আছে যে!
আদিল নিজের রুমে প্রবেশ করল। দৃষ্টি পড়ল নিজের অতি যত্নের গিটারের দিকে। গুলনাহার গুছিয়ে রেখে গিয়েছেন। আদিল প্রায়শই গান গায়। গানের গলা ভালো তার। গুলনাহার ছেলের গলায় গান গাইতে ভালোবাসতেন। বলেকয়ে গাওয়ারেন। আদিল গিয়ে ছুঁলো গিটার খানা। কী শখের গিটার তার। মা যেন কী গান পছন্দ করতো? আদিল ঠান্ডা ফ্লোরেই বসল গিটার বুকে নিয়ে। মায়ের হাস্যোজ্জ্বল মুখ, মুগ্ধ দৃষ্টি ভাসল আদিলের বন্ধ চোখের পাতায়। আদিল ডাকে ফিসফিস করে –

‘মা!’
চোখ ভিজে। গাল গড়িয়ে পড়ে জল। চোখ বন্ধ রেখেই বাজায় গিটার। এককালে যে গান মায়ের জন্য ভীষণ হেসে গাইতো, আজ গাইতে গিয়ে সে কাঁদছে যন্ত্রণায়। বুকের ভেতরটা ক্ষ ত বিক্ষত হতে থাকল ক্রমশ। গান নয় মনে হলো আর্তনাদ –

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৩

‘আমি ছাড়া কেউ নাই আমার,
দুখের পরিজন..
আমারে পোড়াইতে তোমার,
এতো আয়োজন।
আমারে ডুবাইতে তোমার…
এতো আয়োজন।
ও. আমারে ডুবাইতে তোমার,
এতো আয়োজন।’
বাইরে শান্ত বসে পড়েছে ফ্লোরে কাঁদতে কাঁদতে। দুহাতে দুকান ধরে ফ্লোরে মাথা ঠেকিয়ে রেখেছে।
অতীতের শেষ!

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৫৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here