Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩২

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩২

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩২
কায়নাত খান কবিতা

দিনের আলো যত ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে,
অরিনের ক্ষতির পরিমাণ ততই নিঃশব্দে বাড়তে থাকে,
আলো যেখানে স্বস্তি আনার কথা, সেখানে সে আলোই তার জীবনের ক্ষয়কে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
কিংস মেনশনের কিংশুকের বিশাল বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকে অরিন আকাশের পানে।
ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ উদিত হতে থাকা সূর্যের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।
আলোর সেই বিস্তার তার চোখে পড়ে,

কিন্তু ভেতরের অন্ধকারে কোনো ভোর নামে না।
ফুটন্ত আলোর মাঝে অরিন নিজের হাতের দিকে তাকায়।
শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে তার দেহের কিছু অংশ আলোর ছোঁয়ায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরক্ষণেই তার কপাল কুঁচকে আসে।
চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে ওঠে,
ফুটন্ত আলোয় স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়,শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কামড়ের দাগগুলো।
দাগগুলো চোখে পড়তেই তার চোখের কোণ ভেঙে পড়ে,
টপটপ করে অশ্রুর দানা গুলো দাগগুলোর ওপর পড়তে থাকে ।
পানির ছোঁয়ায় সেগুলো মুছে যায় না,বরং আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে অরিনের ভেতরে জমে থাকা নীরব হাহাকার গুলো।
সেই দাগগুলো যেন একেকটা নীরব সাক্ষ্য,
যা অরিন চাইলেও অস্বীকার করতে পারে না।
নিজের নির্মম ভাগ্য নিয়ে যখন অরিন নিঃশব্দে হতাশায় ডুবে থাকে,ঠিক তখনই হঠাৎ একটি শক্তপোক্ত হাত এসে তার কটিদেশ জাপ্টে ধরে
অপ্রত্যাশিত সেই স্পর্শে চমকে ওঠে অরিন।
ভাঙা চিন্তার স্রোত এক মুহূর্তে থমকে যায়।

___বাইরে কী করো তুমি?’’
— এম.. এমনি, দাড়িয়ে ছিলাম।’’
কিংশুক ভ্রু কুঁচকে চারপাশে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে।তার দৃষ্টিতে জমে ওঠে সন্দেহ আর অস্বস্তি।অরিন আসলে কাকে দেখার জন্য তাকে ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে?
এই জায়গায় এমন কে আছে,যার উপস্থিতি তার অজান্তেই অরিনকে টেনে এনেছে বারান্দার প্রান্তে?
তাহলে কি অরিন তাকে ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছে?এই সন্দেহটাই ধীরে ধীরে কিংশুকের মনে শিকড় গাঁথে।

অরিনের নীরবতা আর দূরে সরে আসাটাই যেন সেই আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করে তোলে।
অরিনকে কোনো রেসপন্স করতে না দেখে রাগে
চোয়াল শক্ত হয়ে আসে কিংশুকের। অরিনকে ছেড়ে দিয়ে ম্যানশনের চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে থাকে
চারদিকের প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি নড়াচড়া যেন তার সন্দেহের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে না।
অরিনের আচরণ তার মনে অজানা এক আশঙ্কা আর অস্থিরতার জন্ম দেয়। তাহলে কী অরিন আবার পালাবে? তাকে একা করে চলে যাবে,?

কিংশুকের এমন অস্বাভাবিক তৎপরতা অরিনের মনের ভেতর জমে থাকা ভয়কে আরও ঘনীভূত করে তোলে।অজানা আশঙ্কা ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতর শিকড় গাঁথে।
চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাতে গিয়েই জঙ্গলের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বডিগার্ডকে চোখে পড়ে কিংশুকের।মুহূর্তেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
চারপাশে আর কেউ নেই,শুধু বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে অরিন,আর তার থেকে বেশ দূরে, জঙ্গলের ধারে নীরবে অবস্থান করছে বডিগার্ড। একে একে দুই করে ফেলে কিংশুক।
দ্রুত গতিতে অরিনের কাছে এসে তার হাত শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটতে থাকে কিংশুক।হঠাৎ টানে অরিনের পা যেন তাল হারিয়ে ফেলে, পরে যেতে যেতে যায় না সে।
কিংশুক অস্বাভাবিক দ্রুততায় অরিনের হাত টেনে নিচের দিকে নামতে থাকে।তার গতি এতটাই কঠোর যে অরিন কিছু বোঝার আগেই সিঁড়ির ধাপে ধাপে নামিয়ে আনা হয় তাকে।
কিংশুককে নামতে দেখে সার্ভেন্টরা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়।তার পিছু পিছু নীরবে এগিয়ে আসে ওমার আর টাইগার।
কিংস ম্যানশনের বিশাল বাগানের সম্মুখে গিয়ে থামে কিংশুক।গার্ডের দিকে ফিরে হঠাৎ হুংকার করে ওঠে কিংশুক।

—- হেই ইউ কাম হেয়ার!’’
কিংশুকের ডাক শুনতেই সঙ্গে সঙ্গে গার্ড এগিয়ে এসে তার সামনে এসে দাঁড়ায়।সোজা হয়ে, নিঃশব্দে,যেন এক মুহূর্ত দেরি করার সাহসও তার নেই।
গার্ড সামনে এসে দাঁড়াতেই কিংশুক তার পাশে এসে দাঁড়ায়।কঠোর কণ্ঠে সে গার্ডকে পোশাক খুলে আলাদা হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দেয়।
পরক্ষণেই নিজেও পোশাক খুলে অরিনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দাড়ায়।
কিংশুকের এমন আচরণ দেখতেই অরিনের মনে হঠাৎ করে ফিরে আসে সেই দিনের ভয়াবহ স্মৃতি।
যেদিন রকিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল গুদামঘরের ভেতরে।চোখের সামনে যেন আবারও ভেসে ওঠে সেই ভয়ংকর দৃশ্য। শুকনো ঢোক গিলে অরিন। আজকে ও কী কেউ মারা যাবে তার ফলে?
—- লুট এ্যাট মি জান। আমি কোন অংশে কম ওর থেকে?’’
হঠাৎ করেই প্রচণ্ড জোরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে কিংশুক।
অপ্রত্যাশিত সেই ঝাড়িতে চমকে ওঠে অরিন
মুহূর্তেই তার শরীর থরথর করে কাঁপতে শুরু করে,ভয়ের পরিচিত শীতল স্রোত বেয়ে নেমে আসে সমস্ত শরীল জুড়ে।

—কীরে কথা বল?’’
জোরে চেঁচিয়ে উঠে কিংশুক।
– কোনো কমতি নেই কিং।’’
—- হু ইজ বেস্ট? ‘’
—- আপনি কিং।’’
—- তাহলে ওকে কেন দেখছিলি?’’
—- আম…আমি দেখিনি কিং।’’
অরিনের এই স্বীকারোক্তি কিংশুককে যেন আরও রাগিয়ে তোলে।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে এগিয়ে এসে অরিনের ঠিক সামনে দাঁড়ায়।
অল্প দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা সেই উপস্থিতিই যেন অরিনের নিঃশ্বাসকে আরও ভারী করে তোলে।
খুব জোড়ে একটা থাপ্প’ড় বসিয়ে দেয় কিংশুক অরিনের গাল বরাবর। এমন হঠাৎ চড়ে নিজেকে সামলাতে না পেরে মাটিতে লুটিয়ে পরে অরিন। নড়াচড়া ও বন্ধ হয়ে যায় তার।
কিংশুক সে-দিকে কুরুক্ষেপ না করে সোজা গার্ডের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে পরে।

—–ডু ইউ লাইক হার? ‘’
কিংশুকের হঠাৎ এমন প্রশ্নে ঘাবড়ে যায় গার্ডটি।
—নোহ…নো..স্যার।’’
—- লাইয়ারররররর।’’
গার্ডকে ধরে, ইচ্ছে মতো মা’রতে থাকে কিংশুক। যত সময় যায় ততই তার ক্রোধের মাত্রা তত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে গার্ডটি নড়াচড়া বন্ধ করে দেয়। কিংশুক ও থেমে যায়। পরক্ষণেই তার চোখ চলে যায় মাটিতে পরে থাকা অরিনের পানে। কড়া দৃষ্টিতে তাকায় সকলের দিকে। কেউ কী অরিনের দিকে তাকিয়ে ছিলো এতোক্ষণ? কিন্তু নাহ। কেউ তাকিয়ে ছিলো না। সকলের চোখ মাটির দিকে ছিলো।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩১

—– টেক দিস বাস্ট—‘’
কিংশুক নিজের হাতে লেগে থাকা রক্ত মুছতে মুছতে অরিনের কাছে চলে যায়। আর তাকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটতে থাকে নিজেদের কক্ষের দিকে।
যেতে যেতে কিংশুক আবার ও পিছনে ফিরে তাকায়।
—– আজকে থেকে কারো চোখ ওর উপরে পড়লে তাকে মে রে তিমি মাছ দিয়ে খাওয়াবো।

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৩৩