আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৪
কায়নাত খান কবিতা
–বাইরের আলো ওর শরীর অব্দি স্পর্শ করতে দেই না। সেখানে তুই ওর হাত ধরলি? interesting!!’
কিংশুকের শীতল চোখের চাহুনি দেখে সঠিক আন্দাজ করা যায় না, কী চলছে তার মন জুড়ে। শান্ত শীতল চাহুনি, মুখে নেই কোনো এক্সপ্রেশন। কিংশুক কী আদোও রেগে গেলো না-কি তার মনে অন্য কিছু চলছে তার আন্দাজ বুঝতে না পেরেই শুকনো ঢোক গিলতে থাকে অরিন। এতো শান্ত কিংশুক কীভাবে রয়েছে?
কিংশুকের এই অদ্ভুত শান্তভাব দেখে আতিয়া বেগম এবং বাইকার ও শুকনো ঢোক গিলে। তবে কী ঝড় আসার আগ মুহুর্তে সংকেত এটি?
নিজের নিরবতার অবসান ঘটিয়ে খুব শান্ত স্বাভাবিক ভাবেই উঠে দাড়ায় কিংশুক। অরিনের চোখে ভয়ের ছাপ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এক ঝাঁটকাতে অরিনকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে ফেলে কিংশুক। হঠাৎ এমন টান লাগায় তাল সামলাতে না পেরে কিংশুকের বুকে হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পরে অরিন।
— বলেছিলাম আপনার জন্য পশুতে ও রূপান্তরিত হতে পারি। সেটা যে আপনি এতো সহজে ভুলে যাবেন বুঝতে পারিনি জান।”
— আপনি পশুর থেকে কম কীসে কিং?” অরিনের এমন প্রতিবাদ দেখে কিংশুকের মুখে চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। সে নিজের হাত দিয়ে অরিনের পিঠে স্লাইড করতে থাকে। তারপর তার কণ্ঠ দেশে ডীপলি কি’স করতে থাকে। সকলের সামনে এভাবে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া । বেশ অনেকটা লজ্জায় পড়ে যায় অরিন।নিজেকে ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যায়। উপস্থিত সকলে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারে না।
অরিনকে এতোটা নেককার জনক অবস্থায় দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারে না রাজ। সে তার হাত চালিয়ে দেয় কিংশুকের ওপরে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, কিংশুক তার হাতের তীব্র গতি নিজের হাতের মুষ্টিতে আবদ্ধ করে ফেলে । কিংশুক তাকায় রাজের দিকে।
— তোর জন্য কী বউকে আদর ও করতে পারবো না?”
কিংশুকের কথা শুনে রাজ প্রচন্ড ক্ষেপে যায়। এতো কষ্ট করে সে অরিনকে পেতে যাচ্ছিল।কিংশুকের জন্য কী আবার ও হারাবে তাকে? রাজ হাতের ইশারা দিয়ে ভিতর থেকে তার লোকদের আসতে বলে। এক এক করে বেশ কয়েকজন লোকচারদিক থেকে কিংশুককে ঘিরে ধরে।
শুধু অরিনের দিকে তাকিয়ে বলে।
–একজনকে মারতে এতো জন লোক? বউ কী আমার স্টেমিনা দেখতে চাচ্ছো?”
কিংশুকের গার্ডরা ও সেই লোক গুলোর পিছনে সারি সারি হয়ে দাড়িয়ে পরে । সংখ্যা এবং অস্ত্রের তুলনায় কিংশুকের পাল্লা ভারি হলে ও সে
আশ্চর্যজনকভাবে হাত তুলে সবাইকে থামিয়ে দেয়।
—নো। কেউ এগোবে না। আজ আমার স্টেমিনা দেখবে আমার বউ। ভবিষ্যতে ওকে পরকীয়া করতে হবে না। আই এম এ্যানআফ।”
অরিন আতঙ্কে নিজের হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে।কিন্তু কিংশুকের গ্রিপ ইস্পাতের মতো শক্ত। সেখান থেকে ছাড় পাওয়া এতো সোজা নয়।
—ওমার?”
–বস!”
– তামিম ভাইয়ের গোল্ডেন চাপাতি দাও। একটু ব্যবহার করি।”
ওমারকে বলার সাথে সাথে সে কিংশুকের হাতে চাপাতি তুলে দেয়। একহাতে অরিনকে এবং আরেক হাতে চাপাতিটি শক্ত করে ধরে কিংশুক। তারপর অরিনের পানে তাকায় সে।
–রেডি জান?”
ঘরের বাতাসটি ও যেন জমাট বেধে যায়। কিংশুক এলোপাতাড়ি ভাবে চাপা’তি চালাতে থাকে।
কয়েক মিনিট যেন ঝড়ের মতো কেটে যায়।
চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ, ধাক্কাধাক্কি সব মিলিয়ে এক অভিশপ্ত সময় পার হয় খান ম্যানশনে। আহত লোকদের সকল রক্ত অরিনের মুখে, শরীরে আসতে থাকে। সে মোটামুটি ভিজে যায় র:ক্তে।সব থেকে বেশি ধাক্কা খায় অরিন যখন রাজের ডান হাত কাঁধ অব্দি আলাদা করা হয়। মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করতে থাকে রাজ।
–টাইগার?”
–ইয়েস বস।”
–গিমমি দ্যা এসিড বক্স।”
কিংশুকের বলার সাথে সাথে একটি ছোটো প্রটেকশন ভিত্তি বড় বক্স ভর্তি এ’সিড আনা হয়। সেটা তাদের সামনে রাখা হয়। কিংশুক অরিনের দিকে তাকায় ।
—নাও ইউর ট্রান বেবি গার্ল!”
–ম..মানে?”
কিংশুক কিছু না বলে চুপচাপ অরিনকে পিছন থেকে শক্ত করে চেপে ধরে। তারপর তার হাত ধরে রাজের কাটা হাতটি তুলে।
–কিং ওয়াট আর ইউ ডুয়িং?”
– এ লিটেল বিট পানিশমেন্ট ফর ইউ জান।”
–কিং নো…!”
কিংশুক অরিনের নিজের হাত দিয়েই রাজের খণ্ডিত হাতটি নিয়ে এসিডের বক্সে চুবিয়ে দেয়। যেটা অরিনের জন্য ছিলো ভয়ংকর দূরস্বপ্নের মতো। এটা ও কী একজন মানুষের দ্বারা সম্ভব? এতোটা জা’নোয়ার কে হয়? কয়েক মুহুর্তের জন্য সে পাথর মূর্তির ন্যায় হয়ে যায়।
সে ঠিকমতো কিছুই বুঝতে পারে নাহ।শুধু অনুভব করে বিশৃঙ্খলার ভেতর সে বন্দি।
‘’বর্তমান’’
একজন এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলে,“স্যার, সব রেডি।”
কিংশুক ধীরে উঠে দাঁড়ায়।চাপা’তিটা টেবিলে রাখে।তারপর অরিনের সামনে গিয়ে হাঁটু পেরে বসে।
—এখনো অনেক কান্না বাকি, শখের বউ।”
অরিন মাথা তুলে তাকায়। তার চোখে ভয় কম এখন ঘৃণা বেশি কাজ করছে। পাশেই রাজের নিথর দেহটি পরে রয়েছে। সে জীবিত না মৃত কোনো আইডিয়া নেই অরিনের। কিংশুক অরিনের হাত ধরে হেঁচকা টান দেয়।
—চল।”
অরিন শক্ত হয়ে বসে থাকার ফলে কিং তার হাত শক্ত করে ধরে টেনে তুলে।
–আপনি পাগল কিং।! বদ্দ উন্মাদ। অমানুষ। “
–আই নো বেবি.. এবার চল।”
অরিন ধাক্কা দিয়ে ছুটে যেতে চাইলেই কিংশুক দ্রুত তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয়।
–পালা-পালির এর্নাজি শেষ হয় না জান?”
—মনি প্লিজ… পুলিশ ডাকো!”
অরিনের এমন বোকামিতে উচ্চস্বরে হাসতে থাকে কিংশুক।
–ডাক। যত জোরে পারিস চিৎকার কর। দেখি কে তোকে আমার হাত থেকে বাঁচায়।”
–আমি পুলিশে যাবো! আপনি একজন খুনি!”
–ইন্সপেক্টরকে ফোন দাও ওমার।তোমার ভাবি আমার নামে কমপ্লেইন করবে।”
কিংশুকের এমন আচরণে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে অরিনের আর কোনো উপায় নেই তার সাথে যাওয়া ছাড়া। কিন্তু এতো সহজে কী হার মানা যায়? তার ওপরে তার মা এতো নিরব কেন? কিছু আগে ও তাকে সাহস যোগাচ্ছিল, আর এখন? অরিনের ব্রেন কাজ করা বন্ধ করে দেয়। চোখ কেমন ঝাপসা হয়ে আসে। পুরো শরীর থরথর করে কম্পিত হচ্ছে। তবে কী সব শেষ? আবার ও কিংশুকের বন্দী হয়ে থাকতে হবে? অরিন যখন এদিক ওদিক তাকাতে ব্যস্ত ঠিক তখনই নিজের কোমরে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ অনুভব করে। তার কাঁধে গরম নিঃশ্বাস অনুভব করে।
—বাড়ি চলো জান…” কিংশুকের ঠান্ডা কন্ঠস্বর বলে দেয়, আজ অরিনের অবস্থা খুব একটা ভালো হতে যাচ্ছে না।তার ওপরে সকলে জড়বস্তুর মতো দাড়িয়ে রয়েছে। কেউ তার ধারে কাছে ও আসছে না। চুপচাপ দাড়িয়ে থাকে অরিন। এক চুল পরিমাণের ও নড়ে নাহ। পরক্ষনেই সে নিজেকে শূন্যে আবিষ্কার করে। কিং খুব সুন্দর মতো তাকে আধকোলা করে কোলে তুলে নেয়। অরিন ও তেমন কোনো রিয়েকশন না দিয়ে চুপ হয়ে থাকে। পালিয়ে লাভ নেই। কিং ঠিক ধরে ফেলবে। সব রাস্তা বন্ধ।
– তোমাকে সত্যি সত্যি খাঁচায় পূরতে হবে বেবি গার্ল। অনেক নটি হয়ে গেছো তুমি।” কিংশুকের পিঞ্চ করা কথা গুলো চুপচাপ সহ্য করতে থাকে অরিন। কিংশুক অরিনের কপাল বরাবর আদুরে পরশ একেঁ দেয়। উপস্থিত সকলকে থরিই না কেয়ার করলো সে। সে নিজের কাজে অনড়।
–বউ নিয়ে যাচ্ছি আমি। বাচ্চা সহ ফেরত আসবো।” চোখ বন্ধ করে ফেলে অরিন। কিংশুক ও চুপচাপ যেতে থাকে। অরিনের জানা নেই তার গন্তব্য কোথায় গিয়ে থামবে। আর কতদিন এই পালাপালির খেলটা খতম হবে। বা আদোও খতম হবে কি-না। না-কি সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে কিংশুক নামক নরকযন্ত্রণাকে।
বাইরে বেরিয়ে এসে কিংশুক অরিনকে তার সামনে দাড় করায়। তারপর তার নেক বরাবর একটা বারি মা’রে। যার ফলে অরিন সেখানেই ঢোলে পড়ে কিংশুকের বুকে। খুব আলতো করে জড়িয়ে ধরে কিংশুক অরিনকে।
— না তুমি ঠিকানা জানবে, আর না তুমি পালাবে। বড্ড জালাও জান তুমি।’
জঙ্গলের সরু, আঁকাবাঁকা রাস্তা-দু’পাশে ঘন শাল-গর্জন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সূর্যের আলো পুরোটা ঢুকতে পারে না, পাতার ফাঁক গলে ছায়া-আলো মিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত আবহ। দূরে কোথাও অচেনা পাখির ডাক, হালকা কুয়াশার মতো ধুলো বাতাসে ভেসে আছে।
সেই নিস্তব্ধতার বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে কিংশুকের গাড়ি।
গাড়িটা কোনো সাধারণ বিলাসবহুল মডেল নয়।বিশ্বে হাতে গোনা কয়েকটি কাস্টমাইজড ভার্সনের একটি। কালো ম্যাট বডি, যাতে কোবরার ডিজাইন করা।
বুলেটপ্রুফ গ্লাস, রিইনফোর্সড বডি, রান-ফ্ল্যাট টায়ার।বাইরের দুনিয়ার জন্য একদম দুর্ভেদ্য।
গাড়ির সামনে দু’টি এসইউভি।প্রতিটিতে সশস্ত্র নিরাপত্তাকর্মী। তাদের কানে ওয়্যারলেস ইয়ারপিস, চোখে সানগ্লাস, দৃষ্টি সজাগ। রাস্তার প্রতিটি মোড় তারা আগে স্ক্যান করে নেয়। মাঝে মাঝে একজন গাড়ি থেকে নেমে চারপাশ দেখে নিয়ে তারপর গাড়ি চলে।ঝোপঝাড়, উঁচু গাছের ডাল, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা পাথর।কিছুই এড়িয়ে যাচ্ছে না।
পিছনেও আরেকটি এসকর্ট গাড়ি, যাতে রয়েছে ব্যাকআপ টিম। ড্রোন নিঃশব্দে আকাশে ভাসছে, উপরের দিক থেকে পুরো পথ নজরদারিতে রাখছে।
অরিনকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে রেখে কিংশুক গা এলিয়ে সিটে বসে থাকে। আজ আর কোনো চিন্তা ভাবাচ্ছে না তাকে। বউ নিয়ে এসেছে সে।
গাড়ি সোজা তার ভিলাতে গিয়ে থামবে।
তার ভিলা জঙ্গলের গভীরে উঁচু দেয়াল ঘেরা, ইলেকট্রিক ফেন্সিং, সিসিটিভি ক্যামেরায় মোড়া। প্রধান গেটের সামনে পৌঁছাতেই অটোমেটিক স্ক্যানার গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বায়োমেট্রিক সিগন্যাল মিলিয়ে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে লোহার বিশাল গেট খুলে যায়।
গাড়ি ভেতরে ঢোকে।
আনহেলদি অবসেশন পর্ব ৪৩
ভিলার সামনে ফোয়ারা, চারপাশে ছাঁটা লন, কিন্তু পরিবেশে রাজকীয় শান্তির চেয়ে বেশি রয়েছে নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ছাপ। যেন এই জায়গায় অনুমতি ছাড়া বাতাসও ঢোকে না।
আর সেই নিস্তব্ধতার কেন্দ্রে কিংশুক। এই ভিলাতেই রয়েছে তার ফেলে আসা অতীতের কিছু ভয়ংকর চিহ্ন। গাড়ি থেকে নেমে অরিনকে কোলে তুলে নিয়ে ভিলার সামনে দাড়িয়ে পরে কিং।
__আরেকটা ইতিহাস না হয় তৈরি হোক জান।এমনিতে হাত র’ক্তে রাঙ্গা।”
