আবির ভাই পর্ব ১৮
উর্মিলা মজুমদার
সকালবেলাটা অদ্ভুত। সূর্যের আলো সোনালী না হয়ে যদি একটু সবুজাভ হতো, তবে বেশ হতো। প্রকৃতির নিয়মে আজ সূর্য উঠেছে, কিন্তু সেই সূর্যের তেজ অরুর ঘুম ভাঙাতে পারল না। তার ঘুম ভাঙাল প্রেমা। প্রেমা মেয়েটা খুব প্রাণবন্ত, তবে আজ তার মধ্যে মেঘলা দিনের একটা ভাব আছে। অরুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রেমা বলল, “এই অরু, ওঠ।তুই এখনো পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস?”
অরু চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, “আপু, কিছু বলবে?”
প্রেমা ঝটপট জানালার পর্দা সরিয়ে দিয়ে বলল, “এখনো আদিখ্যেতা মরেনি? আজ না তোদের কলেজের নবীন বরণ! তোর কি যাওয়ার ইচ্ছা নেই?”
মুহূর্তের মধ্যে অরুর মস্তিষ্কের নিউরনগুলো জেগে উঠল। সে এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে প্রেমাকে জড়িয়ে ধরে গালভর্তি চুমু খেতে লাগল। বাদর টাইপ মেয়েদের এই এক স্বভাব, আনন্দের সময় হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তবে প্রেমার মুখে আজ হাসি নেই। শরতের আকাশের মতো তার মুখটা কেমন যেন থমথমে। অরু অবশ্য সেদিকে তাকানোর সময় পেল না। সে ছুটল মেঘের রুমের দিকে। মেঘ তখন গভীর ঘুমে। অরু তাকে সজোরে ঝাঁকানি দিয়ে বলল, “মেঘ! এই মেঘ! ওঠ! আজ আমাদের উৎসবের দিন!”
মেঘ চোখ মেলল। “কিসের উৎসব? কাল কি ঈদ?”
”আরে গাধী, আজ কলেজে নবীন বরণ। মনে নেই?”
এক সেকেন্ড। ঠিক এক সেকেন্ড লাগল মেঘের পুরোপুরি জাগতে। ঘড়িতে তখন আটটা। বড় আম্মু এর মধ্যেই হাজির হলেন ধোঁয়া ওঠা ভুনা খিচুড়ি নিয়ে। মায়েদের এই এক গুণ, প্রলয় আসলেও তারা ঠিকই বুঝে যান সন্তানের পেটে খিদে আছে। তিনি এক লোকমা মেঘের মুখে দিচ্ছেন, তো আরেক লোকমা অরুর মুখে।
খাওয়া শেষ হতেই শুরু হলো সাজগোজের মহোৎসব। মেঘ আলমারি খুলে একটা সাদা জর্জেট শাড়ি বের করল, যাতে টিয়া রঙের সুক্ষ্ম কাজ। কিন্তু সমস্যা হলো, মেঘ শাড়ি পরতে পারে না। শাড়ি পরাটা একটা শিল্প, আর মেঘ সেই শিল্পের ক ক জানে না। অরু অভয় দিয়ে বলল, “চিন্তা করিস না, আমাদের প্রেমা আপু আছে না? সে হলো শাড়ি পরানোর ওস্তাদ।”
প্রেমা একে একে দুজনকে শাড়ি পরিয়ে দিল। শাড়ি পরানোর সময় মেঘ খেয়াল করল প্রেমার মুখটা বড় বেশি ফ্যাকাশে। সে জিজ্ঞেস করল, “প্রেমা আপু, তোমাকে এমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছে কেন? কোনো মন খারাপের ভূত কি ঘাড়ে চেপেছে?”
প্রেমা হাসল। সে মাথা নেড়ে জানাল কিছু হয়নি। মেঘের ইচ্ছে হলো প্রেমার টসটসে গাল দুটো টিপে দিতে, কিন্তু পারল না। সাজ শেষ হওয়ার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেঘ নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। ফর্সা মেয়েটাকে সাদা শাড়িতে অবিকল অপ্সরার মতো লাগছে। চুলে গাজরা, কানে ঝুমকো, আর চোখের কাজলে কী মায়া! বড় আম্মু তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন। কপালে সামান্য কাজল দিয়ে বললেন, “মাশাল্লাহ, আমার মেয়েটাকে তো পরীর মতো লাগছে। কারো নজর না লাগুক।”
অরুও কম যায়নি। কালো শাড়িতে তাকে দেখাচ্ছে যেন এক খণ্ড মেঘের টুকরো। বড় আব্বু ভীষণ খুশি হয়ে দুজনের হাতে দুটো কড়কড়ে টাকার বান্ডিল গুঁজে দিলেন। দুই বাদরের সে কী আনন্দ! টাকা হাতে পেলেই তাদের ডানা গজায়। তৎক্ষনাৎ অরু একটা জটিল প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। মেয়েটার কাণ্ডজ্ঞান ইদানীং বেশ প্রখর হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, “সবই তো হলো। কিন্তু আমাদের এই লটবহর নিয়ে কলেজে পৌঁছে দেবে কে?”
মেঝো আম্মু রান্নাঘর থেকে উঁকি দিলেন। উনার হাতে ভাতের খুন্তি। তিনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন, “কেন, আবির আছে, সাদিফ আছে। যেকোনো একজন পৌঁছে দিয়ে আসবে। সমস্যা কী?”
আবির ভাইয়ের নাম শুনতেই মেঘের বিষম খাওয়ার দশা। সে খুব দ্রুত কাশতে কাশতে বলল, “না না, সাদিফ ভাইয়া গেলেই হবে। সাদিফ ভাইয়া গেলেই ভালো।”
ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়িতে পদশব্দ পাওয়া গেল। ধীরস্থির পায়ে নেমে আসছে আবির। পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, কুনুই পর্যন্ত হাতা গোটানো। মানুষের ব্যক্তিত্বের একটা ঘ্রাণ থাকে, আবিরেরও আছে। সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই হাঁক ছাড়ল, “আম্মা, আমার চা কোথায়? সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
সে যখন মেঘের পাশ দিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল, তখন একটা হালকা পারফিউমের গন্ধ মেঘের নাকে এসে লাগল। কী অবলীলায় লোকটা তাকে এড়িয়ে চলে গেল! একটা ফিরে তাকানো নেই, এক মুহূর্তের বিরতি নেই। একেই বোধহয় বলে ‘ক্যালকুলেটেড ইগনোরেন্স’। মেঘের মনটা হুট করে মেঘলা দিনের মতো বিষণ্ণ হয়ে উঠল। অথচ এই তো একটু আগে সে নিজেই চাইছিল লোকটাকে এড়িয়ে চলতে। মানুষের মন অদ্ভুত এক গাণিতিক ধাঁধা; যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি এড়াতে চাই, অবচেতনে বোধহয় তার উপস্থিতিটুকুই সবচেয়ে বেশি কামনা করি।
সাদিফ তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। আবির তখন নির্বিকার মুখে নাস্তা শেষ করছে। মেঘ আর অরু আর সময় নষ্ট করল না। সদর দরজা দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল তারা। আবির ভাই সদর দরজার দিকে একপলক তাকাল। তারপর ঠোঁটের কোণে খুব চিকন একটা হাসি ফুটিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “যত খুশি আকাশে ঘুড়ি ওড়াও, সুতোর নাটাইটা কিন্তু এই প্রেমিকের হাতেই তোলা আছে।
বড় আম্মু পাশেই ছিলেন। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “আবির, তুই কি কিছু বললি? বিড়বিড় করছিস যে?”
আবির বড় আম্মুর দিকে তাকিয়ে নির্মল এক চিলতে হাসি দিয়ে বলল, “না তো আম্মু। কিছু বলিনি।”
বাইরে তখন সাদিফের গাড়ি স্টার্ট নেওয়ার শব্দ শোনা গেল। মেঘ আর অরুকে নিয়ে গাড়িটা গন্তব্যের দিকে ছুটছে। মেঘ আর,অরুকে কলেজ নামিয়ে দিয়ে সাদিফ ফের নিজের ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে যাবে।
মেঘের মনটা বিষণ্নতার কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে। সে গাল ফুলিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে। মানুষের মন খারাপ হলে সে জগতের তুচ্ছ বিষয়গুলো খুঁটিয়ে দেখে। মেঘ এখন একটা ল্যাম্পপোস্টে বসে থাকা কাকের ঠোঁট ঘষা দেখছে। পাশে অরু মহাব্যস্ত। সে আয়না বের করে ঠোঁটে লিপস্টিক ঘষছে। সাদিফ ভাই মাঝেমধ্যে লুকিং গ্লাসে মেঘকে দেখছেন। তার মুখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। তিনি হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, “মেঘ, মন খারাপ?”
মেঘ হকচকিয়ে গেল। নিজের মনের ভেতরের মেঘগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করে কাচুমাচু গলায় বলল, “না তো ভাইয়া, কিছু হয়নি। এমনি।”
সাদিফ ভাই আর ঘাঁটালেন না। তিনি জানেন, মেয়েদের ‘কিছু হয়নি’ মানে হলো ‘অনেক কিছু হয়েছে’, যা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। কলেজের সামনে গাড়ি থামতেই নামিয়ে দেওয়া হলো দুই ‘বাদঁর’ কন্যাকে। আজ নবীনবরণ। চারদিকে রঙের মেলা। মেয়েরা সব রঙচঙে শাড়ি পরে প্রজাপতির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে। মেঘকেও ঘিরে ধরল একদল। তাদের চোখেমুখে মুগ্ধতা।
“মেঘ, তোকে তো আজ অলৌকিক সুন্দর লাগছে রে!”
প্রশংসা এক অদ্ভুত জিনিস। এটা তেতো মনের ওপর চিনির প্রলেপের মতো কাজ করে। মেঘের মুখটা একটু উজ্জ্বল হলো। নবীনবরণ মানেই ছবি তোলার মহোৎসব। ক্লাসের বান্ধবীদের সাথে চলল দীর্ঘ ফটোসেশন। হাসিমুখের সেই ছবিগুলো দেখলে বোঝাই যাবে না, ভেতরের মেঘ এখনো কাটেনি।
ছবি তুলতে গিয়েই সময় বয়ে গেল। অডিটোরিয়ামে যখন ঢুকল, ততক্ষণে অনুষ্ঠান জমে উঠেছে। মেঘ শাড়ির কুচি সামলে একটু দ্রুত পায়ে এগোতে গিয়েই থমকে দাঁড়াল। তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন স্টেজ অব্দি পৌঁছে যাচ্ছে। সে অরুর হাতটা খপ করে ধরে সজোরে ঝাঁকাতে লাগল। অরু তখন মোবাইলে গভীর মনোযোগ দিয়ে কী যেন দেখছিল। সে বিরক্ত হয়ে বলল, “আহ মেঘ, কী হয়েছে? হাতটা ভেঙে ফেলবি নাকি?”
মেঘ রুদ্ধশ্বাসে তোতলামি করে বলল, “অরু, অরু ওই দেখ! মঞ্চের ওদিকে তাকা।”
“কী দেখব? কেউ কি আকাশ থেকে সোনা ছড়াচ্ছে?”
মেঘ ঠোঁট কামড়ে ফিসফিস করে বলল, “আবির ভাই!”
অরুর হাত থেকে মোবাইল পড়ার দশা। দুই ‘বাঁদরের’ অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। মঞ্চের ওপর প্রধান অতিথির আসনে বসে আছেন আবির ভাই। ধবধবে সাদা শার্টের ওপর কালো ব্লেজার চাপানো। ইন করা শার্ট। তাকে ঘিরে আভিজাত্যের বলয় তৈরি হয়েছে। বেশ স্মার্ট লাগছে আজ আবির ভাইকে। চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেছে। তরুণী হৃদয়ে হিল্লোল তোলা সেই ফিসফাস মেঘের কানে তপ্ত সীসার মতো লাগল। পেছন থেকে এক মেয়ে মুগ্ধ হয়ে বলছে, “ইশশশ, ছেলেটা কী হ্যান্ডসাম! যেন কোনো উপন্যাসের রহস্যময় নায়ক।”
আরেকজন উত্তর দিল, “হ্যান্ডসাম বলছিস কেন? বল আস্ত একটা স্মার্টনেসের পাহাড়!”
মেঘের কান দুটো রাগে ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। ইচ্ছে করছে মেয়েগুলোর মুখ সেলাই করে দিতে। অরু মেঘকে টেনে নিয়ে একটা চেয়ারে বসাল। আবির ভাইয়ের চোখে ডার্ক সানগ্লাস।
সানগ্লাসের ওপাশ থেকে তিনি ঠিক কোন দিকে তাকিয়ে আছেন, তা বোঝা অসম্ভব। তিনি কি ভিড়ের মাঝে মেঘকে খুঁজছেন? নাকি তিনি এখন ধরাছোঁয়ার বাইরের এক ‘ভিআইপি’, যার কাছে মেঘের বিষণ্নতার কোনো দাম নেই?
মেঘ আড়চোখে চশমা পরা আবির ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবল মানুষটা কি ইচ্ছে করেই সানগ্লাস পরে এসেছে? যাতে কেউ তার চোখের ভাষা পড়তে না পারে?
অডিটোরিয়ামের ভেতরের আবহাওয়াটা তথৈবচ। ভ্যাপসা গরম বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই। সিলিং ফ্যানগুলো ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু বাতাস দেওয়ার চেয়ে তারা বোধহয় নিজেদের ক্লান্তির কথাই বেশি জানান দিচ্ছে। এর মধ্যেই আবির ভাই বসে আছেন অত্যন্ত আয়েশ করে। গায়ে কুচকুচে কালো ব্লেজার, চোখে ডার্ক সানগ্লাস। মঞ্চে কলেজের একজন বৃদ্ধ প্রফেসর মাইক্রোফোন আঁকড়ে ধরে তুখোড় বক্তৃতা দিচ্ছেন। বক্তৃতার সারমর্ম অতি সাধারণ—‘ছাত্রছাত্রীরাই দেশের ভবিষ্যৎ’।
মহৎ সত্য কথাগুলো কেন জানি শুনতে সবসময় একঘেয়ে লাগে। প্রফেসর সাহেব গলা চড়িয়ে বলতে লাগলেন, “আজ আমাদের কলেজের এই একাদশ শ্রেণির নবীন বরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন খান গ্রুপের সিইও। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই নক্ষত্রটি আমাদের এই কলেজেরই প্রাক্তন ছাত্র। আমার নিজের সরাসরি ছাত্র সে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে আবির তার পৈতৃক বিজনেস সামলাচ্ছে। আমি আবিরকে অনুরোধ করব আমাদের প্রিন্সিপাল স্যারের হাত থেকে এই পুষ্পস্তবক গ্রহণ করতে।”
মুহূর্তের মধ্যে অডিটোরিয়ামে একটা ছোটখাটো ভূমিকম্প হয়ে গেল। হাততালির শব্দ আর ছেলেদের শিস দেওয়ার আওয়াজে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
আবির ভাই আসন থেকে খুব ধীরস্থির ভঙ্গিতে উঠলেন। যেন তাড়াহুড়ো করাটা তার ডিকশনারিতে নেই। প্রিন্সিপাল স্যারের হাত থেকে ফুলের তোড়াটা গ্রহণ করলেন তিনি। মেঘ যতবার আবির ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছে, ততবারই তার রাগে গা রি রি করে উঠছে। রাগের একটা বিশেষ রং থাকে, মেঘের ক্ষেত্রে সেটা মনে হয় লাল।
আশেপাশে মেয়েদের ফিসফাস এখন রীতিমতো গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে। ঠিক পেছনে বসা এক তরুণী পাশের জনের কানে ফিসফিস করে বলল, “এই দেখ, ওনার নাম নাকি আবির। ভাবা যায়, খান গ্রুপের সিইও! দেখতে কী দারুণ, তাই না?”
অন্যজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে উত্তর দিল, “আবির মানেই তো রঙ। আমাদের জীবনে কি এমন একটু রঙের ছোঁয়া লাগবে না?”
মেঘ মনে মনে বলল, “রঙ না ছাই! উনি হলেন আস্ত একটা তেতো করলার জুস। শুধু তেতো নয়, বরফ দেওয়া হিমশীতল তেতো।”
হঠাৎ মাইক্রোফোনে ঘোষণা শোনা গেল, “এখন আমাদের আজকের অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিকে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দুটি কথা বলার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।”
আবির ভাই মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সানগ্লাস একবার ঠিক করলেন। পুরো অডিটোরিয়াম এখন পিনপতন নীরব। মেঘ বুক দুরুদুরু অবস্থায় ভাবছে, এই লোকটা আবার কী নতুন বিভ্রাট ঘটায়! আবির ভাই মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই তিনি মাথাটা ঘোরালেন মেঘের দিকে। মেঘের চোখে তখন তড়িৎ খেলছে, সেই দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে বিদ্ধ হলো আবির ভাইয়ের ওপর।
আবির ভাই বেশ কিছুক্ষণ ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে নীতিকথা শোনালেন। উপদেশ জিনিসটা তেতো ওষুধের মতো, কেউ গিলতে চায় না কিন্তু সবাই দিতে ভালোবাসে। বক্তৃতার একদম শেষ পর্যায়ে এসে তিনি একটু থামলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,
“আজ এখানে অনেকগুলো কচি মুখ দেখছি। সবাই খুব পরিপাটি। শাড়ি আর পাঞ্জাবিতে একটা উৎসব-উৎসব ভাব আছে। তবে আমার কাছে মনে হয়, অতি-সজ্জার চেয়েও বেশি সুন্দর হলো কারো অভিমানী মুখ। মানুষ যখন অভিমানে ঠোঁট উল্টে বসে থাকে, তখন তার ভেতরের আসল মানুষটাকে দেখা যায়।”
মেঘের বুকের ভেতরটা ঠিক তখন ‘ধক’ করে উঠল। মানুষটা কি তাকেই ইঙ্গিত করছে? পাশে বসা অরু মেঘের হাত খামচে ধরল। ফিসফিস করে বলল, “কিরে মেঘ, আবির ভাই কাকে নিয়ে বলছে? তোকে নয়তো? তোর মুখ তো এখন ঠিক অমাবস্যার চাঁদের মতো অন্ধকার হয়ে আছে!”
বক্তব্য শেষ করে আবির ভাই যখন নিজের আসনে বসলেন, তখন চারদিকে হাততালির যে শব্দ উঠল, তাতে কান পাতা দায়। মেঘের রাগটা তখন অভিমানে রূপ নিয়েছে। এই লোকটা তাকে চেনে না, জানে না এমন একটা ভাব নিয়ে সবার সামনে কথা বলে গেল! অথচ সকাল থেকে মেঘের মনটা যে চুরমার হয়ে আছে, সেই খবর রাখার প্রয়োজন বোধ করল না।
অনুষ্ঠান শেষ। করিডোরে ছাত্র-ছাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়। মেঘ আর অরু সেই ভিড়ের মধ্যে আটকা পড়ে গেল। অডিটোরিয়াম থেকে বের হওয়ার পর মেঘের নিজেকে মনে হলো ‘নুন ছাড়া তরকারি’। স্বাদহীন, বর্ণহীন এক অস্তিত্ব। অরু পাশে হাঁটতে হাঁটতে আপনমনেই বিড়বিড় করছে, “মানুষটার বুদ্ধি আছে রে! সবার সামনে তোকে পচিয়ে দিয়ে আবার জলপরীও বলে গেল। একেই বলে সাপের মাথায় মণি!”
মেঘ ফুঁসে উঠল, “চুপ করবি অরু? উনি কে আমাকে জলপরী বলার? আর আমার মাথা গরম না ঠান্ডা, সেটা মাপার উনি কে?”
ঠিক তখনই করিডোরের মোড় ঘুরতেই আবার সেই ‘হ্যান্ডসামের পাহাড়’ আবির ভাইয়ের মুখোমুখি। যেন তিনি আগে থেকেই এখানে ওত পেতে ছিলেন। আবির ভাই পকেট থেকে একটা ছোট ক্যাডবেরি বের করে মেঘের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
খুব সহজ ভঙ্গিতে বললেন, “রাগ কমানোর মহৌষধ। খেয়ে দেখ। আর শোন মেঘবতী, সাদা শাড়িটা তোমাকে আসলেই মানিয়েছে। তবে সাদা শাড়ির সঙ্গে চোখে একটু গাঢ় কাজল দিলে তুমি জলপরী থেকে সরাসরি কাজলপাখি হয়ে যেতে পারতে। পরের বার ট্রাই করো। সাদা শাড়িতে তোমাকে একটা বিষণ্ন জলপরীর মতো লাগছে মেঘবতী। অরু, ওকে একটু আইসক্রিম খাইয়ে দিস তো। ওর মাথার ভেতরের থার্মোমিটার এখন বোধহয় পারদ ছাড়িয়ে গেছে।”
হঠাৎই এমন সময় মাঝরাতে মেঘের ঘুমটা ভাঙল বেশ নাটকীয়ভাবে। সে বিছানার ওপর ধড়ফড় করে উঠে বসল এবং নিজের অজান্তেই একটা চিকন গলায় চিৎকার দিল। ঘড়ির কাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে টিক টিক টিক। মানুষের মস্তিষ্ক বড়ই বিচিত্র কলকব্জা। অবচেতন মন যখন ডালপালা মেলে, তখন সেখানে লজিক বা যুক্তি বলে কিছু থাকে না।
মেঘ কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছল। তার হার্টবিট এখন রীতিমতো ড্রাম বাজাচ্ছে। স্বপ্নের ভেতর সে দেখেছে আবির ভাই তার দিকে তাকিয়ে খুব করুণ স্বরে বলছেন, “সাদা শাড়িতে তোমাকে একটা বিষণ্ন জলপরীর মতো লাগছে মেঘবতী। অরু, ওকে একটু আইসক্রিম খাইয়ে দিস তো। ওর মাথার ভেতরের থার্মোমিটার এখন বোধহয় পারদ ছাড়িয়ে গেছে।”
ব্যস, এইটুকুই! এই সামান্য প্রশংসা না পাওয়াতেই মেঘের ঘুমন্ত মস্তিষ্ক এক মহাকাব্যিক দুঃস্বপ্ন তৈরি করে ফেলল। স্বপ্নে আবির ভাই তাকে ‘জলপরী’ বলে ডাকছেন, আবার পরক্ষণেই সেই জলপরী নাকি ডাঙায় উঠে খাবি খাচ্ছে। কী বিশ্রী কান্ড!
আবির ভাই পর্ব ১৭
মেঘ দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল। মানুষের মন হলো কাঁচের দেয়াল, ওপাশে কী আছে দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায় না। কি। মেঘ স্রেফ একজন সাধারণ মেয়ে, যার মাথায় আবির ভাই নামক এক রহস্যময় মানব সারাক্ষণ ভূত হয়ে চেপে থাকেন এখন। মেঘ ফিসফিস করে নিজেকেই ধমক দিল।
”মেঘ, তুই কি দিনকে দিন পাগল হয়ে যাচ্ছিস? আবির ভাই তোকে জলপরী ডাকবে কেন? আর তুই-ই বা এসব যাতা স্বপ্ন দেখছিস কেন? তোর কি কমন সেন্স বলে কিছু নেই?”
