Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ২৭

আবির ভাই পর্ব ২৭

আবির ভাই পর্ব ২৭
উর্মিলা মজুমদার

ডাক্তার মঈন সাহেব এলেন রাত দুটোর দিকে। মাঝবয়সী মানুষ। চোখে চশমা। এই অসময়ে কেউ ডাকলে সাধারণত ডাক্তাররা বিরক্ত হন, কিন্তু মঈন সাহেব নির্বিকার। সাদিফ তাকে অনেকটা জোর করেই ধরে এনেছে। রুমে ঢুকেই সাদিফ বাঘের খাঁচায় বন্দি পশুর মতো পায়চারি শুরু করল। তার গলায় রাজ্যের উদ্বেগ, ‘ডাক্তার সাহেব, দেখুন তো কী হয়েছে! শরীর তো কয়লার আগুনের মতো জ্বলছে।’
​মঈন সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি খুব শান্তিতে আবির ভাইয়ের পালস দেখলেন। স্টেথোস্কোপ দিয়ে বুক পরীক্ষা করলেন। তারপর যখন তার নজর গেল বাম হাতের সেই থেঁতলে যাওয়া জখমটার ওপর, তিনি দীর্ঘক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন। মেঘ এক কোণে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার কপালের চুলটা তখনো আবির ভাইয়ের শার্টের বোতামে আটকে। ছিঁড়ে গেছে কয়েকটা চুল, কিন্তু মেঘের সেদিকে খেয়াল নেই। ​ডাক্তার সাহেব থার্মোমিটার বের করতে করতে বললেন, ‘জ্বর তো ১০৫। ব্রেইন ফিভার হতে পারত, কিন্তু হয়নি। এই ছেলেটা বেঁচে আছে স্রেফ মিরাকলের ওপর ভিত্তি করে। বিজ্ঞানে মিরাকল বলে কিছু নেই, কিন্তু মাঝেমধ্যে নিয়ম ভাঙতে হয়।’

​মেঘের বুকটা ধক করে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, ‘মিরাকল মানে? কী হয়েছে তার?’
​ডাক্তার মঈন শান্ত গলায় বললেন, ‘শরীরের এই জখমটা কোনো এক্সিডেন্ট না। খুব ঠান্ডা মাথায় কেউ একজন হাতটা থেঁতলে দিয়েছে, অথবা তিনি নিজেই দিয়েছেন। একে বলে আত্মনিগ্রহ। গত তিনদিন ধরে শুধু পানি খেয়ে পড়ে আছে। ’
​মেঘ আবির ভাইয়ের মুখের দিকে তাকাল।
জ্বরের ঘোরে তিনি বিড়বিড় করছেন। কোনো একটা নাম ধরে ডাকছেন খুব অস্পষ্ট, কিন্তু মেঘের মনে হলো নামটা যেন তার নিজেরই। এক উন্মাদ প্রেমিকের অবচেতন মনের হাহাকার।
​ডাক্তার সাহেব একটা ইনজেকশন পুশ করলেন। তারপর মেঘের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন। বললেন, ‘মেয়ে, তুমি কি সারারাত এখানে থাকবে? প্রয়োজন হলে উনাকে বাড়িতে নিয়ে যাও। এখানে এই নিঃসঙ্গতায় সেবা হবে না।’
​মেঘ উত্তর দিল না। এই রুম থেকে বের হওয়ার সাধ্য আজ আর তার নেই। ​ডাক্তার চলে যাওয়ার পর সাদিফ সোফায় ধপ করে বসে পড়ে বলল, ‘এখন কী করব?’
মেঘ চোখের পানি মুছে নির্লিপ্ত গলায় বলল, ‘সকাল হলে বাড়ি নিয়ে যাব। এখানে থাকলে উনি আর বাঁচবেন না।’
সাদিফ সংশয় নিয়ে তাকাল, ‘তোর কি মনে হয় আবির রাজি হবে?’
‘হবে।’ মেঘের গলায় দৃঢ়তা।

​রাত বাড়ল। সাদিফের চোখটা একসময় ঘুমের ঘোরে লেগে এল, কিন্তু মেঘের চোখে ঘুম নেই। সে বিছানার পাশে মূর্তির মতো বসে রইল। হঠাৎ বারান্দায় কিসের একটা ঝাপটানি শুনে সে উঠে দাঁড়াল।
​বারান্দায় গিয়ে মেঘ থমকে গেল। এক জোড়া লাভ বার্ড। খাঁচায় বন্দি হয়ে ছটফট করছে। এই পাখি দুটো মেঘ আবির ভাইয়ের জন্মদিনে অর্ডার করেছিল। অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়েছিল। তার মানে পাখিগুলো ঠিকই পৌঁছেছে। আবির ভাই এগুলোকে অবহেলায় ফেলে দেননি, নিজের রুমে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। নিজে খাবার না খেলেও পাখি দুটোর কী দারুণ সেবা করতেছেন। ​পাখি দুটোর কিচিরমিচির শব্দে মেঘের ঘোর কাটল।
এই ঘোরলাগা মধ্যরাতে বিষণ্ণতার মাঝেই সে একবার হাসল। এই কিশোরী বয়সে মানুষের হৃদয়ে এক ধরনের অসুখ হয়। যে অসুখের কোনো ওষুধ নেই। মেঘ বুঝল, সে নিজেও সেই একই মরণব্যাধিতে আক্রান্ত।
ভোরবেলাটা। চারদিকেমায়াবী নীল রঙ রাঙা থাকে। এই সময়ে মানুষের মন এবং শরীর দুটোই খুব স্বচ্ছ হয়ে যায়। আবির ভাইয়ের ঘোর কাটল ঠিক এই সময়ে। ​মেঘ জানলার পর্দা সরিয়ে সাদিফকে ডাকল। সাদিফ বেচারা সোফায় কুঁকড়ে শুয়ে ছিল, ডাক শুনে সে আক্ষরিক অর্থেই আছাড় খেয়ে জেগে বসল। চোখ কচলাতে কচলাতে বিড়বিড় করে বলল, ‘কী হয়েছে? কেউ কেউ এসেছে নাকি?’

​মেঘ সাদিফের মাথায় হালকা একটা গাঁট্টা মেরে বলল, ‘আবির ভাইয়ের জ্ঞান ফিরেছে। উনি এখন স্বাভাবিক। আপনি উনাকে নিয়ে নিচে আসুন, আমরা বাড়ি ফিরব।’
​সাদিফ একটা বিশাল হাই তুলে হাই-এর ভেতর দিয়েই বলল, ‘ও আচ্ছা! সমস্ত ঝক্কি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তুই এখন সটকে পড়ছিস তো? চমৎকার!’
​মেঘের মুখটা মেঘলা হয়ে গেল। সে ম্লান হেসে বলল, ‘সেরকম নয় সাদিফ ভাই। আমি উনার মুখোমুখি হতে চাইছি না। আমি গিয়ে গাড়িতে বসছি।’
​মেঘ চলে গেল। সাদিফ খানিকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থেকে আবিরের রুমে ঢুকল। আবির চোখ মেলে সাদিফকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। কাতর গলায় বলল, ‘সাদিফ? তুই এখানে?’
​সাদিফ দাঁত বের করে হাসল। ‘হ্যাঁ, আমি। একা নই, সাথে মেঘও আছে।’
​মেঘের নাম শুনতেই আবিরের কপালে ভাঁজ পড়ল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল সে, কিন্তু সাদিফ তাকে সেই সুযোগ দিল না। হাত ধরে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে উঠিয়ে বলল, ‘আর কোনো কথা নয়। সারারাত তোমার জন্য জেগে থাকা! অসুস্থ হলে একটা ফোন দিতে পারতে না? এখন কোনো অজুহাত চলবে না, সোজা বাড়ি চলো।’
​আবির এবার শক্ত হয়ে বসল। দরাজ গলায় বলল, ‘আমি বাড়ি যাব না।’

​সাদিফ এবার তার তুরুপের তাসটা ছাড়ল। মানুষকে বশে আনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ভয়। সাদিফ সেই ভয়টাই দেখালো। সে পকেটে হাত দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, যেও না। আমি এক্ষুনি বড় আম্মুকে ফোন দিচ্ছি। ফোন দিয়ে বলব যে তুমি শুধু একা থাকছ না, হাতটাও জখম করেছ। তারপর যা ঘটার ঘটবে।’
​ব্যস! কেল্লা ফতে। বড় আম্মুর কথা শুনে আবির ভাই চুপসে গেলেন। বড় আম্মু মানেই হচ্ছে মহাপ্রলয়। সেই প্রলয় ঠেকানোর সাধ্য আবিরের নেই। সে সুবোধ বালকের মতো সাদিফের পিছু পিছু নিচে নামল।
​নিচে গাড়ি রাখা। মেঘ আগেই গিয়ে পেছনের সিটে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বসে আছে। আবিরকে দেখে সে একবার তাকাল, তারপর খুব সচেতনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল। অভিমান জিনিসটা অনেকটা পান্তা ভাতের মতো, যত সময় যায় তত যেন তার স্বাদ বাড়ে। মেঘের অভিমানও এখন টইটম্বুর।
​সাদিফ ড্রাইভিং সিটে, পাশে আবির। গাড়ি স্টার্ট হলো। শহর ভেদ করে গাড়ি চলছে। মাঝেমধ্যে লুকিং গ্লাসে দুজনের চোখাচোখি হচ্ছে, কিন্তু কেউ কথা বলছে না। নীরবতা পুরো গাড়িতে রাজত্ব করছে।
​ফজরের আজান হওয়ার আগেই গাড়ি ‘খান বাড়ি’র গেটে পৌঁছালো। মেঘ কারো সাথে কথা না বলে চোরের মতো নিঃশব্দে নিজের রুমে ঢুকে গেল। সাদিফ আবির ভাইকে নিয়ে গেল তার নিজের রুমে। বাড়ির সবাই এখন গভীর ঘুমে। ঘুমন্ত মানুষদের বিরক্ত করা ঠিক নয়। এই মহৎ চিন্তায় আপাতত কাউকে কিছু জানানো হলো না। রোদ কড়া হলেই সব জানাজানি হবে।
​এখন কেবল ঘুমের অপেক্ষা।

সকালবেলাটা বেশ হট্টগোলের মধ্য দিয়ে শুরু হলো। আবির ভাইয়ের জ্বর আসার খবরটা কেন জানি গোপন থাকল না। পাড়ার রটে যাওয়া খবরের মতো হুড়মুড় করে একদল লোক তার রুমে ঢুকে পড়ল। অথচ মেঘের তখন কোনো খবর নেই। সে অঘোর ঘুমে। মেয়েটা সারারাত ঘুমাতে পারেনি, কপালে জলপটি দিয়ে দিয়ে হাতের তালু সাদা করে ফেলেছে। এখন নাক টেনে ঘুমাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, মেয়েটা যখন জাগবে এবং আবিরকে সামনে দেখবে, তখন কিন্তু তার সেবা করার কথা মনে থাকবে না।
পুরোনো সব অভিমান ঝুলি থেকে বের করে সে চিৎকার শুরু করবে। এটাই মেঘের স্বভাব এক হাতে জলপটি দেয়, অন্য হাতে ঝাড়ি মারে। আবিরের অবস্থা এখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। সে এমনিতে একটু নিভৃতচারী মানুষ, তার ওপর বড় আম্মুর অতি-সেবা তার কাছে রীতিমতো অত্যাচার মনে হচ্ছে। বড় আম্মু চিবুক ধরে বলছেন, “তুই তো আমাদের পর করে দিয়েছিস! এতো জ্বর, একবার ফোন করে বলতে পারলি না?”
আবির বিড়বিড় করে কিছু বলল না। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি থেকে ৯৮-এ নামলেই সে এই বাড়ি থেকে চম্পট দেবে। আপাতত বড় আম্মুর শাসানিগুলো সে বাধ্য ছেলের মতো গিলছে। তিনি আবার রায় দিয়ে দিলেন, “তোকে আর কোথাও যেতে দিচ্ছি না। তুই এখানেই থাকবি।”
আবির শুধু একটু মাথা নাড়াল। যে মানুষের মনে পালানোর নেশা চেপেছে, তার মাথা নাড়ানো মানে সায় দেওয়া নয়।

বিকেলের দিকে মেঘ কলেজে গেল না বটে, কিন্তু অরুর সাথে কোচিংয়ে ঠিকই গেল। সন্ধ্যাবেলা ফিরতেই দেখা গেল অন্য কিছু। বসার ঘরে স্বয়ং তূর্য মহাশয় বসে আছেন। লোকটার আবির্ভাবের কোনো আগামাথা নেই। এতদিন নিখোঁজ থেকে এখন কেন যে ঘনঘন এই বাড়িতে হানা দিচ্ছেন, সেটা অরুও বুঝতে পারছে না। আবির ভাই তখনো নিজের রুমে বন্দি, যেন এক রাজবন্দি যাকে কড়া পাহারায় রাখা হয়েছে।
রাতের খাবার টেবিলে বড় আব্বু বেশ গম্ভীর মুখে একটা ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, “আগামীকাল বাড়িতে একটা অনুষ্ঠান হবে।”
বড় আম্মু অবাক হওয়ার ভান করে বললেন, “কীসের অনুষ্ঠান?”
বড় আম্মুর কথা শেষ হতে না হতেই অরু একদম লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বলে উঠল, “কাল যে আব্বু-আম্মুর ম্যারেজ অ্যানিভারসারি!”
বড় আব্বু সায় দিলেন। ‘
আবিরের জন্মদিনের পার্টিটা যেহেতু ভেস্তে গেছে, তাই সেই খামতিটা এই বিবাহবার্ষিকী দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার একটা চেষ্টা চলবে আরকি।’

সবাই মাথা নাড়িয়ে সমর্থন জানাল। মেঘও চুপচাপ বসে কথাগুলো শুনল।
রাত বারোটা। শীতের হাওয়াটা একটু ধারালো। মেঘের চোখে ঘুম নেই। ঘুমের সাথে তার সম্পর্কটা ইদানীং খুব একটা সুবিধের না। সে যখনই চোখ বন্ধ করে, এক গাদা অবান্তর স্মৃতি এসে দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করে।
​মেঘ হালকা বাসন্তী রঙের একটা সেলোয়ার-কামিজ পরে ছাদে উঠে এল। মাথায় ওড়নাটা জড়ানো। তার খালি পা ছাদের ঠান্ডা মেঝেতে পড়ল। চনমনে শিহরণ তার মস্তিষ্ক অব্দি পৌঁছে গেল। কিন্তু ছাদের দরজাটা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই মেঘের হৃদপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য আঁটকে গেল।
​ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে ঠিক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে আবির ভাই। চাঁদের ফিকে আলো। মেঘের বুকের ভেতর দুরুদুরু শব্দ হতে লাগল। যুক্তি বলছে এখান থেকে দ্রুত প্রস্থান করা উচিত। সে উল্টো ঘুরে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই একটা শান্ত কন্ঠস্বর ভেসে এল।
​’মেঘ?’

​মেঘ শুনল, কিন্তু উত্তর দিল না। তার স্মৃতির আলমারিতে এখনো এক গাদা অভিমান আর অভিযোগ ভাজ করে রাখা। সে আরেকটা পা বাড়াতেই কণ্ঠস্বরটা এবার একটু কঠিন হয়ে এল।
​’আরেক কদম পা বাড়ালে আমার চেয়ে খারাপ মানুষ এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাবি না। সাবধান!’
​মেঘের পা যেন মেঝেতে গেঁথে গেল। সে মনে মনে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। আবির ভাই আবারও রুক্ষ গলায় ডাকল, ‘এদিকে আয়।’
​মেঘ দাঁতে দাঁত চেপে এগিয়ে গেল। দৃষ্টি মেঝের দিকে। খুব নিচু স্বরে বলল, ‘বলুন?’
​আবির ভাই পকেটে হাত দিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে এল। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। সেই হাসি দেখে মেঘের রাগটা আরও এক ডিগ্রি বেড়ে গেল। আবির ভাই বলল, ‘আমাকে এভয়েড করার মতো দুঃসাহস তোকে কে জুগিয়েছে রে মেঘ?’

​মেঘ এবার মাথা তুলল। স্পষ্ট গলায় বলল, ‘আপনিই দিয়েছেন।’
​বলেই সে মুখটা একটু বাঁকা করল। এই মুখ বাঁকানোর অর্থ গভীর। এর ভেতর জমে থাকা মেঘ আর বৃষ্টির খবর কেবল মেঘই জানে। আবির ভাই এবার গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলল, ‘তোর সাথে আমার একটা টেলিপ্যাথিক কানেকশন আছে। একে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বল তো, তুই কী করে জানলি যে আমি অসুস্থ? আমার ওপর রাগ থাকা সত্ত্বেও তুই কেন আমার কাছে ছুটে গিয়েছিলি?’
​মেঘ এক মুহূর্তের জন্য ঢোক গিলল। তার যুক্তিবাদী মন যেন একটু এলোমেলো হয়ে গেল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে সে বেশ কঠিন গলায় বলল, ​’ভুলভাল কল্পনা করবেন না আবির ভাই। আপনার সাথে আমার কোনো কানেকশন-টানেকশন নেই। আর আপনার ওপর আমি একটুও রেগে নেই।’

আবির ভাই মৃদু হাসলেন। জ্যোৎস্নার আলো তাঁর গালে জমা হওয়া কয়েক দিনের না কাটা খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির ওপর পড়ছে। মানুষটাকে এই মুহূর্তে কতটা সুদর্শন লাগছে, সেই প্রশ্নের কোনো জুতসই উত্তর মেঘের জানা নেই। এই তীব্র শীতের রাতেও তার কানের লতি গরম হয়ে উঠছে। আবির ভাই ঘাড় নিচু করে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই ভঙ্গিটা ভীষণ নান্দনিক, যেন কোনো দক্ষ শিল্পী পেন্সিল স্কেচে এই দৃশ্যটা এঁকে রেখেছেন।
আবির ভাইয়ের বুকের উচ্চতা অব্দি মেঘের মাথা। সে মাথা নিচু করে নিজের পায়ের আঙুল দেখছিল। হঠাৎ আবির ভাই নিঃশব্দে মেঘের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালেন। মেঘ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি মেঘের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরলেন। তারপর মেঘের কাঁধের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘মেঘ, তোর সব অভিযোগ আর সব অভিমান আমি একদিন এক নিমিষেই মিটিয়ে দেব, প্রমিজ। শুধু সেই দিনটা আসা অব্দি তুই আমার হয়ে থাকিস।’

কথাটা মেঘের কানে আসতেই বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠল সে। এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে সে চিৎকার করে উঠল, ‘খবরদার! আমাকে একদম ছোঁবেন না বলে দিচ্ছি। আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি, আমি আপনার ওপর একটুও রেগে নেই। রাগ করার কী আছে? আপনার যার সাথে খুশি তার সাথে কেক কাটুন, রাত বিরেতে পার্টি করুন—তাতে আমার কী? আমি অসুস্থ জানার পরেও আপনি একবারের জন্যও আমাকে দেখতে আসেননি, তার জন্য আমি কেন রাগ করতে যাব? আশ্চর্য!’

আবির ভাই পর্ব ২৬

কথাগুলো বলে ফেলার পর মুহূর্তেই মেঘের হুঁশ ফিরল। সে নিজের জিহ্বায় জোরে একটা কামড় দিয়ে বসল। মনে মনে নিজেকে গালি দিল ধিক্কার তোকে মেঘ! যা বলতে চাসনি, সব তো বলে দিলি! আবির ভাই এক গাল হাসলেন। তাঁর এক পাশের ভ্রুটা উঁচিয়ে মেঘের দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে বিজয়ের হাসি। মেঘ বুঝতে পারল, তার ভেতরের সবটুকু মেঘ আর বৃষ্টির খবর আবির ভাই পড়ে ফেলেছেন। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় মেঘের তখন মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। আবির ভাইকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়েই পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে নিচে নেমে গেল। আবির ভাই তাকে আটকালেন না। মেঘের এই পিছুটান আর ছেলেমানুষি কান্ড দেখে শব্দ করে হেসে উঠলেন।

আবির ভাই পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here