Home আবির ভাই আবির ভাই পর্ব ৩২ (২)

আবির ভাই পর্ব ৩২ (২)

আবির ভাই পর্ব ৩২ (২)
উর্মিলা মজুমদার

​”তুমি আমার প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছ কেন?” মেঘের গলায় হাহাকার, “মিথ্যা কেন বললে? আমি এই বিয়ে করব না। কক্ষনো না!”
​দরজার ওপাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ছোটো আব্বু। গ্রামের মানুষ তাকে ‘মাস্টার মশাই’ বলে ভক্তি করে। কিন্তু আজ সেই আদর্শবাদী মানুষটি যেন নিজের ভেতরেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছেন। তিনি হুরমুর করে ঘরে ঢুকলেন। মেঘের পাশে বসে খুব নিচু স্বরে বললেন, “মা, জেদ করিস না। একটু খেয়ে নে তো।”
​মেঘ মুখ ফিরিয়ে নিল। পাথরের মতো গলায় বলল, “আমি খাব না। তুমি আমার সাথে কোনো কথা বলবে না।”
​বলেই সে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ছোটো আব্বু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। তারপর হঠাৎ অত্যন্ত কঠিন গলায় বললেন, “শোন মেঘ, তুই যদি কাল এই বিয়েতে না বসিস, তবে তুই তোর এই বাবার মরা মুখ দেখবি। এই আমার শেষ কথা।”

​রাত বাড়ছে। ভাতের থালাটা ঘরের কোণে অবহেলায় পড়ে আছে। ওটা কেউ ছোঁয়নি। মেঘের দুচোখ এখন জবা ফুলের মতো লাল। তার সিল্কি চুলগুলো আলুথালু হয়ে বালিশে ছড়িয়ে আছে। জানালার বাইরে জোনাকিরা আজ মেলা বসিয়েছে। বৃষ্টির ভেতরেও তাদের মিটিমিটি আলো।

​মেঘ জানালার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে বাইরে তাকাল। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন তাকে আবির ভাইয়ের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা, আবির ভাই কি এখন তার কথা ভাবছেন? নাকি তিনি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত?​মেঘের চারদিকে শুধু দেয়াল আর দেয়াল। সে কি পারবে এই জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে? নাকি কাল তাকে এক অচেনা মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে?
​বাইরে বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। মেঘের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে অবচেতন মনেই গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠল সেই চিরচেনা বিচ্ছেদি গান:
​”ভ্রমর কইয়ো গিয়া…
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে
অঙ্গ যায় জ্বলিয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া…”

আবির ভাই কি শুনতে পাচ্ছেন? শ্রীকৃষ্ণের মতো তিনিও কি কোথাও লুকিয়ে আছেন? নাকি রাধার মতো মেঘকে একাই এই বিচ্ছেদের আগুনে পুড়তে হবে? উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। কোনো এক পেঁচা ডেকে উঠল। আর সিলেটি বৃষ্টি নামল আরও প্রবল বেগে।

নভেম্বরের সাত তারিখ। আকাশের মুখ ভার, তবে বৃষ্টি নেই। বিষণ্ণ বাতাস বইছে। বিয়ের বাড়ি মানেই এক হুলস্থূল কাণ্ড, অথচ মেঘের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে ধূ ধূ মরুভূমির মতো।
​সব নিয়ম মেনেই হচ্ছে। হলুদ বাটা হলো, মেঘের ফর্সা গালে সেই হলুদ লেগে আছে। দুই হাতে কাঁচা মেহেদি। কিন্তু এই আনন্দযজ্ঞের মাঝে মেঘের চেনা কেউ নেই। অরু নেই, পাখি নেই, চড়ুই নেই। মানুষ যখন খুব একা হয়, তখন তার শৈশবের সঙ্গীদের কথা খুব মনে পড়ে। মেঘের চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল হলুদের ওপর। নোনা জলে হলুদ মিশে একাকার।
​শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে মেঘ হুহু করে কাঁদছে। পানির শব্দে কান্নার শব্দ মিশে যাচ্ছে। এটা বোধহয় তার শেষ কান্না। এরপর আর কাঁদা যাবে না। কান্নারও একটা শেষ থাকে। মেঘের বারবার আবির ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। মানুষটা কি জানে? সে যখন বাড়ি ফিরে দেখেছে মেঘ নেই, তখন কি তার বুকের ভেতরটা একটুও হাহাকার করে নি? নাকি সে আগের মতোই নির্লিপ্ত?
​আবির ভাই বলেছিল, “আমার হয়ে থাকিস মেঘ। আমি একদিন সব দুঃখ দূর করে দেব।”
​মানুষের দেয়া কথা কি অদ্ভুত! তারা কথা দেয় ভঙ্গ করার জন্য। পৃথিবীর সব দুঃখ দূর করার ক্ষমতা কোনো মানুষের থাকে না, তবু তারা অবলীলায় বলে ফেলে। মেঘের আর একসাথে থাকা হলো না। নিয়তি বড় অদ্ভুত জিনিস। সে কাউকে ছাড়ে না।

​সিলেটের আকাশে সন্ধ্যা নেমেছে। মেঘকে সাজানো হচ্ছে। পরনে টকটকে লাল লেহেঙ্গা, মাথায় লাল আঁচল। দুই হাত ভর্তি মেহেদির গাঢ় নকশা। কান্নায় মেঘের নাকটা অসম্ভব লাল হয়ে আছে। বিউটিশিয়ানরা খুব যত্ন করে তাকে সাজাচ্ছে। মেঘ আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না। আয়নায় সে অন্য এক মেঘকে দেখছে। যে মেঘের কোনো স্বপ্ন নেই, কোনো আবির ভাই নেই।
​কিন্তু পাত্র কে? যে মানুষটা মাত্র দুই দিনের পরিচয়ে বা অগোচরে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল, সে কেমন মানুষ? কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কি দুই দিনে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে? হয়তো পারে। পৃথিবীতে লজিকের বাইরেও অনেক কিছু ঘটে। হিমু ভাই থাকলে হয়তো বলতেন, “মেঘ, মানুষের মন হলো মহাকাশের মতো। সেখানে কিসের সাথে কিসের ধাক্কা লাগে কেউ জানে না।”
​মেঘকে বাইরে স্টেজে বসানো হলো। চারদিকে আলোর রোশনাই। ফটোগ্রাফার ফ্ল্যাশ জ্বেলে ছবি তুলছে। মেঘের বিষণ্ণ মুখ সেই ছবিতে বন্দি হচ্ছে চিরকালের জন্য। কোনো হাসি নেই, কোনো উচ্ছ্বাস নেই। যেন এক পাথরের মূর্তি বসে আছে।
​ছোট আব্বু এসে মেঘের মাথায় হাত রাখলেন। গভীর মমতায় বললেন, “সুখে থাক মা।”
​সুখ জিনিসটা আসলে কী? এক ধরণের মানসিক বিভ্রান্তি নাকি প্রাপ্তির শেষ সীমানা? মেঘ জানে না। সে শুধু জানে, তার হৃদয়ের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। আবির ভাই কি সত্যিই আসবে না? ​নাহ, জীবন কোনো উপন্যাস নয়।

জীবন বড় নিষ্ঠুর সত্য। মেঘ বাবার দোয়া নিল না। ছোট আব্বুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা শূন্য। মানুষের দোয়া কি সব সময় কাজে লাগে? নাকি কিছু দোয়া অভিশাপের মতো বুকে বিঁধে থাকে? ছোটো আব্বু স্টেজ থেকে নেমে ধীরে হেঁটে দূরে সরে গেল। ​
হঠাৎ করেই শান্ত বিয়ে বাড়িতে একটা কম্পন শুরু হলো। ভূমিকম্প নয়, মানুষের তৈরি দাঙ্গা। চিৎকার, চেঁচামেচি আর এলোপাথাড়ি দৌড়ঝাঁপ।
মেঘ থমকে দাঁড়াল। ভিড়ের মাঝে দূরে একটা অস্পষ্ট অবয়ব দেখা যাচ্ছে। কুয়াশাঢাকা কোনো ছায়ার মতো। মেঘের বুক ধক করে উঠল। এই হাঁটার ভঙ্গি, এই কাঁধের আদল—এ তো চেনা! অত্যন্ত চেনা!
​মেঘ আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। দুই হাতে ভারী লেহেঙ্গাটা উঁচিয়ে ধরে সে দৌড় শুরু করল। কপালে ঘাম, চোখে জল, আর হৃদপিণ্ডটা যেন গলার কাছে এসে ধকধক করছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কোনো কল্পনা নয়, রক্ত-মাংসের আবির ভাই। ঠিক যেন কোনো সস্তা বাংলা সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যের মতো তাঁর আবির্ভাব। কিন্তু জীবন মাঝে মাঝে সিনেমার চেয়েও বেশি নাটকীয় হয়ে ওঠে।
​মেঘ গিয়ে আছড়ে পড়ল আবির ভাইয়ের বুকে। দুই হাতে তাঁর সাদা শার্টটা খামচে ধরল, যেন ছেড়ে দিলেই মানুষটা ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যাবে।

“আবির ভাই! আপনি এসেছেন? আমাকে নিয়ে চলুন এখান থেকে। আমার বি… বি…”
​পুরো কথাটা আর শেষ হলো না। প্রচণ্ড মানসিক চাপে মেঘের শরীরটা ছেড়ে দিল। সে জ্ঞান হারিয়ে আবির ভাইয়ের কোলেই ঢলে পড়ল। আবির ভাই তাকে শক্ত করে জাপটে ধরলেন। তাঁর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখ, এলোমেলো চুল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আবির ভাইয়ের সাদা শার্টের বাম পাঁজরে একদলা তাজা রক্তের দাগ লেগে আছে। অথচ তাঁর শরীরে কোনো ক্ষত নেই। এই রক্ত কার?
​আবির ভাই আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেঘ! এই মেঘ, চোখ খোল!”
​ঠিক সেই মুহূর্তে দূরে পুলিশের সাইরেন বেজে উঠল। ভিড়ের ভেতর থেকে কার যেন একটা ভয়ার্ত চিৎকার ভেসে এল “মাস্টার মশাই খুন হয়েছেন! কে যেন মাস্টার মশাইকে মেরে ফেলেছে!”
​সবকিছু হঠাৎ মূর্তির মতো স্থির হয়ে গেল। কোনো এক শক্তি যেন পুরো বিয়ে বাড়িটাকে পজ করে দিয়েছে। কান্নার শব্দে মুখরিত চারপাশ। পুরো বাড়িটাই একটা বিলাপের সুরে গুঞ্জন করছে।
​মেঘ তখনো অচৈতন্য। আবির ভাইয়ের ঠিক পেছনেই যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ অফিসার শীতল গলায় বললেন, “ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট, মিস্টার খান।”

​আবির ভাই কোনো প্রতিবাদ করলেন না। ঝট করে দু’টো চোখ বন্ধ করে ফেললেন। মানুষের চোখ যখন সত্যকে সহ্য করতে পারে না, তখন সে অন্ধ হতে চায়। তার সাদা শার্টের বাম পাঁজরে লেগে থাকা সেই গাঢ় লাল রক্তের দাগটা এখন এক ভয়ঙ্কর সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই রক্ত মেঘের বাবার মাস্টার মশাইয়ের। আবির ভাই কি জানতেন এই রক্তের উৎস?
নাকি নিয়তি তাকে দিয়ে এক নিষ্ঠুর দাবার চাল চালিয়েছে?
​পুলিশের দৃঢ় হাতের টানে মেঘের থেকে আলাদা করা হলো তাকে। যে হাত দু’টো একটু আগে পরম মমতায় মেঘকে আগলে রেখেছিল, সেখানে এখনব হাতকড়া। লোহার শব্দটা বড় বিচ্ছিরি, ঠিক যেন একটা সম্পর্কের শেষকৃত্যের ঘণ্টা বাজল। মেঘকে পাঁজাকোলা করে অন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো, আর আবির ভাইকে তোলা হলো পুলিশের ভ্যানে।

প্রশ্ন অনেক। মাস্টার মশাইকে কি সত্যিই আবির ভাই খুন করেছেন? নাকি আড়ালে অন্য কোনো কুশীলব এই মরণখেলা খেলেছে? আবির ভাই-ই বা কেমন করে জানলেন মেঘ এই সিলেটে আছে? কিছু প্রশ্নের উত্তর না থাকাই ভালো, উত্তর পেলেই রহস্যের মৃত্যু ঘটে।
​কিন্তু মেঘ? সে যখন চোখ মেলবে, যখন জানবে তার লেহেঙ্গায় এখন তার বাবার রক্তের ছিটে লেগে আছে, আর সেই খুনের দায়ে তার প্রিয় আবির ভাই জেনখানায়। তখন কি তার পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যাবে না? মানুষ সহ্য করতে পারে না এমন শোকের সাগরে যখন সে ডুব দেয়, তখন তার অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যায়। মাস্টার মশাইয়ের সেই শান্ত চোখ দু’টো এখন চিরতরে বন্ধ।

আবির ভাই পর্ব ৩২

​অন্ধকার রাতের বুক চিরে পুলিশের গাড়িটা দূরে চলে যাচ্ছে। সাইরেনের শব্দটা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। কিছু সম্পর্কের পরিণতি হয়তো শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যায়। পূর্ণতা সব গল্পের কপালে সয় না। এই খণ্ডেও সেই অতৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেল।

– প্রথম খন্ড (সমাপ্ত) –

আবির ভাই পর্ব ৩৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here