আবির ভাই পর্ব ৫
উর্মিলা মজুমদার
মেঘ দেয়ালের সাথে লেপ্টে দাঁড়িয়ে থেকে মিহি গলায় ডাকল, “আবির ভাই?”
আবির ভাই ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ছোট করে বললেন, “বল।”
“আমাকে ডেকেছেন?”
আবির ভাই এবার ল্যাপটপটা বন্ধ করলেন। কোলের ওপর থেকে সেটা সরিয়ে পাশে রাখলেন। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে মেঘের চোখের দিকে তাকালেন। সেই চাউনি দেখে মেঘের মনে হলো তার আত্মার অর্ধাংশ এখনই শরীর ছেড়ে পালিয়ে যাবে। মেঘ ভাবল, এখনই বোধহয় সকালের প্রসঙ্গটা উঠবে। এখনই আবির ভাই বলবেন, ‘মেঘ, সকালে আমার রুমে এসে কী খুঁজছিলি?’
কিন্তু আবির ভাই তেমন কিছুই বললেন না। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “জানালার ওই পাশটা দিয়ে বৃষ্টির ছিটে ভেতরে ঢুকছে। পুরো রুম ভিজে যাচ্ছে। তুই একটু জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আয় তো?”
মেঘ কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার মনে হলো সে কোনো ভুল শুনছে। তাকে এত বড় একটা টেনশনের মধ্যে ফেলে এখানে আনা হয়েছে শুধু জানালা বন্ধ করার জন্য? সে বিশ্বাস করতে পারছে না। আবির ভাই আবারও বললেন, “কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা, জানালাটা বন্ধ কর।”
মেঘ জানালার দিকে এগিয়ে গেল। জানালার থাই টেনে দিল। মেঘ ভাবল কাজ শেষ, এবার দ্রুত পালানো দরকার। সে পা বাড়িয়ে দরজার দিকে এগোতে যাবে, ঠিক তখনই টের পেল আবির ভাই একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃষ্টির ভেতর কী আছে বোঝা দায়। মেঘ গুটিগুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ঠিক যখন দরজা পার হতে যাবে, তখনই পেছন থেকে সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“আমি কি তোকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছি?”
মেঘের পা দুটো যেন কেউ সিমেন্ট দিয়ে মেঝের সাথে জমিয়ে দিল। সে থমকাল। অত্যন্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও পেছন ফিরে তাকাল। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “কোনো… কোনো প্রয়োজনে ডেকেছেন বুঝি?”
আবির ভাই উত্তর দিলেন না। তিনি ধীরলয়ে সাইড টেবিলের ওপর থেকে একটা জিনিস তুলে নিলেন। হাতের তালুতে খুব ছোট্ট একটা শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ। গোলাপটার পাপড়িগুলো কালচে হয়ে গেছে।
আবির ভাই সেই গোলাপটার দিকে তাকিয়ে সরু গলায় বললেন, “আজ সকালে আমার ঘরে কেউ একজন এসেছিল। সে সম্ভবত এই গোলাপটা এখানে রেখে গেছে। না, রেখে গেছে বলাটা ভুল হবে। হয়তো ভুলবশত ফেলে গেছে। তুই কি চিনিস এই গোলাপ কার?”
মেঘের বুকটা এবার সত্যিই পিঞ্জর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। সে অবলীলায় ঢোক গিলল। হাতটা অজান্তেই নিজের কানের কাছে চলে গেল। আজ সকালে কানে একটা গোলাপ গুঁজে সে আর অরু এই ঘরে ঢুকেছিল। সেই গোলাপটাই তবে কাল হয়েছে! মেঘের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোল না। তার চুপ থাকাটাই যেন অপরাধের স্বীকারোক্তি।
আবির ভাই এবার গলাটা সামান্য চড়ালেন। ধমকের স্বরে বললেন, “নেক্সট টাইম যদি আমার অনুমতি ছাড়া আমার রুমে ঢুকিস, তবে ফল ভালো হবে না। মনে রাখিস কথাটা, মেঘ।”
মেঘ কেঁপে উঠল। এই কাঁপুনিটা আবির ভাইয়ের ধমকের জন্য নয়, বরং তার নামটা যেভাবে আবির ভাই উচ্চারণ করলেন, তার জন্য। ‘মেঘ’ নামটা এত সুন্দর করে কেউ ডাকতে পারে, তা তার জানা ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রকৃতি তার সবটুকু নাটকীয়তা নিয়ে হাজির হলো। আকাশে তীব্র এক বিদ্যুৎ চমকাল। সেই আলোর ঝিলিক জানালার কাঁচ ভেদ করে রুমে আছড়ে পড়ল। আর তার ঠিক পর মুহূর্তেই পুরো খান বাড়িকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ চলে গেল। মেঘ ছোটবেলা থেকেই অন্ধকার আর বাজ পড়ার শব্দে ভীষণ ভয় পায়। সে আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠল, “আবির ভাই!”
আবির ভাই তৎক্ষণাৎ সোফা ছেড়ে উঠে এলেন। তিনি পকেট থেকে ফোন বের করে টর্চ জ্বালালেন। অন্ধকার ঘরে সেই এক ফালি আলো যেন একটা ধ্রুবতারা। সেই আলোয় দেখা গেল কিছু। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ভয়ে কাঁপতে থাকা সতেরো-আঠারো বছরের এক কিশোরী, যাকে এই মুহূর্তে কোনো এক উপকথার সপ্তমী কন্যা বলে মনে হচ্ছে। আর তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আটাশ বছর বয়সী এক সুদর্শন যুবক।
দুটি মানুষের হৃদস্পন্দন এখন এক সাথে বাজছে। টর্চের আলোয় তাদের দৃষ্টি একে অপরের ওপর স্থির হয়ে আছে। মেঘের ঠোঁট কাঁপছে, সারা শরীর কাঁপছে। কিন্তু আবির ভাই একদৃষ্টে মেঘকে দেখছেন। বাইরের বৃষ্টির শীতল হাওয়া ঘরটায় হানা দিচ্ছে, কিন্তু এই দুজনকে স্পর্শ করতে পারছে না। হঠাৎ করেই ‘খট’ করে একটা শব্দ হলো এবং পুরো বাড়ি আবার আলোয় ঝলমল করে উঠল। বিদ্যুৎ চলে এসেছে। মুহূর্তের মধ্যে মায়াটা কেটে গেল। আবির ভাই যেন সংবিৎ ফিরে পেলেন। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত পিছিয়ে গেলেন এবং মেঘের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়ালেন। তার কণ্ঠস্বর আবার আগের মতো স্বাভাবিক এবং কঠোর হয়ে গেল।
“চলে যা এখন। আর শোন, নিচে যাওয়ার সময় পেয়ারি আন্টিকে মনে করিয়ে দিস এক মগ বড় আদা-চা। চিনি হবে সামান্য। আর শেষ কথা যেটা বললাম সেটা মাথায় রাখিস। আমি যা পছন্দ করি না, তা কখনো ভুলেও করিস না। এর পরিণাম ভালো হবে না, মেঘ।”
মেঘের চোখের কোণে কেন জানি পানি জমে উঠল। মেঘ মাথা নিচু করে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, “সরি, আবির ভাই।”
বলেই মেঘ আর দাঁড়াল না। এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে নামতে মেঘের মনে হলো, পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছে যারা খুব দ্রুত রঙ বদলাতে পারে। গিরগিটির রঙ বদলানো সবাই জানে, কিন্তু মানুষের মেজাজ যে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে শরৎকালের মেঘের মতো পাল্টে যায়, তা আবির ভাইকে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মেঘ গ্রামে যখন প্রথম তাকে দেখেছিল, মানুষটার কণ্ঠ ছিল শরবতের মতো মিষ্টি। এখন সেই কণ্ঠে কেবল নিমপাতার তিতকুটে ভাব। কথা বললেই ধমক দেন। ধমক দেওয়াটা উনার কাছে এখন আর কোনো বিশেষ ঘটনা নয়। মনে হয় যেন আমি উনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো আসামী, আর উনি এজলাসে বসা গম্ভীর এক বিচারক। যে বিচারক কেবল সাজা শোনাতে ভালোবাসেন।
এসব ভাবতে ভাবতে দ্রুত দোতলা থেকে নেমে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল মেঘ। বুক ধুকপুকানিটা কমানো দরকার। বাবা থাকলে নিশ্চয়ই বলতো, ” মেঘ, মানুষের রাগ হলো আগুনের মতো। তাকে প্রশ্রয় দিতে নেই।”
মেঘ কিচেনে ঢুকে দেখল পেয়ারি আন্টি খুব মন দিয়ে কড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। মেঘ চটপটে বলল, “পেয়ারি আন্টি, আবির ভাইয়ের রুমে এক কাপ কড়া করে চা দিয়ে আসুন। লোকটা মনে হয় একটু আগে একটা জ্যান্ত মানুষ চিবিয়ে খেয়েছে, এখন হজমের জন্য চা দরকার।”
পেয়ারি আন্টি অবাক হয়ে তাকালেন। মেঘ আর দাঁড়াল না। মেঘের গন্তব্য এখন অরুর ঘর। অরু মেয়েটা অদ্ভুত। সব বিপত্তির মূলে থাকে সে, আর বিপত্তি ঘটলে তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠিক যা ভেবেছিল মেঘ তাই। অরু তার রুমে নেই।
সারা বাড়ি খুঁজে মেঘ তাকে আবিষ্কার করল প্রেমা আপুর ঘরে। প্রেমা আপুর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, শান্ত স্বভাব সর্বদা। রুমে ঢোকা মাত্রই প্রেমা আপু চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে এক গাল হাসলেন। বললেন, “এসো মেঘ, বসো। অরু তো তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিল।”
মেঘ শান্ত মেয়ের মতো অরুর পাশে গিয়ে বসল। অরু মেঘের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। তার চোখের দৃষ্টিতে হাজারটা প্রশ্ন। সে হয়তো ভাবছে, আবির ভাইয়ের রোষানল থেকে মেঘ অক্ষত অবস্থায় ফিরেছে কী করে। বাইরে তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। অরু হঠাৎ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, “প্রেমা আপু, এই বৃষ্টির দিনে লুডু খেললে কেমন হয়?”
প্রেমা আপু ড্রয়ার থেকে পুরনো একটা লুডু সেট বের করলেন। সবাই বিছানায় গোল হয়ে বসল। প্রেমা আপুর স্বভাবটা আসলে বেশ মিষ্টি। মেঘ আগে ভাবত তিনি কেবল গম্ভীর এক সিনিয়র আপু, কিন্তু তার কথা বলার ধরন আর ছোট ছোট হাসিতে মায়া আছে। মেঘের যদি কোনো আপন ভাই থাকতো, নিশ্চিত প্রেমা আপুকে বাড়ির বউ করে নিয়ে আসত।
এমন গোলগাল মিষ্টি একটা ভাবি পেলে বাড়ির পরিবেশটাই পাল্টে যেত। খেলার মাঝে টুকটাক কথা হচ্ছে। প্রেমা আপু বললেন, “মেঘ, তুমি এত চুপচাপ কেন? আবির কি খুব বকেছে?”
মেঘ ম্লান হাসলা “বকা তো উনার নিত্যদিনের অভ্যাস আপু। উনি কেন এমন করেন কে জানে! প্রথম প্রথম গ্রামে যখন দেখা হতো, কতো সুন্দর করে কথা বলতেন। আর এখন উনার প্রতিটি কথা যেন এক একটা কামানের গোলা।”
প্রেমা আপু ঘুঁটি চালতে চালতে বললেন, “কিছু মানুষ ভালোবাসার প্রকাশটা ঠিকমতো করতে পারে না। তারা রাগের আড়ালে মায়া লুকিয়ে রাখে। আবির হয়তো সেই দলের।”
মেঘ মনে মনে ভাবল, এমন মায়া রাখার চেয়ে খোলাখুলি রাগ করাও ভালো। লুডু খেলায় অরু বারবার চুরি করার চেষ্টা করছে। ধরা পড়লে এমন একটা মুখভঙ্গি করছে যেন সে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ বালিকা। খেলা শেষ হতে হতে বৃষ্টির বেগ আরও বাড়ল। মেঘ আর অরু যখন প্রেমা আপুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলা, তখন মেঘের ভেতরের দমানো রাগটা ফুঁসে উঠল। এই সব কিছুর মূলে অরু। সে-ই মেঘকে আবির ভাইয়ের রুমে নিয়ে গিয়েছিল। যেই ঘর থেকে বের হলা, ওমনি মেঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল অরুর ওপর।
“তোর জন্য! তোর জন্য আজ আমাকে ওই রাগী মানুষটার ঝাড়ি খেতে হয়েছে! তুই জানিস উনি আমাকে কী চোখে দেখছিলেন?”
অরু খিলখিল করে হাসতে লাগল। অরু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “মেঘ, বিশ্বাস কর, রাগী মানুষদের পছন্দ করার ধরণটা একটু আলাদা হয়। অনেকটা তেঁতুলের আচার খাওয়ার মতো। মুখে দিলে টক লাগে কিন্তু জিভে জল আসে!”
মেঘ অরুর কথা শুনে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারলা না। মেঘ অরুর কাঁধ শক্ত করে ধরল। মেঘের চোখে তখন রাজ্যের অন্ধকার। অরু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে।
মেঘ গলার স্বর যতটা সম্ভব করুণ করে বলল, “তোর জন্য আজ আমি যমের দুয়ার থেকে ফিরেছি রে অরু। বড় রকমের ধরা খেয়ে গেছি।”
অরু চোখ কপালে তুলে বলল, “ধরা খেয়েছিস মানে? কী বলছিস এসব?”
মেঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “তুই যে ওই যে বৈয়াম থেকে বাদাম চুরি করেছিস, আবির ভাই সেটা বুঝে ফেলেছেন। শুধু বুঝেছেন বললে ভুল হবে, উনি হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছেন।”
অরু হচকচিয়ে গেল। তার চেহারায় চোর ধরা পড়ার একটা আদিম ভীতি ফুটে উঠল। সে তোতলামি করে বলল, “স-সত্যি? আবির ভাই ধরে ফেলেছে আমাদের?”
“হুম। তা নয়তো কী? উনি কি আর এমনি এমনি লোক? উনার চোখ হলো এক্স-রে মেশিনের মতো। বাদাম কটা ছিল আর এখন কটা আছে, সব উনার মুখস্থ। আমাকে ঘরে ডেকে নিয়ে কী ভীষণ বকাবকি করলেন! শেষে শুদ্ধ বাংলায় ঘোষণা দিলেন আমি যেন আর কোনোদিন উনার ঘরের চৌকাঠ না মাড়াই। উনার পবিত্র ঘরে আমার মতো পাপীর প্রবেশ নিষেধ।”
আবির ভাই পর্ব ৪
অরু থমকে দাঁড়িয়ে গেল। তার চোখের পাতা ঘন ঘন পড়ছে। মানুষের মনে যখন ভয় ঢোকে, তখন সে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। অরু হঠাৎ ভ্রু কুঁচকে বলল, “দাঁড়া, একটা হিসাব মিলছে না। বাদাম যদি আমরা দুজনে চুরি করি, তাহলে আবির ভাই তোকে একা কেন ডাকল? আমাকেও তো ডাকতে পারতেন।”
