Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৩৯

আমার আলাদিন পর্ব ৩৯

আমার আলাদিন পর্ব ৩৯
জাবিন ফোরকান

আচ্ছা, লাউ কি পাকে? মানুষ না কচি লাউ পছন্দ করে?
ইরাম ম্যাকবুকের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ভাবনায় ডুবে গেল। দুপুরে বিশেষ কিছু মনে হয়নি, কিন্তু এখন কেমন যেন গণ্ডগোল লাগছে। সুগন্ধা কি বলল, কি করল, কেন করল? এমনই হয় বোধ হয়। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। ইরামও হুটহাট আজগুবি কিছু ভেবে বসে আছে। মাথা নেড়ে সে কাজে মনোযোগ দিল। আজকেই রিভিউয়ের পর আরেকটা নতুন কাজের অফার এসেছে তার কাছে, তিনদিনের ভেতর করে দিতে পারলে ১০ ডলার দেয়া হবে। তিনটা আর্টিকেল রাইটিংয়ের কাজ। প্রায় মাস দেড়েক ট্রেনিং করে ইতোমধ্যে তার হাত অনেক চালু হয়ে গিয়েছে। শুধু ভাবতে এবং ডাটা সংগ্রহ করতে একটু সময় লাগে। ইযানকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। এখন কাজ করতে করতে ব্রেস্ট পাম্প করে রাখল কারণ রাতে সাইবানের সাথে পার্টিতে যাবে সে। তখন সুগন্ধা খাওয়াবে। ইযান শুরুতে শুরুতে দুধ টেনে খেতে পারতনা। এই নিয়ে ইরাম অনেক ঝামেলা ভোগ করেছে। সাইবানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর সামিয়া ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ব্যাপারটা অনেক কাজে লেগেছে তার। সে যদি কোনোদিন দেরীও করে ফেলে, পাম্প করে রাখার কারণে যে কেউ ইযানকে খাওয়াতে পারে। ইযান শুধু সাইবানের সাথেই দুষ্টু। এমনিতে ভীষণ শান্ত বাচ্চা। অন্য কেউ কোলে নিলেও বেশি গাঁইগুঁই করেনা। আগে তো রাত বিরাতে কাঁদত। এখন কান্নাটাও কিছুটা কমে এসেছে।

কিছুক্ষণ পর তৈরি হবে বলে জিনিসপত্র সব বের করে রেখেছে ইরাম। দ্রুতহাতে রাফ আইডিয়াটা নোট করে রাখছে ম্যাকবুকে। ফিরে এসেই কাজে বসে যাবে। এমন সময় একদম অতর্কিতে তার মুখের সামনে কিছু একটা ধরল কেউ। হতচকিত হয়ে সামনে তাকাল সে। ফোনের স্ক্রিন। সেখানে ভাসছে একটা সার্টিফিকেটের ছবি। বার্থ সার্টিফিকেট।
নাম: সাহরান আলাদিন ইযান
পিতার নাম: সাইবান আলাদিন
মাতার নাম: ইরাম কিবরিয়া
সম্পূর্ণ বিষদভাবে ডিটেইলস নোট করা আছে। ইরাম মাথা কাত করে দেখল তার ঠিক পিছনেই সাইবান দাঁড়িয়ে। চেয়ারে ঝুঁকে তার কাঁধের উপর থুতনি চেপে তাকিয়ে আছে।
“বানান ঠিক আছে কিনা দেখুন। ইস্যু হয়ে যাবে কয়েকদিনের মধ্যেই।”
ইরাম ফোনটা হাতে নিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। ইযানের বার্থ সার্টিফিকেট করার সময় কিংবা সুযোগ তার কাছে ছিলনা। সাইবান এখন এটা নিজ উদ্যোগে করেছে। শুধু করছে না, সে বিষয়টা নিয়ে রীতিমত অবসেসড। কেন, তা ইরাম জানেনা।

“বানান ঠিকই আছে। কিন্তু তোমাকে আরও একবার সাবধান করে দিচ্ছি, অরণ্য যদি পরে কোনোকিছু দাবী করে তাহলে আমরা ঝামেলায় পড়ব।”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল সাইবান,
“দাবী করবে মানে? ওর বাপের সম্পত্তি? আসুক দাবী করতে, এত মাস কোথায় ছিল সে? কেইস ঠোকার ক্ষমতা আমার কাছেও আছে।”
ইরাম দেখা শেষ করতেই ফোনটা ফেরত নিয়ে নিল সে। মাত্রই বাহির থেকে ফিরেছে। ঠোঁট কামড়াল সাইবান, ফোনের স্ক্রিন দেখতে দেখতে জানাল,
“পোটলার জন্মও দেখি ১০ তারিখ। আমার ছাওয়াল।”
ইরাম ম্যাকবুক থেকে মনোযোগ হটিয়ে চেয়ারে হেলান দিল,
“ওহ হ্যাঁ। তোমার জন্মদিনও ১০ তারিখ। ১০ সেপ্টেম্বর না?”
“আপনি আমার জন্মদিন মনে রেখেছেন?”

ঠোঁট চেটে তীর্যক হাসল সাইবান। তাতে ইরাম খানিক বিব্রত বোধ করল। গলা খাঁকারি দিয়ে জানাল,
“এতে এত ভাব নেয়ার কি আছে? ছোটবেলায় তো তোমার জন্মদিনের এক মাস আগে থেকে লাফঝাঁপ শুরু করতে, জন্মদিনের এক মাস পর গিয়ে সেই লাফালাফি থামাতে। মনে না রাখতে চাইলেও মনে থেকে যায়।”
“আপনার এতকিছু মনে থেকে যায়, শুধু আমি বাদে।”
ইরাম হঠাৎ এমন কথায় ভিরমি খেল। কিন্তু কিছু বলার আগেই সাইবান হুট করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল।
“সে যাই হোক, নিজের জন্মদিন ভিন্ন দিনে পালন করার মর্মান্তিক বেদনা আপনি বুঝবেন না।”
এমন এক নাটকীয় ভঙ্গিতে সে বলল যে ইরামের ভ্রু কুঁচকে গেল,
“অন্যদিন মানে? এটা তোমার সত্যিকারের বার্থ ডেট না?”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল ঘষল সাইবান।
“মানুষের বাবা মা চাকরির জন্য ছেলেমেয়ের বয়স কমিয়ে রাখে। আর আমার মম, আমার বয়স একদিন বাড়িয়ে দিয়েছে। মনে হয় আগেই বুঝে গিয়েছিল আমার দ্বারা চাকরি বাকরি হবেনা।”
এই কথাটা জানা ছিলনা ইরামের। সে আজীবন ওই তারিখেই এই ছেলের জন্মদিন পালন হতে দেখেছে। ঠিক এমন সময়ে রুমে পা পড়ল অনুরাগের। তার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু পারফিউমের সুবাস ভেসে এলো, মিন্ট পারফিউম।
“ওর জন্মই যুদ্ধের সাথে। ডায়নামাইট বেবি!”
ইরাম চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। অনুরাগ পুরোদস্তুর তৈরি। রয়েল ব্লু বর্ণের একটা স্যুট পরনে। পকেটের দিকে ময়ূরের আদলে তৈরি একটি ব্রুচ। চুলগুলো পরিপাটি করে জেল দিয়ে সেট করা। ঠোঁটে মৃদু হাসি। সাইবান কটমট করে তাকাল বন্ধুর দিকে। অনুরাগের তাতে থোরাই কেয়ার? ইরাম কৌতূহলী হয়ে উঠল এবার,

“মানে?”
“মানে হলো ও যেদিন জন্মেছে সেদিন ও না কাঁদলেও পুরো বিশ্ব কেঁদেছে।”
“এই তুই দেখেছিস আমি কাঁদিনি? নিজে তো ছিলি তিন বছরের লেংটু! পুক্কু দেখিয়ে ঘুরে বেড়াতি!”
প্রতিবাদ করল সাইবান। পুক্কু জিনিসটা কি সেটা জিজ্ঞেস করার চাইতে স্বামীর সত্যিকারের জন্মতারিখ নিয়ে ইরামের আগ্রহ বেশি। অনুরাগ মুচকি হেসে বলল,
“সামিয়া আন্টি বলেছে না? তুই কাঁদছিলি না। তোর ওই পুক্কু বরাবর সাতটা থাপ্পড় দেয়ার পর কেঁদেছিলি।”
“মমের হাসপাতালের বিছানায়ও এত হুশ ছিল? বাসায় ফিরে খবর নিতে হচ্ছে! কোন ব্র্যান্ডের অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহার করেছে হাসপাতাল যে রোগী উঠে সব দেখে ফেলে? মামলা ঠুকে দেব!”
হাতের আঙুল মটকাতে লাগল সাইবান। ইরামের বন্ধুদের কথায় বিশেষ আগ্রহ হলনা, সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
“জন্মদিন নিয়ে কিছু বলছিলে, অনুরাগ। ও কাঁদেনি, বিশ্ব কেঁদেছে মানে কি?”
বুকে দুবাহু বেঁধে বিজ্ঞের ভঙ্গিতে অনুরাগ বলল,

“১০ এর সাথে ১ যোগ করলে কত হয়, বৌদি?”
“১১।”
“আর সালটা যদি হয় ২০০১।”
এবার মস্তিষ্কে ঢুকল ইরামের। আঁতকে উঠল,
“নাইন ইলেভেন?”
সে বলতেই সাইবান নিজের মাথায় নিজে চাপড় দিয়ে সরে গেল। যেন আরেকটা দূর্বিষহ বিষয় সামনে এসে পড়েছে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। পুরো পৃথিবী কেঁপে উঠেছিল যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হা*মলার কারণে। ঘটনাটা এতটাই ভয়ংকর ছিল যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র নয় বরং গোটা পৃথিবী জুড়ে এর প্রভাব ছড়িয়ে গিয়েছিল। তখন ইরামের বয়স ৭ বোধ হয়। বিশেষ মনে নেই তার। কিন্তু আবছায়া কিছু স্মৃতি আছে। তাদের বাড়িতে পুরাতন একটা সাদা কালো টেলিভিশন ছিল। বি টি ভি তে সারাদিন সারারাত শুধু এই নিউজ চলত। যাদের বাসায় টিভি ছিলনা, তারা তাদের বাসায় নিউজ দেখতে আসত। এলাকার টং দোকানে ভিড় জমে যেত। আলাপ, আলোচনা কত কি! সরকার পর্যন্ত গদিতে নড়েচড়ে বসেছিল। এমনি এক তোলপাড় করা ঘটনা ছিল সেটি। এই ঘটনার পরেই ইউরোপজুড়ে ধর্মবিদ্বেষ ছড়িয়ে যায় এবং শুরু হয় আফগানিস্তানের যু*দ্ধ। এই ঘটনার কথা জানে না, দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল তখন। এখনো পাঠ্যবইতে ইতিহাসের অংশস্বরূপ এটা পড়ানো হয়। ঘটনাটি বিশেষভাবে পরিচিত নাইন ইলেভেন হিসাবে।

সাইবানের জন্ম একই দিনে, যেদিন এই বিশ্বজুড়ে তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। হয়ত সেই কারণেই সামিয়া তার জন্ম তারিখটা পরিবর্তন করে ১১ এর বদলে ১০ করে দিয়েছেন। ছেলের জন্ম হবে এমন একটা বিভীষিকাময় দিনে, মায়ের আনচান মন হয়ত মানতে পারেনি। ইরাম বড় বড় চোখে সাইবানের দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা এখন থুতনিতে হাত ঘষছে। এই ছেলেটার মধ্যে আর কত কি লুকিয়ে আছে? একটা একটা করে রহস্য ইরামের সামনে উন্মোচিত হয়, আর সে অবাক হয়ে থাকে। অর্ধাঙ্গিনীকে এভাবে চেয়ে থাকতে দেখে বোধ হয় লজ্জাবোধ হলো সাইবানের। গলা খাঁকারি দিয়ে সে খেঁকিয়ে উঠল,
“এই দাদাবাবু! তুই যাবি? এসেছিস কেন ছাতার মাথা?”
মৃদু হাসল অনুরাগ। হাতঘড়ি দেখাল,
“কয়টা বাজে সে খেয়াল আছে? নাকি তোর আজ শো করার ইচ্ছা নেই?”
“যা তো। তুই চোখের সামনে থেকে গেলেই হবে। যাওয়ার সময় নিচের জরিনার আম্মা সকিনার চুলের মুঠি ধরে বলে দিস, আমার জন্য যেন কফি তৈরি রাখে। খেয়েই বেরিয়ে যাব।”
“আজ্ঞে, মহারাজ।”
স্যালুটের ভঙ্গিমা করে অনুরাগ চলে গেল। সাইবান কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে এবার ইরামের দিকে তাকাল,
“আপনি আবার টমেটোর মতন চোখ করে বসে আছেন কেন? রেডি হবেন নাকি চাইছেন আমি রেডি করাই? সেক্ষেত্রে আগামী দুই ঘণ্টায় কিছু ফিনিশ হবে কিনা গ্যারান্টি দিতে পারছিনা।”
“অসভ্য।”
মুখ ভেংচে উঠে গেল ইরাম।

প্রাইভেট কারের ভেতর বসেছে ইরাম এবং সাইবান। পিছনের গাড়িতে আছে তিতলি আর অনুরাগ। সুগন্ধা, সারিকা দুজনই ইযানের সঙ্গে বাড়িতে আছে। তারা যাবে না। একটা আসমানী রঙের জর্জেটের শাড়ি পড়েছে আজ ইরাম। চুলগুলো প্রথমে খোঁপা করবে ভাবলেও সাইবানের মন্তব্যের কারণে খোলা রেখেছে। হালকা কিছু গহনা, একটুখানি মেকআপ। এটুকুই। তাকে যথেষ্ট স্নিগ্ধ এবং পরিপাটি দেখাচ্ছে। সাইবান একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। পারতপক্ষে ইরামের দিকে না তাকানোর চেষ্টা করছে। তার বেশভূষাও ফরমাল নয়। একটা পোলো শার্ট, উপরে আবার জ্যাকেট। গলায় অহেতুকভাবে হেডফোন ঝুলছে। চুলগুলো আঁচড়ায়নি, শুধু আঙুল দিয়ে এলোমেলো করে নিয়েছে। ঢোলা জিন্স এবং ভারী কেডস। এই তার ডি জে রূপ। ইরাম কেন যেন বেশ অনেকটা সময় নিয়ে আজ স্বামীকে দেখল। এই ছেলেটার এমন বেপরোয়া ভঙ্গিমা এবং অগোছালো অবয়বে তার আজ খারাপ লাগলনা। আগে মনে হত, ছেলেটা দায়িত্বজ্ঞানহীন। অথচ এখন মনে হয়, ওই কাঁধজোড়ায় যেন এক পৃথিবী সমান দায়িত্ব চেপে চলে সে। অথচ তার বাহ্যিক রূপ দেখলে কেউই বুঝতে পারবেনা, যেমনটা ইরাম এতদিন বুঝতনা। সাইবানের প্রতি সে একপ্রকার বায়াসড ছিল। যাই করুক না কেন, সবটাই বেপরোয়া মনে হত। এখনো মনে হয়। কিন্তু আজকাল এই বেপরোয়া ব্যাপারগুলো তার কেন যেন ভালোই লাগে। এই যেমন, শাড়ির সাথে সাইবানের পোশাক আশাক যাচ্ছেনা, বিষয়টা ইরামের তেমন একটা খারাপ লাগছেনা। বরং লুকিং গ্লাসের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে, যেন প্রথম থেকেই সবটা এভাবেই হওয়ার ছিল। এটাই পারফেক্ট।

সাইবান নিজের উপর ইরামের গভীর দৃষ্টি লক্ষ্য করতে পারছে। গিয়ারের উপর হাত সামান্য কাঁপছে তার। মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে আছে কেন? সে কি জানে না, তার দৃষ্টিতে সাইবানের আত্মা খাঁচাছাড়া হয়? ইরাম বুঝল কি না বুঝল সেই জানে। হঠাৎ করে বলে বসল,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
সাইবান রাস্তার দিকে মনোযোগ রেখেই বলল,
“দশটা কথা জিজ্ঞেস করুন।”
ইরাম মাথা ঝাঁকাল। অতঃপর হুট করে জিজ্ঞেস করল,
“এতকিছু থাকতে তুমি ডি জে হলে কেন?”
ইরাম জানেনা তার প্রশ্নে কি ছিল। সে শুধু সাইবানের তীক্ষ্ণ চোয়াল শক্ত হয়ে যেতে দেখল। স্টিয়ারিংয়ে হাতের আঙুলগুলো এত শক্তভাবে চেপে বসল যে সেগুলো ফ্যাকাশে দেখাল। চোখজোড়া কেমন যেন কঠোর হয়ে উঠল। প্রথম এক মিনিট সাইবান কোনো উত্তর করলনা। পরক্ষণে গাড়ি ঘুরিয়ে খানিকটা গতি বাড়িয়ে বলল,
“ওরা আমাকে বলেছিল আমি আমার রিচ ফ্যামিলির প্যাম্পার্ড কিড। ক্যারিয়ারে কিছু না হলেও চলবে, আমার মম ড্যাডই লাইফ সেট করে দেবে।”

কথাগুলো মিথ্যা নয়। সাইবান চাইলেই সেটা সম্ভব হত। তার পারিবারিক অবস্থার কথা বিবেচনা করলে ক্যারিয়ারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ না দিলেও চলে। তবুও সামিয়া মুন্সীর পরিবারটা অন্য ধাতুতে গড়া। তারা সর্বদাই শিক্ষাকে প্রাধান্য দেন। সামিয়া নিজে ডাক্তার, সারিকা ডেন্টিস্ট, এমনকি সুগন্ধাকেও পড়ালেখা করানো হচ্ছে। সাইবান চাইতো মায়ের মতন ডাক্তার হতে। কিন্তু সে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। প্রাইভেটে তো পড়তে পারত। কেন পড়েনি? সেটা জিজ্ঞেস না করে ইরাম শুধাল,
“বাবার ব্যবসায় বসতে পারতে।”
“অন্যের গড়া সাম্রাজ্য কি আমার হতো?”
একটু জোরালোভাবেই বাঁক কাটল সাইবান। ইরামের কাঁধে সিটবেল্ট চেপে বসল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল সে সামান্য। প্রতিবাদস্বরূপ কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পারলনা। সাইবানের গভীর কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আমার নিজের পরিচয়ের দরকার ছিল, পরিবারের না। যারা বলত আমার কিছু না করলেও চলবে, তাদের এক মাসের বেতন আমার এক ঘণ্টার উপার্জন। আমাকে কেউ সাইবান উদ্দিন নামে চেনে না, চেনে আলাদিন হিসাবে। এটুকুই।”

“টাকাই কি সব সফলতার মাপকাঠি?”
ইরাম বলতেই সাইবান হালকা একটু মাথা কাত করে তাকাল, তীর্যক হাসল। অথচ সেই হাসিটুকুতে বিনোদন নয় বরং বিষাদ মাখা ছিল।
“আপনারও কি আফসোস হয় যে আমি ভদ্র ঘরের ছেলেদের মতন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি?”
“আমি সেটা কখন বললাম?”
প্রতিবাদ করল ইরাম। কিন্তু সাইবান আর তাকালনা তার দিকে। মুখ ফিরিয়ে খানিকটা রুক্ষ গলায়ই বলল,
“গাড়ি চালানোর সময় এত কথা বলবেন না। আমার ডিস্টার্ব হয়।”
এটুকুই। নীরব হয়ে গেল উভয়ে। ইরাম নিজের কোলের দিকে চেয়ে ভাবল, সে সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু একসঙ্গে চাপ দেয়া যাবেনা। একটু একটু করে উদঘাটন করতে হবে সম্পূর্ণটা।
পার্টিতে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগলনা আর। একটা কনভেনশন হলে আয়োজন। ব্যাচেলরেট পার্টি বাংলাদেশের কালচার নয়। তবুও ইদানিং অনেকেই বিদেশী ঐতিহ্যে মাততে ভালোবাসে। এখনকার বিয়েরও হরেক অনুষ্ঠান। পাকা দেখা, আংটি বদল, বাগদান, ডালা বদল, মেহেদী অনুষ্ঠান, সঙ্গীত অনুষ্ঠান, গায়ে হলুদ, বিয়ে, রিসিপশন আরও কত কি! ভাবলেও হাঁপানি উঠে যায় ইরামের। ব্যাচেলরেট পার্টি সাধারণ বর এবং কনে আলাদা আলাদাভাবে রাখে, বিয়ের আগে বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে উদযাপনের জন্য। কিন্তু এক্ষেত্রে সেটাও ব্যতিক্রম। বর কনে দুজনই একসাথে পার্টি রেখেছে। তাদের বন্ধু বান্ধবরা সবাই আমন্ত্রিত। ভিড় ভাট্টাও অনেক বেশি। সাইবান গাড়ি থেকে নামতেই কয়েকজন ছুটে এলো, কানে কানে কি যেন বলল। সে মাথা দুলিয়ে ইরামের কাছে ফিরল।

“আমার এবার স্টেজে যেতে হবে। অনুরাগদের সাথে সাথে থাকবেন, কেমন?”
এগিয়ে এসে হুট করে অর্ধাঙ্গিনীর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে সাইবান ফিসফিস করল,
“আসলাম লক্ষ্মীটি।”
হতবাক হয়ে রইল রমণী। বুকের ভেতর দামামা বাজল নতুন করে। সাইবান দাঁড়ালনা। উল্টো ঘুরে দ্রুতপায়ে ভেতরে ঢুকে গেল। চাকচিক্যময় সাজসজ্জা আর লাইটিং বাতির ভিড়ে ইরাম ভ্যাবলার মতন দাঁড়িয়ে রইল ততক্ষণ, যতক্ষণ না অনুরাগ এবং তিতলি এসে যোগ দেয়। অতঃপর তারা সবাই একসঙ্গে ভেতরে ঢুকল।
বাইরে থেকে যতটা চাকচিক্য, ভেতরে তার থেকেও বেশি অভিজাত হলটা। সুবিশাল। এক কোণায় খাবার এবং ড্রিংকসের বুফে। একটা বড়সড় চকলেট ফাউন্টেন দেখা যাচ্ছে। ডিম লাইট, সবুজাভ, লাল এবং কিঞ্চিং নীলের মিশ্রণ। সবাই এদিক সেদিক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মানুষ প্রচুর। পিছনের দিকে স্টেজ। সেখানে এল ই ডি স্ক্রিনে জ্বলজ্বলে নিয়ন বাতিতে লিখা,
—ডি জে আলাদিন।
দুই পাশে দুটো সুবিশাল পোস্টার, যাতে সাইবানের ছবি এবং লোগো। সাউন্ড প্যানেল প্রস্তুত। গমগমে একটা মিউজিক শুরু হয়েছে এর মধ্যেই, তার তালে তালে দুলতে শুরু করেছে অনেকে। সাইবানকে অবশ্য এখনো স্টেজে দেখা যাচ্ছেনা।

অনুরাগের পাশাপাশি হেঁটে কিছুটা যেতেই ইরাম খেয়াল করল তার আশপাশের ছেলেমেয়েগুলো কেমন করে যেন তার দিকে তাকাচ্ছে। এটা কি পোশাকের জন্য? এখানকার বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের পরনে ওয়েস্টার্ন, নয়ত ফরমাল। শাড়িও যে একেবারে কেউই পড়েনি তা না। তবে তাদের শাড়ি গুলোও চিকচিকে, পাতলা টিস্যুর মতন কাপড়ের। ইরামকে এভাবে দেখার অর্থ কি? আবার কি যেন মন্তব্যও করছে। যেহেতু বর কনের বন্ধু, এখানে কারোরই বয়স খুব বেশি না। এই ধরণের পার্টি গুরুজন কিংবা আত্মীয়দের জন্য হয়না। তাই ইরামের সমান কেউ আছে কিনা সন্দেহ রয়েছে। অন্তত সে দেখতে পাচ্ছেনা। একদল ছেলেমেয়ে হুট করেই এগিয়ে এলো। যাদের নেতৃত্বে কালো জরি বসানো টাইট ড্রেস পরা একটি মেয়ে। ভীষণ সুন্দরী, টগবগে তরুণী। এগিয়ে গেল তিতলি। নিজের বডিকোণ গাউনটা সামলে তরুণীকে আলিঙ্গন করল।

“ফাইনালি, কতদিন পর দেখলাম তোকে রিসা!”
“মি টু। কি খবর তোর তিতলি? আরে অনুরাগ!”
অনুরাগকেও হালকা জড়িয়ে ধরল মেয়েটি। এই রিসাই যে সাইবানের ক্লাসমেট, যার ভাইয়ের বিয়ে, বুঝতে বাকি রইলনা ইরামের। কিছুক্ষণ বাদে রিসা হঠাৎ তার দিকে ঘুরল। বিরাট হাসি নিয়ে এগিয়ে এলো,
“আপনি। নিশ্চয়ই আমাদের সাইবানের বউ?”
“জি। আমার নাম ইরাম কিবরিয়া।”
“হুম। অনুরাগদের সাথে একজন মহিলাকে ঢুকতে দেখেই বুঝে গিয়েছি।”
ইরামের সাথে হ্যান্ডশেক করল রিসা। মেয়েটা সরাসরি অপমান করেনি। কিন্তু মহিলা—সম্বোধনটা অপমানজনক অর্থে ব্যবহার করেছে বুঝতে রমণীর বেগ পোহাতে হলনা। আড়চোখে তিতলির দিকে দৃষ্টি ফেলল সে। চোখ উল্টে মুখে বিনোদন মেখে তাকিয়ে আছে সে। মেয়েটার সঙ্গে কোনো আঁতাত আছে রিসার। এটুকুও ইরাম বুঝল। ক্লাসমেট ক্লাসমেট, বান্ধবী বান্ধবী। তবে সবকিছু হটিয়ে মৃদু হাসল সে,
“জি। বয়সটা তো কম হলো না। আমি বরং অবাকই হলাম আন্টি না বলে মহিলা বললে বলে।”
রিসার মুখটা খানিক পাংশু হয়ে গেল। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই অনুরাগ এসে হস্তক্ষেপ করল।

“এক্সকিউজ মি, সবাই কি এভাবেই কথা বলে বলে কাটিয়ে দিবি? তোর ভাই, ভাবী কোথায়? চল, শুভেচ্ছা জানিয়ে আসি।”
মনে মনে খানিক স্বস্তি পেল ইরাম। অনুরাগদের সাথে গেল চুপচাপ। যার বিয়ে হচ্ছে, সে ইরামের থেকে বয়সে ছোট। রিসার ভাই আবার তার সমান, একই এইচ এস সি ব্যাচ, কথায় কথায় জানা গেল। কিন্তু সামাজিকতাটা ইরাম খুব বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলনা। সে যেদিকে যাচ্ছে, কিছু মানুষের দৃষ্টি তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে। কানাঘুষো হচ্ছে। কেউ কেউ আবার হাসাহাসিও করছে। অবাক করা বিষয় হলেও সত্যি, এর মাঝে মেয়েরাই সংখ্যায় বেশি। ছেলেগুলো সামনে পড়লে ইরামকে সালাম দিয়ে চলে যাচ্ছে, নাহয় চুপিচুপি হাসছে। কিন্তু মেয়েগুলো থেকে থেকে তাকে বিনা কারণে দেখছে আর নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে। তাদের প্রত্যেকের গল্পের টপিক যে সেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
“কাক পাখনা লাগালেই কি আর ময়ূর হয়ে যায়?”
“আই লাভ এইজ গ্যাপ। কিন্তু সেটারও একটা লিমিট তো আছে ভাই।”
“এমন পার্টিতে একটা আন্টি কি করছে ভাই? মনে হচ্ছে এখনি সিসি ক্যামেরার মতন বলা শুরু করবে, কালকে পাশের বাড়ির ছেলের সাথে তোমাকে পার্কে দেখেছি!”
“বুড়ি বয়সে নটাংকি।”

“আগেরজন মনে হয় ভালো সুখ দিতে পারেনি, তাই কচি ছেলের প্রয়োজন হয়েছে।”
সে কি নিদারুণ হাসাহাসি একেকজনের। অনুরাগ বিষয়টা খেয়াল করেছে, সে হনহন করে এগোতেই যাবে কিন্তু ইরাম হাত চেপে ধরল। ইশারায় মানা করল। দাঁত কিড়মিড় করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও পিছিয়ে গেল অনুরাগ তাই। কিন্তু ক্রুব্ধ দৃষ্টি ফেলা ছাড়লনা। তার চোখ দেখলেই অনেকে চুপ হয়ে যাচ্ছে। ইরাম কাউকেই কিছু বললনা। কারোর কাছে প্রমাণ দেয়ার কিছু নেই। পার্টিতে প্রথমটায় সে আসতে চায়নি। নেহায়েত পরিবার নিয়ে এসেছে বলে সাইবানের সঙ্গে তাকেও দাওয়াত দেয়া হয়েছে। সকলকে ছাড়িয়ে সে চুপিচুপি হেঁটে গেল খাবারের টেবিলের দিকে। উদ্দেশ্য একটা জুস নেবে। ঠিক তখনি পরিচিত অবয়বটা চোখে পড়ল। একজন লম্বাটে, ফিনফিনে শরীরের পুরুষ। পিঠ দেখা যাচ্ছে। খয়েরী সিল্কের শার্ট এবং কালো ফরমাল প্যান্ট পরনে। শ্যামলা মুখ, চোখে চশমা। এক হাতে একটি অরেঞ্জ জুসের গ্লাস।
কায়সান রুশদী।
ইরাম বেশ অবাক হলো। কায়সান এখানে কি করছে? তবে কি এই কারণেই ক্লাস ছুটি? আস্থাশীল একজনকে দেখে তার কিছুটা ভালো লাগল। এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে।
“কায়সান?”

কায়সান অন্য একজনের সাথে কথা বলছিল। মাথা কাত করে ইরামকে দেখেই সে অবাক হয়ে গেল। দ্রুত নিজেকে এক্সকিউজ করে লম্বা পা ফেলে হাসিমুখে এগিয়ে এলো।
“তুমি এখানে?”
“একই প্রশ্ন আমারও। তুমি? তোমার তো পার্টি পছন্দ না জানতাম।”
একগাল হাসল কায়সান।
“বরের বন্ধু আমি। জোরাজুরি করল, তাই মানা করতে পারলাম না।”
ইরামের চোখজোড়া প্রসারিত হলো। এবার বুঝতে পেরেছে। বরের সঙ্গে তার এইচ এস সি ব্যাচ মিল, তার মানে সে কায়সানের বন্ধু হতেই পারে।
“যাই হোক, পার্টি ভালো না লাগলেও এখন তোমাকে দেখে ভালো লাগছে।”
কায়সান নিজের হাতের জুসের গ্লাসটা এগিয়ে দিল,
“নাও। তোমার মুখটা কেমন শুকনো দেখাচ্ছে। আমি এখনো একটুও পান করিনি, এটা ফ্রেশ।”
ইরাম মৃদু হেসে গ্রহণ করল।
“থ্যাংকস।”
টেবিলের কাছেই দুজন দাঁড়াল। নিজেদের মতন গল্প করতে লাগল। আশেপাশের দৃষ্টি এবার রীতিমত ভুলে গেল ইরাম। সময়টা এখন আর খারাপ লাগছেনা। তবে কিছুক্ষণ বাদেই এক কোণায় তিতলির উপস্থিতি লক্ষ্য করল সে। মেয়েটা একা নয়, দলে আরও কিছু মেয়ে আছে। নিজেদের মধ্যে চাপড়া চাপড়ি করে অট্টহাসি হাসছে তারা।
“একটা বাচ্চা সহ ইয়াং ছেলের গলায় ঝুলে যাওয়ার কোনো মানে হয়? বেশরম নাকি?”
“পুওর বয় সাইবান।”

কথাগুলো তখনো গুঞ্জরিত হয়ে যাচ্ছে পার্টির মাঝখানে। অত্যন্ত জোরেই। তিতলি ইশারায় নিজের দলকে চুপ করানোর চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু সেটা যে নিতান্তই নাটক সেটা তার ঠোঁটের হাসি দেখলেই বোঝা যায়। ইরাম অবশ্য কর্ণপাত করছেনা। সে নিজের জায়গায় স্থির। দৃষ্টি কায়সানের উপর। চশমা খানিকটা টেনে চোখের উপর তুলে কায়সান আড়চোখে দৃষ্টি ফেলল দলটার উপর,
“ওদের কথায় একদম মনোযোগ দিওনা। মানুষের সমালোচনা করা ছাড়া ওদের কাজ নেই। তোমাকে যথেষ্ট সুন্দর দেখাচ্ছে। শুধু শুধু আক্রোশ মেটাচ্ছে।”
“ইটস ওকে, কায়সান, জাস্ট লুক অ্যাট মি।”
কায়সানের হাত টেবিলের কোণায় অত্যন্ত শক্তভাবে বসেছে বিধায় ইরাম হাত বাড়িয়ে সেটা ছাড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা চমকে উঠে গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল পুরুষটি। ইরাম সেই দৃষ্টির মাঝে লুকায়িত অনুভূতিটুকু ধরতে পারার আগেই মাইক্রোফোনে ভেসে এলো কন্ঠস্বর,
“হ্যালো হ্যালো ইওর ডি জে হেয়ার।”
গমগম করে উঠল গোটা হল। চারিদিকে নীরবতা নেমে এলো। আবছায়া আলো আঁধারি ভেদ করে স্টেজে দেখা মিলল সাইবানের। উপরে ফোকাস লাইট জ্বলছে। চেহারা ভাবলেশহীন, উজ্জ্বল। তার চোখজোড়া সমস্ত হল ঘুরে এক সেকেন্ডের জন্য থামল ইরামের উপর। পরক্ষণেই দৃষ্টি সরিয়ে স্টেজের উপর থেকে অত্যন্ত নমনীয় এবং শান্ত গলায় বলে গেল,

“আজকে আপনাদের সঙ্গে আমি এমন একজনকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই, যিনি একাধারে অনেকগুলো আইডেন্টিটি বহন করেন। তিনি একজন ফ্রি ল্যান্সার, একজন ক্লাসিক্যাল ডান্সার, একজন মা, একজন বোন এবং একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী। যিনি সব কাজ করে শুধু নিজের বাচ্চাকেই সামলান না, বরং আমার মতন একটা বড় বাচ্চাকেও সামলান।”
নিজের একটি হাত তুলে সরাসরি দূরে দাঁড়ানো ইরামের দিকে নির্দেশ করল সে,
“অ্যান্ড দিস লাভলি লেইডি ইয মাই ওয়াইফ, মাই প্রেশিয়াস, হুম আ’ম প্রাউড অব।”
লাইটগুলো সরাসরি ইরামের উপর ফোকাস করল। বেচারী কিছুই করতে পারলনা, স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে পারল শুধু। শেষ কবে তার সাধাসিধে নামটার আগে এতগুলো সম্বোধন বসেছে মনে পড়লনা তার। সাইবান কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে দুহাতে একটা তালি বাজিয়ে বলল,
“কেমন হয় যদি আজকের পার্টিটা একটুখানি ভিন্নভাবে শুরু করা যায়? আর ইউ গাইয রেডি?”
সাউন্ড সিস্টেম অন করে কন্ট্রোলে ঝুঁকল সাইবান, একটি ক্লাসিক মিউজিকের সুর ভেসে এলো। তবলা এবং রাগসঙ্গীতের মেলবন্ধন।

“প্লিজ, ওয়েলকাম অন স্টেজ, মিসেস আলাদিন!”
“ইয়েস!”
পুরো হল এক লহমায় উল্লাসে ফেটে পড়ল। কোথা থেকে কি হলো ইরাম বুঝতেও পারলনা। তাকে কে যে ঠেলে ঠুলে স্টেজের কাছে নিয়ে গেল দেখার আগেই কানে শুনতে পেল ভিড়ের গর্জন,
“নাচ! ভাবী নাচ!”
এর মাঝেই কিছু কিছু মানুষ এই সামান্য কয়েক মুহূর্ত আগেই ইরামকে হেলাফেলা করছিল। মানুষ প্রজাতি বড়ই অদ্ভুত। মাথা ঝাঁকিয়ে ইরাম অবশেষে স্টেজে পা রাখল। সাইবানের দিকে তাকাল, যে ঠোঁটে বিরাট হাসি ঝুলিয়ে চেয়ে আছে। ইশারায় সে ইরামকে স্টেজের মাঝখানটা দেখিয়ে দিল। বুকের ভেতর ধুকধুক করল রমণীর। নাচ শেখা এক জিনিস, শখের বশে নিজে নিজে করা এক জিনিস, আর এতগুলো অচেনা মানুষের সামনে পারফর্ম করা আরেক জিনিস। উপরন্তু, বেশিরভাগ আজকালকার ছেলেমেয়ে। এরা কি তার কত্থক পছন্দ করবে?

অতকিছু ভাবার সময় হলোনা। সঙ্গীতের সুর চড়াও হতেই ইরামের শরীর আপনা থেকেই সাড়া দিল। শাড়ির আঁচলটা টেনে ঢিলেভাবে কোমরে গুঁজল সে। অতঃপর ছেড়ে দিল নিজেকে। উন্মুক্ত করে দিল যেন সকল দ্বিধার দুয়ার। সমালোচনা, ভ্রুকুটি, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য, অপমান কোনোকিছুই তার স্মরণে রইল না। যতটুকু মুদ্রা মনে আছে, ততটুকুই কাজে লাগাল। ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে চুলগুলো হাওয়ায় দুলল তার। তরঙ্গের ন্যায় খেলে চলল সমস্ত স্টেজে। এ যেন এক মুক্ত বিহঙ্গ, স্বাধীনতার আনন্দে উল্লাস করছে। কে কি বলছে, না করছে সেই চিন্তাও আর রইলনা ইরামের। হারিয়ে ফেলেছে সে নিজেকে। পরিবর্তনটা বুঝল সে কিছুক্ষণ বাদেই। তবলার নৃত্যসঙ্গীত নেমে গিয়ে ধীরে ধীরে ভিন্ন একটি সুর প্রবেশ করল। গানটা ইরামের অচেনা লাগল।
নিজের কোমরে একজোড়া শক্তিশালী হাতের উপস্থিতি টের পেলো রমণী। আলতো ছোঁয়া, কিন্তু তাতে মেশানো আবেগ। ঝট করে চোখ খুলে গেল তার, পিছনেই দেখল সাইবানকে। এরপরই ভেসে এলো গানের কথা,
~When all I dream of is your eyes
All I long for is your touch
And, darling, something tells me that’s enough,
mm-mm-mm-mm~

ইরামকে ঘুরিয়ে দিল সাইবান। তর্জনী আঙুল ধরে গোল গোল ঘুরিয়ে নিজের বুকে টেনে নিল। মৃদু আলোর নিচে, হালকা তালে দুলতে লাগল সে। অর্ধাঙ্গিনীকে হাতের বাদ্যযন্ত্রের মতন নিয়ন্ত্রণ করছে সে। শুধু গানটাই বাজছে না, ঠোঁটের পাশে লাগানো মাউথপিসে সাইবান নিজেও গলা মিলাচ্ছে,
~You can say that I’m a fool
And I don’t know very much
But I think they call this love~
সরাসরি ইরামের চোখের দিকে তাকাল সে, কপালে ঠেকাল কপাল। ঠিক ওই মুহূর্তে, ইরামের জন্য হলের ভেতর থাকা অন্য সকল মানুষ গায়েব হয়ে গেল। সে শুধু দেখতে পেল নিজের স্বামীকে, যার হাতের সুনিয়ন্ত্রনে তার শরীর ভেসেছে স্রোতের জোয়ারে। মন উড়েছে অজানায়। কত্থক নৃত্য হোক, কিংবা এই ডুয়েট, ইরাম শুধু তার আলাদিনকেই অনুভব করতে পারল। এই আলো আঁধারির মায়ায় শুধু আছে সে এবং তার আলাদিন। মুচকি হাসল তার আলাদিন, গানের লাইন গুনগুন করতে করতেই খোলা চুলে আঙুল বুলিয়ে কানের পিছনে গুঁজে কপালের পাশে ঠোঁট ছুঁয়ে গানের সাথে গলা মিলিয়ে গাইল,
~Yes, I think they call
This love~

ইযানকে খাইয়েছে সারিকা। এখন সুগন্ধা খেলছে বাচ্চাটার সাথে। সবকিছু ঠিকঠাক আছে নিশ্চিত হয়ে সারিকা নিচে নেমে এলো। সকাল থেকে মাথাটা ব্যথা করছে। এক মগ কড়া চা দরকার তার। এই ভেবে বাড়ির রান্নাঘরের দিকে এগোতে যাবে এমন সময় অদ্ভুত দৃশ্যটা নজরে এলো তার। বসার ঘরে কাঠের টেবিলের উপর বিশাল বড় একটা ফ্রিশিয়া ফুলের বুকে। হালকা হলুদাভ রঙের থোকা থোকা ফুল। তাজা, সুঘ্রাণে ভরপুর চারপাশ। সারিকা হতবম্ব হয়ে গেল। এটা তার সবথেকে পছন্দের ফুল। কিন্তু বাংলাদেশে পাওয়া ভীষণ দূর্লভ বিধায় তেমন একটা দেখা যায়না। এই ফুলের এত বড় বুকে কোথা থেকে এলো। এগিয়ে গেল সারিকা। মুখ ডুবিয়ে সুঘ্রাণটুকু গ্রহণ করতে লাগল। চোখজোড়া আবেশে বুঁজে এলো তার। ঠিক তখনি পিছন থেকে কন্ঠস্বরটি ভেসে এলো,

আমার আলাদিন পর্ব ৩৮

“হ্যাপি বার্থডে, ওয়াইফ।”
সারিকা ঝটকা দিয়ে পিছন ফিরে তাকাল। তার চোখজোড়া স্থির হয়ে দেখল, পিছনে দুহাত ভরে ঠোঁটে অত্যন্ত সূক্ষ্ম হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার স্বামী।
মিসির ইকবাল।

আমার আলাদিন পর্ব ৪০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here