Home আমার আলাদিন আমার আলাদিন পর্ব ৪৩

আমার আলাদিন পর্ব ৪৩

আমার আলাদিন পর্ব ৪৩
জাবিন ফোরকান

বিকালে সুগন্ধার সাথে বেরিয়েছিল ইরাম। কাছের এক লোকাল মার্কেটে ঘুরে এসেছে। সবারই সারিকাকে কিছু না কিছু দেয়া হয়েছে, কিন্তু তার দেয়া হয়নি। একটা পায়েল কিনেছে সে। যদিও সারিকাকে কখনো নূপুর বা পায়েল জাতীয় কিছু ব্যবহার করতে দেখেনি, তবে কেন যেন মনে হয়েছে বস্তুটা দারুণ মানাবে ননদিনীর পায়ে। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো তার। বাইরে থেকে নাস্তা কিনে এনেছে, সুগন্ধা সেসব বেড়ে সবাইকে দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন সময় রুমে ফিরে ইরাম অবাক হলো।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলে আঙুল বুলিয়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছে সাইবান। পুরোদস্তুর তৈরি। নিয়ন হলুদ এবং গাঢ় নীল বর্ণের একটা রংচঙে জ্যাকেট পরনে। ঢোলা জিন্স। ঘাড়ে ঝুলছে হেডফোন। নিজের অনামিকায় একটা সিলভার আংটি গলিয়ে নিচ্ছে সে এমন সময় ইরাম কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“কোথায় যাচ্ছ?”
সাইবান থমকাল। পিছন ঘুরে তাকিয়ে অর্ধাঙ্গিনীকে দেখল। সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ পরনে ইরামের, তাতে আয়না বসানো পুঁতির কারুকার্য। ঠোঁটে অতি ক্ষীণ একটা হাসির রেখা ফুটল সাইবানের, জবাব দিল,
“শো আছে।”
ইরাম অবাক হলো।
“শো? কিন্তু তোমার তো একটাই শো ছিল যতদূর জানতাম।”
“হুম। আজকেরটা স্পেশাল শো।”
চোখ টিপ দিল সাইবান। ইরামের কেন যেন আচরণটা ঠিক ভালো লাগলনা। তবে সে কিছু বলতে পারলনা। এর আগেই সাইবানের পকেটে ফোনটা বেজে উঠল। দ্রুত বের করে রিসিভ করল সে। সামিয়া ভিডিও কল করেছেন ঢাকা থেকে। ফোনটা তুলে ধরে মুখে আহাম্মকি হাসি ফুটিয়ে সাইবান কপালে সালাম ঠুকে বলে উঠল,

“ইও ব্রো! হোয়াটস আপ?”
ইরাম না পারতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা দোলালো। যারা সাইবানকে ব্যক্তিগতভাবে চেনে না, তারা দেখলে নির্ঘাত ভাববে কত জনম জনমের পুরাতন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে সে। সামিয়া ওপাশ থেকে বললেন,
“অবস্থা তো গুরুতর। এইতো, তোর পেয়ারের চেঙ্গিস আর ওসামাকে পশু ডাক্তার দেখিয়ে আনলাম।”
সাইবানের ঠোঁট থেকে হাসিটা সহসাই মুছে গেল। স্ক্রিনের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল সে। ইরামও এবার কৌতূহল দমাতে পারলনা। তার পাশে দাঁড়িয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিল দেখার জন্য। সামিয়া ক্যামেরা ধরে দেখাচ্ছেন, একটা নরম গদিতে শুয়ে আছে সাইবানের হ্যামস্টার। ধবধবে সাদা চেঙ্গিস খান এবং গোটা কালচে বাদামী বারাক ওসামাকে দেখা যাচ্ছে। ব্যান্ডেজের মতন কিছু জড়ানো শরীরে। জিভ দাঁতে ঠেকিয়ে বিরক্তির শব্দ তুলল সাইবান,

“আমি চোখের আড়াল করলেই ওদের মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়, না? দেখি, কালপ্রিটটা কোথায়? ওকে ধরে দুটো উষ্টা দিতে পারনি?”
সামিয়া হাসলেন, ক্যামেরা ঘোরাতেই অপর একটা কাঁচের বাক্সে বালুর উপরে ঘুরঘুর করতে দেখা গেল সাদা আর বাদামীর মিশেলে গড়া কিম জং হিটলারকে। দিব্যি আনন্দে আছে সে। সামিয়া খুব সম্ভবত আঙুর দিয়েছেন, একটা ধরে চুকচুক করে চিবিয়ে যাচ্ছে। সাইবান ধমকে উঠল,
“ইশ! চেহারাটা দেখ যেন ওনার মতন পবিত্র বান্দা দুনিয়ায় দুটো নেই। ওই হিটলারের বাচ্চা ওই! ওদের মেরেছিস কেন?”
ইরাম বিস্মিত না হয়ে পারলনা। অবাক কন্ঠে শুধাল,
“ও বাকিদেরকে মারে?”
চোখ ওল্টালো সাইবান,

“মানুষ হলে সঙ্গী দুজনকে ব্লেন্ডারে ভরে চোখ বুঁজে ব্লেন্ড করে ফেলত! আপনার কি মনে হয়, সাধে ওকে হিটলার ডাকি? মালটায় একটা ডিক্টেটর!”
ইরাম হাসবে নাকি দুঃখ করবে বুঝতে পারলনা। সাইবানের সাঙ্গপাঙ্গ তারই মতন। অবিশ্বাস্য! মাথা দুলিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল সাইবান, আঙুল তুলে শাসাল,
“ওই শালাটাকে একদম চেঙ্গিস আর ওসামার আশেপাশে যেতে দেবে না, মম। দরকার হয় সিন্দুকে ভরে লক করে রাখো। দুই ঘণ্টা খাবার না দিলে যখন দাঁতের জ্বালা উঠবে, তখন এমনিতেই সোজা হয়ে যাবে। আমি এসে নেই, তারপর তোর পিঠের উপর আমি কফি বিন ভাঙব হিটলার!”
হিটলার বুঝেছে কি বোঝেনি সেই জানে। ইরাম শুধু দেখল তার দাঁতের ধার বেড়ে গিয়েছে। একটা আঙ্গুর সমাপ্ত করে চুকচুক করে আরেকটা গিলছে। সামিয়া হেসে ফোন ঘুরিয়ে ফেললেন। সাইবানের দৃষ্টি কেমন যেন নরম হয়ে এলো,

“চেঙ্গিস আর ওসামা ঠিক আছে তো? বেশি সমস্যা হয়েছে?”
মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন সামিয়া।
“না, ওই একটা কামড় খেয়েছে, আরেকজনের সঙ্গে আঁচড়া আঁচড়ি হয়েছে। ডাক্তার বলেছে তেমন গুরুতর নয়, দুদিন বাদে ঠিক হয়ে যাবে।”
“ওদের দেখে রেখো। আমি খুব তাড়াতাড়ি চলে আসব।”
“চিল ব্রো, মম আছে কি করতে? হ্যাঁ, আমার বউমা কোথায়? আর আমাদের সোনা মোনা জাদুপাখিটা? কোথায় ইযান সোনা?”
“এইমাত্র হেগে ঘুমিয়েছে।”
চটাশ করে সাইবানের মাথায় চাটি মারল ইরাম। এসব কোন ধরণের কথাবার্তা? খেয়ে ঘুমিয়েছে এটাও তো বলা যেত! আশ্চর্য্য! ফোনটা কেড়ে নিল সে নিজের হাতে,
“হ্যাঁ আম্মু। আসসালামু আলাইকুম। ওর যতসব বাজে কথা। কুচুপু ঘুমাচ্ছে। তোমার কি খবর? শরীর ভালো আছে? আর বাবা?”

ইরাম কথা বলতে আরম্ভ করল। সাইবান হাসতে হাসতে বিছানার ধারে গিয়ে বসল। নিজের নতুন কেডস জোড়া পায়ে গলিয়ে বাঁধতে শুরু করল। তীর্যক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল বিছানার কোণায় ঘুমে আচ্ছন্ন ইযান। চারপাশে বালিশ দেয়া আছে, কোনক্রমে গড়িয়ে পড়ার সুযোগ নেই। মিনিট পাঁচেক পর সামিয়ার সাথে কথা শেষ করে ফিরে এলো ইরাম। ফোনটা স্বামীর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে তার হালকা চিন্তিত চেহারাটা দেখল।
“চিন্তা করো না, ওরা ঠিক হয়ে যাবে।”
সাইবান খানিকটা অবাক হলো। তাকে কিছুটা লজ্জিতও দেখাল। ফোন পকেটে ভরতে ভরতে সে জানাল,
“চিন্তা করছিনা।”
মৃদু হাসল ইরাম। যদিও সে কখনো কোনো পশুপাখি পালনে আগ্রহী ছিলনা, তবে যারা পেলে অভ্যস্থ তাদের দেখেছে। নিজেদের আপন মানুষের মতোই তারা পোষা প্রাণীদের ভালোবাসে। ইরাম কয়েক মুহূর্ত ভেবে হঠাৎ করে শুধিয়ে বসল,
“সত্যি করে একটা কথা বলবে আলাদিন? আমাদের বিয়ের দিন ইহানের গালে ব্যান্ডেজ ছিল। জিজ্ঞেস করার পর বলল, ইঁদুর কামড়েছে। ওটা কোনোভাবে তোমার সেনাবাহিনী ছিল না তো?”
তড়াক করে লাফিয়ে উঠল সাইবান। চেহারার ভাবখানা এমন যেন তাকে অপমান করা হয়েছে।
“কিঃ? আপনার মনে হয় ওই পোংটাকে শিক্ষা দিতে আমি আমার আদরগুলোর উপর অত্যাচার করব? ছিঃ! এই ছিল আপনার মনে?”

“নাটক কম করো। বিয়ের আগের দিন রাতে তুমি দলবল নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছিল। ওরা তোমার সাথেই ছিল। ছোটবেলায় সি আই ডি আমি অনেক দেখেছি, বুঝেছ?”
একটি ঢোক গিলল সাইবান। জ্যাকেট টেনেটুনে ব্যস্ত হয়ে বলল,
“আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। প্র্যাকটিস করে শো তে যেতে হবে।”
তাড়াহুড়ো করে পালাতে সে বেরিয়েই যাচ্ছিল কিন্তু ইরাম তার হাত চেপে ধরে ফেলল। ভ্রু তুলে শুধাল,
“এই। এক মিনিট। তুমি তো একটা শো করতেই বরিশাল এসেছিলে। আজকে আবার কিসের শো?”
সাইবান ঘুরে দাঁড়াল। নিজের হাতের কব্জিতে ইরামের জড়ানো আঙুলগুলো দেখল। ঠোঁটে তীর্যক হাসি ফুটল তার। রমণী তা লক্ষ্য করে নিজের হাত সরিয়ে নিতে গেলেও পারলনা। সাইবান খপ করে সেটা ধরে ফেলে উপরে তুলল। আঙুলের ডগায় নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। শিউরে উঠল ইরাম। তার তর্জনী আঙুলটা দাঁতের পাটির মাঝে নিয়ে আলতো কামড় দিয়ে হাসল সাইবান,
“জেলাস, মাই প্রেশিয়াস?”
ইরাম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। নিজের হাতটা জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিয়ে আঙুল ঘষতে ঘষতে রাঙা গাল নিয়ে সে

“হাসবেন্ড কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কখন ফিরবে এগুলোও কি জিজ্ঞেস করা যাবেনা নাকি?”
কাছে এসে ইরামের কোমরে হাত রেখে তাকে সন্নিকটে টেনে নিল সাইবান। কানের লতিতে চুমু দিয়ে ফিসফিস করে আবেশিত গলায় বলল,
“এভাবে হুটহাট হাসবেন্ড ডাকবেন না। আমার হার্ট অতি দূর্বল, সামলাতে না পেরে অ্যাটাক করে বসতে পারে।”
ইরাম তপ্ত অনুভব করল। তার আঙুলজোড়া সাইবানের জ্যাকেটের কাঁধের অংশে জড়িয়ে গেল। স্বামী তার নয়ন ভরে প্রতিটি প্রতিক্রিয়া খেয়াল করল। শেষমেষ মাথার একপাশে ঠোঁট ছুঁয়ে আদর এঁকে দিয়ে জানাল,
“জেলাস হওয়ার কিছু নেই। পরনারীকে সীমারেখা দেখিয়ে দেয়ার একশো একটা উপায় আমার জানা আছে। তবুও যদি মনে খচখচ করে তবে নিজের একটা সিলমোহর মেরে দিন।”
মাথা কাত করে আঙুল তুলে নিজের গলার দিকটা নির্দেশ করল সাইবান। বাঁকা হেসে বলল,
“আপনার দাঁতের ধার পরীক্ষা করার উপযুক্ত স্থান। ওয়ানা ট্রাই ইট?”
ইরামের মনে হলো তার মাথার তালু ফট করে গরম হয়ে গিয়েছে। দুই কান থেকে বাষ্পের মতন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। একটা জোরালো ধাক্কা দিয়ে সাইবানকে দূরে সরিয়ে দিল সে। তবে বান্দা সরে যাওয়ার আগে হাত বাড়িয়ে ইরামের কাঁধে জড়ানো সাদা শিফনের ওড়নাটা টেনে নিল। ভ্রু কুঁচকে ফেলল অর্ধাঙ্গিনী তার।
“এটা কি হলো?”

প্রশ্ন শুনে হাসতে হাসতে তার ওড়নাটা নিজের গলায় মাফলারের মতন করে পেঁচিয়ে সাইবান ভ্রু নাচিয়ে জানাল,
“আপনার সিলমোহর।”
চোখ টিপ দিয়ে উল্টো ঘুরে গেল সে। শীষ বাজাতে বাজাতে হেলেদুলে রুমের বাইরে বেরিয়ে গেল। ইরাম নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে হতভম্ব হয়ে দেখে গেল। পরক্ষণেই একটি লাজরাঙা হাসি ছড়িয়ে গেল তার ঠোঁটে। দুহাতে মুখ ঢেকে নিজের বেহায়া অন্তরকে সামাল দিল সে।
“আ…উই!”
ঘুমের মাঝে শব্দ করে নড়েচড়ে উঠল ইযান। ইরাম দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল, বিছানায় চলে গেল।
“এইযে, আম্মু এখানে কুচুপু।”

ইযান ঘুম থেকে উঠে পড়ায় তাকে নিয়ে খেলতে খেলতেই নিজের আর্টিকেলের কাজ সেরে ফেলল ইরাম। সবকিছু ঠিকঠাক আছে নিশ্চিত হয়ে জমা দিতে দিতে রাত নয়টার মতন বেজে গিয়েছে প্রায়। এর মধ্যেই সুগন্ধা এসে হাজির। ইরাম আর সাইবানের রুমটায় ভালো ইন্টারনেট সার্ভিস আসে, বাড়ির অন্য জায়গায় কিছুটা দূর্বল। তাই সুগন্ধা নিজের ড্রামা দেখার সময় এখানে আসে। আজও এলো। ইযানকে কোলে বসিয়ে সে একটা কোরিয়ান ড্রামা দেখা শুরু করল। সেই ধরণের মারামারি চলছে। থ্রিলার বোধ হয়। সুগন্ধা এসবও দেখে ইরামের জানা ছিলনা। তার ছেলেও দিব্যি মশগুল হয়ে গেল। বুঝুক বা না বুঝুক, সুগন্ধার সাথে সঙ্গত করে ড্যাবড্যাব করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে সে। ইরাম ছেলেকে খুব কমই স্ক্রিন টাইম দেয়। তাও না পারতে। আজ যখন সুগন্ধার সাথে মশগুল হয়েছে, তখন আর বিশেষ মানা করলনা সে। এমনিতেও একটু পর খেয়ে ঘুমিয়ে যাবে। ঘড়ি দেখল সে। সময় দেখে ভাবল, এখনি সুযোগ। সারিকাকে উপহারটা দিয়ে আসা যাক।

পায়েলের গিফট বক্স হাতে নিয়ে ইরাম বেরোল। সারিকার রুমটাও দুইতলাতে। তবে সেটা এখন ফাঁকা। ভেতরে কেউ নেই। আশেপাশে কোথাও মিসিরকেও দেখলনা ইরাম। কৌতূহলী হলো সে। গেল কোথায়? নিচে? ইরাম যেই না সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল, তক্ষুণি করিডোরের দেয়ালে থাকা জানালা বেয়ে বাইরের একটি দৃশ্য চোখে পড়ল তার। বাড়ির পিছন দিকে কলাগাছের ছোট বাগান। সেখানে ছোট একটা পুকুর আছে, তাতে মাছ চাষ হয়। সেই পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানব মানবীকে চিনতে ইরামের বেগ পোহাতে হলনা। সারিকা এবং অনুরাগ। তাদের একসাথে দেখে কেন যেন ইরামের খানিকটা ক্রোধ অনুভূত হলো। মিসির এই বাড়িতেই আছে! এই দুজনের কি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে? অনেকদিন ধরেই চুপচাপ দেখে যাচ্ছে সে। যদিও এটা তার ব্যাপার নয়, সারিকার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবুও, চোখের সামনে দেখে কতদিন চুপ থাকা যায়? আজকে কিছু না বললেই নয়। সারিকা নাহয় পাগল, অনুরাগেরও বা কি সমস্যা? শক্ত গলায় মানা করতে পারেনা?
এসব ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল সে। সাবধানে পুকুরঘাটে চলে গেল। দেয়ালের পিছনে নিজেকে আড়াল করে প্রথমটায় শুনল, কথা কি হচ্ছে। যদি সাধারণ কিছু হয়ে থাকে তবে এভাবে ঢুকে পড়াটা মানানসই হবেনা।

“আসলে আমার মনে ছিলনা আপনার জন্মদিনের কথা। তাই তেমন কোনো গিফট তৈরি করতে পারিনি।”
অনুরাগের নরম গলা শোনা গেল। সারিকা কয়েক হাত দূরে মুখোমুখি দাঁড়ানো। মৃদু হাসল সে,
“আমরা কেই বা আর কতকিছু মনে রাখি, বলো অনুরাগ? অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো মস্তিষ্ক এভাবেই মুছে ফেলে।”
হাতজোড়া মুঠ করে ফেলল অনুরাগ। সে সারিকার দিকে সরাসরি তাকিয়ে নেই। দৃষ্টি পুকুরের পানির দিকে আবদ্ধ। রাতের আঁধারে মনে হচ্ছে কাজলা জল টলটল করছে।
“আপনার এভাবে এখানে আসা উচিত হয়নি।”
সারিকা তার কথা শুনে মাথা দুলিয়ে বলল,
“তুমিই বা কেন চলে যাচ্ছনা? পথ তো খোলাই আছে।”

অনুরাগ নিজের পকেটে হাত ভরল। ভেতর থেকে যেটা বের হলো, সেটা অপ্রত্যাশিত। ইরাম চোখ সরু করে অদূর থেকে দেখল, একটা নোটপ্যাড। অনুরাগ সেটার একটা পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সারিকার দিকে বাড়িয়ে ধরল। রমণী প্রথমটা অবাক হয়ে গেল। সে মূলত বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুকুরপাড়ে বসে এই নোটপ্যাডে জেলপেন দিয়ে অনুরাগকে কিছু আঁকাআঁকি করতে দেখেছিল। তাই কৌতূহলী হয়ে এসেছে। পৃষ্ঠাটা দেখে সারিকা স্তব্ধ হয়ে গেল। সাদা কাগজে কালো কলম দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি মেয়েলী অবয়ব। ফুলের দোলনায় দুলছে মেয়েটি, পরনের শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। কানের উপরে চুলের খোঁপায় গোঁজা একটি ময়ূরের পালক। রাঁধার অবয়ব। কিন্তু চেহারার গাঁথুনিতে ভাসছে সারিকা স্বয়ং।
চোখ তুলে সামনে তাকাল রমণী। টের পেল, তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। অনুরাগ নোটপ্যাডটা আবার নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রেখে ফিসফিস করে বলল,

“হ্যাপি বার্থডে।”
এটুকুই। অনুরাগ উল্টো ঘুরে যেতে নিল। সে আর থাকতে চায়না এখানে। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু পিছন থেকে সারিকা খপ করে তার হাতটা ধরে ফেলল। ছবিটা নিজের বুকে চেপে টলটলে অশ্রুমাখা নয়নে আবেদন নিয়ে সে বলে উঠল,
“যদি এভাবে চলে যাওয়ারই ছিল, তবে কেন এসেছিলে আমার জীবনে?”
অনুরাগের হাত শক্ত হয়ে গেল। আস্তে করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল সে, তবে সারিকা ছাড়লনা। আরও জোরালোভাবে চেপে ধরল তার কব্জি।
“আমি তোমায় ভুলতে পারছিনা, অনুরাগ।”
বুকটা বুঝি চুরমার হয়ে গেল অনুরাগের। চোখজোড়া বুঁজে ফেলল সহসাই। না, তার নয়নে জমা অশ্রুজল কিছুতেই ওই রমণীকে দেখতে দেয়া যাবে না। নিজেকে সামলে দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে শেষমেষ সে ঘুরে দাঁড়াল। সারিকার হাতটা এবার জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিল। দূরে সরে গেল কয়েক পা।
“এভাবে বলবেন না। আমাদের কোনোকালে মিলন সম্ভব ছিলনা, আর হবেও না। অসম্ভবের কথা ভেবে নিজের বর্তমানকে নষ্ট করবেন না।”

“তুমি এমনভাবে বলছ যেন তুমি নিজে খুব সুখে আছো, জীবনে এগিয়ে গিয়েছ। অথচ আজও তুমি তোমার চিত্রে আমাকে বাঁধো।”
কাগজের পৃষ্ঠায় ফুটিয়ে তোলা ছবিটা সর্বোচ্চ অর্জনের মতন করে আগলে রেখে বলল সারিকা। অনুরাগের কন্ঠ কাঁপল,
“ওটা সামান্য একটা চিত্র। এর বেশি কিছু না।”
“সামান্য?”
মর্মাহত মনে হলো সারিকাকে। অনুরাগ অবশেষে তার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। গভীর গলায় জানাল,
“হ্যাঁ। সামান্য। আপনি চাইলে আমি আরও পাঁচটা দশটা এঁকে দিতে পারি, আমার হাত কাঁপবেনা। নিজেকে অদৃষ্টের বাঁধন থেকে মুক্ত করুন, সারিকা। আপনার জীবন পড়ে আছে আপনাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য, তাকে আগলে নিন, অতীতকে নয়।”
আর দাঁড়ালনা অনুরাগ। সে জানে, নিজেকে যতটুকু শক্ত রেখেছে, আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সেই শক্তিটুকু আর থাকবেনা। তাই সে ঘুরে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। একবারও পিছন ফিরে দেখলনা। যদি দেখত, তবে দেয়ালের পাশে লুকিয়ে থাকা ইরামকে ঠিকই চোখে পড়ত। অথচ আজ তার মনটা বড্ড বিষাদপূর্ণ।
অনুরাগ চলে যেতেই সারিকা হাঁটু ভেঙে সেখানেই বসে পড়ল। হাতের পৃষ্ঠায় আঁকা চিত্রটার উপর টপটপ করে অশ্রুফোঁটা গড়িয়ে পড়ল তার।

“নিষ্ঠুর! পাষাণ!”
সেটা বুকে চেপে রেখে আপনমনে নিঃশব্দে ফোঁপাতে লাগল সারিকা। ইরাম দ্বিধান্বিত হলো। বুঝতে পারলনা হস্তক্ষেপ করা উচিত নাকি চলে যাওয়া উচিত। সে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই তৃতীয় এক ব্যক্তির উপস্থিতি সেখানে টের পাওয়া গেল। মৃদু পদশব্দ। ইরাম অবাক হয়ে গেল। আর কেউ ছিল নাকি আশেপাশে? সে তো আসার সময় খেয়াল করেনি! তার বুকটা চেপে এলো যখন সে দেখল বাড়ির পিছনদিক দিয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে সারিকার সামনে গিয়ে দাঁড়াল মিসির!
পদশব্দ শুনে সারিকা মুখ তুলে তাকাল। সামনে দন্ডায়মান মানুষটাকে দেখে সে জমে গেল নিজের জায়গায়। কয়েক মুহূর্ত মনে হলো তার বিবেক বুদ্ধি লোপ পেয়ে গিয়েছে।
“মিসির!”
ফিসফিস করল সে কাঁপা কাঁপা গলায়। মিসিরের চেহারা অত্যন্ত শান্ত। কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা। সে কি অনুরাগ আর তাকে একসাথে দেখেছে? কথাবার্তা শুনেছে? সারিকা টের পেলনা। মিসির তো রাস্তার মোড়ের টং দোকানে চা খেতে যাবে বলে বেরিয়েছিল। ফিরল কখন? ফিরলেও পিছন দিক দিয়ে কেন এলো?
মিসির হাঁটু মুড়ে সারিকার সামনে বসল। প্রশান্ত নয়নে একবার স্ত্রীর অশ্রুভেজা মুখ এবং পরক্ষণে তার বুকে আগলে রাখা পৃষ্ঠাটা দেখল। সামান্য হাসি ফুটল তার ঠোঁটে, পরিহাসের হাসি। একটি হাত বাড়িয়ে দিল সে, সারিকার গাল ছুঁয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলে সযত্নে মুছে দিতে লাগল অশ্রুফোঁটা।

“ভালোবাসার মানুষটাকে আপন করে না পাওয়ার যাতনা মাপার দুনিয়াবি কোনো মাপকাঠি নেই।”
মিসিরের কন্ঠটা জাদুকরী শোনাল। নমনীয়, গভীর, আরামদায়ক। সারিকা চোখ বুঁজে ফেলল। নিজেকে এলিয়ে দিল স্বামীর ছোঁয়ায়। মিসির এবার দুহাত বাড়িয়ে তার মুখটা ধরে সব অশ্রু মুছতে মুছতে বলে গেল,
“ভালোবাসা ভোলা যায়না। বুকের এক কোণা দখল করে রাজ করে সে, অন্তিম নিঃশ্বাস অব্দি। আমরা মানুষেরা সেই নিষিদ্ধ রাজ্যে বিচরণ করতে পছন্দ করি। অথচ, সেই রাজ্যে প্রবেশ করব কি করব না, সেই নির্বাচনটাও আমাদের হাতেই থাকে।”
চোখ খুলে গেল সারিকার। প্রসারিত দৃষ্টিতে দেখে গেল সে মিসিরকে। লোকটা রাগ করছেনা। ক্ষোভ দেখিয়ে কথাও বলছেনা। অথচ তার উচ্চারিত প্রত্যেকটা বাক্যে বিষন্ন বাস্তবতা মেশানো। সারিকাকে তাকাতে দেখে মিসিরের সূক্ষ্ম হাসিটা আরেকটু বিস্তৃত হলো।
“তুমি নিষিদ্ধ রাজ্যে বিচরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছ, সারিকা। তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। শুধু নিজের প্রতি আফসোস আছে। দুঃখিত, আমি কোনোদিন তোমার আপন হতে পারলাম না।”

“না…মি…”
সারিকা কিছু উচ্চারণ করতে যাচ্ছিল কিন্তু পারলনা। মিসির হুট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁটু ঝেড়ে একদম স্বাভাবিক গলায় জানাল,
“আমার অফিসে জরুরী কাজ আছে। আমি আজকের রাতের বাসে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি। তুমি সবার সাথে ঘুরেফিরে এসো। ঢাকায় গেলে পরে দেখা হবে। গুডবাই।”
“মিসির!”
লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল সারিকা। হাত বাড়িয়ে দিল স্বামীকে ধরার জন্য কিন্তু পারলনা। মিসির ইতোমধ্যে দ্রুতপায়ে এগোতে শুরু করেছে।
“মিসির, লিসেন টু মি। প্লীজ!”
কিন্তু মিসির আর পিছন ফিরে তাকালনা। হেঁটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। থামল সে, ক্ষণিকের জন্য। তবে সারিকার ডাকের কারণে নয়। মাথা সামান্য কাত করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইরামকে দেখল সে। উভয়ের মাঝে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হলো। এটুকুই। মিসির না কিছু বলল, না কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল। হেঁটে ভেতরে চলে গেল। ইরাম তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকল। নিজেকে কেমন যেন আহাম্মক এবং নীচ মনে হচ্ছে তার। এখানে আসা উচিত হয়নি। এসেছেও বা যখন, তখন কিছু না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকাটাও হয়ত উচিত হয়নি।

একটি আলিশান হোটেলের রুফটপে প্রাইভেট পার্টির আয়োজন। জায়গাটা যথেষ্ট রুচিসম্পন্ন। খোলা আকাশের নিচে চকচকে টাইলসের মেঝে। সেখান দিয়ে হেঁটে গেলে আয়নার মতন নিজের প্রতিফলন দেখা যায়। খোলা বাতাসে প্রাকৃতিকভাবে একটি শীতল অবস্থা বিদ্যমান। লাল, নীল এবং সবুজ রঙের মৃদু আলোর বাতিতে সাজানো চারপাশ। তাতে অদ্ভুতুড়ে একটা মোহময়ী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। জায়গায় জায়গায় সাজিয়ে রাখা শো পিস। কৃত্রিম গাছের আদলে তৈরি সাদা আলোর কিছু কারুকার্য, দেখলে মনে হবে গাছের গায়ে তুষারপাত হয়েছে। স্টেজটা ইলেকট্রনিক লাইট দিয়ে সাজানো। পিছনে বিশাল একটি এল ই ডি স্ক্রিন। তাতে ইংরেজি অক্ষরে নিয়ন আলোয় ভাসছে নামটা,

—ডি জে আলাদিন।
সাইবান দাঁড়িয়ে আছে স্টেজের উপর। কয়েক মিটার উঁচু ডায়াস বসিয়ে তাতে কন্ট্রোল প্যানেল সেট করে দেয়া হয়েছে। ওঠানামার জন্য সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে। এখানের বেশিরভাগ মানুষ অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কর্মচারী বলে মনে হচ্ছে। মখমলি সোফায় বসে নিজেদের মাঝে গল্প করছে। অনেকে আবার জুসের গ্লাস হাতে ইতিউতি হাঁটাহাঁটি করছে। সাইবান কন্ট্রোল বোর্ড ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। একটি মৃদু সুর বাজিয়েছে সে, অর্কেস্ট্রার আদলে। অভিজাত ভাব স্পষ্ট। এখনো পার্টি পুরোদমে শুরু হয়নি। কারো অপেক্ষায় আছে অতিথিগণ। নিজের হেডফোন কানে লাগিয়ে যখন সাউন্ড ঠিকঠাক আছে কিনা সাইবান দেখে নিচ্ছে, তখনি দুজন স্যুট পরিহিত লোক স্টেজের কাছে এসে দাঁড়াল। এর মধ্যে একটুখানি মোটা এবং খাটো, টাক মাথার একটা লোক ভারী গলায় বলল,

“মিস্টার আলাদিন?”
সাইবান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। হেডফোন খুলে স্টেজ থেকে নেমে এলো। তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল লোকটা, করমর্দনের উদ্দেশ্যে। সাইবান হ্যান্ডশেক করতেই বিরাট হাসি ফুটল লোকটার চেহারায়,
“আসলে আপনাকে দেখে কি যে ভালো লাগছে! এতদিন শুধু শুনেছি, আজ সামনা সামনি দেখার সৌভাগ্য হলো। ধন্যবাদ, আমাদের অফারটা গ্রহণ করে এত আর্জেন্টলি শো করতে আসার জন্য।”
“ওয়েলকাম, মিস্টার চৌধুরী।”
ম্যানেজার ছেলেটার কাছ থেকে মোটামুটি ডিটেইলস নিয়েছে সাইবান। হাত সরিয়ে নিয়ে অপর লোকটির উদ্দেশ্যে সম্মানের দৃষ্টিতে চেয়ে আবার মিস্টার চৌধুরীর দিকে ফিরল সে।
“তো, দেরী কিসের? আমরা শো শুরু করতে পারি?”
“ওহ, দুঃখিত। আসলে এই পার্টিটা যার উদ্দেশ্যে দেয়া তিনি এখনো এসে পৌঁছাননি।”
সাইবান ভ্রু উঁচু করল। তার প্রশ্নের প্রয়োজন হলনা, মিস্টার চৌধুরী নিজে থেকেই বলতে লাগলেন,
“আসলে আমাদের কোম্পানির সাম্প্রতিক বিরাট সাফল্যের জন্য আমরা সব এমপ্লয়ীরা মিলে আমাদের বসের জন্য এই সারপ্রাইজ পার্টিটা প্ল্যান করেছি।”

“আই সি। আমি নিশ্চিত আপনাদের বস খুব খুশি হবেন।”
মৃদু হাসল সাইবান। মিস্টার চৌধুরী বোধ হয় আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু পারলেন না। হালকা গুঞ্জন সৃষ্টি হলো প্রবেশপথে।
“বস এসে পড়েছেন বোধ হয়। আমি রিসিভ করে আসি।”
মিস্টার চৌধুরী এবং তার সাথের লোকটা তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। সাইবান বুকে দুবাহু বেঁধে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে গেল চারপাশের তোড়জোড়। এমন মুহূর্তেই দুজন রমণী তার কাছে এলো,
“মিস্টার ডি জে, একটা সেলফি নিতে পারি আমরা?”
পার্টি শাড়ি পরিহিত এক যুবতী অতি উত্তেজনা নিয়ে বলল। সাইবান মাথা দুলিয়ে বলল,
“শিওর।”
দুজন সাইবানের দুই পাশে দাঁড়াল। একজন রমণী বেশ সাবলীল এবং শান্ত থাকলেও যুবতী মেয়েটা সাইবানের গা ঘেঁষে এলো একেবারে। কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে আইফোন উঁচিয়ে ধরল। সাইবান তৎক্ষণাৎ ক্যামেরার সামনে নিজের হাতটা তুলে ধরল,
“এক্সকিউজ মি।”
হাত বাড়িয়ে মেয়েটার হাত থেকে ফোনটা নিজের হাতে নিল সাইবান, তাতে তার অনামিকায় জ্বলজ্বল করতে থাকা সিলভার আংটিটা স্পষ্ট দেখা গেল।
“আমি ক্লোজভাবে ছবি তুলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনা। ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড লেডিস…”
রমণীদের থেকে খানিকটা দূরত্ব রেখে সামনে দাঁড়াল সাইবান। নিজের হাতেই সেলফি তুলে দিল। অতঃপর ফোনটা ফিরিয়ে দিল যুবতীকে। সেলফিতে তখন স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে সাইবানের গলায় মাফলারের মতন পেঁচানো মেয়েদের ওড়না, আর আঙুলে আংটি। দুজন মেয়ে একে অপরের সঙ্গে নীরব দৃষ্টি বিনিময় করল।
“থ্যাংক ইউ।”

হেসে বলে দুজন চলে গেল। তারা যাওয়ার সময় সাইবান খেয়াল করল অন্য মেয়েটি সেই গা ঘেঁষা যুবতী মেয়েটাকে কি যেন বোঝাচ্ছে। খুব সম্ভবত কিছু নিয়ে শাসন করছে। সাইবান আর বেশি দেখলনা। চোখ সরিয়ে নিয়ে প্রবেশপথের দিকে তাকাল। সেখানে ছোটখাট একটা ভিড় জমে গিয়েছে। প্রথমটায় কিছু দেখতে পেলনা সাইবান। ভিড় কিছুটা পাতলা হয়ে আসতেই ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো কাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটি। সাইবান অজান্তেই পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে ধারাল দৃষ্টিতে তাকাল সেদিকে।
দীর্ঘকায় এক বলিষ্ঠ পুরুষ। ভিড়ের মাঝে সবার আগে চোখে পড়ার মতন চেহারা। তীক্ষ্ণতা চেহারার গাঁথুনিতে। টানা শকুনের মতন চোখ। চিবুকে অতি সূক্ষ্ম দাঁড়ির রেখা। চুলগুলো হালকা কোকড়ানো, বাবরি ধরণের। একগুচ্ছ নুইয়ে আছে কপালের একপাশে। ভারী শরীরে জড়ানো কালো স্যুট, এর উপরে আবার পা অবধি লম্বা কালো ওভারকোট। হাতের কব্জিতে রূপালী বর্ণের একটি ঘড়ি চকচক করছে। ওটা সত্যিকারের রুপার তৈরি হলেও হতে পারে। চোখে একটা রিমলেস চশমা। মুখাবয়ব অতীব শান্ত। লোকটা আসলেই সুদর্শন এবং স্টাইলিশ। এটুকুতে কোনো সন্দেহ নেই।

নিজের কর্মচারীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছে সে হেসে হেসে। অতঃপর হুট করেই তার চোখজোড়া ঘুরে পড়ল অদূরে দাঁড়ানো সাইবানের উপর। একচুল নড়লনা সাইবান, নিজের দৃষ্টিও সরিয়ে নিলনা। ঠিক যেভাবে এতক্ষণ তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে, এখনো সেভাবেই তাকিয়ে রইল। লোকটা নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। অতঃপর শান্ত ভঙ্গিতে লম্বা পা ফেলে সাইবানের দিকে হাঁটা দিল। পার্টিতে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। শুধু স্টেজ থেকে মৃদু অর্কেস্ট্রা মিউজিকের ধ্বনি ভেসে আসছে। বাকিরা যেন শ্বাস নেয়াও ভুলে গিয়েছে।
লোকটা সরাসরি সাইবানের সামনে এসে দাঁড়াল। এতটা সন্নিকটে যে চাইলেই হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয়া যাবে। সাইবান এক সেকেন্ডের জন্যও তার চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি সরালনা। পলক পর্যন্ত ফেললনা। লোকটা উচ্চতায় তার চাইতে ইঞ্চি দেড়েক লম্বা। কিন্তু মুখোমুখি দাঁড়ানোর পরও উচ্চতার পার্থক্যটা বিশেষ বোঝা গেলনা সাইবানের শক্তিশালী শারীরিক গঠনের কারণে। তবে উভয়ের চেহারায় বয়স এবং অভিজ্ঞতার পার্থক্যটা স্পষ্ট।

নিজের চিবুকে হাত ঠেকিয়ে লোকটা সাইবানকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল। এক ইঞ্চিও বাদ পড়লনা। পায়ের জুতো থেকে মাথার চুল পর্যন্ত সবকিছুই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। অবশেষে গলায় পেঁচানো ওড়নাটার উপর দৃষ্টি স্থির হলো তার। তীর্যক এক হাসির ধারা ফুটল পুরুষালী ঠোঁটজুড়ে।
“আজকালকার ফ্যাশন খুবই বিনোদনমূলক, তাইনা?”
কন্ঠটা ভারীক্কি, প্রভাবশালী। সাইবান এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজের গলার দিকে তাকিয়ে পুনরায় সামনে ফিরল। কারণ ছাড়াই মুচকি হাসল।

আমার আলাদিন পর্ব ৪২

“এত রংচঙে জিনিস ছেড়ে এই বর্ণহীন সাদাতেই চোখ আটকাল?”
মাথা কাত করল সাইবান, সরাসরি লোকটার চোখের দিকে চেয়ে বিস্তৃত হাসি নিয়ে বলল,
“আপনি মনে হয় সাদা খুব ভয় পান, মিস্টার মির্জা। কাফনের রং বলে কথা!”

আমার আলাদিন পর্ব ৪৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here