আমার আলাদিন পর্ব ৪৮
জাবিন ফোরকান
দড়ির সঙ্গে ঝুলছে সাইবান। শরীরটা কেমন নিস্তেজ। দুলছে এদিক সেদিক, অশুভের মতন।
“সাইবান!”
অনুরাগ আহত সিংহের মতো গর্জে উঠল। পরক্ষণেই দৌঁড়ে গেল বন্ধুর কাছে। সরাসরি তার ঝুলতে থাকা পা দুটো চেপে ধরে নিজের কাঁধের উপর রাখল। সাইবানের সমস্ত শরীরের ভার এখন অনুরাগের উপর। সে কাতরাতে থাকা সারিকার দিকে চেয়ে হুংকার ছাড়ল,
“জলদি! দড়ি কাটুন!”
সারিকা হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হয়ে পড়েছিল। দৌঁড়ে চলে গেল সে এবার রুমের বাইরে। অনুরাগ পা ধরে রাখল বন্ধুর শক্ত করে। তার নিজের চোখজোড়া ভিজে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে আরম্ভ করেছে।
“দোস্ত, একটুখানি! আর একটু অপেক্ষা কর। ডোন্ট লিভ মি, প্লীজ!”
কাঁধ দুটোর উপর গোটা একটা জীবনের দায়িত্ব অনুরাগকে বুঝি চুরমার করে দিল। সারিকা এসে পড়েছে ততক্ষণে। হাতে বিশাল এক দা। মেঝেতে পড়ে থাকা চেয়ারটা বিছানার উপর তুলে তরতর করে উঠে গেল মেয়েটা। বিপদের সময় মানুষের মাথা কাজ করে কম, কখনো বা বেশি বেশি। বর্তমানে সারিকা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হাত উঁচু করে দা দিয়ে সে কো*প বসালো দড়ির উপর। দাঁতে দাঁত চেপে বারংবার চেষ্টা করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর দড়ি কেটে গেল, সাইবানের নিথর শরীরটা হুড়মুড় করে পড়ল অনুরাগের উপর। মেঝেতে আগেভাগে বসে পড়ে কোনমতে বন্ধুকে ধরতে পারল অনুরাগ।
সাইবানের চোখজোড়া বন্ধ। বুক একেবারে স্থির। কোনো উঠানামা নেই। কেমন ঠান্ডা হাত পা। ঠোঁটের ভেতর থেকে হালকা একটু জিভ বেরিয়ে আছে। গলায় প্যাঁচানো দড়িটা এক টান দিয়ে অনুরাগ খুলে নিতেই দেখল সমস্ত গলায় একটা লালচে দাগ বসে গিয়েছে। সারিকা ধপাস করে বসল ভাইয়ের পাশে। কাঁপা কাঁপা হাতে কব্জি ধরে পালস চেক করল। মুহূর্তেই কেঁপে উঠে ছিটকে গেল সে। ভূত দেখার মতন করে ভাইয়ের শরীরটার দিকে চেয়ে রইল। তার দৃষ্টিই অনুরাগের উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট। সে চোখের পানি মুছে ফিসফিস করল,
“না! সাইবান চলে যেতে পারে না!”
সারিকা কম্পিত গলায় বলল,
“স…স..সি পি আর! সি পি আর দিতে হবে!”
হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে সাইবানের বুকে দুহাত চেপে ভর ছেড়ে দিল সারিকা। পাগলের মতন বুক চাপতে শুরু করল,
“সাই! নিঃশ্বাস নে…নিঃশ্বাস নে ভাইয়া প্লীজ!”
সারিকার অশ্রুজল গড়িয়ে সাইবানের বুক ভিজিয়ে তুলতে লাগল। ঘন ঘন চাপের কারণে তার শরীরটা থেকে থেকে ঝটকা দিয়ে উঠতে লাগল। অনুরাগ অসহায়ের মতন নিজের মাথার চুল চেপে ধরল।
“আহহহ…প্লীজ! সাইবান! ইউ ক্যান নট লিভ মি ইয়ার!”
“মাউথ টু মাউথ, অনুরাগ, প্লীজ!”
সারিকার কথায় হুশ হলো অনুরাগের। দ্রুত মাথা দুলিয়ে এগিয়ে গেল সে। ঝুঁকে সাইবানের মুখে বাতাস দেয়ার চেষ্টা করল। প্রথম কয়েকবার কোনো প্রতিক্রিয়া হলোনা।
“থেমো না, একদম থেমো না!”
সারিকা সি পি আর দিতে দিতে অনুরাগ সাইবানের ফুসফুস সচল করার জন্য বাতাস দেয়ার চেষ্টা করতে থাকল। যখন মনে হচ্ছিল, এই বুঝি শেষ, আর হবেনা, তখনি সাইবানের শরীর একটা ঝটকা দিয়ে উঠল। পরক্ষণেই কাশতে লাগল ছেলেটা। সারিকার কান্না দ্বিগুণ হলো। অপরদিকে অনুরাগের বুকটা বুঝি নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল।
“আমি আসছি, ওকে ধরে বিছানায় তোলো।”
সারিকা দ্বিতীয় দফায় ছুটে চলে গেল। অনুরাগ ছটফট করতে থাকা সাইবানকে টেনে বিছানায় তুলল। ছেলেটা কেমন যেন করছে। হা করে শ্বাস নিচ্ছে। বুক চেপে ধরে আছে। ভারী হয়ে থাকা চোখের কোন বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরছে। গলার দাগটা দগদগে হয়ে উঠেছে। দেখতেই কেমন ভয়ানক লাগছে। অনুরাগ তার সমস্ত শরীরে হাত বোলাতে লাগল। কীভাবে বন্ধুকে শান্তনা দেয়া যায় তার মাথায় আসছেনা।
“কেন? হোয়াই? কেন এমনটা করলি? কাওয়ার্ড!”
জবাব দেয়ার মতন অবস্থায় সাইবান নেই। তা সত্ত্বেও অনুরাগ নিজেকে রুখতে পারলনা। সাইবানের ছটফট করতে থাকা শরীর শক্তভাবে চেপে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। সারিকা চলে এলো। তার হাতে ছোট একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার আর মাস্ক। লাফিয়ে বিছানায় এসে সাইবানের ঘাড় চেপে ধরে অক্সিজেন মাস্কটা উড়িয়ে দিল সারিকা। অতঃপর সিলিন্ডার লাগিয়ে দিতেই সাইবানের শরীরটা ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এলো। বুক তীব্রভাবে ওঠানামা করতে লাগল। অবশেষে ফুসফুসে জরুরী অক্সিজেন পাচ্ছে সে।
সারিকা নিজেকে রুখতে পারলনা। ওই সময়েই ভাইয়ের বুকে একের পর এক দূর্বল চড়, ঘুষি বসিয়ে হাহাকার করে উঠল,
“বেয়াদব! আহাম্মক! স্বার্থপর! ভীতু! কুলাঙ্গার! একটা আস্ত জঘণ্য, অসহ্যকর, স্টুপিডের বাচ্চা! ম*রে যাওয়া এত সহজ মনে হয় তোর? হ্যাঁ? যাহ, যাহ ছাদ থেকে লাফ দে যাহ! গলায় দ*ড়ি দিতে এসেছিস কেন রাস্কেল? তুই একটা কুকুর, পাগলা কুকুর! আহাম্মক, আহাম্মক, আহাম্মক!”
সারিকাকে জাপটে ধরে থামাল অনুরাগই। তার বুকে মাথা ঠেকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল মেয়েটি। অনুরাগ নিজের পকেটে হাত চালান করল,
“আমি অ্যাম্বুলেন্সে কল করছি।”
কিন্তু যেই না সে নাম্বার ডায়াল করতে যাবে, অমনি সাইবান দূর্বল হাতে তার হাতটা খামচে ধরল। ভ্রু কুঁচকে ভেজা চোখে তাকাল অনুরাগ। অক্সিজেন মাস্কের কারণে কথা বলতে পারছে না সাইবান, সে শুধু ডানে বামে মাথা নাড়ল। ভারী চোখজোড়ায় বিষদ আতঙ্ক।
“হাসপাতালে যাবি না?”
অনুরাগ প্রশ্ন ছুঁড়তেই জোরে জোরে মাথা দোলালো সাইবান। সারিকা খেঁকিয়ে উঠল,
“ও হাসপাতালে যাবে না মানে ওর ঘাড় যাবে! ফোনটা দাও, ফোন দাও অনুরাগ এক্ষুণি!”
অথচ ফোন করতে গিয়েও করতে পারলনা অনুরাগ। উভয়ের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল সাইবানের চোখ বেয়ে গড়ানো অঝোর ধারার অশ্রুপানে। সে কিছুতেই হাসপাতালে যেতে চাইছে না। অক্সিজেন মাস্কের ভেতর থেকেই ফিসফিস করে বলল,
“আম…আমি…আ…র…নিচেহ…. নামতেহ…চ…চাই ….চাই না!”
এটুকু বলেই চোখ বুঁজে ফেলল সাইবান। তার মাথাটা একদিকে হেলে পড়ল। এক হাতে মাস্ক চেপে আরও জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল সে। সেদিকে চেয়ে অনুরাগ আর সারিকা উভয়ে আর নড়ার শক্তি পেলনা।
এক ঘণ্টা পর।
সাইবানকে হাসপাতালে নেয়ার জন্য রাজী করানো যায়নি। বর্তমানে সে বসার ঘরের সোফায় চুপচাপ বসে আছে। অনুরাগ তাকে গোসল সারিয়ে নিয়ে এসেছে। অক্সিজেন মাস্কের আর দরকার পড়ছে না। সারিকা জুস করেছে, সেটা স্ট্র দিয়ে একটু একটু করে পান করছে। তার গলার দাগটায় অ্যান্টিসেপটিক লাগিয়ে দিচ্ছে অনুরাগ। বাইরে ঝড়ের তান্ডব অনেকটা কমে এসেছে। এখন শুধু থেকে থেকে বাজ পড়ছে, সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। থেকে থেকে জ্বলে উঠছে অনুরাগের চোখ।
“শালা ভালো মানুষের বাচ্চা কুত্তা! দেখিস, যদি একটুখানি এদিক সেদিক হয়েছে তো তোকে সোজা আই সি ইউ তে টেনে নিয়ে ফেলব, ভাগাড় কোথাকার!”
সাইবান বিশেষ প্রতিক্রিয়া করলনা। নিঃশব্দে অনুরাগকে দেখল। বেঁচে যখন গিয়েছেই, তখন হাসপাতালে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। কারণ হাসপাতালে গেলে সামিয়া জেনে যাবেন। সামিয়া জানলে জানবেন আহমদও। এরপর থেকে হয়ত সাইবান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আর কোনোদিন নিজের মুখ পর্যন্ত দেখতে পারবে না। নিজেকে তার স্বার্থপর মনে হবে, কাপুরুষ মনে হবে। মৃ*ত্যুর মতন একটা সহজ পথ বেছে নিতে চেয়েছিল সে জীবনের যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে। অত্যন্ত লজ্জাজনক! নিকৃষ্ট এক সিদ্ধান্ত। যদি সামিয়া জানতে পারেন তবে আর সইতে পারবেন না। কোনোদিন না। অজান্তেই জুসের গ্লাসে আঙুল চেপে বসল সাইবানের।
কিচেনটা গুছিয়ে সারিকা ফিরে এলো। অনুরাগও তখন ব্যান্ডেজ সেরে ফেলেছে। সে সুচারু দৃষ্টিতে সারিকাকে দেখে বলল,
“আপনি শিওর হাসপাতালে না নিলে সমস্যা হবে না?”
সারিকা মাথা দোলালো। আগের তুলনায় অনেকটা শান্ত এবং ধীরস্থির দেখাচ্ছে তাকে।
“হ্যাঁ। কিন্তু কালকে সকালে আমি আমার বান্ধবীর পরিচিত একজন ডাক্তারের ক্লিনিকে ওকে চেক আপ করাতে নিয়ে যাব।”
ভ্রু কুঁচকে ফেলল সাইবান। তাতেই ধমকে উঠল সারিকা,
“এই! একদম চোখ পাকাবি না কুলাঙ্গার! থাপড়ে তোর দাঁত ফেলে দেব হারামজাদা! খুব শখ না? কালকে ট্রাকের নিচে একটা ধাক্কা দেব, লীলাখেলা সাঙ্গ হয়ে যাবে, খুশি?”
সাইবান প্রথমটায় প্রতিক্রিয়া করলনা। কিন্তু পরক্ষণেই জুসের গ্লাস রেখে দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে বোনকে কাছে টেনে নিল। তার কোমর জড়িয়ে ধরে উদরে মাথা ঠেকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“সরি। মাফ করে দে, সিস।”
এই বাক্যের পর নিজেকে আর শক্ত রাখা যায়না। সারিকা পারলনা। সেই রাতে অগণিত বারের মতন কাঁদল সে। ঝুঁকে ভাইয়ের কাঁধ জড়িয়ে ধরে তার মাথার চুল টেনে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“তোর একবারও আমাদের কথা মনে পড়েনি, সাই? মম, ড্যাড, আমি, কীভাবে থাকতাম তোকে ছাড়া? অনুরাগের কথা মনে পড়েনি? তোর কাছের মানুষগুলোর কথা একটুও ভাবলি না তুই? এতই ক্ষোভ, এতই রাগ? তুই চলে গেলে এই সমাজের কিচ্ছু যায় আসত না বিশ্বাস কর। দুদিন গল্প করে সবাই ভুলে যেত। কিন্তু মম, ড্যাড ভুলতে পারত না, তারা সন্তানহারা হত, আমি ভাইহারা হতাম, অনুরাগ বন্ধু হারা হত। এতগুলো মানুষের অশ্রুর কোনো মূল্য নেই তোর কাছে? এতই ঠুনকো আমরা? যে পথে যাচ্ছিলি, সেই পথে কি তোর সুখ মিলত? আল্লাহকে কি জবাব দিতি? আপনার পরীক্ষায় পাশ করতে পারিনি বলে কাপুরুষের মতন পালিয়ে এসেছি? জাহান্নামের উত্তাপ সইতে পারতি? পরকালে সুখে থাকতি?”
সাইবান জবাব দিতে পারলনা। চুপটি করে রইল। সারিকা অনুভব করল, তার উদরে যেখানে মুখ গুঁজে রেখেছে সাইবান, সেখানে টি শার্টের অংশটা ক্রমশ ভিজে উঠছে উষ্ণ তরলে। ভাই তার কাঁদছে। তাকে কাঁদতে দিল সারিকা, নিজেও তাল মিলিয়ে কেঁদে গেল। অনুরাগ সরে এলো কাছে। বন্ধুর পিঠে হাত রেখে ঝুঁকে তার কাঁধে কপাল ঠেকিয়ে গভীর গলায় বলল,
“কোনো ধর্মই আত্মহ*নন সমর্থন করে না রে সাইবান। আমাদের ভগবত গীতায়ও বলা আছে এই কথা। আমি তো জানতাম তোদের ধর্মও একই কথা বলে। তবে কেন এই সিদ্ধান্ত?”
অনুরাগ একটু থামল, অতঃপর আবারও বলল,
“বেশিই কষ্ট পেয়েছিলি? বেশিই হতাশ হয়ে গিয়েছিলি? আমার কাছে চলে আসতি। আমি তোকে লুকিয়ে রাখতাম। তোকে নিয়ে ট্যুর দিতাম দূর কোনো পাহাড়ে বা সমুদ্রে, যেখানে তোকে এই সমাজ ছুঁতে পারতনা। আমার কি দোষ ছিল বল? কেন আমাকে তুই একলা করে দিতে চাইছিলি?”
সাইবানের কাছে এবারেও কোনো জবাব নেই। সারিকা ভাইয়ের কাঁধ চাপড়ে বলে উঠল,
“তুই পারবি সাই। ভেঙে পড়ার জন্য তোর জন্ম হয়নি। ভুলে গিয়েছিস জীবনে কতটা পথ পাড়ি দেয়া হয়েছে? এবার নাহয় একটু বেশিই দুঃখের দিন চলছে, তা বলে কি সুখ আসবে না?”
“সুখ আসবে সাইবান। কিন্তু হতাশার দুয়ার দিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাসের দুয়ার দিয়ে। সময় নে, নিজেকে গড়। সমাজের ইচ্ছায় বাঁচিস না, নিজের ইচ্ছায় বাঁচ। একটাই তো জীবন রে তোদের, নিজের মত করে বাঁচলে ক্ষতি কি?”
অনুরাগ বলল। এরপর দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা হলোনা ত্রিজোড়ের মাঝে। নীরবে একে অপরের পাশে রইল তারা। অবশেষে যখন সাইবান সারিকার কাছ থেকে মুখ তুলল, তার চোখে আর অশ্রুর দেখা পাওয়া গেলনা। তাতে প্রশান্ত একটা ভাব। সরাসরি অনুরাগের দিকে তাকাল সাইবান, ভেঙে আসা গলায় বলল,
“আমায় দূরে কোথাও নিয়ে যাবি?”
ধক করে উঠল অনুরাগের বুকটা। বন্ধুর হাত চেপে সে শুধাল,
“কোথায় যাবি বল?”
“সেন্ট মার্টিন। সমুদ্র দেখব।”
অনুরাগ নিজেকে সামলাতে পারলনা। শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল সাইবানকে। বন্ধুও তার পাল্টা জড়িয়ে ধরল। সারিকা চোখ মুছে নিজের ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সেই রাতে, কেউই আর একটা কথাও বলতে পারলনা একে অপরকে।
সময় চিরবহমান। তাকে থামানো যায়না। কলকলে নদীর মত সে বয়ে চলে। আহমদ, সামিয়া দুজনই বিদেশ থেকে ফিরে এলেন। সারিকা জানাল, সাইবান বন্ধুদের সঙ্গে ট্যুরে গিয়েছে। সামিয়া বিশেষ আপত্তি করলেন না। তার ছেলেটা অবশেষে ঘর থেকে বেরিয়েছে এটাই তার কাছে অনেক।
সেন্ট মার্টিন থেকে সাইবান ফিরল এক সপ্তাহ পর। আর সে যখন ফিরল, তখন বাড়ির অধিকাংশ মানুষই তাকে আর চিনতে পারলনা। সারিকা নিজের পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিল। পাশেই সামিয়া সোফায় বসে মেহের জন্য ফল কাটছিলেন। আজ তার হাসপাতাল থেকে ছুটি। বিশেষ দরকার না হলে যাওয়ার স্কেজিউল নেই। আহমদ ইদানিং বেশিরভাগ বাড়ির বাইরেই থাকেন। তাকে বাড়িতে খুঁজেও লাভ নেই। সামিয়া সারিকার মুখে একটা আপেলের টুকরো তুলে দিয়েছেন কি দেন নি, এমন সময় উৎফুল্ল একটি কন্ঠ ভেসে এলো,
“ব্রো!”
সামিয়া এবং সারিকা উভয়ে চমকে উঠে ঘুরে তাকালেন। বাড়ির সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সাইবান। পরনে নাইলনের জ্যাকেট আর ট্রাউজার। গলায় মাফলার প্যাঁচানো। এক কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। চুলে নতুন হেয়ারকাট দিয়েছে স্পষ্ট। আগের হ্যাংলা পাতলা শরীরটায় হালকা মাং*স পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল নেই। উজ্জ্বল চেহারা। জ্বলজ্বলে কালো মণি। আর ঠোঁটে, বিরাট হাসি। সুঁচালো দাঁত দুটো দেখা যাচ্ছে স্পষ্টভাবে। সারিকা ভড়কাল। তবে সামিয়া ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে গেলেন ছেলের দিকে। সাইবান দৌঁড়ে এসে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই মায়ের কোমর জড়িয়ে তুলে চারপাশে বনবন করে ঘোরাতে ঘোরাতে হাসতে লাগল। সামিয়া ছেলের কাঁধ চেপে ধরলেন,
“আরে, আরে আল্লাহ! নামা আমাকে, নামা!”
“মাই ডিয়ার ব্রো! ডিড ইউ মিস মি?”
“ব্রো আবার কি? মা হই তোর।”
“তাতে কি? আমার বন্ধু না তুমি?”
“নামা! ছেলে তোর কোমর ভাঙবে!”
সাইবান আস্তে করে সামিয়াকে নামিয়ে রাখল। ধড়ফড় করতে থাকা বুক চেপে সামিয়া হাসি নিয়ে চেয়ে রইলেন। এই ছেলের হঠাৎ কী হলো? সেন্ট মার্টিনের বাতাসের এত জোর নাকি?
সাইবান ঘুরে সারিকার দিকে এগোল। বোন তার তখনো চোখে অবিশ্বাস নিয়ে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। তীর্যক হেসে ঝুঁকে খপ করে তার ফলের বাটি থেকে আপেল তুলে নিজের মুখে ঠুসে দিল সাইবান,
“খেয়ে খেয়ে এমনিতেই ঢোল হচ্ছিস, এবার কি ঢাক হওয়ার শখ হয়েছে?”
“ইয়া! সাই!”
তড়াক করে লাফিয়ে উঠল সারিকা। ভাইয়ের চুল টেনে ধরল। ছাড় দিলনা সাইবানও। বোনের লম্বা চুলের মুঠি টেনে ধরল,
“পুরুষ নির্যাতনের জন্য হাত নিশপিশ করে সবসময়, না?”
“তোকে আমি মামলা দিয়ে দেব সাই!”
“দে না, আমিও তোর নামে পোস্টার ছাপাব, পুরুষ নির্যাতক! জীবনে বিয়ে হবে না তোর!”
দুই ভাইবোন চুল টানাটানি করতে করতে সোফায় গড়িয়ে পড়ল। সামিয়া ঝাপসা চোখে চেয়ে রইলেন। আজ কতদিন বাদে তিনি এই দৃশ্যটা দেখছেন? মনে করতে পারলেন না। এগিয়ে গেলেন তিনি, সাইবানকে তুলে অযথাই নিজের বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলেন। তার মাথা বরাবর চুমু খেয়ে ফিসফিস করলেন,
“আমার আব্বুটা।”
সাইবান প্রথমটায় বরফ হয়ে রইল। পরক্ষণে মুচকি হেসে জননীকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আ’ম হোম মাম্মা, আ’ম হোম।”
পাশ থেকে দৃশ্যটা দেখতে দেখতে নিজের এলোমেলো চুল গুছিয়ে নিল সারিকা। মুখ ঘুরিয়ে মায়ের আড়ালে মুছে নিল একফোঁটা অবাধ্য অশ্রু।
সেদিন রাতের বেলা।
তালাবদ্ধ একটা রুমের ভেতরে ঢুকল সাইবান। ছেলে ট্যুর থেকে ফিরেছে বিধায় সামিয়া আয়োজনের কমতি করেননি। পরিবারের সঙ্গে সময়টা আনন্দে কেটেছে তার। অনুরাগ আর তিতলিও এসেছিল কিছুক্ষণ আগে। এখন সামিয়া আর সারিকার সঙ্গে নিচতলায় গল্প করছে তারা। সকলের চোখ এড়িয়ে সাইবান এখানে এসেছে। তার একটা কাজ করার প্রয়োজন আছে। রুমটা মূলত স্টোররুম। সে ভেতরে ঢুকতেই বদ্ধ একটা গন্ধ নাকে গেল। কিন্ত খুব কড়া নয়, সহনশীল। হাতড়ে লাইট জ্বালিয়ে দিয়েই উজ্জ্বল হলুদ আলোয় উদ্ভাসিত হলো চারপাশ। পরনের জ্যাকেটটা খুলে ফেলল সাইবান। উন্মুক্ত হলো তার গলা। সেখানে এখনো হালকা দাগ বর্তমান। দরজাটা আটকে সে এগোল। সামনে কার্ডবোর্ডের বক্স স্তরে স্তরে সাজিয়ে রাখা। একপাশে বেশকিছু অপ্রয়োজনীয় আসবাব, কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। সাইবান গিয়ে থামল এক কোণায় অতি যত্নে মখমলের কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখা একটা বস্তুর দিকে। হালকা ধূলোর স্তর জমেছে উপরে। সেদিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে হাত তুলল সাইবান। এক টানে মখমলি কাপড়টা সরিয়ে ফেলতেই ধুলো উড়ল বাতাসে, মেঘের মতন। সেই ধোঁয়াটে আস্তরণ মিলিয়ে যেতেই দেখা মিলল বস্তুটির। অসংখ্য বোতাম, একপাশে রিমিক্সিং ডিসপ্লে। হেডসেট, সঙ্গে সাউন্ডবক্স। সাইবানের অতি শখের এক জন্মদিনের উপহার। যেটা সে স্কুল আর কলেজে থাকাকালীন বারকয়েক ব্যবহার করেছে স্কুলের অনুষ্ঠান নাহয় কলেজের বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে। সবটাই ছিল অনুরোধ আর শখ থেকে। বস্তুটি, ডি জে কন্ট্রোলার।
—স্বপ্নের কোনো সীমা নেই ছেলে। সেই অসীমের ভেতরে হাতড়ে দেখ, কোথাও তোমার লালিত শখ আজও বাস করে।
সাইবানের কানে বাজল রাফাত ভাইয়ার বলা শেষ কথাগুলো। স্বপ্নের তো কোনো সীমা নেই। লালিত শখ? তার সামনেই আছে। যে শখকে স্টোররুমে আবদ্ধ করে রেখেছিল বছর কয়েক ধরে, যেন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা পূরণ করতে পারে। সাইবানের বুক থেকে আজ কোনো দীর্ঘশ্বাস বেরোলনা। একটি হাত বাড়িয়ে দিল সে। ডি জে কন্ট্রোলার বক্সটার বোতামগুলো ছুঁয়ে দিল অতি যত্নে। একটা সময় সাউন্ড রিমিক্স করায় এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছিল সে, নিজেই নিজের শখটাকে গলা টিপে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল যেন পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটে।
যেখানে স্বপ্ন ফুরোয়, সেখানে শখ শুরু হয়।
কন্ট্রোলারের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল সাইবান, আপনমনে ফিসফিস করল,
“তারা আমার চোখে অশ্রু দেখতে চেয়েছিল, আজ থেকে আমি প্রাণ খুলে হাসব, শুধু হাসব। তারা আমার অধঃপতন দেখতে চেয়েছিল, আমি তাদের আমার সফলতা দেখাব। তারা আমাকে পায়ে ঠেলে দিয়েছিল, তাদের মাথায় উঠিয়ে রাখলেও আমি সেথায় ঠাঁই নেব না। তারা আমাকে রিচ ফ্যামিলির প্যাম্পার্ড কিড ভেবেছিল, আমি তাদের শয়নে স্বপনে আমার নামের জয়ধ্বনি শোনাব। আমার নামটা তারা ভুলে যাবেনা, ভুলতে পারবেনা, ভুলতে দেব না। আমি….. সাইবান আলাদিন। ডি জে আলাদিন।”
আমার আলাদিন পর্ব ৪৭
যন্ত্র জবাব দিতে জানে না। যদি জানত, তবে কি বলতো? সাইবান বেশি ভাবলনা। কন্ট্রোলার, হেডসেট একে একে তুলে নিয়ে আপনমনে খানিক তীর্যক হাসল, গলার প্রায় মিইয়ে আসা দাগটা হলদে আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল যখন সে বলল,
“আর ইউ রেডি, মাই পার্টনার?”
