আমার আলাদিন পর্ব ৫৭
জাবিন ফোরকান
অন্ধকার জগৎ, বিধূর সময়, নীরব আহাজারিদের স্মৃতি আজ ইরামকে আতঙ্কিত করতে পারলনা। সুগন্ধার মুখে নামটা শোনামাত্র তার ভয়ে জড়সড় হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটে যাওয়া উচিত ছিল কারো কাছে, সাহায্যের আশায়। যেন তাকে ওই বিষাক্ত লোকটার মুখোমুখি হওয়া থেকে কেউ বাঁচিয়ে নেয়। কিন্ত রমণী হতবাক হয়ে আবিষ্কার করল, তার বিশেষ ভয় লাগছে না। নবজাতককে বুকে নেয়ার পর সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে আসার সময়ে যেমন দুঃসাহস অনুভব করেছিল সে, এখন, এই মুহূর্তে ঠিক সেই দুঃসাহসটাই ভর করেছে তার উপর। ইরাম জানত, আজ নাহয় কাল, কোনো না কোনো একদিন তাকে এই সময়ের মোকাবেলা করতেই হবে। অন্যের ভরসায় আর কতদিন? এই লড়াইটা তার ব্যক্তিগত।
ইরামের অভিব্যক্তিজুড়ে একসাথে অসংখ্য পরিবর্তন খেয়াল করে সুগন্ধা খানিকটা বিচলিত হলো। শুধাল,
“আপনারে চিন্তিত দেখাইতেসে ভাবীজান, কোনো সমস্যা?”
ইরাম কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তাকে দেখে মনে হলো মাথায় কোনো পরিকল্পনা আঁটছে। তারপর হুট করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল ইরাম। অস্বাভাবিক শান্ত দেখাল তাকে।
“সুগন্ধা। চায়ের জন্য দুধ বসাও। মেহমানকে যথাযথ আপ্যায়ন করতে হবে।”
ইরামের কন্ঠটা অদ্ভুত শোনাল। দৃঢ়, তেজস্বী, আত্মপ্রত্যয়ী। সুগন্ধা ভীষণ অবাক হলো। ইরামকে অধিকাংশ শান্ত, স্নিগ্ধ রূপে দেখেই অভ্যস্থ সে। তাই এই রূপটা খানিকটা অচেনা লাগল। বিশেষ মন্তব্য না করে আজ্ঞা পালন করতে সে মাথা নাড়িয়ে নিচে চলে গেল। ইরাম নিজের জায়গায় খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। মনে মনে ছক সাজিয়ে নিল। ইযান এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। ছেলে নিজের বিছানায় স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুমাচ্ছে নিশ্চিত করল সে। তারপর ক্লোজেট থেকে গত মাসে কেনা বাদামী রঙের জামদানী শাড়ি বের করল। সঙ্গে গয়নার বাক্স। বাথরুম থেকে পোশাক পাল্টে সুন্দর করে শাড়ি গায়ে জড়াল সে। ড্রেসিং টেবিলে বসে চুল আঁচড়ে সুন্দর একটা খোঁপা বাঁধল। মুখে ক্রিম, চোখে হালকা কাজল এবং ঠোঁটে নুড লিপস্টিক লাগাল। অতঃপর গয়নার বাক্সটা খুলল। বিয়ের পর সাইবানের উপহার দেয়া স্বর্ণের নেকলেসটা গলায় পড়ল। সামিয়ার গড়িয়ে দেয়া একজোড়া চুড়ি এবং নাকে নাকফুল পড়ল। নিজেকে বেশ যত্ন নিয়ে তৈরি করল সে। আয়নায় নিজের প্রতিফলনের দিকে চেয়ে মৃদু হাসল সে। ইরাম যে কত ভালো আছে সেটা কিছু মানুষকে জানান দেয়া দরকার। দিনশেষে, এই বাড়ির একমাত্র বউ সে। মেহমানকে এভাবে বরণ করাটাই যুক্তিযুক্ত, তাইনা?
রুম থেকে বেরিয়ে এলো ইরাম। সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়াল। উপর থেকে নিচের হলঘরের দৃশ্য স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সোফায় শরীর এলিয়ে বসে আছে অরণ্য। চেহারা একদম আগের মতন, তাতে ঔজ্জ্বল্যের কমতি নেই। বরং, আগের চাইতেও বেশি জেল্লাদার লাগছে। পরনে চারকোল বরণের স্যুট। বরাবরের মতোই অবয়বে সামান্যতম কোনো খুঁত নেই। চিবুকে ট্রিম করে কেটে রাখা দাড়ির রেখা। চোখে স্বর্ণালী রিমের চশমা। এক হাঁটুর উপর অপর হাঁটু তুলে অভিজাত ভঙ্গিতে বসে আছে সে। যেন এটা তার অচেনা কোনো স্থান নয়, নিজের রাজ্য। ওই অস্তিত্বকে দেখে ইরামের মানসপটে পুনরায় যন্ত্রণারা হানা দিতে চাইল। অথচ নিজেকে রুখল রমণী। দুহাত শক্ত করে মুঠো পাকিয়ে নিয়ন্ত্রণ করল নিজের সমগ্র সত্তাকে। বড় করে শ্বাস টানল। এরপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল।
পদশব্দ শুনে মাথা কাত করে তাকাল অরণ্য। ইরামকে দেখেই তার দৃষ্টিশক্তি স্থির হলো। চশমার লেন্সের আড়ালে চোখজোড়া আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল রমণীকে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তার বাদামী জামদানী, গলায় শোভা পাওয়া অলংকার, নাকে জ্বলজ্বলে নাকফুল অরণ্যর চোখ দুটোকে বুঝি সাক্ষাৎ স্বর্গ দর্শন করিয়ে আনল। নিষ্পলক চেয়ে রইল সে, অজান্তেই ঠোঁটে ফুটল তৃপ্তির হাসি। ইরাম একদম শান্তভাবে নিচে নামল। ততক্ষণে সুগন্ধা কিচেন থেকে বেরিয়েছে। আস্তে করে সে বলল,
“চা বসাইছি। নাস্তাও রেডি।”
ইরাম মাথা কাত করে বলল,
“তুমি রুমে যাও, বাকিটা আমি সামলে নেব।”
সুগন্ধা আরেক দফায় অবাক হলো। খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে একবার অরণ্য আর পরেরবার ইরামের দিকে তাকাল। তর্ক করলনা। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে ইযানের কাছে গেল। যদিও ইরাম সরাসরি বলেনি, তবে মেয়েটা বুঝে নিয়েছে কারণ ইরাম এখানে আছে মানে ওখানে ইযান বর্তমানে একা। সুগন্ধা দৃষ্টির আড়াল হতেই সোফার দিকে এগোল ইরাম। আজ বাড়িতে সে আর সুগন্ধা আছে শুধু। সামিয়া হাসপাতালে গিয়েছেন। আহমদ আছেন কিনা জানা নেই, তাকে নাস্তার টেবিলে দেখেনি ইরাম। সে একদম নিঃশব্দে অরণ্যর বিপরীত দিকের সোফায় বসল। হাঁটুর উপর হাঁটু সাজিয়ে দুহাত রাখল কোলে। শিরদাঁড়া টানটান করে অভিজাত ভঙ্গিমা নিয়ে তাকাল সামনে। এতক্ষণ যাবৎ অরণ্য এক সেকেন্ডের জন্যও তার উপর থেকে দৃষ্টি সরায়নি। ইরাম সূক্ষ্ম হাসল, শুধাল,
“আমার বাড়িতে হঠাৎ লাটসাহেবের পদধূলি! কি মনে করে? পথ ভুলে গিয়েছেন নাকি ইচ্ছা করে ভুল পথে এসেছেন?”
অরণ্য বুঝি একটা ঘোর থেকে বেরিয়েছে, এমন এক অভিব্যক্তি ফুটল তার চোখেমুখে। অতঃপর সোফায় পা ছড়িয়ে বসল সে, সরাসরি ইরামের দিকে চেয়ে একগাল হাসল। নমনীয় গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল,
“তোমার বাড়ি?”
“শ্বশুরবাড়ি প্লাস স্বামীর বাড়ি। ইকুয়ালস টু আমার বাড়ি।”
কাঁধ তুলে এমনভাবে বলল ইরাম যেন এর চাইতে সহজ বিষয় দুনিয়ায় দুটো হয়না। অরণ্য প্রাক্তন স্ত্রীর দিকে একটানা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এই ইরামকে অচেনা লাগছে তার। অনেকটা অচেনা। অরণ্যকে নীরবে চেয়ে থাকতে দেখে ইরাম বলল,
“বোধ হয় আপনার বিশেষ কিছু বলার নেই। আপনার হয়ত কাজবাজ নেই কিন্তু দুনিয়ার অন্য মানুষগুলোর কাজের অভাব নেই। সে যাকগে, এসে যখন পড়েছেন, অবশ্যই চা খেয়ে যাবেন। আমি আবার কিছু মুখে না দিয়ে কাউকে বাড়ি থেকে বিদায় করিনা।”
বলে ইরাম সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। অরণ্য ঝট করে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল তার কব্জি পাকড়াও করার উদ্দেশ্যে। কিন্ত ইরাম সটান এক পা দূরে সরে গেল। খিলখিল করে হাসল,
“ওয়াও, কি স্পিড! বোধ হয় মেহমানদারি আপনার হজম হচ্ছে না। ব্যাপার না। আমাদের মেনুতে দারোয়ানের ঘাড়ধাক্কাও আছে। আপনি নিতে ইচ্ছুক?”
“তুমি অনেক বদলে গিয়েছ, কবিতা।”
কবিতা—নামটা কানে যেতেই ইরামের সমস্ত শরীরে তড়িৎ খেলে গেল। ইচ্ছা হলো হাতটা তুলে সামনে বসে থাকা কদর্য লোকটার গালে ঠাটিয়ে চড় দিতে। কিন্ত নিজেকে বহু কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করল সে। শাড়ির আঁচল মুঠো পাকিয়ে ক্রোধ ঝেড়ে ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসিটা ধরে রেখে বলল,
“কবিতা বদলাতে কলমের একটা আঁচড়ই যথেষ্ট। সেখানে আপনি তো পুরো দোয়াতটাই ঢেলে দিয়েছেন, মিস্টার সওদাগর।”
অরণ্য সরাসরি তাকাল ইরামের চোখের দিকে। রমণীর মাঝে ভীতির লেশমাত্র দেখলনা। তাতে শুধু প্রগাঢ় ঘৃণা। সেই ঘৃণা এতটাই তীব্র যে অরণ্যর অন্তর চেপে আসছে ভারত্বে।
“বসুন। চা নিয়ে আসছি।”
অরণ্যকে দ্বিতীয় কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ইরাম কিচেনে চলে গেল। সুগন্ধা চা বানিয়েই রেখেছে। চুলায় কেটলিতে ফুটছে তা। বাড়ির একেকজন একেক মাত্রায় চিনি খায় বিধায় কখনো চায়ে সরাসরি চিনি দেয়া হয়না। ইরাম ট্রেতে সাজিয়ে রাখা দুটো কাপে চা ঢেলে নিল। একটাতে চিনি মেশাল। অপর কাপে দুই টেবিল চামচ লবণ দিয়ে ভালোমত গুলিয়ে নিল। অতঃপর কিছুই হয়নি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হলরুমে ফিরে এলো। টেবিলে চায়ের কাপ দুটো রাখল। অরণ্যর হাতে তুলে দিলনা। বরং চিনি দেয়া চায়ের কাপটা নিয়ে পুনরায় নিজের সোফায় বসে আয়েশী চুমুক দিল।
অরণ্য নিজের কাপটা তুললনা। ইরামের দিকে চেয়ে রইল। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, চায়ে চুমুক দেয়ায় হালকা ভিজে ওঠা ঠোঁটজোড়ার দিকে।
“আমার ছেলেকে দেখছিনা। কোথায় ও?”
অরণ্যর কথায় চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ইরাম উৎফুল্ল গলায় বলল,
“কংগ্র্যাচুলেশনস! আপনার ছেলে হয়েছে? মাশাআল্লাহ। কবে হলো?”
এতক্ষণ যাবৎ শান্ত দেখালেও এবার অরণ্যকে যারপরনাই বিরক্ত মনে হলো। ভ্রুজোড়া কুঁচকে উঠল বান্দার। বিনোদিত ইরামের দিকে তাকিয়ে খানিক ঝাঁঝাল কন্ঠে সে জানাল,
“রসিকতা করতে আসিনি আমি। ইযানকে নিয়ে আসো। যাও।”
“হুকুমটা জঙ্গলে গিয়ে দিন। এই বাড়ি আমার রাজ্য।”
শক্ত জবাবে প্রথমটায় অরণ্যকে বিস্মিত দেখাল। পরমুহূর্তে তার চেহারায় সেই চিরচেনা অশুভ ভাবটা ফিরে এলো। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সে। শিকারী যেমন করে শিকারকে পর্যবেক্ষণ করে, তেমন করে ঘুরে দেখতে দেখতে ইরামের সোফার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। ঝুঁকল সামনে, দুহাত রাখল সোফায়, একদম প্রাক্তনের কাঁধের কাছে। চাইলেই ছুঁয়ে দেয়া যায়। কিন্তু এই বাড়ির সীমানার ভেতরে ওই তেজস্বী চোখজোড়ার সামনে অবিবেচক কাজটা করতে দ্বিধা হলো অরণ্যর। নিজের ভীরুতায় নিজেই ঘাবড়াল অরণ্য। তবে চেহারায় অন্তর্দ্বন্দ্ব ফুটে উঠতে দিলনা। মাথাটা নামিয়ে ইরামের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“আজকাল আমার কবিতা রাজ্য চালাতেও শিখেছে দেখছি। রাণী আর রাজপুত্রে আমার রাজ্য যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।”
ইরাম হাত তুলে সামনের দেয়ালে লাগানো বড় একটা দেয়ালঘড়ির দিকে ইঙ্গিত করল। ঘণ্টার কাঁটা ১০ আর মিনিটের কাঁটা ৩ এর ঘরে।
“সকাল দশটা পনেরো বাজে। বাইরে সূর্য মামা গলগল করে পৃথিবীতে দিনের আলো ঢালছে। ঘুম থেকে উঠুন মহারাজ, চোখ মেলে আঁধার কাটা জগৎটাকে দেখুন আর দিবাস্বপ্ন বন্ধ করুন।”
হাত বাড়িয়ে দিল অরণ্য এবার। নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলোনা তার পক্ষে আর। খপ করে ইরামের হাতের আঙুলটা আঁকড়ে ধরে ফেলল সে। হ্যাঁচকা টানে সোজা নিজের বুকে নিয়ে ঠেকাল। সুরেলা হেসে বলে উঠল,
“সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে শুনেছিলাম, আজ দেখেও নিলাম। ত্যাদরটা তোমাকে ভালোই ট্রেনিং দিয়েছে। আই লাইক ইওর দিস ভার্সন। আই থিংক আ’ম ফলিং ফর ইউ অ্যাগেইন, ইউ আর টু মাচ হট, ওয়াইফ।”
এক ঝটকা দিয়ে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল ইরাম। তীব্র ক্রোধ নিয়ে তাকাল প্রাক্তনের দিকে।
“অ্যান্ড ইউ আর টু মাচ অব আ বিচ!”
ইরামের কথায় ভরপুর ঘৃণা আর রাগ থাকলেও অট্টহাসি হেসে উঠল অরণ্য। সে রীতিমত শরীর কাঁপিয়ে হাসি। হেলেদুলে সোফায় এলিয়ে পড়ল সে। জ্বলজ্বলে চোখে ইরামের ক্রোধান্বিত মুখ দেখে বলল,
“সো কিউট! ওয়ান্স মোর!”
বলতে বলতে অরণ্য অজান্তেই টেবিল থেকে নিজের চায়ের কাপটা তুলে নিল। লম্বা একটা চুমুক দিল। অসহ্যকর লবণের স্বাদটা জিভে ঠেকতেই তার সমস্ত শরীরজুড়ে কারেন্ট বয়ে গেল বুঝি। মুখ থেকে চা ছিটকে তার চারকোল স্যুটের উপর পড়ল। ভিড়মি খেয়ে কেশে উঠল সে ভয়ানকভাবে। টেবিলে সাজিয়ে রাখা ফলের ঝুড়ির পাশেই টিস্যুর বক্স। অরণ্য হাত বাড়াতেই ইরাম থাবা দিয়ে বক্সটা টেবিল থেকে মেঝেতে ফেলে দিল। দুহাতের আজলায় থুতনি ঠেকিয়ে কিউট ভঙ্গিমায় তাকাল অরণ্যর দিকে, পলক ঝাঁপটাল অপ্রয়োজনীয়ভাবে, রসিয়ে বলল,
“ওয়ান্স মোর।”
অরণ্যর কাশি বন্ধ হয়ে গেল। ফ্যালফ্যাল করে প্রাক্তনকে দেখল সে। পরমুহূর্তে স্যুটের ভেতরে হাত ভরল। রুমাল বের করে নিজের মুখ মুছে নিল। স্যুটে দাগ পড়ে গিয়েছে, সেটা মোছার চেষ্টা করে লাভ নেই। অপমানে তার নাকটা হালকা লাল হয়ে গিয়েছে। ইরাম বেশ তৃপ্ত হলো এমন দৃশ্যে।
অরণ্য ধাতস্থ হলো। দাগের পরোয়া না করে রুমালটা পুনরায় পকেটে ঢুকিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“অপ্রয়োজনীয় স্বাধীনতা পেলে পোষা কবুতরও নিজেকে ফিনিক্স ভাবতে শুরু করে।”
সোজা হয়ে বসল সে। গভীর দৃষ্টিতে তাকাল ইরামের দিকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নজর বোলালো প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গজুড়ে,
“আকাশ দেখে ডানা ছটফটিও না, দিনশেষে শক্ত মাটিই তোমার সীমানা।”
ভ্রু কুঁচকে ফেলল ইরাম ভীষণ বিরক্তিতে।
“কাব্যের বমি গ্রন্থে উগলে দিলে ভালো করবেন। মানুষের কানের হেফাজত হবে। যাকগে, আপনার বমি হয়ে গেলে আসতে পারেন। বাড়ির একমাত্র বউ, কাজের কমতি নেই আমার।”
অরণ্য মাথা দোলালো,
“হুম। দেখতে পাচ্ছি। একদম ভরিয়ে দেয়া হয়েছে তোমায়। তবে আমার মতন কেউ দিতে পেরেছে কি?”
ইরামের কপাল কুঞ্চিত হলো, অরণ্যর মুখপানে বিতৃষ্ণা নিয়ে তাকাল সে। স্মিত হেসে অরণ্য শুধাল,
“তোমায় আমি যা দিয়েছি, তা ফেরত দিতে পারবে কবিতা?”
ইরাম মন্তব্য করলনা। নিঃশব্দে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ফলের ঝুড়িতে রাখা ছুরিটা তুলে নিল। হাতের মাঝে সেটাকে বনবন করে ঘোরাতে লাগল। ধারাল প্রান্তটা জানালা চুঁইয়ে আসা রোদের আলোয় চিকচিক করে উঠল। তার এমন আচরণে ভ্রু তুলল অরণ্য। বলল,
“কি করছ?”
”ফেরত দিচ্ছি।”
“কি?”
“আপনি আমায় যা দিয়েছেন তা। ট্রমা, মেন্টাল প্রেশার আর টর্চার। সুদসমেত ফেরত দেব, ইনশাআল্লাহ।”
ছুরিটা সহসাই ঝুড়িতে রাখা আপেলে গেঁথে ফেলল ইরাম। কচাৎ করে শব্দ হলো। রস ছিটকে উঠল খানিকটা। অরণ্য নিগূঢ় নয়নে দেখল দৃশ্যটা। ক্ষণিকের জন্য মনে হলো, আপেলের জায়গায় তার গলাটা আছে। একটি ঢোক গিলল সে। তারপর সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ইরাম বাঁকা হাসল। হাত ঝেড়ে নিজেও উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“সাবধানে যাবেন জাহান্নামে। ফিরে আসার দরকার নেই। বিদায়।”
অরণ্য এক পা এগোল। হাত বাড়িয়ে দিলেও ইরামের অগ্নিদৃষ্টির সামনে সেই দুঃসাহস আর করলনা। বরং ঝুঁকে রমণীর মুখের সামনে মুখ নিয়ে সরাসরি তাকাল তার চোখে। সুগভীর কন্ঠে ব্যক্ত করল,
“তুমি চাও বা না চাও, তোমার আমার যে এখন থেকে নিয়ম করে দেখা হবে! প্রাণভরে দেখব আমি, তোমাকেও, আর আমার ছেলেকেও। বলে দিও তোমার পোষ্য রক্ত গরম ছানাটাকে। এতদিন পাশা সে গানে গানে খেলেছে, এবার আমাদের সাক্ষাৎ হবে আসল পাশার ময়দানে। গুড লাক।”
স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল ইরাম। অরণ্য সরে দাঁড়াল। মাথা কাত করে একদফা সিঁড়ির উপরে দুই তলার দিকে তাকাল। যার অন্দরমহলে রয়েছে ইযান। পরক্ষণে দৃষ্টি সরিয়ে টেবিল থেকে আধখাওয়া লবণযুক্ত চায়ের কাপটা হাতে তুলে এক চুমুকে পুরোটা শেষ করে ফেলল। বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁটের কোণ মুছে মাদকীয় দৃষ্টিতে ইরামকে দেখল সে, জিভ বের করে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“উমমম…অমৃত।”
প্রসারিত হলো ইরামের চোখজোড়া। অরণ্য আর দাঁড়ালনা। প্যান্টের পকেটে দুহাত ভরে ধীরপায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে। গাড়ি পার্ক করে রাখা ছিল গেটের বাইরে। সেই গাড়িতে উঠল সে। খোলা সদর দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ইরাম শূণ্য দৃষ্টিতে দেখল গাড়িটা, যতক্ষণ না সেটা চোখের আড়াল হয়। অন্তরে একটুও তৃপ্তি হলোনা, কারণ সে জানে,
এটা কেবল শুরু।
পরদিন দুপুরবেলা।
সবেমাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে ইরাম। ইযান মেঝেতে ম্যাট্রেসে বসে খেলছে। তার জন্য রুমের এক কোণায় প্লে জোন তৈরি করে দেয়া হয়েছে। বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা জায়গাটা। যেন হুটহাট ইচ্ছামত হামাগুড়ি দিয়ে বাচ্চা বেরিয়ে যেতে না পারে। ব্লক দিয়ে খেলছে ইযান। একটার উপর আরেকটা বসিয়ে লাগছে না দেখে কিল ঘুষি মারছে ইচ্ছামত। রাগে গজগজ করছে,
“গুই…! ব.. ব!”
ইরাম মুচকি হাসল। চুল মুছতে মুছতে বিছানায় বসল।
“সাবধানে আব্বু, হাতে ব্যথা পেওনা আবার। বাবা এলে কিন্ত বকবে আমাকে।”
“বা..! আম…বা!”
বাবা বলে যে সাইবানকে বোঝানো হয় এটা ইযান বুঝতে শিখেছে। আজকাল সে অর্থপূর্ণ শব্দ উচ্চারণ করার চেষ্টায় আছে। আম্মু পুরোপুরি বলতে পারে না। আম আম করে। তেমনি বাবা হলো তার বা। সামিয়াকে ডাকে দা। সুগন্ধাকে বলে সুসু। তার এমন উদ্ভট নামকরণে বাড়ির সবাই আইসক্রিমের মতন গলে গিয়েছে। ছেলের উত্তেজনা দেখতে দেখতে ইরাম আধভেজা চুল এলিয়ে বিছানায় শুলো। গত রাতে ভালো ঘুম হয়নি তার। অরণ্যর কথা ভেবেছে শুধু। লোকটা এমনি এমনি কিছু করে না। কাল হঠাৎ উদয় হলো, কিছু না করে চলেও গেল? অবশ্যই নয়, হতেই পারেনা। অরণ্যর আগমনের উদ্দেশ্য আছে। কিন্তু সেটা কি? ভাবতে ভাবতে ইরামের ফোন বেজে উঠল। হাত বাড়িয়ে সেটা নিতেই রমণীর চিন্তিত মুখে সুখের প্রস্রবণ খেলে গেল। কলার আইডিতে সমস্ত ফোনজুড়ে ভেসে উঠেছে সাইবানের হাস্যকর একটা ছবি। একটা ভাঙা সানগ্লাস চোখে দিয়ে জিভ বের করে ছবি তুলেছে ছেলেটা। জোকারের মতন দেখাচ্ছে। সেই ছবির নিচে ভাসছে ইরামের সেভ করা নাম—মাই আলাদিন।
ফোনটা রিসিভ করল ইরাম। সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনজুড়ে সাইবানের মুখচ্ছবি ভেসে উঠল। উদাম শরীর। ঘাড় গড়িয়ে পানির ফোঁটা বুকে নামছে। চুলগুলো কপালে লেপ্টানো। ভিডিও কলের ওপাশ থেকে ইরামের দিকে চেয়েই বিনা কারণে হিসিয়ে উঠল সাইবান, যেন বেশ বেদনায় আছে,
“ইশ! আর পাঁচটা মিনিট আগে ফোন করতাম! সিনেমা মিস!”
ইরাম প্রথমে বুঝতে পারলনা। ফোন করেই এমন অসংলগ্ন কথা কে বলে? ক্যামেরায় নিজের প্রতিফলন দেখতেই থমকাল সে। মাত্র গোসল সেরে বেরিয়েছে। লিনেনের একটা পাকিস্তানি কামিজ পড়েছে, ওড়না দেয়া হয়নি কারণ রুমে কেউ নেই। গলার দিকটা এখনো হালকা ভেজা। বুঝতে পেরেই ইরামের কান দুটো গরম হয়ে উঠল।
“ঠিক বলেছ। আর পাঁচ মিনিট আগে ফোন করলে আমিও তোমাকে নবজাতকের রূপে দেখতে পেতাম।”
“দেখার আর কিছু বাকি রেখেছেন সেদিন রাতে?”
চোখ উল্টে সাইবান বলতেই ইরাম উঠে বসে চোখ রাঙাল স্বামীকে।
“চুপ! ঠোঁটের উপর খালি নির্লজ্জ বুলি। ফোন করে কোথায় কেমন আছি, কি করছি বলবে তা না।”
“আমাকে ছাড়া ভালো নেই জানি তো। জিজ্ঞেস করার কি আছে?”
“উফফফ! ওকে বাবা, হার মেনে নিলাম। এবার বলো, কেমন হলো শো?”
ফোনটা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল সাইবান। দেখে বোঝা যাচ্ছে হোটেলরুমে আছে। অর্ধাঙ্গিনীর বিপরীতে সে বলল,
“ইনস্টাগ্রামে দেখে নিন। শুধু জেলাস হবেন না।”
“হব না মানে? দেশের মাটিতে পা রাখো। তোমার পিঠে নতুন একজোড়া ডানা গজিয়েছে। ছাটার জন্য আমার কেঁচি রেডি।”
হাসল সাইবান। দুজনের মাঝে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছাড়াই ঘণ্টাখানেক আলাপ হলো। সাইবান যত ব্যস্তই থাকুক নিয়মমাফিক সে ঠিক কল করে। গতকালও করেছে। কিন্তু ইরাম অরণ্যর কথা বলেনি। আজও বললনা। সাইবানকে বেশ ভালো চেনা আছে তার। এই বাড়িতে অরণ্যর কদম পড়েছে জানলে নিজের ক্যারিয়ারে লাথি মেরে চলে আসবে দেশে। সেটা আপাতত ইরাম চায়না। সে ফিরে আসলে বুঝিয়ে বলবে।
ইরামের সাথে সাথে ইযানের সঙ্গেও কথা বলে প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফোন রাখল সাইবান। তাও ইরামের ধমকের কারণে। তাকে জোর করে বিশ্রামে পাঠিয়ে শেষমেষ ফ্রি হলো ইরাম। সাইবানের ফিরে আসতে এক সপ্তাহের মতন সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত সব ঠিকঠাক থাকলেই হলো।
ক্ষুধা লাগায় ছেলেকে নিয়ে নিচে নামল ইরাম। নামতেই অবাক একটা ঘটনা দেখল। বসার ঘরে বসে আছেন সামিয়া। তবে আজ তিনি একা নন। তার সঙ্গে আছে একটা যুবক গোছের ছেলে। শ্যামলা মুখশ্রী, গালে খয়েরী তিলের মতন দাগ, ফ্রেকেলস্। চোখে চশমা। অত্যন্ত নম্র হাসি। ইরামকে দেখেই সামিয়া হাত তুলে ডাকলেন,
“আরে, এদিকে আয়।”
ইরাম ওড়নার অংশ দিয়ে মাথায় ঘোমটা তুলে এগোল। ইযানকে হাত বাড়িয়ে নিয়ে সামিয়া নিজের কোলে বসালেন।
“এইযে, আমার নাতি, বংশের বাতি। ইযান।”
“ওয়াও কি কিউট।”
আলতো করে ইযানের গাল টেনে আদর করে দিল যুবক ছেলেটা। অমায়িক আচরণ। ইযানও বেশ উৎসাহ নিয়ে দেখল তাকে। সামিয়া এবার ইরামকে দেখিয়ে বললেন,
“আর এই হলো আমার বাড়ির একমাত্র বউ, ইরাম কিবরিয়া। ইরাম, এ হলো আমার হাসপাতালের জুনিয়র, কিন্তু ধরে নে আমার একপ্রকার ছেলে, আদিত্য দেবনাথ।”
আদিত্য নামের ছেলেটা ইরামকে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। যদিও এভাবে অতীব সম্মান জানানোর প্রয়োজন নেই তবুও মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলল,
“আদাব।”
ইরাম মৃদু হাসল,
“আদাব। পরিচিত হয়ে ভালো লাগল আদিত্য। তুমি আমার ছোটই হবে হয়ত, তাই নাম ধরে ডাকলাম, কিছু মনে করোনা।”
“একদম না ভাবী। আপনি আমাকে অবশ্যই নাম ধরে ডাকবেন। ম্যামের মুখে আপনাদের সকলের কথা এত শুনেছি! আজ দেখা হয়ে ভীষণ ভালো লাগছে।”
“আমারও। আজ কিন্ত আমাদের সাথে খেয়েই যাবে কেমন? এর আগে ছাড়ছিনা।”
ইরাম বলতেই সুগন্ধাকে দেখা গেল। একদম নিঃশব্দে কিচেন থেকে বেরিয়ে এসেছে মেয়েটা। হাতে কাঁচের বাটি, যাতে তরকারি। ধীরে ধীরে খাবারের টেবিল সাজাচ্ছে সে। তার আগমনে ক্ষণিকের জন্য ইরামের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকাল আদিত্য। এক পলকের জন্য দেখল সুগন্ধাকে। পরক্ষণেই আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু ওটুকু সময় যথেষ্ট ছিল ইরামের মনে সন্দেহ জাগ্রত করার জন্য। আড়চোখে সে সামিয়ার দিকে তাকাল। নাতির সঙ্গে খুনসুঁটিতে ব্যস্ত থাকা সামিয়া হালকা চোখটিপ দিলেন ইরামকে। সেই চোখটিপের অর্থ ইরাম বুঝতে না পারলেও এখনি কিছু জিজ্ঞেস করলনা। পরে হবে। গলা খাঁকারি দিয়ে সে বলল,
“আরে, দুপুরের খাবারের সময় তো হয়েই গিয়েছে। আমারও ক্ষুধা পেয়েছে। বসে থেকে লাভ কি? আসো আম্মু, এসো আদিত্য, টেবিলে বসে পড়ো।”
দুটো চেয়ার টেনে দিয়ে ইরাম হাতে হাতে সুগন্ধাকে সাহায্য করতে লাগল। আদিত্য আর সামিয়া দুজনই চেয়ারে বসলেন। সুগন্ধা ধীরে ধীরে সবাইকে খাবার বেড়ে দিতে লাগল। ইরাম সবেমাত্র একটা চেয়ার দখল করে বসেছে এমন সময় দরজায় কড়াঘাত। সবাই কিছুটা অবাক হলো। সুগন্ধা গিয়ে দরজা খুলে দিতেই অচেনা এক ব্যক্তির দেখা পাওয়া গেল। ফরমাল শার্ট প্যান্ট পরনে এক মধ্যবয়সী পুরুষ। কাঁধে ঝুলছে একটা কালো ব্যাগ। হাতে বড়সড় একটা বাদামী খাম।
“ইরাম কিবরিয়া আছেন?”
ইরাম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল সেদিকে।
“জি, আমিই ইরাম কিবরিয়া। বলুন?”
“আমি পারিবারিক আদালত থেকে এসেছি। আপনার নামে একটা সমন আছে।”
খামটা বাড়িয়ে দিয়ে একটা ফাইল এগিয়ে লোকটা বলল,
“গ্রহণ করে এখানে সই করে দিন।”
ইরাম হতবিহ্বল হয়ে রইল। পারিবারিক আদালত? টেবিলের সবাই বিস্মিত হয়ে চেয়ে আছে। সুগন্ধাও ভ্রু তুলে বড় বড় চোখে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রেখেছে। ইরাম হাত বাড়িয়ে খামটা নিয়ে সই করে দিল। সামান্য হাত কাঁপল তার। লোকটা কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল কিন্তু ইরাম ডাকল,
“শুনুন? এটা কিসের সমন?”
“খুলে দেখুন। উল্লেখিত দিনে আদালতে উপস্থিত থাকবেন।”
এটুকুই। লোকটা আর কিছু না বলে চলে গেল। বিহ্বল ইরাম দ্রুত খামটা খুলল। ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নোটিশ। বুকের ভেতর ধড়ফড় হলো তার। চোখ জ্বলে উঠল। পৃষ্ঠায় লিখিত—
আমার আলাদিন পর্ব ৫৬
পারিবারিক আদালত, ঢাকা।
মামলা নং: ১৫৮/ ২০২৭
বাদী: অরণ্য মির্জা সওদাগর
বনাম
বিবাদী: ইরাম কিবরিয়া
বিষয়: অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের কাস্টাডি।
