Home আমার শহরে তুমি আমার শহরে তুমি পর্ব ২২ || Alisha Rahman Fiza

আমার শহরে তুমি পর্ব ২২ || Alisha Rahman Fiza

আমার শহরে তুমি পর্ব ২২
 Alisha Rahman Fiza

ঘামে ভেজা শার্ট নিয়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করলো রক্তিম।এদিক সেদিক নজর বুলিয়ে কার্বাড থেকে শার্ট আর টাউজার নিয়ে চলে গেলো ওয়াশরুমে।শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে মাথা মুছতে মুছতে পুরো ঘরে অধরাকে খুজতে থাকে কোথাও না পেয়ে হতাশ হয়ে টাওয়াল রেখে চলে যায় দাদীমার রুমে সেখানে গিয়ে রক্তিম আরো বেশি হতাশ হয় কারণ অধরা সেখানেও নেই।রক্তিম এখন মনে মনে বলছে,

~কোথায় যেতে পারে মেয়েটা?
রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো তার মা রান্নাঘরে কী যেন করছে।সাহারা ছেলেকে এভাবে উঁকিঝুকি করতে দেখে মুচকি হেসে গলার স্বর উঁচু করে বলে,
~অধরা বাসায় নেই।বাবার বাসায় গিয়েছে রাতে হয়তো সেখানে থাকবে।
মায়ের এহেন কথা শুনে রক্তিমের মাথা পুরো হ্যাংঙ্গ হয়ে গেলো।অধরা বাসায় নেই আমাকে না বলে সে কীভাবে চলে গেলো আর আজ রাতে সে ফিরবেনা।কতোটা বেয়াদব মেয়ে একবার হাতের কাছে পাই তারপর বোঝাবো।এসব ভাবছে তখনই সাহারা ছেলের কাঁধে হাত রাখলো রক্তিম পিছনে ফিরে মাকে দেখে মুচকি হাসলো।সাহারা ছেলেকে বললো,
~অধরার বাসা থেকে ফোন এসেছিল যে তার বাবার একটু শরীর খারাপ হয়েছে তাই মেয়েটা তাড়াহুরা করে চলে গেলো।আর তোকে অনেকবার ফোন করেছে তোর ফোন বন্ধ আসছিল তাই আমি ওকে বললাম চলে যেতে
মায়ের কথা শুনে রক্তিমের সব অভিমান পানি হয়ে গেলো কিন্তু চিন্তাটা বেড়ে গেলো।অধরার বাবার শরীর কী বেশি খারাপ নাকি একবার দেখে আসতে হয় তাহলে।রক্তিম এই ভেবে মাকে বললো,

~মা,আমি অধরার বাসায় যাচ্ছি।
সাহারা ছেলের কথা শুনে অস্থির হয়ে বললেন,
~খেয়ে যা সারাদিন তো কী না কী খেয়েছিস?
মায়ের কথা শুনে রক্তিমের মনটা ভালো হয়ে গেলো কতবছর পর মা তাকে খাবার খাওয়ার অনুরোধ করলো।রক্তিমের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো সে চেয়ার টেনে বসে পরলো তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
~ক্ষুধা লেগেছে মা,খাবার দেও।
সাহারা নিজের ছেলের মুখে এমন কথা শুনে চটজলদি তার প্লেটে খাবার তুলে দিলো।রক্তিম তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে তা দেখে সাহারার মনটা ভরে গেলো।রাতও তাকে ক্ষমা করে দিবে এই মনোভাব নিয়েই সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ভার্সিটি থেকে বাসায় যেয়ে মাকে ফোন করে জানতে পারি বাবার শরীর ভালো না তাই আমি বাবার বাসায় চলে আসি।রক্তিমকে অনেকবার ফোন করেছি কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিল তাই রক্তিমকে না জানিয়েই চলে আসি আজ হয়তো বাসায় যাওয়া হবে না তাই আমার রুমের বিছানাটা ঠিক করছি হঠাৎ বাসার কলিংবেল বেজে উঠলো কেউ বারবার শুধু বেল দিচ্ছি আমি রুম থেকে বের হয়ে দরজা খুলে দিলাম।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

আর দরজা খুলেই দেখতে পাই রক্তিম এসেছে তার হাত ভর্তি ফলের ব্যাগ বুঝা যাচ্ছে বাজার থেকে এসেছে।
আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রক্তিম বললো,
~তাকিয়েই থাকো তুমি idiot একটা।
তার ধমক খেয়ে আমি কেঁপে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে মা পিছন থেকে বললো,
~এই বলদ জামাইকে দরজার সামনে দাড় করিয়ে রেখেছিস কেন?
রক্তিম আর মায়ের বকা খেয়ে ঠোঁট উল্টিয়ে বললাম,
~আমাকে তোমরা বকছো কেন?
মা আমাকে সরিয়ে দিয়ে রক্তিমকে বললো,
~ভিতরে আসো বাবা,এই গাধীর কথায় কান দিয়ো না।
রক্তিম ভিতরে এসে ব্যাগ গুলো সাইডে রেখে মাকে বললেন,
~বাবা কোথায়?তার শরীর এখন কেমন?
মা বললো,

~এখন একটু ভালো আছে।বয়স হয়েছে তাই একটু আধটু সমস্যা হয়ে থাকে তিনি রুমেই আছে।
রক্তিম আমার হাতে একটা শপিং ব্যাগ দিয়ে বললো,
~এটা রুমে নিয়ে যাও।এতে আমার কাপড় আছে আগামীকাল কাজে দিবে আমি বাবার সাথে দেখা করে আসি।
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই সে হনহন করতে করতে বাবার রুমে চলে গেলো আমি শুধু হা করে তাকিয়ে রইলাম কী মানুষরে বাবা?এমন করে কথা বলছে যেন তাকে আমি মার্ডার করে এখানে এসেছি এখন সে ভুত হয়ে এসে আমার সাথে এমন করছে।

এসব ভাবতে রুমে চলে আসলাম শপিং ব্যাগটা কার্বাডে রেখে চলে গেলাম মায়ের কাছে
মা চুলোয় মুরগীর রোস্ট বসিয়েছে রাতের খাবারের জন্য মেয়ের জামাই এসেছে তার জন্য তো সব ইস্পেসিয়াল করতে হবে।আর মেয়ে যে এখানে দাড়িয়ে আছে তার কোনো খেয়াল নেই।আমি মাকে বললাম,
~দেখেছো মা রক্তিম আমাকে কীভাবে বকা দিলো?
মা ভাবলেশহীন ভাবে বললো,
~তোকে বকা দিবে নাতো আদর করবে।সবসময় গাধীর মতো কাজ করিস।
আমি রেগে বললাম,
~তুমি রক্তিমের সার্পোট করছো কেন?
মা বললো,
~সঠিকের সার্পোট করছি সবসময় তো তুই গাধীর মতো কাজ করোস।
আমি মুখ ফুলিয়ে সেখান থেকে চলে আসলাম রুমে বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম আকাশের অবস্থা ভালো না যে কোন সময় বৃষ্টির আর্বিভাব হতে পারে।

আকাশটা পুরো মেঘে ডাকা একটু পর পর গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ করছে।আমার বারান্দায় দোলনা আছে আমি সেটায় বসে এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম অনেক ভালো লাগছে এই আকাশটা দেখতে বৃষ্টিতে ভিজতে পারলপ আরো ভালো লাগতো।আমি দোলনা ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে ছাদে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই খেয়াল হলো রক্তিমও তো বাসায় আছে এখন কীভাবে যাবে।পরক্ষনেই মনে হলো রক্তিম তো ব্যস্ত তাই খেয়াল করবে না।যাবো আর আসবো এটা ভেবেই চুপিচুপি ফ্যাল্টের দরজা খুলে সিড়ি বেয়ে ছাদে চলে গেলাম।বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে এ বাসার বাচ্চারাও বৃষ্টিতে ভিজতে ছাদে চলে এসেছে এদের মধ্যে অনেকেই আমাকে চেনে আমিও তাদের চিনি।ওই বাচ্চাদের মধ্যে একজনকে খুব ভালোমতো চিনি তার নাম পুতুল। আমি পুতুলকে দেখে জোড়ে চিল্লিয়ে বললাম,

~এই পুতুল কেমন আছো?
পুতুল চোখ পিটপিট করে আমার দিকে তাকালো আমাকে দেখে সে দৌড়ে চলে আসে আর বলে,
~ ভালো আপু,কেমন আছো তুমি?
আমি বললাম,
~ভালো।আন্টি বৃষ্টিতে ভিজার পারমিশন দিয়ে দিলো?
পুতুল তার ফোকলা দাঁত দেখিয়ে ফিক করে হেসে বলে,
~আরে আপু মা কী আর জানবে আমি এখানে আছি?বৃষ্টিতে ভিজে এখনই চলে যাবো আর মা তো বাসায় নেই।
পুতুলের কথা শুনে মাথায় হাত আমি তার দিকে চোখ চোখ বড় করে বললাম,
~ওরে বাটপার কী চালাক তুমি?
পুতুল বললো,
~আপু তুমি আমাদের সাথে খেলবে?
আমি কিছুক্ষন ভেবে বললাম,
~আচ্ছা।
শাড়ির আচল কোমড়ে গুজে তাদের সাথে কানামাছি খেলা শুরু করলাম।এই বৃষ্টিতে খেলার স্বাদ পেয়ে একদম ছোট বেলার মতো লাগছে

বাবার রুম থেকে বের হয়ে রক্তিম অধরার রুমে চলে গেলো।অধরাকে অনেকবার ডেকেও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে চলে গেলো শাশুড়ি মায়ের কাছে আর বললো,
~মা,অধরা কোথায়?
রক্তিমের কথা শুনে অধরার মা বললো,
~রুমে নেই।
রক্তিম বললো,
~নাহ
অধরার মা বললো,
~নিশ্চয়ই এই মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে চলে গেছে।
অধরার মায়ের কথা শুনে রক্তিমের আরো রাগ হলো এই অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজতে কেন গেলো?এই মেয়ে কে তো আজ ছাড়বোনা।
রক্তিম বললো,

~মা আমি আসছি।
বলেই ছাদের উদ্দেশ্যে চলে গেলে
বৃষ্টি অনেকটাই কমে গেছে তাই আমরা ছাদের ফ্লোরে বসে গল্প করছি বাচ্চারা কবিতা বলছে তো কেউ গল্প শুনাচ্ছে হঠাৎ কেউ রাগী গলায় বলে উঠলো,
~যদি আপনার বৃষ্টি বিলাস হয়ে থাকে তাহলে আমরা নিচে যেতে পারি।
এই কন্ঠ শুনে আমার ভয়ে গলা শুকিয়ে গেলো।এতো আর কেউ নয় রক্তিম আমি পিছে ঘুড়ে তাকিয়ে দেখলাম রক্তিম ছাদের দরজায় হেলান দিয়ে বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে আছে।পুতুল আর বাকি বাচ্চারা রক্তিমকে দেখে ভো দৌড় ওরা হয়তো মনে করেছে রক্তিম তাদের বলেছে।তাদের দৌড় দেখে আমিও একবার ভাবলাম দৌড় দেই পরে ভাবলাম এখন যদি পা ভেঙ্গে যায় তাহলে আরো অবস্থা খারাপ হবে।

রক্তিম আস্তে আস্তে আমার কাছে চলে আসলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে এতে রক্তিমের সাদা রঙ্গের শার্টটা ভিজে যাচ্ছে তার সামনের চুল গুলে সে হাত দিয়ে ঠিক করে। আমার একদম কাছে এসে বললেন,
~চুপচাপ রুমে যাবে কোনো কথা বললে কোলে নিয়ে নিবো।
তার কথা শেষ হতে দেরি আমার হাঁটতে দেরি হয়নি সোজা সিড়ি বেয়ে ফ্যাল্টে ডুকে একদম নিজের রুমে চলে গেলাম।মা আমাকে দেখেই বকা শুরু করেছেন আমি রুমে এসে শাড়ি নিয়ে যেই না ওয়াশরুমে ডুকতে যাবো তখনই দরজা বন্ধ করার আওয়াজ শুনে পিছে ঘুরে দেখি রক্তিম দাড়িয়ে আছে আমাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত স্ক্যান করে বললেন,
~বৃষ্টিতে কেন ভিজতে গিয়েছো?
রক্তিমের শান্ত কন্ঠ আমার কাছে বড্ড অশান্ত মনে হচ্ছে।আমার জবাব না পেয়ে সে আমার কাছে এসে কোমড় জড়িয়ে ধরে বললেন,

~আর কোনোদিন এরকম করবে না নাহলে খুব বড় শাস্তি পাবে।
এতটুকু বলে রক্তিম আমাকে ছেড়ে দিলো আমি ওয়াশরুমে চলে আসলাম।অনেক বড় বাঁচা বেঁচে গেছি
আমি শাড়ি পাল্টে ওয়াশরুম থেকে বেড় হয়ে দেখি রক্তিম বিছানায় শুয়ে আছে মাথায় হাত দিয়ে আমি আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল মুছতে শুরু করলাম
রক্তিম তার চোখ খুলে দেখতে পেলো এক রমনী তার চুল শুকাতে ব্যস্ত। রক্তিমের এখন মন চাচ্ছে এই রমণীকে একবার ছুয়ে দিতে তাও নিবিড় ভাবে। এই রমণীর উপরে তার অধিকার আছে রক্তিমের এই আকাশপাতাল ভাবনায় দরজায় টোকা পরলো জারিফ বাহির থেকে বলছে,
~আপু,নাস্তা রেডি করেছে দুলাভাইকে নিয়ে চলে আসে মাগরিবের আযান সেই কবে দিয়েছে।
আমি জারিফের কথা শুনে বললাম,
~আসছি।
এতটুকু বলে বিছানার দিকে তাকালাম রক্তিম আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি তাকে বললাম,
~চলেন নাস্তা করে আসি।
রক্তিম কিছি না বলে উঠে দাড়ালান আমিও তা পিছে পিছে হাঁটা শুরু করলাম।

রাত আজ তার বাবার অফিসে গিয়েছিল নিজের কাজে ফোকাস করতে চায় সে তাই আজ থেকে কাজ শুরু করে দিলো সে।এইমাত্র বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে খাবার টেবিলে বসেছে রাত অনেক ক্ষুধা লেগেছে তখনই দাদীমা এসে রাতকে বললো,
~রাত দাদুভাই,প্লেটে খাবার নেও সেই যে সকালে বের হয়েছো এখন পর্যন্ত কিছু খাওনি
দাদীমার কথা শেষ হতেই সাহারা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসলো ছেলের প্লেটে খাবার বেড়ে রাতের সামনে দিয়ে দিলো।রাত চুপচাপ খাওয়া শুরু করলো খাওয়ার মাঝেই দাদীমা বললো,
~রাত দাদুভাই,প্রথমদিন অফিসে কেমন কাটলে?
রক্তিম হাসি হাসি মুখ করে বললো,
~ভালো কেটেছে দাদীমা অর্ধেক বেলা ছিলাম।কালকে থেকে সকালেই চলে যাবো
দাদীমা বললো,
~ঠিক আছে।

আমার শহরে তুমি পর্ব ২১

রাত খাওয়া শেষ করে রুমে চলে আসলো তারপর সিগারেটের প্যাকেট নিয়ে চলে বারান্দায় একটা সিগারেট মুখে দিয়ে লাইটার দিয়ে জ্বালিয়ে সেটায় সুখটান দিতে লাগলো।সাহারা ছেলের রুমে এসেছে কোথাও রাতকে না পেয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখলো রাতের অবস্থা।সাহার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললো,
~রাত আর কতোক্ষন মায়ের সাথে রাগ করে থাকবি?
রাত সিগারেট হাত থেকে ডাস্টবিনে ফেলে দিলো আর বললো,
~রাগ করিনি তোমার সাথে কীসের জন্য এসেছো তা বলো।
সাহারা বললো,
~তোর জন্য একটা মেয়ে দেখেছি অনেক ভালো তোর দাদীমা পছন্দ করেছে কালকে আমাদের সাথে চল মেয়েটাকে দেখে আসবি?
রাত মেকি হেসে বললো,
~বিয়ে করবো না মা।
সাহারা বললো,
~এখন কী বিয়ে করবি নাকি এখন শুধু দেখবি
রাত বললো,

~তোমার এক ছেলে বিয়ে না করলে কী ক্ষতি হবে মা?
এভাবেও তোমার এই বাজে ছেলেকে কে ভালোবাসবে?
বলেই রাত একদম বাসা থেকে বের হয়ে গেলো গাড়ি না নিয়ে হাঁটা ধরলো রাস্তায় মনটা হালকা করতে হবে।
সাহারা ছেলের কথায় স্তব্ধ কী বলে গেলো তার ছেলে এতো কষ্ট দিয়ে ফেললো তার সন্তানকে ভাবতেই তার চোখ দিয়ে পানি পরতে শুরু করলো।

আমার শহরে তুমি পর্ব ২৩