Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৮

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৮
ইসরাত জাহান দ্যুতি

এসেছিল দীধিতি অনুপমা আর তামান্নার সঙ্গে পার্লারে৷ শরীরের যত্নআত্তি না নিতে নিতে চোখের নিচ ডেবে কালি পড়ে গেছে, মুখে দু একটা ব্রণও জেগেছে, চুলগুলোরও যাচ্ছেতাই অবস্থা। তামান্না আর অনুপমা চট করে সিরিয়াল পেয়ে গেলেও দীধিতিকে অপেক্ষা করতে হবে কমপক্ষে হলেও ঘণ্টাখানিক। এতক্ষণ এই এক জায়গায় বসে থাকাটা প্রচণ্ড বিরক্তিকর। দশ মিনিট যেতেই দীধিতি তামান্নাকে বলল, ‘আমি একটু হেঁটে আসি বাইপাস থেকে, বুঝলি? ভালো লাগছে না বসে থাকতে।’
তামান্না আর অনুপমা দুজনই চুল রিবোন্ডিং করিয়ে নিচ্ছে। সময় লাগবে বেশ। অনুপমা পাশ থেকে শুনতে পেয়েই বলে দিলো, ‘যা, ঘুরে আয়। আধা ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসিস।’

বেরিয়ে এলো দীধিতি তখনই৷ এগারোটা বাজতে যাচ্ছে বেলা। দুপুর পার হয়ে যাবে পার্লারের কাজ শেষ হতে হতে৷ একটু ক্ষুধা ক্ষুধাও পেয়েছে ওর। সকালে খুব একটা ভারী নাশতা করা হয়নি যে৷ সামনেই ফুডকোর্ট দেখা যায়। কী করবে? ওদের ছাড়াই হালকা কিছু নাশতা সেড়ে আসবে ওখান থেকে? অন্তত একটা স্যান্ডউইচ আর পানি৷ ভাবতে খুব বেশি সময় নিল না৷ বাইপাস ছেড়ে মিরপুর দশের ব্যস্ত সড়ক পার করে চলে এল এপাশে। এই ফুডকোর্ট দেখেই মনে হচ্ছে নতুন হয়েছে এটা৷ কিন্তু ভেতরের সাজসজ্জাটা খুব একটা চমৎকার না। তবে প্রথম প্রথম ফ্রেশ খাবারই পাওয়া যাবে৷

ভেতরে আসার পর একটা কাস্টোমারও চোখে পড়ল না দীধিতির৷ আশেপাশে সার্ভিসবয়গুলোও নেই না কি? হেঁটে সামনে আরও এগিয়ে এসে টেবিলে বসতেই চোখে পড়ল ওর, একদম কর্নারের শেষ টেবিলটাতে চারজন পুরুষের উপস্থিতি। ঝকঝকে স্যুট প্যান্টে তাদের বিশাল বিশাল এক বিজনেসম্যান লাগছে। কৌতূহলী নজরজোড়া হটিয়ে ও সামনে চোখ বুলিয়ে খুঁজতে থাকল সার্ভিসবয়দের। আওয়াজ করে ডাকলও। কিন্তু চকিতেই সাড়া মিলল না। পেছনের টেবিলের লোকগুলোর খেয়ালে বোধ হয় পড়ল ও সে সময়। সেদিকে না চেয়েও বুঝতে পারল তা। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর এল একটা ছেলে। বেশ বিরক্তি নিয়ে দীধিতি তখন বলল, ‘আপনাদের তো ডেকেই পাওয়া যায় না। শুরুতেই সার্ভিসে হেলাফেলা!’
-‘স্যরি ম্যাম। প্লিজ প্লেস দ্য অর্ডার।’ ছেলেটা কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, চোরা নজরে একবার পেছনে তাকিয়ে।
মেনু কার্ডটা হাতে নিয়ে বলল ও, ‘চিকেন শর্মা হবে তো?’

-‘জি জি হবে।’
-‘তাহলে একটা শর্মাই আনুন। কতক্ষণ লাগবে?’
-‘খুব বেশি সময় লাগবে না, ম্যাম। সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট।’
-‘ওকে।’
-‘সাথে ড্রিঙ্কস কিছু?’
-‘না, শুধু পানি।’
ঝটপট চলে গেল ছেলেটা। খাবার না আসা অবধি ফোন ঘাটাঘাটি করার ইচ্ছাবোধ হলেই দীধিতি খেয়াল করল হাতের পার্সব্যাগটা ছাড়াই সে আনমনে চলে এসেছে। আজ-কাল এত ঘনঘন ভুলো মনা হয়ে পড়ছে! খুব মেজাজ খারাপ হচ্ছে এখন নিজের ওপরই৷ মুখটা কালো করে চুপচাপ বসে থাকল।

মিনিট তিনেক বাদ হঠাৎ পেছনের সেই টেবিল থেকে কাচের গ্লাস অথবা কাচের অন্য কিছু ভাঙার আওয়াজ এল। চমকে ফিরল দীধিতি পেছনে, আর অমনিই বিস্ময়মূর্তি বনে দেখল তাওসিফও আছে তাদের মাঝে। ওর সঙ্গেই লোকটা তিনটার হাতাহাতি হচ্ছে৷ চোখের পলকেই একজন ব্লেজারের ভেতরের পকেট থেকে পিস্তল বের করে ওর গলায় ঠেকাল৷ সে সময় চোখাচোখি হয়ে গেল ওর দীধিতির সাথে। প্রচণ্ড নার্ভাস দীধিতি বিপদ মুহূর্তে সব সময় দারুণ উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিতে পারলেও আজ বড্ড ভুল করে ফেলল। লোক তিনটা ওর দিকে তাকানোর পূর্বেই ও উঠেই ছুটে যেতে চাইল অ্যাকাউন্টারের দিকে। যেতে পথেই পায়ে পা জড়িয়ে নিচে পড়ে গেল৷ লোক তিনটার থেকে একজন দৈত্যের মতো বড়ো বড়ো পা ফেলে ওর সামনে এসে দাঁড়াল। আজও দীধিতি বোরকা, হিজাব ছাড়া৷ ওর এই মন মর্জি বোরকা পরার অভ্যাসটার জন্য আজ বিপদ ভাগ্যে ওরও ছিল। লোকটার বয়স তাওসিফের মতোই৷ কিন্তু ষণ্ডা চেহারার। কালো মুখটার তীক্ষ্ণ বড়ো বড়ো চোখজোড়ায় নারীদেহের প্রতি যে ভীষণ লোভ তা এক নিমিষেই ধরে ফেলল দীধিতি। হাত বাড়িয়ে খপ করে ওর বাহু চেপে ধরে দাঁড় করিয়ে সঙ্গী দুজনকে বলল, ‘নো রিস্ক শুড বি টেকেন। সঙ্গে এই সুন্দর মা**টাকেও লাগবে আমার।’

গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল দীধিতি এবার, ‘কেউ আছেন? হেল্প আস। প্লিজ কেউ আসুন!’
শেষের বাক্য সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ডান গালে শক্ত এক থাপ্পর পড়ল ওর। লোকটা আবারও এক বিশ্রী গালি দিয়ে ওর গাল চেপে ধরে বলল, ‘কেউ যাতে না আসে সে ব্যবস্থা করেই আসছি। এখন প্লিজ হেল্প আস করে করে গলা ফাটাবি না। আমার সঙ্গে শোয়ার পর প্লিজ ফা** মি বলে বলে চেঁচাবি শুধু। এনজয় করব।’
বাঁ ভ্রুর কোনা কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে তাওসিফের। গ্লাস দিয়ে আচমকা আঘাত করে হয়েছিল ওর ওখানেই। যার জন্য আঘাতটা সামলাতে পারেনি তৎক্ষণাৎই। তারপর অবশ্য ও-ও দু’তিনটা ঘুষি মেরেছিল সামনেরজনকে। কিন্তু সুবিধা করতে পারেনি। পালটা আঘাত পেতে হয়েছে আরও। নাক আর কপালের ব্যথায় এখন নাজুক অবস্থা ভীষণ। দীধিতি বেচারির জন্য আওয়াজ করেও লাভ হবে না। কারণ, অন্য কোনো উপায়েই ছাড়া পাওয়ার সুযোগ নেই। একটু আগেই ওর ফোন, ওয়ালেট এমনকি হাতের ঘড়িটাও খুলে নিয়েছে ওরা।

এই তিনজন আততায়ীর আগমনটা তাওসিফের জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছেড়ে দিতে হয়েছে ওকে মাহতাব শেখের নির্দেশে। নাওফিলের অন্যায় কাজটির পর মাহতাব শেখ এখন সব নাতি-নাতনিদের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছেন। একা একা কোনো নাতিকেই তিনি আর থাকতে দেবেন না। যোগ্যতার পরিচয় যথেষ্ট দিয়েছে তাকে নাতিরা৷ এখন যতটা সম্ভব শাসন বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি৷ তাওসিফকে বাবা, চাচাদের সাথে ব্যবসায় ঢোকার আদেশ দিয়েছেন। এবং আজই ওকে একবার গাজীপুর আসতে বলেছেন। তাই অনিচ্ছাতেই তাওসিফকে ব্যাঙ্কের চাকরিটা ছেড়ে আসতে হয়। অফিসিয়ালি কাজগুলো দ্রুত হয়ে যায় দাদার পরিচয় দেওয়ার পরই। ফিরে এসে এই ফুডকোর্টে ঢুকেছিল সকালের নাশতাটা করার জন্য। খাবার অর্ডার দেওয়ার ঠিক দশ মিনিট পর এই লোক তিনটা এসে হাজির হয় ওর সামনে। পরিচয় দেয় প্রথমে নাওফিলের কলিগ বলে৷ তাওসিফকে দূর থেকে নাওফিল ভেবেই এগিয়ে এসেছিল নাকি ওরা। কাছে এসে ভুল ভাঙলেও সৌজন্যবোধ আর আগ্রহের বশে কথা বলতে আরম্ভ করে৷ খোঁজ নেয় নাওফিলের। তারপর আদেশ দেয় হঠাৎই, ওদের সঙ্গে ওদের বসের কাছে যেতে হবে তাওসিফকে। এমন অযৌক্তিক আদেশ শুনে ঠান্ডা আর গম্ভীর স্বভাবের তাওসিফ ধমকে ওঠে ওদের আর বলে ওকে বিরক্ত না করে চলে যেতে। কারণ, ততক্ষণে ও বুঝে গিয়েছে লোকগুলো আদতে ভালো মানুষ নয়। চোখে মুখে ওদের ধূর্ততাও টের পাওয়া যায়৷ কিন্তু লোকগুলো এখানে ঢোকার সময়ই এখানের ম্যানেজারকে পিস্তসলের মুখে বসিয়ে এসেছে ওদেরই আরেক লোকের মাধ্যমে।

তাওসিফ আর দীধিতির পেছন পেছন লোকগুলো বেরিয়ে এল ফুডকোর্ট থেকে। ওদের টু শব্দ করারও সাহস নেই৷ পিঠের পিছে খুব সাবধানে পিস্তল ঠেকিয়ে রাখা। কারও নজরেই তা পড়বে না, ঠিক সেভাবেই ধরে রেখেছে। রাস্তার ধারে সাদা একটি মাইক্রো দাঁড়িয়ে আছে। দিনে দুপুরে দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক যুবতীকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তা শুধু দেখতে পেল ওই ফুডকোর্টের ম্যানেজার আর সার্ভিসবয়গুলো। সাধারণ জনতা কেউ টের পেল না। নয়ত অবাকই হত শিল্প মন্ত্রীর মতো মানুষের নাতিকে দিনের আলোয় তাদের সামনে অপহরণ হতে দেখে৷ তাওসিফের আজকের পরিণতির জন্য একমাত্র দায়ী সে নিজেই। মাহতাব শেখ তার পরিবারের মানুষগুলোকে নিরাপত্তা ছাড়া কখনই বাইরে চলাফেরা করতে দিতে চান না৷ নাওফিলের পিছে ওর অগোচরেই জাহিদ শেখ কখনও দেহরক্ষী নিয়জিত রেখেছেন, কখনও গুপ্তচর৷ তাতেও নাওফিল স্বেচ্ছায় নিজেকে কতবার বিপদের মুখোমুখি করল। সেখানে তাওসিফ কখনই রাজি ছিল না দেহরক্ষী নিয়ে চলাফেরা করতে৷ সে সব সময় নিজের পিতৃ পরিচয়, দাদার পরিচয় গোপন রেখে নিশ্চিন্তে সাধারণ মানুষের মতো ঘুরে বেরিয়েছে৷ অথচ আজ দুর্ভাগ্যক্রমে নাওফিলের চাচাতো ভাই হওয়ার জন্য এবং একে অপরের চেহারায় মিল থাকার জন্য কি না অপহরণকারীদের খপ্পরে পড়ল!

ফুডকোর্টের ম্যানেজার নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে পুলিশকে কোনোভাবেই জানাতে রাজি হলো না এই দুর্ঘটনার কথা। কারণ, লোকগুলো বেরিয়ে আসার আগে তাকে ভালোভাবেই শাসিয়ে এসেছে। কিন্তু যে ছেলেটা দীধিতির খাবারের অর্ডার নিয়েছিল, বুকে অদম্য সাহস নিয়ে সে-ই গাড়ির নাম্বারসহ ৯৯৯-এ কল করে পুলিশদের জানিয়ে দিল পুরো ঘটনাটা অতি গোপনে।

গাড়ির মধ্যে তাওসিফ আর দীধিতিকে পাশাপাশি বসানো হয়নি। ষণ্ডা চেহারার ছেলেটার নাম সাদ্দাম। নিজের পাশে বসিয়ে সারা গাড়িতে খুব নোংরাভাবে দীধিতিকে লাঞ্ছনা করল সে। আজ ধর্ষণের শিকার হওয়ার পূর্বেই সুস্থ আর স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার স্পৃহাটুকু শেষ দীধিতির। ওর কোমল দেহের সংবেদনশীল স্থানগুলো যেমন রুক্ষ, কামুক ছোঁয়ায় ব্যথায় নীল। তেমনই মনটাও নিস্তেজ হয়ে গেছে।
সার্টসি দীপের প্রাসাদে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে বিপদে পড়া মিরহানকে এক অদৃশ্য জাদুর বলয় সব সময় বিপদ থেকে আগলে নিত। লম্পট পুরুষ মায়া নেকড়েদের লোভপীড়িত দৃষ্টি আর ওদের হামলা থেকেও কতবার বাঁচিয়েছে কোনো এক অদৃশ্য বলিষ্ঠ পুরুষালি হাত। সে হাতের স্পর্শই কেবল অনুভব করতে পারত মিরহান।
সেই কল্পজগতের মিরহানকে কোনো বিপদ ছুঁতেও পারেনি শুধু ওই জাদুর বলয় আর ওই হাতজোড়ার যত্নের জন্য। কিন্তু বাস্তব অস্তিত্বের দীধিতিকে বাঁচাতে তো কোনো জাদুর বলয় তৈরি হবে না, আসবেও না কোনো সুপারহিরো।

চিলেকোঠার ঘরটা আজ সকাল থেকে ঝুমুর আর শিউলি দু’জন মিলে ধুয়েমুছে, ঝকঝকে তকতকে করে রেখেছে৷ বিকালে এই ঘরে একজন ভাড়াটে আসবে৷ সে কিরণের কলেজের নতুন অঙ্কের শিক্ষক। ছেলেটা এসেছিল এদিকেই বাসা খুঁজতে গতকাল। পথিমধ্যে দেখা হয়ে যায় তখন ঝুমুরের সঙ্গে। কিন্তু সে সময় ছেলেটাকে দেখে তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন বোধ হয় মাটি, বালি টেনে আনা ট্রাকের ড্রাইভার হবে। আপাদমস্তক মাটি আর বালিতে ভরা ছিল তখন ছেলেটার। চোখে শুধু মোটা কালো ফ্রেমের চশমাটা না থাকলে ঝুমুরের মনে সন্দেহই জাগত না। গায়ে ছিল তার ছাই বর্ণের একটা ঢিলেঢালা টি শার্ট আর রংচটা জিন্সের প্যান্ট। কিন্তু মুখের আদল খুব সরল আর সুন্দর। দেখলেই মমতা জাগে মনে। ঝুমুরের সামনে পড়তেই ভারী গলায় সালাম জানিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আন্টি, এই এলাকায় ভাড়া নেওয়ার জন্য ঘর দেখলে সে ঘর না নিলেও ঝেড়ে মুছে দিয়ে আসতে হয়?’

এহেন আজগুবি প্রশ্নে ঝুমুর রিমলেস চশমার আড়াল থেকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকেন। তখনই ছেলেটা করুণ সুরে জানায়, ‘ওই যে আকাশী রঙা চারতলা বাসায় ভাড়া নিতে রুম দেখছিলাম। কিন্তু আমার একটু নিরিবিলি জায়গা পছন্দ। আর ওই বাসাটা বেশ কোলাহলময় মনে হল। গিটার, মাউথ অর্গান এসব বাজায় বোধ হয় বাড়িওয়ালার ছেলে। শব্দে তখনই বিরক্ত লাগছিল আমার। ওখানে রুম নেব না মনস্থির করে আমি ফিরে আসার সময় হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছেলে ডেকে বলে, “জুতার মধ্যে একগাদা ময়লা ভরে সারা রুম ঘুরে দেখলেন, রুম নোংরা করলেন। অথচ রুম ভাড়া নেবেন না! তা তো হবে না। হয় রুম ভাড়া নেবেন নয় সারা রুম ঝেড়ে মুছে সাফ করে দিয়ে যাবেন।” আমি তাজ্জব বনে গেলাম। বললাম, ভাড়া দিতে চাইলে এটুকু ময়লা তো হবেই ঘর। আমার ঘর পছন্দ হয়নি। তাই ঘর নেব না। ঘর না নিলে ঘর ঝাড়ব মুছবই বা কেন? কিন্তু ছেলেটা খুব বেয়াদব আর বেপরোয়া ধরনের, বুঝলেন আন্টি। আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল সে ঘরে। আর বলল, “ঘর না নিলেও ঘরে ঢুকলেই ঝেড়ে মুছে দিয়ে যেতে হবে। এটাই নিয়ম এখানের।” এই বলে আমাকে ঘরের ঝুল ঝাড়া থেকে শুরু করে পুরো ঘর ধোয়াল মুছাল পর্যন্ত। কিচেন আর বাথরুমও বাদ দিতে দেয়নি।’

ঝুমুরের সামনের বাড়িটাতেই একটা মহা ফাজিল ছেলে থাকে। নাম সৌরভ। ঢাকা মেডিকেলে পড়ছে দু বছর হল। ছুটিতে বাড়ি এসেছে দুদিন হয়েছে। সৌরভের বাবা একজন খুব খ্যাতিমান আইনজীবী আর মা গৃহিণী। তাদের সঙ্গে ঝুমুরের খুবই ভালো সম্পর্ক। মানুষ হিসেবে তারা ভীষণ ভালো। শুধু বড়ো ছেলেটাই হয়েছে আস্ত বজ্জাত। তবে ঝুমু্রকে সৌরভ খুবই শ্রদ্ধা করে। ঝুমুরও আদর করেন ওকে খুব। সময়, সুযোগ পেলেই এ বাসায় এসে ঝুমুরের কাছে নানান কিছু খাওয়ার আবদার ধরে ছেলেটা। বছর দুই আগেও যখন যশোর থাকত সৌরভ, তখন ফ্রিজে থাকা কিরণের পছন্দের কেক আর আইসক্রিম রোজ এসে খেয়ে যাওয়া ছিল ওর নিত্যদিনের স্বভাব। কিরণকে সৌরভের বাবা-মা পুত্রবধূ হিসেবে অনেক আগেই চেয়ে রেখেছেন ঝুমুরের কাছে। ঝুমুরও মনেমনে রাজিই। কেবল প্রকাশ্যে বলা বাকি।

আর তা তিনি জানাবেন যেদিন বুঝতে পারবেন কিরণ আর সৌরভ দুজনই দুজনকে পছন্দ করে৷ কারণ, এদের দুজনের মাঝে বর্তমান যে দা কুমড়া সম্পর্ক তাতে ঝুমুর সন্দিহান ভবিষ্যতে এদের মাঝে বিবাহ সম্পর্ক সম্ভব কি না।
গতকাল বিকালে সেই ছেলেটার সাথে কথা বলে যখন জানতে পারলেন ঝুমুর, ছেলেটা কিরণের কলেজের নতুন শিক্ষক। মাস তিনেকের জন্য গেস্ট টিচার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সে এখানে৷ আত্মীয় বলতে এ জেলায় কেউ-ই নেই তার। ছেলেটার অবস্থা, সরল চেহারা আর শিষ্টাচারে মুগ্ধ হয়ে তিনি তখন নিজেই প্রস্তাব দেন তার চিলেকোঠায় থাকার জন্য৷ ছাদটা সব সময়ই নিরিবিলি থাকে৷ কিরণ যতটুকু যাওয়া আসা করে তাও না হয় তিনি বারণ করে দেবেন। স্মরণ বাড়িতে যেহেতু থাকে না তাই চিলেকোঠাটা ফাঁকাই পড়ে থাকে এখন। অবশ্য স্মরণ বাড়িতে ঘুরতে এলেও ভাড়া দেওয়া সম্ভবই ছিল না এমন ব্যাচেলর একটা ছেলেকে।

স্মরণ ঢাকা চলে যাবার পর থেকে তার ঘরটা কিরণের দখলেই এখন। দোতলায় স্মরণের ঘরের সঙ্গে অর্ধেক দেওয়াল টানা লম্বা একটা বেলকনি রয়েছে। বেলকনির দুই ধারে সৌরভের এনে দেওয়া কতগুলো ফুলের টবও ঝুলছে। স্মরণ আর সৌরভ বাড়ি থাকতে এই দুজনের আবার গলায় গলায় ভাব ছিল৷ সে সময়গুলোতে এই বেলকনিতে সৌরভের যাতায়াত ছিল যখন তখন৷ এই দুটো মানুষ ঢাকায় চলে যাবার পর থেকে কিরণ নিজের মনমতো রাজত্ব করে এখন বেলকনিতে। দুটো চেয়ার আর ছোট্ট একটা গোল টেবিল পেতেছে সে এখানে৷ রাত হলে টেবিলের মাঝে ল্যাম্পশেড জ্বালিয়ে পড়তে বসে, দীর্ঘ রাত ধরে গল্প, উপন্যাসও পড়ে, ফোনে চ্যাটিংও চলে বন্ধুদের সাথে। তবে সুস্থ হওয়ার পর ইদানিং ওর শখ জেগেছে চেয়ার, টেবিল সরিয়ে বসার ঘর থেকে ডিভানটা টেনে আনবে সে এখানে৷ মা’কে সে কথা এখনও বলা হয়নি। আধ ঘণ্টা হল ঝুমুর এমারজেন্সি ফোনকল পেয়ে ক্লিনিকে ছুটেছেন। আজ শুক্রবার ছিল। আজকের দিনে তিনি কোনো সেবায় দেন না কোনো রোগীকে৷ কিন্তু কলটা ছিল সুহাইলের। তার বোনের ডেলিভারি ডেট ছিল আজ। কিন্তু হঠাৎ সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাচ্চাটা নরমাল পজিশনে নেই। হয়ত সি সেকশনে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে তাই নতুন ভাড়াটের জন্য মায়ের বদলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে কিরণকে। বেলকনিতে বসে সৌরভের শোবার ঘরটার দিকে আনমনে তাকিয়ে ভাবছে নতুন শিক্ষক নিহাদ শেখের কথা। সে ভেবেছিল, এই স্যারটা সুহাইল আঙ্কেলের কোনো আত্মীয় হবে হয়ত৷ কেমন যেন চেহারায় একটু আধটু মিল খুঁজে পাওয়া যায় দুজনের৷ তাছাড়া কলেজে সেদিন যেভাবে নিহাদ স্যারের কাঁধ জড়িয়ে ধরে এসেছিলেন সুহাইল শেখ, তাতে কিরণ নিশ্চিত ছিল সম্পর্কে তারা কোনো একভাবে ভাই ভাই হবেই। তবে তার সে ধারণা সম্পূর্ণই ভুল হল গতকাল রাতে নিহাদ স্যারের ব্যাপারে সব শুনে।

সন্ধ্যা লগ্ন বয়ে যায়। মাগরিবের আজান পড়ছে চারপাশে সকল মসজিদে। কিরণ বেলকনি ছেড়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করে নিল ঘরে এসে। জায়নামাজ ছেড়ে উঠতেই কলিংবেল বেজে ওঠে হঠাৎ। মাথার হিজাবটা না খুলেই বসার ঘর পার করে এসে দরজাটা খুলে দেখে শিউলি দাঁড়িয়ে আছে।
-‘ও কিরণ, তুমাগের ভাড়াইটে আইছে তো৷ সুজা ছাদে চইলে গ্যাছে। আমারে কইল খালাম্মারে ঘরের চাবি নিয়া যাইতি।’
-‘তোমার খালাম্মা নাই, আপা। ক্লিনিকে গেছে৷ ফিরতে রাত হবে৷ আমি যাচ্ছি, চলো।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কেমন উদাস গলায় বলল কিরণ।

-‘আমি যাইতে পারব না এহন৷ ঘরে কাম আছে। তুমি যাও।’ শিউলি আর দাঁড়াল না কথা শেষে।
মায়ের ঘর থেকে চিলেকোঠার ঘরের চাবিটা খুঁজে নিয়ে কিরণ চলে এলো ছাদে। স্যার লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে এখন ওকে অতি ভদ্রসুলভ মেকি আচরণ করতে হবে। মানে যেটা সকল শিক্ষার্থীরাই করে থাকে শিক্ষকদের সামনে। আসতে পথে আর যেতে পথে সালাম ঠোকা, কিংবা যতবারই স্যারের মুখোমুখি হবে ততবারই সালাম জানাতে হবে, কথা বলতে দাঁড়ালে কথার মাঝে ঘনঘন স্যার জপতে হবে, উচ্চস্বরে কথা বলা, হাসা, কোনোটাই করা যাবে না। মোদ্দা কথা, যতটা সম্ভব নিজেকে অত্যন্ত সুশীল বালক কিংবা বালিকা সেজে থাকতে হবে। এই ব্যাপারটা এখন কিরণকে রোজ করতে হবে ভাবতেই অস্বাভাবিকরকম বিরক্ত লাগছে ওর। এই যে স্যার মানুষটির কাছে চাবিকাঠি নিয়েও যেতে মন চাইছে না ওর৷ তার থেকে বেশি মন চাইছে না লোকটিকে ঘরটাই ভাড়া দিতে। আপুটা থাকলে এই বিরক্তির হাত থেকে রেহাই পেত সে।
-‘এতক্ষণ লাগে আসতে! মালামাল নিয়ে ছাদে উঠতে উঠতে ঘেমে-নেয়ে শেষ এক্কেবারে। একটু জলদি দরজা খোলো, মেয়ে।’

কী সাবলীল ঢঙে কথা বলছে লোকটা! যেন কত আগের চেনাজানা তার কিরণের সঙ্গে৷ না না, চেনাজানা নয়। মনে হলো যেন কিরণ বউ হয় তার। তাই আসতে দেরি হওয়াই মহা বিরক্ত সে। সঙ্গে সঙ্গেই কিরণ নাক কুঁচকাল৷ এই হাবাগোবা চেহারার ছেলেটার কথাবার্তা তো মোটেও হাবাগোবা ধরনের না। এই ধারার কথায় মা শিষ্টাচার খুঁজে পেল কোথায়?
-‘আরে কী হলো? খুলছ না কেন দরজাটা?’ বিরক্ত প্রকাশের সঙ্গে একটু কড়াও শোনাল কথাদুটো।
কিরণ বিস্ময়ে, রাগে বাক্যহারা। ভেবেছিল নিচু স্বরে আর নরম গলায় কথা বলতে হবে তাকে সব সময় এই লোকের সঙ্গে। স্যার মানুষ বলে কথা! কিন্তু এরকম খিটমিটে গলায় কথা বললে একে সম্মান তো দূর, আসতে পথে যেতে পথে ঝগড়া না করতে হয়। যেমন শুরুটা হল ওদের এখন থেকেই।
-‘জি স্যার, এক্ষুনি খুলছি। কিন্তু স্যারের বোধ হয় ম্যনারস সার্টিফিকেটটা অর্জন করা হয়নি?’ বলতে বলতে দরজাটা খুলে দিলো কিরণ।
নিহাদের অসন্তোষ দৃষ্টিজোড়া তীক্ষ্ণ হল। ভ্রু’কুটি করে কয়েক পল কিরণকে দেখে নিয়ে দু হাতে লাগেজ ধরে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল, রাশভারী গলায় আদেশ দিলো, ‘লাইট, ফ্যান অন করে দাও। নাম কী তোমার?’

নিহাদের কথা মতো ঘরে এসে সুইচ অন করে দিলো কিরণ, জবাব দিলো ওর প্রশ্নে, ‘রেজাউল হক জ্যোতি।’
প্রবল ঝটকায় ফিরে তাকাল নিহাদ কিরণের দিকে। নিষ্পলক ওর মুখপানে চেয়ে থেকে স্বগতোক্তি করল বিড়বিড়িয়ে, ‘রেজা হক। অফিস অ্যাসিসট্যান্ট কাম কম্পিউটার অপারেটর। অরগ্যানেজেইশন এনএসআই।’
নিহাদের চিকন ঠোঁটদুটো নড়তে দেখলেও ওর কথা স্পষ্ট কানে এল না কিরণে। তবে মনে হল ওর বাবার নামটা বলল বোধ হয় মাস্টারটা। ‘কী? কিছু বললেন, স্যার?’
-‘বললাম। তোমাকে শোনানোর জন্য বলিনি৷ আর এই কথায় কথায় স্যার স্যার করবে না৷ যখন তোমার ম্যাথ ক্লাস নিই তখন কোরো৷ এখন একটু উপকার করো খাবার পানি এনে দিয়ে৷ গলা শুকিয়ে গেছে।’ অপ্রসন্ন গলায় বলল নিহাদ৷

কিরণ প্রচণ্ড অপমানবোধ করছে নিহাদের সঙ্গে কথা বলে৷ ওর মনে হচ্ছে স্যার ওকে একটুও সহ্য করতে পারছে না। বাধ্য হয়েই কেবল এটুকু কথা খরচ করছে সে। আজকের পর এই বেয়াদব স্যারের কাছে সে জীবনেও আসবে না। এই সুন্দর বেয়াদব লোকের মধ্যে ওর মা শিষ্টাচার খুঁজে পেলেন কোথায়, তা মা আজ আসতেই জিজ্ঞেস করবে ও।
নিচে এসে এক জগ ভর্তি পানি নিয়ে ফিরল আবার ছাদে। ঘরের দরজা খোলা দেখে আর অনুমতি বা দরজায় কড়া নেড়ে ঢোকার প্রয়োজনবোধ করল না। তাই স্বাভাবিকই ঘরে পা রাখল সবে আর তখনই নিহাদ ধমক দিলো, ‘জ্যোতি ফোতি! ঘরের বাইরে যাও, আউট! কমনসেন্স নেই ঘরে নক করে ঢোকার?’ বলেই টি শার্টটা দ্রুত আবার পরে নিলো নিহাদ৷ ওর খেয়ালই ছিল না কিরণ পানি নিয়ে ফিরবে।

কিন্তু মেজাজ তরতরিয়ে বেড়ে গেল কিরণের৷ সামান্য ভাড়াটে হয়ে, তাও প্রথম দিনেই বাড়িওয়ালার মেয়ের সঙ্গে এমন অমানুষের মতো ব্যবহার করবে? না অসম্ভব, এই ভাড়াটে একটা মাসও থাকতে পারবে না এই বাড়ি৷ মা থাকতে দিলেও সে দেবে না। প্রয়োজনে ঢাকা থেকে আপুকে ডেকে আনবে সে।
নিহাদের কথা মানল না একেবারেই। ঘরের বাইরে না গিয়ে হনহনিয়ে আরও ভেতরে এসে ছোটে কাঠের টেবিলটার ওপর পানির জগটা রেখে তর্জনী আঙুল তুলে, শাসানোর ভঙ্গিমায় চড়া গলায় নিহাদকে বলল, ‘আমার নাম শুধু জ্যোতি৷ নামের বিকৃতি করবেন না কিন্তু একদম।’
কোমরে দু হাত রেখে অদ্ভুত দৃশ্য দেখার মতো চোখ ছোটো ছোটো করে চেয়ে থাকল নিহাদ কিরণের দিকে। পুচকি মেয়েটা ওকে এভাবে আঙুল তুলে কি না হুমকি দিচ্ছে! বাচ্চা মেয়েটা জানে সে কার সামনে দাঁড়িয়ে আছে? ওর বয়স কত সে ধারণা নেই না কি? এগিয়ে কিরণের কাছে এসে দাঁড়াল। শীতল চোখে, শীতল সুরে শুধু বলল, ‘নামটা মোটেও পছন্দ হয়নি আমার।’

-‘তাহলে প্রয়োজন পড়লে কিরণ বলে ডাকবেন। তাও ভুল করে যদি নামের বিকৃতি করেন!’ কঠিন শোনাল কিরণের বাক্যদুটো।
ভ্রু জোড়া মুহূর্তেই উঁচু হয়ে গেল নিহাদের। কপালের চামড়ায় ভাঁজ পড়ল তাতে৷ কপট শঙ্কিত অভিব্যক্তি ওর।
একটু নিচু হয়ে কিরণের মুখখানির খুব কাছে এসে চাপা স্বরে শুধাল, ‘যদি করি? তাহলে? গুলি করে দেবে?’
মুখটা পিছিয়ে আনল কিরণ, খানিক চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে কী আশ্চর্য ভাই! আপনি এত কাছে এসেছেন কেন? ভিলেনদের মতোই বা এমন ফিসফিসিয়ে কথা বলছেন কেন? আপনার মতিগতি তো একদমই ভালো না।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৭

নিহাদ নিম্ন ঠোঁট কামড়ে একটু হাসে, ‘বর্তমান তামিলনাড়ুর অরবিন্দ স্বামী আমার সব থেকে পছন্দের অ্যাক্টর। তোমার কেমন লাগে, কিরণ?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here